হোম গদ্য যখন প্রদীপ চৌধুরীর সঙ্গে শ্যাম্পেনের বোতলে বাঙলা খেতুম

যখন প্রদীপ চৌধুরীর সঙ্গে শ্যাম্পেনের বোতলে বাঙলা খেতুম

যখন প্রদীপ চৌধুরীর সঙ্গে শ্যাম্পেনের বোতলে বাঙলা খেতুম
1.23K
0

হাংরি আন্দোলনের কবি প্রদীপ চৌধুরীর কথা মনে পড়লেই শ্যাম্পেনের কথা মনে পড়ে। সঠিক উচ্চারণ শ্যামপেন না শপ্যাঁ? প্রদীপ ভালো বলতে পারবে। ইউরোপে প্রায়ই ঢুঁ মারত যৌবনে, বিশেষ করে প্যারিসে, বিশেষ করে ফরাসি ভাষায় লেখা বা অনুবাদ করা ওর কবিতা পাঠের জন্য বা রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে ফরাসি ভাষায় বক্তৃতার জন্য, বুদ্ধিজীবী সমাবেশে, রেডিও’য়, টিভিতে। বদল্যার, র‌্যাঁবো, ভেরলেন, গীয়ম অ্যাপলিনেয়ারদের জমঘটের স্মৃতি-পরিসরে, পরাবাস্তববাদী আর ডাডাবাদীদের বিচরণ ক্ষেত্রের হাওয়ায় শ্বাস নিয়েছে, বেড়িয়েছে মঁপার্নাস, ল্যাটিন কোয়ার্টার আর প্যারিসের বিখ্যাত যৌনকর্মীদের প্রেম বিলোনোর প্রায়ান্ধকার সুগন্ধের অলিগলিতে, ওর চেয়ে প্রতিটি যৌনকর্মীই দীর্ঘাঙ্গী, আর হেনরি মিলারের ট্রপিক অফ ক্যানসার-এর পৃষ্ঠা থেকে নেমে আসা সুন্দরীরা, বদল্যারের কৃষ্ণাঙ্গী ভেনাসেরা,  যাদের সঙ্গে ওর দহরম-মহরম প্রদীপ চৌধুরীর আত্মজীবনী প্রকাশিত হলে হয়তো জানতে পারব কোনোদিন।


প্রদীপ ১৯৬২ সালেই হাংরি আন্দোলনে যোগ দিয়েছিল, শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের মাধ্যমে, দেবী রায়ের সঙ্গে পরিচয়ের পর


প্রদীপের কথা মনে এলেই মনে পড়ে শ্যাম্পেনের কথা। না এ শ্যাম্পেন ফরাসিদেশের বিখ্যাত শ্যাম্পেন এলাকার স্পার্কলিং ওয়াইন নয়, ফ্রান্সের শপাঁ এলাকার নয়, যে মদ তৈরির আছে নানান নিয়মকায়দা, কালো পিনো নয়ের আর কালো পিনো মেয়ঁর থেকে যা তৈরি হয়, যে মদ সতের থেকে উনিশ শতক পর্যন্ত ইউরোপের রাজারাজড়াদের প্রিয় পানীয় ছিল, খ্রিস্টধর্মী মঠের মঙ্করা দায়িত্ব নিয়ে তৈরি করাতেন, খ্রিস্টধর্মী ভিক্ষুণীদের পা-দিয়ে থেঁতো-করা আঙুর থেকে, যে বুদ্‌বুদময় মদ ঝাঁঝ করা আবিষ্কার করেছিলেন ১৫৩১ সালে, আকস্মিকভাবে, আর যার বোতল ফেটে ছিপি লাফিয়ে ওঠায় তারা আনন্দে হাততালি দিয়ে মদটির ডাকনাম রেখেছিলেন ‘শয়তানের পানীয়’, তখন কিছুটা মিষ্টি হতো, তারপর তারা শিখলেন বোতলে ছিপি কতটা ভেতরে থাকবে, তৃতীয়াংশ ডুবে থাকবে বিশেষভাবে তৈরি বোতলের পানীয়তে, আর যা খাওয়া হবে শ্যাম্পেন ফ্লুট নামের গেলাসে। প্রদীপের সঙ্গে যেদিন স্মিরনফ ভোদকার বোতল কিনে শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের বাড়ি গিয়েছিলুম—শক্তি চট্টোপাধ্যায় দুপুরে খেতে ডেকেছিলেন—উনার স্ত্রী মীনাক্ষী ওই শ্যাম্পেন ফ্লুটে খেয়েছিলেন ভোদকা, সেটিই উনার মদ খাবার গ্লাস জানিয়ে।

Prodip
প্যারিসের “বিট হোটেলে” ব্যালেরিনা ক্রিস্টিনা জিগনিন-এর সঙ্গে হাংরি আন্দোলনের কবি প্রদীপ চৌধুরী

ষাটের দশকের অনলপ্রবাহের পর প্রদীপ চৌধুরীর সঙ্গে বহুকাল পরে, নব্বই দশকে যখন আবার দেখা হলো, প্রদীপ ডেকেছিল আমাদের, দাদাকে আর আমাকে সপরিবারে ওর রিজেন্ট পার্কের ফ্ল্যাটে, খানা-পিনার জন্য, পিনা বিশেষ করে, শ্যাম্পেন খাওয়াবে। বোতলটা শ্যাম্পেনের হলেও, তাতে ছিল বিশুদ্ধ খালসিটোলার বাঙলা, সেটাই হুল্লোড় করে খেলুম সবাই মিলে, প্রদীপকে জানতে না দিয়ে যে আমার মেয়ে-জামাই যতবার বিদেশ থেকে আসে, চার বোতল করে মদ নিয়ে আসে, শ্যাম্পেন, সিঙ্গল মল্ট, স্কচ, আবসাঁথ, ভেরমথ, কনিয়াক, রাশিয়ান ভোদকা—যা ওদের নিয়ে আসতে বলি—ক্যাঙ্গারুর সসেজও। প্রদীপের বিল্ডিংয়ে ওর ভাইরাও থাকে দোতলা-তিনতলায়, ওর বাবার জমিতে বিল্ডারের তোলা ফ্ল্যাটে। তারাও জড়ো হয়েছিল হুল্লোড়ে, মনে হলো প্রদীপের হাংরি আন্দোলনের সময়ের হলকায় ওরাও ছিল, সেই জেল-জরিমানা-রাজসাক্ষী-মুচলেকার দিনগুলোয়। প্রদীপের স্ত্রী গৌরী তখনও মারা যান নি।

