হোম গদ্য মুক্তির জন্য কবিতা

মুক্তির জন্য কবিতা

মুক্তির জন্য কবিতা
106
0

‘কবিতা মুক্তির জন্য’—এ রকম একটা প্রস্তাবনা প্রতিপাদন করা যৌক্তিকভাবে প্রায় অসম্ভব। কারণ কবিতা জিনিসটা কোনো মতে বোঝানো সম্ভব হলেও ‘মুক্তি’ জিনিসটা কেমন গোলমেলে ধরনের। মুক্তি শব্দটির নানা রকম ভাষান্তর করার পরেও এর মাত্রাগত সমতার ধারণা যেমন পরিবর্তন হয় না, তেমন বহুমুখী ব্যাখ্যার দ্বারা তা স্পষ্ট করাও সহজ নয়। আবার একই সঙ্গে এর অর্থের শ্লেষাত্মক ও জটিল কোনোটেশন শ্রোতার পক্ষে বোঝা সম্ভব হয় না; যদি না বিষয় প্রস্তাবনার ক্ষেত্রে আগে থেকেই তারা একটি সাধারণ ধারণায় উপনীত হন। যেমন ‘মুক্তি’ শব্দটি একই সঙ্গে বেঁচে যাওয়া এবং মরে যাওয়ার মতো সম্পূর্ণ বিপরীতার্থের সঙ্গে দিব্বি মানিয়ে চলতে পারে। এ ক্ষেত্রে আমি একটি গল্প দিয়ে সূচনা করতে পারি—গল্পটি পারস্যের ধ্রুবযুগের কবি জালালউদ্দীন রুমির মসনবী শরীফে লেখা আছে। এক আরবীয় বণিক ভারতবর্ষে বাণিজ্যের উদ্দেশ্যে কাফেলা প্রস্তুতির আগে তার প্রিয়জনদের মনোবাসনা জানতে চাইলেন; এমনকি শেষ পর্যন্ত তার খাঁচায় বন্দি তোতাপাখিটিকেও জিজ্ঞাসা করলেন, সুদূর ভারত থেকে তার জন্য কিছু আনতে হবে কি-না। পাখি বলল, সওদাগর ভারতবর্ষের আকাশে তুমি অসংখ্য মুক্ত তোতাপাখি উড়তে দেখবে; পারো যদি তাদের কাছে জেনে এসো আমার মুক্তির উপায়।


যে জীবনে মৃত্যু সকল কীর্তিকে ঢেকে দেবে, সেই জীবনে লোভ ও প্রাপ্তির কোনো অর্থ হয় না।


বণিক সওদা শেষে ফেরার পথে একঝাঁক উড়ন্ত তোতাপাখি দেখে বলল, হে মুক্ত বিহঙ্গগণ তোমাদের গোত্রের একটি পাখি আরবের এক সওদাগরের খাঁচায় বন্দি হয়ে আছে; সে তোমাদের কাছে জানতে চেয়েছে তার মুক্তির উপায়। এই সংবাদটি শোনার সঙ্গে সঙ্গে দলের সবচেয়ে প্রবীণ পাখিটি শোকাহত হয়ে পাখা-ঝাঁপটিয়ে মাটিতে পড়ে মরে গেল। ফিরে এসে এমন একটি হৃদয়বিদারক খবর সে তার পোষা পাখিকে জানাতে চাইল না; তবু নাছোড় পাখিটির অনুরোধ সে উপেক্ষা করতে পারল না, সকল কাহিনি সবিস্তারে জানাল; পাখিটি এই ঘটনা শোনামাত্র শোকে ইহলীলা সাঙ্গ করল। শোকাহত বণিক পাখিটিকে মৃত ভেবে খাঁচার বাইরে ফেলে দিল; অমনি মৃত পাখিটি ডানায় ভর দিয়ে উড়ে যেতে যেতে বলল, সওদাগর, আসলে আমি মারা যাই নি, মরার ভান করে ছিলাম; আমার জ্ঞাতিরা তোমার মাধ্যমে বার্তা পাঠিয়েছে, আসলে মুক্তি পেতে চাইলে জীবনে মৃত্যুর মতো থাকতে হবে। এই বার্তা রবীন্দ্র-কাব্যের অসংখ্য চরণে ছড়িয়ে আছে। ‘মরণ রে তুহু মম শ্যাম সমান।’ ‘বাঁচিতাম সে মুহূর্তে মরিতাম যদি’ কিংবা ‘মরণকে মোর দোসর করে রেখে গেছ আমার ঘরে, আমি তারে বরণ করে রাখব পরাণময়/ তোমার তরবারি আমায় করবে বাঁধন ক্ষয়।’ ‘বৈরাগ্যসাধনে মুক্তি সে আমার নয়।’ ‘মুক্তি নানা মূর্তি ধরি’ আবার তিনি বলছেন, ‘মুক্ত করো মুক্ত করো নিন্দা প্রশংসার।’ কিংবা ‘আমি বহু বাসনা প্রাণপণে চাই/ বঞ্চিত করে বাঁচালে মোরে।’ রবীন্দ্রনাথ তার কাব্যে গানে, প্রবন্ধ নাটকে ‘মুক্তি’ শব্দটিকে কত মাত্রায় ব্যবহার করেছেন তার ইয়ত্তা নেই। এমনকি একটি গ্রন্থের নামই দিয়েছেন মুক্তির উপায়। এ ধরনের দ্বিরুক্তিবদাভাষ, এম্বিগুইটি, শ্লেষ, কটূক্তি, প্যারাডক্সে কখনো কবিতাকে গদ্যের সারল্যে প্রমাণ করা সম্ভব নয়। এমনকি যে গদ্যকে আমরা সরল বলে ধরে নিই তারও রয়েছে একটি বায়োনারি পজিশন। শ্রোতা কিংবা পাঠকের নিজস্ব জগতের মধ্য দিয়ে তা কেবল স্পষ্ট হতে পারে। বক্তা এবং শ্রোতার অবস্থান এ ক্ষেত্রে সম্পূর্ণ ভিন্ন হলেও ইতরবিশেষ হয় না।

