হোম গদ্য ভাষা, কবিতা ও রবীন্দ্রনাথ

ভাষা, কবিতা ও রবীন্দ্রনাথ

ভাষা, কবিতা ও রবীন্দ্রনাথ
615
0

১.

‘জানার কথাকে জানানো আর হৃদয়ের কথাকে বোধে জাগানো, এ ছাড়া ভাষার আর-একটা খুব বড় কাজ আছে। সে হচ্ছে কল্পনাকে রূপ দেওয়া। এক দিকে এইটেই সবচেয়ে অদরকারি কাজ, আর-এক দিকে এইটেতেই মানুষের সবচেয়ে আনন্দ।…

মানুষ নির্মাণ করে প্রয়োজনে, সৃষ্টি করে আনন্দে। তাই ভাষার কাজে মানুষের দুটো বিভাগ আছে—একটা তার গরজের; আর-একটা তার খুশির, তার খেয়ালের। আশ্চর্যের কথা এই যে, ভাষার জগতে এই খুশির এলাকায় মানুষের যত সম্পদ সযত্নে সঞ্চিত, এমন আর-কোনো অংশে নয়। এইখানে মানুষ সৃষ্টিকর্তার গৌরব অনুভব করেছে, সে পেয়েছে দেবতার আসন।’

(বাংলাভাষা-পরিচয়, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর)

ভাষার সৃষ্টিশীল ও কল্পনাশ্রয়ী প্রয়োগকার্যের হোতা বিশেষ মানব সম্পদায়কে রবীন্দ্রনাথ সৃষ্টিকর্তার গৌরবে গৌরবান্বিত করেছেন।  প্রবন্ধ রচনায় রবীন্দ্রনাথ তুলনা, উপমা, অনুসন্ধান, সংযুক্তির স্তরে স্তরে হেঁটে শেষাবধি এরকমই বিস্ময়কর কিছু উপলব্ধি বা মীমাংসায় পৌঁছাতে চেয়েছেন অনেকবারই। তখন সে গদ্য আর গদ্যের যৌক্তিক সীমাবদ্ধতায় শুধু গুমরে মরে নি, কাব্যও হয়ে ওঠেছে। অর্থাৎ প্রয়োজনের কথা বলার ভাষাটিও অর্থের ভেতর দিয়ে পৌঁছাতে চায় প্রয়োজনাতিরিক্ত অন্য-অর্থ তৈরির পাঁয়তারায়।

রবীন্দ্রনাথকে টেনে আনার অতি প্রয়োজন ছিল না, কিন্তু এড়িয়ে যাবারও সাধ্য ছিল না, এই রচনায়, কারণ ভাষা নিয়ে কথা, এবং তা সাহিত্যের ভাষা, আর এই চিন্তা এলাকায় তাঁর খননকার্যের দাগচিহ্ন দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য অপ্রতুল নয়। হালের সাহিত্যকর্মীরা সকলেই ভাষা নিয়ে নানান ধরনের নতুন নতুন ইশারা উদ্রেক লক্ষ করে থাকি।

সাহিত্য কোন ভাষায় হবে? আঞ্চলিক ভাষায় নাকি ‘শুদ্ধ’ বা ‘মান’ ভাষায়?

রবীন্দ্রনাথ ভাষা নিয়ে চিন্তা করেছেন, ভাষার সংস্কার বা আধুনিক রূপকাঠামো তৈরির ধারায় সাধু থেকে চলিত পর্যন্ত এসেছেন। সাধু ভাষার মৃত্যু যে আসন্ন সেটা তিনি উপলব্ধি করেছেন কমপক্ষে ৭৫ বছর আগে। চলতি বা চলিত ভাষাটাকে তিনি প্রয়োজনের ভাষা হিশেবে দেখেছেন।

‘স্বদেশী বিদেশী হালকা ভারী সব শব্দই ঘেঁষাঘেঁষি করতে পারে তার আঙিনায়।’ কলকাতা-কেন্দ্রিক যে ভাষার বিকাশ, তাকেই চলতি ভাষা বলতে চেয়েছেন রবীন্দ্রনাথ। আবার সেখানে পূর্ববঙ্গের (বর্তমান বাংলাদেশের) শব্দের কথনের অনুপ্রবেশকেও তিনি রোধ করতে চান নি।

তিনি বলেছেন :

‘কোনো বিশেষ কারণে বিশেষ প্রদেশের ভাষা স্বতই সর্বজনীনতার মর্যাদা পায়। যে-সকল সৌভাগ্যবান দেশে কোনো একমাত্র ভাষা বিনাতর্কে সর্বদেশের বাণীরূপে স্বীকৃত হয়েছে, সেখানেও নানা প্রাদেশিক উপভাষা আছে।’

