হোম গদ্য রক্তখরচের ভিন্নপাঠ : সংস্কৃতির যুদ্ধদিন

রক্তখরচের ভিন্নপাঠ : সংস্কৃতির যুদ্ধদিন

রক্তখরচের ভিন্নপাঠ : সংস্কৃতির যুদ্ধদিন
4.27K
0

পরস্পর রাজনৈতিক তর্কের কোনো প্লাটফর্ম নয়। কিন্তু যে তর্ক আমাদের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের, যে তর্ক শিল্পীর ভূমিকা ও দায়বোধের সঙ্গে সম্পর্কিত, তাতে সাড়া না দিয়েও উপায় নেই আমাদের। সেই প্রেক্ষিতে অতি-সাম্প্রতিক একটি আলোচিত প্রসঙ্গে প্রতিক্রিয়া মুদ্রিত হলো পরস্পরে। তথ্যসমৃদ্ধ, বস্তুনিষ্ঠ এমন বিতর্ককে আমরা স্বাগত জানাই…

সম্পাদক

মুক্তিযুদ্ধ কত কত না বলা ইতিহাসের, রক্ত, খুন, ধর্ষণ, হত্যা, ভীরুতা, নীচতা, কাপুরুষতা, বীরত্বগাথা, আত্মদান, সহযোগিতা, দৃঢ়চিত্ততা—এই সমস্ত কিছুর; জানে মহাকাল। কত মহৎপ্রাণ আর রক্তখরচের অধ্যায় শেষে আমরা ‘বিজয়’ নিয়ে গর্ব করি, বলা মুশকিল। যদি ক্ষয়ক্ষতি ও অন্ধকারের পোতাশ্রয়ে হারানোর হিশেব কষা হতো, তবে কেউ বলত না যুদ্ধে জয় হয়েছে বাঙালির। এ যুদ্ধ ভাইকে ভাইয়ের থেকে আলাদা করেছে, বোনের সম্মানহানি ভাইয়ের কাজের জন্য হালকা তুচ্ছ হয়েছে, বাবার শান্তিরক্ষায় নেমে গেছে মেয়ের সম্মান, গলায় জুটেছে শাড়ির প্যাঁচ বা দড়ি; অপর মানুষ গালি দিয়ে বলতে পেরেছে, ‘রাজাকারের বোনের, রাজাকারের মেয়ের সম্মান গেলেও কি, না গেলেও কি’। বাবা ও সন্তানকে চিরতরে আলাদা করেছে এই যুদ্ধ, দেবতুল্য শিক্ষককে হত্যা করেছে তারই ছাত্র, হয়তো এক সময় কাউকে পাশে না পেয়ে শিক্ষককে বলেছিল বিপদের কথা। এমনও খুঁজে পাওয়া দুষ্কর নয়, যে দল ছিল ছয়দফার স্রষ্টা, গণঅভ্যুত্থানের প্রতীক, বাঙালির মুক্তির প্রতীক, সে দলের মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মী ভোল পাল্টে মুক্তিযুদ্ধে পাক-আর্মিকে সাহায্য করেছেন। এইসব ইতিহাস চাপা রইলেও কিন্তু মিথ্যে হয়ে যায় না। অগ্রন্থিত অন্ধকার চারপাশে ডিমেন্টরের ছড়ানো কালো জালের মতো হয়ে আছে। সেসব ঘটনার একটা এখন আলোচনার তুঙ্গে, বাকি কিছু ঘটনাকে উস্কে দিতেই এ লেখার জন্ম।

