হোম গদ্য মলাটের ভেতর থেকে : মায়াপারাবার

মলাটের ভেতর থেকে : মায়াপারাবার

মলাটের ভেতর থেকে : মায়াপারাবার
510
0
এই বইয়ের কাহিনি স্মৃতিনির্গলিত, অটোবায়োগ্র্যাফিক, রচয়িতার জীবনের উষাকাল এর উপজীব্য।
শুধু রচয়িতারই নয়, বাংলাদেশেরও উন্মেষপর্বের একটি বিশেষ ভঙ্গির স্মৃতিচিত্র এই বই।

.
স্মৃতিলেখা হলেও উপন্যাসোপম এ-আলেখ্য গরিমার সেই কালখণ্ড, ১৯৭১ ও অব্যবহিত পূর্বাপর, ছুঁয়ে রেখে এগিয়েছে একেবারেই নির্ঝরের মতো স্বতশ্চল। রচনার অন্তর্গত স্থানিক ও কালিক নির্দিষ্টতা সত্ত্বেও বইটি পিছুসময়ের গোটা বাংলাদেশের শীতগ্রীষ্মজলবায়ু, উদ্বেগ ও বিহ্বলতা, ভাঙন ও উত্থান, ভোর-দুপুর-অপরাহ্ণ চলচ্চিত্রিত করেছে ব্যঞ্জনাবাহিত বর্ণনাকৌশলে।
এই দৃশ্যমর্মরিত রচনাটি বিবৃত হয়েছে পৃথিবীর-পাঠশালায়-পা-রাখা এক বালিকার বরাত দিয়ে, যে নেত্র প্রসারিয়া গ্রাসিছে তার চারপাশ, সক্রিয় হচ্ছে যে ক্রমশ জগতের সঙ্গে, যে তার রক্তসূত্রের জ্ঞাতিদের মায়াবাঁধনে থেকেও খোঁজ নিতে শিখছে আরও বড় ভুবনপারাবারের।
.
মুক্তিযুদ্ধকালীন বাংলাদেশের অন্তঃপুরের ইতিহাস, কতিপয় আপনজনের সংবেদনা ও আনন্দ, অনাড়ম্বর অথচ অন্তরঙ্গ ভঙ্গিতে গেঁথে রেখে এই স্মৃতিকাহিনি নির্মিত। সরল, সহজিয়া, মায়াবাতাসের মতো মর্মস্পর্শা। আত্মজৈবনিক হয়েও উপন্যাসোপম।
.
মায়াপারাবার বইটি প্রকাশ করেছে নান্দনিক। বই থেকে অংশবিশেষ পাঠকদের জন্য…

ছেলেধরার ডাক পেলাম
.

‘ছেলেধরা’রা প্রায়ই নাকি বাচ্চাদের ধরে নিয়ে যায়—এ-কথা আব্বা-আম্মা প্রায়ই বলে। তারা নাকি বাচ্চাদের ধরে নিয়ে গিয়ে চোখ উপড়ে ফেলে, নইলে হাত-পা ভেঙে দেয়! চোখ উপড়ে, হাত-পা ভেঙে ভিক্ষা করার জন্য রাস্তায় বসিয়ে দেয়। ‘ছেলেধরা’র গল্প আব্বা-আম্মার কাছে শুনে ভাবতাম আমাকে কেউ ধরবে না। কারণ আমি তো মেয়ে—এখানে তো মেয়েধরার কথা কেউ বলে না। কিন্তু আব্বা-আম্মা তবুও সাবধান করত—‘অপরিচিত কেউ ডাকলে কাছে যাবা না, বুঝলা, খবরদার!’
‘কোনো অচেনা মানুষের কাছ থেকে কিছু খাবা না, বুঝলা?’