প্রদীপ চৌধুরীর জন্ম ১৯৪৩ সালে, কুমিল্লায়। এখন ওর বয়স তিয়াত্তর বছর। দেশভাগের পর ওরা ত্রিপুরায় চলে যায়, তা সত্ত্বেও প্রদীপের জিভে এখনও কুমিল্লার উচ্চারণের রেশ রয়ে গেছে। স্কুলে পড়েছে পার্বত্য ত্রিপুরায়। স্কুলে পড়ার শেষে প্রদীপের বাবা ওকে শান্তিনিকেতনের বিদ্যাভবনে ভর্তি করে দিয়ে যান, হোস্টেলে থাকার ব্যবস্থা করে। ওর প্রথম কবিতা ১৯৬১ সালে ‘পরিচয়’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। প্রদীপ ১৯৬২ সালেই হাংরি আন্দোলনে যোগ দিয়েছিল, শক্তি চট্টোপাধ্যায়ের মাধ্যমে, দেবী রায়ের সঙ্গে পরিচয়ের পর, যখন কিনা শৈলেশ্বর ঘোষ, সুভাষ ঘোষ যোগ দিয়েছিল ১৯৬৩ সালে, দেবী রায়ের ডাকে।

শান্তিনিকেতনে থাকাকালে ‘স্বকাল’ নামে একটা পত্রিকা সম্পাদনা আরম্ভ করেছিল প্রদীপ। বিদ্যাভবনের ছাত্রী ঈশিতা ঠাকুরের প্রতি ইনফ্যাচুয়েশানে আক্রান্ত প্রদীপ নিজের কবিতায় যুবতীটির নাম উল্লেখ করে; মেয়েটির তা পছন্দ হয় নি এবং বিদ্যাভবন কর্তৃপক্ষের কাছে নালিশ করে। তারা প্রদীপকে সতর্ক করে দেন কিন্তু ইনফ্যাচুয়েশানে আক্রান্ত প্রদীপের পক্ষে মেয়েটিকে ভোলা সম্ভব হচ্ছিল না। মেয়েটিকে আবার উল্লেখ করে নিজের কবিতায়। এখনকার মেয়েরা হয়তো দলবেঁধে যুবকটিকে গোটাকতক চড় মেরে বা হুমকি দিয়ে ছেড়ে দিত, কিন্তু এই ঘটনা পঞ্চাশ বছরের আগেকার তরুণীদের নিয়ে। সেই বিতর্কিত কবিতাগুলো প্রদীপ আমাকে পড়ায় নি; ওই সংখ্যায় আমার কবিতা বা গদ্য ছিল না।

বিদ্যাভবন কর্তৃপক্ষ প্রদীপ চৌধুরীকে রাস্টিকেট করে দিলেন। প্রদীপকে বলা যায় হাংরি আন্দোলনের প্রথম ক্যাজুয়ালটি। বহিষ্কারপত্রটা তুলে দিচ্ছি এখানে :

নং. আই.ডি.পি/VII-১০/৬৩-১০                                              তারিখ ১৮ জুলাই ১৯৬৩                                             

শ্রীপ্রদীপ চৌধুরী
আপনাকে সতর্ক করে দেওয়া সত্ত্বেও এই প্রতিষ্ঠানের স্বার্থবিরোধী কার্যকলাপ থেকে আপনি বিরত হন নি। কর্তৃপক্ষের নির্ণয় অনুযায়ী এই পরিসরে ছাত্র হিশাবে আপনার উপস্থিতি কোনোমতেই কাম্য নয়। অতএব আজ দ্বিপ্রহরের পূর্বেই আপনাকে ছাত্রাবাস ত্যাগ করার আদেশ দেওয়া হচ্ছে এবং জানানো হচ্ছে যে যত সত্বর সম্ভব আপনি আপনার ট্রান্সফার সার্টিফিকেট সংগ্রহ করে নিন ও সমস্ত বকেয়া চুকিয়ে দিন।

কালিদাস ভট্টাচার্য                                      পি.সি দাশগুপ্ত                                    হীরেন্দ্রনাথ দত্ত

অধ্যক্ষ বিদ্যাভবন                                      প্রোকটর                                           বিভাগীয় প্রধান

শান্তিনিকেতন                                            বিশ্বভারতী                                         ইংরেজি

বহিষ্কার সংক্রান্ত যে-চিঠি বিদ্যাভবন কর্তৃপক্ষ  প্রদীপ চৌধুরীর বাবাকে লেখেন :

নং. সি.এস.এস VII-I/৬৩/৭৯                                                তারিখ ১৮ জুলাই ১৯৬৩

শ্রীপ্রমোদরঞ্জন চৌধুরী
প্রিয় মহাশয়

শ্রীমান প্রদীপের বিরুদ্ধে অভিযোগ অত্যন্ত গুরুতর।

কয়েক মাস পূর্বে ‘স্বকাল’ পত্রিকার একটি সংখ্যায় সে জনাকয় ছাত্রীর নামোল্লেখ করে একটি অর্ধ-অশ্লীল কবিতা লেখে। প্রচ্ছদে জানানো হয় যে পত্রিকাটি বিশ্বভারতী, শান্তিনিকেতন হতে প্রকাশিত। তাকে ডেকে সতর্ক করে দিয়ে জানানো হয় যে ভবিষ্যতে যেন কোনো সংখ্যায় বিশ্বভারতীর নাম না থাকে এবং অশ্লীল কবিতা বা রচনা প্রকাশিত না হয়, অন্যথা তাকে বিশ্ববিদ্যালয় ত্যাগ করতে বাধ্য করা হবে।

