হোম গদ্য মিডিওক্রিটি ও সাহিত্যে জনপ্রিয়তার রাজনীতি

মিডিওক্রিটি ও সাহিত্যে জনপ্রিয়তার রাজনীতি

মিডিওক্রিটি ও সাহিত্যে জনপ্রিয়তার রাজনীতি
585
0

সাহিত্য—এমন রচনা যার আক্ষরিক সত্যতা নাই, যদিও তা আক্ষরিক। এই আক্ষরিকতাকে সংজ্ঞায় ফেলা প্রায় অসম্ভব,—সাহিত্যের একক কোনো সংজ্ঞা হয় না। চর্যাপদ থেকে শুরু করে শ্রীকৃষ্ণকীর্তন, বৈষ্ণবপদাবলী, আলাওলের সৃষ্টিসমূহ, শ্রীরামপুর মিশনের ধর্মীয় নসিহত ইত্যাদি পর্ব পেরিয়ে বিদ্যাসাগরের রচনাবলী, মধুসূদনের কাব্য, বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাস, রবীন্দ্রনাথের রচনাবলী, সৈয়দ ইসমাইল হোসেন সিরাজী, মীর মশাররফ হোসেন, শরৎচন্দ্র, নজরুল জীবনানন্দ, তারাশংকর, মানিক, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, আবু ইসহাক, শামসুর রহমান, আল মাহমুদ এদের বহুমুখী লেখা, নানাজনের আত্মজীবনী, কাব্যবিষয়ক সন্দর্ভ, প্রবন্ধ, পত্রাবলি—সবকিছুই বাংলা সাহিত্যের অন্তর্ভুক্ত।

এসবের কিছুই সাহিত্যকে সংজ্ঞায়িত করে না। সাহিত্য সাধারণের ভাষাকে রূপান্তরিত করে নেয়, পাল্টে নেয় নিজের প্রয়োজনে। রুশ সমালোচক ইয়াকবসনের মতে, সাধারণ ভাষার উপর সংঘটিত সংগঠিত বলাৎকারই সাহিত্য। অর্থাৎ সাহিত্যে এসে ভাষা সাধারণের মৌখিক ভাষা থেকে আলাদা হয়ে যায়। আলাদা হয়ে যায় বলেই প্রসঙ্গ আসে সাহিত্যের মান ও ভাষা নিয়ে। কারণ মৌখিক ভাষার কোনো ত্রুটি নাই। জনগণের ভাষা ত্রুটিহীন, দূষণমুক্ত।


পুঁজির ধর্মই সব কিছু ছাপিয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠা। বর্তমান আর্থনীতিক ব্যবস্থাপনায় সাহিত্যও পুঁজির আওতাধীন।


জিজ্ঞাসা আসবে, তাহলে সাহিত্যের ভাষা কোনটি? আর সেই মানই বা কারা নির্ণয় করবে? এর সহজ উত্তর যুগে যুগে সাহিত্যের ভাষা পাল্টে গেছে। পাল্টেছে এর সৃষ্টির উদ্দেশ্যও। যেমন চর্যাপদ সৃষ্টির অন্তত দুটি উদ্দেশ্য বর্তমানে আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে ধরা দেয়—সংসার ও যাপিত জীবনের সংবদ্ধ প্রকাশ এবং নির্বাণ বা মোক্ষপ্রাপ্ত হবার সাধনা। তবে চর্যাকার যারা ছিলেন প্রকৃত তথ্য তাদেরই জানা। কিন্তু তাদের সৃষ্ট রচনাবলী থেকে উদ্দেশ্য খুঁজে নিতে কষ্ট হয় না। দুর্ভোগ যা পোহাতে হয়েছে তা কেবল সেইসব রচনার অর্থোদ্ধার করাতেই। যাই হোক, সাহিত্যের ভাষাপ্রসঙ্গে পরে আরও কিছু কথা বলা যাবে।