ছেলেধরারা নাকি বাচ্চাদের গায়ে সোনার গয়না দেখলে তাকে কিছুতেই নিস্তার দেয় না। এদিকে আমি আছি বিপদে। আম্মা নানাভাইকে দিয়ে আমার জন্য গলার হার বানিয়ে এনেছে। এই হার নিয়েও কাহিনির অন্ত নাই! যতদিন নানাভাই হার বানিয়ে আনে নি, দাদাজান আমাকে ক্ষেপিয়ে একশেষ করেছে।
দাদার মুখে এক ছবক—
‘তোমার নানা তো ধামরাইয়ের জোলা। জোলাগো বুদ্ধি-আক্কেল আছে নাকি? তোমার হার বানানোর টাকা দিয়ে সে দেখো গা কদমা কিনা খাইছে।’
শুনে আমি কত-যে কান্নাকাটি করেছি! আমার নানাভাই এত খারাপ! একে তো সে তাঁতি, তার উপর আমার হার বানানো টাকায় কদমাও কিনে খেয়ে ফেলেছে! হায়, আমার হারের কী হবে! কিন্তু দাদাজানের কথা মিথ্যা প্রমাণ করে নানাভাই ঠিকঠিকই আমার হার নিয়ে এল। সুন্দর গোলাপি পাতলা কাগজে মোড়ানো একছড়া সোনার হার!

হারের গোল লকেটের মাঝখানে আমার নাম লেখা ‘পাপড়ী’। আমি তখনো ইশকুলে যাই না, লেখাপড়া জানি না, কিন্তু নানাভাই দেখিয়ে দিয়েছেন—আমার নাম আছে ওতে। সেই থেকে আমি গলায় পরে আছি সোনার হার। পরবর্তীকালে সোনারুদের লেখা ভুল বানানে নিজের নাম ‘পাপড়ী’ লিখেছি ম্যালা দিন। আজও সোনারুদের ভুল বানানেই চাচা আমাকে চিঠি লেখে।

আমি সোনার হার পরার পর আব্বা আরও সতর্ক। বলল, ছেলেধরাদের হাতে রুমাল থাকে, আর সেই রুমাল নাকে ধরলেই বাচ্চারা অজ্ঞান হয়ে যায়। সাবধান করল গলায় হার পরে আমি যেন কিছুতেই বাইরে না-যাই।

একদিন দুপুরের দিকে আমি উদলা গায়ে বাসার গেইটে দাঁড়িয়ে আছি—হঠাৎ দেখি লম্বা-ঢ্যাঙা মতো একটা লোক আমার দিকে ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে রয়েছে। তার পরনে কালো প্যান্ট আর চেক শার্ট। আমাকে দেখে চাপা গলায় বলল—
‘এই খুকি শোনো, এদিকে শুনে যাও একটু।’
আমি ভাবছি যাব কি যাব না, কিন্তু এই মানুষকে তো আমি চিনি না। তাকিয়ে দেখি তার হাতের ভেতর লাল রঙের রুমাল। আরে, আব্বা না আমাকে সতর্ক করে দিয়েছিল! এই তো সেই ছেলেধরা!
আজ কি সে ছেলেদের না-ধরে মেয়েদের ধরতে এসেছে? নইলে আমায় কেন ডাকছে?
লোকটা ফের মিনমিনিয়ে ডাকে—
‘এই খুকি, শুনে যাও। ডাকতেছি, শোনো না কেন?’
এবার আমি ভয়ে কেঁপে উঠি। ভোঁ দৌড়ে বাসায় ঢুকেই ঝাঁপিয়ে পড়ি দিদির পিঠে। দিদি স্টোভে রান্না করছে। চমকে বলে—
‘কী হইছে? কাঁপতেছস ক্যান?’
‘দিদি ছেলেধরা আমারে ধরতে আসছে।’
দিদির রান্না মাথায় ওঠে—
‘কই, চল তো দেখি!’
দিদি দ্রুত গেইটে গিয়ে দাঁড়ায় আর আঁতিপাঁতি করে খোঁজে—
‘কই, কাউরে তো দেখি না। কেরা তোরে ডাকে?’
আমি অবাক হয়ে দেখি, সত্যি! লোকটা নেই! পলকেই যেন হাওয়া হয়ে গেছে!
দিদি আমাকে কোলে তুলে নিয়ে পানের খুশবু ছুটিয়ে বলে—
‘কই ছেলেধরা? তুমি বুঝলা কেমনে যে সে ছেলেধরা?’
‘আমারে যে ডাকল! আর তার হাতে লাল রুমাল ছিল।’
দিদি পান-খাওয়া-ঠোঁটে আমার গালে চুমু দিয়ে বলে—
‘বইনে কেউ ডাকলে কিন্তু যাইবা না, বুঝলা?’
আমি ততক্ষণে দিদির স্তন নিয়ে খেলতে শুরু করেছি।


এই সেই ঘাট সই এই সেই জল
এই সেই ছায়াতল বকুল-হিজল
.

