হোম গদ্য ব্যক্তিকে মুছিয়া জাগিয়া উঠা এক ধারণার গৌরব

ব্যক্তিকে মুছিয়া জাগিয়া উঠা এক ধারণার গৌরব

ব্যক্তিকে মুছিয়া জাগিয়া উঠা এক ধারণার গৌরব
993
0

আপন ভাষাচৌহদ্দির বাহিরে জন্মানো একটি শিশুকে হামেশা যে-পরিবেশের মোকাবিলা করিতে করিতে সাবালক হইতে হয়, তাহাতে ভাষার প্রশ্নে আপোস না করিয়া সে থাকিতে পারে না। কারণ, গরজ বড় বালাই। ইহার পরেও যদি কোনও দলছুট বিস্ময়বালক বা বালিকা আপন ভাষাটিকে মর্মে লালন করিতে চায়, প্রতিকূল বাতাসের বিরুদ্ধে নৃত্যরত সেই মায়াবী মোমশিখাটিকে বহুদূর দিগন্ত পার করিয়া বহন করিয়া লইয়া যাইতে চায়, তাহার দীর্ঘ ও জটিল সংগ্রাম এক অভাবিত সঞ্চারপথের জন্ম দেয়। নানান বিচিত্র ও বিসদৃশ অভিজ্ঞতা, নানান দুর্জ্ঞেয় আত্ম-আবিষ্কার, পলে পলে যে-ভাষ্য রচনা করে, তাহা দুনিয়ার সকল ভাষাশিক্ষার্থীর কাছেই কিছু না কিছু বার্তা পাঠায়।

কোনও কোনও কবির ভবিতব্যও বুঝি এইরকম। কবিজীবনের জন্মকাল যাহাদের অনুকূল নয়। যাহাদের উন্মেষপর্বের উপর বিপরীতমনস্ক এক সমসময় সর্বাগ্রাসী ছায়া ফেলিয়া তাহাদের স্বভাবধর্মকে কেবলই প্রতিহত করিবার চেষ্টা লয়। কবিও নাছোড় সাঁতারুর মতো, কখনও মাথার উপর দিয়া ঢেউকে চলিয়া যাইতে দিয়া, কখনও কিছু নাকানি চুবানি খাইয়া, কখনও অসম সাহসিক উলটা সাঁতারে, এক দীর্ঘ জলযাপনের ভিতর দিয়া, আপন তটভূমিতে আসিয়া পৌঁছান। বিস্ময়ে আমাদের মাথা নত হইতে কিছু দেরি হয় মাত্র। কিন্তু কবির মহিমা তাহাতে বিন্দুমাত্র খাটো হয় না। আমাদের সৌভাগ্য এই যে, আমাদের জীবৎকালে, এমনই একজন কবির দৃষ্টান্ত আমরা প্রায় চোখের সমুখেই দেখিলাম, যিনি এক শান্ত অঙ্গীকারে দীর্ঘ কবিতাজীবনের ধারাবাহিক প্রবর্তনায় সময়ের বিপ্রতীপ স্রোতকে হেলায় হারাইলেন। তিনি, আমাদের সবার প্রিয় ও শ্রদ্ধেয় অগ্রজ, কবি কালীকৃষ্ণ গুহ।


কালীকৃষ্ণের প্রারম্ভিক লিখন কিছু ঘোর রাবীন্দ্রিক ছিল।


কেজো ইংরেজিতে ‘অড ম্যান আউট’ বলিয়া যে একটি লব্জ আছে, বিগত শতকের ৬০দশকের মাঝামাঝি হইতে ৭০দশকের প্রথম ২/১ বছরের মান্য কাব্যভাষার প্রেক্ষিতে কালীকৃষ্ণের সেকালীন শান্ত ও দূরান্বয়ী উক্তিগুলি নিঃসন্দেহে তাহাকে সেই বিসদৃশ জন হিশাবে দাগিয়াছে, যাহাতে তিনি মহাজনি ফর্দ হইতে নিষ্ক্রান্ত হন। তদুপরি, আলোকিত কবিনায়কদের দ্বারা পাপোশে গড়াগড়ি খাওয়া রবীন্দ্রনাথের প্রতিধ্বনি তখনও তাহার কণ্ঠে ইতস্তত বিচ্ছুরিত। ইহা হইতে বড় পাপ আর কিছু হইতে পারে না—

