হোম গদ্য মঙ্গল মাঝির ঘাটে

মঙ্গল মাঝির ঘাটে

মঙ্গল মাঝির ঘাটে
607
0

সূর্য তখন মঙ্গল মাঝির ঘাটের পশ্চিমে হেলে পড়েছে। ঘুরতে ঘুরতে আমরা চা খাওয়ার জন্য এক ঘুমটি দোকানের টুলে বসলাম। কিন্তু সেখানে কনডেন্স মিল্কের চা। পাশের দোকানে খাঁটি গরুর দুধের চা আছে। আমার দুই সঙ্গী কবি ফেরদৌস মাহমুদ ও অরবিন্দ চক্রবর্তীকে বললাম, ‘চলেন, আমরা ঐ দোকানে গিয়ে বসি।’ সঙ্গে সঙ্গে এই দোকানি বলে উঠলেন, ‘আপনারা এখানেই বসে চায়ের অর্ডার দেন, অসুবিধা নাই। বসেন বসেন।’ আমি তার মুখের দিকে তাকালাম। খোঁচা খোঁচা দাড়ি। মাথার পেছনে চুলের একটা ঝুঁটি রাবার দিয়ে বাঁধা। আমার দ্বিতীয় সত্তা চাপাস্বরে কানে কানে বলে গেল―ইনি সহজিয়া মানুষ, মঙ্গল মাঝির ঘাটে তুমি যাকে খুঁজে বেড়াচ্ছ। এখানে বসো।

আমরা বসে পড়লাম। দোকানের ভেতরটায় চোখ বুলাতে লাগলাম আমি। একপাশে একটি সাইনবোর্ড দেখতে পাই। তাতে লেখা : ‘চিসতিয়া স্টোর। এখানে দেশি বিদেশি কফি, চা পাওয়া যায়।’ একটা ইুঁদর কোত্থেকে ছুটে এসে বাঁধাই করা বড় একটা ছবির পেছনে লুকাল। ছবিটি শাদা শ্মশ্রুমণ্ডিত উজ্জ্বল চেহারার এক বৃদ্ধের। ছবির নিচে তার নাম লেখা : ‘হযরত খাজা আবদুল হালিম মিয়া বয়াতি।’


আট কুঠুরি তো বোঝেন? আট কুঠুরি হলো শরীরের আটটা দরজা। বোঝেন তো? এই শরীরটা বেঁচে আছে এই আটটা দরজার মধ্য দিয়া, লালন যে দরজাগুলার কথা বলেছেন।


দোকানিকে জিজ্ঞেস করলাম, আচ্ছা ভাই, আপনার কী নাম?

: জসিম। বললেন দোকানি।

: বাঁধাইকরা ঐ ছবিটা কার?

: ছবিটা? ঐটা আমার মুর্শিদের। অনেক বড় বয়াতি ছিলেন, বুঝলেন। লালন তো বলেছেন, ‘আট কুঠুরি নয় দরজা আঁটা/ মধ্যে মধ্যে ঝরকা কাটা/ তার উপরে সদর কোঠা আয়না মহল তায়।’ কিন্তু আমার মুর্শিদ হালিম বয়াতি কী কয় জানেন? কয়, ‘নয় দরজা বন্ধ করে এক দরজায় মার টান।’

আমি পায়ের ওপর পা তুলে বসলাম। ফেরদৌস মাহমুদ আমার ঊরুতে খোঁচা দিচ্ছেন। খোঁচার অর্থ আমি বুঝতে পারি। অর্থ হচ্ছে এই, আপনি যাকে খুঁজছিলেন পেয়ে গেছেন। শুরু করে দিন।

আমি শুরু করে দিলাম। জসিমকে বললাম, বুঝিয়ে বলুন। এ বিষয়ে আমার জানাশোনা কম। এক দরজা মানে কী? দরজাটাই বা কোথায়?

