হোম গদ্য ব্যাঙ ও খেঁকশিয়ালের বিয়ে দেয়া সেইসব বৃষ্টি

ব্যাঙ ও খেঁকশিয়ালের বিয়ে দেয়া সেইসব বৃষ্টি

ব্যাঙ ও খেঁকশিয়ালের বিয়ে দেয়া সেইসব বৃষ্টি
1.01K
0

মানুষের চিত্তের চারিদিকেও একটি বিশাল অবকাশের বায়ুমণ্ডল আছে। সেইখানেই তাহার নানারঙের খেয়াল ভাসিতেছে; সেইখানেই অনন্ত তাহার হাতে আলোকের রাখি বাঁধিতে আসে; সেইখানেই ঝড়বৃষ্টি, সেইখানেই উনপঞ্চাশ বায়ুর উন্মত্ততা।—মহর্ষি রবীন্দ্রনাথের কথাগুলো মনে বড় বাজে; এই গ্রীষ্ম তাপদাহে।

কিছুদিন হলো এসেছে নতুন বছর, কিন্তু নতুন যে বড় কঠিন, তার পথ বন্ধুর, হল্কাপ্রবণ। এই গ্রীষ্মমণ্ডল, খড়িমাটি উঠা মুখ; দৃষ্টিবিভ্রম বালিয়াড়ি—বন্ধু, বৃষ্টির দেখা মিলছে কই? থার্মোমিটারেরর পারদ উপরতলায় উঠে ভেংচি কাটছে বারবার। বলছে, বুঝেছ মজা! তপ্ত গুমোট বাতাস, ইটপাথরের সরু গলি, দালানকোঠা-অফিস-মার্কেটের ঝকঝকে কাচে সূর্যের প্রতিফলিত বর্শা ফালাফালা করছে এই দেহভাণ্ড, নগরজীবন। বৃষ্টি চাই বৃষ্টি। চৈতালী কাব্যগ্রন্থে আমার মনে অবস্থার কথা যেন বলে গেছেন কবিগুরু। রবিঠাকুর বলছেন, ‘শুনেছিনু পুরাকালে মানবীর প্রেমে/ দেবতারা স্বর্গ হতে আসিতেন নেমে।/ সেকাল গিয়েছে। আজি এই বৃষ্টিহীন/ শুষ্কনদী দগ্ধক্ষেত্র বৈশাখের দিন/ কাতরে কৃষককন্যা অনুনয়বাণী/ কহিতেছে বারম্বার—আয় বৃষ্টি হানি।/ ব্যাকুল প্রত্যাশাভরে গগনের পানে/ চাহিতেছে থেকে থেকে করুণ নয়নে।/ তবু বৃষ্টি নাহি নামে’


