হোম গদ্য মালার্মে এবং বোর্হেস : অভিজ্ঞতা ও শুদ্ধতার প্রতীক

মালার্মে এবং বোর্হেস : অভিজ্ঞতা ও শুদ্ধতার প্রতীক

মালার্মে এবং বোর্হেস : অভিজ্ঞতা ও শুদ্ধতার প্রতীক
1.66K
0

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর সিগমুন্ড ফ্রয়েডের মনঃসমীক্ষণতত্ত্ব ও পরাবাস্তববাদের পরিচিতির পাশাপাশি প্রতীকবাদী শিল্পধারা যেভাবে প্রসার লাভ করেছে, অতটা ১৬৬০-১৬৮৫ এর ফরাশি ক্ল্যাসিসিজম অথবা ১৮২০-১৮৪৫ এর রোম্যান্টিসিজমের ক্ষেত্রেও ঘটে নি। অথচ, আজ একশ বছর পর প্রতীকবাদী সাহিত্য আধুনিক শিল্পধারার মগ্নচৈতন্যস্রোতে যেভাবে নিরীক্ষাধর্মী যাত্রা শুরু করেছে তাতে পাঠকশ্রেণির শিক্ষাবোধ কতটুকু সমন্বয় করতে সক্ষম, বিষয়টি তলিয়ে দেখার সময় এসেছে।

কবিতা এবং এ সময়ের অন্যান্য শিল্পমাধ্যম অনুশীলন করলে এ প্রতীতি জন্মানো অস্বাভাবিক কিছু নয় যে, এখনকার শিল্পজগৎ মগ্ন-চৈতন্য-প্রবাহ কথকতার সমন্বয়ে রহস্যময় তথা স্বতঃস্ফূর্ত আচ্ছন্নতায় প্রতিভাসিত। রহস্যময়তার জগৎই কি কবিতার জগৎ? নাকি সচেতন শিল্পীর নির্মাণ দক্ষতার ওপরই কবিতার সাফল্য? নাকি উভয়ই পরস্পর পরিপূরক? শিল্পের মায়াজাল চক্রান্তে আমরা আবেশ-আক্রান্ত হই। ফলে শিল্পের প্রগাঢ় রহস্য নিয়ে চূড়ান্ত কিছু বলা সম্ভব নয় অথবা ধর্মগ্রন্থ নিয়ে যেমন মাঙ্গলিক রহস্য বিদ্যমান শিল্পকে ঘিরেও রয়েছে তেমন মঙ্গলপ্রদীপ। ফলে ধর্মগ্রন্থের মতোই শিল্পকে নিয়ে ধৃষ্টতাপূর্ণ অথবা হঠকারী মন্তব্য অবান্তর।


ফরাসি কবিদের যে অংশটির কারণে আমরা আধুনিক কবিতার সাথে পরিচিত হয়েছি তাঁদের সিংহভাগই ছিল প্রতীকবাদী।


আপাত-বাস্তবের বিভ্রান্তি থেকে অতিবাস্তবের শাশ্বত সত্যালোকে প্রবেশের বাহন শিল্প। আর এই শিল্পের ভেতর উৎকৃষ্ট শিল্প হলো কবিতা। অন্তত কবি ওয়ার্ডসওয়ার্থ এমনটিই ভাবতেন। তিনি তাঁর দ্য প্রিফেস টু লিরিক্যাল ব্যালাডস-এ লিখেছেন, কবিতা আর-সব শিল্প অপেক্ষা অধিক দার্শনিক শিল্প। বস্তুত অনেকের কাছে কবিতাই সর্বাপেক্ষা রসসঞ্চারী শিল্প। রোমানরা কবিকে বলতেন নবী (ভাটেস); অর্থাৎ তিনি স্বর্গীয়, তিনি ভবিষ্যৎবক্তা এবং তিনি প্রেরিত পুরুষ। গ্রিকরা তাকে বলতেন কবি (পোয়েট); সেই থেকে সব ভাষাতেই তিনি কবি। অস্কারওয়াইল্ড লিখেছেন, শিল্পী হচ্ছেন সৌন্দর্যের জনক। কবি হচ্ছেন সর্বোত্তম জনক; যিনি কখনো কখনো দেবতুল্য অর্থাৎ ঈশ্বর বা স্রষ্টার ধারণার সমতুল্য। অবশ্য এ ব্যাপারটি একদিনে তৈরি হয় নি। এর সাথে সম্পৃক্ত মানব সভ্যতার ইতিহাস। পশু থেকে মানুষের পার্থক্যের দু’টি প্রধান বৈশিষ্ট্য হাতিয়ার তৈরি এবং কথা বলা। এবং এ দুটি বৈশিষ্ট্যের পরিণত প্রকাশই শেষ পর্যন্ত শিল্পে রূপ পেয়ে যায়।

এই হাতিয়ার আর বাকশক্তির মিথস্ক্রিয়ায় কবি হোর্হে লুইস বোর্হেসের জন্ম। সুতরাং তিনি স্বাভাবিকভাবেই তাঁর কবিতায় লিখবেন তাঁর পূর্বপুরুষের কথা; অহমের কথা অথবা ঐতিহ্যের কথা। তাঁর ‘সেপালচারাল ইনসক্রিপসন’ কবিতায় পাওয়া যায়,

His valor passed beyond the Andes.
He fought against mountains and armies.
Audacity was a habit with his sword.
At Junin he put a lucky end to the fight
and gave Spanish blood to Peruvian lances.
He wrote his roll of deeds
in prose inflexible as battlesinging trumpets.
He died walled in by implacable exile.
Now he is a handful of dust and glory.

(রবার্ট ফিটজারালড কর্তৃক অনুদিত)

হোর্হে লুইস বোর্হেস-এর জন্ম ১৮৯৯ সালের ২৪ আগস্ট; বুয়েনোস এরিসে। প্রথম কাব্যগ্রন্থ ফেভর দ্যু বুয়েনস এরিস প্রকাশ পায় ১৯২৩ সালে। বোর্হেস-এর মতে, যত ঘটনাবিহীন হোক, প্রতিটি মানুষের জীবনে অনেক গভীর কবিতা এবং বহু জটিল মানসিক প্রক্রিয়ার চেয়েও বহু বেশি সম্পদ এবং রহস্যময়তা সংগোপনে থাকে। ফলে মানব দেহের পরিণতি ‘হ্যান্ডফুল অফ ডাস্ট’ হলেও তা কিন্তু শেষ পর্যন্ত ‘গ্লোরিও’ বটে।

মালার্মের জন্ম ১৮৪২ খ্রিস্টাব্দে পারির এক মধ্যবিত্ত পরিবারে। মালার্মের জন্মতথ্যের পাশাপাশি আরেকটি তথ্য আমাদের জানা অপরিহার্য, কবিতায় আধুনিকতা নিয়ে এসেছেন ফরাসি কবিগণ। এই ফরাসি কবিদের যে অংশটির কারণে আমরা আধুনিক কবিতার সাথে পরিচিত হয়েছি তাঁদের সিংহভাগই ছিল প্রতীকবাদী; যে প্রতীকবাদ বস্তুত কবিতায় জটিলতা বাড়িয়ে দিয়েছে। যদিও এই জটিলতার পথ উত্তীর্ণ হয়েই আমাদেরকে প্রকৃত কবিতার জগতে প্রবেশ করতে হয়। প্রকৃত কবিতার জগতে প্রবেশ-ক্ষমতা বিষয়ে মালার্মে মনে করতেন, আবেগকে ঘনীভূত ও পরিশুদ্ধ করে সমস্ত আলঙ্কারিকতা ত্যাগ করতে হবে। এবং কবিতার রহস্যময়তা আর তার আশ্চর্য জাদুকরী প্রভাব সম্পর্কে মালার্মে স্পষ্ট মন্তব্য করেন, আমরা যা-ই লিখি না কেন তার শুরু ও শেষটা অবশ্যই ছেঁটে ফেলতে হবে; কোনো ভূমিকা অথবা উপসংহার নয়। কেননা যা কিছু পুণ্য পবিত্র এবং যা কিছু পুণ্য পবিত্র থাকতে চায়, তা-ই রহস্যের অবগুণ্ঠনে আবৃত থাকে।