আব্বা হঠাৎ করেই আমাদের গ্রামের বাড়িতে পাঠিয়ে দিল। ঢাকা তখন ক্রমে আন্দোলনে উত্তাল হতে শুরু করেছে। শুরু হয়েছে গণ-অভ্যুত্থান। চলছে নানান মিছিল-মিটিং। আব্বা চাইল ঢাকা থেকে সরে আমরা যেন নিরাপদ আশ্রয়ে থাকি। দাদাজান-দিদির কাছাকাছি থাকি।

বাংলার মানুষ চাইছে একটা যুদ্ধ। নিজেদের মুক্তির জন্য যুদ্ধ। চাইছে নিজেদের স্বাধীন ভূখণ্ড—আমার বাংলাদেশ!
এসবই আমার বড় হয়ে জানা।

গ্রামের বাড়িতে আসতেই ঢাকা শহর, যে-শহরে আমার জন্ম—তা কেন যেন আমার কাছে খুব আবছা হয়ে গেল! এবং সেই থেকে ঢাকা আমার কাছে কোনোদিন আর আপন হতে পারে নাই।

আমাদের গ্রামের বাড়িতে তিন-চার ঘর শরিক। আর এত বড় বাড়ি যে চোখের দৃষ্টি মেললে শেষ সীমানা দেখা যায় না। আমাদের দুইটা পুকুর। আর বাড়ির সামনে দিয়ে চলে গেছে মস্ত খাল। খাল বয়ে যায় পুকুরের মাঝ দিয়ে। পুকুরের অন্য পাশেই জমিদারবাড়ি।
খালের ধারে বকুল গাছ। ঝাঁকড়া-তরতাজা বকুল। পাশে প্রায় ন্যাড়া হিজল আর বইন্যা গাছ। বইন্যা দেখতে কদবেলের মতো। ঢুস ঢুস করে পানিতে পড়ে। আর পচে উঠলে দুর্গন্ধ ছড়ায়।
বাড়ির সামনে যে বয়ে-যাওয়া খাল, তার এমন অদ্ভুত রূপ! এই খাল বাইস্যা মাসে জলে থইথই আর উইন্যা মাসে এতে গভীর খাদ!
উইন্যা মাসে এই গভীর খাদে আমাদের খেলাধুলা চলে। খাদের ভেতর লাফিয়ে আমরা খেলি কুম্ভির-কুম্ভির। একজন কেউ কুমির হয়, আর সে আমাদের হা করে খেতে আসে। আমরা সজোরে দৌড়াই আর সমস্বরে বলি—

কুম্ভির তর গাঙে নাইমাছি
কুম্ভির তর গাঙে নাইমাছি…

এই কুম্ভির গাঙে নামতে-না-নামতেই একদিন ভোরবেলায় দেখি অন্য রূপ! একেবারে অপরূপ দৃশ্য! খালের মাঝ দিয়ে তিরতির করে জল বইছে! ঠিক চার আঙুল সমান এই জলের ধারা। তারপর তা প্রতিদিন বাড়তে থাকত। নতুন জলের ধারায় ভেসে আসত রঙিন কাপড়-পরা পুঁটি মাছের ঝাঁক। একেবারে গিন্দিগিন্দি মলা, ঢেলা, চাপিলা, দারকিনা, কাকিলা। আর প্রতিদিন ফুলতে থাকত জল, জলের সাথে মাছ! জল বিনে মীন, আর মীনহীন জীবন ভাবাই যেত না।

জল বাড়তে বাড়তে খালের এমন রূপ, যেন কোনো নদী নাকি সমুদ্দুর! আমরা ভাবতাম এই বুঝি খাল থেকে উঠে আসছে কোনো জলকন্যা! দিদির কাছে শুনতাম এই খাল দিয়ে শিশু (শুশুক) ভেসে যায়। শিশু নাকি হঠাৎ করেই তার পাছা জলের উপর তুলে ধরে। এই খাল দিয়েই ভেসে চলে যায় ধান-বোঝাই নৌকা গয়না। ভেসে যায় কোষা, ডিঙি, কখনো পানসি নাও। পানসি বা বড় কোনো গয়না আসতে দেখলেই আমরা সার বেঁধে খালপাড়ে দাঁড়িয়ে যেতাম। আর বড়দের কাছ থেকে শোনা শ্লোক বলতাম—

পানসি নাও পানসি নাও
পান খাইয়া যাও
পান্নার শাশুড়ির ঢবলা গুয়া
তুইল্যা নিয়া যাও…।

এই ‘গুয়া’ শব্দটি বলতে গিয়ে আমরা বেশ আড়ষ্ট হয়ে উঠতাম। আমাদের আঞ্চলিক ভাষায় ‘গুয়া’ মানে ‘পাছা’। এই গুয়া নামক লজ্জাকর শব্দটির সাথে যুক্ত কারো শাশুড়ি!

