হোম গদ্য রবীন্দ্রনাথের বিজ্ঞাপন, বিজ্ঞাপনের রবীন্দ্রনাথ

রবীন্দ্রনাথের বিজ্ঞাপন, বিজ্ঞাপনের রবীন্দ্রনাথ

রবীন্দ্রনাথের বিজ্ঞাপন, বিজ্ঞাপনের রবীন্দ্রনাথ
3.56K
0

‘লজ্জাভূষণ’ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন :

সংবাদপত্রে দোকানদারেরা যেরূপে বড়ো বড়ো অক্ষরে বিজ্ঞাপন দেয়, যে ব্যক্তি নিজেকে সমাজের চক্ষে সেইরূপ বড়ো অক্ষরে বিজ্ঞাপন দেয়, সংসারের হাটে বিক্রেয় পুতুলের মতো সর্বাঙ্গে রঙচঙ মাখাইয়া দাঁড়াইয়া থাকে, ‘আমি’ বলিয়া দুটো অক্ষরের নামাবলী গায়ে দিয়া রাস্তার চৌমাথায় দাঁড়াইতে পারে, সেই ব্যক্তি নির্লজ্জ । সে ব্যক্তি তাহার ক্ষুদ্র পেখমটি প্রাণপণে ছড়াইতে থাকে, যাহাতে করিয়া জগতের আর সমস্ত দ্রব্য তাহার পেখমের আড়ালে পড়িয়া যায় ও দায়ে পড়িয়া লোকের চক্ষু তাহার উপরে পড়ে।

বিজ্ঞাপন কিভাবে সবকিছুকে ঢেকে দেয়, কিভাবে সত্যকে প্রলেপ দিতে দিতে একটি কিম্ভূত বায়বীয় জগতের সৃষ্টি করে সে-ব্যাপারে নতুন করে বলবার কিছু নেই। সবচেয়ে ভয়ঙ্কর হলো এর মিথ্যে নাচনকুদন, যাতে আমার পণ্যটিই সেরা, প্রকারন্তরে ‘আমি’ই সেরা এই মনোভাব। প্রচার-প্রপাগাণ্ডায় বিষয়খানা এমন দাঁড়ায়—আপনি যদি অমুক ক্রিম ব্যবহার না করেন তবে আপনার প্রেমিক অন্যজনের কাছে ভেগে যাবে, আপনি কি তমুক গুঁড়াদুধ বাচ্চাকে দিচ্ছেন? কি দিচ্ছেন না! তাহলে তো ও ফার্স্ট হবে না। এই প্রথম হবার ইঁদুরবিড়াল দৌড়ে মানুষকে ঠেলে দেয় বিজ্ঞাপন। বলছি না, সব বিজ্ঞাপনই মিথ্যার বেসাতি। কিন্তু চারদিকে এত এত বিলবোর্ড, পত্রপত্রিকা-লিফলেটে ক্রেতা ধরার ফন্দি, তা দেখেই মনে হয় বিজ্ঞাপনের আগুনে জ্বলছি। হয়তো একারণেই রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন :

ভাগ্যে বাগানে আসিয়া পাখির গানের মধ্যে কোনো অর্থ পাওয়া যায় না এবং অক্ষরহীন সবুজ পত্রের পরিবর্তে শাখায় শাখায় শুষ্ক শ্বেতবর্ণ মাসিক পত্র, সংবাদ পত্র এবং বিজ্ঞাপন ঝুলিতে দেখা যায় না! ভাগ্যে গাছেদের মধ্যে চিন্তাশীলতা নাই!