১. দারুণ ঝড়ের মধ্যে তোমার সঙ্গে দেখা
২. এ পথ দিয়ে পথিক যাবেন
৩. অন্ধ তিমিরের মধ্যে একটি প্রার্থনা যেন কেঁপে ওঠে
৪. এবার আমার কলুষ ধুইয়ে দাও
৫. আমারও রয়েছে অসীম যাত্রার পথ, রৌদ্র, আদিগন্ত ম্লান আলো

প্রিয় পাঠিকা প্রিয় পাঠক, আশা করি এমন আন্দাজ করিতেছেন না যে, এই সামান্য কয়টি কবিতাংশ দিয়া আমরা ফয়সালা করিতে চাহিতেছি, কালীকৃষ্ণের প্রারম্ভিক লিখন কিছু ঘোর রাবীন্দ্রিক ছিল। বরং, বলিতে কি, সময়োচিত (বয়সোচিত নয়) ‘দীর্ঘ ঘুম, তিমির-প্রোথিত ঘুম, মৃত্যু’ তাহাকে হাতছানি দিয়াছে। সেই অন্ধকারেরই সম্প্রসারণে তিনি আরও টের পাইয়াছেন—‘রুক্ষ ঝাউবনে হাওয়া লাগে, ব্যক্তির অন্ধকার মেশে রৌদ্রে অথবা শীতে, শতাব্দীর দীর্ণ অন্ধকারে’। পঙ্‌ক্তিগুলি, ১৯৭২ সালে প্রকাশিত কবির নির্বাসন নাম ডাকনাম  কবিতা বহি হইতে সংগৃহীত। দেখিতে পাই, এই অন্ধকার এই অন্ধতা এই রাত্রি এই স্তব্ধতা এই মৃত্যুবোধ, কবিকে প্রায় আরও ২দশক ধরিয়া আচ্ছন্ন করিয়া রাখিয়াছে—

১. এই মধ্যরাত্রে আমি মানবিকভাবে এই মাথা রাখি নীল বিছানায়। পাশে জল, মৃত্যুবোধ, ঘড়ি…
                                        —গীতিকবিতার পাশে/ একবছরের সামান্য কবিতা, প্র. ১৯৮১

২. স্মৃতিফলকের পাশে যে স্তব্ধতা রয়েছে, যে স্থবিরতা, যে/ অবলুপ্ত সময়/ তার কাছে যেতে হবে আমাকে।
                                                —গ্রীষ্মের দুপুর/হস্টেল থেকে লেখা কবিতা, প্র. ১৯৮৪

৩. ব্যক্তির অন্ধকার এসে বারবার ছুঁয়ে দেয় এই মাটি, ঘাস।
                                                                                       —দৈত্যের পোশাক/হে নিদ্রাহীন, প্র. ১৯৮৮

৪. এ জীবন নক্ষত্রের/ অতি স্থির পথে যেতে গিয়ে কালো হয়ে/ ফেরে;
                                                    —অসুখ/ পিতামহ, খোয়াইয়ে এসেছি, প্র. ১৯৯০

৫. তিমির রচিত হয় বিশুদ্ধ ব্যক্তির;/ প্রেত-তাড়িতের মতো সে জাগে ধোঁয়ার মধ্যে অবশেষে, একা
                                                                তোমার প্রবাহ, চৈত্রমাস, প্র. ১৯৯১

৬. প্রতিটি যাওয়ার আছে অবসাদ, ঘুম, বিচ্ছিন্নতা
                                                            —পলাশ/অন্ধত্বের প্রশ্নে জড়িত, প্র. ১৯৯১