জসিম বলতে শুরু করলেন পদ্মাতীরবর্তী তার নিজস্ব ভাষায় : আট কুঠুরি তো বোঝেন? আট কুঠুরি হলো শরীরের আটটা দরজা। বোঝেন তো? এই শরীরটা বেঁচে আছে এই আটটা দরজার মধ্য দিয়া, লালন যে দরজাগুলার কথা বলেছেন। কিন্তু আমার মুর্শিদের কথা হলো, ঐ নয় দরজা বন্ধ করে দিয়ে এক দরজায় টান মারো। ঐ এক দরজাটা কোথায়? সেটা হচ্ছে মাথার তালুতে। বুঝলেন তো? ঠিক এইখানে। শিশুদের মাথার তালুতে দেখবেন টিক্ টিক্ করে কী যেন লাফায়। গ্রামের মানুষ বলে ঐখানে ইন্দুর লাফাচ্ছে, বাচ্চার মাথায় তেল দাও। তেল দিলে লাফানি বন্ধ হয়ে যাবে। আমার মুর্শিদ বলেন, তেল দেওয়ার দরকার নাই। ঐ দরজা খুলে দাও। ঐটাই হচ্ছে আসল দরজা। ঐখানে টান মার। ঐটা খুলে দিলেই আসল মুক্তি। চোখ বন্ধ করলাম আমি। খানিকক্ষণ। চোখ খুলে জসিমকে বললাম, আপনার কাছে পান আছে ভাই?
জসিম বললেন, আছে। দেবো?

: কাঁচা সুপারি আর হাকিমপুরি জর্দা দিয়ে এক খিলি দেন। মাথাটা যাতে চক্কর মারে।

জসিম মুচকি হাসি দিয়ে পান বানাতে শুরু করলেন। আমি তার কথার আসল রহস্য খোঁজা শুরু করে দিলাম। মাথার তালুর দরজা খুলে দেওয়ার মানে আমি যা বুঝলাম তা বলতে লাগলাম আমার দুই সঙ্গীকে : তালুর ঐ দরজা খুলে দেওয়া মানে মাথাটা ফুটো করে দেওয়া নয় কিন্তু। হালিম বয়াতি এখানে টান মারার মধ্য দিয়ে মূলত জ্ঞানের কথা বোঝাতে চেয়েছেন। জ্ঞান তো থাকে এইখানে, মাথায়। জ্ঞানের এই দরজাটা খুলে দিতে হবে। তাহলেই মুক্তি। ঠিক বলেছি কিনা, জসিম ভাই?

তর্জনি নাড়িয়ে জসিম বললেন, রাইট। ঠিক বলেছেন আপনি।

: আচ্ছা, আমি হালিম বয়াতি সম্পর্কে জানতে চাই। তার কোনো বই পুস্তক কি পাওয়া যাবে?

: তার গানের বই আছে। এ-ই মোটা। কিন্তু এখানে তো পাবেন না। তার বাড়িতেও নাই। বইটার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছিল, জানেন?

: ওমা! বইয়ের বিরুদ্ধে মামলা হবে কেন? কপালে বিস্ময়ের রেখা টেনে বললাম আমি।

জসিম মুচকি হাসি দিলেন। হাসিতে উপহাসের মিশ্রণ। বললেন, বোঝেন না মোল্লা-মৌলানাদের কাণ্ড! হালিম বয়াতির বইটা নাকি সাইজে কোরান শরীফের চেয়ে বড় হয়ে গেছে। তাই ঠুকে দিল ওটার বিরুদ্ধে মামলা।

: আশ্চর্য! এটা কোনো কথা হলো!