এই পান্নাদের বাড়ি ছিল আমাদের বাড়ির সীমানা ছাড়িয়ে অন্য সীমানায়। ওর মা ও দাদি আমাদের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করত। ওদের বাড়িতে যাওয়া আমাদের জন্য নিষিদ্ধ ছিল। কারণ ওরা হলো ‘গেরস্ত’ আর আমরা হলাম ‘মিয়া’। কিন্তু ওই গেরস্ত-বাড়িতেই আমার মন চলে যেত। মনে হতো যাই, গিয়ে দেখে আসি ওরা কী খায়? কেমনে ঘুমায়? মিয়ারা কখনো গেরস্ত-বাড়ির চৌহদ্দি মাড়াত না। দিদিকে দেখতাম কাজের দরকার হলে গলা বাড়িয়ে আমাদের শেষ সীমানায় গিয়ে ডাক দিত—
‘ও ময়নার মা, ময়নার মা—এট্টু আইসো তো, শুইন্যা যাইও।’

পান্নার সবচেয়ে বড় বোনের নাম ময়না, তার পরের জন পাখি। আমি জন্মানোর পর এই পাখি আম্মার কাছে ছিল। পাখি আমাকে দেখাশোনা করত। পাখির ছোট আঁখি। তারপর আন্না, পান্না। ওরা আমাদের খেলার সময় হলে এসে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকত। আমাদের সাথে খেলতে নামবে এমন সাহস ওদের ছিল না। আমি ওদের হাত ধরে টেনে খেলায় নামাতাম। আমাদের বাড়ির বড়রা কেউ এসে পড়লে ওরা খেলা ফেলে দাঁড়িয়ে পড়ত। ‘মিয়া বাড়ি’র মেয়ে হয়েও আমি ‘গেরস্ত-বাড়ি’র মেয়েদের সাথে মিশতাম বলে আম্মা আমাকে খুব বকত। কিন্তু আমি কোনোকালেই ‘মিয়া’ হতে পারলাম না, গেরস্থও না—এর মাঝামাঝি কিছুতে যেন আটকে থাকলাম! ‘গেরস্ত’দের খেলায় না নিয়ে আমাদের উপায় কী? আমরা তো মাত্র কয়েক ঘর মিয়া। আর গ্রামের বেশিরভাগ ঘরই তো গেরস্থদের।

এদিকে আমাদের দিদি আমের একটা মস্তপানা ডাল কাটিয়ে রেখেছে। শুকিয়ে জ্বালানি করবে। এই ডালে চেপে আমাদের রেলগাড়ি-রেলগাড়ি খেলতে হবে যে! ফলে বড়দের রক্তচক্ষু ফাঁকি দিয়ে আন্না-পান্নাদের আমরা খেলায় নিতাম। ওদের গায়ের রঙ ছিল ভয়ানক কালো। আমাদের বড়দের কেউ কেউ ওদের ‘বকরি’ (ছাগল) ডাকত! অমন শিশুবেলাতেই আমার মন বিষণ্ন হয়ে উঠত। মানুষকে কেন জন্তু-জানোয়ারের নামে ডাকতে হবে?

বাইস্যা মাসে ভরা খাল মানে তো নদী নইলে সমুদ্দুর! দিদিরা গোসল করতে নামলে তেমন বিপত্তি হতো না। বিপত্তি হতো আম্মা-চাচিমারা গোসল করতে নামলে। তাদের যৌবন-ভরভরন্ত শরীর। ফলে প্রায় সকলেই শাড়ির উপর গামছা পেঁচিয়ে খালে নামত। হঠাৎ করে পানসি বা গয়না নৌকা এসে পড়লে দেখতাম আম্মা-চাচিমা-ফুফুরা গলাজলে নড়ন-চড়নহীন দাঁড়িয়ে আছে। মাঝিরা নৌকা নিয়ে চলে না-যাওয়া পর্যন্ত তারা এমন জলশাস্তি ভোগ করত। কারণ মিয়াবাড়ির বউ-ঝিদের গোসল অন্যেরা দেখে ফেললে সে ছিল ভারি মুশকিলের কথা!