বস্তুত এইসব কবিতা যখন রচিত হইতেছিল, তাহার খানিক পূর্বেই, বু.ব. কর্তৃক প্রচারিত আধুনিকতা বাংলায় ভালো মতো পত্তনি পাইয়া গিয়াছে। তাহারই ঘটকতায় কেবলই আছড়াইয়া পড়িয়াছে পশ্চিমি মসিহাদের একের পর এক নাম। সেই লহর হইতে খাদ্যপ্রাণ সংগ্রহ ছাড়া তরুণ কবির উপায় কী? কিন্তু অন্তর্গঠনের বিভ্রাটের ফলে, যাহাকে আমাদের অনেক দোস্ত কহিবেন গ্রহের ফের, কালীকৃষ্ণের ওইসব মহাপ্রাণ খাদ্য ধর্মে সহিতে ছিল না। গলায় কাঁটা কেবলই খচখচ করিতে ছিল। সেইসব মহান ‘দ্রষ্টা’দের ঘৃণা ও ক্লিন্নতার জগৎ কেবলই হাতছানি দেয়। আর, হৃদয় তবু চায় সেই স্বতপ্রভ নরকের উদ্ভাসগুলি পার হইয়া যাইতে—

১. শুধু মাঝে মাঝে চোখের সামনে ভেসে ওঠে বোদলেয়রের মুখ,/ র‍্যাঁবোর মুখ, আর তাদের নরক।
                                                    —গ্রীষ্মের দুপুর, হস্টেল থেকে লেখা কবিতা, প্র. ১৯৮৪

২. ঘৃণার ভিতর থেকে তুমি কথা বলেছিলে, আর স্মৃতিফলকের জন্য/ লিখে রেখেছিলে ছোট একটি কবিতা।/ তারপর, দীর্ঘদিন পর, এক গ্রীষ্মের দুপুরে তুমি দেখতে পেয়েছ/ তোমার কবিতা/ ঘৃণা আর মৃতদেহ অতিক্রম করে চলে আসতে চায়…—ঐ/

এমনকি, যে-রাত্রি-অন্ধতা-মৃত্যুর বোধ কবিকে দীর্ঘদিন আচ্ছন্ন করিয়া থাকে, তাহাও যেন ভিতরে ভিতরে এক অস্বস্তির কারণ হইয়া বহিয়া চলে। কোথাও যেন মৃদুতম অপরাধী করিয়া তুলে—

রাত্রির বিষয়ে আমি কবিতা লিখেছি, তাই ক্ষমা
অন্ধতা বিষয়ে আমি কবিতা লিখেছি, তাই ক্ষমা
মৃত্যুর বিষয়ে আমি কবিতা লিখেছি, তাই ক্ষমা
কিন্তু কার কাছে ক্ষমা চাইব? কিভাবে চাইব?
                                                        —আকাশে তাকিয়ে/ একবছরের সামান্য কবিতা

আধুনিকতা লইয়া এই উচাটনের কথা, চাপের কথা, কবি নিজেই খুব নির্মোহ ভঙ্গিতে উল্লেখ করিয়াছেন তাহার শ্রেষ্ঠ কবিতা-র ভূমিকায়—

গোপন একটা ভয় নিয়ে আমাদের কবিতা লেখা শুরু হয়েছিল চার দশক আগে। কবিতা যথেষ্ট ‘আধুনিক’ হচ্ছে কিনা এই প্রশ্ন থেকে—সময়ের এক শাস্ত্রপাঠ থেকে—ভয়। (২২ জুন ২০০৩)