পরবর্তী সংখ্যায় কেবল যে বিশ্বভারতীর নাম ছিল তা নয়, সঙ্গে অত্যন্ত অশ্লীল একটি কবিতা দেখে আমরা স্তম্ভিত হয়ে যাই, যা একজন ছাত্রের কাছ থেকে আশা করা যায় না, যদি তার রুচি অত্যন্ত নোংরা না হয়। অতএব বিশ্বভারতীর ছাত্র হিশাবে তার উপস্থিতি সম্ভব নয় এমন একটি নির্ণয় নেওয়া হয় এবং তাকে চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে ক্যাম্পাস ছেড়ে যেতে বলা হয়। আদেশের একটি কপি পাঠানো হলো।

শ্রীমান প্রদীপ চলে যাবার পর অ্যাকাউন্টস অফিসার জানিয়েছে যে ৪৫৫ টাকার বিশাল অঙ্ক সে বাকি রেখে গেছে।

                                                                                                        কালিদাস ভট্টাচার্য
অধ্যক্ষ বিদ্যাভবন
শান্তিনিকেতন

বিশ্বভারতী থেকে রাস্টিকেট হবার পর বুদ্ধদেব বসু, নরেশ গুহ, দীপক মজুমদারের সৌজন্যে প্রদীপ কলকাতায় এসে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগে ক্যাজুয়াল স্টুডেন্ট হিশাবে ভর্তি হয়, থাকত পান্থনিবাস হোটেলে। যাদবপুর থেকে ইংরেজিতে স্নাতকোত্তর এবং ফরাসি ভাষায় ব্যুৎপত্তি পায়।

যে বুলেটিনটির জন্য মামলা দায়ের হয়েছিল, সেটি প্রদীপই ছাপিয়েছিল, কিন্তু শৈলেশ্বর ঘোষ ও সুভাষ ঘোষের মতন মুচলেকা দেয় নি এবং রাজসাক্ষী হয় নি প্রদীপ চৌধুরী। বুলেটিন ছাপাবার টাকা দেবী রায়কে আমি পাঠিয়ে দিয়েছিলুম, সুবিমল বসাক লেখা সংগ্রহ করেছিল আর তা কোনো প্রেসে ছাপাবার চেষ্টা করছিল, কিন্তু পঞ্চাশ দশকের দাদারা সে সময়ে প্রেসে গিয়ে ভয় দেখাবার কারণে কোনো প্রেস ছাপতে রাজি হয় নি।

শৈলেশ্বর ঘোষ আর সুভাষ ঘোষকে যেদিন গ্রেপ্তার করা হয়, অর্থাৎ ২রা সেপ্টেম্বর ১৯৬৪, ওরা সেই দিনেই মুচলেকা লিখে দিয়েছিল, জানিয়েছিল যে হাংরি আন্দোলনে ওরা বিশ্বাস করে না, হাংরি আন্দোলনের সঙ্গে ওদের কোনো সংশ্রব নেই। প্রদীপকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে আনে এফ আর দায়ের হবার ছয় মাস পর, ত্রিপুরা থেকে, ৩১ মার্চ ১৯৬৫ তারিখে। প্রদীপ চৌধুরীর সঙ্গে সুবো আচার্যও ছিল ত্রিপুরায় প্রদীপের বাড়িতে; প্রদীপকে পুলিশ গ্রেপ্তার করতে এসেছে দেখে সুবো সেই দিনই আরও ভেতরের একটি গ্রামে গিয়ে লুকিয়েছিল। একা আমার বিরুদ্ধে মামলা শুরু হবার পর সুবো আচার্য ওর বিষ্ণুপুরের বাড়িতে ফিরেছিল। শৈলেশ্বর ঘোষ আর সুভাষ ঘোষের মুচলেকার কথা জেনেও প্রদীপ যে স্টেটমেন্ট লালবাজারে দিয়েছিল তা এই :

My name is Pradip Choudhuri. I am appearing for M.A. (English) examination from Jadavpur University, this year as a casual student. I came in contact with the publication known as Hungry Generation sometime in 1962, while I was a student of Visva Bharati University. I had contributed one of my poems titled “বাবা আমার বর্বরতা” in the said booklet. I also sent a poem entitled “সাময়িকতা” To Debi Roy taking him as editor of the magazine as was published in the previous issue of the Hungry Generation. Later on while the paper was running high controversy among public, I enquired from Shakti Chattopadhyay about the motto of Hungry Generation who was one of the editors. From the very beginning  my outlook was philosophical. Hungry Generation I considered an aesthetic movement and accordingly I even placed it to the Philosophical Congress of Shantinikatan. About the booklet in question I have only to confess that on someday in April 1963 Saileswar Ghose came to Panthanivas where I used to reside and they told me that another booklet was going to be published under the patronage of Malay Roychoudhury, Subo Acharjee and others who contributed in the booklet in question. I myself also felt some interest as one of my poem was going to be published. Saileswar and Subhas who were trying to publish the said booklet even before my coming to Calcutta but in vain. They told me whether I could solve the matter. Accordingly I introduced them to Dhananjoy Samanta of Mahendra Press at 58 Kailash Bose Street whom I knew earlier as I published a booklet entitled “স্বকাল” from them. Dhananjay Samanta agreed on our proposal of printing 300 copies entitled Hungry Generation, a Bengali booklet and duly received the manuscript copy from us with advance payment. I saw the proof along with Saileswar and Subhas at the press. I cannot say who actually gave the cost of printing for those booklet. It is a fact that I took delivery of those books from the press and kept at Panthanivas Hotel where I used to reside. In the evening of the date of delivery Saileswar and Subhas came to my hotel and we took some copies and went to Coffee House where we distributed free of cost few copies to the members present over there. I sent a copy to Samir Roychoudhury at his Chaibasa address forthwith. I left Calcutta in July 1964. I know the handwriting of Malay Roychoudhury.

ত্রিপুরায় ৩১ মার্চ ১৯৬৫ গ্রেপ্তার হয়ে প্রদীপ চৌধুরী ৭ এপ্রিল ১৯৬৫ আমাকে এই চিঠিটা লিখেছিল, ও জানত না যে তখন কলকাতায় আমার মাথা গোঁজার ঠাঁই নেই, আদালতে মামলা চলার দরুন দুবেলা খাবার মতন যথেষ্ট রেস্ত বাঁচে না, একই পোশাক পরে দিনের পর দিন চালাচ্ছি, হাগতে যাই শেয়ালদার দূর পাল্লার ট্রেনে, নিয়মিত স্নান করা হয়ে ওঠে না, বেশির ভাগ দিন থাকি সুবিমল বসাকের জ্যাঠামশায়ের স্যাকরার দোকানে, বৈঠকখানাপাড়ায়।

প্রিয় মলয়,
এর মধ্যে তোমাকে চিঠি, সুভাষকে চিঠি এবং টেলিগ্রাম পাঠিয়েছি, তোমার ঠিকানা সম্পর্কে আমি শিওর নই, তাই আর কিছু করতে পারলাম না। ট্রাঙ্ক কল করার ইচ্ছে ছিল।

কলকাতার পুলিশ আমাকে ৩১ মার্চ ১৯৬৫ ত্রিপুরায় এসে গ্রেপ্তার করেছে; কিন্তু আজ আর সেই প্রাথমিক উচ্ছ্বাস একদম নেই, জুজুর ভয়ও নেই। কবিতার বুকের ওপর চেপে বসলে সম্ভবত এইটেই ভবিতব্য। তুমি হাজতে বসে যা আমাকে লিখেছিলে—আমি তার সিগনিফিক্যান্স আগে যেমন, এখন তার চেয়ে অনেক স্বাভাবিক, তাই অনেক ভয়ংকর করে ভাবতে পারছি।


তাবৎ ফর্ম থেকে মুক্ত কবিতার সূচনা করতে চেয়েছিল প্রদীপ।


অনেকদিন এমন নিঃসঙ্গতা ও ভয় এবং অনুশোচনায় কাটিয়েছি যে, কী দারুণ উৎকণ্ঠার ভিতর আমি প্রদীপ চৌধুরীর যাবতীয় আবরণ খুলে, লাথি মেরে নষ্ট করে, একজন কবন্ধ লেখকে পরিণত হয়েছি। আমাকে না দেখলে, আমার মুখোমুখি না হলে, তুমি বুঝতে পারবে না। অসম্ভব দুঃখ পেয়েছি যেদিন শৈলেশ্বরদের ঠিকানা থেকে আমার বই ফেরত এসেছিল (ওরা রিফিউজ করেছিল)—হ্যাঁ তখন থেকে আমার অসহায় দুঃখকে চাবুকের মতোই আমি নিজের শরীরে ব্যবহার করে আসছি।

এনি হাউ, আমি ১২ এপ্রিল দুপুর ১২-১২.৫০-এর মধ্যে দমদম বিমানঘাঁটিতে পৌঁছব। কলকাতা পৌঁছে ব্যক্তিগতভাবে আমার একমাত্র সান্ত্বনা থাকবে বিমানঘাঁটিতে পৌঁছেই যদি তোমাকে ও অন্যান্য সবাইকে দেখতে পাই। তারপর এয়ার-অফিসের গাড়িতে না এসে একসঙ্গে ট্যাক্সিতে করে ফেরা যাবে কলকাতায়।

১৪ এপ্রিল কোর্টে সারেন্ডার করার দিন। এর মধ্যে জামিনের সব ব্যবস্থা করে রেখো। আজ আর কিছু লিখি না—লিখলে কেবল অনুশোচনা ও বর্বর সহানুভূতিই আমাকে কাটবে। ভালোবাসা জানাই। তোমার

                                                                                                                       প্রদীপ চৌধুরী
৭ এপ্রিল ১৯৬৫

৩রা মে ১৯৬৫ আমাকে চার্জশিট দিয়ে বাকি সবাইকে রেহাই দিয়ে দিলে সবাই যে যার আস্তানায় ফিরে যায়, প্রদীপ চৌধুরী ত্রিপুরায়, বাসুদেব দাশগুপ্ত অশোকনগরে। সুবিমল বসাক, ত্রিদিব মিত্র ছাড়া কেউই আর কোর্টে আসত না, আমার লেখা ছাপতেও ভয় পেত ওরা। বাসুদেব-সুভাষ-শৈলেশ্বর “ক্ষুধার্ত”, ক্ষুধার্ত খবর” ইত্যাদি প্রকাশ করলেও তা থেকে “যারা উদ্বাস্তু নয়” তাদের বাদ দিয়ে দেয় ওরা, কমিউনিস্ট ইন্টার ন্যাশানাল গাইতে-গাইতে। ব্যাংকশাল কোর্টে যে আমার এক মাসের সাজা হয়ে গেছে, হাইকোর্টে আমার শুনানি যে তখনও শেষ হয় নি তা প্রদীপ চৌধুরী জানত না। বোঝা যায় প্রদীপের এই চিঠিটা থেকে :

                                                                    India Hotel
                                                                    Surya Sen Street, Kolkata-9

প্রিয় মালয়,
কলকাতা এসেই ভীষণ অর্থকষ্টে পড়ে গেছি। সঙ্গে বউও রয়েছে। তুমি আমার চিঠি পাওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে কমপক্ষে ২০০ টাকা ধারদেনা করে হলেও পাঠিয়ে দাও। টাকাটা আমার ১ জুনের মধ্যে দরকার। DONT FAIL TO WIRE RUPEES TWO HUNDRED AT ONCE.

এটাকে কোনো শিল্পের সঙ্গে জড়িয়ে দিও না।

বিয়ে করে আমি এতই Crippled হয়ে পড়েছি যে কারোর সঙ্গেই ঠিকমতো সময় কাটাতে পারছি না। আমি তোমার T.M.O.-র অপেক্ষা করব । অসম্ভব risk-এর মধ্যে আছি।

