হোম গদ্য মজিদ মাহমুদের কবিতা সময়ের নতুন সমিধ

মজিদ মাহমুদের কবিতা সময়ের নতুন সমিধ

মজিদ মাহমুদের কবিতা সময়ের নতুন সমিধ
117
0

মজিদ মাহমুদ, কেমন তার কবিতা। একজন সত্যিকারের কবির কবিতায় ঘৃণা, প্রেম, আক্রোশ, সমর্পণ সবই মিশে থাকে। অন্তরাত্মা কখনও সামাজিক বা রাজনৈতিক চলাচলে এমন অনেক কথা বলে যা আকাঙ্ক্ষার আগুনে জ্বলে ওঠে ভস্মের আকার ধারণ করে। কবি খুঁজতে থাকেন এক প্রচ্ছন্ন সত্যকে যা খণ্ডকালের মধ্যেও শাশ্বত। কবির বিশ্ববীক্ষা সবসময় নতুন। পল ক্লী-র ভাষায় ‘To man art should be an opportunity to change his point of view… it should help him put off his shell’—কবিতার শিল্পপ্রতিমা নির্মাণে বাংলাদেশের এই কবির আশ্চর্য দক্ষতাকে স্বীকার করতে কোনো অসুবিধে থাকার কথা নয়। আমি এই কবির ‘আপেল কাহিনি’র কবিতার অনুভূতিখানা বেছে নিই।

‘রাত্রি এখন গভীর কোথায় দাঁড়িয়ে আছি
সমুদ্র নিয়েছে কোলে শরীরে অল্প কাঁপন
হাতের মধ্যে ধরা জোছনার দুটি ক্যান
আর তুমি সমুদ্র নিজেকে ছুঁয়েছে দেখ’
—সমুদ্র দেখার পরে


কী অনিবার্যভাবে কবিতার এক একটি শব্দ বিন্যাসে তৈরি হয়েছে আত্মকথনের সার্বিক মুহূর্ত। এইগুলোই তো কবিতা। 


কবির শিক্ষিত চেতনার মধ্যে রয়েছে ইতিহাস চেতনা, পুরাণবোধ, ক্লাসিসিজিম ও বিশ্বসাহিত্য পাঠ। তামাটে জীবনের প্রতিচ্ছবির সঙ্গে বোমাবাঁধা ফিলিস্তিনি বালক বা ইন্ডিয়ানার তামাক ক্ষেতে ধুঁকে-মরা আরব ক্রীতদাস এসবই তার তীক্ষ্ণ আধুনিক সমাজ জীবনের পর্যবেক্ষণ। একেই এক অর্থে অস্তিত্বের তাৎপর্য বলে। আধুনিকতার মৌল উপাদান আবিষ্কারের স্পৃহা মজিদ মাহমুদকে জীবন সম্পর্কিত ঐতিহ্যের ভিত্তিভূমিতে আস্থাবান রেখেছে। সমকালীন এবং ভবিষ্যবাদী এই দুই সত্তার চোরাটান তার কবিতাবলীর মধ্যে সর্বদাই সাংকেতিক মৌল উপাদান তৈরি করেছে।

‘ধরো আজ যদি আমি হেলেনের কথা বলি
তোমাকে নিয়ে মেতেছিল গ্রিসের মানুষ
আমিই সেই একিলিস; যার গোড়ালিতে প্রাণ ছিল
এই অন্ধ হোমারকে তুমি কি বিশ্বাস করতে পারো?’
—যৌবনে ছিল রবীন্দ্রনাথ

একজন কবির শুধু স্বপ্নালু বিশ্বাস থাকলে চলে না। সামাজিক ও রাষ্ট্রিক ভিত্তিভূমির ওপর তার চলাচল নন্দনপ্রস্থান কি? তার কাব্যমুন্সীয়ানা যে ইংরেজ কবি উইলিয়াম ব্লেকের তাৎপর্যমণ্ডিত তত্ত্বে ধরা পড়ে—

‘To see the world in a grain of sand
And a heaven in a world of flowers,
Hold infinity in the palm of your hand
and eternity in an hour.’