২.
দুনিয়াকে দেখিবার তরিকা যাহাই হউক, মতবাদ নির্বিশেষে কবিতানাগরিকরা একথা প্রায় মান্য করেন যে, কবিতায় লিপ্ত থাকিবার কালে সেই সৃজনক্রিয়া স্বয়ং, কবিকে আখের ইস্তক চালাইয়া লইয়া যায়, কবিতাটির রাহাখরচের বিলকুল বন্দোবস্ত করে। তাই বলিয়া কবির বোধবুদ্ধি যে ইস্তফা দিয়া বসিয়া থাকে, তাহা নয়। তাহা এক প্রচ্ছন্ন আত্মসমালোচক ও বিশ্লেষক বন্ধুর অনপনেয় ছায়ার মতো নিঃশব্দে তাহার পিছনে পড়িয়া থাকে। কখনও কখনও কবির সঞ্চারপথটিকে আলতো মোচড়ে নিয়ন্ত্রিত করিবার প্রয়াস লয়। বহু প্রতিভাবান কবিই অবশ্য এই ইশারাটিকে আমলে লইলেও সেকথা চাপিয়া যান। তাহারা কবিতা ও স্জ্ঞাকে আলাদা কামরায় পুরিয়া রাখেন। ভাবেন, সব কথা সবখানে ফাঁস করিতে নাই। এইদিক দিয়া কালীকৃষ্ণ সরলতার উপর ভরসা রাখেন। কবিতা লইয়া তাহার সংকট ও উপলব্ধিগুলি তিনি কবিতা হইতে গুম করেন না। তাই, স্বজ্ঞার উস্কানিগুলি, পরামর্শগুলি, ধীর ও মন্থর গতিতে কিভাবে তাহার উপর ক্রিয়াশীল থাকিয়াছে, আমরা পাঠকরাও তাহা জানিতে পারি।  জানিতে পারি, ‘সময়ের… শাস্ত্রপাঠ’ হইতে নিষ্ক্রান্ত হইবার আকুতিগুলি কিভাবে তাহাকে শৈল্পিক উত্তরণের পথে লইয়া গিয়াছে। যেমন, আমরা সহজেই দেখিতে পাই, শুরুতে শুরুতেই কালীকৃষ্ণ একবার অনুভব করিয়াছিলেনদীর্ঘকবিতা আমার হাতে বারবার ভাঙা-ছন্দে লিরিক হয়ে ফিরে আসে (একটি লিরিক/ নির্বাসন নাম ডাকনাম)। যেমন দেখিতে পাই, হস্টেল থেকে লেখা কবিতা-র কালে তিনি খোঁজখবর চালাইতেছেন—১. কিভাবে আরও সহজ হয়ে আসবে কবিতা, ২. কার্তিকের মাঠ, কবিতা কি বস্তুনিষ্ঠ হবে, ৩. ভাষা আনোস্তব্ধতার ভাষা। যেমন দেখিতে পাই, কবিতাজীবনের প্রায় আড়াই দশক অতিক্রান্ত হওয়ার পর পিতামহ, খোয়াইয়ে এসেছি গ্রন্থে আসিয়া বিধিবদ্ধ মিশ্রবৃত্তে তিনি বেশ কিছু অমিল চতুর্দশপদী লিখিয়া ফেলিলেন। এমন এক সংগীতকে স্পর্শ করিতে চাহিলেন, যাহা ‘বাজে মর্মান্তিক, যেন এক/ বেদনার স্বর ধ্বংস করে দেবে সব/ নাগরিক কল্পনার ভান’ (অস্তিবাদী/ )। দেখিতে পাই, হয়তো বা সেই ‘নাগরিক কল্পনার ভান’ হইতে গ্রেফতারি এড়াইবার মানসে কবির উপর নাজেল হইতেছে এমন মোক্ষম এক আত্ম-প্রত্যাদেশ—

সমস্ত ক্লান্তি এবং অনুশাসনের গল্প বলা শেষ হয়েছে। একটা পর্ব শেষ। এরপর দ্বিতীয় পর্ব। চলো, হাঁটি। মাথার উপরে নক্ষত্রলোক—ভাষাও অন্ধকার হয়ে এল…                                        —ঝাউগাছ/