প্রদীপ
২৭ মে ১৯৬৭

কলকাতা হাইকোর্টের রায়, ব্যাংকশাল কোর্টের দণ্ডাদেশ নাকচ করে বেরোয় ২৬ জুলাই ১৯৬৭। তারপর থেকে আমার সঙ্গে প্রায় সকলের যোগাযোগ ছিন্ন হয়ে যায়। বস্তুত মুচলেকা দিয়ে রাজসাক্ষী হয়েছিল বলে সুভাষ ঘোষ আর শৈলেশ্বর ঘোষ সম্পর্কে বহুকাল ঘৃণা পুষে রেখেছিলুম। ১৯৯৫ সালে যখন কলকাতায় ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার হয়ে ফিরলুম, পশ্চিমবঙ্গের গ্রামগঞ্জ ঘোরার, চাষি তাঁতি জেলে ক্ষেতমজুর উপজাতিদের সমস্যা বোঝার জন্যে ট্যুর করার প্রচুর সুযোগ পেতুম, আমার স্ত্রীকেও নিয়ে যেতুম সঙ্গে। ফিরে এসে সকলের সঙ্গে আবার দেখা করার ইচ্ছে হলো, কে কেমন আছে, কী করছে জানার জন্য। প্রদীপ আমার নাকতলার ফ্ল্যাটের কাছেই থাকত, রিজেন্ট পার্কে। দাদা “হাওয়া৪৯” পত্রিকা বের করা আরম্ভ করলে প্রদীপকে নিয়ে আমি একটা প্রবন্ধ লিখেছিলুম। দুর্ভাগ্যবশত প্রদীপ তখনও শৈলেশ্বরদের নিশিডাকে আক্রান্ত ছিল আর আমার প্রবন্ধটা অনুমোদন করাতে নিয়ে গিয়েছিল। প্রদীপকে ভালোমন্দ শোনানো হয়ে থাকবে। সঙ্গে দেবার জন্যে প্রদীপ নিজের একটা ফটো এনে দিল যেটি প্রবন্ধলেখককে পা দেখাচ্ছে। আমি সেই ফটোসুদ্দুই ছাপিয়ে দিয়েছিলুম প্রবন্ধটা। এখন প্রদীপ মনে করে ওকে নিয়ে লেখা সেইটিই সবচেয়ে উচ্চমানের বিশ্লেষণ।

শৈলেশ্বর ঘোষের বাড়ি কোথায় জানতুম না বলে প্রদীপকে অনুরোধ করলুম যে একদিন ও সঙ্গে চলুক। যেদিন যাবার সেদিন গড়িয়া বাস স্ট্যান্ডে দুঘণ্টা অপেক্ষা করেও প্রদীপের দেখা পেলুম না। প্রদীপ সেদিন শৈলেশ্বর ঘোষকে আগাম জানিয়ে দিতে গিয়েছিল যে আমি দেখা করতে যাচ্ছি। পরের দিন প্রদীপের সঙ্গে গেলুম শৈলেশ্বর ঘোষের বাড়ি। বেশ ভালো লাগল, ছোট্ট বাংলো টাইপ বাড়ি। গল্প হলো খানিকক্ষণ। কিন্তু বুঝতে পারলুম না এরকম বাড়িতে থেকেও বইয়ের আর পত্রিকার মলাটে দারিদ্র্যকে তুলে ধরা হয় কেন। কলকাতায় অনেক মধ্যবিত্ত কবি-লেখককে দেখেছি ভালো মাইনেপত্র পায়, ভালো খাওয়া-দাওয়া করে, কিন্তু ইচ্ছাকৃতভাবে গরিব সেজে থাকে বা নিজেকে গরিব দেখাবার চেষ্টা করে। সেই “সর্বহারা হওয়া ভালো, উদ্বাস্তু হওয়া ভালো, ইংরেজি না শেখা ভালো, কম্পিউটার না শেখা ভালো, কলকারখানা বন্ধ করিয়ে দেয়া ভালো” দর্শন থেকে বেরোতে পারেন নি এনারা । প্রদীপ চৌধুরী নিজে অবশ্য ভালোভাবেই থাকে, শ্যাম্পেন-কনিয়াক খায়, বিদেশে যায়, ত্রিভাষিক পত্রিকা প্রকাশ করে, বিদেশি কবিরা অতিথি হয়ে আসেন ওর বাড়িতে, ছেলে-বৌমা-নাতনিকে নিয়ে বেড়াতে যায়। এখন “স্বকাল” পত্রিকার নাম রেখেছে “স্বকাল ফুঃ”। হাংরি আন্দোলনে অপদস্থ হবার কারণেই হয়তো, প্রদীপ বহুকাল কলকাতার কবি-লেখকদের সঙ্গে মিশত না, এখন কিছুকাল হলো মেলামেশা আরম্ভ করেছে, বিক্রির জন্য ধ্যানবিন্দুতে কাব্যগ্রন্থ দিচ্ছে।

ত্রিপুরায় হাংরি আন্দোলনকে প্রসারিত করার চেষ্টা করেছিল প্রদীপ, সেলিম মুস্তফা, অরুণ বণিক, রসরাজ নাথ, অরূপ দত্ত, রত্নময় দে প্রমুখকে একত্র করে, কিন্তু অরুণ বণিকের নৃশংস হত্যার পর তা থিতিয়ে যায়। অলোক গোস্বামী “কনসেনট্রেশন ক্যাম্প” আর রাজা সরকার “ধৃতরাষ্ট” পত্রিকার মাধ্যমে যেভাবে উত্তরবঙ্গে হাংরি আন্দোলনের বিস্তার ঘটাতে পেরেছিল, তা ত্রিপুরায় সম্ভব হয় নি।

