হোম গদ্য মাসুদ খানের কবিতা

মাসুদ খানের কবিতা

মাসুদ খানের কবিতা
1.68K
0
মাসুদ খানের ওপর এত বিপুল পরিমাণে লেখা আছে আমাদের সংগ্রহে, তা দিয়ে অনায়াসে
২০/২৫ ফর্মার বই করে ফেলা যায়। এখানে কোনটি রেখে যে কোনটি ছাপি!—

সব ভেবে ছোট্ট তিনটি গদ্য ছাপা হলো কবির জন্মদিনের শুভেচ্ছাস্বরূপ।
একটি লেখা তাঁর অগ্রজের, একটি কবিবন্ধুর এবং শেষেরটি তাঁর অনুজ কবির…

সিকদার আমিনুল হক

মাননিক ভাষা


কবিতার উজ্জ্বলতা তার শব্দে, দোদুল্যমান সম্ভব ও অসম্ভবের মাঝখানে। এক কথায় রহস্যময়তায়; আজকের তরুণতম কবিদের এই ক্ষমতা ও গুণের জন্যেই আমাকে তা বেশি টানে।

মাসুদ খানের কবিতাতেও আছে এই জটিলতার দ্বন্দ্ব তথা রহস্যময়তা। সমকালীন কবিতার বিষয়বস্তু আর আঙ্গিক ধরনে ধরা যায় না, ধরার প্রয়োজনীয়তাও আছে কি-না সন্দেহ। সত্তর দশকের বিষয়বস্তুর বিশ্বস্ততা থেকে কবিতা সরে এসে ক্রমে অধিকার পেয়েছে যুক্তিহীনতার ঐশ্বর্য। প্রকৃত ইতিহাস খুঁজলে দেখব জীবনানন্দই সচেতনভাবে অসচেতনতার উপলব্ধি আনতে পেরেছিলেন বাংলা কবিতায়—তারই ধারাবাহিকতা চলছে আজকের তরুণ কবির নির্মাণে।

মাসুদ খানের কবিতায় আবেগের বিহ্বলতা নেই, আছে যুক্তির প্রাখর্য। অপরিচিত, কিন্তু সাম্প্রতিক বিশ্ব-স্বরূপকে ধরবার চেষ্টা সহজেই চোখে পড়ে। মাননিক ভাষায় কবিতা লেখা তরুণ কবির পক্ষে কতটা স্বাভাবিক, সেটা ভিন্ন বিতর্ক; কিন্তু মাসুদ খানের কবিতা পড়ে মনে হয়েছে শুধুমাত্র আত্মপ্রকাশের গরজে তিনি কবিতা লেখেন না। এই তাগিদ যথেষ্ট স্বচ্ছ ও সংস্কারমুক্ত। গীতলতা তাঁর কবিতায় নেই বললেই চলে, এবং ছন্দ পর্যালোচনা করলে মনে হয় তা যান্ত্রিকতাকে প্রশ্রয় দেয় নি। শব্দপ্রয়োগের পরীক্ষায় তাঁর উত্তীর্ণ হওয়ার অনেক পরিচয়ই আছে এখানে মুদ্রিত পাঁচটি কবিতায়।

আমার ব্যক্তিগত ভালো লাগার মূল্য যাই থাক, কিন্তু ‘ইতিহাস’ বাস্তবিকই একটি ভালো ও আত্মিক জিজ্ঞাসার কবিতা। এই কবিতাটির গ্রহণ উপলব্ধির মূল বাক্যটি সম্ভবত এ রকম : ‘অর্থাৎ পৃথিবী হতে/বিচ্ছুরিত আলোর ইতিহাসই পৃথিবীর ইতিহাস। আর তা-ই হচ্ছে প্রকৃত ইতিহাস,/ কেননা তা লিখিত প্রাকৃতিকভাবে’। যদিও কবিতার শেষ দুই পঙ্‌ক্তিতে আশ্চর্যবোধক এবং প্রশ্ন-চিহ্ন একই সঙ্গে লিপ্ত—তা আমার ধারণায় পাঠককে দ্বিধায় রাখবার কৌশল মাত্র; কবির সিদ্ধান্ত ও প্রতীতিতে কোনো চিড় নেই।

কবিতার আলো-বাতাস বদলে যাচ্ছে, এটা আমার বিবেচনায় সুলক্ষণ। শুচিবাই ত্যাগ করার কৃতিত্বও শেষ পর্যন্ত তিরিশের কবিদের; প্রধানত সুধীন্দ্রনাথ দত্তের—একালেও মাসুদ খান ‘কিভাবে সম্ভবে!’—এ-রকম মাইকেলীয় বাক্য ব্যবহারে সাহস দেখান। তবে পরের পঙ্‌ক্তিটিতে আমার সামান্য আপত্তি আছে—‘হতবাক হয়ে ভাবে সাধারণ প্রজাসাধারণ’। প্রথম সাধারণটির পরে প্রজাসাধারণ শব্দটি শব্দ-সঞ্চয়ের দুর্বলতাই প্রমাণ করে।