শুরুতে এক পরিবারের কথা বলি, দেশের সবচেয়ে সম্ভ্রান্ত, বনেদি, সেক্যুলার পরিবারগুলোর একটি চৌধুরী পরিবার। চিন্তাজগতের কর্ণধার পরিবারের তিন পুরুষ পেছনে গেলে দেখা যায় ব্রিটিশ আমলে কীর্তির জন্যে জুটেছে খান বাহাদুর উপাধি। হ্যাঁ, কবির চৌধুরী, মুনীর চৌধুরী, ফেরদৌসী মজুমদার এরকম আট ভাইবোনের রত্নসম্ভারের বড় জন কাইয়ুম চৌধুরী। মুক্তিযুদ্ধের সময় ছিলেন পাক-আর্মির কর্নেল। অত উচ্চ পোস্টে কিন্তু কম বাঙালিই ছিলেন। লক্ষণীয়, স্বাধীনতার ঘোষক বলে যাকে বলা হয় তিনি ছিলেন সামান্য একজন মেজর। অত উঁচুতে উঠে কাইয়ুম চৌধুরী দেশকে ভুলে বাংলাদেশকে অস্বীকার করেছেন এমনকি যুদ্ধের পরেও আর ফিরে আসেন নি। পাকিস্তানেই ওনার মৃত্যু ও কবর। কিন্তু তা সত্ত্বেও উনি কবির ও মুনির চৌধুরীর ভাই এ সত্য মিথ্যে হয়ে যায় না। যেমন মিথ্যে হয়ে যায় না এই পরিবারের মেয়ের যুদ্ধকালীন সংগ্রাম। তাকে ভারতে পালিয়ে গিয়ে সিঁথিতে সিঁদুর নিয়ে লুকিয়ে থাকতে বলা হয়েছিল। হিন্দু গেরস্তঘরে অন্যরা মুসলমান বলে যেন সন্দেহ না করতে পারে। না খেয়ে এক কাপড়ে সীমান্তের পথে হেঁটে চলার যে দুঃসহ অভিজ্ঞতা তা থেকে রেহাই পায় নি এই পরিবারেরও কেউ কেউ। যুদ্ধ এসেছিল সর্বজনীন মৃত্যু-উৎসবে।


পাকিস্তান সরকারের পক্ষে যে ৫৫ জন বুদ্ধিজীবী ও শিল্পী ১৯৭১-এর ১৭ মে মুক্তিযুদ্ধকে ‘চরমপন্থীদের কাজ’ বলে নিন্দাসূচক বিবৃতি দিয়েছিলেন তাতে কবির চৌধুরীর মতো সেকালের ডাকসাইটে বুদ্ধিজীবী স্বাক্ষর করেন নি।


কবির চৌধুরী ১৯৭১ সালে বাংলা একাডেমির চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেছেন। নয়টি মাস ঢাকায় সরকারের হয়ে চাকরি; একে ভীরুতা, কাপুরুষতা বলে অভিহিত করলে বিষয়টা খণ্ডিত করে দেখা হবে। হয়তো যুদ্ধে যেতে পারেন নি কিংবা যেতে চান নি পরিবারের কথা ভেবে কিংবা পরিস্থিতির চাপে। পাকিস্তান সরকারের পক্ষে যে ৫৫ জন বুদ্ধিজীবী ও শিল্পী ১৯৭১-এর ১৭ মে মুক্তিযুদ্ধকে ‘চরমপন্থীদের কাজ’ বলে নিন্দাসূচক বিবৃতি দিয়েছিলেন তাতে কবির চৌধুরীর মতো সেকালের ডাকসাইটে বুদ্ধিজীবী স্বাক্ষর করেন নি। জীবনের ঝুঁকি নিয়েছিলেন যে, তা সহজেই অনুমেয়। বাম-মতাদর্শে দীক্ষিত, ছাত্ররাজনীতির সাথে যুক্ত, কবরের মতো মহান নাটকের স্রষ্টা অধ্যাপক মুনীর চৌধুরী ভীষণ বিতর্কিত সেই বুদ্ধিজীবীদের তালিকায় সই দিয়েছিলেন। হয়তো অনেকের মতোই প্রাণভয়ে, অস্ত্রের মুখে; কিন্তু কেউ কেউ তো স্বতঃস্ফূর্ত ছিলেন। দার্শনিক সরদার ফজলুল করিম ‘আমি সরদার বলছি’ বইতে লিখেছিলেন, মুনীর চৌধুরী সম্ভবত ধারণা করতে পারেন নি, বাম-আদর্শ ও -রাজনীতি থেকে বহু দূরে চলে যাওয়া সিতারা-ই-ইমতিয়াজ খেতাবপ্রাপ্ত একজন লেখক ও নাট্যকারকে ধরে নিয়ে পাক-আর্মি মেরে ফেলতে পারে। শুধু তিনিই নন, চৌদ্দই ডিসেম্বরে শহিদ হওয়ার আগ পর্যন্ত শিক্ষার প্রতি নিবেদিতপ্রাণ বহু শিক্ষক, বুদ্ধিজীবী, সৃজনশীল লোকেরা কেউই ধারণা করতে পারেন নি কী হতে যাচ্ছে তাদের ভাগ্যে। দেশ স্বাধীনের দিনকয়েক আগে এই খুনগুলো বাঙালি জাতির মেরুদণ্ডে ছুরি বসিয়ে দিয়ে গেছে।