: মোল্লা-মৌলানারা তো মূর্খ, বোঝেন না? ওরা এসব হাকিকতের কী বুঝবে।

জসিমের চোখের দিকে তাকালাম। তার ঠোঁটে চাপা হাসি। কী যেন লুকাইতে চাইছেন আমাদের কাছ থেকে। কী লুকাতে চাইছেন? আমার যৎসামান্য অভিজ্ঞতা সাক্ষী দিল―কোরানের চেয়ে সাইজে বড় হয়ে যাওয়ার কারণে আসলে বইটির বিরুদ্ধে মামলা হয় নি। মামলার কারণ অন্য। কী কারণ? নিশ্চয়ই হালিম বয়াতির কোনো গানে ইসলাম ধর্মের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো কথা আছে। এই কারণে মোল্লা-মৌলানারা ক্ষেপে গিয়ে মামলা ঠুকে দিয়েছে।

জসিম আবার বলতে শুরু করলেন, চেহারার সে কী জৌলুস আমার মুর্শিদের। বুঝলেন, মৃত্যুর আগে তার চেহারার দিকে তাকানো যেত না। যেন আসামানের চান। জ্বলজ্বল করছে। খুব সুপুরুষ ছিলেন। মস্ত জ্ঞানী মানুষ। তার গানের প্রতিটা লাইনে লাইনে হাকিকতের কথা, জ্ঞানের কথা। দেশ-বিদেশে তার হাজার হাজার মুরিদ। আমি অধমও তার মুরিদি নিছি।

: আচ্ছা, হালিম বয়াতি কি স্কুল-কলেজে লেখাপড়া করেছিলেন?

: না না, তিনি তো উম্মি মানুষ। অশিক্ষিত। লালনের মতো। লেখাপড়া কিছু করেন নাই।

: তাহলে তিনি এত বড় জ্ঞানী হলেন কেমন করে?

এবার কথা বলে উঠলেন আরেকজন, যার নাম আবদুল কুদ্দুস, যিনি দোকানের ভেতরে একপাশে বসে এতক্ষণ আমাদের কথা শুনছিলেন। থুতনির নিচে এক গোছা কুচকালো দাড়ি। মিচকালো শরীর। ডারবি সিগারেট ফুঁকতে ফুঁকতে তিনি বলতে শুরু করলেন : শোনেন, আসল ঘটনা আমি বলি। হালিম বয়াতির বাবা ছিল নাওডোবা গাঙের মাঝি। খেয়ানৌকায় লোক পারাপার করত। একদিন বিকেলবেলা। হালিম বয়াতী তখন ছোট। তার বাবা নৌকার লগিটা তার হাতে দিয়ে বলল, আমি বাড়ি থেকে একটু ঘুরে আসি। কেউ এলে তুই পার করে দিস।

ছেলেকে ঘাটে রেখে বাবা চলে গেল। লগি নিয়ে ঘাটে বসে রইল ছেলে। বসে থাকতে থাকতে সন্ধ্যা নামল। হালিম হঠাৎ দেখল, দেবী সরস্বতী তার সামনে হাজির। দেবী তাকে বলল, তুই আমারে পার কইরা দে। হালিম কী আর করে, নৌকায় উঠিয়ে দেবীকে গাঙ পার করে দিল। গাঙের এই পারে এসে হালিমরে দেবী বলল, তুই কী চাস বল? যা চাস সব দিব। হালিম বলল, আমি কী চামু? কিচ্ছু লাগবে না আমার। তখন দেবী বলল, হাঁ কর। হালিম মুখটা হাঁ করল। দেবী তার মুখে একটা ফুঁ দিল। সঙ্গে সঙ্গে হালিমের ছিনা খুলে গেল। মারেফাতের দুনিয়া তার চোখের সামনে ভাসতে লাগল। তারপর তো তিনি গান লেখা শুরু করলেন। আধ্যাত্মিক জগতে চলে গেলেন।

কৌতূহলী আমি মাথা নাড়াতে লাগলাম। কুদ্দুস বললেন, সত্যি ঘটনা কিন্তু ভাই। আমি বললাম, ঘটনা সত্য ঠিক আছে। কিন্তু একটা বিষয় বুঝে আসছে না। সরস্বতী তো হিন্দুদের দেবী। মারেফাত ব্যাপারটা তো হিন্দুদের মধ্যে নাই, এটা মুসলমানদের। সরস্বতী ফুঁ দিল আর অমনি হালিমের চোখের সামনে মারেফাতের দুনিয়া খুলে গেল, ব্যাপারটা ঠিক বুঝলাম না।

কথা কেড়ে নিলেন জসিম। বললেন, কুদ্দুস ঠিক বলে নাই। সরস্বতী নয়, তিনি আসলে দয়াল খোয়াজ খিজির। তার সাথে আরো ছয়জন ছিল। তিনিসহ মোট সাতজন গাঙ পার হতে আইছিল। সাতজনরেই পার করো দিছিল হালিম বয়াতি।

: সাতজনের মধ্যে কোনজন হালিমের মুখে ফুঁ দিয়েছিল?