মালার্মের এই রহস্যের অবগুণ্ঠন ছিল মস্তিষ্কজাত এবং তাঁর প্রেম ছিল কবিতার শব্দের প্রতি। সম্ভবত এই বিশুদ্ধ প্রেম আর রহস্যময় জগতের গভীর পথেই ছিল বোর্হেসের যাত্রা। তবে প্রতীকবাদী কাব্যকৌশলে মালার্মে যেভাবে শুদ্ধতা ও অভিজ্ঞতায় প্রোথিত থেকেছেন সে অর্থে অবশ্যই বোর্হেস প্রতীকী প্রতীতিকে আত্মগত করেন নি; বরং পৃথিবীর যা কিছু পবিত্র ও পুণ্য তা থেকে যেন ঐশী শক্তি আহরণ করেই বাস্তবতাকে অতিবাস্তবতার আলোকে তিনি চিহ্নিত করেছেন। ফলে এই যাত্রাপথ মানবদেহ থেকে, তুচ্ছ ও ক্ষুদ্র সীমা থেকে অসীমের পথে যাত্রা করেছে। রবীন্দ্রনাথের ভাষায় সীমা থেকে অসীমে প্রবেশ। এবং এই পবিত্র রহস্যময় অসীমে প্রবেশে পাঠক ব্যর্থ হলে সেটা অবশ্যই পাঠকের দুর্ভাগ্য। অন্তত মালার্মে তাই মনে করেন। কেননা সমসাময়িকরা যদি পড়তে না শেখেন তার জন্য শিল্পী দায়ী নন মোটেও। যে কোনো শ্রেণির জনসাধারণকে তুষ্ট করতে পারে যে শিল্প, মালার্মে সে শিল্পকে এক কথায় নাকচ করে দিয়েছেন।

প্রথম জীবনের বন্ধু লেফেবুরে (১৮৩৮-১৯০৮)-কে মালার্মে ১৮৬৮ এর ৩ মে একখানি চিঠি লিখেছিলেন; যেখানে মালার্মে উল্লেখ করেন, তিনি ‘সে পুর ওঙ্গলে’ এর মতো এমন চতুর্দশপদী রচনা করেছেন যা যথার্থই দুরূহ; যেখানে তিনি স্ব-উদ্ভাবিত এমন কিছু শব্দ ব্যবহার করেছেন, প্রকৃত প্রস্তাবে অভিধানে যেগুলোর কোনো উল্লেখ নেই। তারপরও মালার্মে স্ব-উদ্ভাবিত নতুন শব্দগুলোর ভেতর এমনভাবে ইঙ্গিতময়তা সংযুক্ত করতে সক্ষম হয়েছিলেন যে তিনি বলতে বাধ্য হলেন, কবিতার যথার্থ সৌন্দর্যক্ষমতা ছন্দের ভেতর থাকে না অথবা থাকে না শুধুমাত্র চিত্রকল্পে বরং তা গ্রথিত থাকে কবিতার ইঙ্গিতময়তার ভেতর। কবিতার মালমশলা মূলত শব্দ। কাজেই শব্দকে কবি কোন অনুষঙ্গে কাজে লাগিয়েছেন সে অনুভবের ভেতর দিয়েই উদ্ধার করা সম্ভব কবিতার সংবেদনশীলতার গাঢ়তা এবং ভাবনার প্রগাঢ়তা। মালার্মের এহেন বাকদৃঢ়তার কারণেই কমলেশ চক্রবর্তী মালার্মের কবিতার বুনন নিয়ে বলতে পেরেছেন, ‘মালার্মের বেলায় তাঁর ভাষার সঙ্গে প্রণয়, শব্দের ধ্বনি তাঁর চিত্রকল্পের ইন্দ্রিয়গ্রাহ্যতা; তাঁর বিতৃষ্ণা ভাষার স্বাভাবিকতায়, পৌনঃপুনিকতায়, তাঁর প্রথাগত পদবিন্যাসের বিরোধিতা আর ব্যাকরণের প্রতি অনীহাই তাঁর চরিত্রের বৈশিষ্ট্য। তাঁর ভাষার সুসজ্জা।’


প্রতীক সৃষ্টির সাধনায় মালার্মে তাঁর সমস্ত জীবন ব্যয় করেছেন।


মালার্মে মনে করতেন, শিল্পের চূড়ান্ত দায় বাস্তব বস্তুর আপাত-সৌন্দর্যকে অতিক্রম করা এবং সৌন্দর্যের ধ্রুব উৎস বিষয়ে যথার্থ উপলব্ধি কবিতায় পরিষ্কার করা। ফলে মালার্মে তাঁর কবিতায় উপমার মর্মবাণী যথাযথভাবেই কাজে লাগাতে সচেতন ছিলেন। তারপরও তিনি মনে করতেন পৃথিবীর কোনো কবিতাই যথার্থ বিশুদ্ধ নয়, অথচ এই বিশুদ্ধ কবিতার প্রতিই ছিল মালার্মের যাত্রা। মালার্মের মতে, শব্দমাত্রই এক একটি প্রতীক আর একটি প্রতীকের ইঙ্গিতময়তা আরও অজস্র প্রতীকের ভেতর জড়িয়ে থাকে; যা আরও অসংখ্য প্রতীক নির্মাণ করে রচনার অগ্রযাত্রাকে অব্যহত রাখে। এই প্রতীকগুলো শেষ পর্যন্ত লাভ করে স্বনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতা এবং অর্থমাত্রা। যে প্রতীকগুলো এভাবে নিজ ক্ষমতা অর্থাৎ স্বশাসিত জীবন থেকে প্রতিনিয়ত গূঢ়ার্থ নির্মাণের সৌন্দর্য লাভে সক্ষম হয়; সে প্রতীকগুলোর স্বশাসিত সৌন্দর্য অনন্যনির্ভর। এবং এই অনন্যনির্ভর প্রতীক সৃষ্টির সাধনায় মালার্মে তাঁর সমস্ত জীবন ব্যয় করেছেন। যদিও এই প্রতীক নির্মাণ করতে গিয়ে মালার্মে সমস্ত জীবনে মাত্র ৬০টি কবিতা রচনা করেছিলেন এবং গুটিকয়েক গদ্যরচনা। তারপরও আমরা শতাব্দীপর পাঠকেরা মালার্মে-পাঠে আবিষ্কার করে থাকি অনাবিষ্কৃত কাব্যসৌন্দর্য।

বলা চলে মালার্মের কাজ ছিল কবিদের করণীয় অর্থানুসন্ধান; যার নমুনা আমরা তাঁর ‘তোস্ত ফুনেব্র’ অথবা ‘তোম্ব’ অথবা ‘য়োমাজ’ প্রভৃতি কবিতায় পেয়ে থাকি; যে কবিতাগুলো রচিত হয়েছিল কবি গোতিয়ে, পো, বোদলেয়ার, ভেরলেন, হ্বাগনার, অথবা পুভিস দ্য সাভানের উদ্দেশ্যে। এসব কবিতায় অমর কবিদের আত্ম-অনুসন্ধান এবং কবিতার ‘শব্দরাজি’ যা কবি ব্যবহার করে থাকেন তাদের ভেতরের পবিত্রতা, যার পরিবর্তন সম্ভব নয় অর্থাৎ ব্যবহৃত শব্দের কোনো বিকল্প আর কখনোই সম্ভব নয়— এমন এক বিশ্বাস ধ্বনিত হয়েছে। এই শব্দগুলোকে শাসনের ক্ষমতা রাখেন একমাত্র সংশ্লিষ্ট কবি এবং চমৎকার বিষয়টি হচ্ছে, এই ব্যবহৃত শব্দগুলো শেষ পর্যন্ত স্বায়ত্তশাসনের ক্ষমতা অর্জন করে ফেলে।