কবির কাজ উন্মাদ-না-হবার সঙ্কল্প ধরে রাখা।


সেই পর্বান্তরের উদ্‌যাপনে অতঃপর ‘ভাঙা-ছন্দে লিরিক’-এর বদলে আমরা একটি মিশ্রবৃত্ত-আশ্রয়ী দীর্ঘকবিতা পাইলাম। সেই অত্যাশ্চর্য রচনাটির নামতোমার প্রবাহ, চৈত্রমাস। অত্যাশ্চর্য এই জন্য যে, এ যাবৎ স্কেচবহির পাতায় কালি ও কলমে ছবি আঁকিয়া চলা শিল্পীটি সহসা যেন কোন জাদুমন্ত্রবলে দিগন্তের বুকে এক বিপুল দেওয়ালচিত্র আঁকিয়া ফেলিলেন। আমাদের ক্ষুদ্রজ্ঞান-স্মৃতি-অনুভূতি মোতাবেক, বাংলাভাষার একটি অন্যতম অবশ্যপাঠ্য কবিতা এইটি। ইতিহাস, পুরাণ, সমাজবাস্তবতা, প্রণয়, যৌনতা ঘিরিয়া ঘনাইয়া উঠা আত্মপ্রশ্নরাশির তরঙ্গমালা এক ধ্রুপদী সাংগীতিক বিন্যাসের মতো ইহার স্তবকে স্তবকে বিচ্ছুরিত। জাদুমন্ত্র যদি কিছু থাকে, তাহা স্ফুরিত হইয়াছিল তাহার নিজেরই আত্মপরিক্রমার অভিজ্ঞায়। একদা আশঙ্কা ছিলতবু ভয় হয়, একদিন প্রকৃত উন্মাদ হয়ে যাব (ভয় ১/ হে নিদ্রাহীন)। আজ শোনা যায় সেই প্রকৃত উন্মাদনাকে স্পর্শ করিয়া তাহাকে অতিক্রম করিবার প্রশান্ত হলফহয়তো কবির কাজ উন্মাদ-না-হবার সঙ্কল্প ধরে রাখা। ব্যক্তির যে-তিমির ইতঃপূর্বে বারংবার রচিত হইয়াছে, আজ সেই ‘ব্যক্তির তিমির তার ভাষা খুঁজে পায় অতঃপর’। কিন্তু সেই ‘ভাষাও কখন যেন অন্ধকার হয়ে আসে’। আর, সেই মহতী তমসার ভিতর দিয়া অবশেষে এমনই এক নৈর্ব্যক্তিক অনুভব বাজিয়া ওঠে—

ব্যক্তি মুছে গিয়ে ধারণার জন্ম হোক আজ
সব মোহ থেকে মিথ্যা থেকে উন্মাদনা থেকে সত্য জন্ম নিক
সে’সত্য যা কাকের ডাকের মতো—স্থির, রিক্ত, সংগীত-বর্জিত

ব্যক্তি অবশ্য সহসা মুছিয়া যায় না। তবে নানাবিধ ধারণার জন্ম হইতে থাকে। যেমন—এই গ্রহ মহাজগতের মধ্যে একা নয়। বা—প্রত্যেকটি রাস্তাই অন্ধত্বের প্রশ্নে জড়িত। বা—জামপাতা ছুঁয়ে দেখি পরিচয়হীন এক পৃথিবীর দিকে তার যাওয়া। বা—এই মরুভূমির শহরে তুমি এক বজ্রাহত পঙ্গু আগন্তুক।অন্ধত্বের প্রশ্নে জড়িত কবিতাবহির (প্র. ১৯৯১) এই সকল দার্শনিক উক্তির পরেও, তথাপি ব্যক্তিগতের প্রতি কিছু মায়া রহিয়া যায়—

পথের গল্প শেষ হয়েছে, এখন অন্য কিছু বলো। অন্য গল্প। যে বাঁশির কথা বলেছিলে একদিন তা এখনও বেজে চলেছে কি? আজ তবে রেস্তরাঁর কথা বলো। শূন্যের দিকে স্থাপিত সেই রেস্তরাঁর কথা, যার সবটা শোনা হয় নি এখনও।
                                                            —অন্য গল্প / খণ্ডিত সেই সূর্যোদয়, প্র. ১৯৯৪