13295201_572294246283072_731280292_nকিন্তু বাজার-অর্থনীতির যুগে এই আগুন ও বিকিকিনির প্রক্রিয়া শেষ হবার নয়। সে কারণেই যে রবীন্দ্রনাথ গাছের বন্দনা করেন ওদের শরীরে বিজ্ঞাপন ঝোলে না বলে (সত্যিই কি তাই? সড়কের পাশে কত গাছে ব্যানার-ফেস্টুন আর আলগা পোস্টার এখন সবখানেই দেখা যায়), সেই রবীন্দ্রনাথকে পড়তে হয়েছে বিজ্ঞাপনের লোলুপ দৃষ্টিতে। বিভিন্ন নথি ও তৎকালীন সংবাদপত্র ঘেঁটে জানা যায়—১৮৮৯ থেকে মৃত্যুর বছর পর্যন্ত অর্থাৎ ১৯৪১ সাল পর্যন্ত ছোট-বড়, পরিচিত-অপরিচিত বিভিন্ন পণ্যের বিজ্ঞাপনে রবীন্দ্রনাথ অংশ নিয়েছেন। তেল-সাবান, ক্রিম থেকে শুরু করে পাগলের মহৌষধ পর্যন্ত বিচিত্র বিজ্ঞাপনে তাঁর উপস্থিতি দেখা যায়। কখনো মডেল, কখনো তাঁর প্রশংসাবাক্য শোভা পেয়েছে বিজ্ঞাপনপত্রে।


বন্ধুস্থানীয় হেমেন্দ্র মোহন বোসের পীড়াপীড়িতে কবি লিখেছিলেন, ‘সুলেখা কালি। এই কালি কলঙ্কের চেয়েও কালো।’


মোটা দাগে এইসব বিজ্ঞাপনকে দুটো ভাগে ভাগ করা যেতে পারে। একটি পণ্যের পরিচিতি, অন্যটি কোনো বিশেষ পণ্য সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথের সার্টিফিকেট; যেখানে কবিগুরুর মুখ দিয়ে ব্যবসায়ীরা তাদের পণ্যটি যে সেরা তাই বলিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেছেন। ওইসব বাণীর মধ্যে ছিল রস, বুদ্ধিমত্তা, ছন্দ, শ্রুতিমধুরতা, আর থাকত একটা দৃশ্য বা সমাজের কোনো একটি দিকের প্রতি ইঙ্গিত। এছাড়া স্বদেশি শিল্পোদ্যোগকে উৎসাহ দিতে এবং তা সবার মাঝে ছড়িয়ে দিতেই তিনি দেশীয় পণ্যের জন্য বাণী লিখে দিতেন। ব্যবসায়ীরা এগুলোকে বিজ্ঞাপন হিশেবে ব্যবহার করতেন।

রবীন্দ্রনাথের প্রথমোক্ত ধারার বিজ্ঞাপনগুলোর মধ্যে লুকিয়ে আছে আধুনিক বিজ্ঞাপনের অনেক আকর্ষক কলাকৌশল। অল্প কথায় পণ্যের একটি ট্যাগ লাইন হিশেবে এইসব কাজ বিস্ময়ের উদ্রেক করে। এমনি একটি বিজ্ঞাপন—সুলেখা কালি। বন্ধুস্থানীয় হেমেন্দ্রমোহন বোসের পীড়াপীড়িতে কবি লিখেছিলেন, ‘সুলেখা কালি। এই কালি কলঙ্কের চেয়েও কালো।’

মাত্র দুটি বাক্য। সাতটি শব্দ। ‘এই’ শব্দটি বাদ দিলে কালির বিজ্ঞাপনের ভাষা এর চেয়ে আকর্ষণীয়, বুদ্ধিদীপ্ত আর ছোট করা বোধহয় খুব কঠিন হতো। কলঙ্কের সাথে কালোর সম্পর্ক গড়ে পণ্যের ট্যাগ লাইন বানানোর আইডিয়াটি এক কথায় ইউনিক। আজকের বিজ্ঞাপনেও আমরা দেখি যে, বিজ্ঞাপনের অল্প সময় আর অল্প কথায় বেশি পাঞ্চ দেয়ার ওপরই নির্ভর করে নির্মাতার মুনশিয়ানা। রবীন্দ্রনাথ এইক্ষেত্রে যথেষ্ট সফল ও পথপ্রদর্শক।