সমসাময়িক অনেক কবিকে সমালোচকরা বলেছেন নিঃসঙ্গ একাকী অসামাজিক অবসাদগ্রস্ত। অথচ প্রায় প্রতিটি সংকলনে এবং দুর্গোৎসব অমনিবাসে তাদের পাওয়া যাবে! সেসব অন্তর্ভুক্তির জন্যে যে তৎপরতা এবং নেটওয়ার্কিং প্রয়োজন, তাতে কিভাবেই বা, কেউ নিঃসঙ্গ একাকী অবসাদগ্রস্ত থাকেন? প্রদীপ চৌধুরীকে ১৯৬৩ সালে দেখার পর, পরে নব্বই দশকে তার সঙ্গে ওঠাবসা মেলামেশায়, তার বাড়ি যাতায়াত করে, এসব কথা মাথায় এসেছিল। “স্বকাল ফুঃ” নামে যে ত্রিভাষিক পত্রিকা (বাংলা, ফরাসি, ইংরেজি) সম্পাদনা করে প্রদীপ, তার সঙ্গে বিশেষ পরিচিত নন কলকাতার পাঠক। সন্দীপ দত্তের গবেষণাগারে গিয়ে গবেষকরা পত্রিকাটির প্রয়োজনীয় কপি খুঁজে পান না। বাঙালি পাঠকের কাছে যদি না পৌঁছয় তাহলে ঠিক কী জন্যই বা লেখা! সাড়ে পাঁচ দশকে মাত্র কয়েকটি বই বেরিয়েছে প্রদীপ চৌধুরীর, যার অধিকাংশই চটি : অন্যান্য তৎপরতা ও আমি (১৯৬৪), চর্মরোগ (১৯৬৫), ৬৪ ভুতের খেয়া ( ১৯৭১) এবং কালো গর্ত (১৯৮৩), রাত্রি, মত্ততা ও তারপর এবং কবিতাধর্ম ; এছাড়া ফরাসি ভাষায় এবং ইংরেজিতে আছে কয়েকটি গ্রন্থ। ফলে, আপাতভাবে, তাকে সাইকোপ্যাথিক মনে হতে পারে। ট্র্যাংকুইলাইজার ও বারবিটুরেট নিত বলে, মাদক সেবন করত বলে, তার চরিত্রে এবং কবিতার ও গদ্যের উপরিতলে অসঙ্গতি অস্থিরতা অসংলগ্নতা অনিশ্চয়তা এবং ঠান্ডা চাঞ্চল্য থাকে। “স্বকাল” পত্রিকার ৭৯ নম্বর সংখ্যায় হাংরি আন্দোলনের মৃত্যু ঘোষণা করেছিল প্রদীপ।

প্রদীপের কাছে একবার জানতে চেয়েছিলুম যে কেন সে কলকাতার কবিদের সঙ্গে মিশ খেতে পারে না, যখন কিনা সে ইউরোপীয় কবিদের সঙ্গে কাফে-পাব-কবিতা আড্ডায় সহজে মেলামেশা করে? বাঙালির বর্তমান সমাজে তার কি সততা নষ্ট হবার আশংকা? প্রদীপ চৌধুরী বলেছিল ও নিশ্চিত নয়। প্রদীপ বলেছিল, ওর তাবৎ ব্যাপার ইন্সটিংকটিভ, এমনকি কবিতা লেখে আর্জ থেকে। ডাডাবাদ ও পরাবাস্তববাদকে ছাপিয়ে যে বিকার ওর কবিতায় থাকে, তা অস্তিত্বকে কদর করার নান্দনিকতা, কেননা জ্ঞানপ্রাপ্তি একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়া, যে-কোনো জ্ঞান। বিলুপ্তির উদ্বেগ থাকে প্রত্যেকেরই, এবং উপেক্ষার ব্যবহার কমিয়ে আনা কঠিন। প্রদীপের কবিতায় তাই নান্দনিকতার নয়ছয়, শিল্পের ভূক্ষয়। তাছাড়া শান্তিনিকেতনে ঈশিতা ঠাকুর, যাদবপুরে ইলিনা রায় আর ত্রিপুরায় গৌরীর সঙ্গে ওর সম্পর্কগুলো ভাঙচুর করেছে প্রদীপকে। গৌরীকে ও বিয়ে করেছিল কিন্তু কলকাতায় এসে মারা যান গৌরী।

ষাট দশকের আগের কবিদের রচনার সঙ্গে যদি প্রদীপ চৌধুরীর কবিতা তুলনা করি তাহলে দেখব যে হাংরি আন্দোলনের শুরুতেই প্রদীপ জীবন থেকে সরাসরি যুক্তিহীন ও অসম্ভাব্য অসঙ্গতিমূলক ছকভাঙা শব্দবিন্যাস টেনে নামিয়েছিল। যে-সময়ে কাব্যগ্রন্থের নাম রাখা হচ্ছিল যৌবন বাউল, একা এবং কয়েকজন, হে প্রেম হে নৈঃশব্দ্য, দিনগুলি রাতগুলি, উতল নির্জন, সহজ সুন্দরী, সে সময়ে প্রদীপের যে তুমুল বদল ঘটে প্যারাডাইমে ও চেতনায়, তা ধরা পড়ে চর্মরোগ বা ৬৪ভুতের খেয়া নামকরণ থেকে। প্রচ্ছদগুলোও ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। আধুনিক কবিতা বলতে যে নান্দনিক ব্যাখ্যাযোগ্যতা স্বীকৃত ছিল, তাকে প্রথম থেকেই একেবারে এলোমেলো করে দিয়েছে প্রদীপ, প্রবেশ ঘটিয়েছে যুক্তিভাঙনের, মুক্তসূচনার, মুক্তসমাপ্তির। প্রতিষ্ঠা দিতে চেয়েছে তাড়না এবং মূর্ছাপ্রবণতাকে। মনে রাখা দরকার যে জীবনানন্দ ছাড়া পঞ্চাশ দশক পর্যন্ত কবিতাকে সিকোয়েনসিং ও লজিক থেকে মুক্তি দেন নি কবিরা। ওর কবিতায় রয়ে গেছে ত্রিপুরার জামাতিয়া রিয়াং ককবরক জনজীবনের চাপা দুর্জ্ঞেয় প্রভাব, জীবনের এলাহি ও ক্রুর অরডিয়ালের প্রতিচ্ছায়া, ত্রিপুরার বিদীর্ণ উপজাতি সংস্কৃতি এবং সেই ভূখণ্ডে বহিরাগত বঙ্গসংস্কৃতির দ্বিমুখী চাপের মাঝে বহুত্ববাদী জিজ্ঞাসাবোধ।