ব্যক্তি এখানে বিস্তারিত হয় কাহিনির সূত্রে। উপরের ‘অন্য গল্প’ কবিতাংশটিতে যে-বাঁশির কথা আছে, তাহার সূত্র রহিয়া গিয়াছে অন্ধত্বের প্রশ্নে জড়িত-র ‘বাঁশি’ কবিতায়। আবার রেস্তরাঁর আদিকথাটি শুনিতে গেলে, ফিরিয়া যাইতে হইবে ওই বহিরই ‘সময়-প্রবাহ’ কবিতায়। বুঝা যায়, ‘বাসনা পুড়ে ছাই হয়ে যায়’ বলিয়া ঘোষণা দিলেও, পুরানো জীবনমুহূর্তগুলি তখনও কবিকে হাতছানি দিয়া চলিতেছে। জীবনের প্রতিটি অনুপুঙ্খের ভিতর দিয়া যে-কবি কবিতাকে গড়িয়া তুলিতে চাহিয়াছেন, তাহার পক্ষে যেকোনও মায়ার বিস্তারই বুঝি অনন্ত সম্ভাবনাময়। তবে, পাঠকের দিক হইতে এইভাবে আত্মচরিতের ভিতর কবির তালাশ করিলে যে বিলকুল হতাশ হইতে হইবে, এই মতো ফতোয়া দিয়া গিয়াছেন স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ। কবিতা হারগিজ সময়ের ভিজা ত্বকের উপর জীবনের মৃৎশকটের চাকার দাগ মাত্র নয়। তবু, কোনও না কোনও ভাবে তাহা কবির আত্মজীবনেরই এক বিস্তারও বটে। বিশেষত, কালীকৃষ্ণ গুহর মতো একজন আড়ালহীনতায় বিশ্বাসী কবির ক্ষেত্রে, জীবন আর কবিতা যেখানে ওতপ্রোত। কিন্তু সমস্যা জীবন লইয়া নয়, তাহার বর্ণনার তরিকা লইয়া। সে কি সারমর্মে সংকলিত হইবে, না কি অনুপুঙ্খে উৎকলিত হইবে। আরও খোলাসা করিয়া বলিলে, সে কি হইয়া উঠিবে নিবেদন, নাকি প্রতিবেদন।

শেষ পর্যন্ত কালীকৃষ্ণ গুহ একজন আপামাথা নিবেদনের কবি। তবু দেখা যায়, হে নিদ্রাহীন-এর আমল হইতে, এক ধরনের প্রতিবেদন-প্রবণতাও তাহার কিছু কবিতায় প্রশ্রয় পাইয়াছে। সেখানে তিনি, যেন-বা খবর সরবরাহকারির নির্লিপ্ততায়, বহমান জীবন হইতে আমাদের উদ্দেশে কিছু তথ্য পেশ করিতেছেন। হয়তো নিতান্ত আটপৌরে ১টি/ ২টি ঘটনা। তাহার পর সেই অকিঞ্চিৎকরতাকে বেকোশেশ সম্পর্কিত করিয়া তুলিতে চাহিতেছেন এক রহস্যময়তার পরিসরে—

১. রুদ্রপলাশ থেকে পূর্বপল্লী গেস্ট হাউস।/ শ্রাবণ-দুপুর।/ দেবদারু-পথ জুড়ে বৃষ্টি হয়ে গেছে।/ ‘রিকশাচালক আপনি বলে দিন কোনটা ছাতিমগাছ—/ আমাদের জানা বাকি আছে কোনটা শিরীষ কুর্চি মহাশ্বেতা প্রকৃত চন্দন।’/ সাইকেল-রিকশার পথ বারবার বেঁকে যায় খোয়াইয়ের স্তব্ধতার দিকে।
                                                                    —শান্তিনিকেতন ১৯৮৫/হে নিদ্রাহীন