তবে মাসুদ খানের কবিতার ছন্দে প্রধান স্বাচ্ছন্দ্যই মুক্তক অক্ষরবৃত্তে; যদি তিনি ছন্দেই কবিতা লিখতে চান, সেক্ষেত্রে। ‘আজ উল্লাস দিবস’ কবিতার এই পঙ্‌ক্তিগুলো বারবার পড়ার মতো—‘উনি এক রূপোপজীবিনী, সর্দি-লাগা কনিষ্ঠের হাত ধরে/ বেড়াতে এসেছেন অন্য নতুন শহরে।/ আর ওই যে উনি সীসাবণিক, ইনি গন্ধবিক্রেতা,/ উনি হিসাবরক্ষক, ইনি কোষাধ্যক্ষ এবং পাশেই/ গুঁড়ি গুঁড়ি ইলশেগুঁড়ির দিনে ইলিশ-চোরের মাধ্যমিক ভাই…/ ওই যে কাত হয়ে, কাল্পনিক হয়ে, উৎকলিত হয়ে বসে আছেন,/ উনি কবি, কবিরাজ।’—এই শ্লেষ-মিশ্রিত বাক্যগুচ্ছে ‘উৎকলিত হয়ে’ শব্দদ্বয়ে বারবার পৌঁছে আমি জালছেঁড়া মাছের মতো বাস্তবিকই উল্লাসের সুখ পেয়েছি।


সাজ্জাদ শরিফ

মাসুদ খান : চেতনাআক্রান্ত বস্তুবিশ্ব


প্রথম বইটিতেই—ধ্বনিবহুল কিন্তু মন্ময়, ছন্দচেতন কিন্তু মাত্রাপেরুনো—তার অনন্য কণ্ঠস্বর পাঠকদের কাছে পৌঁছে দিতে পেরেছিলেন মাসুদ খান। শুরু থেকেই দুটো বিষয় আদ্যোপান্ত আবিষ্ট করে রেখেছে তার কবিতার জগৎকে: বস্তুর অপরিসীম উদ্ভাসের বিস্ময়, আর শব্দের শ্রুতিমূল্য। চারপাশের বস্তুপুঞ্জ নিছক নিষ্প্রাণ ও নিরঞ্জন নয় তার কাছে। কবির অভিজ্ঞতার ভিতরে এরা সজীব, মুখর ও বিচরণশীল। এরাই তার কবিতার প্রধান চরিত্র, এমনকি অনেক সময় মুখ্য নিয়ন্ত্রক। মাসুদ খানের কবিতায় চেতনার সঙ্গে এদের বিচিত্র মিথষ্ক্রিয়া চলে; কখনো কখনো এই বস্তুপুঞ্জই হয়ে ওঠে প্রবলভাবে চেতনাআক্রান্ত। তাদের সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে কবি উন্মোচন করতে থাকেন একের পর এক গুপ্তনাটক। আর সেসবের মধ্যে এসে মিশে যেতে থাকে তার লুপ্ত অতীত, তার কুহকী নদীতীর, তার জাগ্রত ছাতিম গাছ, শহুরে কেতার তলায় চাপা পড়া তার গ্রামজীবনের প্রচ্ছায়া। এই গ্লোবাল ভিলেজে মাসুদ খান শেষ ও পরিত্যক্ত সর্বপ্রাণবাদী।

যে বাইফোকাল চশমাটি মাসুদ খান পরে আছেন তার একটি পরকলা বিজ্ঞানীর, অপরটি জাদুকরের। এই মুহূর্তে বিজ্ঞানের বিমূর্ত জগৎটি সমঝে নিয়ে পরমুহূর্তেই তাকে তিনি ছাপিয়ে যান; তার স্পর্শগন্ধময় রূপ দেন প্রায় পুরাণসুলভ নৈপুণ্যে; ছিন্ন ও অলগ্ন বস্তুবিশ্বকে মিলিয়ে দেন পরস্পরনির্ভর এক ঐকতানে। ঐকতান শব্দটিই মাসুদ খানের কবিতার যথার্থ বিশেষণ। মূল অভিপ্রায়ের আশেপাশে তার কবিতায় আনাগোনা করতে থাকে আরো অজস্র অনুচরিত্র, নানা ঘটনাচূর্ণে আকীর্ণ হয়ে থাকে তার কবিতা। এসবেরই মধ্য দিয়ে অনেক সময় জেগে ওঠে কবিতার অভিপ্রায়টি।