চর্যা এবং তৎপরবর্তী বাংলা সাহিত্যের যে-ধারা সেখানে দেখা যায় মানুষের জীবনাচরণের সাথে ধর্মের রয়েছে আত্যন্তিক সম্পর্ক। তারই প্রকাশ দেখা যায় সাহিত্যে। বলতে পারি, বাঙালি জনগোষ্ঠীর আচরিত ধর্ম সাহিত্য সৃষ্টির পেছনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। তার প্রমাণ পাওয়া যায় আরাকান রাজসভার কর্মকাণ্ডেও। আর ইংরেজ শাসনামলে শ্রীরামপুর মিশনের কর্মকাণ্ড সবকিছু পরিস্ফুট ও সহজে অনুধাবনযোগ্য করে দেয়।

সামন্তযুগ পর্যন্ত কবি, সাহিত্যিকদের মুখে তাদের নিজের কথা শোনা যায় নি। সামন্তযুগের ভাঙনের কালে প্রথম আমরা সাধারণ মানুষের কথা শুনি ঈশ্বর পাটনী তথা ভারতচন্দ্রের মুখে—আমার সন্তান যেন থাকে দুধেভাতে। এই অমোঘ উচ্চারণের ভেতর দিয়ে বাংলা সাহিত্যের মুক্তি ঘটে মধ্যযুগের চিন্তা থেকে, সাধারণ মানুষের জীবন উপজীব্য হয়ে ওঠে সাহিত্যের। এরপরই ক্রমাগত আসতে থাকে জীবন আর জীবনের দুর্ভোগ, সৌন্দর্য আর ব্যর্থতা ও সফলতার উপাখ্যান।

সেইসব উপাখ্যান মানুষ কেন পাঠ করবে? জীবনধারণের নিষ্প্রাণতা, কর্কশতা আর নিতান্ত দৈহিক প্রয়োজন মানুষকে উচ্চ চিন্তা করতে দেয় না। অর্থনীতিক সংগ্রাম, স্বার্থ, লাভ-লোকসানের হিশাব কষেই মানুষকে চলতে হয়। তার জীবনে নির্মল আনন্দ নাই, নাই সোনালি সময়। অবসর মোটেই মেলে না। ব্যর্থতা আর গ্লানির লজ্জা ঘুচিয়ে তবু মানুষ খুঁজে ফেরে কাঙ্ক্ষিত মোকাম। সাহিত্য তেমনই এক ঠিকানা। যখন তার দর্শন পেয়ে যায় সে গেয়ে ওঠে : জীবনের অর্থ আছে, তার অন্বেষণে মেলে সোনা আর রূপা।

নিটশে বলেছিলেন :

আমরা যা এবং যেসব কিছুর সম্পর্কেই আসি না কেন চাই প্রতিনিয়ত সব কিছুকে আলোকোজ্জ্বল ও দীপ্ত করে তুলতে—আমাদের কাছে তাই জীবন।

তার মানে দাঁড়াচ্ছে দৈনন্দিনতা আর অন্নবস্ত্র চিন্তার সর্বত্রব্যাপীতা থাকা সত্ত্বেও যা যাপন করি তাই মুখ্—জীবন। তাকেই করতে হবে উপভোগ্য আর আনন্দঘন। সাহিত্য তারই উপলক্ষ।

পুঁজিবাদী সমাজে যে কোনো উপলক্ষকেই পূর্ণতা দিতে গেলে প্রয়োজন অর্থের। গোটেনবার্গের ছাপাখানা আবিষ্কারের পর সাহিত্য দ্রুত বিস্তার লাভ করেছিল। সেটা কেবল বিজ্ঞানের সাফল্য নয়, ছিল পুঁজির বিনিয়োগও। আর পুঁজির ধর্মই সব কিছু ছাপিয়ে নিজেকে প্রতিষ্ঠা। বর্তমান আর্থনীতিক ব্যবস্থাপনায় সাহিত্যও পুঁজির আওতাধীন। কাজেই বিনিয়োগ সাহিত্যেরও এক অনিয়ন্ত্রিত ফেনোমেনন। একে স্বীকার করেই সাহিত্য ও এর আলোচনা এগিয়ে নিতে হয় আজকাল।এইসব কথা মাথায় রেখে বলতে হয়, তাহলে গ্রন্থ আমাদের জন্য কী করে? এর গুরুত্ব কোথায়? গোর্কি বলেন :