অতএব মালার্মে উপলব্ধি করলেন, একজন কবির জীবন সীমাবদ্ধ তাঁর মৃত্যু দ্বারা কিন্তু একটি কবিতার জীবন অসীম এবং স্বয়ম্ভু, সৃষ্টিশীল। সুতরাং কবিতা সীমায়ত মানবজীবনের বিপরীতে স্বাধীন এবং মুক্ত; মৃত্যু মুক্ত করে মানুষকে কিন্তু কবিতা নিজেই মুক্ত এবং স্বাধীন। কিন্তু একথা ঠিক, যখন কোনো কবি লিখতে বসেন তখন পক্ষান্তরে তিনি নিজেকেই রচনা করতে থাকেন। এক্ষেত্রে প্রেমই সবকিছু।

১৮৬৫-র ফেব্রুয়ারিতে মালার্মে লেফেবুরে-কে লিখলেন, প্রেমই মোদ্দাকথা, আসলে প্রেম হচ্ছে হাজারো অনুভূতির মতোই একটি আবেশ যা আমাদের আত্মাকে আবিষ্ট করে রাখে এবং ভয় অথবা বিষণ্নতা অথবা অতৃপ্তি অথবা ঘৃণা অথবা বেদনা ছাড়া আমাদেরকে আর কিছুই দেয় না। ১৮৬৫-র জুনে আঁরি কাজালিস-কে লিখিত চিঠিতে উল্লেখ করেন, আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি যে শিল্প একমাত্র শিল্পীর জন্যই। আমি ভয়ানক কষ্ট পাই যদি কখনও সাধারণ পাঠকের জন্য আমার লেখাকে সরল করতে হয়। যদি তুমি জানতে কত রাত কাটে আমার হতাশায়, কত দিবস কাটে স্বপ্নে; কেননা আমাকে মৌলিক কবিতা রচনার জন্য বেঁচে থাকতে হবে; যা এর আগে আমি কখনো লিখি নাই; সেই মহোত্তম রহস্যময় কবিতা, যে কবিতা আমার আত্মাকে আলোকিত করবে।

এবং ঐ একই বছরের ডিসেম্বরে আঁরি কাজালিসকে মালার্মে আবার লিখলেন, প্রতিটা রাত আমার নিজের; প্রতিটা শব্দ আমার নিজের যা নিয়ে আমি স্বপ্ন দেখি। আর পরের বছর জুলাইতে লিখলেন, আমি ভ্রমণ করতে শুরু করেছি এক অজানা ভূমিতে। আর যদি আমি বাস্তবতার প্রবল উষ্ণতা থেকে পালিয়ে গিয়ে প্রতীকের শীতলতায় আনন্দ কুড়িয়ে নেই তবে তার কারণ মাসাধিককাল আমি বিশুদ্ধ নন্দনতত্ত্বের তুষারস্রোতে গা ভাসিয়েছি। আর এতে আমি শূন্যতার সন্ধান পাবার সাথে সাথেই সৌন্দর্যের সন্ধানও পেয়েছি।

এই সৌন্দর্য আবিষ্কারের পর ১৮৮৮-র ২২ জানুয়ারিতে সিম্বলিস্ট আন্দোলনের সাথে যুক্ত বেলজিয়ান লেখক এমিলি ভেরহারেনকে মালার্মে লিখলেন, অন্য এক ধরনের কবিতাও আছে যা সেই কাব্যের নিজস্ব ঝড়ে, বৃষ্টিপাতে পরিশুদ্ধ হয়ে ওঠে চিরকাল চমৎকারভাবে আর আমি যখনি স্বপ্ন দেখি তখনই আবার সশব্দে এই কবিতায় প্রত্যাবর্তন করি। এবং সত্যিকার অর্থে মালার্মে প্রত্যাবর্তন করতে পেরেছিলেন বলেই ১৯৯১-র ৮ আগস্ট ভিয়েলে গ্রিফিন-কে লিখতে পেরেছিলেন, কবির কাজ হচ্ছে প্রতিনিয়ত অন্বেষণ এবং প্রতিতুলনার মধ্য দিয়ে সেই গোপন অভিন্নতার চিহ্নগুলো প্রকাশ করা; যা ক্ষয় করবে অথবা অন্তত কমিয়ে দেবে শারীরিক জান্তবতা অথবা সবসময় ক্রিয়াশীল থাকবে বিশুদ্ধতার কেন্দ্র-অভ্যন্তরে প্রবেশের।


সত্যভাষণ নয় বরং অনুভূতির যথাযথ জাগরণই কবিতার উদ্দেশ্য।


এই বিশুদ্ধতার কেন্দ্রাভ্যন্তরে প্রবেশের জন্য প্রয়োজন অনুভব-সঞ্চারী কাব্যভাষা; তথ্য-নির্দেশক ভাষা অবশ্যই নয়। কেননা তথ্যের উপস্থাপন নয়, অনুভূতির বিচিত্র উদ্বোধনেই কবিতার সার্থকতা। তথ্য-নির্দেশক ভাষায় কবিতার মৃত্যু অনিবার্য। কবিতার অনুভব-সঞ্চারী জগতে তথ্যের প্রশ্ন অবান্তর। সত্যভাষণ নয় বরং অনুভূতির যথাযথ জাগরণই কবিতার উদ্দেশ্য। সুতরাং এই অনুভূতির বিচিত্র মাত্রাজগতেই কবিতার মোক্ষলাভ সম্ভব হয়ে ওঠে। এবং মানব সমাজে পরিবেশ, চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য ও কালচার অনুসারে অবশ্যই অনুভূতির অনুবাদ ভিন্ন ভিন্ন হওয়া স্বাভাবিক। সুতরাং কবিতার প্রকৃত পাঠে প্রবেশের জটিলতা অবশ্যই প্রাসঙ্গিক একটি প্রশ্ন; যা কবিতা পাঠককে বিভ্রান্ত করে। তাহলে কি বিভ্রান্তের জগতই কবিতার জগৎ? কবি সফেদ ফরাজী কবিতার ভাষা প্রসঙ্গে বিষয়টিকে ব্যাখ্যা করেছেন। তিনি বলছেন :

শব্দকে নির্ভর করে জেগে উঠে ভাষা। সাধারণভাবে শব্দ যদিও নির্দিষ্ট অর্থবাহী কিন্তু যখন তাকে একটি কাব্যিক বিন্যাসের অংশ হিশেবে একটি কবিতার অন্তর্ভুক্ত করা হয় তখন তা আর প্রথাগত অর্থের বাহন নয়। কবিতাটির অনন্য সাধারণ নিজস্ব প্রসঙ্গই তখন নিয়ন্ত্রিত করে শব্দের গতি-প্রকৃতি। শব্দ তখন পরিগ্রহ করে নতুন রূপ ও নতুন অর্থ, যা কেবল ঐ বিশেষ কবিতাটি প্রসঙ্গে কার্যকর। একটি কবিতার অন্তর্গত বিভিন্ন উপাদান পারস্পরিক সম্পর্কসূত্রে গ্রন্থিত হয়ে সৃষ্টি করে নিজস্ব জগৎ।