জসিম হেসে দিয়ে বললেন, সেইটা তো কইবার পারুম না, ভাই।

আমি ফেরদৌস ভাইর মুখের দিকে তাকালাম। অরবিন্দ তাকালেন আমার মুখের দিকে। দুজনের উদ্দেশে বললাম, যে সরস্বতী সে-ই খেয়াজ খিজির। হালিম বয়াতির মুখে যিনি ফুঁ দিয়েছিলেন, হিন্দুদের কাছে তিনি সরস্বতী, মানে বিদ্যাদেবী, আর মুসলমানদের কাছে তিনি খোয়াজ খিজির, মানে সুমুদ্রের পীর, জলের শাসক। খেয়াল করুন, এখানে এসেই কিন্তু আন্তঃধর্মীয় ঐক্যটা ঘটে গেছে। ঠিক বলেছি না, জসিম ভাই?


শিষ্যের মন খারাপের কারণ বুঝতে পেরে তার বাড়িতে হাজির হলেন বড়পীর। জালালি দৃষ্টিতে তাকালেন মেয়েশিশুটির দিকে। সঙ্গে সঙ্গে শিশুটির নিচের দিকটা (নিম্নাঙ্গ) পুরুষের মতো হয়ে গেল, আর উপরের দিকটা (ঊর্ধ্বাঙ্গ) রয়ে গেল নারীর মতো।


জসিম বললেন, মূর্খ মানুষ আমি, অতশত কি আর বুঝি! খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে জানতে চাইলেন, আচ্ছা ভাই, আপনারা কি সাংবাদিক?

আমি বললাম, ঠিক সাংবাদিক না, পত্রিকায় কাজ করি আরকি। বলতে পারেন সাংবাদিক।

: আমি আগেই বুঝতে পারছি। আরেক খিলি পান খাবেন?

:  দেন। সুপারি বাড়িয়ে দেবেন কিন্তু। সাথে হাকিমপুরী।

দুই.
একে তো তীব্র গরম, তার উপর কাঁচা সুপারি ও জর্দা দিয়ে পান। আমার দুই গাল বেয়ে দরদর করে ঘাম ঝরতে লাগল। শরতের প্রখর সূর্যের তেজ ধীরে ধীরে মিইয়ে আসছে। মঙ্গল মাঝির ঘাট আরো বেশি জমে উঠছে ধীরে ধীরে। এক যুবক এসে ‘চিসতিয়া টি স্টলের’ ভেতরে ঢুকে জেটমেরে বসল। জসিমের কাছ থেকে একটা নেভি সিগারেটে নিয়ে আগুন ধরাল। তার ধোঁয়া ছাড়ার স্টাইল দেখে আমারও সিগারেট টানতে ইচ্ছে করল খুব। কিন্তু হাকিমপুরী জর্দা সিগারেটের বাপ! সিগারেটের নেশা দমিয়ে রাখে।

: আমি কি আপনার একটা ছবি তুলতে পারি? জসিমের উদ্দেশে বললাম আমি।

: কোনো অসুবিধা নাই, তোলেন।

আমি ক্যামেরা অন করলাম। জসিম বললেন, দাঁড়ান, আমি একটু রেডি হয়ে নিই।

একটা জালিটুপি মাথায় দিলেন জসিম। চুলের ঝুটিটা ছেড়ে দিলেন। লম্বা চুল কাঁধ অবধি নেমে এল। ‘চিশতিয়া টি স্টলে’র সাইনবোর্ডটা হাতে নিয়ে বললেন, এবার তোলেন।

আমি কয়েকটা ছবি তুললাম তার। সাইনবোর্ডটা নামিয়ে রেখে জসিম আমাকে হালিম বয়াতির মৃত্যুবার্ষিকীর একটা পোস্টার উপহার দিলেন। তাতে লেখা : নবম প্রয়াণ বার্ষিকী ২০১৬, শোক ও শ্রদ্ধায় স্মরণ, ২১ ফেব্রুয়ারি, মহান পীর দার্শনিক কবি লোকসংগীতের প্রবাদপুরুষ বিচারগানের সম্রাট হযরত শাহ সূফী খাজা আবদুল হালিম মিয়া বয়াতি চিস্তী নিজামী (র:) এর নবম প্রয়াণ বার্ষিকীতে গভীর শোক ও সশ্রদ্ধ স্মরণ।

জসিমের কাছে জানতে চাইলাম, আচ্ছা, এখানে প্রয়াণ লেখা কেন? মুসলমানরা তো সাধারণত ওফাত লেখে।

জসিম বললেন, ‘শোনেন ভাই, হালিম বয়াতি বাঙালি ছিলেন। ওফাত আরবি শব্দ, প্রয়াণ বাংলা। আপনি একজন বাঙালি। আমিও বাঙালি। আমাদের কি উচিত না বাংলা শব্দ ব্যবহার করা? আমার মুর্শিদ হালিম বয়াতি তো আরবি ভাষায় গান লেখেন নাই। লিখেছেন বাংলা ভাষায়। একজন বাঙালি কবির প্রায়ণ দিবসকে আমরা কেন ওফাত দিবস লিখব?

আমি মাটির দিকে তাকিয়ে কপালে হাত রাখি। দুই আঙুলে কপালটা ঘষি। সুপারির শেষ কণাটুকু চিবিয়ে আবদুল কুদ্দুসের কাছে জানতে চাইলাম, আচ্ছা ভাই, আপনি কোন তরিকার?

কুদ্দুস বললেন, ‘মোজাদ্দেদিয়া। আমি চন্দ্রপুরীর মুরিদ।’

কুদ্দুস তার মুর্শিদের পুর্বপুরুষদের নাম বলতে লাগলেন এক নিঃশ্বাসে। সবিস্ময়ে আমি বললাম, বাহ! এতসব নাম আপনি মুখস্থ রেখেছেন! দারুণ তো!’

আমার কথা কেড়ে নিয়ে জসিম বললেন, বাহাউদ্দিনের নাম শোনেন নি?

: না তো! কে তিনি?

জসিম বলতে লাগলেন, মোজাদ্দেদিয়া তরিকার অনেক বড় পীর। জানেন, তিনি কিন্তু নারী হয়ে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। মেয়েশিশু জন্মানোয় তার বাবার তো খুব মন খারাপ। তিনি গেলেন বড়পীর আবদুল কাদের জিলানির কাছে। শিষ্যের মন খারাপের কারণ বুঝতে পেরে তার বাড়িতে হাজির হলেন বড়পীর। জালালি দৃষ্টিতে তাকালেন মেয়েশিশুটির দিকে। সঙ্গে সঙ্গে শিশুটির নিচের দিকটা (নিম্নাঙ্গ) পুরুষের মতো হয়ে গেল, আর উপরের দিকটা (ঊর্ধ্বাঙ্গ) রয়ে গেল নারীর মতো। এই শিশুর নাম রাখা হলো বাহাউদ্দিন। অর্ধেক নারী আর অর্ধেক পুরুষ।

