হোম গদ্য যেখানে ঝরাপাতা নিজের শব্দে বন

যেখানে ঝরাপাতা নিজের শব্দে বন

যেখানে ঝরাপাতা নিজের শব্দে বন
599
0

একেকটা চাঁদ ক্ষয়ে যায়—হাওয়ায় ভেসে ভেসে পৃথিবীর কক্ষপথ পাড়ি দিয়ে সে কখনো কৃষ্ণপক্ষের রাত্রিতে কালোমেয়েটির কপালে বসে থাকে কখনো শুক্লপক্ষের তটভূমি ভরে ওঠে চিত্রার্পিত ফুলে তখন শরতের আকাশে ভূতের দাঁড়ি উড়ে যায়, শান্ত নদীর পাশে দাঁড়িয়ে শাদা শাদা উড়ন্ত বক দেখে শিশুরা দুই হাতের নখ ঘষে আর চোখ বন্ধ করে মনে মনে দোয়া করে, যেন তাদের নখেও ফুটে থাকে বকফুল—তখন চাউলের মতো শাদা শাদা ছোট দাগে ভরে ওঠে আঙুলের নখ। এভাবেই একেকটি ঋতু-দিন-মাস ভাসতে ভাসতে গড়ের ওপারে হারিয়ে যায় শুধু পুরনো বটের গাছে লাল ফলগুলো আরো একটু স্বাধীনতা নিয়ে ঝরে পড়ে, পচে যায়—সুবিলের পাড়ে বসে কোনো পাখির ঠোঁটের দিকে তাকিয়ে নতুন বউটি দূরের গ্রামে তার ফেলে আসা অভিমান মনে করে ব্যথা পায়, সে পথ মনে হয় মুদ্রাদোষের মতো কাছে তবু যেকোনো মুহূর্তের মতো দূরে—সে গ্রামের নাম হয়তো পদ্মপাড়া অথবা শালিখা অথবা মোকামতলার পাশেই তার সাকিন—সবই পুরনো হয় কেবল মাইনে পাওয়ার মতো ফিরে আসে চাঁদ।

ধরমপুরেও ওঠে সে—তবে শিশুরা তাকে দেখবার লোভে জড়ো হয় না পাতারে, বানু ফুপুদের অর্জুন গাছের ফাঁকে সে-ও ঝুলে থাকে হয়তো, কিন্তু ভ্রুক্ষেপ থাকে না এ গাঁয়ের কিশোরদেরও। এখানে বাংলা মাসের নাম দাদি-নানি আর মা-চাচিরাই মনে রাখে, আর রাখে যারা মাঠের কাজ করে, ফসল ফলায়, তারা। আরবি মাসের অবস্থা আরও করুণ—মসজিদের হুজুরদেরই মনে থাকে শুধু। আমাদের চাঁদ ছিল কেবলই ঈদের।


আমাকে আজীবন ডুবিয়ে রেখেছে বহুদিন আগে শোনা নিবিড় সাইরেন—যা ছিল আমার রবের দিকে প্রশান্তির ডাক।


কিভাবে যেন মায়েরা আগে থেকেই বুঝে যেত—রমজান আসছে। শবে বরাতের আগেই আঙিনার এক কোণে রাখা বেলে মাটির কয়েকটা ঢিবি কাজে লাগে তখন, বালতিতে কাদা করে নিকানো হয় সারা বাড়ি, সেই ন্যাপা বারান্দায় বিনয়ের মতো পা টিপে টিপে ঘরে যাই, ‘১’-এর মতো পায়ের তলার দাগ ভেসে ওঠে, কেউ পিছলে পড়ে, আমূল বকতে থাকে মা। ফালি করে কাটা বল সাবান আর জেট মিশিয়ে পানি জ্বাল দিয়ে সিলভারের বড় গামলায় মা ভিজিয়ে রাখে সমস্ত কাপড়-চোপড়, অর্ধছেঁড়া পুরনো যে কাপড় বহুদিন ট্রাংকের নিচে পড়ে ছিল অন্ধকারের ঘ্রাণসহ সেসব গায়ে ওঠে সেদিনের জন্য। ধরমপুরের অধিকাংশ বাড়ির আঙিনায়, পাশের মাঠে, গড়ে উজাড় হয়ে শুকাতে থাকে কাপড়—যেন বিরাট এক ধোপাপল্লীতে পরিণত হয় ধরমপুর। শবে বরাতের দিন পুরুষদের চেয়েও যেন মায়েদেরই কর্মব্যস্ততা তুমুল। ঢেঁকিতে পাড় দিয়ে চাল কোটা, রুটি বানানো, হালুয়া-বরফি তৈরি করা, প্রতিবেশীদের বাড়ি বাড়ি সেসব পৌঁছানো—তুমুল কর্মযজ্ঞে মেতে থাকে আমাদের মায়েরা।