আবু সয়ীদ আইয়ুব কবিতার জগৎ বা শিল্পের জগৎ বিষয়ে মনে করেন, ফলিত সাহিত্য বিশুদ্ধ নয়। ধনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় যাঁরা শ্রমিক-সাহিত্য দাবি করছেন তারা সাহিত্যকে এগিয়ে দিচ্ছেন না, গুলিয়ে দিচ্ছেন মাত্র। কবিতা লেখা শুরুর অনেক আগেই মালার্মে তাঁর (সম্ভবত) প্রথম প্রবন্ধ ‘লা আর্ত পোউর টোস’ অর্থাৎ ‘সকলের জন্য শিল্প’-তে বলেছিলেন, কবিতা সমস্ত শিল্পের মধ্যে উত্তম; কবিতাকে অবশ্যই চিত্রলিপি বা সঙ্গীতের স্বরলিপির মতো আপাত হেঁয়ালির অবয়ব নিয়েই প্রকাশ পেতে হবে। যেহেতু প্রতীকের ভেতরে আছে বহুবিধ অর্থের এক প্রকার পারস্পরিক বিন্যাস এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে আপাত বোধগম্যতার ভেতরে প্রচ্ছন্ন অবস্থায় লুক্কায়িত থাকে রহস্যময় গভীরতা, সেহেতু অবশ্যই প্রতীকবাদী সাহিত্য পাঠকের কাছে দাবি করে পঠন-পাঠনের সক্রিয় আন্তরিকতা।

১৮৯৩-র মার্চে শার্ল বোন্নিয়েরকে মালার্মে লিখলেন, এমন কিছু ভাবনা অথবা অনুভূতির সমন্বয়ে কাব্যকলা গ্রথিত থাকে, যে ভাবনাগুলো দ্রুত সংযুক্ত অথবা সাজানো থাকে যথাযথ পঙ্‌ক্তির সাহায্যে; যদিও অনাবিষ্কৃত অবস্থায় এই ভাবনাগুলো যতই বিচ্ছিন্ন থাকুক না কেন আসলে তারা যথাযথভাবে একত্রিত হবার জন্য সর্বদাই উদ্‌গ্রীব ছিল। এবং কাব্যকলার গূঢ় কৌশল বিষয়ে শার্ল মোরিচকে লিখেছিলেন, অধিবিদ্যা বা আত্মিক কোনো ধরনের দর্শনতত্ত্বেরই কবিতায় অনুপ্রবেশ ঘটতে দেওয়া উচিত নয় বরং তা কবিতায় অন্তর্লীন থাকবে। অথবা স্বতঃস্ফূর্ত গঠনশৈলীর জাদু তৈরির জন্য অবকাঠামোরও প্রকাশ্য অবয়ব রাখা চলবে না বরং এ বিষয়গুলো নিজের প্রয়োজনেই রহস্যময়তার একটি পরিমণ্ডল সৃষ্টি করবে অথবা সঙ্গীত প্রবাহিত হবে সহজাত চাহিদায় অথবা এমন নিপুণ বিচ্ছুরণ, কী ভয়ানক প্রতিভার দরকার কবি হয়ে উঠার জন্য; প্রয়োজন বিদ্যুৎতুল্য প্রেরণা অথবা প্রবল আলোক বিস্ফোরণ। অবশ্যই কবিতার বুদ্ধিগত অস্ত্রটা আড়ালে রাখবেন; যদিও তা খুঁজে পাওয়া সম্ভব কবিতার স্তবকগুলোর মাঝের শূন্য অংশে অথবা পৃষ্ঠার শাদা অংশে। তারপরও অর্থময় নৈঃশব্দ্য যা লিখিত পদগুলোর চেয়ে কম আনন্দ দেয় না।

কমলেশ চক্রবর্তী মালার্মের শব্দ ব্যবহার প্রসঙ্গে মন্তব্য করেছেন, মালার্মের শব্দ ব্যহারের গূঢ়ার্থ হচ্ছে, জটিল বন্ধ্যাত্ব। যাকে মালার্মে নিজেই বলেছেন, বসন্তকালীন বিমর্ষতা অর্থাৎ এমন একটা অবস্থা যখন কবি অশুদ্ধ কিছুই রচনা করতে চান না অথচ বিশুদ্ধ কোনো কিছুই লেখা সম্ভব হচ্ছে না ফলে কাগজের ওপর কলম স্পর্শ অসম্ভব। অথচ মালার্মের কাছে কবিতার যাবতীয় আদর্শ এমনকি স্বপ্ন পর্যন্ত ছিল ঈশ্বরতুল্য অথবা ঈশ্বরের সমান্তরাল এবং তা মোটেও অতিরঞ্জিত কিছু নয় অথবা উৎপ্রেক্ষা নয়। ফলে তিনি নিজের বিষয়ে কবিতায় বলতে বাধ্য হয়েছিলেন, যেমন বলতে বাধ্য হয়েছিলেন কবি গোতিয়ে সম্পর্কে, ‘চন্দ্রাহত, আনন্দ-উন্মাদ সন্ন্যাসী’।

মাইক্রোকোজম অর্থাৎ ক্ষুদ্র সৃষ্টি এবং ম্যাকরোকোজম অর্থাৎ মহাবিশ্ব বা মহাসমগ্রতার ভেতর সম্বন্ধ বা সাদৃশ্য খুঁজে বের করার ভেতর দিয়ে প্রতীকবাদীদের আত্মযন্ত্রণা নিহিত; যা বর্তমান কবিদের প্রকরণগত জটিলতায় প্রবাহমান। মন বিষয়ক ক্ষুদ্র জগৎ এবং বিশ্বব্রহ্মা-বিষয়ক বৃহৎ জগৎ, যার রহস্য উন্মোচনে যুক্তি ও বিজ্ঞানের সমস্ত প্রয়াসকে একত্রিত করেও শেষ পর্যন্ত মানব মেধার মুক্তি নেই। অথচ এই মুক্তি যন্ত্রণার ভেতরই কবির কাজ অদৃশ্যের অর্থোদ্ধার। ‘পড়ন্ত দেবশিশুর মতো জলাশয়ের গভীরে লজ্জা’; এই গভীর রহস্যঘন লজ্জাবোধ যা সাধারণের অগোচরে থেকে যায়; বোর্হেস এই অগোচরে থেকে যাওয়া রহস্যঘন লজ্জাবোধের উদ্‌ঘাটক।


যে কেউ গণতান্ত্রিক হতে চায় হোক কিন্তু শিল্পীকে অবশ্যই থাকতে হবে তাঁর আভিজাত্যে অবিচল


এবং এর মধ্য দিয়েই মালার্মে অবিরাম স্বপ্ন দেখেন এমন এক শিল্পের, যা তাঁর এবং বিমূঢ় জনতার মাঝখানে তুলে দেবে এক অলঙ্ঘনীয় প্রাচীর। অথচ অপর পক্ষে বোর্হেস-এর ক্ষেত্রে, ‘দ্য ওয়ে এ ড্রিম ইজ ব্রোকেন; দ্য মোমেন্ট দ্য স্লিপার নোউজ হি ইজ ড্রিমিং’; মালার্মে এই ড্রিমকে গণতান্ত্রিক হতে দিতে অভ্যস্ত নন। তিনি মনে করেন, আর যে কেউ গণতান্ত্রিক হতে চায় হোক কিন্তু শিল্পীকে অবশ্যই থাকতে হবে তাঁর আভিজাত্যে অবিচল; কবিতার ভেতরে প্রবেশ মানে ধর্মজীবনে প্রবেশ। মালার্মের এই উচ্চকিত আকাঙ্ক্ষা এবং তা বাস্তবায়নের মধ্যে যে দূরত্ব তা তার ঐশী সত্তাকে ক্রমাগত যন্ত্রণাকাতর করে তোলে। শুরু হয় অন্তর্গত রক্তক্ষরণ। এ অবস্থায় আমরা এক অনিবার্য প্রশ্নের মুখোমুখি হই। তা হলো, এ অবস্থায় কি কবিসত্তা প্রতারিত হয়ে থাকে? নাকি শেষ পর্যন্ত মালার্মে লৌকিক ধর্ম, ঈশ্বর এবং কাব্যসৌন্দর্যকে আত্মগত সত্তায় উপলব্ধিতে এনে এদের ভেতরের গূঢ় সম্পর্ক নির্ণয়ে সক্ষম হয়েছিলেন?

