হোম গদ্য মৃত্যু, একটা দীর্ঘ ঘুমের নাম

মৃত্যু, একটা দীর্ঘ ঘুমের নাম

মৃত্যু, একটা দীর্ঘ ঘুমের নাম
817
0

‘আমরা জানি, একদিন আমরা মরে যাব। এই জন্যেই পৃথিবীটাকে এত সুন্দর লাগে। যদি জানতাম আমাদের মৃত্যু নেই, তাহলে পৃথিবীটা কখনোই এত সুন্দর লাগত না।’

—হুমায়ূন আহমেদ (মেঘ বলেছে যাব যাব/পৃ: ১৫৮)

ক’দিন ধরে আমার ভাবনায় মৃত্যুচিন্তা বেশ ঘুরপাক খাচ্ছে। পথে-ঘাটে, নদীতে-সমুদ্রে, আকাশে না বাড়িতে কোথায় থেমে যাব, পড়ে থাকবে প্রাণহীন দেহটা? ভাবতে থাকি, কোনটা হবে আমার পবিত্র রুহ’র এক্সিট পয়েন্ট? শেষবারের মতন সে যখন শ্বাস নিবে আর তারপর চলে যাবে। আমার এই দেহটাকে রেখে যাবে এই আশ্চর্য সুন্দর মায়াভরা পৃথিবীতে! কিভাবে মৃত্যুটা ঘটতে পারে—এটা নিয়ে আমি বেশ খানিকটা চিন্তিত। শেষ সময়টায় বাড়িতে একটা/ দু’টা কথা বলা বা হাসিমুখে থাকা হবে কিনা বুঝতে পারছি না। ঘটনাটা কিভাবে ঘটবে, স্বাভাবিকভাবে না দুর্ঘটনায়? এই প্রশ্নটা নিয়ে আমি মনের মধ্যে নাড়াচাড়া করছিলাম। টেনশনটার পিছনে অবশ্য আমারই লেখা একটি কবিতার কয়েকটি চরণের অপরিকল্পিত ও সংগোপন উসকানি টের পাই। বোঝা গেল মনের মধ্যে এই উসকানির গভীর প্রভাব সৃষ্টি হয়েছে। উসকানিটা ছড়িয়ে গেছে ভিতর খুঁড়ে ওঠে আসা দিগন্তব্যাপ্ত জিজ্ঞাসায়। যার এই কাণ্ড সেই কবিতাটি আয়তনে একটু বড় ধরনের, নাম রেখেছি ‘তমিস্র আলো’। সেখানে আছে :

‘‘আকাশে ঝমঝম ঝমঝম..
খুব ভোরে আঙিনায় হাঁটু পানি
চোখ খরার জমি সব পানি নামিয়ে নিয়েছে;
আমার পানিতে আমি ডুবি আর ভাসি
খুব ভোরে সূর্য ওঠে নি—হৃদয়ে উঠেছিল ঘূর্ণিঝড়
আমার কবর হবে কোথায় জিজ্ঞেস করেছিল’’


হুমায়ূন আহমেদের শেষ পরিণতি তার ভাবনা অনুযায়ী ঘটে নি।


কবিরা অনেক সময় কী করে যেন সেই একটা বিশেষ মুহূর্ত বা ভবিতব্যকে আঁচ করে নিতে পারে। সেগুলোই তার লেখায় অমোঘ ভবিষ্যদ্বাণীর মতন চলে আসে। যেমন নজরুল তার আপন নিয়তির ইঙ্গিত রেখে গিয়েছিলেন ‘বাতায়ন পাশে গুবাক তরুর সারি’ কবিতায়। ১৯৪২ সালে শেষ পর্যায়ের অসুস্থতায় নজরুল বাকশক্তি হারালেন। এ অবস্থায় ১৯৭৬ পর্যন্ত প্রায় ৩৪ বছর তিনি জীবিত ছিলেন। সেই কবিতায় বলেছিলেন—

তোমাদের পানে চাহিয়া বন্ধু, আর আমি জাগিব না,
কোলাহল করি’ সারা দিনমান কারও ধ্যান ভাঙিব না।
—নিশ্চল নিশ্চুপ
আপনার মনে পুড়িব একাকী গন্ধবিধুর ধূপ।

