হোম গদ্য মজিদ মাহমুদের কবিতা—পাঠ করি সংশয়ে, সংকল্পে

মজিদ মাহমুদের কবিতা—পাঠ করি সংশয়ে, সংকল্পে

মজিদ মাহমুদের কবিতা—পাঠ করি সংশয়ে, সংকল্পে
445
0

কবি ও কথাসাহিত্যিক মজিদ মাহমুদের বয়স ৫০ বছর পূর্ণ হচ্ছে ১৬ এপ্রিল ২০১৬, ৩ বৈশাখ ১৪২৩।
এ উপলক্ষে পয়লা বৈশাখ থেকে শুরু হয়েছে তিন দিনব্যাপী অনুষ্ঠান পাবনা তথা ঈশ্বরদীর চর গড়গড়িতে।
সে অনুষ্ঠানে যোগদানের আগে কিছু কথা টুকে রাখছি তার কবিতা নিয়ে…

সো. হা. গা.

বিশেষভাবে যে ধরনের কবিতার প্রতি আমার দুর্বলতা, মজিদ মাহমুদের কবিতা তেমন নয়। শিল্পবিচারে পাঠকের এই অবস্থান যে বৈদিক ব্রাহ্মণের গুরুত্ব বহন করে না, এ কথা প্রথমেই স্বীকার করা ভালো। তবু, ব্যক্তির রুচি আর শিল্পের নৈর্ব্যক্তিকতা পরস্পরের কাছে দুরাত্মা নয়, দূরাত্মীয় বলা যায়। ফলে, কোনো কোনো রচনাপাঠে লেখক ও পাঠকের দ্বৈরথ খুব স্বাভাবিক ঘটনা।

তাই মজিদ মাহমুদের কবিতা আমি পাঠ করি দ্বিধাচিত্তে, কিন্তু অনুসরণ করি সাগ্রহে, সংগোপনে। সেটা কেন, তা একটু পরিষ্কার করে বলা দরকার।

শোচনীয়ভাবে আমাকে এই কথা বলতে হচ্ছে যে, বাংলা কবিতার সঙ্গে সম্ভবত নাড়ির বন্ধন আমার কিছুটা ছিন্ন হয়ে পড়েছে। পিছন দিকে তাকালে দেখতে পাই, আমাদের কবিতা কখনোই ‘কাজের কথা’র বাইরে যেতে চায় নি। অর্থাৎ, অকাজের হয়ে ওঠে নি। কবিতার ভিতরে আমরা সবসময়ই একটা কার্যসিদ্ধির প্রচেষ্টা দেখেছি। দেখেছি তার অনেক দায় আছে। ধর্মের দায়, সমাজের দায়, জ্ঞানের দায়, প্রেমের দায়—সর্বোপরি পাঠককে বোঝানোর দায়। চর্যাপদ থেকে শুরু করে আধুনিক পর্বের কবিতাও দায়মুক্ত নয়। এ কারণেই স্মরণীয় সমস্ত কবিতাই মহৎ চিন্তা আর বলিষ্ঠ বক্তব্যে ঠাসা। আইডিয়ার ঠাসবুনটে কিভাবে ভাষা গুমরে মরে তারও উদাহরণ এইসব রচনা।

আমার দুর্ভাগ্য এই যে—সম্ভবত সবারই—গোয়েন্দা গল্প দ্বিতীয়বার পড়তে উদ্দীপনা জাগে না আর। রহস্য একবার উন্মোচিত হয়ে গেলে, পরে তা অত্যন্ত ক্লিশে, সাজানো নাটক মনে হয়। আর মানুষের মনও—কতই-না অপরাধপ্রবণ—পরস্ত্রীকাতরতা নিয়ে বেঁচে থাকে। হায়, অধরা মাধুরী!

কিন্তু যে কবিতার পক্ষে আমি সাফাই গাইতে চলেছি সেসব আপাত-অর্থে অনর্থবাদী, দায়দায়িত্বহীন, ভাবজগতে নৈরাজ্য সৃষ্টিকারী। বলা ভালো, চেতনায় অন্তর্লীন নৈরাজ্যের রূপকার। যে নৈরাজ্য আমাদের পঞ্চভূতকে দুমড়ে-মুচড়ে নতুন কোনো ভূতার্থের চেহারা দিতে চাইছে। বাংলাদেশে আশির দশকে এমন ধারাটি গড়ে উঠতে শুরু করে কারো কারো কবিতার মধ্য দিয়ে। পরবর্তীকালে সেই ধারাটিকে প্রতাপশালী হয়ে উঠতে দেখি আমরা।