আমার মধ্যে উৎকৃষ্ট যা কিছু আছে তার জন্য আমি বইয়ের কাছে ঋণী।

বইয়ের গুরুত্ব বুঝতে এরচেয়ে উত্তম কথা আর হয় না। উত্তম সাহিত্যকর্ম আমাদের চিন্তার বিকাশ ও বিস্তার ঘটায়। আমাদের চারিত্র‍্যে সাযুজ্য আনয়ন করে এবং মনকে পরিশুদ্ধ করে সৌন্দর্যের লালিত্যে।

প্রসঙ্গে ফেরা যাক। মিডিওক্রিটি নিয়ে কথা তুলতে চাইছিলাম। সেটা কী বস্তু তার জবাব দেয়া চাই। তার আগে বলে নিই, সংজ্ঞায়ন করতে যাচ্ছি না কিছু। বিচারও বসাই নি। শুধু যা অনুভব করি, যাতে আবেগের সমর্থন আছে তাই বলব। কিন্তু তাই বলে আবেগকে যুক্তিসিদ্ধ করতে যাচ্ছি না। বরং যুক্তিই লাভ করবে আবেগের স্বীকৃতি। মিডিওক্রিটি নিয়ে কথা বলতে গেলে আগে বুঝে নিতে হয় পাঠকের মনোবৃত্তি। কেন? সেই আলাপও সেরে নিতে চাই।


সাহিত্য যতই বিনোদন কিংবা আনন্দের উপলক্ষই হোক তাকে ক্ষমতা-নিরপেক্ষভাবে পাঠের সু্যোগ নাই।


পাঠকের রুচি গড়ে ওঠে তার পারিপার্শ্বিক অবস্থার আলোকে। যদি জানতে চান, আজকের বাঙালি পাঠক কী পাঠ করছে। এর উত্তরে বলব, তার পূর্বপুরুষ যা পাঠ করেছে তাই!

এতে হয়তো মিডিওক্রিটি কী তার জবাব মেলে নাই। কিন্তু জিজ্ঞাসার জবাব খুঁজতে পাঠকের রুচিশীলতা নিয়ে কথা বলা লাগবেই। পাঠাভ্যাস কিভাবে গড়ে ওঠে তা জানার ভেতর দিয়েই বুঝে নেয়া চাই জবাব। পাঠকের রুচিকে নিয়ন্ত্রিত করার রাজনীতি না জেনে এইসব জিজ্ঞাসার উত্তর মিলবে না। যে সকল আপাত জনপ্রিয় সাহিত্যের ছড়াছড়ি চারপাশে তার উদ্দেশ্য আর তাৎপর্য অনুধাবন করেই আমাদের সম্মুখে এগুতে হবে। তাই জনপ্রিয় যা পাঠকের সম্মুখে উপস্থাপিত হয় রঙচটা মোড়কে। এইটাই সাহিত্যের রাজনীতি। পাঠকের বিনোদনের খোরাক যুগিয়ে জনপ্রিয় সাহিত্য তার উদ্দেশ্য বাস্তবায়িত করে। জনপ্রিয় সাহিত্যের লক্ষ্য বিনোদন।

এইবার একটু অর্থনীতির পাঠ নিয়ে আসি। বিনোদন ব্যবসা দুনিয়ার অর্থনীতির ৯০ ভাগ নিয়ন্ত্রণ করে। এই নিয়ে কথা বলা উদ্দেশ্য নয়। তবু একবার চোখ বুলাই বিনোদন ব্যবসার ক্ষেত্রগুলোর দিকে: সংগীত, গ্রন্থ, ফিল্ম, ভিডিওগেমস, স্পোর্টিং ইভেন্টস, রেডিও, টিভি, থিয়েটারসহ আরও অগুনতি উৎস। শুধু ওয়াল্ট ডিজনির একটা কথা বলেই এই আলোচনার সমাপ্তি টানব :

I never called my work an art. It’s part of show business, the business of building entertainment.