তাবৎ ফর্ম থেকে মুক্ত কবিতার সূচনা করতে চেয়েছিল প্রদীপ।

কবিতা লেখার জন্য প্রদীপ চৌধুরী ভালো চাকরি-বাকরির দিকে গেল না, একটা প্রাইভেট ছোট স্কুলে মাস্টারি করে কাটিয়ে দিল সারা জীবন। বাবার জমিতে ফ্ল্যাটের সুবিধা না থাকলে ওই চাকরি করে প্রদীপের সংসার চালানো কঠিন হতো; ওর স্ত্রী গৌরী সরকারি চাকরি করতেন ত্রিপুরায়, তাকেও চাকরি ছাড়িয়ে কলকাতায় নিয়ে চলে এসেছিল। জীবনের পুরো ব্যাপারটা নিয়ে প্রদীপের যে কারবার, নিজেকে কলকাতার কবিদের থেকে আলাদা করে রাখার চেষ্টা, সবাইকে এড়িয়ে যাবার ঝোঁক, নিজের কলকাতার বাড়িতে ঘরকুনো অথচ বিদেশে হরফনমওলা, তার বাংলা কবিতার বই কেউ পড়ছে কিনা, সে ব্যাপারে আগ্রহের অভাব, পশ্চিমবঙ্গের লিটল ম্যাগাজিনে ওর বইয়ের রিভিউ বা আলোচনা সম্পর্কে স্পৃহাহীনতা, সব মিলিয়ে একজন জটিল প্রদীপ চৌধুরীর ছবি গড়ে ওঠে; যন্ত্রণার অভীষ্টে হয়তো কোনো গোপন আনন্দ আছে। কলকাতায় প্রদীপের নিকটবন্ধু, ও হয়তো উপদেষ্টা, ছিল কেবল শৈলেশ্বর ঘোষ।

লরেন্স ফেরলিংঘেট্টির “সিটি লাইটস জার্নাল”, ডিক বাকেনের “সল্টেড ফেদার্স”, হাওয়ার্ড ম্যাককর্ডের “ইন্ডিয়ান পোয়েমস” এবং বিট আন্দোলনের সময়ে বহু পত্রিকায় হাংরি আন্দোলনের কবি-লেখকরা যাতে অন্তর্ভুক্ত হন আমি সে চেষ্টা করতুম বলে আমেরিকা-ইউরোপে হাংরিদের লেখাপত্র পৌঁছতে পেরেছিল। প্রদীপ বহুবার গেছে বিদেশে, বহু পত্রপত্রিকায় ইংরেজি আর ফরাসি ভাষায় লিখেছে, কিন্তু কখনও চেষ্টা করে নি যে ওর লেখার পাশাপাশি অন্যান্য হাংরি আন্দোলনকারীদের  অনুবাদ করা লেখাও প্রকাশিত হোক।

এক অভ্যন্তরীণ নকশায় সম্পর্কিত, প্রদীপের কবিতা, এলোমেলোভাব সত্ত্বেও, স্বয়ংসম্পূর্ণ; মনে হয় সচেতনভাবে নিরীক্ষা করে না। সামান্য টেনশনে ওর মেটাবলিজম বিঘ্নিত হয়। এই সংবেদন থেকে একাধিক ইন্দ্রিয়চেতনার অর্গল ভেঙে বেরোয় প্রদীপের শব্দ আর রূপকল্প, শৃঙ্খলাবর্জিত, ছিন্নভিন্ন, বিস্রস্ত, কিন্তু তা অটোমেটিক রাইটিং নয়, কেবল অবচেতন নির্ভর নয়। স্বর ও ব্যঞ্জন ধ্বনিসংঘাত মডুলেশানের প্রয়োগ নিয়ে, পাঠকের কথা মনে রেখে, নিরীক্ষা করে নি প্রদীপ। উপজাতিদের স্বরগ্রাম আবার স্মরণ করতে হয়। মোটামুটিভাবে রবীন্দ্রনাথের মডুলেশান থেকে বাংলা কবিতা যে সম্পূর্ণ বেরিয়ে আসতে পারে নি তা কবিতাপাঠের আসরগুলোতে গেলে টের পাওয়া যায়। সেনেট হলে জীবনানন্দ যখন নিজের কবিতা পড়েছিলেন, অনেকেই ভেবেছিলেন উপস্থিত অন্যান্য কবিদের মতো তিনিও রবীন্দ্রনাথের মডুলেশান দেবেন। ক্ষমার অযোগ্য এই ধারণা। প্রত্যেক কবিরই নিজের ফোনেটিকাল কাঠামোয় গড়ে ওঠে তার কবিতা। একজন কবির থেকে আরেকজন কবির ফোনেটিক কাঠামো আলাদা হওয়া জরুরি নয়তো প্রভাব রয়ে যাবার প্রশ্ন ওঠে। কবিতার ইশারা ছন্দ শব্দ যা-ই হোক না কেন, তা যদি রাবীন্দ্রিক পাঠের ও আবৃত্তির ফ্রেম থেকে বেরোতে না পারে, তাহলে তাকে সত্যিই সমসাময়িক বা রবীন্দ্রোত্তর বলা হবে কিনা তা নিয়ে তর্ক হতেই পারে। প্রদীপের ফোনেটিকাল কাঠামো এবং ওর কবিতার মডুলেশান-যোগ্যতা একেবারে আলাদা, ওর সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বললেই তা টের পাওয়া যায়।


বিশ্বভারতী ছাড়ার সময়ে কেঁদেছিল প্রদীপ।


আমি এখানে এজিট-প্রপের ফোনেটিকসের কথা পাড়ছি না। বস্তুত প্রদীপের যাপনপ্রক্রিয়া এবং কবিতার প্রেক্ষিতে প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা, প্রতিবাদ, প্রতিরোধ, দায়বদ্ধতা, সমাজমনস্কতা ইত্যাদি ইস্যুগুলো ক্লিশে মনে হয়। হাংরি আন্দোলনের সুভাষ ঘোষ আর বাসুদেব দাশগুপ্ত দরবারি বামপন্থার আশ্রয় নিয়েছিল, যখন কিনা পশ্চিমবঙ্গে সেসময়ে চলছে রক্তচোষার দিগ্বিজয়। প্রদীপ চৌধুরী অমন প্রাতিষ্ঠানিক দরবারের আশ্রয় নেয়া দরকার মনে করে নি। প্রদীপের চোরাগোপ্তা নাস্তিক্যবোধ সামগ্রিক। তার কবিতায় মৌনতা যেমন নেই, তেমনই নেই চিৎকার, যা হাংরি আন্দোলনের কবি ত্রিদিব মিত্রের “হত্যাকাণ্ড” কবিতায় স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। প্রদীপের কবিতায় আছে গোঙানি; যন্ত্রণাশীর্ষেও যেখানে শেষতম সহ্যশক্তি অটুট থাকে। কবি তার ক্রাইমের জায়গায়, অর্থাৎ কবিতায়, ফেরত যেতে বাধ্য হয়। নিজস্ব ধাঁধা-লোকসানে আটক জেরিক্যান প্রস্তুতকারকদের, মড়ার মাচান বিক্রেতাদের, কবর খুঁড়িয়েদের বর্তমান সামাজিক-রাজনৈতিক অর্থব্যবস্থায়, প্রদীপ চৌধুরী জানে যে তার জায়গা কোথাও নেই। আর ওর কোনো ডুপ্লিকেটও সম্ভব নয়।