শব্দব্যবহারেও মাসুদ খান বহুত্ববাদী। একেকটি শব্দে মুচড়িয়ে দেন কবিতাকে: জলদগম্ভীর তৎসমের পাশে বসিয়ে দেন আটপৌরে বা ইংরেজি শব্দ; বিশেষ্য-বিশেষণের আচমকা স্থানচ্যুতি ঘটিয়ে জ্বালিয়ে দেন নিরীহ কোনো শব্দবন্ধকে। এভাবে তিনি বুনে তোলেন পরাক্রান্ত শব্দফাঁদ, জমকালো এক ধ্বনিজাল। শব্দপ্রয়োগে তিনি ওজোগুণের সাধক। তার মগ্ন কবিতাগুলোর রসও বহুগুণ হয়ে ওঠে সরব উচ্চারণে। নিজের কবিতা পড়ার সময় নিম্নকণ্ঠ মাসুদ খান নিজেও হয়ে ওঠেন ঝঙ্কারময়। এও মানতে হবে, মাসুদ খানের কোনো কোনো কবিতা তার স্বকণ্ঠ আবৃত্তিতেই সুগম্য ও স্বাদু।

নিজেকে তিনি প্রকাশ করেন অক্ষরবৃত্তের ঢিলেঢালা চালে। তবে তাতেও তার স্বস্তি মেলে বলে মনে হয় না। ছন্দটির সীমারেখা পেরিয়ে, অনেকটা শহীদ কাদরীর মতো, তার কবিতা এদিক সেদিক বেরিয়ে আসে প্রায়ই। বলা যায়, তার কবিতা এগিয়ে চলে আলের দুদিকে অক্ষরবৃত্ত আর গদ্যস্পন্দের ওপর যুগপৎ পা ফেলে ফেলে।

পাখিতীর্থদিন-এর এই কবির এখন চলছে সহজিয়াসাধনা। তার নতুন তীর্থসন্ধানের খবর অন্য কোথা, অন্য কোনোখানে।


চঞ্চল আশরাফ

অর্থান্তরের ‘হাওয়া’


কবি মাত্রই তার জন্মার্জিত নশ্বরতার বিপরীতে দাঁড়াতে চান, তাঁকে চ্যালেঞ্জও করেন। এটা করতে গিয়ে প্রচলিত যে জীবন, তার ধারণাকেও তিনি উপেক্ষা করেন, আক্রমণ করতেও কুণ্ঠিত হন না। ফলে প্রচলিত জীবনের যা-কিছু, বোধ, শব্দ, তার অর্থ, রুচি, অভিব্যক্তি সবই তিনি ডিঙিয়ে যেতে চান। এই চাওয়া, তার সাধনাই কবির নিজস্ব পৃথিবী নির্মাণের অপরিহার্য শর্ত।

মাসুদ খানও যে সেই শর্তের অনুগামী, তা বারবার প্রমাণিত। তাঁর কোনো কোনো কবিতা এই মন্তব্যের উজ্জ্বল বাহক হয়ে আছে। তারই একটি হলো ‘হাওয়া’—নদীকূলে করি বাস কাব্যগ্রন্থের কবিতা এটি। কবিতাটি শুরু হয়েছে এই লাইন দিয়ে : সারাদিন বিভিন্ন রকম হাওয়া বয়। হাওয়া!—এই উচ্চারণেই আভিধানিক অর্থজগৎ থেকে ‘হাওয়া’র মুক্তি ঘটে। এই মুক্তিতেই কবির উদ্যম নিঃশেষিত হলে চলে না। শব্দটির সঙ্গে এমন এক জগৎকে জড়িয়ে নিতে হয়, সেখানে যেন সেটি উল্লেখমাত্র হারিয়ে না যায়। ফলে কবির কাজ হয়ে দাঁড়ায় শব্দটির অর্থের পর অর্থ সৃষ্টি করা। এই অর্থান্তরের মেলায় গড়ে ওঠে অন্যতর জগৎ। ও তার সৌন্দর্য। হাওয়া শব্দটির অর্থের পর অর্থ সৃষ্টি করেছেন মাসুদ খান, তাতে গড়ে উঠেছে অন্যতর জগৎ। ‘অনেক দূরের দেহে, দূর মেরুরেখায় শোষিত হয়ে হয়ে/ আজ পুনর্মুক্ত হচ্ছে এখানে, এখন/ এই মধ্যপ্রকাশ অঞ্চলে।’ হাওয়ার একটা অঞ্চলে পুনর্মুক্ত হওয়ার চিন্তা মামুলি বা সাধারণ কিছু নয়, হাওয়ার যে অর্থ প্রচলিত, তাতে এই ভাবনা সঙ্গত নয়। কিন্তু এটা তো অর্থান্তরের উপক্রমণিকা, কেননা ‘গোলকের ওই পার থেকে’ হাওয়া এসে ‘প্রতিটি বিভাগ আর দিবস-রাত্রির দেহে দেহে / স্থির হয়ে আছে।’ এখানে অর্থান্তরের পূর্ণতা ঘটল।