আগেই বলেছি, সাহিত্য ব্যবসা। ব্যবসার দর্শন ক্ষমতাকে সংহত করা। সেইজন্য দেখা যায়, সাহিত্য সুস্থির বাস্তবকে প্রতিফলিত করার সকল প্রচেষ্টাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে বেঁচে থাকে শুধু আঙ্গিক বা ভাষার স্তরে।

তার কারণও নিহিত ক্ষমতার রাজনীতিতে। যদিও সে ভান করে নিরপেক্ষতার। আর এটাই ভাষার রাজনীতি। কাজেই এই সিদ্ধান্তে আসাই যায়, সাহিত্য যতই বিনোদন কিংবা আনন্দের উপলক্ষই হোক তাকে ক্ষমতা-নিরপেক্ষভাবে পাঠের সু্যোগ নাই। এই পর্যায়ে এসে একজন প্রকাশকের মনোভাব জানার চেষ্টা করাই যায়। প্রকাশক চান বাজার দখল করতে। পাঠকই প্রকাশকের বাজার। পোশাক শিল্পে একটা কথা প্রচলিত আছে, ক্রেতার রুচি নিয়ন্ত্রণ করার মধ্যেই ব্যবসার সফলতা। আর মানুষ নিজেকে যে কোনো কিছুতেই অভ্যস্ত করে তুলতে পারে। সে যেমন উৎকৃষ্ট বস্তুতে নিজেকে অভ্যস্ত করতে পারে, তেমনই পারে নিকৃষ্টতম বস্তুর সঙ্গেও খাপ খাইয়ে নিতে। সাহিত্যের আপাত ভালোমন্দের নিয়ন্ত্রক প্রকাশক ও প্রকাশনা ব্যবসা।

প্রশ্ন আসবে, যদি প্রকাশকই সাহিত্যের ভালোমন্দের নিয়ন্ত্রক হন তবে লেখকের ভূমিকা কী? ভালোমন্দ বিষয়টা আপেক্ষিক। আপেক্ষিকতার ব্যাখ্যায় না গিয়েই বলি, সাহিত্যে লেখকের ভূমিকা ধর্মগুরুর মতো নয়। তাকে যা করা লাগে তা হলো ক্রমাগত লিখে যাওয়া। যদিও কেউ কেউ মনে করেন লেখকেরা হলেন সামষ্টিক মানবতার গার্ডিয়ান। যারা মানুষের অসীম সম্ভাবনা নিয়ে লেখেন। আর তাদের মধ্য দিয়েই পরিস্ফুট, দৃশ্যমান হয়ে ওঠে সেই সম্ভাবনার দুয়ার। কারো কারো মতে লেখকেরা কিভাবে লেখেন, কী লেখেন আর কার জন্যই লেখেন তা মুখ্য নয়—তারা মানুষের হয়ে কথা বলেন সেটাই অগ্রগণ্য।

সুধীন দত্ত এইক্ষেত্রে ভিন্নমত পোষণ করেন। তিনি বলেন :

অন্তর্যামীর আশীর্বাদে শাশ্বত সৌন্দর্য নখদর্পণে এলেও, সৎশিল্পী লোকরঞ্জনের অভিলাষেই আলস্য ভোলে। তবে সমষ্টিগণিতের মতে সঙ্কল্পসিদ্ধির অনুপাতে দৈবদুর্বিপাক সংখ্যাভূয়িষ্ঠ, এবং পলাতকেরাও যেমন কালে-ভদ্রে অপঘাতে মরে, তেমনই মন যোগাতে গিয়ে কেউ কেউ কেবল বিরাগ জাগায়।