২. মেদিনীপুর থেকে বাঁকুড়া যাওয়ার পথে আমরা দেখেছি শালবন, আমরা শুনেছি আকস্মিক চিৎকার। এই পরিচয় নিয়ে কালপুরুষের দিকে তাকাই।/ অকালবৃষ্টির এই রাত…
                                                                        প্রসঙ্গ/ খণ্ডিত সেই সূর্যোদয়

দৈনন্দিনের এহেন জর্নাল হইতে সময় পরিসরহীন একটি অবস্থানকে স্পর্শের তাগিদে, এই ধরনের কবিতায়, অন্তে পঁহুছিয়া অনিবার্য এক উলম্ফনের এন্তেজাম করিতে হয়। কাজেই বর্ণনার এই ঢঙটি হামেশাই শেষ হয় কিছু নাটকীয়তা দিয়া। ফলত কিছু কবিতা আবার প্রতিবেদনের নৈর্ব্যক্তিকতা হইতে এক ধরনের গল্পের আমেজের দিকে ঢলিয়া পড়ে—

অনেকদিন পর সে এল।
তখন বেলা পড়ে এসেছে।
দরজা খুলে তাকে বসতে দিলাম।
সে কথা বলতে লাগল।

কথা বলতে বলতে সে সারাক্ষণ তাকিয়ে রইল আমার দিকে
কথা শুনতে শুনতে আমিও তার দিকে তাকিয়ে রইলাম।

একসময় দেখলাম
স্বামীর কথা ছেলেমেয়েদের কথা গানের কথা বলতে বলতে
সে তার ডানাদুটো মেলে দিয়েছে…
                                                                                             —ডানা/ অপার যে বিস্মরণ, প্র. ২০০৬

কবিতার মতো করিয়া গল্প বলার এই রীতিটি নিশ্চয়ই তরুণতর কবিদের ভিতর বেশ কিছুটা গ্রহণযোগ্য হইয়া উঠিয়াছিল। কারণ, সে বেশিদিন আগের কথা না, প. বাংলার কবিতাকাগজ খুলিলেই চমকপ্রদ সব গল্প পড়িবার ফুরসত মিলিত। পাঠক হিশাবে আমরা, কবি কালীকৃষ্ণ গুহকেই, এই ধরনের গাল্পিক কবিতার প্রবর্তক বলিয়া মনে করি। এইসব কবিতা রবীন্দ্রনাথের কাহিনিকাব্য হইতে দৃশ্যতই আলাহিদা। আবার সদ্য-আবিষ্কৃত নারায়ণ মুখোপাধ্যায়ের কবিতার মতো রূপকাহিনির যৌথ অবচেতনের পটভূমিও ইহাদের নাই। ইহারা নাগরিক ও প্রায়শই আধুনিক মনের উৎসার। এই কথা কবুল না-করিলে অন্যায় হইবে যে, এইসব প্রতিবেদনপ্রধান বা গল্পবৎ কবিতাগুলির স্বাদুতা হয়তো আমরা কমবেশি উপভোগ করিয়াছি, কিন্তু যে-শৃঙ্গলীলায় কালীকৃষ্ণের মাহাত্ম্য সুপ্রতিষ্ঠিত, সেই উচ্চতা বরাবর ইহাদের কিছুটা হইলেও অপ্রস্তুত বলিয়া ঠাহর হয়।


ছন্দ বুঝি-বা কবিতাশরীরে নামাবলি বা আলখাল্লার মতো।


তাহার শেষতম বহিগুলিতেও এই কিসিমের কবিতা ১টি/ ২টিও হাজির থাকায় বুঝা যায়, এহেন প্রতিবেদকতার প্রতি আসলেই কবির এক ধরনের নাছোড় টান রহিয়া গিয়াছে। আবার একই সাথে ঘটনার এই উদ্বর্তন তাহাকে পেরেশানও করিয়াছে। অব্যবহিতের এই প্রপঞ্চের ঊর্ধ্বেই যে তাহার প্রকৃত গন্তব্য, ঢের আগেই তাহা তিনি টের পাইয়াছিলেন। তাই বুঝি বিগত শতকের শেষ প্রান্তে পঁহুছিয়া কবির কানে আরও এক আসমানি আত্মপরামর্শ ভাসিয়া আসিয়াছিল—