আমাদের বাড়িতে হালুয়া রুটি হতো না সাধারণত, অন্য বাড়ি থেকেই আসত। মন খারাপ হতো খুব—মীর আলমদের বাড়িতে, সোহাগদের বাড়িতে, টুটুলদের বাড়িতে সব জায়গাতেই রান্না হয়, শুধু আমাদের বাড়িতেই নিষেধ। আব্বুই নিষেধ করত। আমার দাদুরা মোহাম্মাদী জামাতের বলে শবে বরাত পালন করত না। নানান বিদআতের কথা শুনতাম সেদিন। আমার নানার পরিবার ছিল হানাফি জামাতের, মা তো ছোটবেলা থেকেই দেখে আসছে সারা মণ্ডলপাড়ায় সেদিন উৎসবের আমেজ থাকে। ওদিকে মুন্সিপাড়ার শেষ বাড়ি থেকে উত্তরে রাজ্জাকদের বাড়ি পর্যন্ত শবে বরাতের আয়োজন। পাঞ্জাবি-লুঙ্গি পরে সন্ধ্যার পরপরই মসজিদে যায় বড়রা, ছোটরাও যায়। এ বাড়ি ও বাড়ি হালুয়া-রুটি নিয়ে হাজির হয় মেয়েরা। ছেলেরা পটকা ফুটিয়ে বাঁধিয়ে দিত তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ। একদল তো তক্কে তক্কে থাকে কখন রাত গভীর হবে আর ডাব চুরির সম্ভাবনায় জ্বলে উঠবে তারা আপন শক্তিতে।

শবে বরাতে সবচেয়ে উজ্জ্বল হয়ে থাকত মসজিদ আর দূর থেকে দেখতাম গড়ের উপর কবরস্থানে আলো জ্বলছে, সে আলো ঝুরঝুর করে ছড়িয়ে পড়ছে ঘাসে, এতদূর আসতে যেন হাঁপিয়ে যাচ্ছে পথেই। রাত একটু বেশি হলে পশ্চিমের জানালা খুলে বসে থাকি, মসজিদ থেকে জিলাপি নিয়ে আসবে মীর আলম—মিলাদের কোনো তবারকই আমাকে ছাড়া খায় না ও। এভাবেই শাবানের চাঁদ ক্ষয়ে যায়, নতুন চাঁদের অপেক্ষায় রাত্রির মগডাল জেগে থাকে আরো কিছুদিন। অন্ধকারের উপর পড়ে থাকে নিয়রের স্বেদ। তারপর চাঁদ ওঠে—যেন সহস্র উটের এক সদাগর ময়নাবনের পাশে দাঁড়িয়ে আলোর তলোয়ার শানায় পুরো রাত।

এখানে রোজা কেবল ধর্মের অনুষঙ্গ হয়ে থাকে না, কেবল সকাল থেকে সন্ধ্যা অব্দি উপোসেরও কারণ হয় না রোজা—এখানে রোজাকে দরদ করে মানুষ। হয়তো সেহেরিতে কিছুই খেতে পারে নি, কেউ হয়তো কেবল দুই মুঠ মুড়ি মুখে দিয়ে পানি খেয়েছে, সারাদিন সংসারের খাটুনি, মাঠের কত কাজ, দরদর করে ঘাম পড়তে থাকবে দুপুরের রোদে, শরীরে অসুখ আসবে তবুও রোজা ভাঙবে না কেউ—এ এক আশ্চর্য দরদ।

রোজার প্রথম দিন থেকেই আনন্দ শুরু হতো, কে কয়টা রোজা রাখবে তাই নিয়েই হইহল্লা করতাম আমরা। প্রতি বছর রোজার সংখ্যা বাড়াতে উদ্‌গ্রীব হয়ে উঠতাম, মাকে বারবার সাধতাম যেন শেষ রাতে ডেকে দেয়—প্রায় রাতেই ডাকত না মা, খাওয়া শেষে হাড়িপাতিলের শব্দে ঘুম ভাঙত আর মন খারাপ করতাম। ভাবতাম, কেন যে শত্রুর মতো আচরণ করে মা! রোজা রাখলে কী এমন ক্ষতি হবে তার! মনে আছে প্রথম যেদিন রোজা রাখব আব্বু বড় মাছ কিনেছিল, মা কুমড়া ফুল আর মসুরের ডাল মিশিয়ে বড়া করেছিল আমার জন্য। অদ্ভুত উত্তেজনায় আমার সেই রাত তিরতির করে কাঁপছিল পিপুলপাতার অন্ধকারে। সারা মাস মিলিয়ে তিনটা রোজা করেছিলাম সেবার। বিকাল হলে বারান্দায় বসে বসে কুরআন শরিফ পড়তাম, যখন কুরআন ধরি নি তখন সিপারা পড়তাম—পাড়ায় বিশেষত নারীরা কুরআন খতম দেয় এই মাসে। রেডিয়োতে তেলাওয়াত শুনতে খুব ভালো লাগত, কী সুরেলা আর দ্রুত ছিল পাঠ! দাদু এলে ইফতার সামনে রেখে মুনাজাত করতে বলত আমাকে। ঢাকায় আজান হতো আগেই, আমি পানি মুখে দিতে চাইলে মা নিষেধ করত, বলত—‘ধরমপুরের মজজিদে যখন সাইরেন বাজবি তখন ইফতেরি খোলা লাগবি এর আগে করলে ওজা হবি নে’। আমি বলতাম—‘ঢাকায় আজান আগে হয় কিসোক?’ মা উত্তর দিত না।