মিডিওকার কারা? এই জিজ্ঞাসার উত্তর হয়তো এখনো মেলে নি।

মিডিওকার লেখক তারাই যাদের উদ্দেশ্যই থাকে লোকরঞ্জন। তারা জনপ্রিয়তা অর্জন করেন লোক হাসিয়ে। স্বীকার করি কর্মটি সহজ নয়। তবে এই সত্য তারা মানুষকে কোনো জিজ্ঞাসার মুখোমুখি দাঁড় করান না। হয়তো তা চান না। তাই তারা পরিচিত জগতের কথাই লিপিবদ্ধ করেন। তাতে সাধারণের মুহূর্তের আনন্দ হয়তো মেলে, কিন্তু চিন্তারাজ্যে তা দোলা দেয় না। তাদেরকে আন্দোলিত ও পরিবর্তন করে না।


পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থায় পাঠকের রুচি ও চিন্তা নিয়ন্ত্রণ করেন লেখক ও প্রকাশক।


লেখক মিডিওকার হয়ে নিজের সাথে আপস করেন, জনরুচিকে ধোঁকা দেন আবার জনরুচির সাথে আপস করেন। কাজেই তিনি পরাজিতও হন। নিজেকে অতিক্রম করেন না। কাজেই তার নিজের সাহিত্য অন্তত এগোয় না। একই লেখা প্রতিদিনই লেখেন। নিজেকেই নিজে নকল করেন। সামনে এগোন না। দেয়াল ভাঙে না। পথ কাটে না। কোনো সঙ্গম হয় না। এটা এক রকম স্বমেহন। এতে সাময়িক উত্তেজনার উপশম ঘটলেও পরিনামে ক্লান্তিই মেলে, তা কোনো ফলপ্রসূ পরিণতি লাভ করে না।

স্টিফেন কিং তার On writing-এ লেখকদের চারটি শ্রেণিতে বিভক্ত করেছেন। তাদেরকে চিত্রিত করেছেন পিরামিড আকারে যেখানে নিচের সারিতে প্রচুর সংখ্যক লেখকের উপস্থিতি। এরপরের সারিতে লেখকের সংখ্যা হ্রাস পেয়েছে। এইভাবে পিরামিড চূড়ায় খুব কম সংখ্যক লেখকেরই স্থান মিলেছে। একেবারে নিচের সারিতে স্থান মিলেছে খারাপ লেখকদের, এরপর তুলনামূলক কম খারাপ লেখকদের। এরপর মোটামুটি মানের লেখকদের। আর পিরামিড চূড়ায় অধিষ্ঠিত আছেন জিনিয়াসেরা।

এইকথা স্বীকার্য, অনেক লেখকের মৃতভস্মের আড়াল থেকেই একজন জিনিয়াসের আবির্ভাব ঘটে। জিউসের মস্তিষ্ক থেকে জ্ঞানদেবী সম্পূর্ণ অবয়ব নিয়ে সৃষ্টি হয়েছিল। এটা পুরাণে আছে। কিন্তু সাহিত্যে জিনিয়াস হঠাৎ সৃষ্টি হয় না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তিনি অগ্রবর্তীদের কাঁধে চড়েই চূড়ান্ত পরিণতির দিকে ধাবিত হন। অর্থাৎ একজন সৎ-মহৎ সাহিত্যিক জন্ম ও স্বীকৃতি লাভ করেন অনেক মৃত লেখকের কাঁধে ভর দিয়েই।