কিন্তু এই কাজটি করতে গিয়ে আমাদের অগ্রজ কবিরা বাংলাদেশের কবিতাকে পশ্চিমবঙ্গের অনুগামী করে তুলেছেন অনেকটাই। এখানকার কবিতাকে পশ্চিমমুখী করে তোলার প্রধান কৃতিত্ব ‘গাণ্ডীব’ গোষ্ঠীর। বিশেষত সাজ্জাদ শরিফ ও শান্তনু চৌধুরীর নাম নেয়া যায়। আরও বিশেষভাবে বলতে হয় আশির দশকের কবি ফরিদ কবিরের কথা। তাঁর বক্তব্যটি প্রামাণ্য হিশেবে হাজির করা যেতে পারে :

‘উৎপলকুমার বসু পঞ্চাশের দশক থেকে লেখালেখি করলেও এদেশে আশির দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত তার নাম আমরা শুনি নি। ৮৪ সালে তার ‘আবার পুরী সিরিজ’ বইটা আমার জন্মদিনে উপহার দিয়েছিলেন কবি কবিতা সিংহ! সে বই পড়ে আমার মনে হলো, এ কবিতাগুলো শক্তি-সুনীল বা ৫০-এর দশকের অন্য কবিদের থেকে আলাদা। তাঁর কবিতা ফটোকপি করে আমি তখন অনেককেই পড়তে দেই। ভাস্কর, জয়, মৃদুল ও রণজিৎ দাশের বইও আমি ফটোকপি করে অনেককে দিয়েছি! এর আগে এই কবিদের নামই কেউ জানত কিনা সন্দেহ! আমি তাদের কবিতা অনেককে পড়িয়েছি এটাই বোঝাতে যে, কবিতা নানাভাবে লেখা যেতে পারে! একইভাবে শহীদুল জহিরের প্রথম বইটির কথাও আমি বলেছি অনেককে। আমার মনে হয়, মোহাম্মদ সাদিক ছাড়া তার বইটি আর কারোর কাছেই ছিল না! আমার কাছ থেকে নিয়ে সাজ্জাদ শরিফ আর সেলিম মোরশেদ বইটি পড়ে। পরে, আরো অনেকে। এর আগে ভিন্ন ধারার কবি বা লেখক হিসেবে আমরা সবাই মলয় রায়চৌধুরী ও সুবিমল মিশ্র’র কথাই জানতাম। সত্তুর ও আশির দশকের শুরুতে যারা কবিতা লিখছিলেন তাদের সবার কবিতাই তখন ছিল একই রকমের, তারা অনুসরণ করছিলেন শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদকে, নইলে শক্তি বা সুনীলকেই। মধ্য আশি থেকে উৎপল ও জয়সহ অনেকেরই প্রভাব আমাদের কবিতায় দেখা যায়। এর মূলে আমার কিছুটা ভূমিকা হয়তো ছিল! ৮৮ সালে আমার উদ্যোগে ‘এইসব স্রোতের বিরুদ্ধে’ নামে দুদিনের একটা কবিতা সম্মেলন হয়! যেখানে মৃদুল, রণজিৎ, প্রসূনসহ অনেকেই যোগ দেন। আমাদের সেই উদ্যোগটাও ছিল কবিতায় একটা নতুন ধারা, নতুন স্রোত সৃষ্টি করা। সে সময় তাই তাদের কবিতার প্রভাব আমাদের অনেকের কবিতায় থাকাটা বিচিত্র নয়। কারণ, নানাভাবে কবিতা লেখার তেমন উদাহরণ তো ছিল না আমাদের সামনে!’ [দেখুন : বাংলাদেশের কবিদের চোখে উৎপল]

অথচ ৪৭-এর দেশভাগের পর পঞ্চাশের কবিপ্রমুখ, যেমন—শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, শহীদ কাদরী—এদের হাতে পূর্ববাংলা অর্থাৎ বাংলাদেশের কবিতা বলে যে একটি ধারা সৃষ্টি হয়েছিল—যাতে বৈচিত্র্য দান করেছিল ষাটের কবিরা—সত্তরের দশকের পর তা আর বিকশিত হয় নি, বরং এই দশকেই অবক্ষয়িত হয়েছে। ইতিহাসের গতিপথ রুদ্ধ করে এই প্রশ্ন করা চলে না, তবুও বলতে ইচ্ছে হয়, চর্চা অব্যাহত থাকলে একটি শক্তিশালী ধারা বাংলাদেশের কবিতাকে স্বতন্ত্র পরিচয়ে তুলে ধরত হয়তো।