খালের পাড়ে দাঁড়িয়ে আমরা ছোটরা দেখতাম আম্মা-চাচিমা-ফুফুরা জলে জলকন্যার মতো দাঁড়িয়ে রয়েছে। আর তাদের সামনে দিয়ে স্রোতের টানে ভেসে যাচ্ছে অজস্র হিজল ফুল। কখনো-বা বেগুনি ফুল সমেত দামের দঙ্গল। কাপড়চোপড় ধোয়াও চলত এই খালের পানিতে। এই খালেই আব্বা-চাচারা জিয়ালা দিয়ে ধরত বোয়াল, বাইন, রুই, কই, কাতলা মাছ।

আদতে বাইস্যা মাস মানেই ছিল জলের উৎসব। আব্বা-চাচাদের প্রচণ্ড মাছ মারার নেশা ছিল। ছুটিছাটায় বাড়ি এলেই তারা মাছ মারতে ছুটে যেত দূর-দুরান্তে। দেউলি, কাশিল, দাঁতমাজর নদীবর্তী গ্রামে। পাড়ে-দাঁড়ানো হিজল গাছটির অর্ধেক পানিতে ডুবে যেত। পানি যখন কমতে শুরু করত, গাছের শরীরে পানির দাগ দেখে আমরা বুঝতে পারতাম পানি কতটুকু কমেছে।


ছোরমানের ছোটভাই চিকা
.

সওদাগর বাড়ির সীমানা মাপা বেশ কঠিন। কোনখান থেকে শুরু আর কোথায় যে এর শেষ, ছাইছাতু কিছুই আমার মনে থাকে না। দিদি প্রায়ই আমাকে নিয়ে বনে-জঙ্গলে, আদাড়ে-বাদাড়ে ঘুরে বেড়ায়। উদ্দেশ্য বাড়ির সীমানাটা যেন আমি ভালো করে চিনে রাখি। আমার দিদি আবার ড্যাবরা, মানে বাঁহাতি। সব কাজ সে তার বাঁ হাত দিয়েই করে। দিদি আদুল গায়ে, একপ্যাঁচ দিয়ে শাড়ি পরে সারা বাড়ি ঘুরে বেড়ায়। কব্বরখানা, ঝোপঝাড়, টিয়াটুটি আমগাছ কিছুই সে বাদ রাখে না। আমাকে সাথে নিয়ে ঢ্যাঁপা শাক তুলে আর বলে—
‘ওই যে দেখছস ধানক্ষেত—রাজবাড়ির দেয়ালে গিয়া ঠেকছে, ওইটুকু আমাগো।’
‘আর এই যে পুকুর দেখতাছস—পুকুরের সবটা আমাগোর।’
‘আষাইঢ়্যা আমগাছ পার হইয়া বেতের ঝোপ পর্যন্ত সওদাগরগো।’
‘আর ওই যে দেখা যায় গাবগাছ—অইটা শেষ হইলে আমাগো সীমানা শেষ। হের পরে ছোরমানগো বাড়ি।’
আমি খুব আস্তে করে বলি—
‘ও দিদি ছোরমান নাকি চুরি করে খায়?’
দিদি পান-খাওয়া লাল জিব দাঁতে কেটে বলে—
‘ধুর, এইসব পোলাপানগো শুনতে হয় না।’
‘কিন্তু বেবাকে তো কয় ওরা চুরি করে?’
‘আরে ছোরমান না, ওর ছোডুভাই চিকা চুরি করে। তাও তো গেরামে করে না। চুরি করে সে হাটে-বাজারে। হাটে যাইয়া সে মাইনষের পকেট মারে।’
‘ও দিদি, পকেটমারা কী?’
দিদি শাকের বোঝা ফেলে দিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকে। কিন্তু পকেট মারার কোনো ব্যাখ্যা সে আমাকে দেয় না। বরং সামান্য ঘুরিয়ে অন্য কথা বলে—
‘বুঝলি না, মাইনষের অভাবে স্বভাব নষ্ট হয়।’