এই কবির কবিতা পড়তে পড়তে বারবার মনে হয়েছে জীবনের চলমানতা, খণ্ডচিত্রের তৃপ্ত বৈচিত্র্য, মিশ্রিত প্রকাশ-রীতির চাতুর্য, বাক্‌প্রতিমার বিন্যাস ও কাব্যশৈলীর স্বচ্ছন্দ উত্তরণ তার আয়ত্তাধীন। কবির একটি পঙ্‌ক্তি ধরা যাক—

‘মৃত্যু কী তবে মৃত্যুই ডেকে আনে
আমার স্মৃতি মরা মানুষের শব
আমার স্মৃতি শ্মশানের ভৈরব
আমি বেঁচে আছি মৃত্যুর জয়গানে।’
—মৃত্যুর জয়গান

কবিতার এই বোধের মধ্যে রয়েছে এক ধরনের Poeticoeuvre যাকে কবির শিল্পসমগ্র বা সামগ্রিকতা বলা যায়। চলমান জীবন প্রতিমুহূর্তেই পৌঁছে যাচ্ছে মৃত্যুর উপত্যকার দিকে। আজকের দিনযাপন আগামীর স্মৃতির বৈভব। ‘মৃত্যু কী তবে মৃত্যুই ডেকে আনে’—এক অনন্য উপলদ্ধির বার্তা দিলেন কবি। নিবিড় চেতনা থেকে হৃদয়ের রেখাচিত্রের মাত্রা সরলরেখা হয়ে গেল। শিল্পী পাবলো পিকাসো এক মন্তব্যে বলেছেন—‘My art alternates between gracefulness and horror,… ’
কবির ‘পরিপ্রেক্ষিত’ কবিতার একটু অংশ দেখা যাক—

‘তোমাদের শরীরের মধ্যে আগুনের চুল্লি প্রজ্বলিত রাখছিল
প্রকৃতপক্ষে কী আছে তোমার যা থেকে সে চুরি করতে পারে
যাকে তোমরা সম্পদ এবং শরীর বল, যেমন
একখণ্ড জমি পাথরের দালান ইলেক্ট্রনিক্স কাগজের নোট এবং
তোমার ঊরু নিতম্ব বক্ষদেশ ও মুখমণ্ডল; আর
এসব কেন যে সুন্দর
তুমি ঠিক ব্যাখ্যা করতে পারো না
তখন বলো, এসব ঈশ্বরের কৃপা, কিন্তু
নগ্নপদ ঈশ্বরকে তোমরা চিনতে পারো না, যখন সে
বালির সঙ্গে সুরকি মেশাতে থাকে…’

‘নগ্নপদ ঈশ্বর’—শব্দ ব্যবহার রবীন্দ্রনাথের ধূলামন্দির কবিতাটি মনে করিয়ে দেয়। জীবন ও মানুষকে প্রত্যক্ষ করার এই চোখ কবির ‘ইনার আই’ বা ‘অন্তরদর্শন’। সমস্ত সত্যিকার কবিতার মধ্যে একধরনের নির্বাসিত আবেগ নির্ভর সুনির্দিষ্ট পাঠক্রমিক স্তর (Specific textual level) থেকে। বেদনা বিস্ময়ে মানুষ আবিষ্কার করে তার সত্তাকে। একটি সময়-পরিধি অন্য সময়-বলয়ে মিশে যেতে থাকে। যা থেকে নির্গত হয় সরল সত্য। অমলিন নির্মাণ প্রক্রিয়ায় সে পেয়ে যায় তার সজীবতা। নীটসের উক্তির মতো : ‘We have art in order that we may not perish from truth.’