পপশিল্পী ফিরোজ সাঁই, তার ক্ষেত্রে কী হলো? বেশ তো গাইছিলেন ঢাকায় শিল্পকলা একাডেমির মঞ্চে। ‘এক সেকেন্ডের নাই ভরসা বন্ধ হবে রঙ তামাশা’—গানটি সাঙ্গ হলো বটে, ফিরোজ সাঁইও ঢলে পড়লেন মৃত্যুর কোলে। ১২ জানুয়ারি ১৯৯৫-তে এই বিয়োগান্তক ঘটনা। অত্যন্ত ভদ্র, সজ্জন ও বিনয়ী শিল্পী ফিরোজ সাঁই, আমার নামে নাম। আমি আযম খানকে বেশি পছন্দ করতাম, তারপর তাকে। ছিলেন সত্তর ও আশির দশকে লোকসঙ্গীত ও আধ্যাত্মিক ধারার গানকে পপসঙ্গীতের আদল দিতে অন্যতম পথিকৃৎ। সৃষ্টিকর্তা কী অদ্ভুত রহস্য করলেন। গানের সাথে মিল করেই তার জীবননাট্যের উপসংহার টানলেন। তার গাওয়া ‘এক সেকেন্ডের নাই ভরসা’, ‘ইঞ্জিন যদি চইলা যায় ডাব্বা লইয়া কী হইব’ অথবা ‘ইস্কুল খুইলাছে রে মওলা, ইস্কুল খুইলাছে’-এর মতো গানগুলো আজও লোকজন মনে রেখেছে।

হুমায়ূন আহমেদের শেষ পরিণতি তার ভাবনা অনুযায়ী ঘটে নি। তিনি আবেগ দিয়ে বেশ করেই চাইতেন, রীতিমতো সৃষ্টিকর্তার কাছে ‘চান্নিপসর রাইতে’ মৃত্যুর ক্যাম্পেইনও করেছেন। যারা তার লেখা পড়তেন তারাও এই ক্ষ্যাপামির সাথে প্রবলভাবেই পরিচিত। কিন্তু সৃষ্টিকর্তা তার সেই ইচ্ছা অপূর্ণই রাখলেন। তবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মৃত্যুর বিষয়ে নজরুলের মতো ভবিষ্যদ্বাণী বা হুমায়ূন আহমেদের মতো শেষ ইচ্ছাটুকু প্রবলভাবে ব্যক্ত বা আকাঙ্ক্ষা করেন নি। জীবনের শেষ পর্যায়ে পৌঁছে রোগশয্যায় (১৯৪০), আরোগ্য (১৯৪১), জন্মদিনে (১৯৪১) ও শেষ লেখা (১৯৪১-মৃত্যুর অব্যবহিত পরে প্রকাশিত) কাব্যে মৃত্যু ও মর্ত্যপ্রীতিকে একটি নতুন আঙ্গিকে রবীন্দ্রনাথ তুলে ধরেছিলেন। জীবনের শেষ সময়টায় আকাশবাণী ঘণ্টায় ঘণ্টায় আপডেট দিয়েছিল। চেতন-অচেতন বা ঘোরের ভিতর জীবনমৃত্যুর সন্ধিক্ষণে যখন রবীন্দ্রনাথ। মৃত্যুর আট দিন আগে ৩০জুলাই ১৯৪১, সকল সাড়ে ন’টা। মুখে মুখে লিখলেন ২০ লাইনের সর্বশেষ কবিতা ‘তোমার সৃষ্টির পথ’। আগস্টের ৭ তারিখ রবীন্দ্রনাথের মহাপ্রয়াণে পুরো ভারতবর্ষে স্তব্ধতা নেমে আসে। রবীন্দ্রনাথের সর্বশেষ কবিতার প্রথম কয়েকটি চরণ—

তোমার সৃষ্টির পথ রেখেছ আকীর্ণ করি
বিচিত্র ছলনাজালে
হে ছলনাময়ী!
মিথ্যা বিশ্বাসের ফাঁদ পেতেছ নিপুণ হাতে
সরল জীবনে।