বাহাউদ্দিন বড় হলেন। বড়পীরের হাতেই তিনি বাইয়্যাত (শিষ্যত্ব গ্রহণ) নিলেন। এক পর্যায়ে বাহাউদ্দিনও অনেক বড় পীর হয়ে উঠলেন। দেশ-বিদেশে তার অনেক শিষ্য-শাবক। একদিন তিনি শিষ্যদের নিয়ে এক মরুভূমি পাড়ি দিচ্ছেন। হাঁটতে হাঁটতে শিষ্যরা হয়রান। খাদ্যসামগ্রী সব ফুরিয়ে গেছে। খাওয়ার মতো একটু পানি পর্যন্ত নাই। তৃষ্ণায় ছাতি ফাটার জোগাড় সবার। গলা শুকিয়ে কাঠ। অন্তত গলাটা ভেজানো দরকার; নইলে কেউ এক কদমও হাঁটতে পারবে না। বাহাউদ্দিন বুঝতে পারলেন শিষ্যদের দশা। তিনি তখন করলেন কী জানেন? তার বুকের দুধ (স্তন) দুইটা ছিল ই-য়া বড়। নাভি পর্যন্ত লম্বা। দুধ দুইটা তিনি কাঁধের ওপর দিয়ে পিঠের উপর চালান করে দিলেন। তার শিষ্যরা তার দুই দুধ চুষতে লাগল। দয়াল মাবুদের কী লীলা দেখেন, ঐ স্তন থেকে মধুর মতো মিষ্টি দুধ বেরুতে লাগল। শিষ্যরা বাহাউদ্দিনের দুধ খেয়ে তৃষ্ণা মেটাল।

আমি ফেরদৌস ভাইর মুখের দিকে তাকালাম। ফেরদৌস ভাই আমার দিকে। বললাম, দেখেন মিথ কিভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে এদের মুখে মুখে।

: হ্যাঁ, দারুণ মিথ। টুকে রাখেন। কাজে লাগবে।

কিন্তু টুকব কিভাবে? কাগজ কলম তো নেই সাথে। জসিমের কাছ থেকে একটা কলম চেয়ে নিলাম। কিন্তু কাগজ পাব কোথায়? মানিব্যাগ হাতড়িয়ে দেখি ব্যাংকে টাকা জমা দেওয়ার একটা রশিদ। ওটার উল্টো পিঠে টোকা শুরু করলাম। জসিম বললেন, কত টুকবেন। এরকম শত শত কাহিনি কেতাবে লেখা আছে।

: কেতাবে লেখা আছে! কোন কেতাবে?

: কেতাব আরকি। পীর-আওলিয়াদের কেতাব আছে না? সেগুলাতে লেখা আছে।

: আচ্ছা। কিন্তু আপনাদের এসব পীর-মুরিদি ব্যাপার-স্যাপার তো ধীরে ধীরে হারিয়ে যাচ্ছে তাই না?

: হারাবে কেন? লালন সাঁইর দেশ না এটা? হারিয়ে যাবে কোথায়? শোনেন, পৃথিবীতে আর কোনো নবী আসবে না। দয়াল নবীর মধ্য দিয়ে নবুয়তের দরজা বন্ধ। এখন পীর-আওলিয়াদের জমানা। তারাই এখন কুল-মাখলুকাতকে পথ দেখাবেন। পীর-আওলিয়াদের মৃত্যু নাই।

: কিন্তু ভাই, অনেক মুসলমান তো পীর-আওলিয়াদের মানে না।

: কারা মানে না? সবাই মানে। মানে না শুধু ওয়াহাবিরা। তারা খুব খারাপ। নামে মুসলমান, কামে বেদ্বীনের চেয়ে খারাপ।

: তাই নাকি? ওয়াহাবি আবার কারা?

: এই যে দেখেন না তাবলিগ জামাত। মসজিদে মসজিদে থাকে আর কী জানি কী তালিম করে। মানুষদের ধরে ধরে তালিম দেয়। এই তালিমই যত সর্বনাশের মূল।

: কেমন?