মজিদ মাহমুদ কবিতায় সেই অর্থে পশ্চিমমুখী হন নি বলেই আমার প্রতীতি। আঙ্গিকের অবিরাম ভাঙচুর তার লক্ষ্য নয়। তিনি লেখেন আইডিয়া-নির্ভর কবিতা। কথা বলেন পরিচিত ভঙ্গিতে। বিশেষ বাগভঙ্গি নয়, চিত্রকল্প বা ধনিব্যঞ্জনাও নয়, তার কবিতার ভাববস্তুই কবিকে চিনিয়ে দেয় পাঠকের কাছে। নিজ ভূগোলের ভাব-পরিমণ্ডলে বাস করে তিনি গ্রহণ করেছেন ভেতর ও বাইরে থেকে সুপ্রচুর। ইসলামি সংস্কৃতির চিহ্ন উদ্ধারে, বিশেষত সিমেটিক সভ্যতার মিথ বিচূর্ণীভবনে তার ঝোঁক লক্ষণীয়। উল্টোমিথ সৃষ্টিতেও সমান আগ্রহ। তাকে যথার্থভাবে চেনা যায় মাহফুজামঙ্গল কাব্যে। এখানে বল উপাখ্যান বইয়ের ‘পুত্র ডুবে যাচ্ছে’ কবিতা থেকে একটুখানি:

অবাধ্য! তবু সে পুত্র আমার
মানুষের পাশে থেকে করেছে বিদ্রোহ
সবাই জানে তোমার নৌকায় সে লেখায়নি নাম
তাই বলে তার ধান ডুবে যাবে!
…   …   …

পুত্র ডুবে যাবে আর পিতা থাকবে প্রমোদতরীতে!
সেই ভীতুদের নবী আজ গতায়ু প্রভু
আমিও জলে যাব আমার পুত্রের সাথে
আমিও থৈ থৈ আগুন পানির মধ্যে হাবুডুবু খাব
জীবন মৃত্যুর স্বাদ মেখে নেব শরীরে

তোমার কিশতি প্রভু তুমিই সামলাও…

কবির স্বাজাত্যবোধকে কখনোবা ‘পুত্র ডুবে যাচ্ছে’ বলে মনে হয়। যেখানে পুত্রকে ত্যাগ করে উত্তরণ পেতে চান না পিতা। যেন কবিও পরের নৌকায় উঠবেন না, বরং নিমজ্জিত হবেন। এখানে বাৎসল্যরসের সঙ্গে নীতিবোধের দ্বন্দ্বটি যেমন নৈয়ায়িক, কবিতার উৎক্ষেপের সঙ্গে ফর্মের আকাঙ্ক্ষার দূরত্বও তেমনি পাঠকরুচির।

সেই পাঠকরুচি নিয়ে মজিদ মাহমুদের কবিতায় আমি ঢুকে পড়ি সংশয়ে, ভিন্নতর সংকল্পে।

সোহেল হাসান গালিব
গালিব

সোহেল হাসান গালিব

জন্ম : ১৫ নভেম্বর ১৯৭৮, টাঙ্গাইল। বাংলায় স্নাতক ও স্নাতকোত্তর।
সহকারী অধ্যাপক, ঢাকা কলেজ, ঢাকা।

প্রকাশিত বই :
কবিতা—
চৌষট্টি ডানার উড্ডয়ন ● সমুত্থান, ২০০৭
দ্বৈপায়ন বেদনার থেকে ● শুদ্ধস্বর, ২০০৯
রক্তমেমোরেন্ডাম ● ভাষাচিত্র, ২০১১
অনঙ্গ রূপের দেশে ● আড়িয়াল, ২০১৪

সম্পাদিত গ্রন্থ—
শূন্যের কবিতা (প্রথম দশকের নির্বাচিত কবিতা) ● বাঙলায়ন, ২০০৮
কহনকথা (সেলিম আল দীনের নির্বাচিত সাক্ষাৎকার) ● শুদ্ধস্বর, ২০০৮।

সম্পাদনা [সাহিত্যপত্রিকা] : ক্রান্তিক, বনপাংশুল।

ই-মেইল : galib.uttara@gmail.com
সোহেল হাসান গালিব
গালিব