13288980_572294262949737_1464639537_nঅন্য যে ধরনটির কথা বললাম রবীন্দ্র-বিজ্ঞাপনের সেটি হলো নোবেল লরিয়েট ‘কবীন্দ্র’-এর সার্টিফিকেট। নানাভাবে বিজ্ঞাপনদাতা এটা বোঝাতে চেয়েছেন—রবীন্দ্রনাথ বলেছেন এই পণ্য ভালো, অতএব আপনারা এটা কিনুন। রবীন্দ্রনাথের ক্ষেত্রে এই ধরনের বিজ্ঞাপনই বেশি। এই যেমন সুলেখা কালির কর্ণধার হেমেন্দ্রমোহন বোসের কথা ধরা যাক। উনার অন্যান্য পণ্যের জন্যও রবীন্দ্রনাথ প্রশংসাবাক্য লিখে দিয়েছিলেন। যতদূর জানা যায়, হেমেন্দ্রমোহন ১৮৯৪ সালে সুগন্ধির ব্যবসা শুরু করেন। পরে চুলের তেল, অডিকোলন ও অন্যান্য প্রসাধনের ব্যবসায় হাত দেন। এতে প্রচুর অর্থপ্রাপ্তি ঘটে। ১৯০০ সালে উনি একটি ছাপাখানা খোলেন। প্রতিষ্ঠা করেন প্রকাশনা সংস্থা ‘কুন্তলীন’। ১৯০৩ সাল থেকে লেখকদের জন্যে বিখ্যাত ‘কুন্তলীন পুরস্কার’ দেওয়া শুরু করেন হেমেন্দ্র। এই পুরস্কার পেতে হলে লেখকদের পূরণ করতে হতো দুটি শর্ত। প্রথমত : একটি নতুন গল্প জমা দিতে হবে, আর দ্বিতীয়ত : সেই গল্পে কোথাও না কোথাও ‘কুন্তলীন তেল’-এর উল্লেখ থাকতে হবে। প্রথম কুন্তলীন পুরস্কার পেয়েছিলেন বাংলা সাহিত্যের নিয়তিবাদী গল্পকার হিশেবে খ্যাত জগদীশ গুপ্ত। জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ও কুন্তলীন তেল সহযোগে রচনা লিখে এই পুরস্কার লাভ করেছিলেন। সে যা হোক, কুন্তলীন কেশ তৈলের বিজ্ঞাপনে রবীন্দ্রনাথকে কিভাবে ব্যবহার করা হয়েছিল আমরা বরং সেই দিকে নজর ফেরাই।

কুন্তলীনের বিজ্ঞাপনে ‘নারীর রূপলাবণ্য’ টাইটেল দিয়ে লেখা হচ্ছে—কবি বলেন যে, ‘নারীর রূপ লাবণ্যে স্বর্গের ছবি ফুটিয়া ওঠে।’ সুতরাং আপনাপন রূপ ও লাবণ্য ফুটাইয়া তুলিতে সকলের আগ্রহ হয়। কিন্তু কেশের অভাবে নরনারীর রূপ কখনই সম্পূর্ণভাবে পরিস্ফুট হয় না। কেশের প্রাচুর্য্যে মহিলাগণের সৌন্দর্য্য সহস্রগুণে বর্ধিত হয়। কেশের শোভায় পুরুষকে সুপুরুষ দেখায়। যদি কেশ রক্ষা ও তাহার উন্নতি সাধন করিতে চান, তবে আপনি যত্নের সহিত ভিটামিন ও হরমোনযুক্ত কেশতৈল ‘কুন্তলীন’ ব্যবহার করুন।