বাংলা সাহিত্যের আদি কবিগণেরও কাব্যের বিষয় ছিল ‘নির্বাণে’র উপায়। যার অর্থ—মোক্ষলাভ, বিলয়, ক্ষয়প্রাপ্তি ইত্যাদি। আমরা জানি নির্বাণ শব্দটি এসেছে বৌদ্ধ ধর্ম পালনের পরম প্রাপ্তির ফল প্রকাশের নিমিত্তে। জীবনের জরা মৃত্যু, ভয় ও মাৎসর্য—থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য কপিলাবস্তুর রাজা শুদ্ধদোনের পুত্র ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠেছিলেন। গভীর অনুধ্যানে তিনি বুঝতে পেরেছিলেন—জগতে এসবই দুঃখের কারণ। সুন্দরী স্ত্রী যশোধারা, শিশুপুত্র রাহুল আর ভবিষ্যৎ সিংহাসনের মায়া ত্যাগ করে কোনো এক অমানিশায় তিনি গৃহত্যাগ করেছিলেন। আমাদের প্রশ্ন—কী তাকে বেঁধে রেখেছিল; আর কী-ই বা তাকে মুক্তি দিয়েছিল? নাকি মৃত্যুর ভয়াবহতা—একদিন আমি থাকব না—এই হাহাকার গৌতমকে পথে টেনে নিয়েছিল—গভীরভাবে উপলব্ধি করেছিলেন তিনি, যে জীবনে মৃত্যু সকল কীর্তিকে ঢেকে দেবে, সেই জীবনে লোভ ও প্রাপ্তির কোনো অর্থ হয় না। তাই জীবন ও জগৎ সম্বন্ধে তার এই বাণী তিনি কবিতাকারে লিখে চললেন, যার নাম দিলেন সূত্র ত্রিপিটক। এখানেই তিনি থেমে থাকলেন না, ঘর থেকে বের করে আনলেন অসংখ্য মানুষ, যারা মুক্তি পেতে চায়—তাদের বুদ্ধের সংঘে সভ্য করে নিলেন। যারা বুদ্ধ-রচিত কবিতা-গানেই নিজেদের ব্যাপৃত রাখলেন না, নিজেরাও রচনা করতে শুরু করলেন, অসংখ্য চর্যাচর্য, জাতকের কাহিনি; সমৃদ্ধ হয়ে উঠল সংস্কৃত-পালি সাহিত্য। তারই ধারাবাহিকতায় হাজার বছর আগে অপভ্রংশের যুগে বাংলা সাহিত্যও নির্মাণ করল তার উত্তরাধিকার—‘চর্যাচর্য-বিনিশ্চয়’। জার্মান নোবেল বিজয়ী ঔপন্যাসিক হেরমান হেস বিশ শতকে এসে এ রকম একটা কাহিনি অবলম্বন করে লিখলেন তার বিখ্যাত উপন্যাস সিদ্ধার্থ। কিন্তু আজ আমাদের জানতে ইচ্ছে করে সত্যিই কি গৌতম মুক্তি পেয়েছিলেন—জীবনের সংঘারাম থেকে—যেখানে স্থবির গলিত ব্যাঙ এক মুহূর্ত জীবনের ভিক্ষা মাগে। কোনটি তার জীবনের শ্রেষ্ঠ স্মৃতি হয়ে মরণ পাড়ে নিয়ে গিয়েছিল—শিশুপুত্র রাহুল, নাকি স্ত্রী যশোধরা কিংবা প্রবাজ্যা জীবনের নগর-নটী সুজাতা—মানুষের এসব গোপন ও ব্যক্তিগত জীবনের উপলব্ধি কেউ কখনো জানতে পারবে না।

সাহিত্যের এই আলোচনায় ফিরে যাওয়ার আগে আমি মুক্তির জন্য কবিতা শীর্ষক একটি সাধারণ আলোচনায় ফিরে যেতে চাই। কবি এবং কবিতার পাঠকদের কাছে আমার সবিনয়ে জানাবার আছে—কয়েক লক্ষ বছরের মানবযাত্রার ইতিহাসে কবিতা খুবই অর্বাচীন কালের সৃষ্টি; অন্তত প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে আমাদের কাছে তা-ই মনে হয়। কারণ কবিতা রচনার জন্য যে সুসাংগঠনিক ভাষার প্রয়োজন ছিল তার ইতিহাস বেশি পুরনো নয়। আসিরীয়-মিসরীয় সভ্যতার গিলগামেশ থেকে শুরু করে ভারতীয় সভ্যতার রামায়ণ মহাভারত বেদ-উপনিষদ কারো জন্মই পাঁচ হাজার বছরের বেশি নয়। এই সময়কালের মধ্যে মানুষের ভাষাপ্রতীক যোগাযোগের ইঙ্গিত-বহনের জন্য কিছুটা যোগ্য হয়ে উঠছিল; প্রাকৃতিক জগতের অপরাপর প্রাণীর চেয়ে ইতোমধ্যে তার শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণিত হয়েছে। সে তার এই জয়গাথা পরবর্তী প্রজন্মের কাছে রেখে যেতে চায়, কিংবা একদা সে থাকবে না—যে-সব নারী ও শিশুরা তাকে আনন্দ দিয়েছে—তাদের ছেড়ে একদিন চলে যেতে হবে; এইসব ব্যথা ও বেদনা তাকে কবিতার পথে নিয়ে এসেছে। অপরাপর প্রাণীদের মতো শারীরিক অস্তিত্বকে কেন্দ্র করে যদিও মানুষের জীবন, তবু তাকে মানব হয়ে উঠতে এক অবিনাশী চেতনা দ্বারা তাড়িত হতে হয়েছে। হয়তো সেই চেতনার বাণী রূপই ছিল কবিতা। তাই মানুষের সংগঠন যুগের কবিরা প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের লড়াই কিভাবে নিজেদের যোগ্য করে তুলেছিল—তারই কাহিনি বর্ণনা করেছেন। নানা রকম প্রতীক, রূপক ও মিথোলজির আশ্রয় নিয়ে সেই সব মানুষের কথা তারা বলেছেন—যারা জীবনযাপন করত প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় ঘনিষ্ঠতায়; এবং তখন তরুণ বসুমাতার সঙ্গে বৃক্ষরাজির পাশাপাশি সমুদ্র, ফুল ও পাহাড়-পর্বতের সঙ্গে মানবসন্তানদের ছিল আত্মিক যোগাযোগ। সভ্যতার অবদান হিশেবে আজ মানুষ প্রকৃতির সঙ্গে যে বৈরী সম্পর্ক গড়ে তুলেছে, তার প্রতিশোধ হিশেবে প্রকৃতিও তার সৈন্যসামন্ত নিয়ে বিপরীত আঘাতের জন্য ছুটে আসছে। যখন কবিরা এই সমূহ বিপর্যয় থেকে বাঁচার জন্য নতুন কাব্যভাষা আবিষ্কারের জন্য ব্যাপৃত। আমরা যেভাবেই বলি না কেন, কবিতা কোনো অবিনাশী সৃষ্টি নয় যে তার স্রষ্টা মানব না থাকলেও তা টিকে থাকতে পারে। উদাহরণ হিশেবে বলা যেতে পারে, যে বাংলা কাব্যের উত্তরাধিকার হিশেবে আমরা নিজেদের দাবিকে প্রতিষ্ঠা করেছি তার সর্বমোট বয়স এখনো হাজার বছর অতিক্রম করে নি। তা ছাড়া শিশুবাংলার শিশুভাষা নিঃসন্দেহে তার আধোআধো বোলে সমকালীন জীবনের জয়গান তুলে ধরেছিল—যারা নৌকা চালায়, যারা তুলো ধোনে, মদ চোলাই করে, তাদের জীবনের নিত্যব্যবহার্য ভাষার মাধ্যমে সমকালীন ধর্ম-আক্রান্ত চেতনাজগৎ তুলে ধরেছিল। এখন আমার প্রশ্ন এই যে মানুষের চিন্তার চিরন্তনতা, কবিতার কালোত্তীর্ণ হওয়ার কাহিনি—ভাষাবিহীন কিভাবেই বা প্রকাশিত হতে পেরেছিল। আসলে মানুষের চিন্তা ভাষাকে বাহন করে মুক্তি পেতে চায়।