: তারা আমাদেরকে ইসলাম শেখায়। আরে ব্যাটা, তোদের কাছ থেকে ইসলাম শিখতে হবে? তোরা তো ওয়াহাবের বংশধর। তোরা ইসলামের সর্বনাশ করছিস।

দোকানের ভেতর বসে যে যুবকটি নেভি সিগারেট টানছিল সে বলে উঠল, ‘আমি যামু তাবলিগে/ আমার বউরে নিব পাবলিকে।’

এই বলে সে দোকান থেকে নেমে দাঁড়াল। আমি বললাম, এই কথার অর্থ কী ভাই?

: অর্থ বোঝেন না? ভণ্ড ভণ্ড, ওরা সব ভণ্ডের দল। ইসলামের বারোটা বাজিয়ে দিচ্ছে তাবলিগি ওয়াহাবিরা।
এই বলে যুবক চলে গেল। আমরা আবার আলোচনায় ফিরে এলাম। জসিমের কাছে জানতে চাইলাম, ওয়াহাবের বংশধর মানে?

জসিম বললেন, আপনি আবদুল ওয়াহাবের নাম শোনেন নাই?

: না তো! কে তিনি? বাড়ি কোথায়?

: কোথায় আর, আরবে। দয়াল নবীর জমানায় তার মা ছিল আরবের খুব খারাপ একজন মহিলা। দয়াল নবী কোনো কথা বললে সে তাতে রঙচঙ লাগিয়ে আরো কিছু বাড়িয়ে গ্রামে গ্রামে প্রচার করত। ধরেন, দয়াল নবী তার সাহাবাদের হুকুম দিলেন, তোমরা মদ খাওয়া অবস্থায় নামাজ দাঁড়াবে না। ওয়াহাবের মা এই কথাটি বিকৃত করে গ্রামে গ্রামে প্রচার করত, দয়াল নবী মদ খেতে বারণ করেছেন। অর্থাৎ দয়াল নবী যা বলতেন তাতে আরো কিছু যোগ করে কথাটাকে বিকৃত করে গ্রামে গ্রামে প্রচার করত ঐ মহিলা। একদিন দয়াল নবী তার এসব অপপ্রচারের কথা জানতে পারলেন। ঐ মহিলার নাক কেটে দিতে তিনি তার সাহাবাদের হুকুম দিলেন। সাহাবারা ঐ মহিলার নাক কেটে দিল।


বাংলার সহজিয়া মুসলমানরা সৃষ্টি করেছে সালাফি কট্টরপন্থাকে ঠেকানোর জন্য। ইসলামি কট্টরপন্থার বিরুদ্ধে প্রকৃত লড়াকু হচ্ছে এরাই, জসিম ও আবদুল কুদ্দুসের মতো মানুষেরা।


আবদুল ওয়াহাব বড় হয়ে তার মায়ের কাটা নাকের নেপথ্য কাহিনি জানতে পারল। তখন সে মাকে ছুঁয়ে শপথ করল, মা, যে কাজ করতে গিয়ে তোমার নাক কাটা গেছে, আজ থেকে আমিও সেই কাজ করব। ইসলামকে বিকৃত করাই হবে আমার জীবনের মূল লক্ষ্য। নবী যা বলেন নি, আমি মানুষদের কাছে তা-ই প্রচার করে বেড়াব। ইসলাম ধর্মকে বিকৃত করে তোমার নাক কাটার প্রতিশোধ নেব আমি। তারপর এই আবদুল ওয়াহাব শুরু করল ইসলাম ধর্মের বিকৃত প্রচার। তার অনুসারীদেরকেই বলা হয় ওয়াহাবি।

: আমাদের দেশে কি ওয়াহাবিরা আছে?

: আছে না! কত আছে…।

: কারা তারা?

: এই যেমন ধরেন তাবলিগ জামাতের লোকেরা। আরো আছে। চিটাগাংয়ের দিকে অনেক আছে। এরা লেবাসধারী মুসলমান। এজিদের বংশধর। ইসলামের গোড়া কেটে তারা আগায় পানি ঢালে, বুঝলেন ভাই। খুব খারাপ তারা।

ফেরদৌস ভাই ও অরবিন্দ এতক্ষণ হাতের তালুতে থুতনি ঠেকিয়ে আমাদের কথোপকথন শুনছিলেন। দুজনের উদ্দেশে আমি বললাম, বুঝলেন কিছু?