রোজার মাসে সবচেয়ে কৌতূহল হতো সাইরেন নিয়ে—ধরমপুর মসজিদে হুমমমমম আওয়াজ করে বেজে উঠত সাইরেন। অনেক দিন ভেবেছি আসলে সাইরেন কী ধরনের যন্ত্র! আমি আর মীর আলম গবেষণা করতাম সাইরেন নিয়ে। আমি বলতাম—‘মাইকের পেছনে যে গোল জিনিশটা থাকে ওডে বনবন করে ঘুরলেই হুমমমমম সাউন্ড হয়, মনে হয় ওডেই সাইরেন’। ও আমার কথা কখনো বিশ্বাস করত কখনো করত না। কয়েক দিন বিকালে মসজিদে নামাজ পড়তে গিয়ে আমরা দুই জন সাইরেন খুঁজে খুঁজে হয়রান, মিম্বারের কাছে কয়েকটা যন্ত্র দেখে ভেবেছিলাম ওইটাই সাইরেন কিন্তু মীর আলম মসজিদের ছাদে লোহার বাক্সের মধ্যে বেলনাকার কী এক মেশিন দেখে বলে—‘তুই যেডেক সাইরেন ভাবিচ্চু সেডে না উ যে দ্যাক ছাদের উপ্রে সাইরেন’। আমি বিশ্বাস করি। সে সাইরেন মৎস্যকন্যার রূপে সুর তুলে স্বর্ণমেষের অভিযানে চলা আর্গোনটদের যেভাবে সম্মোহিত করেছিল ভরা জোছনায় সেভাবে আমাকেও ডাক দিত প্রচলিত বাতাসের গায়ে উড়ে উড়ে ধাতব সুরে, তফাত এই যে সেদিন জেসনকে বাঁচিয়ে ছিল অর্ফিউসের বীণা আর আমাকে আজীবন ডুবিয়ে রেখেছে বহুদিন আগে শোনা নিবিড় সাইরেন—যা ছিল আমার রবের দিকে প্রশান্তির ডাক।

আমাদের ইফতারি ছিল খুব সাধারণ—মা রুটি আর সেমাই রান্না করত বেশি, মাঝে মাঝে চিড়া আর গুড়, কখনো ছাতু, মা শেষ রাতের ভাত খেত। গ্রামের অনেকেই পান্তা দিয়ে ইফতার সেরে নিত। ধরমপুর বাজারে হয়তো ছোলা-পিঁয়াজু বিক্রি হতো কিন্তু সেসব অজানাই থেকে গেছে। যেদিন প্রতিবেশীদের বাড়িতে ইফতার পাঠানো হতো ভালো ভালো রান্না হতো। সারাদিন এর গাছের পেয়ারা ওর গাছের আমড়া, বড়ই এসব লুকিয়ে রেখে ইফতারের পরেই মাঠে গিয়ে ভাগ করে খেতাম। গভীর রাত্রিতে যখন সবাই ঘুমিয়ে মা একাই আঙিনার মাটির চুলায় বসে বসে রান্না করত—প্রস্রাব করার জন্য সাহস পেতাম তখন, কলপাড় থেকে ফিরে বারান্দায় হেঁটে যেতে যেতে দেখতাম চুলার আগুনের পাশে কী শান্ত রূপ হয়ে বসে আছে মা—বাইরে ঝিঁঝির শব্দ, দু একটা পাখি হঠাৎ চিকচিক করে ডেকে উঠছে, চাঁদের বিলীয়মান আলো ভেসে যাচ্ছে সুবিলের পানিতে, কাশের বনের মধ্যে শিয়ালেরা খামচে ধরছে অন্ধকার, মার গালের উপর আগুনের আলো এসে উপচে পড়ছে হু হু, যেন বেথেলহেমের পাশেই বসে আছে আমার মা জিসাসের জননী হয়ে, তার গ্রীবায় ডালিম ফুলের নৈঃশব্দ্য, আল্লার করুণা হয়ে তখন ঝরে পড়ছে রাত।