দিদির কথা সত্য। ছোরমানদের যে অভাব আছে তা আমি যেমন জানি, গ্রামের সবাই তেমন জানে। আমি কতদিন দেখি আমাদের পুকুরে ছোরমানের বউ গোসল করে। তার একটাই শাড়ি। গলাপানিতে নেমে উদোম হয়ে রোজ সে তার শাড়িটা ধোয়। অর্ধেক শাড়ি গায়ে দিয়ে বাকিটা রোদে শুকায়। শুকনা অর্ধেক পরে ফের ভেজা অর্ধেক শুকায়। এমন করে কাপড় শুকানোর সময় তার লজ্জাটজ্জা প্রায়ই কেউ-না-কেউ দেখে ফেলে। আমিও কতদিন দেখেছি। ছোরমানের বউয়ের পরনে কোনো সায়া নাই। তার লজ্জাটজ্জার উপর বড় একটা তিল আছে, তাও তো আমি কতদিনই দেখেছি। তার গায়ের একটাও ব্লাউজ নাই। আমার দিদির ব্লাউজ গায়ে দিলেই দম আটকে আসে বলে সে উদলা গায়ে চলাফেরা করে। কিন্তু আম্মা-চাচি-ফুফুরা কেউ ব্লাউজবিহীন চলার কথা ভাবতেই পারে না।

আমাদের সাথে খেলতে আসে পান্না, আন্না, আঁখি—ওদের বড়চাচি এই ছোরমানের বউ। ওদের বাপ হলো চিকা, ওরফে চিকাচোর। খেলার সময় ভুলেও আমরা চিকাচোরের প্রসঙ্গ তুলি না। আসলে ওদের বাপ যে চুরি করে এটা বলে আমরা ওদের লজ্জা দিতে চাই না। আমরা ওদের নিয়ে খেলি কানামাছি, গোল্লাছুট, বউছি, দড়িলাফ, ইচিংবিচিং, ঝুক্কুর-ঝুক্কুর-মমিসিং এইসব কত কী!

আব্বা-চাচাজান ছুটিতে বাড়ি এলে অন্য দৃশ্য। গ্রামের গেরস্তরা বেশ সঙ্কুচিত হয়ে আমাদের বাড়ির উপর দিয়ে হেঁটে যায়। আমাদের বাড়ির উপর দিয়ে যাওয়া ছাড়া ওদের আর কোনো উপায়ও নাই। পেছনের বাড়ির যে যেভাবেই যাবে তাকে সওদাগরবাড়ির আঙিনা দিয়েই যেতে হবে। আব্বা বাড়িতে থাকলে চিকাচোর বেশ সম্ভ্রমের সাথে চলাফেরা করে। আব্বা চিকাচোরকে ডাকে মামু। চিকাচোরও আব্বাকে বলে মামু।

আব্বা ক্যাপস্ট্যান সিগারেট খায়। সিগারেটে সুখটান দিয়ে চিকাচোরকে ডেকে বলে—
‘মামু কিবা আছ?’
চিকাচোর লাজুকভাবে বলে—
‘আছি মামু, ভালাই আছি। আপনে কিবা আছুন?’
আব্বা একশলা সিগারেট এগিয়ে দিলে চিকাচোর যেন আরো সঙ্কুচিত হয়ে ওঠে। হাত সামান্য এগিয়ে সিগারেটটা হাতে নিয়ে বলে—
‘মামু, এত দামেরডা খাইলে যে বদভ্যাস হইয়া যাব।’
আব্বা হো হো করে হেসে বলে—‘আরে খাও মামু খাও—একটা-দুইডা খাইলে কী-আর এমুন অভ্যাস বদভ্যাস হইয়া যাইব?’
চিকাচোরকে আব্বা ম্যাচ দিলে সে বেশ প্রশান্ত মুখে সিগারেট ধরায়। চিকাচোর চোর হলে কী হবে, তার নীতিজ্ঞান বেশ প্রখর। সে নিজ গ্রামের কারো বাড়িতে চুরিধারি করে না। সিঁধ কাটে না। তার যত হাত সাফাই চলে অচেনা গ্রামে। হাটের অচেনা মানুষের পকেটে।
হাটুরেরা যারা হাটে আসে তাদের পকেট খালি করে সে নিজের পকেট ভরতি করে।

তবে চিকাচোরের যেমতি হ্যাংলা-পাতলা দেহ, তাতে সে যে কীভাবে চুরি করে তা আমার মাথায় ঢোকে না। এমন ভগ্ন স্বাস্থ্য নিয়ে চুরি করার সাহস সে কীভাবে পায়? তখন হয়তো সামান্য-সামান্য বুঝতে শিখছি আমি। দুই-একজন মানুষের মুখ চিনতে শিখছি। একেবারে সুপারি গাছের মতো সরু মানুষটা কীভাবে মানুষের পকেট কাটে? কেন সে চুরি করে? অন্য কাজ করলে তার সমস্যা কী?