ফেরদৌস ভাই মাথা নাড়ালেন। বললাম, আবদুল ওয়াহাবের যে কাহিনিটা শোনালেন জসিম, তা কিন্তু ইতিহাসের কোথাও লেখাজোখা নেই। এই কাহিনি বাংলার সহজিয়া মুসলমানরা সৃষ্টি করেছে সালাফি কট্টরপন্থাকে ঠেকানোর জন্য। ইসলামি কট্টরপন্থার বিরুদ্ধে প্রকৃত লড়াকু হচ্ছে এরাই, জসিম ও আবদুল কুদ্দুসের মতো মানুষেরা। এরা বাঙালি সহজিয়া মুসলমান। এরা যতদিন থাকবে ততদিন এ দেশে জঙ্গিবাদ মাথা তুলে দাঁড়াতে পারবে না। এরাই প্রতিরোধ গড়ে তুলবে।

অস্তাচলে চলে গেছে সূর্য। ফেরার জন্য আমরা উঠে দাঁড়ালাম। আমার মোবাইল নম্বরটি চেয়ে নিলেন জসিম। বললেন, ঢাকায় গেলে আমি আপনাকে ফোন দেবো। বললাম, অবশ্যই দেবেন। বলবেন, আমি মঙ্গল মাঝির ঘাটের জসিম।

জসিম হাত বাড়িয়ে আমাদের সঙ্গে হ্যান্ডশেক করলেন। হাঁটতে হাঁটতে আমরা নদীর ঘাটে এসে দাঁড়ালাম। দখিনা বাতাস বইছে। আমার ভেতরে বাজছে : সহজ মানুষ ভজে দেখ না রে মন দিব্যজ্ঞানে…।

স্বকৃত নোমান

স্বকৃত নোমান

জন্ম ৮ নভেম্বর, ১৯৮০, বিলোনিয়া, পরশুরাম, ফেনী। বাংলাদেশ মাদ্রাসা শিক্ষাবোর্ড থেকে তিনি কামিল পাস করেন। বিএ পাশ করেন সোনাগাজী ডিগ্রি কলেজ, ফেনী থেকে। পেশায় সাংবাদিক।

উল্লেখযোগ্য বই :
নাভি (উপন্যাস), ২০০৮, ধাবমান ও বনলতা পাবলিকেশন্স।
রাজনটী (উপন্যাস), ২০১১, ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ।
বেগানা (উপন্যাস) ২০১২, বিদ্যাপ্রকাশ।
হীরকডানা (উপন্যাস) ২০১৩, বিদ্যাপ্রকাশ।
নিশিরঙ্গিনী (গল্পগ্রন্থ) ২০১৪, জাগৃতি প্রকাশনী।
কালকেউটের সুখ (উপন্যাস) ২০১৫, জাগৃতি প্রকাশনী
বালিহাঁসের ডাক (গল্প), ২০১৬, অনিন্দ্য প্রকাশ

আবদুশ শাকুরের জীবনী, বাংলা একাডেমি, ২০১৫
প্রাচ্যের ভাব আন্দোলনের গতিধারা (প্রবন্ধ), ২০০৯, বাঙলায়ন।
খ্যাতিমানদের শৈশব (গবেষণা), ২০১০, ইত্যাদি গ্রন্থ প্রকাশ।
আবদুশ শাকুরের বয়ান, শ্রোতা স্বকৃত নোমান (সম্পাদনা) ২০১২, রোদেলা প্রকাশনী।
গুণীজন কহেন (সাক্ষাৎকার সংকলন) ২০১২, অন্বেষা প্রকাশন।
বহুমাত্রিক আলাপ (সাক্ষাৎকার সংকলন), ২০১৫, বিদ্যাপ্রকাশ।

ই-মেইল : swakritonoman@gmail.com
স্বকৃত নোমান

Latest posts by স্বকৃত নোমান (see all)