আব্বু সাধারণত বাড়িতেই তারাবির নামাজ পড়ত। আমাকে আর ভাইকে দুই পাশে দাঁড় করিয়ে নামাজ পড়াত আব্বু। আমি ইকামত দিতাম। তিরিশতম পাড়ার সুরাই বেশি পড়ত আব্বু, সুরা আর রাহমান আর সুরা আল ফজরের শেষ তিন আয়াত অনেক শুনেছি আব্বুর কণ্ঠে। ‘আর রহমান। আল্লামাল কুরআন। খলাকাল ইনসানা আল্লামাহুল বয়ান। ওয়াশশামসু ওয়াল কামারু বিহুসবান। ওয়াননাজমু ওয়াশশাজারু ইয়াসজুদান।… ফাবিআইয়্যি আলায়ি রব্বিকুমা তুকাজজিবান’। কখনো—‘ইয়া আয়্যুহাননাফসুল মুতমাইন্নাহ। ইরজিয়ি ইলা রাব্বিকিরাজিয়াতাম মারজিয়্যাহ। ফাদখুলিফি ইবাদি। ওয়াদখুলি জান্নাতি।’ কী আশ্চর্য কণ্ঠ আব্বুর, সারা বাড়ি ম ম করত তখন। মনে হতো, একেকটা শব্দ জোনাক পোকার মতো উড়ে উড়ে কোনো এক তেরনদীর দেশ আর ঘুমন্ত মাছের চোখ ছুঁয়ে উড্ডীন ইগলের ঠোঁটে পরিয়ে দিচ্ছে রহম। বিছানায় শুয়ে শুয়ে কতদিন সেসব আয়াত শুনেছি, মুখস্থও হয়ে গেছে সব।

রোজা এত বেশি আনন্দের ছিল সে হয়তো ঈদের জন্যও। শুধু তো ঈদেই নতুন কাপড় হতো আমার। সারা বছর আব্বুর পুরনো প্যান্ট কেটেই প্যান্ট বানানো হতো। নতুন বলতে শুধু স্যান্ডো গেঞ্জিটাই পেতাম অন্য সময়। তখন টিভিতে বেলি কেডস, জাম্প কেডসের বিজ্ঞাপন হতো। আমিও খুব চাইতাম আব্বু অন্তত ঈদে আমাকে ওই জুতা কিনে দিক। কয়েকবার পায়ের মাপও নিয়েছিল। কিন্তু কোনো ঈদেই সে জুতা পরা হয় নি আমার। সেদিনের ছোট-ছোট সুতাগুলো যেন আমার চারপাশে উড়তে থাকে লাল নীল কালো হয়ে। কতদিন খেলতে গিয়ে স্যান্ডেল হারিয়েছি—কোনো এক গাছের নিচে রেখে খেলতে খেলতে মনভুলে খালি পায়েই বাড়ি যেতাম, ওজু করার সময় সারা বাড়ি খুঁজেও যখন পাওয়া যেত না, মা মারত তখন। ওইসব স্পঞ্জের স্যান্ডেলকেই মহার্ঘ্য মনে হতো আর ভাবতাম এই বার ঈদে বাটার স্যান্ডেল কিনে নেব, বাটার শুধু নামটাই জানা হতো আর কিছুই হতো না। দরজির [আমরা বলতাম খলিফা বা খলপে] দোকানে গিয়ে যেদিন কাপড়ের মাপ দিয়ে আসতাম প্রজাপতির পাখার রঙ দেখতে পেতাম সেদিন। কাপড় বানানো হলে ওই কাপড় পরেই ঘুমিয়ে পড়তে চাইতাম, তরই সইতো না, দিন গুনতাম কবে ঈদ! সবচেয়ে অশ্লীল প্রশ্ন করতাম আমার বন্ধুদেরকে, কে কী কী নিয়েছে ঈদে সে কথা জিজ্ঞাসা করে। যারা কিছুই নেয় নি খুব মন খারাপ করত তারা। আমারও তো কত বার অমন হয়েছে!


তিরিশ রোজার চাঁদ আমার ভালো লাগত না, কেমন ড্যাম হয়ে যাওয়া বিস্কুটের মতো মনে হতো তাকে।