পুঁজিবাদী সমাজ-রাষ্ট্রে মানুষের সকল আচরণ ও কর্মকাণ্ড নিয়ন্ত্রিত হয় আর্থনীতিক লাভালাভের ভিত্তিতে। তার কামনা থাকে দুঃখ পরিহার ও আনন্দ আহরণ। দর্শনে তাকেই ভোগবাদ হিশেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বেশিরভাগ মানুষ কবিতা, উপন্যাস বা নাটক পড়ে আনন্দ লাভের উদ্দেশ্যে। প্রকাশক ও লেখকেরা পাঠকের এই দৌর্বল্য সম্পর্কে অবগত বলেই পাঠকের সম্মুখে এমন সাহিত্যকর্ম উপস্থাপিত করেন যা আনন্দ দেয় ঠিক, কিন্তু সমাজের প্রতি—এমনকি স্বয়ং সাহিত্যের প্রতি—কোনো প্রশ্ন ছুড়ে দেয়ার উপযোগী কিছু তাদের পড়তে দেয়া হয় না। অর্থাৎ পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থায় পাঠকের রুচি ও চিন্তা নিয়ন্ত্রণ করেন লেখক ও প্রকাশক।

তারা কেন তা করেন? সাহিত্য খুব প্রাসঙ্গিকভাবেই রাজনীতিক পদ্ধতির সাথে সম্পর্কিত। আমরা মানতে চাই বা না-চাই, সাহিত্য রাজনীতিক সিস্টেমকেই পরিপোষণ করে, তাকে সংহতি দেয়। শক্তিশালী করে। কবিতা, গল্প, উপন্যাস আমাদের আপাত বাস্তবতা থেকে বিকল্পের সন্ধান দেয়। আমাদের ক্রোধ, ক্ষোভ আর বিদ্রোহ-প্রবণতাকে শান্ত আর সমাহিত করে তোলে। এইক্ষেত্রে একজন মিডিওকার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। কেননা তিনি নিজেও মহৎ কিছু দ্বারা তাড়িত নন! তার লক্ষ্য থাকে সমাজের স্থিতি বজায় রাখা। তাতেই তার কল্যাণ, লাভ। তারা মানুষের রুচি নিয়ন্ত্রণ করার ভেতর দিয়ে দুইটা উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন করেন। মানুষকে জিজ্ঞাসাহীন করে তোলেন। নিজের আর্থনীতিক সুবিধা নিশ্চিত করেন। সেই জন্য এদের থেকে সতর্ক থাকা সত্যিকার মহৎ সাহিত্যিকের কর্তব্য। মহৎ-সাহিত্যিক ব্যক্তিক স্বার্থের ঊর্ধ্বে যেতে পারুন, না-পারুন—অন্তত লোক ঠকিয়ে ব্যবসা করেন না। অস্কার ওয়াইল্ড ব্যক্তির ডেভেলপমেন্টের চিন্তা করে মন্তব্য করেন, ‘Even a color sense is more important, in the development of an individual, than the sense of right and wrong. ‘

বোঝা যাচ্ছে, ব্যক্তি মানুষের উন্নতি, তার বিকাশ নানাকিছুর ওপর নির্ভরশীল। সামান্য কালার সেন্সও কম গুরুত্ববহ নয়। তার প্রায়োগিক মূল্যও অস্বীকার করার উপায় নাই। উৎসবের রঙ লাল, নীল, সবুজ। মৃত্যুর রঙ মহাদেশ ভেদে শাদা, কালো। এইসব কিছু যতই সামান্য মনে হোক, এদের প্রভাব সুদূরপ্রসারী। আমাদের বেড়ে উঠার ভেতর দিয়েই আত্মপরিচয় লাভ করি। আর ভেবে নিই সবকিছু স্থির, স্থাণু। আলথুসার বলেন :

আমরা ইডিওলজির কব্জায় থাকি, এবং সামাজিক বাস্তবতাকে স্বাভাবিক ভেবে তার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ হই—প্রশ্ন করি না কিভাবে এই বাস্তবতা, এবং সেইসাথে আমরা, নির্মিত হয়েছি, এবং কিভাবে সম্ভবত তাদের রূপান্তর ঘটানো সম্ভবপর হতে পারে।


ভাষার বহুমুখী ব্যবহার, দ্বন্দ্ব ও রাজনীতিকতা যার ফলশ্রুতি—সত্য দ্বারা নয়, নির্ধারিত হয় ক্ষমতা দ্বারা।