কবীন্দ্র রবীন্দ্রনাথ বলিয়াছেন : ‘কুন্তলীন ব্যবহার করিয়া এক মাসের মধ্যে নূতন কেশ হইয়াছে।’

‘কুন্তলীনে’র গুণে মুগ্ধ হইয়া কবি গাহিয়াছিলেন—

‘‘কেশে মাখ ‘কুন্তলীন’।
         রুমালেতে ‘দেলখোস’।
পানে খাও ‘তাম্বুলীন’।
         ধন্য হোক এইচ বোস।’’

দেখেছেন ব্যাপারখানা! কুন্তলীন ঘষে কেশপ্রাপ্তিতে আটখানা কবীন্দ্র। সেই খুশিতে গুণকীর্তণ করে পদ্যপ্রসব। এমন কাঁচা কথার বিজ্ঞাপন এখন হাস্যকর ঠেকলেও সেই সময়ের বাস্তবতাটি আমাদের মাথায় রাখতে হবে। সেটা এমন এক সময় যখন রবীন্দ্রনাথের নাম জুড়ে দিতে পারলেই পণ্যের কাটতি। এই একই বাসনায় রবীন্দ্রনাথের কাছে ধরনা দিয়েছিল অন্যতম বিশ্বসেরা চা কোম্পানি লিপটন। ওদের জন্যও পদ্য ফেঁদেছিলেন নোবেল লরিয়েট। এইখানে দেখা মেলে কবিগুরুর ইংরেজিকে আত্মীকৃত করার সেই ট্রেডমার্ক টেকনিক। অফিসকে আপিস বলার মতো রবীন্দ্রনাথ এখানে কেটলিকে বলছেন কাতলি—

চা-স্পৃহ চঞ্চল
চাতকদল চল
কাতলি-জল তল
কলকল হে…

রবীন্দ্রনাথকে দিয়ে এই চায়ের বিজ্ঞাপন লিখিয়ে নিতে পেরে লিপটন কর্তৃপক্ষও ছিল দারুণ উচ্ছ্বসিত। আর হবেই-না বা কেন? জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির শিরোমণির স্বীকৃতি পেয়ে লিপটন চা যেন আভিজাত্য ও বুদ্ধিদীপ্ততার রসদ হয়ে উঠেছিল। লিপটন কর্তপক্ষ বলেছিল, ‘আমাদের চায়ের সঙ্গে সরাসরি তাঁর নাম যুক্ত করার বিষয়ে আমরা প্রথমে ইতস্তত বোধ করছিলাম। কিন্তু ভাবতে ভালো লাগছে যে, বিভিন্ন ব্র্যান্ডের চায়ের মধ্যে লিপটনই একমাত্র কবিগুরুর সমর্থন লাভ করেছে।’


‘বাংলায় ঘিয়ের ভেজাল বাঙালির অন্ত্রের ভেজালকেও অনিবার্য করে তুলেছে। আশাকরি শ্রীঘৃত বাঙালির এই ভেজাল রোগের প্রতিকার করবে।’


13313465_572294279616402_1107496313_oশুধু বেসরকারি কোম্পানি ও প্রতিষ্ঠান নয়, সরকারি প্রতিষ্ঠানও বিজ্ঞাপনের স্লোগানের জন্য মুখাপেক্ষী হয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথের। এই যেমন ভারতীয় রেলওয়ের কথাই ধরা যাক। এই রেলগাড়ি নিয়ে কবিগুরুর কত অভিজ্ঞতা, কত কথা। ইউরোপ-যাত্রায় ওখানকার রেলের ভূয়সী প্রশংসা করে তাঁর কণ্ঠে আক্ষেপ ঝরতে দেখেছি—কবে ভারতীয় রেল এমন হবে? আবার কখনো রেলগাড়িকে তিনি দেখেছেন দার্শনিক জায়গা থেকে। এক জায়গায় তিনি বলছিলেন—‘যুক্তি হচ্ছে স্টিম-এঞ্জিন, আর বিশ্বাস হচ্ছে রেলের রাস্তা। বিশ্বসুদ্ধ লোকের নজর এঞ্জিনের উপরে; সকলে বলিতেছে—‘বাহবা, কী কল বাহির হইয়াছে! অত বড়ো গাড়িটাকে অবাধে টানিয়া লইয়া যাইতেছে। নিচে যে একটা রেল পাতা রহিয়াছে, ইহা কাহারো চোখে পড়ে না, মনেও থাকে না।’

ভারতীয় রেলগাড়ি নিয়ে ২-৩ কিস্তির পুরোদস্তুর প্রবন্ধই আছে তাঁর। যেখানে তিনি সাহিত্যের সাথে রেলগাড়ির সাযুজ্য দেখছেন, বলছেন :

সাহিত্য-এঞ্জিন কেন, দেশে সহস্র এঞ্জিন বেকার পড়িয়া আছে। ভারতবর্ষের রাজা-গঞ্জে রাণী-গঞ্জে কয়লা যে নাই, এমন নহে, কিন্তু এত গভীর অকালে নিহিত যে, সহস্র মাথা খুঁড়িলেও পাইবার কোনো সম্ভাবনা নাই। আর এক উদ্যমের কয়লা আছে, তাহাও বাংলা দেশে এমন বিরল ও বাংলার কয়লার এত অধিক ধোঁয়া হয় ও এত কম আগুন জ্বলে যে, দুই পা গিয়াই গাড়ি চলে না।

সে যা হোক—রেলের এমন কড়া সমালোচনা সত্ত্বেও রেলবিভাগ কিন্তু বিজ্ঞাপনের জন্য দ্বারস্থ হয়েছেন রবি ঠাকুরের কাছেই। তবে দার্শনিকতা নয়, বিজ্ঞাপনে ব্যবহৃত হয়েছে কবিগুরুর রোমান্টিক পঙ্‌ক্তি—

‘রেলগাড়ির কামরায় হঠাৎ দেখা
ভাবি নি সম্ভব হবে কোনদিন’

এই মিষ্টি রোমান্টিক পঙ্‌ক্তি, দুদিকে দুই যুবক-যুবতীর চোরা চোখাচোখি; আর নিচে পূর্ব রেলের লোগো। রেলগাড়ি এমনিতেই নস্টালজিক। তার ওপর সাদাকালো এই বিজ্ঞাপন রোমান্টিক বাঙালির রেলভ্রমণকে নিঃসন্দেহে রোমাঞ্চিত করেছিল।

রবীন্দ্রনাথের আর একটি জনপ্রিয় বিজ্ঞাপন ছিল জলযোগ মিষ্টান্ন ভাণ্ডারের জন্য। ওই বিজ্ঞাপনে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘জলযোগের বানানো মিষ্টান্ন আমি চেখে দেখেছি। এটা আমাকে তৃপ্তি দিয়েছে। এর আলাদা স্বাদ আছে।’

jমজার বিষয়, জলযোগ সেইসময় কিংবা এখনো মিষ্টির জন্য বিখ্যাত নয়। এর তৈরি কেক জনপ্রিয়। দেশীয় পণ্য রেডিয়াম ক্রিম এবং শ্রীঘৃতের জন্যও তিনি বিজ্ঞাপন করেছেন। পশ্চিমবঙ্গে এখনও  শ্রীঘৃত পাওয়া গেলেও রেডিয়াম ক্রিম আর পাওয়া যায় না। শ্রীঘৃত সম্পর্কে তিনি লিখে দেন, ‘বাংলায় ঘিয়ের ভেজাল বাঙালির অন্ত্রের ভেজালকেও অনিবার্য করে তুলেছে। আশাকরি শ্রীঘৃত বাঙালির এই ভেজাল রোগের প্রতিকার করবে।’

রেডিয়াম ক্রিম সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ লিখেছিলেন, ‘রূপচর্চার জন্য স্নো ও ক্রিমজাতীয় প্রসাধন যারা ব্যবহার করেন, তারা রেডিয়াম ফ্যাক্টরির তৈরি ক্রিম ব্যবহার করে দেখুন, বিদেশি পণ্যের সঙ্গে এর কোনো পার্থক্য খুঁজে পাবেন না।’

এই এতদিন পর, কোম্পানির নাম রেডিয়াম না রেডিয়ম তা নিয়ে একটু মতভেদ তৈরি হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ রেডিয়াম লেখা সত্ত্বেও বিজ্ঞাপনের নিচে রেডিয়ম লেখা দেখতে পাওয়া যায়!

mদেশীয় পণ্য যে কোনো অংশে বিদেশি পণ্যের চেয়ে খারাপ নয় এমন কথা আরও অনেক বিজ্ঞাপনে বলেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। ভারতের আজকের অন্যতম বড় শিল্পগোষ্ঠী সে-সময়েই দ্বারস্থ হয়েছিল সাবানের বিজ্ঞাপনের জন্য। সেখানে রবীন্দ্রনাথকে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছিল—গোদরেজের চেয়ে ভালো কোনো বিদেশি সাবানের কথা আমার জানা নাই। তাই আমি সবাইকে এটা ব্যবহার করতে বলব।

রবীন্দ্রনাথের উদ্ধৃতির পর ছোট্ট করে আরেকটি উদ্ধৃতি দেখা যায় বিজ্ঞাপনটিতে। সেটি মেজর ডব্লিউ এইচ ডিকিনসনের। সরকারি এই রসায়নবিদও সাবানটির প্রশংসা করেছিলেন। তবে লক্ষণীয়, একজন সরকারি আমলা, তার ওপর ইংরেজ—এমন মানুষের চেয়ে ন্যাটিভ রবীন্দ্রনাথের কথাই ছিল গোদরেজের কাছে অধিক গুরুত্বপূর্ণ। বিজ্ঞাপনের ঊর্ধ্বাংশে অপেক্ষাকৃত বিস্তৃতভাবে রবীন্দ্রাথের উদ্ধৃতি সেটাই প্রমাণ করে। সন্দেহ নেই, রবীন্দ্রনাথকে ব্যবহার করলে কাটতি বাড়বে—গোদরেজ কর্তৃপক্ষ এমনটাই মনে করত।

bএভাবেই রবীন্দ্রনাথ সেনোলা রেকর্ড কোম্পানি, ভোলানাথ দত্ত অ্যান্ড সন’স লিমিটেডের কাগজ এবং ডরকিনস হারমোনিয়াম কোম্পানির জন্যও বাণী লিখে বিজ্ঞাপন করেছিলেন। এমনকি ৮ ধর্মতলার অপেরা পরিচালক হরেন ঘোষের মৃত্যুর পর অর্ঘ্যবাণীও লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ। সে সময়ের ফটো স্টুডিও এস ঘোষের নামডাক কতখানি ছিল তা জানা যায় না। তবে এই প্রতিষ্ঠানের জন্য দু’কলম লিখে দিয়েছিলেন কবিগুরু। তিনি বলছেন—‘এস ঘোষ আমার যে দুটি ফটোগ্রাফ তুলেছেন তা অতি সুন্দর ও সুনিপুণ। দেখে আমি বিস্মিত ও সন্তুষ্ট হয়েছি। তাদের ব্যবসায়ে তারা যে যথেষ্ট সফলতা লাভ করবেন তাতে আমার সন্দেহ নেই।’


রবীন্দ্রনাথও সেই বাজার-অর্থনীতির অংশ হয়েছেন, কখনো বন্ধুজনের অনুরোধে, কখনো স্বদেশি বন্ধুদের পণ্য বিপণনের জন্য, আবার কখনও হয়তো অজ্ঞাতেও।


নিজেদের তোলা ছবির পাশে সেই প্রশংসাসূচক কথাগুলো বিজ্ঞাপনে দিয়েছিল প্রতিষ্ঠানটি। এরপরেই নিজেদের বিশেষত্ব ও ক্রেতাদের আকৃষ্ট করে স্টুডিওতে আসার আমন্ত্রণ। ভাবখানা এমন—কবিগুরু যখন ছবি তুলিয়ে খুশি, আপনারা কি আর নাখোশ হবেন!