একদিন বিষ্যুদবার হাটের বেলা প্রায় যাই-যাই করছে—এমন সময় ময়নার মা বিলাপ করতে করতে ছুটতে শুরু করল আমাদের বাইরবাড়ি দিয়ে।
‘ও আল্লা রে, আমার এমুন সব্বোনাশ কেমনে হইল রে!’
ময়নার মা বিলাপ করে ছুটছে আর তার পিছুপিছু ছুটছে ময়না, পাখি, আন্না, পান্না, আঁখি, বড়গেদা, ছোটগেদা, আকাইল্যা—ওদের সব ছেলেমেয়ে।
এতজনের সম্মিলিত কান্না আর চিল্লাচিল্লি­তে আমরা বাড়ির প্রায় সকলেই খালপাড়ে।
ঘটনা কী?
চিকাচোর যেন কার পকেটে হাত দিয়ে ধরা খেয়েছে! আর হাটুরেদের গণপিটুনিতে তার দফা রফা হলো বলে।
আমাদের খালে তখন কোমর-সমান পানি।
ময়নার মার কোনোদিকে ভ্রুক্ষেপ নাই, সে পাছা উদাম করে খাল পার হয়ে গেল! এদিকে তাদের একদঙ্গল ছেলেমেয়ের মরা কান্নার বিরাম নাই। আমরা হা করে তাকিয়ে তামশা দেখছি। প্রায় ঘণ্টা দেড়েক পরে চিকাচোরকে পাঁজাকোলা করে নিয়ে সকলে ফিরে এল। চিকাচোরের চোখ-মুখ রক্তাক্ত। হাটুরেদের কেউ-একজন আঙুল দিয়ে তার বাম চোখটা উপড়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছে। একেবারে কঞ্চির মতো শুকনা লোকটাকে ময়নার মা একাই খাল পার করে নিয়ে এল। ছেলেমেয়েরা তখনো বিলাপ করছে। মারাত্মক রক্তারক্তি মানুষ আমি এই প্রথম দেখলাম। প্রচণ্ড ভয়ে আমার বুক কাঁপতে লাগল। আমাদের বাড়ির কেউ কোনো কথা বলছে না! পান্নাদের কান্না দেখে আমারও বেদম কান্না পেল। ওরা আমার প্রতিদিনের খেলার সাথি, বাপের চুরির খেসারত ওদেরও দিতে হচ্ছে দেখে আমিও কাঁদতে লাগলাম। সে-যাত্রায় চিকাচোর প্রায় ছয়মাস ঘরে শয্যাশায়ী ছিল। এবং ভালো হয়ে পুনরায় ফিরে গিয়েছিল তার পুরাতন পেশায়।


ভুরুঙ্গির উদ্দাম আদি নৃত্যকলা
.