কী কারণে সেই উপভাষাগুলো থেকে কোনো একটি ভাষা সমস্ত দেশের ভাষা হিশেবে প্রতিষ্ঠা পায় তার সমাজতাত্ত্বিক ব্যাখ্যা রবীন্দ্রভাষ্যে না মিললেও, তিনি যে কলকাতার চারদিকের ভাষাকে বাংলার চলতি ভাষারীতি বলে অভিহিত করতে চেয়েছেন, সে-বিষয়ে মোটামুটি নিশ্চিত হওয়া যায়।


ভাষা নিয়ে আমাদের উপমহাদেশের প্রধান আন্দোলনগুলো রবীন্দ্রপরবর্তী যুগে সংঘটিত। ফলে তার রাজনৈতিক তাৎপর্যকে জনসংস্কৃতির ভেতর থেকে চেনার কিংবা চেনানোর কাজটা রবীন্দ্রনাথ করে যেতে পারেন নি।


তার একটা সাহিত্যিক কারণ রয়েছে আঁচ করা যায়। কারণ পূর্ববঙ্গের তখন রাষ্ট্রিক জাতিগত বিকাশের সেই লক্ষণ স্পষ্ট ছিল না, ছিল না ভাষা-সাহিত্যের নাগরিক চর্চার বেগবান ধারা। তাই এই সিদ্ধান্তকে কনক্রিট বা বৈজ্ঞানিক বলার চাইতে আপাত যৌক্তিক বলাটাই শ্রেয় হতে পারে।

তবে কলকাতাকেন্দ্রিক বাংলা ভাষার স্বঘোষিত প্রতিষ্ঠানটিকে তিনি যে অনড় কিছু বলে মানছেন না সেটা বোঝা যায় তাঁরই মন্তব্যে। মেনে নিচ্ছেন পূর্ববঙ্গের ভাষাগত প্রভাবকে। বলছেন :

‘এই ভাষায় ক্রমে পূর্ববঙ্গেরও হাত পড়তে আরম্ভ হয়েছে, তার একটা প্রমাণ এই যে আমরা দক্ষিণের লোকেরা ‘সাথে’ শব্দটা কবিতায় ছাড়া সাহিত্যে বা মুখের আলাপে ব্যবহার করি নে। আমরা বলি ‘সঙ্গে’। কিন্তু দেখা যাচ্ছে, কানে যেমনি লাগুক, ‘সঙ্গে’ কথাটা ‘সাথে’র কাছে হার মেনে আসছে।’

‘কিন্তু তারপরও’ তিনি বলছেন :

‘যে দক্ষিণী বাংলা লোকমুখে এবং সাহিত্যে চলে যাচ্ছে তাকেই আমরা বাংলা ভাষা বলে গণ্য করব। এবং সাধু ভাষা তাকেই আসন ছেড়ে দিয়ে ঐতিহাসিক কবরস্থানে বিশ্রামলাভ করবে। সেই কবরস্থান তীর্থস্থান হবে, এবং অলঙ্কৃত হবে তার স্মৃতিশিলাপট।’

ততদিনে সেই সংস্কৃত-ঘেঁষা সাধু ভাষার ওপর তাঁর যে বৈরাগ্য কোন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকেছে জানতে অসুবিধা হচ্ছে না আশা করি।

কিন্তু আজ যখন সেই কলকাতা ও তার চারপাশের ভাষাবৈশিষ্ট্যের সংশ্লেষিত রূপের কথিত চলতি ভাষাটাকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করানো হচ্ছে, বা বলা হচ্ছে আঞ্চলিক ভাষার কথা, অর্থাৎ সাহিত্য নানান অঞ্চলের প্রচলিত ভাষায় নানানভাবে রচিত হবে ইত্যাদি, তখন রবীন্দ্রনাথের কী সিদ্ধান্ত বা মীমাংসা থাকত, জানার উপায় না থাকলেও অনুমান করা মনে হয় অসংগত হবে না, তিনি একটা উদার মতই পোষণ করতেন হয়তো-বা।

২.
আঞ্চলিক ভাষা বা উপভাষা প্রভৃতি ধারণা আজ রাজনৈতিক সমাজতাত্ত্বিক সূত্রগুলোর সাথে যুক্ত হয়ে ভাষা-এলাকার জটিল বিষয়াবর্তে পাক খেতে শুরু করেছে। ‘মান ভাষা’র ধারণাটিও আজ নিশ্চিত চ্যালেঞ্জের মুখে।