প্রশ্ন উঠতে পারে, সাম্প্রতিককালে নাসির উদ্দীন ইউসুফ বাচ্চুর নিউইয়র্কে দেয়া বক্তব্য ‘খান আতাও রাজাকার ছিলেন’ এর প্রেক্ষিতে কেন এত কথা টানা? কথাগুলো এজন্যে বলা যে, মুক্তিযুদ্ধের সময় সাধারণ জীবনযাপন, যুদ্ধের ডামাডোল থেকে দূরে থাকাও অনেকের জন্য ছিল যুদ্ধের নামান্তর। জীবনের অনিশ্চয়তায় যেমন মুক্তিযুদ্ধের বছরে বর্ষাকালে বিয়ের সংখ্যা বেড়েছিল হু হু করে। ধ্বংস ও মৃত্যুর মাঝেই মানুষ জীবন খোঁজে, যুদ্ধকে অস্বীকার করে নতুন জীবনের জন্ম দিয়ে। যেমন যুদ্ধের নয় মাসে গর্ভ ধারণ করে, দহদকালে অবিশ্বাস্য রকম কষ্ট সহ্য করে শেখের বেটি জন্ম দিয়েছেন সন্তান জয়কে; তেমনি আরও অনেক নারী হারিয়েছে তাদের সম্মান, জীবন ও মৃত্যুর মাঝে সুতোয় ঝুলে জন্ম দিয়েছে যুদ্ধশিশুর। যাদের পিতা ওই নরপশুরা, কুলাঙ্গারের দল; কিন্তু তাতে কি ওই শিশুরা আর মায়েরা পাপী হয়? মুক্তিযুদ্ধ কতটা বহুমাত্রিক, লিখতে গেলে সহস্র মহাকাব্য লিখতে হবে। কিন্তু তা বলে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের অবদান অস্বীকার, গালি দিয়ে অপমান এসব সহ্য করা যায় না। নাসির উদ্দীন ইউসুফ যদি জীবনে ভুল কিছু করে থাকেন, বলব, অকৃতজ্ঞের দেশে যুদ্ধ করেই ভুল করেছেন। সত্য কখনো চাপা থাকে না। যে লোকের বাবা মুক্তিযুদ্ধে পাকবাহিনীর হাতে মারা পড়েছে, তার নানা কিংবা দাদা শান্তিকমিটির চেয়ারম্যান ছিলেন, এমন হয়েছে আকসার। যে লোককে শহিদের সন্তান বলে জানি, তার উত্তরাধিকারের বাকি অংশ মিথ্যে হয়ে যায় না। প্রখ্যাত লেখক হুমায়ূন আহমেদ, জাফর ইকবাল, আহসান হাবীবের বাবা পুলিশের উপ-বিভাগীয় কর্মকর্তা ফয়জুর রহমান যেমন পাকবাহিনীর হাতে নিহত, তেমনি হুমায়ূন আহমেদের লেখায় বর্ণিত পা থেকে মাথার চুল পর্যন্ত ভদ্রলোক ‘নানাজান’ মারা গেছেন মুক্তিযোদ্ধাদের হাতে, স্বাধীনতাযুদ্ধের পরে। হুমায়ূন নানাকে লেখায় মহৎ করার চেষ্টা করেছেন, কিন্তু তাতে প্রমাণ হয় না তিনি রাজাকার ছিলেন না। এমনকি হুমায়ূন নিজেও অস্বীকার করতে পারেন নি।


কিন্তু ঊনসত্তর, সত্তর, একাত্তর এই উত্তাল সময়ে চুটিয়ে গান করেছেন একের পর এক উর্দু সিনেমায়।


প্রভাবশালী সঙ্গীতশিল্পীদের মধ্যে দুজনের নাম তোলা যায়। একজন রুনা লায়লা, কিশোরী বয়স থেকে যিনি বিশ্বজুড়ে আলোড়ন তুলেছেন। পাকিস্তানে পিতার কর্মসূত্রে বেড়ে ওঠা ও অন্যান্য। তার ‘বাচপানের’ সাথিদের অনেকের বাবা হয়তো মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যায় যুক্ত ছিল কিংবা নিদেনপক্ষে সন্ত্রাসী বলে জানত—এর জন্যে তিনি দায়ী নন কোনোভাবেই। কিন্তু ঊনসত্তর, সত্তর, একাত্তর এই উত্তাল সময়ে চুটিয়ে গান করেছেন একের পর এক উর্দু সিনেমায়। উর্দুই তার কণ্ঠে সবচেয়ে ভালো আসে, ওই সময়ে গাওয়া গানগুলোই সঙ্গীত-জীবনের সেরা অর্জন। বছর কয় আগে ‘সুরক্ষেত্র’ নামে এক অনুষ্ঠানে বিচারক হিসেবে ভারতীয় এক প্রতিযোগীর ভুলও ধরেছেন চোস্ত উর্দু উচ্চারণে। মাত্র বিশেরও কম বয়সী উঠতি সঙ্গীত-তারকার কাছে দেশ, সমাজ, জাতিবোধ দাবি না করা গেলেও এটুকু দাবি অন্তত যৌক্তিক যে, যুদ্ধের সময় মিডিয়ায় নিদেনপক্ষে একটা বিবৃতি দিতে পারতেন, কিছু বলতে পারতেন এই পরিস্থিতি নিয়ে। এমনকি দেশে যে ফিরেছেন, তাও পিতার ফিরে আসার ইচ্ছেয় সম্মান জানিয়ে। নিজের স্বর্ণসময়ের সাম্রাজ্য ফেলে চলে এসেছেন তিনি, এদেশে এসে যা পুনরুদ্ধারে সক্ষম হন নি।

আরেকজন সঙ্গীত-তারকা শাহ্‌নাজ রহমতুল্লাহ। তার ভাই সুরকার আনোয়ার পারভেজ, নায়ক জাফর ইকবাল মুক্তিযুদ্ধের সময়ে জীবনবাজি রেখে যুদ্ধ করেছেন। ওদিকে তখনকার শাহ্‌নাজ বেগম, কণ্ঠে ঈশ্বর-কথা-বলা গজলসম্রাট মেহেদি হাসানের কাছে গজল শিখছেন, গুরু মেনে নিয়ে তার সাথে এক মঞ্চে গান গেয়েছেন। সাধারণ সময়ে হলে এ নিয়ে ভীষণ গর্ববোধ করা যেত, হয়তো বলা যেত, দ্যাখো আমাদের রুনা আছে, আমাদের শাহ্‌নাজ বেগম আছে, যারা সর্বপাকিস্তান পর্যায়ে দেশকে তুলে ধরছে। কিন্তু এই সময়টা ত্রিশ লাখ মানুষের রক্তে ভেসে যাওয়ার কাল, এই রক্তের স্রোত ভুলে পশ্চিমে গিয়ে বাঙালি-নিধন ভুলে সঙ্গীতচর্চা ও আসর মাতানো আসলে মেনে নেয়া কঠিন। এই নৈশব্দের তীব্রতা এত বেশি যে আমরা মেনে নিলেও অনেক ক্ষেত্রে ভুলে গেলেও শহিদ পরিবারের একজন, বীর মুক্তিযোদ্ধা নাসিরউদ্দিন ইউসুফ বাচ্চুর মেনে নেয়া কঠিন। শাহ্‌নাজ বেগম, রুনা লায়লা সেদিন কিছু বললে হয়তো জীবন বিপন্ন হতো, কিন্তু তাদের প্রতি বাঙালি জাতির শ্রদ্ধা অটুট থাকত চিরকাল।

খান আতা প্রথাগত অর্থে রাজাকার ছিলেন কিনা এ নিয়ে প্রশ্ন আছে। তাকে অস্ত্রহাতে মুক্তিযোদ্ধা মারতে দেখা যায় নাই, বলতে শোনা যায় নি—মুক্তিবাহিনীর লোকেরা মালাউন, ভারতের দালাল, এদের ধ্বংস কাম্য। প্রথাগত অর্থে রাজাকার বলা কঠিন হলেও তাকে পাকিস্তানপন্থি, পাকিস্তানের অখণ্ডতায় বিশ্বাস করা হিশেবে চিহ্নিত করতে সমস্যা হয় না। গান দিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করতে পারতেন নিজের করে, যুদ্ধের সপক্ষে জাগাতে পারতেন সুরের ইন্দ্রজাল; তিনি পাক-আর্মির পক্ষে গানে গানে প্রচার চালিয়েছেন রেডিও, টিভিতে। মুক্তিযোদ্ধারা তাকে মেরে ফেলতে চেয়েছিল একথা জানিয়েছেন বাচ্চু সাহেবসহ আরও মুক্তিযোদ্ধা নায়ক ফারুক ও সোহেল রানা। এমনকি একই তথ্য জানিয়েছেন প্রথিতযশা অভিনেতা হাসান ইমাম। এই তথ্য যেহেতু মিথ্যে নয়, তাই প্রশ্ন জাগে কেন মুক্তিযোদ্ধারা ভুল বুঝেছিল, তারা কি অবুঝ দুধের শিশু ছিল? তারা কি জানত না খান আতা জীবন থেকে নেয়ার খান আতা, সিরাজউদ্দৌলার খান আতা, খাঁচা ভাঙতে চাওয়া খান আতা? এখন প্রশ্ন এই, যিনি পাকিস্তানপন্থি অর্থাৎ Pro Pakistani, যার কাজ মুক্তিযুদ্ধ, আমাদের স্বাধীনতা ও রক্তখরচের অন্তহীন দহনকে ছোট করে দেখে, তাকে রাজাকার বলা যায় কিনা। আমার মনে হয়, যায়। রাজাকার শব্দটা বাংলায় বোঝায় পাকিস্তানের দোসর, তা সে যেই হোক। তবে এও সত্য এমন হালকা শব্দ রাজাকার নয়। পাকবাহিনীর হত্যা, লুণ্ঠন, খুনধর্ষণের দোসর রাজাকারদের অপরাধের বিস্তর তালিকার সাথে খান আতার অপরাধ মেলে না। তিনি যা করেছেন তা বুদ্ধিবৃত্তিক অপরাধ, যেমন এজরা পাউন্ডের ফ্যাসিস্ট মুসোলিনিকে সমর্থন। যদি গবেষণায় উঠে আসে দেশে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ লোক পাকিস্তানপন্থি ছিল যুদ্ধের সময়, তাতেও অবাক হবার কিছু নেই। বিন্দুমাত্র সন্দেহ নেই বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষ যুদ্ধে গেছে কিংবা ঘর ছেলে পালিয়ে সীমান্ত অতিক্রম করেছে বর্বর পাকিদের আক্রমণ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে, দেশ স্বাধীন করার চিন্তা বহু মানুষ কল্পনায় আনতে পারে নি। কিন্তু দিনশেষে যারা যুদ্ধে গেছে তারা মুক্তিযোদ্ধা, একজন চোর, ডাকাত, খুনিও যদি যুদ্ধে গিয়ে থাকে দেশের ডাকে সে আপনার আমার এই কলম, চাবি চাপার চেয়ে অনেক অনেক উপরের স্তরের মানুষ। সমালোচনার নামে তাঁকে যাচ্ছেতাই বলার অধিকার আমাদের নেই।


একাত্তরে তথ্যের প্রবাহ অবাধ থাকলে বিস্ময় নিয়ে দেখতাম দেশে সিংহভাগ লোক ছিল পাকিস্তানপন্থি, তারা স্বাধীনতা চায় নি কোনোদিন, চেয়েছিল শেখ মুজিবের হাতে ক্ষমতা যাক।