ভুরুঙ্গি দেখতে কালো। দোহারা গড়ন। মুখটা লাবণ্যে ঢলোঢলো, তবে ভয়ানক রগচটা টাইপের ছিল। কেউ তাকে ঠাট্টা-তামশা করলেও মুহূর্তে ক্ষেপে উঠত। অনেক সময় কেউ কিছু না-বললেও। তা এই ভুরুঙ্গি একদিন ভয়ানক এক নৃত্য প্রদর্শন করল, যাকে বলে আদিম নৃত্য। সেদিনও বাইস্যা মাইস্যা দিন। আমাদের বাড়িটা কচ্ছপের মতো পিঠ জাগিয়ে আছে। আর বাড়ির চৌপাশেই খলবল জল। জল পেরিয়ে খানিক দূরে দূরে ছোট ছোট কুমিরের মতো ভেসে আছে আরও কয়খানা বাড়ি। আমাদের বাইরবাড়িতে জল ওঠে নি। ফলে আমরা খেলছি যথারীতি, হঠাৎ বাড়ির ভেতরে তীব্র হট্টগোল শুনে সবাই দৌড় দিলাম। দেখি সে এক অদ্ভুত দৃশ্য! ভুরুঙ্গি কী কারণে যেন বেজায় ক্ষেপেছে। আর ক্ষেপে গিয়েই শুরু করেছে অশ্লীল-উদ্দাম নাচ! অবশ্য তার নাচের ধরন একেবারে অপ্রচলিত। ভুরুঙ্গি ব্যাঙের মতো লাফিয়ে লাফিয়ে সারা উঠান ঘুরছে। আর লাফের সাথে তার পরনের সায়া-শাড়ি পাছার উপর ওঠাচ্ছে আর নামাচ্ছে। অর্থাৎ তার নাচের বিষয়বস্তু ‘পাছা প্রদর্শন’! বড়রা যারা কম বয়সি তারা হেসে লুটোপুটি খাচ্ছে। ভুরুঙ্গির এহেন নৃত্যে আমরা ছোটরা তো তাজ্জব! বিমূঢ় ও অসহায় হয়ে দাঁড়িয়ে রইলাম। কী করব এখন? এই উভয় সঙ্কটে ভ্যাবলার মতো বিপদে পতিত হলাম। কারণ ভুরুঙ্গির আদিম-উদ্দাম নৃত্য দেখার লোভ সামলাতে পারছি না; ফের দেখতেও লজ্জা পাচ্ছি। বাড়িতে যারা পুরুষ ছিল তারা যে-যার মতো মাথা নিচু করে রেখেছে। কেউ কেউ সরে গেছে দূরে। কিন্তু ভুরুঙ্গি কিচ্ছুর তোয়াক্কা না-করে নেচে চলেছে তো চলেছেই। এদিকে দিদি চেঁচিয়ে বাড়ি মাথায় তুলেছে ‘অই ভুরুঙ্গিমরারশুঁকি থাম থাম। কী করতেছিস অ্যাঁ? বাড়িতে পোলাপাইন আছে না? বেবাকে তো নষ্ট হইয়া যাইতেছে!’ দিদির কথা পাত্তা না-দিয়ে ভুরুঙ্গি তার নাচের গতি বাড়িয়ে দিল। অতঃপর সে পেছনের কাপড় মাথায় তুলে সারাবাড়িতে নাচতে লাগল! আম্মা-চাচিমারা তো হাসতে হাসতে খুন হয়ে যাচ্ছে। এমন নাচ তারা কোনোদিন দেখেছে নাকি? ঝাড়া বিশ মিনিট নাচার পর ভুরুঙ্গি বেরিয়ে গেল আমাদের বাড়ি থেকে এবং পাছা উন্মুক্ত রেখে! পানিতে খলবল তুলে সে যেতে লাগল অন্য কোনো বাড়ির উদ্দেশ্যে। একবাবের জন্যও সে পেছন ফিরে তাকাল না। তবে যতক্ষণ তাকে দেখা গেল, একমিনিটের জন্যও সে পেছন ঢাকার কোনোরকম চেষ্টাই করে নি।.

papree.rahman@gmail.com'

পাপড়ি রহমান

জন্ম ১৯৬৫, ঢাকা। বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর।
লেখক, সম্পাদক, গবেষক এবং অনুবাদক।

গল্পের বই:
লখিন্দরের অদৃষ্টযাত্রা (২০০০)
হলুদ মেয়ের সীমান্ত (২০০১)
অষ্টরম্ভা (২০০৭)
ধূলিচিত্রিত দৃশ্যাবলি (২০১০)
মৃদু মানুষের মোশন পিকচার (২০১২)
মামুলি জীবনের জলতরঙ্গ (২০১৪)
Lilies, Lanterns, Lullabies (২০১৪) Edited By Niaz Zaman
শহর কিংবা ঊনশহরের গল্প (২০১৬)

উপন্যাস:
পোড়া নদীর স্বপ্নপুরাণ (২০০৪)
মহুয়া পাখির পালক (২০০৪)
বয়ন (২০০৮)
পালাটিয়া (২০১১)

সম্পাদনা:
ধূলিচিত্র (সাহিত্যপত্রিকা)
বাংলাদেশের ছোটগল্প : নব্বইয়ের দশক
গাঁথাগল্প (যৌথ), লেখকের কথা (যৌথ)
অ্যালিস মানরোর নির্বাচিত গল্প (যৌথ)
Women Writing from Bengal (Joint)

গবেষণা : ভাষা শহীদ আবুল বরকত
আত্মজীবনী : মায়াপারাবার (২০১৬)

ই-মেইল : papree.rahman@gmail.com
papree.rahman@gmail.com'