রুদ্ধতা বদ্ধতা বন্দিত্ব ভবিষ্যতহীনতা ধূসর বিবর্ণ শূন্যগর্ভ নেতি ইত্যাদি ইউরোপীয় আধুনিকতাবাদী মোহ থেকে নিজেকে মুক্ত করতে চেয়েছে প্রদীপ, কেননা তারুণ্য থেকেই অনির্বাণ যৌনতা আছে তার অস্তিত্বের কেন্দ্রে। সমর সেন থেকে ভাস্কর চক্রবর্তী পর্যন্ত, এমনকি হাল আমলের তরুণতম কবিদের কয়েকজনের ক্ষেত্রেও, নিজেকে হেয় করার নাগরিক কবিত্বে যে বিচ্ছিন্নতাবোধের আধুনিকতায় উত্তরণ, প্রদীপ চৌধুরী তা থেকে চিরকাল দূরত্ব বজায় রাখার চেষ্টা করে গেছে। অবশ্য ফরাসিদেশের এখনকার কোনো-কোনো কবিদের সঙ্গে ও মিশেছে, বর্তমান ফরাসি কবিতার রেশ প্রদীপ চৌধুরীর কবিতায় জায়গা করে নিয়েছে কিনা, তা আমি বলতে পারব না।

প্রদীপকে জানতে পারব এ-কথা মনে রাখলে যে প্রাইমেট মাত্রেই স্বমেহনের হকদার, কেননা তা তাকে কীট বা পাখি বা সরীসৃপ বা জানোয়ার থেকে পৃথক ও গৌরবান্বিত করে। মানব ইথসের মূল হলো যৌনতা। মাদক নেয়াটাও মানুষকে অন্যান্য প্রাণী থেকে আলাদা করে। উপজাতি মানুষের কাছে মাদক স্বাভাবিক, তা তাদের সংস্কৃতির অঙ্গ। যৌনতা ভাষার সীমাকে ভাঙে। ভাষা না জেনেও যৌন সম্পর্ক সম্ভব এবং কাম্য। তাতে সংলাপবর্জিত বার্তাবিনিময় ঘটে—কবিতার ভরকেন্দ্রের ইশারার সঙ্গে যা তুলনীয়।

বিশ্বভারতী ছাড়ার সময়ে কেঁদেছিল প্রদীপ। প্রদীপের ধারণা ছিল যে, যেহেতু ও একজন কবি,  রবীন্দ্রনাথের সম্পত্তির ওপর ওর অধিকার আছে। প্রদীপের কবিতা থেকে অতিষ্ঠতা তাই যেতে চায় না। তার মানসদুনিয়ায় প্রকৃতিস্থতা আর অপ্রকৃতিস্থতার ডিকটমি নেই; পাঠককে ঘিরে ফেলতে হবে ছবি-শব্দের জলস্তম্ভে। যে-কালে বিজ্ঞাপন হয়ে উঠেছে সংক্ষিপ্ত এবং মেদহীন, প্রদীপ মনে করে যে কবিতাকে হতে হবে ভারবোজ, অতিকথনের লতায় জড়িয়ে নিতে হবে পাঠককে, বোধের ধারাপ্রবাহকে চিন্তা দিয়ে আখছার টুকরো করে ফেলতে হবে, কেননা প্রদীপের মতে কবিতা লেখার অছিলা হয় না, সে কারণে একের পর এক হাইপার রিয়াল কবিতা আসতে থাকে ওর কবিতায়। প্রদীপের কবিতা তাই গাটারাল ও লাবিয়াল মিশ্রিত। প্রচুর ঝুঁকি নিতে হয়েছে সে কারণে। ফ্রেমের পর ফ্রেমে আঁকড়ে ধরতে চেয়েছে চকিত বর্তমানকে। ও চারিয়ে দিচ্ছে অতিরেক, চারিয়ে দিচ্ছে ভারবোজ অতিকথন, চারিয়ে দিচ্ছে ধাতুকীটের শয়তানি।

মলয় রায়চৌধুরী

জন্ম ২৯ অক্টোবর, ১৯৩৯। বিশিষ্ট বাঙালি কবি, ঔপন্যাসিক, গল্পকার, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক, সাংবাদিক।

মলয় রায়চৌধুরীর ১০টি কাব্যগ্রন্থ, ৪টি উপন্যাস, ১০টি সমালোচনা গ্রন্থ এবং কয়েকটি অনুবাদ গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছে। উল্লেখযোগ্য রচনার মধ্যে ‘শয়তানের মুখ’, ‘জখম’, ‘ডুব জলে যেটুকু প্রশ্বাস’, ‘নামগন্ধ চিৎকার সমগ্র’, ‘কৌণপের লুচিমাংস’, ‘অ্যালেন গিন্সবার্গের ক্যাডিশ গ্রন্থের অনুবাদ’ প্রভৃতি অন্যতম।

শিক্ষা : পাটনার সেইন্ট জোসেফ কনভেন্টে প্রাথমিক এবং রামমোহন রায় সেমিনারিতে ম্যাট্রিকুলেশানের পর অর্থনীতিতে সাম্মানিক স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন।

মলয় রায়চৌধুরী ২০০৩ সালে অনুবাদ সাহিত্যে, সাহিত্য অাকাদেমি পুরস্কার এবং পরবর্তীকালে বিভিন্ন লিটল ম্যাগাজিন পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করেন।

ই-মেইল : 39malayrc@gmail.com