বঙ্কিমচন্দ্রের সাহিত্য আলোচনার মূল বিষয়, সৌন্দর্য ও মনুষ্যত্ব; রবীন্দ্রনাথে সুন্দর, আনন্দ এবং কল্যাণ। মালার্মের চেতনায় বহু আগেই যা ধরা দিয়েছিল অভিজাত পবিত্রতা নিয়ে এবং যথাযোগ্য প্রতীকই পেরেছিল এই অভিজাত পবিত্রতাকে যথাযথ মর্যাদাপূর্ণ প্রকাশসীমায় পৌঁছে দিতে। সম্ভবত এই প্রজ্ঞা থেকেই মালার্মে ঈশ্বরকে অস্বীকার করে কবিতাকে ধর্মীয় ঈশ্বর বলে আত্মস্থ হলেন। সম্ভবত, মালার্মেই প্রথম কবি যিনি ধর্মগ্রন্থ এবং কাব্যগ্রন্থের প্রকৃত চরিত্র অনুধাবনে সক্ষম হয়েছিলেন। সক্ষম হয়েছিলেন প্রতীকের যথার্থ মর্মার্থ উদ্ধারে।

প্রতীকী কাব্যধারার বিশ্লেষণ করতে গিয়ে ল্য রোমাঁ দ্যাভেনত্যুর (১৯৪৭)-এ লেখক জাঁক রিভিয়ের বলেছেন, ‘প্রতীকবাদীরা প্রথমত একটা গল্প আবিষ্কার করেন, কিন্তু তা বলার মতো সময় লেখকের থাকে না। হয়তো গল্পটি বলার মতো কারণও তিনি খুঁজে পান না। ফলে তা তাঁর মস্তিষ্কের প্রকোষ্ঠেই রয়ে যায়। এবং যেহেতু তিনি নিজেই কাহিনিটি সম্পূর্ণ জ্ঞাত হন নি তাই তাঁর পাঠকও পুরোপুরি জানতে অধিকারী হয় না। তাঁর প্রতীকবাদী কাজ তখনই শুরু হয় যখন তিনি তাঁর বক্তব্যের সীমানা ছাড়িয়ে যান, যখন সামনে শুধু থাকে গোপন বিষয়ের বিচ্ছুরিত তরঙ্গ।’ (কমলেশ চক্রবর্তী/স্তেফান মালার্মের চিঠিপত্রাংশ)

আমরা মালার্মের নন্দনতত্ত্ব বিষয়ক কাব্যমেধার পবিত্র স্বাদ আহরণে কবির বিখ্যাত দীর্ঘকবিতা ‘তোস্ত ফ্যুনের্ব’ অধ্যয়নে মনোযোগী হব। কবি রবার্ট লোয়েল কবিতাটির ইংরেজি অনুবাদে শিরোনাম লিখেছেন ‘অ্যাট গোতিয়েরস গ্রেভ’। আমি বাংলা ভাষায় লিখতে চাচ্ছি ‘গোতিয়ের উদ্দেশ্যে স্বাস্থ্যপান’। পুরো কবিতাটি অনুবাদে মূল ফ্রেঞ্চ এবং ইংরেজি অনুবাদের সাহায্য নেয়া হয়েছে। আক্ষরিক অর্থের প্রতি দৃষ্টি রাখা সত্ত্বেও মালার্মের কবিতাতে শেষ পর্যন্ত ভাবার্থ ও আবহ নির্মাণই বেশি প্রাধান্য পেতে বাধ্য। কেননা মালার্মে স্বপ্নের জগৎ নির্মাণ করতে গিয়ে কোনো কার্যকরণসূত্র পিছে রেখে অগ্রসর হন নি।

গোতিয়ের উদ্দেশ্যে স্বাস্থ্যপান

তোমার প্রতি, মানুষের সুখের সবটুকু স্মৃতিচিহ্ন চলে যায়,
স্বাস্থ্যপান! ভাবতে পারি না আমি তুলে নেব এই শূন্যপাত্র
শূন্যতার উদ্দেশ্যেই এই উন্মত্ত মাতাল স্বাস্থ্যপান, কেননা
অস্তিত্বহীন শূন্য করিডোরই দিয়ে যায় স্বপ্ন আকাঙ্ক্ষা আমার।
গাছের গুঁড়ির ওপর দহিত হয় সোনালি দানব
তোমার ভৌতিক ছায়াচিহ্ন আমাকে স্বস্তি দিতে পারে না
আমি নিজেকে গোপন করি; গোপন করি তোমার নিকট থেকে
তোমার ঐ কঠিন প্রস্তরখণ্ড থেকে আমি নিজেকে গোপন করি।
গোতিয়ে! আমার হাতে নিক্ষেপযোগ্য ধর্মীয় বিশ্বাস
এই বিশ্বাসের বিশাল আলো,
তোমার রুগ্‌ণ লৌহদ্বারযুক্ত ভূনিম্নস্থ গৃহের বিপক্ষে।
কবি অনুপস্থিত। আমরা, শুধুুুই সম্মান জানাতে সমবেত আজ।
পাপ স্বীকারের পর, সমাধিস্তম্ভ সম্পূর্ণ ঢেকে ফেলে তাঁকে
যতক্ষণ না পর্যন্ত তাঁর কর্ম-নৈপুণ্যের দীপ্তিময় জ্বলজ্বলে গৌরব
চাপা পরে যায়; ঢেকে যায় সবটুকু গৌরব।
অহংকারী আলো, জানালায় জ্বলজ্বলে দীপ্তি ছড়াতে থাকে,
মৃত্যুময় সূর্য কথা বলে ওঠে, বিশুদ্ধ অগ্নি; আগুনেই শুদ্ধতা;
অবশেষে ছাই, ভস্ম হতে ভস্মের মধ্যে
সমস্ত সাধারণ লেখার খসড়া কাগজ!

কম্পিত নিশ্বাসের মিথ্যা অহংকারের মতোই
তোমার অহংকার বিস্ময়কর, সুসম্পূর্ণ এবং একা—
সেই জনগণ ইতোমধ্যেই বদলিয়ে ফেলেছে সীমানা,
অন্ধকার হয়ে উঠতে পারে না কোনো ভবিষ্যৎ প্রেত।
কিন্তু যখন মিথ্যা শোকোচ্ছ্বাস তাদের প্রচারকার্যে নিযুক্ত
চক্ষুদ্বয়কে ঢেকে দিল; তখন অন্তত এই মৃত কবিদের ভেতর
একজনের পৌঁছানো উচিত ছিল আমার অলঙ্ঘনীয় পবিত্র কাব্যের
প্রশান্ত বধিরতায়। হেঁটে যায় মেহমান
হেঁটে যায় ভবিষ্যৎ বংশধরদের কুমারী বীর অবধি,
হেঁটে যায় তাঁর অস্পষ্ট কাফনের ওপর দিয়ে—
আমি ঘৃণা করি, আমি কান্নার মতো ভয়কে ঘৃণা করি।

বিশাল গহ্বর, জমাট কুয়াশার সাথে বহন করে নেয়
ভয়ানক বাতাসের গর্জন; যে গর্জনসমূহ
উচ্চারণ করতে পারে নি সে কোনোদিন;
এবং হারিয়ে যাওয়া মানুষটির অর্থহীন জিজ্ঞাসা—
স্বপ্নময় তীক্ষ্ণ চিৎকার, ‘বলো পৃথিবী কেমন ছিল?
তুমি? তোমার ছায়া!’ জানা নেই উত্তর;
শূন্য সীমানা; শুধু এই খেলাঘর
শূন্য কণ্ঠস্বর অস্পষ্ট ঘরঘরে গলায় বলে ওঠে,
‘আমি বুঝি না’। প্রভু স্থির চোখে দেখেন; ফিরাতে পারেন
পাপের পথ থেকে স্বর্গের অবিরাম অলৌকিক দৃশ্য।