হাওয়ার ‘স্থির হয়ে’ থাকার পর, কেবল নতুন অর্থ সৃষ্টিতেই সন্তুষ্ট নন কবি। তিনি শব্দটি পরের স্তবকে উচ্চারণ করেন না—সে-জায়গায় দু’টি বিশেষণসমেত ব্যবহার করেন বিকল্প শব্দ—‘একদিন সম্ভবত অস্থির অচেনা এক বায়ুপ্রবাহের/ মধ্যেই মুদ্রিত হয়ে রবো’। এখানে নিজেকে সংশ্লিষ্ট করা হয়েছে সংশয়বাচক ‘সম্ভবত’ দিয়ে আর ‘হাওয়া’ হয়ে উঠল বায়ুপ্রবাহ, তাতে ‘মুদ্রিত’ হওয়ার আকাঙ্ক্ষায় ভবিষ্যৎবাচক ‘রবো’ ক্রিয়াপদটি আমাদের দূর-পূর্বসূরিদের ব্যবহার-করা; কিন্তু মাসুদ খানের এই কবিতায় বেশ মানিয়ে গেছে। শেষ অনুচ্ছেদের শেষাংশটুকু এই:

রকমারি রৌদ্র আর মরুবালুকার মধ্য দিয়ে বয়ে যাওয়া গৌণ সংবাদের মতো
বায়ু বয়ে যায়।
মৃদু-মৃদু, গম্ভীর, বিশিষ্ট ভাবমূর্তি সহকারে।

উল্লেখ বাহুল্য নয়, পূর্ববর্তী অনুচ্ছেদে ‘বায়ুপ্রবাহের/ মধ্যেই মুদ্রিত’ হয়ে থাকবার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশের পর যখন কবি উচ্চারণ করেন : ‘তার বেশ আগে/ আমাদের অসম্পূর্ণ রেখে,/ আমাদেরকে অশেষ করে দিয়ে বায়ু বয়ে যায়’—তখন কালের প্রচলিত ধারণাটির নস্যাৎ হয়ে যায়। অভিধানের অর্থ থেকে শব্দকে মুক্ত করার পর তা উচ্চারণের জন্য এমন এক ভাষাপৃথিবী গড়ে তুলতে হয় কবিকে, যা প্রচলিত ভাবনা, তার প্রক্রিয়া আর উপাদানের সমস্ত ইউনিটকে আমূল বদলে দেয়। এখানেও ঘটেছে তা-ই। কিন্তু মাসুদ খান এক্ষেত্রে সম্ভবত এক ধরনের রফা করেছেন। তিনি যখন উচ্চারণ করেন—‘আমাদের অসম্পূর্ণ রেখে’ তখন এটা মনে হতে পারে মানুষের জীবনের অসম্পূর্ণতা সম্পর্কিত ধারণাটিকে মান্য করছেন। এই কথাটির দরকার আছে। কেননা, এতে কবির ভাষাপৃথিবীর সঙ্গে প্রচলিত ভাষাকাঠামোর ঘটকালির কাজটুকু হয়ে যায়। এটুকু না হলে, কবিতা প্রলাপে পরিণত হয়। এবং যখন বলা হচ্ছে ‘নদীকূলে বংশপরম্পরাক্রমে, আমার পুত্রের, তার পুত্রের, এবং দৌহিত্রের/ বহু চুল এলোমেলো করে দিয়ে’ ‘বায়ু বয়ে যায়’—আমরা বায়ুর পরিচিত অর্থের জগতে প্রবেশ করি। সেই জায়গা থেকে কবি আবার শেষে পাঠকের পরিচিত পরীক্ষা ও জিজ্ঞাসার মুখে ফেলে দেন ‘বিশিষ্ট, গম্ভীর, ভাবমূর্তি সহকারে’ বায়ুর বয়ে যাওয়ার কথা বলে। ব্যক্তিত্ব আরোপের মধ্য দিয়ে তিনি শেষ পর্যন্ত অর্থান্তরের খেলায় পাঠকের স্নায়ুকে সক্রিয় রাখতে চান। মাসুদ খানের এই অর্থান্তর-খেলার প্রতিপক্ষ প্রচলিত পৃথিবী, তার অনুষঙ্গে প্রচলিত, বিবর্ণ আর একঘেয়ে অর্থরাশি।


পড়ুন : মাসুদ খানের বাছাই কবিতা