কবি কেবল কবিতা, সংগীতেরই স্রষ্টা নন, সে সকল আইন ও সভ্য সমাজের প্রতিষ্ঠাতাও বটে।’


একটি পাখির বেঁচে থাকার বাসনা যেমন ডিমের আকার ধরে বেরিয়ে আসে, সেই ডিমের খোলস ভেঙে একটি পাখির ছানা যেভাবে মুক্তি পেতে চায়, মানুষের ইচ্ছার সন্ততিরাও ভাষার খোলসের মধ্যে কবিতার আকৃতি ধরে বেরিয়ে আসে। আমরা যাকে কবিতা বলি, তা আসলে কী তার সঠিক ব্যাখ্যা এখনো হয় নি। কবিতা বিশেষজ্ঞরা সর্বদা কবিতার কাঠামো বা তার বিষয় নিয়ে তর্ক করেছেন। আসলে কবিতা কি তাই! কবিতা এমন একটি সাংগঠনিক শক্তি, যার আকর্ষণে শব্দগুলো একত্র হয়ে যায়, নানা প্রান্তর থেকে বিষয়গুলো একত্র হওয়ার জন্য ছুটে আসে। যেভাবে বাষ্পের কণাগুলো মেঘরূপে একত্র হয়; বৃষ্টিরূপে বর্ষিত হয়; কিন্তু আমরা কেউ বলতে পারব না, ঠিক এটি কোন নদী বা সাগর থেকে এসেছিল; হয়তো আরব-কাস্পিয়ান সাগর ঘুরে বঙ্গোপসাগরের সাথীদের নিয়ে খেলাচ্ছলে কোনো এক গ্রামের কৃষকদের কষ্ট দেখে তাদের ধানের ক্ষেত্রে বর্ষিত হয়েছিল তারা। কবিতার মুক্তির কথা বললে, প্রথমেই বলতে হয় কবিতা কিসে মুক্তি পায়; মানুষের যেসব চেতনা, বোধ, উপলব্ধি, ধ্যান—বন্দি হয়েছিল মনের কন্দরে; দুঃখ ও আনন্দে অনুকূল বাতাসে ভাষাকে আশ্রয় করে বেরিয়ে এল সে; যেভাবে ডিম থেকে চঞ্চুতে কষ্ট নিয়ে ছানারা বেরিয়ে আসে; আপাত এই বেরিয়ে আসাকে মুক্তি মনে হলেও প্রকৃতপক্ষে সে বৃহত্তর বন্দিত্বের মধ্যেই পতিত হয়। তার চারপাশে অসংখ্য শিকারি জীবননাশের জন্য ওত পেতে আছে; একটু অসাবধানতায় হয়ে যেতে পারে কম্ম-কাবার। যে মুক্তির আনন্দ নিয়ে সে মায়ের উদরের তন্ত্রী কেটে ডিম্বকের আবরণ ছিন্ন করে বেরিয়ে এসেছিল; সেই মুক্তিটুকু ধরে রাখার জন্য কী প্রাণান্তকর পরিশ্রমই না করতে হয়। হয়তো কোনোভাবে সে জীবনকে শিকারির থাবা থেকে রক্ষা করে চলল; কিন্তু সময় নামের যে মহাশিকারি আমাদের ধরার জন্য ফাঁদ পেতে আছে—তার কবল থেকে কে কাকে রক্ষা করবে! তাই গীতায় শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলেছিলেন, ‘তুমি কাউকে হত্যা করতে পারো না, সময়ের গর্ভে সবাই নিহত হয়ে আছে, তুমি উপলক্ষ মাত্র।’ চার হাজার বছর আগেও কবিরা এই সত্য আবিষ্কার করেছিলেন; হয়তো আরো আগে এই মহান সত্য অবিষ্কার করেছিলেন; কিন্তু মহাভারত কিংবা রামায়ণের কবির আগে— এই সত্য প্রকাশের কবিতা-রূপের দাবি কেউ করতে পারে না। বেদব্যাস তার কাব্যে বৃহত্তর মানবজীবনের মুক্তির কাহিনি প্রকাশের চেষ্টা করেছিলেন তার মহাকাব্যের বৃহত্তর আয়োজনের মধ্যে; কিন্তু চূড়ান্ত বিচারে মানুষের শারীরিক ও আত্মিক মুক্তির আকাঙ্ক্ষাই ছিল তার কাব্যের মূল প্রধাবনা। আপাতভাবে আমাদের মনে হতে পারে—কৌরব ও পাণ্ডবদের রাজ্য দখলের লড়াই, রাজনীতির জটিল-কুটিল পরিস্থিতি এই কাব্যের প্রধান প্রধাবনা; কিন্তু বিচিত্র মানবজীবনের নানা চিন্তা, বহুমুখী কর্মকাণ্ড, লড়াই সংগ্রামের মহা-আয়োজন এক নিষ্পৃহ দৃষ্টিভঙ্গির মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয়েছে; অন্ধ্রধৃতরাষ্ট্রের একশত পুত্র এই মহারণে প্রাণ হারাচ্ছেন, কৌরব ও পাণ্ডব উভয় তার নিকট জ্ঞাতিদের যুদ্ধের ময়দানে হারিয়ে ফেলেছেন; যুদ্ধের বিজয়বার্তা প্রকাশের জন্য তারা অশ্বমেধযজ্ঞের আয়োজন করছেন; কিন্তু তারপর! সকল কিছু মিথ্যা প্রতিপন্ন করে মহাকালের দেবতারা সক্রিয় হয়ে উঠছেন। পরাক্রমশালী যোদ্ধাদের কাছ থেকে একে একে কেড়ে নেওয়া হচ্ছে অব্যর্থ মারণাস্ত্র—যেভাবে নিকুম্ভিলা যজ্ঞাগারে মেঘনাদকে নিরস্ত্র করা হয়েছিল। পঞ্চপাণ্ডবদের এখন একে-একে স্বর্গে যাওয়ার পালা। বিন্ধ্যাপর্বত পেরিয়ে মানুষের চিরন্তন ফেলে আসা রাজ্যে তারা যাত্রা করলেন; অথচ যুধিষ্টির ছাড়া কারো পক্ষে সশরীরের স্বর্গে যাওয়া সম্ভব হলো না। যুধিষ্টির যদিও ভ্রাতাদের মধ্যে জ্যেষ্ঠ—সকল রাজ্যপাটের বৈধ অধিকারী, তবু জীবনের এক নিষ্পৃহতা, সকল কিছুর প্রতি নির্মোহতা, ফলের প্রত্যাশাবিহীন কর্মযোগ তাকে এই মহান মুক্তি এনে দিয়েছিল। দ্রুপদী পঞ্চস্বামীর গর্বিতা স্ত্রী হয়েও সে সম্মান পান নি; কারণ পাঁচজন স্বামীর তিনি ভার্যা হলেও অর্জুনের প্রতি তার অন্তরের পক্ষপাত ছিল কিছুটা বেশি। আর এই লোভ তাকে জীবনের সার্বিক মুক্তি এনে দিতে ব্যর্থ হয়েছিল।

ঠিক একইভাবে গ্রিক মহাকবি স্কাইলাস অসহায় মানুষের মুক্তির জন্য প্রমিথিউসের অসহ্য যন্ত্রণাময় লড়াইকে গভীর মমতা দিয়ে অঙ্কন করেছেন। মানবসৃষ্টির আগেই প্রমিথিউসের ভাই এপিমিথিউস খামখেয়ালির বশবর্তী হয়ে সকল সৌন্দর্য ও টিকে থাকার ক্ষমতা দান করে ফেললেন জন্তু-জানোয়ারকে—শক্তি ও ক্ষিপ্রতা, সাহস ও ধূর্ততা, পশম ও পালক, ডানা ও খোলস—সকল কিছু তিনি দিয়ে দিলেন তাদের, মানুষের জন্য আর কিছুই বাকি থাকল না। তিনি বুঝতে পারলেন না মানুষ কী দিয়ে বিপদে আত্মরক্ষা করবে; তাই তিনি আহ্বান করলেন তার ভাই প্রমিথিউসকে; তিনি মানুষকে শ্রেষ্ঠতর করার উপায় খুঁজে বের করলেন, মানুষকে সাজালেন পশুদের তুলনায় মহত্তম অবয়বে—অনেকটা দেবতাদের মতো করে। তারপর তিনি সূর্যের কাছ থেকে একটি অগ্নিশিখা এনে মানুষের রক্ষা কবচ হিশেবে দান করলেন। কিন্তু প্রধান দেবতা জিউসের এটি পছন্দ হলো না। তাকে ধরে নিয়ে যাওয়া হলো ককেশাস পর্বতে; সেখানে শৃঙ্খলিত করে রাখা হলো; সারা দিন একটি ঈগল তার মাংস ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে খেত; তার হৃৎপিণ্ড ও যকৃৎ নিয়ে মেতে উঠত; রাতে পুনরায় প্রমিথিউসের শরীর পুনর্গঠিত হয়ে উঠত। জিউস তাকে বললেন—‘অনন্তকাল ধরে অসহনীয় বর্তমান তোমাকে নিষ্পিষ্ট করে যাবে; এবং যে তোমাকে মুক্তি দেবে তার জন্ম এখনো হয় নি; এই ফলই তুমি অর্জন করেছ তোমার মানবপ্রীতির পথে। একজন দেবতা হয়ে তুমি উপেক্ষা করেছ প্রধান দেবতার ক্রোধ; উপরন্তু মরণশীল মানুষকে দিয়েছ অভূত সম্মান। তাই তোমাকে ভোগ করতে হবে—বিশ্রামহীন-নিদ্রাহীন শাস্তি, আর্তনাদ হবে তোমার ভাষা, বিলাপ হবে তোমার শব্দমালা। আসবে রক্তে রঞ্জিত এক ঈগল, তোমার ভোজপর্বে সে-ই যোগ্য অতিথি, সারা দিন সে তোমার শরীরকে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করবে, তোমার কালো যকৃৎ হবে তার খেলার বিষয়।’ কিন্তু হুমকি বা নির্যাতনে, কোনো কিছুতেই ভেঙে পড়েন নি প্রমিথিউস। কারণ তার শরীর বন্দি থাকলেও তার আত্মা ছিল মুক্ত। ইস্কাইলাসের প্রমিথিউসকে আপাত দেবতা মনে হলেও এটা ছিল মানুষের সংগ্রাম ও টিকে থাকার কাহিনি; মানুষ এভাবেই আদিপৃথিবীতে মুক্তির সংগ্রাম করেছে; যে শক্তি এখন মানুষ হারিয়ে ফেলেছে—যার অর্থ ছিল দেবতা-দোসর বীর তার পরাজয় গাঁথা। ইস্কাইলাসের এই কাহিনিকে অবলম্বন করে আজ থেকে প্রায় ২০০ বছর আগে ইংরেজ রোমান্টিক যুগের বিদ্রোহী কবি পার্সি বিসি শেলি ‘প্রমিথিউস আন বাউন্ড’ নামে চার অঙ্কের একটি নাটক রচনা করেছিলেন। প্রমিথিউসের এই বন্দিদশাকে তার কাছে মনে হয়েছিল সমকালীন বন্দি মানবাত্মার কান্না। ফলে সেই কষ্ট থেকে মানুষ কিভাবে মুক্তি পেতে পারে তারই রূপকল্প হিশেবে তিনি প্রমিথিউসকে নায়ক হিশেবে বেছে নিয়েছিলেন। ফরাসি বিপ্লবের ফলাফল বিবেচনায় রেখে তিনি জুপিটারের মতো এক-নায়কের হাতে মানুষের অবিরত মার খাওয়া ও তার থেকে উত্তরণের আকাঙ্ক্ষাই ব্যক্ত করেছিলেন। পরবর্তীকালে ডব্লিউবি ইয়েটস শেলির এই নাটকটিকে পৃথিবীর এই ধারায় পবিত্র সৃষ্টিকর্মের একটি বলে অভিহিত করেন। শেলিই বলেছিলেন, ‘পোয়েটস আর দ্য আনঅ্যাকনলেজড লেজিসলেটর অব দ্য ওয়ার্ল্ড।’ তার ভাষায়, কবি কেবল কবিতা, সংগীতেরই স্রষ্টা নন, সে সকল আইন ও সভ্য সমাজের প্রতিষ্ঠাতাও বটে।’ প্রায় একই সময়ে ইলিয়াডের কাহিনি অবলম্বন করে লর্ড আলফ্রেড টেনিশন ‘ইউলিসিস’ রচনা করেছিলেন। আজও এই কাব্যটিকে ভিক্টোরিয়ান যুগে ইংরেজ জাতির মুক্তির আকাঙ্ক্ষা হিশেবে বিবেচনা করা হয়। এই কাব্যে টেনিশন রাজার ঐশ্বরিক দাবিকে অস্বীকার করেছিলেন। বলেছিলেন, সময় ও ভাগ্য আমাকে কাবু করতে পারে, কিন্তু আমার ইচ্ছাশক্তিকে কেউ পরাস্ত করতে পারবে না।