মানব সংস্কৃতি, ইতিহাসচেতনা, কালজ্ঞান ও কখনও পরাবাস্ততা কবিতার নিজস্ব ধারা। কমলালেবুর খোসা ছড়ানোর মধ্যেই তার নির্মাণ কৌশল। চেতনা ও অবচেতনার মধ্যেই সৃষ্টি প্রক্রিয়ার সমস্ত উপাদান মিশ্রিত আছে। সময়ের অপস্রিয়মাণ অবয়ব ধরে রাখাই কবির কাজ। এই প্রসঙ্গে কীয়ের্কেগার্দের একটি উক্তি তুলে ধরা যাক—

‘The imagination is what providence uses in order to get men into reality, into existence, to get them for enough out, or in or down in existence. And when imagination has helped them as far out as they are meant to go- that is where reality, properly speaking begins.’
3909 on (বর্জিতাংশ)। মজিদ লিখলেন—

‘একটি ভাসমান তরীকে তোমরা সবকিছু বলতে পারো না
তোমরা শুধু দেখো তার গন্তব্যে পৌঁছে যাবার অদৃশ্য ক্ষমতা
কিন্তু জলের নিচে ডুবে থাকা চৌকোনা হলে কি তোমরা দেখতে পারো…
ছায়াময় প্রতিবিম্ব; আসলে সত্য হলো তুমি নও, সেই সব প্রতিবিম্বই
তোমাকে গভীরভাবে যারা অবলোকন করে চলেছে…’

পিয়েরজাঁজুভ যাকে বলেন—‘Poetry is a soul inaugurating form.’ ঝকঝকে তারার আলোর মতো যা ছড়িয়ে পড়ে। বুদ্ধদেব বসুর কবিতা বিষয়ক মতামত এ প্রসঙ্গে স্মরণ করা যায়। তিনি বলেছেন—‘যে দুঃখের অনুভূতি জনতা থেকে বিচ্ছিন্ন, যা একলার, যা নির্জনের, সেটাই অসামান্য। সেটা যত তুচ্ছ কাল্পনিক হোক, বিশুদ্ধ কবিতার জন্ম হয় তা থেকেই।’

অক্তাবিও পাস বলেছিলেন—‘modern time is a critical time.’ যে কোনো কবির মধ্যে তার প্রভাব পড়তে বাধ্য। প্রত্যেক প্রকৃত কবির থাকে এক রকমের অস্তিত্বের সত্যসন্ধান। পিকাসোর ত্রিমাত্রিক ছবির মতো বর্তমান, অতীত, ভবিষ্যৎ-এই তিনটি ভাব-দর্শন। কালের কৌতুক বিশ্বের অবস্থানের আনন্দ ও যন্ত্রণা তার অস্তিত্বের অবস্থান। বোদলেয়ারের ‘মাতাল নৌকো’, টলমল ভাবে সে ভেসে চলেছে কৌতুকময়তার মহাচক্রবালে। মজিদের ‘সিদ্ধার্থ’ কবিতাটি ধরা যাক—

‘আর সিদ্ধার্থ ভাবতে থাকেন সুজাতার কাছে আমিও
একদিন এইভাবে প্রাণভিক্ষা চেয়েছিলাম কিনা
সেদিনই আমাদের যথার্থ জন্ম হতে পারে কেবল
প্রাণকে লোভনীয় এক টুকরো মাংসের মতো
যারা ঝুলিয়ে রেখেছিল কাল, সেইসব কুকুরের
জিহ্বা থেকে লালা গড়িয়ে পড়ার আগেই
এক লাফে দেয়াল টপকে কেউ যদি ধরে ফেলে
ঈশ্বরের হাত।’

কী অনিবার্যভাবে কবিতার এক একটি শব্দ বিন্যাসে তৈরি হয়েছে আত্মকথনের সার্বিক মুহূর্ত। এইগুলোই তো কবিতা। যেখানে লিখছেন ‘প্রাণকে লোভনীয় এক টুকরো মাংসের মতো’ আমি দেখতে পাচ্ছি অসামান্য সম্ভাবনাময় এক স্বপ্ন ছুঁয়ে দিচ্ছে নিগূঢ় বাস্তবতাকে। অসহায়তা, ক্ষয় থেকে একইভাবে এই কবি মনে করাচ্ছেন—কামু, নেরুদা, লবকা বা বোলদেয়ারের কথা। কখনও প্রকট হচ্ছেন টি. এস. এলিয়ট।