একবার ঘটল কী, গায়ে হলুদের সময় মাদি ব্যাঙটা হাত ফসকে দিঘির জলে


‘অনাবৃষ্টি’ শিরোনামের এই কবিতায় রবীন্দ্রনাথ টিপ্পনি কাটছেন এই বলে—‘কলিযুগে, হায়, দেবতারা বৃদ্ধ আজি’ বৃষ্টিপ্রার্থণায় সাড়া দেন না তারা। খরা যেন এক নিষ্ঠুর পরীক্ষা, কৃষকের পরীক্ষা, জেলের পরীক্ষা, মাঝির পরীক্ষা, এমনকি প্রকৃতিরও পরীক্ষা। সবাইকে প্রমাণ দিতে হয় নবউদ্যোম ও জীবনের প্রতি গভীর মমতার। এই খরায় সবাইকে ন্যায়নিষ্ঠভাবে অতিক্রম করতে হয় প্রতীক্ষা শব্দটি। সেই পরীক্ষায় পাস দিলেই, দেখা মেলে অমৃত-বর্ষার। এটাই বাংলার ঋতুবৈভব। একে ঘিরেই আমাদের জীবনাচার, লোকসংস্কৃতি। এই তো সেদিন খবরের কাগজে শিরোনাম : পাঁচ শতাধিক অতিথির আপ্যায়ন, নাচ-গান, মাইকের বাজনা আর ধুমধাম আয়োজনের মধ্য দিয়ে দিনাজপুরে ব্যাঙের বিয়ে দিচ্ছে মানুষ। তাই ঘিরে উৎসবের আমেজ। সবার বিশ্বাস, ব্যাঙের বিয়ে দিলেই অনাবৃষ্টি কেটে যাবে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গেও দেখা মেলে এমন খবরের। ওপারের খবরে বলা হয়েছে : প্রাচীন প্রবাদ মেনে একেবারে ধর্মের রীতি অনুযায়ী বৃষ্টি কামনায় দেওয়া হয়েছে একজোড়া ব্যাঙের বিয়ে। ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের দক্ষিণ দিনাজপুর জেলার তপন এলাকার বজরাপুকুর গ্রামে আজব এই ঘটনা ঘটে। একবিংশ শতকের টুইটার ফ্রিক সাংবাদিকের কাছে এই ঘটনা ‘আজব’ ঠেকলেও বঙ্গদেশে বিষয়টা বিরল না। পুরো বাংলাদেশেই গ্রামাঞ্চলে এই রীতি এখনও বহাল তবিয়তে আছে। পাঠক কষ্ট করে একটু লক্ষ করুন—ব্যাঙের বিয়ের যে দুটো ঘটনার কথা আগে জানালাম, সে দুটোই ঘটেছে দিনাজপুরে। একটি বাংলাদেশ অংশে, অন্যটি ভারতের। জন্মগতভাবে এই অঞ্চলের অধিবাসীরা এখানকার রীতি নীতি আর ‘খামখেয়ালি’ প্রকৃতির সুর ভালো করেই চেনেন। ‘খামখেয়ালি’ বলার কারণ, এখানে গরমের সময় যে ঠাটাপড়া রোদ, আবার হুলফোটানো কনকনে ঠান্ডা পড়ে শীত মৌসুমে। এই আপাত চরমভাবাপন্ন এলাকাটিতে আবার সবুজের হাতছানি। বিঘার পর বিঘা ফসলের ক্ষেত। শীতে ফসল কাটার পর চৈত্র বৈশাখে মাটি ফেটে চৌচির। এমন সময় প্রায় ৩ কিলোমিটার হেঁটে স্কুল যাওয়া! এখনকার বাচ্চাকাচ্চারা সেই পরিস্থিতি কল্পনাও করতে পারবে না।  ভাবুন তো, দিনের পর দিন বৃষ্টির দেখা নাই, ধু-ধু মাঠ, ছোটখাটো পুকুর-বিলে পানি নাই, গভীর কুয়ার জলও নেমে গেছে তলানিতে, বীজতলা পুড়ে যাচ্ছে, হাল-জুড়া যাচ্ছে না বৃষ্টির অভাবে। তখন আকাশের দিকে চাতকপাখির মতো তাকিয়ে ছাড়া কি গতি? তখন পাড়ার মসজিদে জুম্মাবারে বৃষ্টির জন্য বিশেষ প্রার্থনা। আর ব্যাঙের বিয়ে। যাকে বলে একদম শাস্ত্রমতে বিয়ে। রং মেখে নেচে-গেয়ে আনন্দ-ফুর্তিতে মেতে উঠেছে পুরো পাড়া। চালন-কুলায় রাখা হয় পান, সুপারি, দূর্বাঘাস, মিষ্টি, মাটির গুঁড়াসহ বিয়ের উপকরণ। তার আগে হলুদ-চন্দন দিয়ে প্রাক-শৃঙ্গার; কোনোকিছুই বাদ থাকে না। একবার ঘটল কী, গায়ে হলুদের সময় মাদি ব্যাঙটা হাত ফসকে দিঘির জলে! তাকে ধরতে সে কি কসরত; কেউ বলে—ঘুঘরি পোকার টোপ দাও; কেউ বলে—বর পছন্দ হয় নাই; কেউ বলে—ও রহিমা তোর মেয়ে তো পালায়া গেল! শেষমেষ অনেক কসরত করে ধরে আনা হলো পালিয়ে যাওয়া কণেকে। ছোটছোট ছেলেমেয়ে, সাথে বয়স্করা গাইল বিয়ের গীত:

‘ব্যাঙের বিয়া দেও সখা-সখি, ব্যাঙের বিয়া দেও
কলিজা পুড়ি কাঠ; ঠ্যাং ধর আজামশাই বিষ্টি নামাও।

এই হাসিখুশির মাঝেও শরীর-মনের দহন সুর হয়ে ঝরে। গীতে ফুটে ওঠে সেই বৃষ্টিহীনতার গল্প।

পুকুরেতে পানি নাই
পানা কেন ভাসে
যার সাথে কথা নাই
সে মুচকি হাসে

এখন, ডিপ-টিউবওয়েল, শ্যালো মেশিন কতো কী। কিন্তু সেই সুযোগ-সামর্থ্য কতভাগ মানুষের? পানির অভাব না হয় মিটল, কিন্তু রৌদ্রদিনে মনের-দেহের দহন কি বর্ষা ছাড়া মেটে। তাই প্রার্থনা একটাই : আল্লাহ মেঘ দে পানি দে, ছায়া দে, পানি দে, বৃষ্টি দে রে তুই আল্লাহ মেঘ দে।