সাহিত্যে পুঁজিবাদের সবচে বড় অবদান উপন্যাস। আমাদের কল্পনানিয়ন্ত্রিত সংস্কৃতিকে দেয়া গুরুত্বপূর্ণ উপহার। সত্যি বলতে কী, মানুষ নিজেকে—সেইসাথে একে অপরকেও—বুঝতে শেখে নাই। ব্যতিক্রম এই যে যতটা জেনেছে তা স্থুল আর রেডিমেইড। অর্থাৎ মতাদর্শের ভেতরে থেকে যতটুকু সম্ভব তাই জেনেছে। আর চাইলেও নিজেকে আবিষ্কার করতে পারে না। যেটাকে আমরা জানাশোনা বলি তা হলো আত্মোপলব্ধির বিকল্প। প্রকৃত জ্ঞান এক ধরনের ইল্যুশন। এক্ষেত্রে উপন্যাস আমাদের সাহায্য করার ক্ষেত্রে কার্যকরী ভূমিকা রাখে। উপন্যাসেই মানুষ নিজেকে ঠিকঠাক আবিষ্কার করেন। সাধারণ পঠনপাঠনের আনন্দ ব্যতিরেকে উপন্যাস হয়ে ওঠে মানুষের অন্ধতার ক্ষতিপূরণ। এখানেই উপন্যাস ইতিহাসের চেয়ে সত্য হয়ে ওঠে।

আর কে না জানে, শিল্পী-অনুভূত আবেগের দ্বারা মানুষকে সংক্রমিত করাই শিল্পের লক্ষ্য। তাই রাজনীতি আর মতাদর্শ নির্মাণের ক্ষেত্রে সাহিত্যের ভূমিকা সম্পর্কে সতর্ক থাকা জরুরি। আমাদের জানা উচিত কোন সাহিত্য ও সাহিত্যিক আমাদেরকে প্রভাবিত করছে। কার দ্বারা আমাদের চিন্তা শাসিত হচ্ছে।

এর মীমাংসা করতে পারলেই অনেক জিজ্ঞাসার জবাব মিলে যাবে, আমরা পেয়ে যাব নিজের অন্তরতম পরিচয়। সাহিত্য একই সঙ্গে জীবন, সত্য ও সৌন্দর্য রক্ষা করতে সক্ষম হবে। সৌন্দর্যের কাছে জীবন পরাজিত হবে না। বরং জীবন স্বয়ং লাভ করবে সৌন্দর্যের দর্শন। আর সত্যিকার মহৎ সাহিত্য আমাদের চিন্তাকে উন্নত করবে, আমাদের চারিত্র‍্যে আনয়ন করবে বিশ্বাস, মনকে করবে সৌন্দর্য পিয়াসী। একই সঙ্গে পূরণ করবে পিপাসার্তি। সেইসাথে এইটুকু মনে রাখাই চাই, সাহিত্যের একক নির্ধারণযোগ্য সত্য নাই। আছে ভাষার বহুমুখী ব্যবহার, দ্বন্দ্ব ও রাজনীতিকতা যার ফলশ্রুতি—সত্য দ্বারা নয়, নির্ধারিত হয় ক্ষমতা দ্বারা।

এই কথা বলে শেষ করতে চাই, সাহিত্যে মিডিওক্রিটি, শেষ পর্যন্ত, কারো কোনো উপকার করে না!

শামশাম তাজিল

জন্ম ১ এপ্রিল, ১৯৮৪; বি-বাড়িয়া, চট্টগ্রাম।

শিক্ষা : ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

পেশা : একটি বেসরকারি কলেজে প্রভাষক হিশেবে কর্মরত।

প্রকাশিত বই :
আদম পাহাড় [কবিতা, তিতাসনামা, লিটলম্যাগাজিন, ২০১৬]

ই-মেইল : shamshamtajil@gmail.com