এই দুটি মহাকাব্যের মানবমুক্তি নিয়ে কবিদের যে উচ্চপদের ধারণা আলোচনা করা হলো তাও কিন্তু অবিমিশ্র মুক্তি হিশেবে বিবেচিত হয় নি। বিশেষ করে নারীবাদী লেখকরা এই দুটি মহাকাব্যের জব্বর সমালোচনা করতে পারেন এই বলে যে, মহাভারত এবং ইস্কাইলাসের কাহিনিতে নারীদের তেমন পাত্তা দেওয়া হয় নি; কিংবা উপেক্ষা করা হয়েছে। সেদিক দিয়ে এই মহাকাব্যদ্বয়কে নারীমুক্তির সপক্ষে বলা যায় না। যেমন মহাভারতের কবি ধ্রুপদীকে পাঁচ স্বামী দান করলেও নারীকে দেহের উপরে মুক্তি দিতে পারেন নি। যার ফল-স্বরূপ সে অর্জুনের মতো বীরভোগ্যায় সমর্পিতা এবং যুধিষ্টিরের মতো একজন পাশাখোরের আসক্তি চরিতার্থ করতে তার অন্যান্য সম্পদের মতো নিজেকে অপমাণিত হতে হয়েছে। অথচ সেই যুধিষ্টির সব কিছুকে অবলীলায় ফেলে—প্রিয়তম ভ্রাতাবর্গ ও প্রিয়তমা স্ত্রীকে পশ্চাতে রেখে সশরীরে স্বর্গে চলে গেল। স্বার্থবাদীরা চিরদিন এমনই হয়, কেবল নিজেরটা বুঝে নিতে পারলে—দুনিয়া রসাতলে যাক। ঠিক তেমনি প্রমিথিউসও মানুষ বলতে পুরুষ মানুষকেই বুঝতেন। তিনি পুরুষদেরই সুন্দর করে তৈরি করেছেন, তাদের জন্যই সূর্যের কাছ থেকে আগুন চুরি করেছেন। তাই জিউস পুরুষদের শাস্তি দিতে তৈরি করেছেন স্নিগ্ধ সুন্দর সলাজ নারী। তাকে উপহারস্বরূপ দেওয়া হলো মূল্যবান সামগ্রী, আর তার সঙ্গে কৌতূহলময় একটি প্যান্ডোরার বাক্স।পুরুষদের জন্য এই অপরূপ উপহারটি জিউস পাঠিয়ে দিলেন এপিমিথিউসের কাছে। নারী-পুরুষ মিলে ভালোই দিন কেটে যাচ্ছিল; নারীদের অদম্য কৌতূহল আর লোভী মনোবৃত্তির ফলে সে একদিন খুলে ফেলল পেন্ডোরার বাক্স; বেরিয়ে এল দুঃখ কষ্ট মহামারী—মানবজাতির অশুভ সব শক্তি; কিন্তু দেরি হয়ে গেছে, ততদিনে আর কিছুই করার নেই—এই অশুভ শক্তি নিয়েই পৃথিবীতে মানুষের বসবাস। সেমেট্রিক গ্রন্থগুলোতেও নারীদের অনেকটা একই আদলে সৃষ্টি করা হয়েছে। নারীবাদীদের এমন প্রশ্ন করা অস্বাভাবিক নয় যে, সত্যিই কি কবি এখানে অসহায় নারীদের মুক্তির ব্যাপারে উদাসীন ছিলেন? না-কি কালের রাজনীতি ও সামাজিকতার ঊর্ধ্বে উঠে তার পক্ষে আলাদা কিছু করা সম্ভব হয় নি?


প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের নারী-পুরুষের সম্পর্কের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে আদিকাল থেকেই একটি পার্থক্য রয়ে গেছে।


নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে সমসাময়িক পৃথিবীতে আরো দুটি মহাকাব্যের অবস্থান এখানে তুলে ধরা যেতে পারে; একটি হলো প্রাচ্যের মহাকাব্য ‘রামায়ণ’ অন্যটি প্রতিচ্যের ‘অডিসি’—এই দুটি কাব্যেরই কেন্দ্রীয় আখ্যান হিশেবে প্রাধান্য পেয়েছে দুটি নারী চরিত্র। একজন সীতা অন্যজন হেলেন। দুজনই বিবাহিত। একজন জনক রাজার কন্যা ও ভগবান রামচন্দ্রের স্ত্রী; অন্যজন জিউস ও লিডার কন্যা এবং মেনেলাউসের স্ত্রী। এই দুই নারীকেই অপহরণ করা হয়েছিল। রামচন্দ্রের ভাই লক্ষণ রাক্ষসরাজ রাবনের বোন শুর্পনখার প্রেম-প্রত্যাখান করে তার নাসিকা কর্তন করে দেওয়ার প্রতিশোধে সীতাকে পঞ্চবটী বন থেকে অপহরণ করে নিয়ে যাওয়া হয় লঙ্কাপুরীতে। স্ত্রী সীতাকে উদ্ধারের জন্য রামচন্দ্র যুদ্ধযাত্রা করেন। বিশাল সে যুদ্ধের আয়োজন—দেবতাদের নানা রকম কারসজি, আপন ভ্রাতা বিভীষণের বিশ্বাসঘাতকতায় পর্যুদস্ত রাবন, আর অপরদিকে ভাগ্যের আনুকূল্য জয়লাভ করেন অযোধ্যার রাজ্যহারা রাজা রামচন্দ্র। বনবাসের সময় শেষ হয়ে গেলে উদ্ধারকৃত স্ত্রীকে নিয়ে মহাধুমধামে রাজধানীতে ফিরে যান তিনি। কিন্তু অল্পদিনের মধ্যেই প্রজাদের মধ্যে কানঘুষা শুরু হয়ে গেল—রাবনের রাজপুরীতে সীতা তার সতীত্ব রক্ষা করতে পেরেছিলেন কি-না। তিনি যদি সতী হয়ে থাকেন তাহলে জ্বলন্ত চিতায় প্রবেশ করে দেখাতে হবে তার ভর্জিনিটির ক্ষমতা। কারণ ওই সমাজে হিন্দুদের লোকবিশ্বাস ছিল—প্রকৃত সতী নারীকে অগ্নি স্পর্শ করতে পারবে না। সীতার সতীত্ব প্রমাণিত হয়েছিল; কিন্তু লোক অপমানে, স্বামীর অবিশ্বাস ও নিস্পৃহতায় তিনি মাটির কন্যা মাটিতেই দেহ রেখেছিলেন। একদিন জনক রাজার হাল কর্ষণে মাটির নিরিখ থেকে যে মাটির কন্যা উঠে এসেছিল, সেই সর্বংসহা মাটিতেই তিনি বিলীন হয়ে গেলেন। এরই ধারাবাহিকতায় হিন্দু রমণীদের চলেছে মৃত স্বামীর চিতায় নিজেকে জ্বলন্ত আত্মহুতি দেওয়া। আর এই ভয়াবহ অন্যায় থেকে নারীকে রক্ষার জন্য মূলত উনিশ শতকে লেখকরাই এগিয়ে এসেছিলেন। অপর দিকে ট্রয়নগরীর পতনের পরে হেলেন মেনেলাউসের কাছে ফিরে গিয়েছিলেন। তারা আবার স্বামী-স্ত্রী হিশেবে সংসার-যাপন করতে লাগলেন; হেলেন ধর্ষিত হয়েছে জেনেও, প্রায়ামের সঙ্গে একত্রে থাকার পরেও তার চরিত্র বিষয়ে হোমার কিংবা ইউরিপিদিসের কাব্যে কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করা হয় নি; কিংবা সতীত্বের পরীক্ষা দিতে হয় নি। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের নারী-পুরুষের সম্পর্কের দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে আদিকাল থেকেই একটি পার্থক্য রয়ে গেছে। কিন্তু নারীর প্রতি দৃষ্টিভঙ্গির ক্ষেত্রে এই দুই মহাকবির মধ্যে পার্থক্য ছিল সামান্যই; কারণ চরিত্র হিশেবে মহাকাব্যের বিশাল আয়োজনের কাছে তাদের ভূমিকা অনুল্লেখ্য। তা ছাড়া এই দুই মহাকাব্যেই এই দুই নারীকে নানা গঞ্জনা সহ্য করতে হয়েছে; তবু যুদ্ধের জন্য তাদের দোষ সামান্যই; পুরুষের বহুভোগ্য মানসিকতা এবং রাজ্য বিস্তারের আকাঙ্ক্ষাই তাদের যুদ্ধের পথে ঠেলে দিয়েছিল; অথচ তার খেসারত দিতে হয়েছে—নারী ও শিশুদের। ট্রয়ের সকল কিছু যখন ধুলায় লুণ্ঠিত—কোনো কিছু অবশিষ্ট নেই; হেক্টর ও প্যারিসের মা রানি হেকুবাকে যখন বন্দি করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে তখন তিনি বলছেন—‘এমন কী দুঃখ আছে যা আমার নয়? হারিয়েছি স্বদেশ, স্বামী এবং সন্তান-সন্ততি; আমার গৃহের সকল গৌরব হয়েছে ভূলুণ্ঠিত।’ তার সঙ্গে বন্দি সহ-নারীরা তখন বলছে—‘একই যন্ত্রণায় পুড়ছি আমরাও, আমরাও ক্রীতদাসী, আমাদের সন্তানরা ক্রন্দনশীল, অশ্রুসিক্ত হয়ে ডাকছে আমাদের।’ আদিকাল থেকে কবির চোখ এই বিসদৃশ দৃশ্য এড়িয়ে যায় নি। এই অন্যায় নিপীড়নের চিত্র নিখুঁতভাবে তুলে ধরেছেন কবি; মুক্তি পেতে চেয়েছে লোভী ও যুদ্ধবাজ নৃপতিদের আক্রোশ থেকে।

প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের যে চারটি মহাকাব্যের উদাহরণ আমি নিয়ে এলাম, তা মোটেও বিষয়ের জন্য অপ্রাসঙ্গিক এবং পুরনো নয়। কারণ মানবজাতির এই অভিজ্ঞতা ও প্রকাশের উত্তুঙ্গতা এখনো পৃথিবীর সকল প্রান্তরের কবিরা ধারণ করে আছেন। তাদের কাহিনি নানামাত্রায় আবর্তিত ও বর্ধিত হয়ে সমকালের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিচ্ছে। যেমন মধ্যযুগের বাংলাকাব্যের মুক্তি ঘটেছিল—প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের এইসব মহাকাব্যের মাধ্যমে। উনিশ শতকের মধ্যপর্বে এসে মাইকেল মধুসূদন দত্ত রামায়ণের কাহিনি অবলম্বন করে লিখলেন, মেঘনাদবধকাব্য আর অডিসি অবলম্বনে লিখলেন, হেক্টরবধকাব্য—সংখ্যাতত্ত্বের হিশাব যাই হোক না কেন, মধুসূদনের কাব্য আপাত ভারতীয়-বাঙালীয় মনে হলেও তার সকল কাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে পাশ্চাত্যের এই সব কাব্যের আদলে। কাঠামোর বন্দিত্ব স্বীকার করে নিলেও মধুসূদন এক নতুন যুগের কাব্য রচনায় সক্ষম হয়েছিলেন; যার ফলে বাংলা ভাষাছন্দ ও বিষয় ছয় শ বছরের নিগড় ভেঙে মুক্তি পেয়েছিল। তিনি নতুন যুগের বার্তা বহন করে আনলেন, দেবতাদের জয়গানের বদলে মানবের মাহাত্ম্য দান করলেন। রাক্ষস রাবনকে বানালের মানুষের সুখ-দুঃখ প্রেম-রিরংসার আধার করে, আর দেবতা রামকে করলেন অন্যের দেশ আক্রমণকারী হীন-কাপুরুষ হিশেবে। ইংরেজ দখলদারির বিরুদ্ধে তিনিই প্রথম রূপকার্থে সোচ্চার হয়ে উঠেছিলেন; পুত্র বীরবাহুর মৃত্যুতে রাবন বলেছিলেন—‘জন্মভূমি রক্ষাহেতু কে ডরে মরিতে?/ যে ডরে, ভীরু সে মূঢ়; শত ধিক্ তারে!’ রাবনের কষ্ট ও লঙ্কাপুরীর বিপর্যস্ততা বাংলা কাব্য পাঠককে নাড়িয়ে দিয়ে গেল। প্রায় একই সময়ে হেমচন্দ্র রাজপুতানি পদ্মিনীর উপাখ্যানে বলেছিলেন, ‘স্বাধীনতা হীনতায় কে বাঁচিতে চায় হে।’ কাব্যের চিরন্তনতা এখানেই—মানুষের শারীরিক যন্ত্রণা এক, কিন্তু যুগযন্ত্রণা আলাদা। মানুষের একটি শ্রম থেকে অন্য শ্রমে যাওয়া; কৃৎকৌশলের পরিবর্তন—তাকে মারণাস্ত্রের জগতে আলাদা করে উপস্থাপনের আপতকৌশলে ভিন্ন মনে হলেও মানবযাত্রার ইতিহাসে কম পরিবর্তনই হয়েছে। কিন্তু শিকার যুগের কলাকৌশল, কৃষিযুগের সমাজ কাঠামো, শিল্প ও ডিজিটাল যুগের উপাদান দিয়ে ব্যাখ্যা করা মুশকিল।