আমি শেখ ফিরোজ সামান্য লিখিয়ে একজন। আমাকে তেমন করে কেউ চিনে না। আমিও তেমন মহান কিছু সৃষ্টিকর্ম রেখে যাচ্ছি না। অথচ আজীবন কবিতা নামের মরীচিকা ধরার স্বপ্ন দেখে বেড়িয়েছি। গড় প্রতিভায় সামান্য একটু মকশো পর্বে জগতও তেমন আলোকিত হয় নি। কবিতায় বা নাট্যসংলাপে কোনো ভবিষ্যদ্বাণী বা প্রবল আকাঙ্ক্ষার ক্যাম্পেইনের কোনো শক্তিও আমার ওপর ভর করে নি! তাহলে এখন কী হবে? উত্তর খুঁজতে যাই আমার দ্বিতীয় কবিতার বই মাতরিশ্বা-র কাছে। বইটি হাতে নিই, দেখি প্রথম কবিতা ‘আমাদের কথাগুলি’-র শেষদিকটায় আছে—

‘‘মৃত্যু, অন্ধকার কুৎসিত বুড়ি
আমার এ প্রাণ নিয়ে কোথায় রাখিস’’


জীবনের অভিজ্ঞতা থেকেই বুঝতে পারলাম, মৃত্যু নিয়তি-নির্দিষ্ট একটা ব্যাপার মাত্র।


আমি ভাবি, মৃত্যু কি সত্যিই কুৎসিত বুড়ির তুল্য হতে পারে, কেন হবে? যত দিন যায় ভাবনা একটু একটু করে বদলায়। এখন মনে হয়, এই কথাটি হয়তো সঠিক ছিল না। মৃত্যু পবিত্র বিষয়,  বিভিন্ন উপায়ে সংঘটিত হয়ে সৃষ্টিকর্তার কাছে ফিরে যাওয়ার একটা পদ্ধতি। জে. কে. রাউলিংও মৃত্যুকে দেখেছেন সম্মানের চোখে, অন্যরকম ভ্রমণের প্রস্তুতি হিশাবে। যেমন : “To the well-organized mind, death is but the next great adventure।” কাজেই মৃত্যু একটি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা মাত্র। অন্যভুবনে পৌঁছবার আগে বিরতি পর্বে একটি দীর্ঘ ঘুমের প্রক্রিয়া। একই বইয়ে আমার ‘জলযাত্রা’ কবিতায় বলেছি—‘মৃত্যুর নাচে আলোকবর্ষ দূর থেকে ক্ষমা ভেসে আসে/ ক্ষমারা দাঁড়িয়ে যায় বনে বনে হাত ধরাধরি করে।’’ এই কথারও সমর্থক হিশাবে পেলাম রোমান্টিক যুগের অন্যতম জার্মান কবি হাইনরিখ হাইনকে। মৃত্যু নিয়ে তার একটা উদ্ধৃতি ঘুরছে নেটে। হাইনরিখ বললেন—‘‘ঈশ্বর আমাকে মাফ করে দেবেন। এটাই তার কাজ।’’ কথা কিন্তু তিনি খারাপ বলেন নি। এখান থেকে সাহসের যোগান পাওয়া যাচ্ছে, সৃষ্টিকর্তার মুখোমুখি হওয়ার। এই জন্য ‘স্মরণপিপাসা’-তে বলেছিলাম সেই কবেই—

‘‘আমি সূর্যের হৃৎপিণ্ড থেকে
জ্যোতি করেছি আহরণ
কাটামুণ্ডু রাহুর গ্রাস থেকে বারবার
এই আমি প্রকাশ্য আকাশে

আছাড় খেয়ে খেয়ে ফের দাঁড়ানো আমি অদম্য
তোমরা আমাকে দলবেঁধে
দিতে এসো না সান্ত্বনা, যদি পারো
বাড়ানো হৃদয়ের জন্য রেখো কিছু স্মরণপিপাসা’’