২৮ রোজার দিনেই শুরু হতো ঈদের আয়োজন। পরের দিন চাঁদ উঠবে। কে সবার আগে চাঁদ দেখবে তারপর অন্যদেরকে সে খবর দেবে সেটাই ছিল আনন্দের। ইফতারের আগেই ওকড়ামাঠের গড়ে দাঁড়িয়ে দূরের ছাতিম গাছের মাথায় আকুলি-বিকুলি করে চাঁদ খুঁজতাম। যেন একটা অলৌকিক বক্রতা সারা আকাশ জুড়ে, প্রচলিত অন্ধকার তাকে ফাঁকি দিয়ে লুকিয়ে রাখত কোথাও। শিশুরা যেমন মাটির ব্যাংকে চুলের কিলিপ ঢুকিয়ে খুচরে খুচরে কয়েন বের করে সেভাবেই বাঁশের পাতার ফাঁকে অথবা যেকোনো বৃক্ষের পাতার আড়ালে থাকা ঈদের চাঁদকেও এক সময় আবিষ্কার করে নিজেই—সে আনন্দ খেলার মাঠে হারিয়ে ফেলা পয়সা খুঁজে পাবার চেয়ে কিছুমাত্র কম নয়! আকাশের দিকে তর্জনী তাক করে যে যার চাঁদ দেখাতে থাকে, অন্যের চাঁদ তখন ভাসছে হয়তো আরেক কোথাও। ছোটরা কাঁধে উঠে কেবল হা করে তাকিয়ে থাকে আর মিথ্যা চাঁদের দিকে চেয়ে শুরু করে হাততালি। আমাকে সবার আগে চাঁদ দেখাত ভাই, যদি ঠিকভাবে না দেখতে পেতাম কোমড় ধরে উঁচুতে তুলত ভাই তারপর বলত—‘উ যে ছাতিম গাছের মাথাত, ইউক্যালিপ্টাসের বাম দিক দিয়ে তাকাও, উ যে উ যে দেকা যাচ্চে’। সে চাঁদ কোকিলের ডাকের মতো চিকন, নতুন ধানের মতো তার ঘ্রাণ। রেডিয়োতে ততক্ষণে উঠে গেছেন নজরুল—‘ও মন রমজানের ঐ রোজার শেষে এল খুশির ঈদ!’ যদি কখনো ২৯ রোজায় চাঁদ না উঠত মন খারাপ হতো আমার। তিরিশ রোজার চাঁদ আমার ভালো লাগত না, কেমন ড্যাম হয়ে যাওয়া বিস্কুটের মতো মনে হতো তাকে। যেন পরের দিনের ঈদে আর কোনো আনন্দই থাকবে না, সবাই জেনেই গেল সেদিন তো ঈদ হবেই!

ঈদ এলেই মীর আলমের মন খারাপ দেখতাম। ওর আব্বা রিকশা চালাত, অসুস্থই থাকত বেশি সময়। ঈদের দিন বের হতে চাইত না মীর আলম। আমি ওদের ঘরে গিয়ে জোর করে শ্যালোমেশিনের পাড়ে নিয়ে যেতাম মীর আলমকে। সেখানে গোসল করে কাপড় পরে ঈদগা চলে যেতাম আমরা। সুবিলের ঈদগার দেয়াল তখন নতুন চুনে উজ্জ্বল—দূর থেকে এক টুকরা বেহেস্ত মনে হতো, পাকুড়ের ঝিরঝির পাতার শব্দে ছায়া পড়তো একপাশে অন্য পাশে বাঁশবনের নিস্তব্ধতায় নেমে আসত ঘুঘুর শ্রান্তি। মাঠের বাইরে ভিড় জমত আইসক্রিমঅলা আর নানান বাঁশির ফেরিঅলাদের, পাপড়ের দোকানিও আসত দূরের গ্রাম থেকে। মা নতুন দশ টাকার নোট দিত আমাকে, মীর আলমকেও। সোহাগদের অর্জুন গাছ আর মেশিন ঘরের পাশ দিয়ে দূর্বাঘাসের আইল মাড়িয়ে সুবিল পার হতাম, সুবিল তখন শুকনা থাকত। নামাজের পরেই বাড়ি এসে দুই বন্ধু এক সাথে খেতে বসতাম। খিচুড়ি, আলু ভাজি, আর ঝিরঝির করে কাটা বেগুন ভাজত মা। সেমাই আমার ভালো লাগত না। তারপর ঝোপগাড়ির রাস্তা দিয়ে রক্তকুঁচের দিঘির দিকে চলে যেতাম। সেদিন মিরিন্ডা আর ফানটা কিনতাম, ছোট ছোট প্যাকেটের হজমি কিনতাম—লটারি খেলা হতো, মন চাইলেও খেলতাম না আমি, মা জানতে পারলে মারবে খুব, এই ভয়ে। ঈদের দিন পুরো গ্রামে ‘বুড়ি মা’ পটকা ফুটাত ছেলে রা। তখন ‘বুড়ি মা’ পটকা ছাড়া ঈদই হতো না আমাদের। যারা পটকা কিনতে পারত না অন্যদের সাথে থেকে পটকার আওয়াজ শুনেই ঈদ হয়ে যেত তাদের।