ভাষার বিষয়টা এখন অধিকতর রাজনৈতিক। অর্থাৎ ভাষা মানুষের অস্তিত্বের একটি চিহ্ন হিশেবে মানুষটির বা মানববর্গের টিকে থাকার, আত্মসম্মান নিয়ে বেঁচে থাকার শর্তের সাথে জড়িত হয়ে পড়েছে, যা রাবীন্দ্রিক ভাষাচিন্তায় হয়তো অনুপস্থিতই ছিল। কারণ রবীন্দ্রনাথের চর্চার ভাবনার সেই ভাষা মানুষের অন্তর্গত তৃষ্ণার সৃষ্টিশীলতার চর্চার সাথেই মূলত যুক্ত ছিল। ভাষা নিয়ে আমাদের উপমহাদেশের প্রধান আন্দোলনগুলো রবীন্দ্রপরবর্তী যুগে সংঘটিত। ফলে তার রাজনৈতিক তাৎপর্যকে জনসংস্কৃতির ভেতর থেকে চেনার কিংবা চেনানোর কাজটা রবীন্দ্রনাথ করে যেতে পারেন নি। আজ ইতি হোক নেতি হোক ভাষার সেই ধারণামণ্ডলে অনেক পরিবর্তন এসেছে। নোয়াম চমস্কি থেকে শুরু করে মিশেল ফুকো, জাঁক দেরিদা পর্যন্ত অনেক মনীষী ভাষাকে ক্ষমতাকাঠামোর সাথে আপেক্ষিক করে মিলিয়ে দেখানোর অভিনব প্রয়াস চালিয়েছেন। সারা বিশ্বে এখন ভাষার প্রশ্নটি নানান প্যারাডক্সে দ্বিধা-আন্দোলিত। বাংলা ভাষাও নিশ্চয় তার বাইরে নয়।


সাহিত্যের ভাষা উপযোগিতার ভাষা নয় বলেই আমরা শিখে এসেছি। এটা কাজের ভাষা নয়, মানে অ-কাজের ভাষা। আবার সেই অ-কাজটাই এসে একটা সময় সব কাজের নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠে।


ভাষা, বিশেষত শিল্পসাহিত্যের ভাষা আদতে বর্ণচোরা কিংবা মুখোশপরা। তা নিজেই এক আবিশ্ব প্রতীকমণ্ডল। বলার মধ্য দিয়েই যে ভাষা নিরন্তর সৃষ্টি হয়ে চলে, তার সাথে বলার আকাঙ্ক্ষাও না-বলতে পারার মধ্য দিয়ে যে স্নায়ুচাপের ভাষা অস্পষ্ট থাকে, তার একটা পার্থক্য তো আছে। সেখানেই সাহিত্যের ভিন্নতল।

সাহিত্যের ভাষা উপযোগিতার ভাষা নয় বলেই আমরা শিখে এসেছি। এটা কাজের ভাষা নয়, মানে অ-কাজের ভাষা। আবার সেই অ-কাজটাই এসে একটা সময় সব কাজের নিয়ন্ত্রক হয়ে ওঠে। দেবেশ রায় যেমন বলেছিলেন, শিল্পসাহিত্য মানবসমাজের সুপারস্ট্রাকচারের অঙ্গ, কিন্তু এক পর্যায়ে এসে তা-ই পরিণত হয়েছে বেসিক স্ট্রাকচারে। অর্থাৎ এসব এখন মানুষের অর্থনৈতিক উৎপাদনেরও হাতিয়ার বা উপাদান বা কাঁচামাল।  জীবিকা উৎপাদন-পরবর্তী অবসর-উপভোগের বিষয়মাত্র নয় এখন, খোদ জীবিকা নির্বাহেরও উপায়। তাই সাহিত্যের ভাষা কেমন হতে পারে সে-প্রশ্নের মীমাংসা সুদূরপরাহত।

৩.
ভাষাকে খুব বেশি নিরাভরণ করে বা সাধারণের বোঝার সহজতার মধ্যে টেনে বা যোগাযোগ রক্ষাকারী একটা সরল মাধ্যম হিশেবে নিয়েও শেষতক সাহিত্যের জনসম্পৃক্তি কতটুকু বাড়ানো যায়, জনতাকে সাহিত্যের প্রভাবক বা প্রভাবিত কোনো বর্গ হিশেবে কতটুকু গড়ে তোলা যায়, বা সাহিত্য কতটুকু শেষাবধি গণ-বোধগম্য হতে পারে—সে সন্দেহ থেকেই যাবে। কারণ সাহিত্য ভাষার সকল ইশারাকে নিয়ে অজস্র অযুত-নিযুত সংকেত তৈরি করে। ভাষার এই সাংকেতিকতা সাহিত্যে এমনই ভয়ঙ্কর যে, একটি থেকে আরেকটি, তার থেকে আরেকটি, তার থেকে আরেকটি… এভাবে অনির্দিষ্ট সংকেত তৈরি হতেই থাকে তার অর্থবলয়ে।