একদিন তার কণ্ঠ ছিল একা। শেষাবধি
ঐ নিঃসঙ্গ কণ্ঠ থেকে উচ্চারিত শব্দে ঝরে পড়ে লিলি এবং গোলাপ।
এই মহান দাবির এমন কিছু কি অবশিষ্ট আছে?
না; মানুষেরা, ভুলে যাও তোমাদের সংকীর্ণ বিশ্বাসসমূহ,
কোনো ছায়া নেই, কৃত্রিম আগুনই আমাদের জন্য অন্ধকার।

তোমার চিন্তাতে, আমি তোমাকে আহ্বান জানাই,
অবশিষ্টটুকু; ওহ্, আমি এখন হারিয়ে যাই
এই তারকাখচিত বাগানের ভেতর;
ভালোবাসার পাত্র থেকে লাল মাতাল শব্দ দিয়ে সম্মান জানাও
সম্মান জানাও আমাদের পৃথিবীর স্থির দুর্ভাগ্যকে।

বাতাসের ওপর পবিত্র আলোড়ন
হিরকখণ্ডের স্ফটিক স্থির দৃষ্টি এবং বৃষ্টিপাত—
প্রিয় ফুলের ওপর উজ্জ্বল চির-যুবক হিরকদৃষ্টি;
চির-তরুণ বৃষ্টিপাত; সূর্যালোকমুহূর্তে সব ভেঙে যায়
মুছে যায়, শেষ হয়ে যায়; বিচ্ছিন্ন সবকিছু।
পুষ্প-উদ্যানের পথে তাঁর সমাধিস্তম্ভ সজ্জিত
এখানেই একমাত্র সত্য এবং স্থায়ী আলো,
যেখানে কবি অপ্রত্যাশিত, বিনীত নম্র ভঙ্গিমার সমাপ্তি
সেই স্বপ্ন যা তাঁর ভেতরের মানুষকে হত্যা করে,
আজই তাঁর নিদ্রার মহান প্রভাত,
সুপ্রাচীন মৃত্যু এখন গোতিয়ের মতোই তাঁর সাথে
বুজে থাকা অলঙ্ঘনীয়  চক্ষুদ্বয়ের ভেতর,
সহিষ্ণুতার জন্য শান্তির সুযোগ;
আমরা দাঁড়িয়ে থাকি এবং তাকিয়ে দেখি
এই নিরেট সমাধিস্তম্ভ ধারণ করে সেই সবকটি হৃদয়
কৃপণ নিথর নীরবতা এবং বৃহদাকার সুবিশাল রাত্রি।

বোদলেয়ারের বন্ধু ফরাশি কবি ও ঔপন্যাসিক থিয়োফিল গোতিয়ের (১৮১১-১৮৭২); যাকে বোদলেয়ার তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ লা ফ্ল্যর দ্যু মাল উৎসর্গ করেছিলেন; তাঁর মৃত্যুর পর কবির স্মৃতি-সম্ভার অনুষ্ঠানে সববেত হয়েছিলেন উ্যগো এবং ল্যকঁৎ দ্য লিল-এর পাশে মালার্মে ও ইংরেজ কবি সুুইনবর্ন। ‘তোস্ত ফ্যুনের্ব’ এ উপলক্ষে রচিত; যা মালার্মের বহু সনেট এমনকি ভেরলেন ও এডগার এলেন পো-র উদ্দেশ্যে লেখা অপেক্ষাকৃত কম জটিল কবিতাগুলোর চেয়েও অধিক জনপ্রিয় এবং নান্দনিক। কবিতাটি কার্যকরণগত দিক থেকে অস্পষ্ট। কবিবন্ধু গোতিয়ের প্রতি অকৃত্রিম বন্ধুত্ব ও নিয়তিনির্ভর দীপ্ত অহঙ্কারবোধে এটি উদ্ভাসিত। আপাত জটিল ভাষা সমন্বয় অর্থহীন শব্দের পারম্পরিকতার সূত্র ধরে অগ্রসর হলেও সামগ্রিক ঐক্যবন্ধনে চূড়ান্ত অনুভূতি পাঠককে পৌঁছে দেয় কবির প্রকৃত বক্তব্যের কাছাকাছি নয় বরং প্রকৃত বোধের গভীরতায়। যে গভীরতা প্রচ্ছন্ন থাকে কাব্যের শরীরে নির্মিত বহুবিধ চলমান ছবি ও শব্দের বহমানতায়। আর এই গভীরতার মধ্য দিয়ে প্রতিভাসিত হয়েছে কবির প্রকৃত কাব্য-বিশ্বাসের নান্দনিক অহংবোধ। যে অহংবোধ আশ্রয় লাভ করে রহস্যময় স্বপ্নজগতে। যে স্বপ্নজগতে শাদা কফিন বস্ত্রের ওপর দিয়ে হেঁটে যায় অশরীরী অস্তিত্ব। যার যাত্রাপথ ভবিষ্যতের কুমারী বীর অবধি।


অভিজ্ঞতালব্ধ দৃশ্যপটের ভেতর অবলীলায় বোর্হেস প্রবেশ করিয়ে দেন অর্থপূর্ণ জীবন-জিজ্ঞাসা।


মালার্মে তাঁর কবিতায় ব্যবহার করেছেন এমন কিছু বাকপ্রতিমা যা মালার্মের ক্ষেত্রে শেষ পর্যন্ত কিছু প্রয়োজনীয় প্রতিভাস নির্মাণ করেছে। যেমন কুমারীত্ব, নিষ্ফলতা, মৃত্যু, খনিজ, বরফ, লেক, রাজহংস, ডানা, ঊষা, হেমন্ত, হীরক, নক্ষত্র, স্বর্ণ, তুষার ইত্যাদি; ফলে মালার্মের কবিতা কেবলমাত্র অতীন্দ্রিয়বাদীদেরই সহজবোধ্য। যেমন, বিশুদ্ধ নন্দনতত্ত্বের তুষারস্রোতে মালার্মের যাত্রা; এই ‘তুষারস্রোত’ মালার্মের রচনার এমন একটি গুহ্য শব্দ যা তাঁর নৈর্ব্যক্তিকতা, বন্ধ্যাত্ব, বিশুদ্ধতা ও সৌন্দর্য বিষয়ক তত্ত্বসমৃদ্ধ শব্দের বিপরীত। এই ‘তুষারস্রোত’ মালার্মের অন্তত তিনটি কবিতার অন্যতম প্রতীক। প্রতীক অনুসন্ধানে মালার্মে ভেরলেনের অনুরোধে মালার্মের আত্মজীবনী বিষয়ক চিঠিতে লিখেছেন, আমি সারাটাজীবন স্বপ্ন দেখেছি, সাধনা করেছি, ভিন্ন কিছুর জন্য; এমন কিছু যা একজন কেমিস্ট করে থাকে; আমি একজন কেমিস্টের ধৈর্যে সেই মহৎ কাজের জন্য সেই মহৎ কাজের মালমশলা যুগিয়ে চলেছি।