সারাদিন টইটই করে ঘুরতাম—মাঠব্যাপী বাতাসের গায়ে গায়ে সে দিন আকন্দ কষের মতো দুপুরের তরল রূপা গড়িয়ে পড়ে, বাজারের চিবুক ধরে দেখা যায় চালতাগাঙের পাড়, সেখানে পানির রঙ দুধকুমারীর মতো মায়াবী—হয়তো চম্পকনগরীর থেকে একদিন লখিন্দর এখানেই প্রথম তাকিয়ে ছিল বেহুলার চোখে, হয়তো, তারই করুণ ছায়ায় মঙ্গল-যুগের এক রাতে সহসা ভেসে উঠেছিল চালতাগাঙের পাড়। একটা রিক্ত শিমুল গাছ দাঁড়িয়ে আছে সাবান ফ্যাক্টিরি থেকে দূরে, ছাতিম গাছের নিচে পয়সা খেলছে শিশুরা।

খুব দ্রুতই শেষ হয়ে যেত দিন। ধীরে ধীরে মন খারাপ হতো আমার। আবার পড়তে বসতে হবে বলে। ভাবতাম, পাখিদের ঈদ হয়তো অনেক দিন থাকে। আমাদের কোঠাঘরের বাঁশের ফোঁকড়ে যে চড়ুই পাখি থাকত ঈদের পরদিনও তারা কেমন ইচিরমিচির করে পাখা ঝাপটাতো—ওদের ঈদ যেন সহজে শেষ হবার নয়। বিকালে এই ভেবে একটু সান্ত্বনা পেতাম যে এখনো সিনেমা শুরু হয় নি। বিটিভিতে ঈদের দিনে ‘বই’ আর ছায়াছন্দ হতো—আমাদের শেষতম আনন্দের মাঠ যেন সেদিনের বিটিভি।

এমন বিকালে একবার আলমগীর আর শাবানার কী একটা সিনেমা হলো—নাম মনে নেই—ফ্যাক্টিরিতে কাজ করার সময় আলমগীরের দুইটা হাতই কেটে যায়, সংসারে বেশ কয়েক জন ছেলে মেয়ে তাদের, প্রচণ্ড অভাবে তাদের দিন কাটে, একদিন জানা গেল শাবানার ক্যান্সার; তাদের দুঃখের দিন আরো ঘনীভূত। কয়েক জন ধনী লোক তাদের বাচ্চা দত্তক নিয়ে চলে যায়, সেসব বাচ্চারও বাবা-মার জন্য মন পোড়ে খুব। ওদের কষ্টে অনেক দর্শকের মধ্যে বসেও কাঁদতে থাকি আমি। কেউ দেখার আগেই চোখ মুছে ফেলি। বুকের মধ্যে ফিক উঠতে থাকে আমার। এক সময় শাবানা আলমগীর দুই জনই মরে যায়। এবার আর কান্না গোপন করতে পারি না। হু হু করে কেঁদে ফেলি আমি। মা বারবার বুঝাতে থাকে ওরা সত্যিকারে মরে নি—এটা কেবলই সিনেমা। বিশ্বাস হয় না আমার। বারবার ওদের কবর চোখে ভেসে ওঠে আর ফিক ওঠে কান্নায়। কিছুতেই থামাতে পারি না। রাতে যখন ছায়াছন্দ দেখতে বসলাম, দেখি দুই জনেই গান গেয়ে গেয়ে এক সঙ্গে নাচছে—মাকে চিৎকার করে ডাকতে থাকি—‘আলমগীর-শাবানা মরে নি মা, ই যে দ্যাকো ওরা গান গাচ্চে’। সবাই আমার বোকামির দিকে তাকিয়ে হাসতে থাকে। শরম পাই খুব। তবু মনে হলো—পাথর নেমে গেছে বুক থেকে, কী যে স্বস্তি পেয়েছিলাম সেদিন!