বাংলা সাহিত্যে হালে ভাষা ব্যবহারের স্বাধীনতার কিংবা গূঢ়ার্থে আঞ্চলিক জাতীয়তাবাদের যে প্রশ্নটা তোলা হয়, তা-ও এক অর্থে স্থূল। কেননা কোনো একটি অঞ্চলের ভাষায় লিখলেই তা সে-অঞ্চলের সাহিত্য হয়ে ওঠে না, কারণ ভাষা এক জিনিস, আর সাহিত্য আরেক জিনিস; ভারতীয়রা ইংরেজিতে সাহিত্য রচনা করতে শুরু করেছেন, বৃটিশ ও আমেরিকান ইংরেজি ভাষার দুই ধারাকে গলাধঃকরণ করে, তার সাথে খানিকটা ভারতীয় ভাব ঢুকিয়ে বিশ্বায়নের শিল্প-রসায়নাগারে যে নতুন ইংরেজি ভাষার জন্ম হচ্ছে, তাকে ইংরেজিওয়ালা বিদেশিরাই স্বীকৃতি দিতে শুরু করেছে যে তার পরিচয়—ভারতীয় ইংরেজি।

অর্থাৎ এক ভূখণ্ডের ভাষা অন্য ভূখণ্ডে কেবল সাহিত্য রচনার আশ্রয় বা আধারই হয়ে উঠল না, হয়ে গেল খোদ ভাষাগত বিনির্মাণের শিকারও।

তাই আঞ্চলিকতার/ নির্দিষ্ট নাগরিকতার/ পৌরতান্ত্রিকতার স্বার্থ রক্ষা করে বাংলা ভাষা শুধু নয় কোনো ভাষাই উদারশক্তিধর বা লিবারেল কিছু হতে পারে বলে বিশ্বাস হয় না। বরং, ঠাকুরের উক্তির বরাতে, এ-কথাই গুরুত্বপূর্ণ মনে হয় :

‘সম্মিলিত জাতীয় হৃদয়ের মধ্যে যখন সাহিত্য আপন উত্তপ্ত সুরক্ষিত নীড়টি বাঁধিয়া বসে, তখনই সে আপনার বংশ রক্ষা করিতে, ধারাবাহিকভাবে আপনাকে বহুদূর পর্যন্ত প্রসারিত করিয়া দিতে পারে। সেইজন্য প্রথমেই বলিয়াছি সহিতত্ত্বই সাহিত্যের প্রধান উপাদান; সে বিচ্ছিন্নকে এক করে, এবং যেখানে ঐক্য সেইখানে আপন প্রতিষ্ঠাভূমি স্থাপন করে। যেখানে একের সহিত অন্যের, কালের সহিত কালান্তরের, গ্রামের সহিত ভিন্ন গ্রামের বিচ্ছেদ, সেখানে ব্যাপক সাহিত্য জন্মাতে পারে না।’

আমাদের সাহিত্যভাবনা আর যন্ত্রণাকে এই সত্যের ভেতরই বোধ হয় খুঁজে নিতে হবে। ফোঁড়া এক জায়গায় রেখে অন্য জায়গায় গিয়ে চুলকানো মস্ত এক জৈবিক পরিহাস বটে!

শুভাশিস সিনহা

জন্ম ২৯ জানুয়ারি ১৯৭৮, মৌলভীবাজার জেলার কমলগঞ্জ উপজেলার ঘোড়ামারা গ্রামে। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। বর্তমানে মণিপুরি ললিতকলা একাডেমিতে নাট্যপ্রশিক্ষক।

প্রকাশিত বই :
ডেকেছিলাম জল (কবিতা)
অক্ষর নতুন করে চিনি (কবিতা)
বেলা দ্বিপ্রহর (কবিতা)
হওয়া না-হওয়ার গান (কবিতা)
দ্বিমনদিশা (কবিতা)
আবছায়াদের রূপকথা (গল্প)
প্রতিরূপকথা (নাটক)
কুলিমানুর ঘুম (উপন্যাস)
ইঞ্জিন (উপন্যাস)
ভাষা, কবিতা ও রবীন্দ্রনাথ (প্রবন্ধ)
রবীন্দ্রনাথ : গ্রামের ছবি (গবেষণা)
মণিপুরি সাহিত্য সংগ্রহ ২খণ্ড (অনুবাদ ও সম্পাদনা)

ই-মেইল : shuvashissinha@yahoo.com