কবির জয়যাত্রায়আমরা রঙিন নিশান দোলাচ্ছি। মানুষের জায়মান সম্পর্কের গাথা শিল্প দর্শনে তুলে আনা কবি-শিল্পীরই কাজ। আর যিনি তা নিখুঁতভাবে পারেন তার সমাচার বিদিত হতে বাধ্য।


শব্দ দিয়ে নৈঃশব্দ্যকে খুঁড়ে তার মধ্যে তিনি প্রবেশ করান জীবনের জটিল অভিজ্ঞতা, প্রেম, পরাবাস্তবতা।


শিল্পমাধ্যমের উন্মোচন যা গভীরতর ব্যঞ্জনায় প্রতিভাত হচ্ছে তা সৃষ্টিকালের কবিতার রহস্য। ‘mutul illumination of arts’ কবিতায় যখন প্রতিটি বর্ণ, ধ্বনি, ঘ্রাণ আলাদাভাবে আসে তখনই শুরু হয় তার প্রকৃত ভ্রমণ। বোদলেয়ার যেমন কবিতার সঙ্গে জীবনের ব্যবধান ঘুচিয়েছিলেন। র‌্যাঁবোর কথানুযায়ী সত্যিকারের আধুনিক কবিতা শুরু হয়েছিল সেদিন। প্রত্যেক জীবনযাপনের মধ্যে লুকিয়ে থাকে এক অাত্মবিচ্ছেদের পালা। মানুষ চেষ্টা করে আত্ম-অবমাননার জাল থেকে এক স্বপ্নময় জগতে প্রবেশ করতে। ব্রেঁতোর কথায় যেমন—‘man, that incorrigible dreamer from day to day more dissatisfied with his fate…’ angst ‍বা উদ্বেগযন্ত্রণার দহন দেখতে পাই।

‘আমার ছেদন দাঁতে এখনও লেগে আছে সেই স্বাদ
এইভাবে তোমার দেহের মধ্যে আমাকে লুকিয়ে ফেলেছি কিংবা
আমার প্রাণবীজ তোমার বরফঠান্ডা অন্ধকারের প্রকোষ্ঠে
গচ্ছিত রেখে
লক্ষ কোটি বছর ধরে অদৃশ্য তপস্যায় মগ্ন রয়েছি আমি…’
—আমার ছিল ঈশ্বরী

কী অপূর্ব নির্মাণ! বিশুদ্ধ উচ্চারণে আঁধার থেকে ভৈরবী। কল্পনা প্রতিভার মৌলিক অবগাহনে এক উজ্জ্বল অন্তর্লোকে প্রবেশ করেছেন বারংবার। কোনো সংশয় নেই সৃষ্টি প্রক্রিয়াই তার নির্দিষ্ট অবলম্বন। জীবনের স্পন্দনের অভিব্যক্তি কবিতার ভাব-ব্যঞ্জনাকে গভীর ছন্দময় বাণী করে তুলেছে! জীবনবোধের কেন্দ্রাতিক শক্তির পর্যবেক্ষণ অবচেতনের সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে বিস্ময়ের দ্বান্দ্বিক চেতনাকে উপলব্ধি করতে চাইছে বারবার।

‘The poetic embrace like the carnal
While it endures
Forbids all lapse into the miseries of the world
—ব্রাতো

মজিদের আরেকটি কবিতায় আসি ‘সমুদ্র দেখার পরে’—

‘চুম্বন তোমার ছুয়ে যাচ্ছে অশান্ত অম্বরে
আমি আবারও যাব তোমার জলযোনিতে মিশে
লক্ষ কোটি বছর ধরে এই জলাবর্ত শেষে
আমাকে মানব মাতৃগর্ভে দিও
মানুষের মার জন্য আমার মায়া পড়ে আছে খুব।’

মনে পড়ে যাচ্ছে গারসিয়া লরকার ‘Minor song’ কবিতাটি।

‘On the marble fountain
is the kiss of water,
dream of humble stars.

………

I will give everything away
and weep my passion
like a last child
in a forgotten tale.’

শাব্দিক স্বয়ংক্রিয়তার পদ্ধতি। একই সঙ্গে সমিধ ও অগ্নি মজিদ মাহমুদকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। রবি ঠাকুরের ‘কুসুমে কুসুমে চরণচিহ্ন’ রেখে যাওয়ার মতোই। মজিদ ভেসে গেছেন ক্রিয়াপর্বে। ‘আনন্দ’ নামক কবিতায় লিখেছেন—

‘তোমাকে পরিহার করুক মৃত্যু ভালোবাসা শোক
তুমি পরিত্যক্ত জনপদ; তবু আমার হোক
শূন্য প্রান্তরে একমাত্র আমার নাম ধরে ডাকো
তুমি মরীচিকা তুমি ছায়ালোক
আমার একাকিত্বের নিদারুণ কালে তুমি দুঃখ
কিংবা সুখ আমাকে জড়িয়ে থাকো।’

বিচ্ছিন্নতা বোধ থেকে কবি পৌঁছতে চাইছেন এক সঞ্জীবিত নবপ্রস্থানে। এও তো সেই কবি ডিলান টমাসের ‘form darkness towards some measure of light’-এর মতোই। আত্মমুখী কবির হৃদয় একে অন্যের পরিপূরক। এই প্রসঙ্গে গারসিয়া লোরকাকে আবার মনে পড়ছে—

‘are a gardland of love, bed of the wounded where without sleep, I dream of your presence amid the ruins of my sunken breast.’

এক সুতীব্র আকুলতা কবিতাটির মধ্যে লুকিয়ে আছে। যে আকুলতা গীয়ম অ্যাপোলিনেয়ার মধ্যে আমরা লক্ষ করেছি। ‘open this door on which I knock weeping.’ কবির কাব্যের প্রাণিত উৎসধারা অনন্তের মধ্যে স্থাপিত। রবীন্দ্রনাথের ভাষায়, এ কী সুধারস তব প্রাণে। কবি দৃষ্টির ভাস্বরতাই তার অনন্ত প্রকাশ। শব্দ দিয়ে নৈঃশব্দ্যকে খুঁড়ে তার মধ্যে তিনি প্রবেশ করান জীবনের জটিল অভিজ্ঞতা, প্রেম, পরাবাস্তবতা। টি. এস. এলিয়ট যেমন মনে করতেন, ‘a life-time burning in every moment.’ মজিদের আর একটি কবিতা লক্ষ করা যাক—‘সমুদ্র দেখার পরে’

‘হে জল, জলের দেবতা তোমাকে আমার ভয়
শ্রীচৈতন্যের কৃষ্ণঠাকুর তুমি
অথচ তুমি নিশ্চুপ আছ কার যেন আঁজলায়।’

দেবত্বের বিশ্বাস থেকে ‘জল’ শব্দের উপমায় প্রাকৃতিক প্রগাঢ়তার দিকে এগিয়ে গেল কবিতার ধারা। উপলদ্ধির বাইরে-দূরে। সীমা থেকে সীমাহীনতার দিকে যেতে যেতে প্রেমের ইঙ্গিতপূর্ণ বোধ। অন্তর্লীন প্রতীকের প্রচ্ছন্নতা। এই প্রসঙ্গে কবি প্রণবেন্দু দাসগুপ্তর একটি কবিতা মনে পড়ছে—

‘দেখা হল কিন্তু যেন জলের ভেতর
দেখা হল তুমি স্থির ভাসলে অকূলে’
—একটি প্রেমের কবিতা