ঈদুল ফিতর অর্থাৎ রোজার ঈদ করা হতো ধরমপুরে আর কুরবানির ঈদ তালতলায়। দুই জায়গায় ছিল ভিন্নতর আনন্দ। তালতলায়, আমাদের গ্রামেই ছিল ঈদের মাঠ—কামার জানির বাঁকে পুরনো এক অশ্বত্থ গাছের নিচে ঈদের মাঠ, দও পার হলেই অন্য বাঁকে ছিল আরেকটি অশ্বত্থ গাছ, বহুদিন ঝড়-বৃষ্টি-শিলায়, অনন্ত বন্যার মধ্যেও দুই জন অশ্বত্থ ছিল কামারজানির এপার-ওপার। পুবে মুন্সিপাড়ার ঝোপঝাড় দক্ষিণে কয়ার বিল আর বিস্তীর্ণ ধানের মাঠ। সারা বছর পরিত্যক্তই থাকে এই ঈদগা, তখন অশ্বত্থের নিচে শুয়ে কেউ মহিষ চড়ায় আবার গরুর বাথানও নিয়ে আসে রাখালেরা। পাতার শনশন শব্দে ঘুম আসে তাদের। বিষ্ণুবৃক্ষের নতুন তামাটে পাতায় ঝিলমিল করে রোদ, বৃষ্টিতে ধুয়ে যায় শেকড়ের সিঁদুর। খুব সকাল থেকেই মাইকে ভেসে আসতে থাকে ‘আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার ওয়ালিল্লাহিল হামদ, আল্লাহু আকবার কাবিরা ওয়াল হামদুলিল্লাহি কাসিরা, সুবহানাল্লাহি বুকরাতাও ওয়া আসিলা’। তিনমাথা থেকে কামারজানি ব্রিজের বাঁয়ে অনেক খানি নিচে নামলেই ঈদের মাঠ। ব্রিজের দুই পাশে দুস্থ নারীরা শাড়ির উপর চাল বিছিয়ে রাখে, ঈদের নামাজ পড়তে যাওয়া মানুষেরা টাকা পয়সা রেখে দেয় সেসব শাড়ির উপর। রোদে আধুলিগুলি ঠা-ঠা করতে থাকে। এই মাঠে সাধারণত নামাজ পড়ি না আমরা। নানাদের মাঠ এটা—মণ্ডলপাড়া আর মুন্সিপাড়ার মানুষেরা এখানেই আদায় করে ঈদের নামাজ।

চুকাই নগরের মাদ্রাসা-মাঠ আমাদের ঈদগা। এখানে চুকাইনগরকে উচ্চারণ করা হয়ে চুকেনগর। আমার পূর্বপুরুষেরাও এই মাঠেই ঈদের নামাজ পড়ত। যমুনা নদীর তীরে বহুকাল আগের এই মাঠ। কাচারি, পাকুল্ল্যা, সরলিয়া, আমতলী, রাধাকান্তপুর, গজারিয়া, চুকাইনগর, মহেশপাড়া, শালিখা, কালাইহাটা, দাউদের পাড়া—প্রায় দশ-বারোটি গ্রামের মানুষের ঈদগা এই যমুনাতীরবর্তী মাঠ। নদী ভাঙতে ভাঙতে যেটুকু অবশিষ্ট আছে মাঠ তাতেও সাত-আটটি গাঁয়ের মানুষ নামাজ পড়তে পারে এক সঙ্গে। পাশেই ধু-ধু যমুনা—তার এপার-ওপার বিঁধে আছে বহুদূরের দিগন্তে।

চুকাইনগরের মাঠে যেতে অনেক খানি হাঁটতে হয়। তালতলার উত্তর দিকের রাস্তা ধরে কাচারি বাজার, সেখান থেকে পুবের দিকে কয়েকটা কালভার্ট পার হতে চোখে পড়বে মাইল মাইল শূন্যতা। হাজার একর জমি ডুবে আছে পানিতে, শুকনার দিনেও খাঁ খাঁ সেসব। অনেক দূরের গ্রাম থেকে কাচারি হাটে আসে মানুষেরা—সোম আর শুক্র হাট বসে এখানে। ঝুপড়ি গাব গাছের নিচে দরদাম হয় বড় বড় নৌকার। রাস্তায় প্রাচীন একটি মসজিদ জমিদারি আমলের স্মৃতি রক্ষা করছে শ্যাওলা আর পলেস্তরা খসিয়ে। ছোট ছোট বাচ্চারা ন্যাংটা হয়ে দৌড়াদৌড়ি করছে এদিক-ওদিক, হাঁসেরা কাদা পানিতে ঘোঁৎ ঘোঁৎ করছে, স্তূপাকার পাটকাঠি দাঁড়িয়ে আছে উদ্ধত হয়ে, এখানে পাঠকাঠিকে বলা হয় শিন্টে। এইসব অনেক দৃশ্য হাঁটার পর আমাদের ঈদগা।

গোসল করেই কল্লোল ভাইকে ডাকতে যেতাম আমি আর সাব্বির ভাই। কল্লোল ভাই আমাদের মধ্যে সবচেয়ে অলস। ওদের খুলিতে [উঠানে] দাঁড়ালেই বড় আম্মা [বড় চাচি] সেমাই খেতে ডাকবে, কাকলী আপা চিল্লাতে চিল্লাতে বলবে—’এ ছ্যাড়া খা খা, এত প্যাগনা করিস ক্যা, মনে হচ্চে মহা কুটুম্বু হয়া গেছু তাই আদর ব্যাড়ে [বেড়ে] গেছে।’ তারপর কলকল হাসিতে ভরিয়ে তুলবে উঠান। কাকলী আপার এই হাসিটুকুর জন্যই এই খুলিতে আসা যায় সহস্র বার। কল্লোল ভাইয়ের গোসল হলে আমি, দাদু, কল্লোল ভাই আর সাব্বির ভাই মাঠের দিকে হাঁটা শুরু করি। দাদুর হাতে থাকত লাঠি। মাঠে তখন গনগনে রোদ। নামাজ শেষ হলেই ছেলেরা যে যার মতো বিদায় হতে শুরু করে। ইমাম তখন বার বার হাশরের মাঠে সূর্যতাপের কথা বলে, কিন্তু কে শোনে কার কথা! আমাদের অবশ্য পালানোর কোনো উপায় থাকে না। দাদুর সঙ্গে মুনাজাত শেষ করে তবেই বাড়ি ফিরতে হয়।