জীবনের অভিজ্ঞতা থেকেই বুঝতে পারলাম, মৃত্যু নিয়তি-নির্দিষ্ট একটা ব্যাপার মাত্র। এড়ানোর উপায় নাই। যে কারণে সক্রেটিসের মৃত্যুদণ্ড বাস্তবায়ন আজও জগতের জন্য একটি আলোড়ন সৃষ্টিকারী ঘটনা। জুরিরা এথেন্সের তরুণ সমাজকে বিভ্রান্ত ও প্রচলিত দেবদেবিকে উপেক্ষা করার অপরাধে সক্রেটিসের বিচার করেছেন, তারপর মৃত্যুদণ্ড দিলেন। ‘আই টু ডাই; ইউ টু লিভ, হুইচ ইজ বেটার অনলি গড নোজ’—কথাটি সক্রেটিসের। এথেন্সে হেমলকের পেয়ালা হাতে মৃত্যুমুহূর্তে অথবা বিচারপ্রক্রিয়া চলাকালে সক্রেটিস এই কথাটি কি বলেছিলেন? যদি বলে থাকেন তাহলে সক্রেটিসের কথার শেষাংশের মানে করা যায়—কোনটা ভালোমন্দ সেটা সৃষ্টিকর্তাই জানেন। আমার মনে প্রশ্ন হয় ‘আমার আকাশ’ কবিতায় এজন্যই কি বলেছিলাম, আসলে কিন্তু এই উদ্দেশ্যেই বলি নি? কিন্তু সিকোয়েন্স বন্ধনে মিল পাই—

‘‘যতসব অলৌকিক উদ্ধার
সমস্তই নিহিত একটি আকাশ—সে আমার বুকের ভেতর
আমি শুনি তার কলকল গান।’’

প্রচলিত বিশ্বাসে আকাশের ওপারেই সেই অদেখা ভুবন। যেখানে মৃত্যুর পর মানুষ ফিরে যায়। সবই সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছা। মানুষের বুকের মধ্যে সাহস, বুকের মধ্যেই সংগ্রাম। মানুষ আজন্ম লড়াকু—জীবনের লড়াই চলতেই থাকে। পৃথিবী যদি আমার নিবাস হয়, তাহলে আকাশের ওপারেই সেই অনন্ত প্রবাস। ওখানে মানুষ ভালো থাকে, এই ধারণা থেকেই ওখান থেকে আমি আগে গিয়ে মায়ের কাছে পৃথিবীতে খবর পাঠাতে চেয়েছিলাম। কিন্তু মা-বাবা আমার আগেই ওখান থেকে ডাক পেয়েছেন বা বসত করেছেন। আমার একটা ধারণা ভ্রান্ত প্রতিপন্ন হয়। আমি মায়ের আগে ওখানে যেতে পারি নি। অথচ যেতে পারব ভেবেই,

মাতরিশ্বা’র ‘ছায়ায়, মায়ায় আছি’—কবিতাতে আমি এভাবেই বলতে চেয়েছিলাম।

‘‘ফানুস, কত যে ফানুস ওড়ে
ওই রূপবতী বুকে
পদপ্রান্তে তখন অলৌকিক আকাশ
স্বপ্নপ্রবণ মন ফুটো হয়ে ঝরে পড়ে
নিখিল বিশ্ব নিজ্‌ঝুম

একটা আকাশে কত যে ফানুসের
ওড়াউড়ি

মা, কিচ্ছু ভেব না আমি ভালো আছি
এই অনন্ত প্রবাসে।’’