বর্ণপ্রতীক ও অনুভূতির ছোঁয়া কবির অলৌকিক সবুজ চাদরের সর্বস্বতায় লীন হয়ে আছে।


মজিদ তার সহিত্য প্রয়োগের ভাষা খুব উচ্চকিত বা ঝঙ্কৃত করেন নি কখনও অথচ সাবলীল শব্দ প্রয়োগ তার রচনাকে গভীরতা দিয়েছে। মানুষের ঘর-দুয়ারেই তার বসত, সে কারণেই যেকোনো সময়ের প্রেক্ষাপট তার কাছে সজীব। মজিদ মাহমুদ নিজস্ব কবিতা ভাবনায় ‘কবিতামালা’ মুখবন্ধে কিছু ভাবনার সন্ধান দিয়েছেন যা তার সজীব বিশ্বাসে পূর্ণ। তার লেখার সামান্য কিছু অংশ তুলে দিয়ে লেখার অন্তিম পর্বে চলে যাই। তিনি লিখেছেন—‘এই কবিতাগুলো লেখা হচ্ছিল মাতৃগর্ভ থেকে, পিতার ঔরস থেকে, যখন একজন পুরুষ ও নারী ভাগাভাগি করে আমাকে বহন করছিল। এই কবিতাগুলো লেখা হচ্ছিল পিতার পিতাদের জন্মের আগে, মাইটোসিস মেয়োসিস বিভাজনের আগে, মুরগি ও ডিম আলাদা হওয়ার আগে, ভাষা নির্মাণের আগে, এমনকি-সমুদ্রের শেওলা ও পানি নির্মাণের আগে।’

মুখবন্ধের স্বীকারোক্তি কবি মনের এক আশ্চর্য দহন। একেই কী ব্রেঁতো-কথিত ‘eternal marvellous’ বলে! বর্ণপ্রতীক ও অনুভূতির ছোঁয়া কবির অলৌকিক সবুজ চাদরের সর্বস্বতায় লীন হয়ে আছে। শব্দ ব্যবহারে পরাবাস্তবাদিতার চিহ্ন উচ্চারণে স্নায়ুকে অসাড় করে রাখে। কবির কিছু কিছু কবিতায় ভাষার পুনর্নির্মাণ ঘটেছে। আরাগঁ-র ‘airdutemps’ কবিতার মতো বিচিত্র। ‘are you going to hang about all your life among/ half deap people/ half asleep/ have not you had enough of common places.’ এই কবির কাব্য কাব্যভাষা ও কবিতার মধ্যে কখনো ‘self induced hallucination’ এই কবির কাব্য কাব্যভাষা ও কবিতার মধ্যে কখনও ‘self induced hallucination’ খুঁজে পাওয়া যায়, যা তার কবিতাকে পরিণত করেছে। কবিতা সমালোচনার মূল ধারায় কবিতার অবমূল্যায়ন চোখে পড়ে নি, বরং উপলব্ধির সত্যতাই কাব্যিক নির্মাণে প্রকট।

রবীন্দ্রনাথের, রানু অধিকারীকে লেখা চিঠির দুটি লাইন উদ্ধৃতি দিই—‘এ সংসারে আমার জীবনকে চলতে হবে সামনের দিকে, সকলের দিকে এবং অনন্ত সাগরের দিকে,… আমি মুক্তিকে ভালোবাসি এবং যে ভালোবাসা মুক্ত তাকে আমি বিধাতার দান বলে গ্রহণ করি।’

কবি মজিদ মাহমুদ চলেছেন অনিঃশেষ আলোর দিকে। তার লেখা কালোত্তীর্ণ হোক, কামনা করি। কবির ‘curious heightening of his artistic temper’ (টমাসমান) যত প্রবল হবে ততই প্রসারিত ও প্রখর হবে তার দৃষ্টি। ভাঙাগড়ায় ভরা জীবনের আধুনিক অস্তিত্বকে আরও প্রত্নকথায় বা অবচেতনার ভিত্তি গভীরে উজ্জ্বল মানবিক ভাষায় কবিতায় এঁকে ফেলতে পারবেন।

dipok.lahiri@gmail.com'

দীপক লাহিড়ী

ই-মেইল : dipok.lahiri@gmail.com
dipok.lahiri@gmail.com'

Latest posts by দীপক লাহিড়ী (see all)