13289105_572294269616403_1928970401_nরবীন্দ্রনাথ বিভিন্ন শিল্প-উদ্যোক্তাদের কাছে কতটা জনপ্রিয় ছিলেন তার প্রমাণ মেলে এস সি রায় অ্যান্ড কোং-এর বিজ্ঞাপনে। কলকাতার ১৬৭/৩ কর্নওয়ালিশ রোডে নিজস্ব ফ্যাক্টরিতে ওরা তৈরি করত পাগলের ওষুধ। সেই ওষুধের বিজ্ঞাপনেও রবীন্দ্রনাথের প্রত্যয়ন পত্রের সন্ধান মেলে। ডাক্তার উমেশচন্দ্র রায়ের জগদ্বিখ্যাত ‘পাগলের মহৌষধ’ শিরোনামের সেই বিজ্ঞাপনে বলা হচ্ছে—

৭০ বৎসরের ঊর্ধ্বকাল যাবৎ লক্ষ লক্ষ দুর্দ্দান্ত পাগল ও সর্ব্বপ্রকার বায়ুগ্রস্ত রোগীর আরোগ্য করিয়াছে। মূর্চ্ছা, মৃগী, অনিদ্রা, হিষ্টিরিয়া, অক্ষুধা, স্নায়বিক দুর্ব্বলতা প্রভৃতি রোগেও ইহা আশুফলপ্রদ। প্রতি শিশি মূল্য ৫ টাকা।
বিবরণী-পুস্তিকা বিনামূল্যে পাঠাই ।

“আমি ইহার উপকারিতা বহুকাল যাবৎ জ্ঞাত আছি”—রবীন্দ্রনাথ।

ভাবুন ব্যাপারখানা! রবীন্দ্রনাথের সার্টিফিকেটে পাগলের ওষুধ!

রবীন্দ্রনাথের লেখা বিজ্ঞাপনগুলো প্রকাশিত হয়েছে—প্রবাসী, বসুমতি, কলকাতা মিউনিসিপাল গেজেট, ভাণ্ডার, শনিবারের চিঠি, সাধনা, তত্ত্ববোধিনী পত্রিকাসহ আনন্দবাজার পত্রিকা, অমৃতবাজার পত্রিকা, দি স্টেটসম্যান ও অ্যাডভান্সসহ বিভিন্ন সংবাদপত্র ও সাময়িকীতে। তবে সংখ্যা অনুযায়ী আনন্দবাজার পত্রিকাতেই সবচেয়ে বেশি ছাপা হয়েছে তাঁর বিজ্ঞাপন।

llঅনেকে আবার নিজের প্রতিষ্ঠানে প্রত্যয়নপত্রে ঝুলিয়ে রাখতেন এইসব পোস্টার। যেমন : নেপিয়ার পেন্ট (পেইন্ট!) ল্যাবরেটরিতে রবীন্দ্রনাথের যাওয়ার খবর আমরা যেমন পত্রিকাতেও দেখি তেমনি এটি—৮, গোবরা গোরস্থান রোডে নেপিয়ারের কারখানাতেও শোভা পেয়েছিল দীর্ঘদিন।