এপিটাফের কথা যখন ভাবি, কবি মধুসূদন দত্তকে বেশ ঈর্ষা করতে ইচ্ছা হয়।


শেষ পর্যন্ত মৃত্যু আমার কাছে ‘কুৎসিত বুড়ি’ হয়ে থাকল না। মনে হলো একটা পদ্ধতি। অন্যভুবনে পৌঁছানোর বিরতিতে প্রস্তুতিমূলক একটা দীর্ঘ ঘুমের বিশ্রাম। আমি এখন মায়ের কাছে যাওয়ার জন্য অপেক্ষা করি। আমি স্বাভাবিক ঘুমের ভিতর দিয়ে বাড়ি থেকেই মায়ের কাছে যেতে চাই। মা আছেন অন্য ভুবনে। এজন্য আমাকে একটা দীর্ঘ ঘুম পাড়ি দিতে হবে। গোরস্থানে মা-বাবা পাশাপাশি ঘুমিয়ে আছেন। আমি মায়ের পায়ের নিচে একটু কবর পেতে চাই কিংবা বাবার। অপেক্ষায় থাকি—খোদা যেখানে মঞ্জুর রাখবেন। পুরোটাই তার মর্জি। মাঝে মাঝে ভাবি, আমি যদি একটা ড্রাফ্‌ট অছিয়ত করে যাই, আমার এপিটাফ কি কেউ লিখবে? এপিটাফে কী লিখব আমি? এপিটাফের কথা যখন ভাবি, কবি মধুসূদন দত্তকে বেশ ঈর্ষা করতে ইচ্ছা হয়। তিনি আপন সমাধির জন্য অনেক সুন্দর এপিটাফ লিখেছেন। আমেরিকায় ওয়েস্টার্ন যুগের কাউবয়দের কবরেও বেশ কিছু আকর্ষণীয় এপিটাফ আছে। কিছু ক্ষেত্রে মরার আগে কী লেখা হবে কাউবয়রা নিজেরা বলে গেছে, কিছু মরার পর স্থানীয়রা প্রেক্ষিত অনুযায়ী লিখে দিয়েছে। ওয়ার সিমেট্রি বা সাধারণ কবরস্থানেও এরকম আছে।

মহাকবি মাইকেল মধুসূদন দত্তের সমাধিস্থলে আবক্ষ মূর্তির নিচে উৎকীর্ণ সেই বিখ্যাত এপিটাফ,  যার অমোঘ আহ্বানে পথিক আজও বিনম্র ভালোবাসা ও বেদনায় অশ্রুসজল হয়—

দাঁড়াও পথিকবর, জন্ম যদি তব
বঙ্গে! তিষ্ঠ ক্ষণকাল! এ সমাধি স্থলে
(জননীর কোলে শিশু লভয়ে যেমতি
বিরাম) মহীর পদে মহা নিদ্রাবৃত
দত্তকুলোদ্ভব কবি শ্রীমধুসূদন!
যশোরে সাগরদাঁড়ি কপোতাক্ষ-তীরে
জন্মভূমি, জন্মদাতা দত্ত মহামতি
রাজনারায়ণ নামে, জননী জাহ্নবী।

ব্যক্তির মৃত্যুতে যেমন তেমন সমষ্টির জন্যও এপিটাফ রচিত হতে পারে। প্রশংসা বা দার্শনিক অভিব্যক্তি, সমালোচনা বা কখনো ব্যঙ্গাত্মক সুরেও এপিটাফ রচিত হয়। নির্ভর করে প্রেক্ষিতের উপর। যেমন খ্রিস্টপূর্ব পঞ্চম শতকে পারস্য সম্রাট গ্রিস আক্রমণ করলে তিনশত স্পার্টান যোদ্ধা থার্মোপাইলির রণক্ষেত্রে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেন। এদের স্মৃতিতে রচিত বিশ্ববিখ্যাত এপিটাফ হলো—

Go, tell the Lacedaimonians, passerby,
That here obedient to their laws we lie.

প্যারিসের ‘পের লা শেজ’-কে বলা হয় পৃথিবীর সব থেকে বড় গোরস্থান। সবুজে ছাওয়া বিশাল পার্কে বৈচিত্র্যে ভরা এপিটাফ ও আকর্ষণীয় সব স্থাপত্যের সমাহার নিয়ে বেশ নামডাক। ১৮০৪ সালে স্বয়ং সম্রাট নেপোলিয়ন উদ্বো্ধন করেছিলেন। রাজা চতুর্দশ লুইয়ের আমলের রাজকীয় পাদ্রি পিয়েরে ল্য শেজের নামে গোরস্থানের নাম। তার সমাধিও এইখানে। প্রায় ১২০ একর আয়তনে তিন লক্ষাধিক কবর। প্রতিদিন শত শত দর্শনার্থী আসেন। তারেক ‘অণু সচলায়তন’ ব্লগে লিখলেন, ‘‘বিখ্যাত সব ব্যক্তি—দার্শনিক, চিত্রকর, সঙ্গীতজ্ঞ, লেখক, রাজনীতিবিদ, রূপালি পর্দার তারকা, সে ফরাসিই হোক কি ভিনদেশি, নানা ধর্মের নানা মতের—সবারই শেষ বিশ্রামস্থল হিশেবে পের লা শেজ্‌ পরিণত হয়েছে লাখো মানুষের অবশ্য গন্তব্যে। আর সেই সাথে পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত কবরস্থানে।’’ প্রতিটি কবরের এপিটাফ-ই আলাদা, আপন আপন বৈশিষ্ট্যে ভিন্নতর।