এভাবেই দুনিয়ার গমখেতের উপর দিয়ে সময় চলে যায়, গমের ঘ্রাণে একেকটা কালও পেকে ওঠে, তখন সমস্ত চাঁদের নিচে শিলীভূত অন্ধকার এসে ডাক দেয় আরেক মহাসময়কে


ফিরলেই দেখব বারান্দায় হবু বড় আব্বা [বড় চাচা] বসে আছে। হবু বড় আব্বা আমাদের পুরনো বাড়িতে সেই ছোট বেলা থেকেই বছর হিসেবে কামলা থাকত। বাড়ির সমস্ত কৃষি আর গবাদিপশুর সেই ছিল কাপ্তান। আব্বুর নানান কর্মের সতীর্থ। বড় আব্বা এখন এই পরিবারেরই একজন, হয়তো সরকার বংশের রক্ত তার শরীরে নেই কিন্তু সে এ বাড়িরই সন্তান হয়ে গেছে। উনি থাকেন রাধাকান্তপুর। ঈদের দিন আমি কেবল হবু বড় আব্বার জন্যই অপেক্ষা করতাম সারা সকাল। মণ্ডলপাড়ার ঈদগা মাঠেই নামাজ পড়ত বড় আব্বা। কুরবানি হলে গরুর মুতরি [মূত্রথলি] আমার জন্য লুকিয়ে রেখে দিত, পরে সাব্বির ভাই সেই মুতরি দিয়ে দইয়ের ডোগায় লাগিয়ে দিত, শুকালে ঢোলের মতো আওয়াজ হতো। ঈদের দিন ওইটাই ছিল আমার শ্রেষ্ঠ খেলা। হিন্দু পাড়ার বাঁশবনে অনেক ছেলেকেই দেখতাম পয়সা দিয়ে খেলছে। তিনমাথায় রঞ্জু আর অতুল কাকার দোকান সেদিন শিশুদের তীর্থভূমি।

রক্তকুঁচের শরীর থেকেও একদিন কালো দাগ মুছে যায়, উত্তরের তারাগুলো কৃষ্ণবিবরের পথে পাক খেতে মহাভরের টানে চলে যায় ঘটনাদিগন্তের দিকে, গাছের ফোকর থেকে চুরি করা শালিকের ডিম কার্পাস তুলার মধ্যে পচে যায়, কুব্বাতুস সাখারার অদূরে শিশুরা ধুলায় লুটিয়ে সবুজ চড়ুই হয়ে উড়ে যায় স্বর্ণআভায়—মহান সলোমনের দ্রাক্ষায় সহস্র বছর ধরে সাঁতরাতে থাকে গোখরার ফণা, কেদরের তাঁবুর মতো কালো কন্যাটি নীল হয়ে ওঠে ছোবলে, গজলা হরিণের জমজ শাবকের মতো স্তনে পেঁচিয়ে থাকে সাপ, জলপাইবনে একে একে ঝরে পড়ে পত্রবিলাপ। এভাবেই দুনিয়ার গমখেতের উপর দিয়ে সময় চলে যায়, গমের ঘ্রাণে একেকটা কালও পেকে ওঠে, তখন সমস্ত চাঁদের নিচে শিলীভূত অন্ধকার এসে ডাক দেয় আরেক মহাসময়কে—সে যেন কেবল দুপুরের আতাবনে শ্রান্তির সুর হয়ে ডুবতে থাকে মাধুডাঙাতীরে, সেখানে দুয়েকটি নৌকা ঘাটে ভিড়ে আবার কোথায় যেন চলে যায় দিগ-দিগন্তের শিরিন সৌরভ হয়ে।

হাসান রোবায়েত

হাসান রোবায়েত

জন্ম ১৯ আগস্ট ১৯৮৯, বগুড়া। শিক্ষা : পুলিশ লাইন্স হাইস্কুল, বগুড়া। সরকারী আযিযুল হক কলেজ; বগুড়া। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

প্রকাশিত বই :
ঘুমন্ত মার্কারি ফুলে [কবিতা; চৈতন্য, ২০১৬]
মীনগন্ধের তারা [কবিতা; জেব্রাক্রসিং, ২০১৮]

ই-মেইল : hrobayet2676@gmail.com
হাসান রোবায়েত