সামন্তবাদ ভেঙে পুঁজিবাদী ব্যবস্থা গড়ে ওঠার সময় বিজ্ঞাপন কিভাবে মানুষের মনোজগৎ দখল করে নিতে শুরু করেছিল তা এখন ঐতিহাসিক সত্য। রবীন্দ্রনাথও সেই বাজার-অর্থনীতির অংশ হয়েছেন, কখনো বন্ধুজনের অনুরোধে, কখনো স্বদেশি বন্ধুদের পণ্য বিপণনের জন্য, আবার কখনও হয়তো অজ্ঞাতেও। ইন্ডিয়ান স্টেট ব্যাংক এই তো বছর কয়েক আগে, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছবি ব্যবহার করে টিভি বিজ্ঞাপন বানিয়েছিল।

এখন সময় বিজ্ঞাপনের। বিজ্ঞানের জোয়ারে মানুষ ভেসে যায়। ঘুরে চলে সভ্যতার চাকা। ওতেই আবার কেউ ক্ষত-বিক্ষত হয়। টাকাকড়ির হিশেবের ভেতরেও উঁকি দেয় মানবিক টানাপোড়েন। তাই-তো ‘জমা খরচ’ শীর্ষক নাতিদীর্ঘ প্রবন্ধে রবীন্দ্রনাথ বলছেন :

প্রস্তাব-লেখক এইখানে একটি বিজ্ঞাপন দিতেছেন। একটি অত্যন্ত দুরূহ অঙ্ক কষিবার আছে, এ পর্যন্ত কেহ কষিতে পারে নাই। যে পাঠক কষিয়া দিতে পারিবেন তাঁহাকে পুরস্কার দিব। আমার এই হৃদয়টি একটি ভগ্নাংশ; আর একটি সংখ্যার সহিত গুণ করিয়া ইহা যিনি পূরণ করিয়া দিবেন তাঁহাকে আমার সর্বস্ব পারিতোষিক দিব। বিষয়টা আরও খোলাসা করে দেখা মিলবে শেষরক্ষা নাটকে, চন্দ্রকান্তের জবানিতে—‘কাগজে বিজ্ঞাপন বেরোবে—হৃদয়-বেদনার জন্য অতি উত্তম মালিশ, উত্তম মালিশ, উত্তম মালিশ! বিরহনিবারণী বটিকা; রাত্রে একটি সকালে একটি সেবন করিলে বিরহভার একেবারে নিঃশেষে অবসান।’

হে মহামান্য কর্পোরেট, আছে নাকি সেই বটিকা? না থাকলেও সমস্যা নাই—রবীন্দ্রনাথকে উদ্ধৃত করে না হলেও উনার ছবি ঠুসে দিয়ে সেই বিজ্ঞাপন যে তৈরি হবে-না তার গ্যারান্টি কোথায়?

মাজুল হাসান
মাজুল হাসান

মাজুল হাসান

কবি ও গল্পকার
জন্ম : ২৯ জুলাই ১৯৮০, দিনাজপুর।
পড়াশুনা করেছেন দিনাজপুর জিলা স্কুল, নটরডেম কলেজ
ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অর্নাস।।

প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ:
বাতাসের বাইনোকুলার ● বাঙলায়ন প্রকাশনী, ২০১০।
মালিনী মধুমক্ষিকাগণ ● বাঙলায়ন প্রকাশনী, ২০১৪।
ইরাশা ভাষার জলমুক ● চৈতন্য, ২০১৬।

প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ:
টিয়ামন্ত্র ● ভাষাচিত্র প্রকাশনী, ২০০৯।
নাগর ও নাগলিঙ্গম ● বাঙলায়ন প্রকাশনী, ২০১২।

অনুবাদগ্রন্থ:
টানাগদ্যের গডফাদার, রাসেল এডসনের কবিতা ● চৈতন্য, ২০১৬।

মাজুল হাসান পেশায় সাংবাদিক। বর্তমানে একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে বার্তা বিভাগে কর্মরত।
মাজুল হাসান
মাজুল হাসান