অবশ্য এমনতর জটিল কাব্যভাষা পাঠকের জন্য গুরুত্বপূর্ণ কিনা তা বলা কঠিন। তারপরও মালার্মের ক্ষেত্রে অপরিহার্য তো বটেই এমনকি এটা একটি ধ্রুপদী শিল্পকৌশলও বটে; যা স্বতঃস্ফূর্ত এবং শাশ্বত। পাশাপাশি এও ঠিক, অদৃশ্যের অর্থোদ্ধারের জন্য যে কবিতা, তার ভাষামাধ্যম এবং কাব্যজগৎ, কাব্যমেধা তথা সমসাময়িক প্রবাহমান জগতের সাথে সামঞ্জস্য রেখে অনিবার্য কাব্যভাষা ও কাব্যজগৎ নির্মাণ করে চলেছে; যদিও বর্তমানে কবিতা এই অনিবার্য সময় উপযোগী পথ নির্মাণে কিছুটা হলেও বিভ্রান্ত। ফলে হয়তো কবিতা ফিরে যেতে চায় সেই একশ বছর পেছনে; যেখানে রয়েছে প্রতীকী জগতের এক রহস্যঘনচক্র।

বোর্হেসের মতে, তাঁর কবিতায় তিনি অধিবিদ্যা ও ধর্মশাস্ত্রের সাহিত্যিক সম্ভবনাগুলোকে উন্মোচিত করার চেষ্টা করেছেন। তথাপি তাঁর কবিতার বিষয় মূলত ঐহিত্যনির্ভর। অভিজ্ঞতালব্ধ দৃশ্যপটের ভেতর অবলীলায় বোর্হেস প্রবেশ করিয়ে দেন অর্থপূর্ণ জীবন-জিজ্ঞাসা। ফলে শুরু হয় অনুসন্ধান। অনিবার্য ভ্রমণ-তৃষ্ণা কবিসত্তাকে নিয়ে যায় আননোন স্ট্রিটের রহস্যঘন রূপকল্পের কাছাকাছি। চমৎকার বিষয় হলো, বোর্হেসের কাছে প্রতীক শেষ পর্যন্ত প্রতীকী জগতের রহস্যঘন পরিবেশ থেকে বের হয়ে এসে সরাসরি পাঠকের অনুভূতিতে তৈরি করে দেয় প্রকাশযোগ্য অর্থ। এই অনিবার্য অর্থ-নির্মাণ কৌশল, প্রতীকবাদী সাহিত্য টেকনিকের অগ্রবর্তী ধাপ; যা শিল্পকে আরও পরিশুদ্ধ ও আন্তরিক করে তোলে। সম্ভবত এ কারণেই বোর্হেস কার্যকরণ সূত্রহীনতায় দ্বিধান্বিত নন; বরং তিনি পরিষ্কার আবিষ্কার করেন, ‘মাই ফুটস্ট্যাপস ফাউন্ড আ স্ট্রিট আই ডিড নট নো’ এবং পরিশুদ্ধ আন্তরিকতায় দেখতে পান,

বেলকনির রেলিঙে কোনো এক বালিকার স্বপ্ন
আমার ভেতরে তার হৃদয়
স্পষ্ট ফোঁটায় ফোঁটায় খসে পড়ে পরিষ্কার চোখের জল।

এই পরিষ্কার ফোঁটায় ফোঁটায় খসে পড়া চোখের জল যার একমাত্র কারণ আত্মার গভীর থেকে উঠে আসা ঘনিষ্ঠ গভীর উত্তেজক এবং ‘মিরাকল অফ দ্য গ্লোইং স্ট্রিট’ এবং ‘আই রিয়ালাইজড দ্যাট, দ্যাট প্লেস ওয়াজ স্ট্রেঞ্জ’ এবং

সেই প্রতিটি গৃহ এক একটি আলোর দীপাধার
যেখানে জীবন জ্বলে ওঠে প্রতিটি পৃথক আলোকশিখায়,
আমাদের সেই প্রতিটি নিকটবর্তী পদক্ষেপ
গলগোথাসের ওপর দিয়ে তৈরি করে অপরের পথ।

এই পথ পরিক্রমা, এই যে পথ নির্মাণ, যে নির্মাণকলাতে প্রোথিত থাকে মানবজন্মের প্রগাঢ়তম রহস্য। এখানেই কবিসত্তার বিস্ময়কর আবিষ্কার।

প্রকৃত প্রস্তাবে মাতৃভাষার বাইরে যে কবিতার জন্ম তা পাঠকের কাব্যবোধের জটিলতার সীমানা বাড়িয়ে দেয় মাত্র। এ অবস্থায় ভিন্ন ভাষার ফ্রেজ, শ্ল্যাং, কালচার, আচরণ অথবা আবেগকে অনুবাদ করতে গেলে তা নতুন সৃজনশীলতায় কবিতার জটিলতাকে আরেক ধাপ এগিয়ে দেয়। ফলে অনুদিত কবিতার প্রকরণগত বিষয়, বিশেষ করে ভাষাগত শিল্প নৈপুণ্য বিশ্লেষণ করার চেষ্টা বাতুলতা মাত্র। বরং সে চেষ্টা না করে কবিতার ভাবগত সৌন্দর্য উদ্ধার প্রসঙ্গে কবিতার আপাতবাস্তব চিত্রানুভূতি অতিক্রম করে অতিবাস্তব সত্যে উত্তীর্ণ হওয়ার চেষ্টা করা যেতে পারে। এ পর্যায়ে বোর্হেস-এর ‘লা রেকোলেটা’ কবিতাটি মূল স্পেনিশ থেকে বাংলা ভাষায় রূপান্তর করা হলো। কবিতাটি নরম্যান থোমাস দি গিয়োভানি ইতিপূর্বে ইংরেজিতে ভাষান্তর করেছেন।

রেকোলেটা

আমাদের আয়ত্তে এই নশ্বর জীবন
অজস্র সুদৃঢ় পূর্ণাঙ্গ ধুলোর ভেতর,
আমাদের ক্ষীণ কণ্ঠ আর মন্থর পদক্ষেপ
সারি সারি মন্থর পারিবারিক সমাধিগৃহ,
যার স্বর্ণোজ্জ্বল ছায়ায় কাব্যময় মার্বেল পাথর
প্রতিজ্ঞা অথবা পূর্বাভাসে বিদ্যমান মৃত্যু-গৌরব।
সমাধিগাত্রে চমৎকার কিউবিয়ান সুরমূর্ছনা,
নগ্ন লাতিন আর ভয়ানক দিনটির যোগাযোগ,
পুষ্পসম্ভার আর মার্বেল পাথরের যোগাযোগ
এবং পরিচ্ছন্ন বাগানের বিশালতা
এবং আমাদের সমস্ত গতকাল আজ কাহিনি মাত্র
আজকের সময় স্থির, বন্দি, অদ্বিতীয়।
মৃত্যুর এই প্রশান্তিকে আমরা ভুল বুঝি
আমাদের শেষ দিনটির জন্য আমরা দীর্ঘদিন ধরে ভাবছি
এবং দীর্ঘদিন সেই স্বপ্নের ভেতর বিভোর।
তরবারির কম্পনে তীক্ষ্ণ উত্তেজনা
আইভি লতায় নিদ্রা; বেঁচে থাকার নামই অস্তিত্ব।
স্থান এবং সময়ের ভেতর তোমার কিউবিয়ান সুর,
হৃদয়ে ঝঙ্কৃত সুরের জাদু এবং যখন এই জীবন জ্বলে ওঠে
স্থান-কাল-মৃত্যুকে সাথে নিয়ে চলে যায়,
দিনের আলোর মতো যখন নিভে যায় জীবন
আয়নার মিথ্যে প্রতিবিম্বের মতো সকলেই তখন পড়ন্ত বিকেলের আলো।
গাছেদের মহান পরশ; সবুজ শাখায় বাতাস আর পাখিদের তরঙ্গ,
অপরের আত্মার সাথে আমার হৃদয় যায় চারিদিকে ছড়িয়ে,
ঐশী আগন্তুক আমাদের মুক্ত করে; ইন্দ্রিয়াতীত এই অলৌকিক রহস্য,
এমনকি এর কল্পনারাশি আমাদের দিনগুলোকে করে তোলে ভয়ানক দূষিত।
রেকোলেটাতেই বসে ভাবছি এতসব; যেখানে রয়েছে আমারই দেহভস্ম।

মৃত্যুচেতনার এই মহান উদ্ভাসন ইহলৌকিক ও পারলৌকিক জীবনকে সমান্তরালে সূচিত করেছে। বোর্হেস-এর কবিতা আমাদের দু’ধরনের অনুভূতিকে বিলোড়িত করে। প্রথমটি, ‘অলৌকিক আনন্দের ভার’ আর দ্বিতীয়টি ‘সীমাহীন মহাজাগতিক শূন্যতাবোধের যন্ত্রণা’। বোর্হেস-এর রেকোলেটাতে যেমন অলৌকিক আগন্তুক এসে এই নশ্বর জীবনকে মুক্ত করে দেয় তেমনি অপরের আত্মার সাথে আমাদের হৃদয় যায় চারিদিকে ছড়িয়ে। এই মহাজাগতিক উপলব্ধিতে প্রোথিত থাকে কবির দেশ, জাতি, সময় এবং ঐতিহ্য। ফলে বোর্হেস আলোড়িত হন ইতিহাসের মধ্যে; আর হেনতিনার ইতিহাস, ল্যাটিন আমেরিকার ইতিহাস এবং শেষ পর্যন্ত সমগ্র সভ্যতার ইতিহাসের মধ্য দিয়ে কবি আবিষ্কার করেন প্রকৃত জীবনরহস্যের শাশ্বত ফসিল। যে ফসিলের ভেতর কাল-মহাকাল একাকার। কখনো দেহধারণকৃত জীবনের মধ্যে, কখনোবা দেহত্যাগী জীবনের সমাহিত চেতনার মধ্যে বোর্হেস-এর কাব্যসত্তা স্ফূর্তি লাভ করে। এই ইহলৌকিক ও পারলৌকিক চেতনার যোগসূত্রের ভেতর প্রোথিত বোর্হেস-এর সবটুকু গতকাল; যার যোগফলের পরিচিত নাম ‘জীবন’।

মালার্মে এবং বোর্হেস, যাঁদের মধ্যে সময়ের পার্থক্য প্রায় অর্ধ শতাব্দীকাল। এই পার্থক্যের মধ্যে বিবর্তিত হয়েছে শিল্পকলার প্রকরণগত কৌশল তথা সভ্যতার যন্ত্রণাবোধ। উভয়ের মধ্যে যে মুক্তি আকাঙ্ক্ষা; জ্ঞান থেকে, ধারণকৃত জীবন-কাঠামো থেকে এবং অনাবিষ্কৃত রহস্যের যন্ত্রণাবোধ থেকে পরিত্রাণের যে প্রতিনিয়ত লড়াই তা ক্রমাগত নতুন নতুন কাব্যমাত্রার সৃষ্টি করেছে। সম্ভবত এখানেই কবিসত্তার বিবর্তন। শুধু প্রকাশেই নয়, শুধু নির্মাণেই নয়; বরং মৃত্যুই পরম-সত্তা; এই উপলদ্ধির সাথে উভয়েই মিলিয়ে নেন পরিচিত দেহকে; দেহের ভেতর সংঘটিত চেতনাকে এবং চিরন্তন সভ্যতার অনিবার্য যাত্রাপথকে; যে যাত্রাপথ ক্রমাগত ধাবিত হচ্ছে উইলিয়ম স্টিফেন হকিং-এর ব্ল্যাকহোল-এর দিকে। এই অনিবার্য চেতনার ভাষান্তরই মূলত স্তেফান মালার্মে এবং হোর্হে লুইস বোর্হেস-এর অভিজ্ঞতা। এই অভিজ্ঞতাই কবিসত্তাকে শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত করেছে শুদ্ধতার প্রতীক হিশেবে। মানব সন্তানগণ এই শুদ্ধতম প্রতীক-প্রজ্ঞার অর্থ উদ্‌ঘাটক হবেন। এবং এ কথা ঠিক যে, এই প্রতীক-প্রজ্ঞার অর্থ উদ্‌ঘাটনের আলোকেই কবিতার আপাত বিভ্রম দূর করা সম্ভব।

শিমুল মাহমুদ
Shimul Mahmu

শিমুল মাহমুদ

জন্ম ৩ মে ১৯৬৭, সিরাজগঞ্জ জেলার কাজিপুর।

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে পাঠ গ্রহণ শেষে ইউজিসি-র স্কলার হিসেবে পৌরাণিক বিষয়াদির ওপর গবেষণা করে অর্জন করেছেন ডক্টরেট ডিগ্রি। বর্তমানে তিনি রংপুর বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক, চেয়ারপারসন ও কলা অনুষের ডিন-এর দায়িত্ব পালন করছেন।

প্রকাশিত বই :
কবিতা—
মস্তিষ্কে দিনরাত্রি [কারুজ, ঢাকা: ১৯৯০]
সাদাঘোড়ার স্রোত [নিত্যপ্রকাশ, ঢাকা: ১৯৯৮]
প্রাকৃত ঈশ্বর [শ্রাবণ প্রকাশন, ঢাকা: ২০০০]
জীবাতবে ন মৃত্যবে [শ্রাবণ প্রকাশন, ঢাকা: ২০০১]
কন্যাকমলসংহিতা [ইত্যাদি, ঢাকা: ২০০৭]
অধিবিদ্যাকে না বলুন [ইত্যাদি, ঢাকা: ২০০৯]
আবহাওয়াবিদগণ জানেন [চিহ্ন, রাজশাহী: ২০১২]
কবিতাসংগ্রহ : সপ্তহস্ত সমুদ্রসংলাপ [রোদেলা, ঢাকা: ২০১৪]
স্তন্যপায়ী ক্ষেত্রউত্তম [অচেনা যাত্রী, উত্তর ২৪ পরগণা: ২০১৫]
বস্তুজৈবনিক [নাগরী, সিলেট: ২০১৬]

গল্প—
ইলিশখাড়ি ও অন্যান্য গল্প [নিত্যপ্রকাশ, ঢাকা: ১৯৯৯]
মিথ মমি অথবা অনিবার্য মানব [পুন্ড্র প্রকাশন, বগুড়া: ২০০৩]
হয়তো আমরা সকলেই অপরাধী [গতিধারা, ঢাকা: ২০০৮]
ইস্টেশনের গহনজনা [আশালয়, ঢাকা: ২০১৫]
নির্বাচিত গল্প [নাগরী, সিলেট: ২০১৬]
অগ্নিপুরাণ ও অন্যান্য গল্প [চৈতন্য, সিলেট: ২০১৬]

উপন্যাস—
শীলবাড়ির চিরায়ত কাহিনী [ইত্যাদি, ঢাকা: ২০০৭]
শীলবাড়ির চিরায়ত কাহিনী [ধানসিড়ি, কলকাতা: ২০১৪]
শীলবাড়ির চিরায়ত কাহিনি [চৈতন্য সংস্করণ, ২০১৬]

প্রবন্ধ—
কবিতাশিল্পের জটিলতা [গতিধারা, ঢাকা: ২০০৭]
নজরুল সাহিত্যে পুরাণ প্রসঙ্গ [বাংলা একাডেমী, ঢাকা: ২০০৯]
জীবনানন্দ দাশ : মিথ ও সমকাল [গতিধারা, ঢাকা: ২০১০]
বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ধারার কবিতা [গতিধারা, ঢাকা: ২০১২]
মিথ-পুরাণের পরিচয় [রোদেলা, ঢাকা: ২০১৬]

ই-মেইল : shimul1967@gmail.com
শিমুল মাহমুদ
Shimul Mahmu