যেমন বাংলার মধ্যযুগের কবিরা প্রায় ছয় শ বছর ধরে একই ধারায় কাব্য রচনা করে চলেছিলেন। কারণ, কৃষি ও শিকারযুগের পরিবর্তন রাতারাতি সাধিত হয় নি। একই ধরনের ভয় ও শঙ্কা, টিকে থাকার লড়াই ছিল তাদের অব্যাহত। তাদের আকাঙ্ক্ষায় থাকত প্রকৃতিকে জয়, ভালো আবহাওয়া, রোগ মহামারী থেকে বেঁচে যাওয়া, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য দুধভাতের স্বপ্ন, সন্তান বাৎসল্য, নারীর প্রতি প্রেম, আর সামাজিক জাতপাত থেকে মুক্তি—এসবই ছিল মধ্যযুগের কবিদের কাব্যের বিষয়। সমকালীন মুক্তির ধরন—এর চেয়ে বেশি করে কল্পনায় আনা তাদের পক্ষে সম্ভব ছিল না। মঙ্গলকাব্যের কবিরা যখন মনসামঙ্গল লিখছেন, তখন সাপের দেবীকে তুষ্ট করাই তাদের একমাত্র উদ্দিষ্ট—যাতে সাপের কামড় থেকে তার প্রজন্ম রক্ষা পেতে পারে; শীতলামঙ্গল, উলামঙ্গল লেখা হচ্ছে বসন্ত ও কলেরার মহামারী থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য, অন্নদামঙ্গল লেখা হচ্ছে ক্ষুধা থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য। সুতরাং একটি সাধারণীকরণ করা সম্ভব যে, কবিরা সর্বদা মুক্তির জন্য কবিতা রচনা করে থাকেন। এর পাশাপাশি বাংলার মধ্যযুগের কবিরা শ্রীচৈতন্যের প্রভাবে বৈষ্ণব ভাবকাব্যের বন্যা বইয়ে দিয়েছিলেন। শ্রীচৈতন্যের এই আন্দোলন ছিল মূলত হিন্দুর দীর্ঘদিনের জাতপাতের শৃঙ্খল থেকে বেরিয়ে আসা। তিনি লক্ষ করেছিলেন, সুলতানি আমলে মুসলমান প্রভাবে অনেক হিন্দু সামাজিক ভেদনীতির ফলে ধমান্তরিত হচ্ছিল। এই সমূহ বিপদ থেকে রক্ষার জন্য তিনি বললেন, ‘মুচি হয়ে শুচি হয় কৃষ্ণ নাম জপে।’ এসব ক্ষেত্রে মুক্তি সব সময় আপেক্ষিক। কাজী নজরুল ইসলাম যখন ব্রিটিশের কবল থেকে ভারতবর্ষের মুক্তির জন্য কাব্য রচনা করছেন; তখন একই সময় ভারতে জন্মগ্রহণকারী ইংরেজ কবি রুডিয়ার্ড কিপলিং ভারতে ইংরেজ শাসন টিকে রাখার জন্য কবিতা রচনা করছেন। নজরুল বলছেন, ‘মুক্ত বিশ্বে কে আর অধীন? স্বাধীন সবাই আমরা ভাই। / ভাঙিতে নিখিল অধীনতা-পাশ মেলে যদি কারা, বরিব তাই।’ মুক্ত বা স্বাধীন থাকার কী পরিহাস, যা নজরুলের কাব্যে প্রকাশিত হয়েছে। অর্থাৎ কেউ যখন মনে স্বাধীন থাকতে চাই, তখন বাইরের স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়। শান্তিতে নোবেল জয়ী তুর্কি কবি নাজিম হিকমাত তার ‘এ স্যাড স্টেট অব ফ্রিডম’ কবিতায় নজরুলের মতোই স্বাধীনতা বা মুক্তির এক ভয়াবহ চিত্র তুলে ধরেছেন; বলছেন, তুমি তোমার দেশকে ভালোবাস; দেশের স্বাধীনতা চাও; আর এর জন্য তুমি শত্রুপক্ষের কাছে ধরা পড়লে এবং তোমার ফাঁসি হয়ে গেল। আর তাতে তুমি চিরদিনের জন্য মুক্ত হয়ে গেলে। পৃথিবীতে এও এক প্যারাডক্স, কষ্টময় স্বাধীনতা। আরেকজন আরব বংশোদ্ভূত কবি কাহালিল জিবরান বলছেন, তুমি তোমার স্বাধীনতাকে স্বাধীন রেখো, তুমি তোমার নিজের স্বাধীনতারই কেবল উপাসনা করো; এমনকি যখন কোনো স্বৈরাচারের খড়গের তলে তোমার মাথা কাটা যাবে, তখনো একজন ক্রীতদাসের মতো কেবল নিজের স্বাধীনতার কাছেই অবনত হও। অদূর অতীতে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের নিয়ে অসংখ্য গান-কবিতা রচনা করেছেন এ দেশের কবিকুল। কিন্তু মুক্তির কবিতা কেমন হবে তার সঠিক কোনো দিক নির্দেশনা নেই। কেবল প্রীতি ও ভালোবাসার কবিতা হয়ে যেতে পারে মুক্তির কবিতা। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের কালেও লক্ষ করা গেছে নানা উদ্দীপনাময় কবিতার পাশাপাশি জীবনান্দ দাশের রূপসী বাংলা এক অনন্য আবেগ সৃষ্টিতে কাজ করেছিল।


কবিতা ও মুক্তি একই সঙ্গে চলতে পারে না।


আসলে মুক্তি মানে ভালোবাসা। আমরা ভালোবাসার মানুষের কাছে যেতে চাই। আমরা তাকে খুঁজে বেড়াই। কিন্তু কায়াময় জীবনে তাকে পাওয়া যায় না। এসব কথাই এ দেশের বাউল কবিরা বলেছেন। ঘর থেকে বেরিয়ে পড়েছেন। দেহের চৌহদ্দির মধ্যে দেহাতীতের সন্ধান করেছেন। কিন্তু সেই মুক্ত পাখিকে মুক্ত করে রাখার মধ্যে সুখ নেই; তাই লালন বলেছেন, ‘ধরতে পারলে মনোবেড়ি দিতাম পাখির পায়।’ এখন দেখা যাচ্ছে প্রিয়জনকে সবাই মুক্তি দিতে নারাজ; প্রিয়জনকে সবাই নিজের কাছে ধরে রাখতে চায়। এই চাওয়া যতক্ষণ উভয় পক্ষের ভালোবাসায় সংগঠিত হয়, ততক্ষণ এই বন্দিত্বকে মুক্তি হিশেবে বিবেচনা করা হয়। সুতরাং বন্দিত্ব ও মুক্তি আপাত বিরোধাত্মক মনে হলেও দুটিতে রয়েছে দারুণ মিল; সূর্য পৃথিবীকে ছেড়ে দিলে, পৃথিবী চন্দ্রকে ছেড়ে দিলে যেমন সর্বত্র গোল বেঁধে যাবে, তেমনি ভালোবাসার মানুষ মুক্তি দিয়ে গেলে প্রেমিক হয়ে যাবে গোলমেলে মজনু—অর্থাৎ বন্ধন ছেড়ে দিলেও মুক্তি হয়ে যায় সুদূর পরাহত। মুক্তি আসলে একটি সঠিক কেন্দ্রের ধারণা । কেন্দ্রচ্যুতি হলে মুক্তি ব্যাহত হয়, এমনকি অস্তিত্বের সংকটও তৈরি হতে পারে। কবি কখনও সে মাত্রাকে অতিক্রম করে না। এমনকি সে তার কবিতা গঠনের ক্ষেত্রেও একটি ছন্দময় নিয়ম মেনে চলে। ছন্দ থেকে কবিতাকে মুক্তি দিলেও অন্য একটি নিয়মের মধ্যে সে প্রবিষ্ট হয়।

পৃথিবীতে মানুষের কাঙ্ক্ষিত ও যাচিত মুক্তি সম্ভব নয়; মুক্তি এখানে সাপেক্ষে রচিত। তাই মুক্তির জন্য একক কোনো সংজ্ঞা রাখা হয় নি। হরিচরণের বঙ্গীয় শব্দকোষে তাই এর বিবিধ অর্থ রাখা হয়েছে। অর্থগুলো হলো : ১. স্বাধীনতা ২. পরিত্রাণ ৩. মোক্ষ ৪. অবসান ৫. হিন্দুমতে জীবজন্ম পরিগ্রহ থেকে অব্যাহতি ৬. নিষ্কৃতি ৭. অবরোধ বা বন্ধন হতে মুক্তি।

কবিরা এর সকল অর্থকে কবিতায় গুরুত্ব দিয়েছেন। তবু মোদ্দাা কথা, কবিতা ও মুক্তি একই সঙ্গে চলতে পারে না। আর চলতে হলে জীবনকে কারাগারে বা খাঁড়ার তলে বন্দি রেখেই কবিতা রচনা করতে হবে। কারণ রুটির বিনিময়ে ঈশ্বর আমাদের স্বাধীনতা কিনে নিয়েছেন; আর ঈশ্বরের রুটির পারমিট দখল করে রেখেছে সরকার ও তাদের এজেন্টরা। তবু মানুষের মন কবিতা, সংগীত ও নৃত্যের আধার; শুষ্ক কাষ্ঠখণ্ডের মধ্যে, একটি ধাতব একতারার মধ্যে যে কান্না বন্দি হয়ে থাকে ভালোবাসার স্পর্শে মানুষ তার ভেতর থেকে সুরের মুক্তি দিয়ে থাকে। যতদিন কবিতা থাকবে ততদিন সুর থাকবে, যতদিন মানুষের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা থাকবে, ততদিন মানুষ কবিতা লিখবে। ভাষা দিয়ে সেই মুক্তির সৌন্দর্য হয়তো সব সময় ব্যাখ্যা করা যাবে না; তখন সন্ত কবি কবীরের মতো বলতে হবে—

কথার ফাঁদে মুক্তি নাই কো
মুক্তি আছে ভক্তিতে
চতুরতা-ত্যাগ প্রেমকে ধরো
মুক্তি মিলবে সেই তাতে॥

মজিদ মাহমুদ

মজিদ মাহমুদ

জন্ম ১৬ এপ্রিল ১৯৬৬, পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার চরগড়গড়ি গ্রামে। এম.এ (বাংলা), ১৯৮৯, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। লেখালেখি ঠিক রেখে কখনো সাংবাদিকতা, কখনো শিক্ষকতা; আর পাশাপাশি সমাজসেবা।

প্রকাশিত বই:
কবিতা—
মাহফুজামঙ্গল (১৯৮৯), গোষ্ঠের দিকে (১৯৯৬), বল উপখ্যান (২০০০), আপেল কাহিনী (২০০১), ধাত্রী ক্লিনিকের জন্ম (২০০৫), নির্বাচিত কবিতা (২০০৭), কাঁটাচামচ নির্বাচিত কবিতা (২০০৯), সিংহ ও গর্দভের কবিতা (২০১০), শ্রেষ্ঠ কবিতা (২০১১), দেওয়ান-ই-মজিদ (২০১১), গ্রামকুট (২০১৫), কবিতামালা (২০১৫)।

প্রবন্ধ ও গবেষণা—
নজরুল তৃতীয় বিশ্বের মুখপাত্র (১৯৯৭), কেন কবি কেন কবি নয় (২০০১), ভাষার আধিপত্য ও বিবিধ প্রবন্ধ (২০০৫), নজরুলের মানুষধর্ম (২০০৫), উত্তর-উপনিবেশ সাহিত্য ও অন্যান্য (২০০৯), রবীন্দ্রনাথের ভ্রমণ-সাহিত্য (২০১১), সাহিত্যচিন্তা ও বিকল্পভাবনা (২০১১), রবীন্দ্রনাথ ও ভারতবর্ষ (২০১৩), নির্বাচিত প্রবন্ধ (২০১৪), সন্তকবীর শতদোঁহা ও রবীন্দ্রনাথ (২০১৫), ক্ষণচিন্তা (২০১৬)।

গল্প-উপন্যাস—
মাকড়সা ও রজনীগন্ধা (১৯৮৬), মেমোরিয়াল ক্লাব।

শিশু সাহিত্য—
বৌটুবানী ফুলের দেশে (১৯৮৫), বাংলাদেশের মুখ (২০০৭)

সম্পাদনা—
বৃক্ষ ভালোবাসার কবিতা (২০০০), জামরুল হাসান বেগ স্মারকগ্রন্থ (২০০৩); পর্ব (সাহিত্য-চিন্তার কাগজ)

অনুবাদ—
অজিত কৌড়ের গল্প (২০১৬), মরক্কোর ঔপন্যাসিক ইউসুফ আমিনি এলালামির নোমাড লাভ এর বাংলা অনুবাদ ‘যাযাবর প্রেম’

ই-মেইল : mozidmahmud@yahoo.com
মজিদ মাহমুদ