একাত্তরে তথ্যের প্রবাহ অবাধ থাকলে বিস্ময় নিয়ে দেখতাম দেশে সিংহভাগ লোক ছিল পাকিস্তানপন্থি, তারা স্বাধীনতা চায় নি কোনোদিন, চেয়েছিল শেখ মুজিবের হাতে ক্ষমতা যাক। এমনকি পূর্ণ যুদ্ধ শুরু হয়ে যাবার পরেও এ ভাবনা থেকে সরে আসে নি অনেকে। যাপনের প্রয়োজনে হিন্দুরা কালেমা শিখেছে, টুপি পড়েছে, পাঞ্জাবি নেতাদের ছবি ঘরে ঝুলিয়েছে, এমনকি খুঁজলে হয়তো দেখা যাবে কেউ কেউ খতনাও করে নিয়েছে। শত শত পরিবার বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে চিরকালের মতো। আমার নানাভাই পাঁচ-পাঁচজন বাড়ন্ত মেয়ে আর নয় বছরের ছেলে নিয়ে উৎকণ্ঠার দিন কাটিয়েছেন। সেটা মায়ের মুখে শুনে শিউরে উঠেছি। শহিদ ফয়জুর রহমান ও অন্যান্য অনেক মুজিব বা বাংলাদেশপন্থিকে হত্যা করেছে, তা থেকে মাত্র শ-তিনেক গজ দূরে ছিল আমার নানাবাড়ি। মেয়েগুলোর নিরাপত্তার জন্য পাক-আর্মির ক্যাপ্টেনের কাছে গেছেন, সরকারি চাকরিজীবী হিশেবে পাকিস্তান সরকারের কাছে নিরাপত্তা চেয়েছেন। যদিও নির্বিবাদী লোকটি শেষ পর্যন্ত মেয়েদের দূরের গ্রামে পাঠাতে বাধ্য হয়েছেন, শান্তি কমিটিতে নাম না থাকায় অত্যাচার সহ্য করেছেন—এটা কি যুদ্ধ নয়? আওয়ামী লীগ নেতা ও পরবর্তীকালে মুক্তিযোদ্ধা এক লোক বাড়িতে প্রায় মাস দুই লুকিয়ে রেখে তিনি কি যুদ্ধ করেন নি? এই হলো মুক্তিযুদ্ধ। জীবনে প্রথমবারের মতো নানাভাই সত্তরের নির্বাচনে শেখ সাবকে ভোট দিয়েছিলেন। এমন কত শত সহস্র লোকের বেলায় হয়েছে ভাবাও কঠিন। যা-খুশি-তাই বলার দিনে আজ এক মহান মুক্তিযোদ্ধাকে গালি দেয়া খুব সহজ। যারা কোনো আপোস না করে জীবনকে নিয়ে জুয়া খেলেছে তাদের ফেলে দেয়া যায় আঁস্তাকুড়ে।

জীবনে অনেক কিছু শেখায় যুদ্ধ, অনেক কিছু বদলে যায়, ফেলে যায়, লিখে রেখে যায় নতুন করে। আমার আরেক নানা যুদ্ধের সময় পাক-আর্মির রাইফেলের বাটের বারি খেয়ে সাতদিন জ্বরে ভুগেছেন, পরে প্রত্যন্ত গ্রামে পালিয়ে গেছেন। যদি সাহস থাকত, যদি রুখে দাঁড়াবার ক্ষমতা থাকত তবে তিনি হয়তো যুদ্ধে যেতেন, বলতে পারতাম মুক্তিযোদ্ধা নানার গল্প। কিন্তু সে সৌভাগ্য আমাদের নেই। মুক্তিযোদ্ধা কেউ পরিবারে আছে, এ দাবি করতে পারি না। এই আপোস ভীরু বাঙালি করে গেছে সারাজীবন, যুদ্ধের সময়েও; রুখে দাঁড়াবার ক্ষমতা সবার থাকে না; যাদের থাকে তারা নমস্য। এই আপোসকামী শান্তিবাদী জনতা পাক-সরকারের গুণগান করেছে, বেতন নিয়েছে, স্বাভাবিক জীবন চালিয়ে গেছে, এমনকি মুক্তিযোদ্ধাদের গণ্ডগোলকারী বলে গালও দিয়েছে। সমস্ত ঘটেছে সময়ের প্রয়োজনে, বেঁচে থাকার তাগিদে। এ আপোস লজ্জার নয়, ইতিহাসের। একটু ছিমছাম বেঁচে থাকা মা-শিশুর বন্ধনকেও আলাদা করে দেয়, যার প্রমাণ দেখেছি যুদ্ধদিনে। কিন্তু যারা প্রাণ তুচ্ছ করে যুদ্ধে নেমেছে, তারা কি আত্মত্যাগ করেছে সেটা বোঝার যোগ্যতা তাদেরই ছিল ও আছে, শুধু যারা গেছেন। মুক্তিযোদ্ধাদের অবদান কতটা সেটা বুঝতে পারলে তাদের উদ্দেশ্যে আমাদের সারাজীবন নতমস্তকে কুর্নিশ করলেও ঋণ শোধ হবে না।