এই দূর নগরে তোমাকে কামনা করে ভেতরের সবুজ


এই গ্রীষ্মের খরতাপে শুকিয়ে যাওয়া অশ্রু কিংবা স্মৃতিবাষ্পের মতো কত কিছুই না হানা দেয়। মুকুল থেকে কুঁড়ি, তারপর গোটা; ধীরে ধীরে বড় হচ্ছে আম্রপালির থোকা; সবুজ ভুলে কালচে সরেস হয়ে উঠছে জাম। ছেলেবেলায় এই মৌসুমে দাদিবাড়ি, নানাবাড়ি, মামাবাড়ি বেড়াতে যাওয়ার যে চল, কোথায় গেল সেসব দিন? এখনও গ্রীষ্মকালীন ছুটি থাকলে সেইসময়ে ঠুসে দেয়া থাকে নানারকম পরীক্ষা। শহরের কারারুদ্ধ শিশুগুলো যে একটু সুস্থির মতো সবুজ-সান্নিধ্যে ঘুরতে যাবে—তার সুযোগ কোথায়? অনেকের আবার গ্রামের সাথে কোনো সম্পর্কই নাই এখন, রুজিরুটির উদ্বাস্তু জেনারেশন এটি। এখন সম্বল পাঠ্যবই আর পল্লীকবি জসিমউদ্‌দীন। ঝড়ের দিনে মামার দেশে যাওয়া কিংবা পাকা জামের শাখায় উঠে মুখ-দাঁত-জিহ্বা রঙিন করার সুযোগ কোথায়? গাছের কাদিভরা খেজুরের কথা এখন শেয়ালের গল্পের আঙুরফলের মতোই টক।

টকের কথা যখন এসে গেল, তখন ঝড়ের দিনে ঝরে পড়া কাঁচা আমের সরিষা-বাটা মাখানির কথা না বলে থাকা কী যায়! আর ছোট অপরিণত কাঠালের তরকারি। ভালো পারতেন নয়া নানি, বানাতেন জব্বর। ছোট কাঁচা কাঠাল পেড়ে মাংসের মতো ডুমো-ডুমো করে কেটে, মাংসের রেসিপিতে কড়া ঝাল-নুনের তরকারি। শক্ত কাঁঠালের কোয়া রান্নার পর মোমের মতো নরম হয়ে যায়, আর সে কী তার স্বাদ! এই একই রেসিপিতে হতো কলার মচা’র তরকারি, সাথে খাসির মগজ। গরমের দিনে খাটা বা চুক্ষা খাওয়ার চলটাই এখন তেমন দেখি না। এই যে টক খাওয়ার রীতি এটা তো সাইন্টিফিক ব্যাপার। গরমে ঘাম হবে, পানি বের হবে শরীর থেকে, ধুলোবালিতে রোগ বালাই হবে; সেই অবস্থা থেকে বাঁচাবে খাটা-টক; মানে ভিটামিন সি।

এখন, কতকিছুই বদলে গেছে। বর্ষায় বৃষ্টি নাই, শীতে শীত নাই, বৃষ্টিতে দেমাক নাই। বাসা থেকে বৃষ্টি মাথায় বেরিয়ে অফিস পৌঁছানোর আগেই বরুণের রোয়াবি শেষ। আবার এমনও দেখি, রাস্তার একদিকে বৃষ্টি হচ্ছে অন্যদিকে একেবারে শুকনো। ছেলেবেলায় এমন দিনে ছড়া কাটতাম দল বেধে, রোইদ উঠিছে বিষ্টিও হছে/ খেঁকশিয়ালের বিয়াও লাগিছে। এখনও আমার মনে হয়, রোদের মধ্যে বৃষ্টি হলে খেঁকশিয়ালের বিয়ে হচ্ছে। এটা একটা ভিন্ন জগৎ; ভিন্ন মানসিক স্থিতি। মনে হয়, ভরা গ্রীষ্মে মেঘের আনাগোনার দিনে কাগজিদের পুকুরে নামার মতো। হঠাৎ বৃষ্টি, কেঁপে উঠছে পুকুরের জলপৃষ্ঠ। পানির ওপর বৃষ্টিপতনের ছন্দ; গভীরে ডুব দিলে রেলগাড়ির বগির মতো ঝুমঝুম শব্দ শোনা যায়। রেললাইন ভিজে যায়, মেঘের গর্জনে কেঁপে ওঠে শৈশবের লাগোয়া বিরল স্টেশন, হঠাৎ বাতাস, কালবৈশাখী, দুরুদুরু প্রাণ সঞ্চার হয় জীবনে; প্রকৃতিতে। তাই এই দূর নগরে তোমাকে কামনা করে ভেতরের সবুজ, বাহির-অন্দর—হে বৃষ্টি!

মাজুল হাসান
মাজুল হাসান

মাজুল হাসান

কবি ও গল্পকার
জন্ম : ২৯ জুলাই ১৯৮০, দিনাজপুর।
পড়াশুনা করেছেন দিনাজপুর জিলা স্কুল, নটরডেম কলেজ
ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অর্নাস।।

প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ:
বাতাসের বাইনোকুলার ● বাঙলায়ন প্রকাশনী, ২০১০।
মালিনী মধুমক্ষিকাগণ ● বাঙলায়ন প্রকাশনী, ২০১৪।
ইরাশা ভাষার জলমুক ● চৈতন্য, ২০১৬।

প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ:
টিয়ামন্ত্র ● ভাষাচিত্র প্রকাশনী, ২০০৯।
নাগর ও নাগলিঙ্গম ● বাঙলায়ন প্রকাশনী, ২০১২।

অনুবাদগ্রন্থ:
টানাগদ্যের গডফাদার, রাসেল এডসনের কবিতা ● চৈতন্য, ২০১৬।

মাজুল হাসান পেশায় সাংবাদিক। বর্তমানে একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলে বার্তা বিভাগে কর্মরত।
মাজুল হাসান
মাজুল হাসান