এখানেই অসংখ্য সমাধির ভিড়ে ফরাসি ভাষার জনপ্রিয় কবি গীয়ম অ্যাপোলোনীয়রের শেষ বিশ্রামস্থল। গ্রানাইটে খোদাই করা আছে তার অমর অক্ষয় পঙ্‌ক্তিমালা। অ্যালেন গিন্সবার্গ এই সমাধি দর্শন করে আবেগ প্রবণ হয়ে লিখেছিলেন অ্যাপোলোনীয়রের সমাধি নামে এক অসাধারণ কবিতা। ভক্তদের ভিড় বাড়ছে এই শুদ্ধতম কবির স্মৃতিসন্ধানে, সেই সাথে বাড়ছে রঙ ঝলমলে ফুলের সংখ্যা।

রূপকথার সেরা গল্পকার অস্কার ওয়াইল্ডের সমাধির উপর শোভা পাচ্ছে বিশাল এক চৌকাকার স্থাপত্য। একপাশটায় পাথর কুঁদে-ছেনে বের করা হয়েছে উড়ন্ত দেবদূত, গাঢ় লাল লিপস্টিকে রমণীদের ঠোঁটের ছাপ। এক অন্ধ ভক্ত লিখে রেখেছে—‘এখানে শুয়ে আছেন পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ মানুষটি।’

এপিটাফ নিয়ে অল্পকিছু কথা তো হলো। আবারও বলি, কেন আমার কাছে মৃত্যুকে এক দীর্ঘ ঘুম মনে হয়। দু’বছর পর্যন্ত হয় নি আমার হার্টের তিনটি ব্লক ভাঙার জন্য রিং বসানো হয়। অপারেশন টেবিলে শোয়া আমি। আমার সাথে ডাক্তার দু’একটা কথা বলতে না বলতেই দক্ষ হাতে লোকাল এনেস্থিয়া কমপ্লিট। নিথর শরীরে ডাক্তাররা কাজ করছেন। মাথার উপর সেট করা কম্পিউটার মনিটরে নিজ হার্টের অপারেশনের সেই কাজগুলো লাইভ দেখছিলাম। ইউনাইটেড হাসপাতালে ড. মমিনুজ্জামান বেশ ভালো অপারেশন করলেন। তারও প্রায় সপ্তাহখানেক আগে মহাখালীর মেট্রোপলিটন ক্লিনিকে সোহরা্ওয়ার্দী হাসপাতালের ডা. মীর জামালউদ্দিন আমার শুধু এনজিওগ্রাম করলেন। তিনি বের করলেন—তিন তিনটা ব্লক সুন্দরভাবে ডেনজারাস পয়েন্টে। তখন টাকা জোগাড় ছিল না বলে রিং বসাই নাই। দু’বারই মূল অপারেশনের পর খানিকটা সময় অপারেশন টেবিল একা পড়েছিলাম। তখনও আমাকে আইসিইউতে সরিয়ে নেওয়া হয় নি। নরম্যাল অবস্থার মধ্যেই হঠাৎ বুকের মধ্যে দু’তিনবার মৃদু ধাক্কা খাই। তখন মনে হয় এবার একটু ঘুমোই। কী আশ্চর্য আচ্ছন্নতার ভিতর আমি টের পাই রহস্যময় অপার্থিবতা।


ঘুমাই বা না ঘুমাই, এতকালের জানাবোঝায় দেখেছি রবীন্দ্রনাথই আমাদের শক্তির উপলক্ষ, সান্ত্বনার আশ্রয়স্থল।


আমি পড়ে আছি খানিক আগেই মেরামত করা, সৃষ্টিকর্তার খেলনা মানুষের একটা বডির খোলের ভিতর। রুমের ভিতর নার্স-সিস্টার-আয়া-ব্রাদার সবাই যে যার মতন আপন কাজে মগ্ন। হাঁটাচলা করছে, কাজ করছে, কথা বলছে। মনে হয় অনেক দূর থেকে হাল্কাভাবে ভেসে আসছে তাদের কথাগুলি। আমার মোলায়েমভাবে ঘুমুতে ইচ্ছা করছে। এ যদি মরে যাওয়ার ব্যাপার হয়, কই কোনো যন্ত্রণা বা ভয় তো পাচ্ছি না। বুকের ভিতর একটি বা দুটি হালকা ধাক্কা। আমার ঘুম আসতে চায়। সিদ্ধান্ত নিতে পারি না জীবন কি তাহলে বিভিন্ন কলকব্জা ও কেমিস্ট্রি মিলিয়ে একটা ঠুনকো খেলনা? ডাক্তার বিগড়ে যাওয়া সেই খেলনাটিকেই খানিক আগে মেরামত করেছেন। নিজেকে বড় তুচ্ছ মনে হয়। এরকম আরেকবার হয়েছিল যখন সমুদ্রের কাছে প্রথমবার যাই। এজন্যই অপারেশন থিয়েটারে শোয়া অবস্থায় বারবার মনে পড়ছিল আমারই ‘তমিস্র আলো’ কবিতার কথা। শেষের আগের চরণটি হলো—‘আমার শরীর ঝোড়ো ঝঞ্ঝার পর/ পরিত্যক্ত লোকালয়।’ ভাবনা হয় ডাক্তার, ইন্টার্নিরা কি আমাকে পরিত্যাগ করে চলে গেছে, তাহলে আমি একা কেন? এই শূন্য বিরানভূমিতে ঘুম যদি আসেই আসুক, লোকালয় বা জনপদ যেখানেই কবর হয় হোক। এপিটাফে লেখা হলে খুশি হব—‘মৃত্যু, একটা দীর্ঘ ঘুমের নাম। এখানেই অবিরাম ঘুমায় কবি শেখ ফিরোজ।’

ঘুমাই বা না ঘুমাই, এতকালের জানাবোঝায় দেখেছি রবীন্দ্রনাথই আমাদের শক্তির উপলক্ষ, সান্ত্বনার আশ্রয়স্থল। তিনি লিখলেন সময়ের তুলনায় অভূতপূর্ব ও আধুনিকতম প্রেমের উপন্যাস শেষের কবিতা। আমি তার থেকে কিছুটা নিয়ে বলতে চাই। কিন্তু বলতে গিয়ে আমার ভিতরটা এত কাঁদছে কেন! বিশ্বাস করুন, আমি তা জানি না। আমি এত সব কাকে, কেনই বা বলছি।

আমি কি তাকেই বলছি!

‘‘হে বন্ধু, বিদায়।
মোর লাগি করিয়ো না শোক—
আমার রয়েছে কর্ম, আমার রয়েছে বিশ্বলোক।
মোর পাত্র রিক্ত হয় নাই,
শূন্যের করিব পূর্ণ, এই ব্রত বহিব সদাই।’’

Firoz ahmad

শেখ ফিরোজ আহমদ

জন্ম ১ আগস্ট ১৯৬৩, চাঁদপুর।
অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। পেশা : উন্নয়নকর্মী।

প্রকাশিত বই :
পাতকীর ছায়া [কবিতা, অন্তরীপ প্রকাশনী, বগুড়া, ১৯৮৭]
কালের পৃষ্ঠায় [প্রবন্ধ, যুক্ত, ঢাকা, ২০০৮]
মাতরিশ্বা [কবিতা, ভাষাচিত্র, ঢাকা, ২০১০]

ই-মেইল : firozbangla@yahoo.com
Firoz ahmad