অনেকেই খান আতার প্রতি সহমর্মিতা দেখাচ্ছেন। সৃজনশীল মানুষ হিসেবে বাচ্চুও যে সহানুভূতি পোষণ করেন সেটাই প্রকাশ করেছেন ওই ভিডিওতে; মুক্তিযোদ্ধাদের ফেলে দেয়া ড্রেন থেকে খান আতাকে উদ্ধার করার জন্য গর্ব বোধ করেন বলার মাধ্যমে। খান আতা অমর, তার কীর্তি ধন্বন্তরি, কিন্তু অপরাধও যে সত্য। তার অপরাধ শুধু পাকিস্তানের সময়েই নয় এমনকি বঙ্গবন্ধু হত্যার পরেও প্রশ্নবোধক কাজ করেছেন বহু, ঠিক যেমন আওয়ামী লীগের শতশত নেতাকর্মী করেছেন। পাপকে পাপ বলে গণ্য না করার সংস্কৃতি আজ আমাদের ধ্বংস ডেকে আনছে। যত মহৎ ব্যক্তিই হোন, কারো পাপ অস্বীকার করে মুছে ফেলা যায় না। আর যারা বাচ্চু সাহেবকে গালিগালাজ করে চলেছেন, পিণ্ডি চটকাচ্ছেন সেই লোকেরা পুরো ঘটনা দেখলে বুঝবেন যাদের ঠিক ভাবা হচ্ছে, তারা পুরো সত্য প্রকাশ করছেন না। যাকে আপনার বাক্যের বিষে আহত করছেন সেই সত্য। হয়তো বাচ্চু সাহেবের হুটহাট মন্তব্য পুরো পরিস্থিতির বিস্তারিত বিবরণ দেয় না, কিন্তু এটা ঠিক যে, তার কথা ও তিনি সত্য; সকালের রোদের মতো।

রেজওয়ান তানিম

রেজওয়ান তানিম

জন্ম ১৫ ফেব্রুয়ারি, ১৯৮৭, বরিশাল। বুয়েট থেকে পাশ করে উচ্চশিক্ষার জন্য দেশ ছেড়েছেন। বর্তমানে জার্মানির টি ইউ ফ্রাইবার্গ-এ অধ্যয়নরত।

প্রকাশিত বই :
কবিতা—
শাদা পরচুল অন্ধকার [অনুপ্রাণন, ২০১৪]
মৌনমুখর বেলায় [জাতীয় গ্রন্থ প্রকাশন, ২০১২]

গল্প—
অবন্তি [ভাষাচিত্র, ২০১২]

সম্পাদিত গ্রন্থ—
শাহবাগের সাথে সংহতি [ই-বুক, ২০১৩]
আন্তর্জাতিক কবিতা সংকলন ‘In Praise-In Memory-In Ink’‘In Our Own Words’ ‘Heavens above, poetry below’, [Blurb Publication, Canada, ২০১৩, ২০১৪]

সম্পাদিত পত্রিকা—
লিপি (২য় ও ৩য় সংখ্যা), ত্রৈমাসিক সাহিত্যপত্রিকা 'অনুপ্রাণন'

ই-মেইল : rezwan.tanim@gmail.com
রেজওয়ান তানিম