ঘটনাবলির মধ্যে ঢুকে গিয়ে বহুদিন ক্লান্ত হয়ে আছি
ঘটনাবলির ঊর্ধ্বে যেখানে পিপাসা জন্ম নেয়

সেখানে—সরল ভাষা—চলে যেতে হবে একদিন, এই জানি…
                                                                     —ঘটনাবলির ঊর্ধ্বে/ ক্লান্তির ভিতরে এই বর্ষশেষ, প্র. ১৯৯৬

৩.
আমরা দেখিয়াছি, পিতামহ, খোয়াইয়ে এসেছি-তে পাওয়া আত্মপ্রত্যাদেশ মান্য করিয়া কালীকৃষ্ণের কবিতাজীবনে প্রথম পর্বান্তরটি ঘটিয়াছিল। তাহার আধা-দশকের ভিতরেই, অন্তরের কোনো এক গোপন প্ররোচনায়, এতদিনকার অভ্যস্ত কথ্যস্পন্দ ও অংশত মিশ্রবৃত্তের এলাকা ছাড়াইয়া কবি সহসা তালপ্রধান ছন্দ এস্তেমাল করিলেন। তাহা কি তবে ঘটনাবলির ক্লান্তি হইতে ‘ঘটনাবলির ঊর্ধ্বে’ উঠিবার পূর্বকথিত সলাহ্‌ মান্য করিয়া? প্রশ্নটি ধোঁয়াটে মনে হইতে পারে। কেহ বা এই মর্মে ফিরতি বিস্ময় প্রকাশ করিতে পারেন—কবিতায় ভাবনাগত কোনও অবস্থান বদলের সাথে ছন্দের কী বা সম্পর্ক! এহেন অবাকপনার আড়ালে ছন্দ লইয়া এক ধরনের বিহ্বলতা কাজ করে। যাহার মূলে আছে এই সংস্কার যে, ছন্দ বুঝি-বা কবিতাশরীরে নামাবলি বা আলখাল্লার মতো। সে বুঝি বাহির হইতে সরবরাহ করা কোনও বেশবাস। ঝাড়িয়া ফেলিয়া দেওয়া বা গায়ে চড়ানো, কবির মর্জিমাফিক ব্যাপার, কবিতার তাহাতে কোনও দায় নাই। এইভাবে যাহারা ভাবেন, তাহাদের ভিতর একদল, ছন্দের জাঁক দেখিলেই তাল ঠুকিতে থাকেন এবং হাততালি দেন। যেন-বা, ছন্দবদ্ধ বাক্যমাত্রেই কবিতা! এই মানসিকতারই অপর মেরুতে রহিয়াছেন আর একদল কবিতামোদী, ছন্দের ধূপছায়াটুকু দেখিলেই যাহারা নাক সিটকান। যেন-বা, ছন্দহীন বাক্যমাত্রেই কবিতা! ছন্দ বা আঙ্গিক যে কবিতার আত্মার সহিত মায়ামজ্জায় জড়িত একটি ব্যাপার, সার্থক কবিতা যে নিজেই তাহার রূপটি নির্বাচন করে, এই বয়ানে হয়তো তাহারা ঈমান রাখিতে পারেন না। বাহাসটিকে মুলতুবি রাখিয়া আমরা বরং স্তম্ভিত হইয়া দেখি, মাত্র কয়দিন আগেক্লান্তির ভিতরে এই বর্ষশেষ বহিতে যিনি লিখিয়াছিলেন—

১. ধোঁয়ার মধ্য দিয়ে উড়ে এসেছে কাক। ধোