হোম গদ্য ভোরের স্বগতোক্তি : কো উন

ভোরের স্বগতোক্তি : কো উন

ভোরের স্বগতোক্তি : কো উন
263
0
কবির গদ্যও কবিতার অবিরল ধারার মতো। গদ্যেও বড় কোনো তত্ত্ব নিয়ে হাজির হন না কবি। বরং সব তত্ত্ব, তথ্য ও বিশ্লেষণ সত্ত্বেও যেন সেই গদ্য তার কাব্যধারার ওপর দিয়ে বয়ে চলা আরামদায়ক ও সম্মোহনী হাওয়া। যা পাঠকের জন্য উপলব্ধির পাশাপাশি বোধগম্যতার এক বাড়তি সঞ্জীবনী। পূর্ব এশিয়ার দেশ দক্ষিণ কোরিয়ায় জাতীয় কবির মর্যাদায় অভিষিক্ত কো উনের খ্যাতি রয়েছে সারা বিশ্বেই। দক্ষিণ কোরিয়ার আধুনিক কবিতার প্রায় সমান বয়সী কবি কো উনের অসাধারণ এই গদ্যটি ইংরেজিতে ছাপা হয়েছিল ‘কোরিয়ান লিটারেচার নাও’ ত্রৈমাসিক সাহিত্য সাময়িকীর ২০১৪ সালের শারদীয় সংখ্যায়। বাঙালির প্রাচীন ধর্ম ও সংস্কৃতির নিকটাত্মীয় এক সংস্কৃতির বর্তমান এবং কবির মনস্তত্ত্ব ও দৃষ্টিভঙ্গি বোঝতে গদ্যটি খুবই সহায়ক হতে পারে। বাংলাভাষার পাঠকদের জন্য সেটি অনুবাদ করেছেন মাকসুদ ইবনে রহমান।

আমি আমার সব সীমাবদ্ধতা ঝেড়ে ফেলে ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে লিখছি।

সম্প্রতি একদিন ভোরে আমি ঘুম থেকে উঠলাম। আগের দিন সন্ধ্যায় আমি মাতাল হয়ে বাড়ি ফিরেছিলাম। আমার নিষ্পাপ মাতলামির প্রবল উন্মত্ততা কেটে যাওয়ায় (ঘুম থেকে উঠার পর) খুব তৃষ্ণার্ত বোধ করলাম। আমি কিছুটা পানি খেয়ে নিলাম।

‘আমি কে?’ হঠাৎ নিজেকে আমার এই সাধারণ প্রশ্নটা করতে আর ভালো লাগল না। তাই আমি সন্দেহ নিয়ে শুরু করলাম। সম্ভবত কেউ একজন কো উনকে কো উন নামটা দিয়েছিল এবং যে কো উনের অস্তিত্ব কখনোই ছিল না। ফলে আমিই কো উন হয়ে গেলাম এবং এই আমিই একজন কবি হিসেবে প্রায় ৬০ বছর ধরে বেঁচে আছি। তাহলে এই আমি কি মিথ্যা? একটা হিমেল অনুভূতি আমাকে আচ্ছন্ন করে ফেলল।

১৯৫০ দশকের শেষের দিকে এবং ১৯৬০ দশকের শুরুতে কোরিয়ার বিভিন্ন জায়গায় কয়েকজন ভুয়া কো উনের আবির্ভাব ঘটেছিল। তাদের একজন আঞ্চলিক কবিতা উৎসবে জুরিবোর্ডের সভাপতির আসন অলঙ্কৃত করল; একজন সংস্কৃত ভাষায় কথা বলে জনগণকে তাক লাগিয়ে দিল; আরেকজন বিদেশ ভ্রমণের কথা বলে অর্থ ও মূল্যবান সামগ্রী হাতিয়ে নিল। বিদেশ ভ্রমণের ব্যাপারটা তখনকার সময়ে ছিল খুবই বিরল ঘটনা। যা হোক, শেষপর্যন্ত সে ভাড়ার টাকা জোগাড় করতে পারে নি। সবচেয়ে বাজে যে ঘটনাটা ঘটেছিল তা হচ্ছে, একজন কো উন সেজে সিউলের একটা নারীদের বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন স্নাতককে বিয়ে করে ফেলল। এসব ভুয়া কো উনদের একজনকে গ্রেফতারও করা হয়েছিল। আমি অবশ্য তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ বাতিল করে দিয়েছিলাম। দুই গালে দুইটা চড় দিয়ে আমি তাকে মদ কিনে দিলাম। তাকে তার নিজের জীবনে ফিরে যাওয়ার উৎসাহ দিলাম। সেই সময় আমার মনে হয়েছিল, আমিই সম্ভবত ভুয়া কো উন, আর ওই ভুয়া কো উনই সম্ভবত সত্যি।

অতীতের ওই সব অদ্ভুত ঘটনা স্মরণ করে আমি বিস্ময়ের সাথে মনে মনে ভাবতে শুরু করেছি, আমি সত্যিই আমি কি না! যদি তা না হই তাহলে একটা অস্তিত্বহীন সত্তাকে বর্তমানে অস্তিত্ব দিয়ে একটা ভেজাল আমিকে সত্যিকারের আমির মতো নিখাদ আমিতে পরিণত করেছি কি না! তেমন হলে একজন কিভাবে কো উনের—যে কি-না জীবনের উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে গেছে—অসংখ্য কাব্যিক জগৎ এবং অসংখ্য সাহিত্যিক কাজ নিয়ে কথা বলতে পারে? ১২শ শতকের কবি-প্রতিভা জেয়ং জি-স্যাং (Jeong Ji-sang) যেমন বলতেন, তাঁর কবিতা তৈরি হয়েছে এক ভুতবন্ধুর সহায়তায়; তেমনই কেউ একজন হয়তো আমার কবিতাও তৈরি করেছে অথবা কেউ একজন আমার নামে বছরের পর বছর ধরে রাতদিন লিখে চলেছে।

আমি মাঝে মাঝে কঠিন নিরীক্ষার মাধ্যমে আমার কবিতার বিষয় এবং আমার বাস্তব অস্তিত্ব সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার চেষ্টা করি। সেই চেষ্টা আমি যত বেশি করি ততই এই ভেবে নিজের ভেতরে কাঁপন অনুভব করি যে আমি সম্ভবত শুধু বাইরের একটা আবরণ, একটা বাহ্যিক অস্তিত্ব, ত্বকের একটা বহিঃস্তর এবং মেকি একটা কিছু। আমি এই চিন্তাকেও এড়িয়ে যেতে পারি না যে, তথাকথিত আধুনিক সত্তা আসলে আত্মসত্তার একটা ভঙ্গুর ধারণা ছাড়া আর কিছু নয়। তাই এ কথা স্বীকার না করেও পারছি না যে, আমার কবিতার স্থির কোনো সংজ্ঞা নিরূপণ করা সম্ভব নয়। স্পষ্ট অনুভূতির প্রকাশ এখানে অকার্যকর।


সম্ভববত নামহীন লেখকদের রক্ত থেকেই আমার জন্ম হয়েছিল


কবিতার উৎপত্তির তত্ত্বগুলো দাবি করে যে প্রাচীন যুগের কবিতা ও গান সব সময়ই ছিল নামহীন এবং তা তৈরি হতো পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে। ওই সব কবিতা ও গান প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে সংশোধিত হয়ে অবশেষে যথার্থ পাঠ হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেত। সেখানে এমন পার্থিব পরিবেশ-পরিস্থিতি ছিল যেটির মাধ্যমে আত্ম-বিবর্জিত ও ব্যক্তি-নিরপেক্ষ কাব্যশাস্ত্রের জন্ম হতো। এমনকি এখনও আলটেইক পার্বত্য এলাকায় কিছু ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠির লোক আছে যারা ভীষণ রকম দীর্ঘ আখ্যানমূলক কবিতা রচনা করে। তাদের সেই কবিতা আবৃত্তি করে শেষ করতে কয়েক দিন ও কয়েক রাত লেগে যায়। গোবি মরুভূমির যাযাবর জীবনেও আখ্যানমূলক কবিতার নজির দেখা যায়। সেইসব কবিতার শেষ লাইনে পৌঁছতেও সারা রাত জেগে থাকতে হয়। দিকচক্রবালে ভোরের সূর্য যখন তার আভা ছড়িয়ে দেয় তখন তাদের কবিতা শেষ হয়। সম্ভববত নামহীন লেখকদের রক্ত থেকেই আমার জন্ম হয়েছিল এবং এই মহাদেশের অন্তহীন গতিময়তার মধ্যে সেই রক্ত একীভূত হয়ে গিয়েছিল। যে কারণে আমি নিজেও আখ্যানমূলক কবিতা রচনা করেছি। যেসব কবিতা শেষ করতে কয়েক দিন লেগে যায়। উদাহরণ হিসেবে আমার সাত খণ্ডের ‘বায়েকডু পর্বত’ (Mount Baekdu) এবং ত্রিশ খণ্ডের ‘মানিবো’ বা ‘দশ হাজার জীবনে’র (Ten Thousand Lives) কথা বলা যায়।

আমার সামনে আখ্যানের যে জগৎ আছে সেখানে শেষপর্যন্ত লেখক হচ্ছে সামষ্টিক ‘লেখকেরা’। এটা শুধু লেখা প্রস্তুত করার প্রক্রিয়ার মধ্যেই থাকে না, সেখানে শুধু একজন ব্যক্তি নয়, আরো অনেক লোক থাকে যারা এই কাজের সাথে যুক্ত হয়। অধিকন্তু, কবিতার লেখকই নন শুধু, যারা কবিতা উপভোগ করেন তারাও সবাই এক একজন ব্যক্তি, রাজপ্রাসাদের গুটিকয় ব্যক্তির গণ্ডি ছাড়িয়ে যা বহুদূর বিস্তৃত।

বস্তুত, প্রাচীন ভারতের ‘মহাভারত’ ও ‘রামায়ণ’ এবং প্রাচীন চীনের হলুদ নদীর (Yellow River) অববাহিকায় রচিত ‘গাথাকবিতার বই’ (Book of odes) কোনো একজন কবির কাজ নয়। গ্রীসের পুরাণ ও মহাকাব্য—যেগুলো সরাসরি ভারতীয় পুরাণ ও কবিতা থেকে ধার করে তৈরি করা—সেগুলোও ছিল যৌথ রচনা। যে সাংস্কৃতিক ইতিহাসবিদ হোমারকে ‘হোমার আলফা’ হিসেবে দেখেছেন দৃষ্টিভঙ্গির দিক থেকে তিনি অনেক প্রাজ্ঞ। এভাবে দেখলে দেখা যায়, ব্যক্তি ও সমাজের মধ্যকার দ্বন্দ্ব আধুনিক রাজনৈতিক কবিতা এবং যৌথভাবে রচিত কবিতারও অনেক আগের। এমনকি এই দ্বন্দ্ব একেবারে প্রাগতৈহাসিক।

যা হোক, একেবারে আদি থেকেই মৌলিক কবিতার সামাজিকীকরণ সত্ত্বেও ৫ হাজার ৫শ বছর আগের সুমেরীয় সভ্যতার মাটির ফলকে একজন ব্যক্তি-কবির নাম লিপিবদ্ধ থাকার নজিরও পাওয়া যায়। সেই নিদর্শন থেকে আমরা প্রথম লেখকের নাম-পরিচয় জানতে পারি। তার নাম ছিল ক্যানোচে ক্যাডরো (Kanoche Kadro)। আমাদের সৌরজগতের মানবের এই গ্রহে বিদ্যমান কবিতার যে কাঠামো তাতে আমরা কবিদের নাম পাই। মনে হয় এ যেন মহাজাগতিক এক মন্ত্রোচ্চারণ। সভ্যতার ইতিহাসে এইসব কবিতার মূল্য আছে, এসবই পৃথিবীতে কাব্যিক জগৎকে টিকিয়ে রেখেছে। সম্ভবত এই কারণেই নব্য সমালোচনা তত্ত্বগুলো (New Criticism) লেখক ও তার সৃষ্টির মধ্যকার সম্পর্ককে অস্বীকার করে, কবিকে কবিতা থেকে সরিয়ে রাখে এবং কবিতাকে কবি থেকে বিচ্ছিন্ন মনে করে। ব্যাপারটা যেন এমন যে, পক্ষপাতহীন মূল্যায়নের প্রয়োজনে কোনো প্রতিযোগিতা থেকে লেখকের নাম গোপন রাখা হচ্ছে। তা সত্ত্বেও কবি সব সময়ই তার কবিতাকেই অনুসরণ করে এবং কবি তার কবিতার সাথে নিয়তির দ্বারাই সম্পর্কিত থাকে।

এখানে আমি এমন কোনো সিদ্ধান্ত টানতে চাই না যে কবিতা একটা সমগ্রতে বিস্তৃত কিংবা একজন ব্যক্তির মধ্যে কেন্দ্রীভূত। আধুনিক পদার্থবিদ্যায় সবচেয়ে ক্ষুদ্রতম একক ‘প্ল্যাঙ্ক লেন্থ’ (Planck Length) এবং সুবিশাল মহাবিশ্ব শুধু অবয়বগত ধারণার দ্বারা কিভাবে স্বাধীন থাকে? এই দুটিকে শেষপর্যন্ত একই সাথে সুনির্দিষ্ট করে দেখাতে হবে ঠিক বুদ্ধের হুইয়ান (Buddhist Huayan) ধারণার মতো। হুইয়ানে বলা হয়েছে, ‘একই সমগ্র এবং সমগ্রই এক।’ যেভাবে ভাষা প্রকাশিত হয় তার মধ্যেই কবিতার এই ‘এক’ অথবা ‘সমগ্রের’ উদ্দেশ্য প্রতিফলিত হয়। আমি চাই না কোরিয়ার কবিতা তার নিজের তার নিজের মাতৃভাষার সীমা ছাড়াতে ব্যর্থ হয়ে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের কবিতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যাক অথবা আমি এও চাই না যে কোরিয়ার কবিতা বিশ্বের কাব্যিক ঘূর্ণাবর্তে হারিয়ে যাক।


যে ভাষায় একটা কবিতার জন্ম হয়েছে সেই ভাষার দেশের সীমার মধ্যে তা আটকে থাকতে পারে না।


তারপরও কবিতা গেঁয়ো আত্মতৃপ্তির মধ্যে আটকে থাকতে পারে না কেবল এই দাবিতে যে, কবিতার মূল ভাষাকে অনুবাদ করা যায় না। যে ভাষায় একটা কবিতার জন্ম হয়েছে সেই ভাষার দেশের সীমার মধ্যে তা আটকে থাকতে পারে না। সেভাবে আটকে থাকা কবিতা একটা দীর্ঘ সময়ের পরে উপজাতীয়দের কামানের মতো একটা জায়গায় স্থির হয়ে যাবে। পারস্য দেশের হাফিজের কবিতা হচ্ছে তার উদাহরণ।

কবিতা শুধু পার্থিব নয়, স্বর্গীয়ও বটে। উপরন্তু কবিতার থাকে নবস্বপ্ন, তাই পৃথিবীর যে স্থানে তার জন্ম সেই স্থানের আশির্বাদ দিয়ে তাকে ঘুম পাড়িয়ে রাখা যায় না। কবিতা মৌলিকভাবেই অস্থির ও বিদ্রোহী। তাই এক ভাষার কবিতা দূরের অথবা কাছের যেকোনো ভাষার কবিতার সাথে মিশে যায়। তারপর সে ওই ভাষার একেবারে ভেতরে প্রবেশ করে এবং পুনর্জন্ম লাভ করে।

তাই কবিতা সহজাতভাবে তার মূল ভাষা থেকে অন্য ভাষায় রূপান্তরের মধ্য দিয়ে কষ্টকর পথে পুনর্জন্ম লাভ করে পরিপূর্ণতা পায়। সে নিজ দেশের জগতের সীমানা পেরিয়ে বহির্জগতের দিকে পা বাড়ায়। যেমনটা হয় প্রাচীন কাব্য ‘গিলগামেশে’ (Gilgamesh)। ওই কাব্যের নায়ক গিলগামেশ তার অপূর্ণ জীবনে পরিপূর্ণতা পাওয়ার আশায় নিজ দেশের সীমানার বাইরে ভ্রমণ করতে বাধ্য হয়েছিলেন। এটি আমাদের এই ধারণাই দেয় যে, কবিতা হচ্ছে এমন একটা কিছু যা একই সাথে ব্যক্তিক ও সামষ্টিক।

ফরাসি কবি মিশেল দেগুই (Michel Deguy) কবিতার অনুবাদের বিরোধিতা করেছেন। অনুবাদে আস্থা না থাকলেও আমেরিকার কবি গ্যারি স্নাইডার (এGary Snyder) এবং সুইডেনের কবি টমাস ট্রান্সটোমারের (Tomas Transtromer) কবিতার অনুবাদ একদিকে যেমন তাদের নিজেদের ভাষাকে মুক্তি দিয়েছে, তেমনি অন্য দিকে তা দুইটি ভাষার মধ্যে বন্ধুত্বের উপলব্ধিও তৈরি করেছে। এ হচ্ছে অন্যের সাথে মিশে যাওয়ার ব্যাপারে কবিতার নিজস্ব আকুতি। প্রতিটি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডই হচ্ছে একটা রসায়ন এবং পারস্পরিক বোঝাপড়ার ভিত্তিতে একটা রক্তের সম্পর্ক, একটা যোগাযোগ।

আমার কবি-ভাইদের মতো আমার কবিতাও মাতৃভাষায় তাদের মৌলিকত্ব নিয়েও অন্য অনেক ভাষায় পুনর্জীবন লাভ করেছে। এটি পৃথিবীর অন্য স্থানগুলোতে আমার বেঁচে থাকা সম্ভব করে তুলেছে। কারণ, অস্তিত্ব মানেই পৃথিবীর বুকে অস্তিত্ব।

আমি শুধু পূর্ব এশিয়ার কোরীয় উপদ্বীপের কবি নই, আমি কবিতার একজন তীর্থযাত্রীও, অকুতোভয়ে গোটা পৃথিবীময় বিচরণ করছি। আমি প্রাচীন দক্ষিণ-পশ্চিম এশীয় হোতা (Hoter) কিংবা একজন আলিমা১০ (Alima), যে নাকি প্রাচীন গোটা মিশর ঘুরে বেরিয়েছে। আমার লক্ষ্য হচ্ছে পরিক্রমণশীল ও আবর্তমান স্বাধীনতা, যার কাছে ঊষর জনহীন প্রান্তর এবং বেদির মধ্যে কোনো তফাৎ নেই। আমি মধ্যযুগের ইউরোপের একজন গীতিকবি এবং গীতিকবিতার রচয়িতাও। আমি দিনরাত বিচরণ করি পৃথিবীর সর্বত্র, যেখানে কবিতার আত্মা ক্রমাগত ঊর্ধ্বপানে ধেয়ে চলে।

কবিতা কখনো একটি স্থানের দ্যোতনায় শেষ হয়ে যায় না। আমার কবিতা চূড়ান্ত অর্থে হয়ে উঠবে অন্যের কবিতা।


টীকা :
.
১। হোমার আলফা : মানে প্রথম হোমার। প্রাচীন গ্রীক সাহিত্যের মহাকবি ব্যক্তি হোমারকে নিয়ে যে কিংবদন্তি আছে তাকে অস্বীকার করেন আধুনিক সাংস্কৃতিক ইতিহাসবিদরা। এখানে ‘হোমার আলফা’ বলতে ব্যক্তি হোমার নয়, উনিশ ও বিশ শতকের সমালোচকদের মাধ্যমে শক্ত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত ‘বহু রচয়িতা তত্ত্বের’ কথা বলা হয়েছে। তারা বলেন, হোমারের নামে প্রচলিত যে দুটি মহাকাব্য—‘ইলিয়াড’ ও ‘অডিসি’—তা একক কারো রচনা নয়। এটি লোকসাহিত্যের ধারায় মুখে মুখে সৃষ্ট ও সমৃদ্ধিপ্রাপ্ত দুটি রচনা। কেউ কেউ বলেন, এগুলোর প্রথম রচয়িতা কেউ থাকলেও পরবর্তী অনেকের হাতে সমৃদ্ধ হয়ে শৈল্পিক উৎকর্ষ লাভ করেছে। কেউ কেউ বলেন, হোমার শব্দটি দ্বারা কোনো ব্যক্তির নামই বোঝায় না। এই শব্দ দ্বারা গাথা, কথন, গাওয়া এবং যুদ্ধবন্দির পুত্রদের বোঝায়। মূলত তারা হোমার বলতে লোক-ঐতিহ্যের দিকটি প্রমাণের চেষ্টা করেন।
.
২। প্লাঙ্ক লেন্থ : কোয়ান্টাম বলবিজ্ঞানের পরিভাষা। পরিমাপের ক্ষুদ্রতম একক। দৈর্ঘ্যের একেবারে সর্বনিম্ন একক কিংবা সর্বনিম্ন দৈর্ঘ্যকে বলে প্লাঙ্ক লেন্থ বা প্লাঙ্ক দৈর্ঘ্য। কোয়ান্টাম তত্ত্বের আবিষ্কারক জার্মান নোবেলবিজয়ী পদার্থবিজ্ঞানী ম্যাক্স প্লাঙ্কের নামানুসারেই দৈর্ঘ্য পরিমাপের এই এককের নামকরণ হয়েছে।
.
৩। হুইয়ান : বৌদ্ধধর্মের দশভূমিকা সূত্র থেকে হুইয়ান ধারার উৎপত্তি। চীনের ট্যাং রাজবংশের সময়ে এটি দার্শনিক ধারণা হিসেবে বলিষ্ঠতা লাভ করে।
.
৪। হাফিজ : খাজা শামসুদ্দিন মোহাম্মদ হাফিজ-এ-সিরাজের ছদ্মনাম ‘হাফিজ’। চৌদ্দ শতকের পারস্যের প্রখ্যাত কবি।
.
৫। গিলগামেশ : বিশ্বের প্রাচীনতম মহাকাব্যের নির্দশন ‘গিলগামেশের মহাকাব্য’। গিলগামেশ বা বিলগামেশ হচ্ছে সেই মহাকাব্যের মহানায়ক। এটি প্রাচীন মেসোপটেমীয় সভ্যতার সাহিত্যের নিদর্শনও।
.
৬। মিশেল দেগুই (১৯৩০) : ফরাসি কবি ও অনুবাদক এবং সাহিত্যের অধ্যাপক।
.
৭। গ্যারি স্নাইডার (১৯৩০) : মার্কিন পণ্ডিত গ্যারি স্নাইডার। কবি হিসেবে সমধিক খ্যাতিমান। প্রাবন্ধিক, বক্তা ও পরিবেশবাদী হিসেবেও তিনি পরিচিত।
.
৮। ট্রমাস ট্রান্সটোমার (১৯৩১-২০১৫) : সুইডিশ কবি, মনস্তাত্ত্বিক এবং অনুবাদক। ২০১১ সালে সাহিত্যে নোবেলবিজয়ী।
.
৯। হোতা : বৈদিক যজ্ঞে ষোল জন ঋত্বিকের প্রয়োজন হতো। চারজন হোতা, চারজন অধ্বর্য্যু, চারজন উদ্গাতা, আর চারজন ব্রহ্মা। যাহারা ঋঙমন্ত্র পাঠ করত, তারা হোতা। হোতারা ঋঙমন্ত্র পাঠ করে দেবতাদের আহ্বান করেন—‘অগ্নি হবিরাদি’ বহন করে দেবতাদের আহ্বান করেন—এই জন্য হোতা। “ঋত্বিজং হোতারং” সায়নাচার্য্য এর অর্থ করেন যে, অগ্নি ঋত্বিকের মধ্যে হোতা। (সূত্র: বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়/ দেবতত্ত্ব ও হিন্দুধর্ম/ বেদ।)
.
১০। আলিমা : প্রাচীন মিসরে এবং আরবে আলিমা ছিলেন নৃত্য ও গীতি পরিবেশনকারিণী। ওসমানীয় সাম্রাজ্যেও এই ঐতিহ্য ছিল। এরা বিশেষ করে ডোম বা জিপসি সম্প্রদায়ের মানুষ। ফরাসি লেখক গুস্তাভ ফ্লবেয়র তাঁর জনপ্রিয় ভ্রমণ-রচনা ফ্লবেয়র ইন ইজিপ্ট গ্রন্থে আলিমাকে বলেছেন ‘আলমে’। অনেকে মনে করেন, আলিমা গান ও নাচ পরিবেশন করতেন শুধু নারীদের। পুরুষদের জন্য নাচ ও গান পরিবেশন করতে ‘ঘাজিয়া’ বা ‘ঘাওয়াজি’রা (Ghawazi)। রাস্তায়, বাড়ির দরজায় কিংবা রাজ-দরবারের হেরেমের বাইরে নাচ-গান করতেন খোলামেলা পোশাকে। উনিশ শতকে কায়রোতে ঘাজিয়ারা নিষিদ্ধ হয়ে যাওয়ার পর তারা একটি নতুন কৌশল নেয়। তারা তখন বলে যে, তারা আসলে আলিম, মানে তারা গান, নাচ কবিতা আবৃত্তি, সংস্কৃতি ও চিন্তাভাবনা করতে শেখায়। ফরাসি প্রাচ্যতত্ত্বে এসে এই আলিমারা আলমে হয়ে যায় এবং পরে যার অর্থ দাঁড়ায় বেলি ড্যান্সার। ঘাওয়াজি শব্দটির উৎপত্তি আবার উত্তর ভারতীয় ‘গাওয়ার’ থেকে। ‘গাওয়ার’ মানে গায়ক।

সংশ্লিষ্ট পোস্ট : কো উনের কবিতা : সম্রাজ্ঞী ও নর্মসখীরাদানব-তাড়িত এক বৌদ্ধের সাক্ষাৎকার

মাকসুদ ইবনে রহমান

জন্ম ১৯৬৪, নারায়ণগঞ্জ। ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর। পেশা সাংবাদিকতা।

Latest posts by মাকসুদ ইবনে রহমান (see all)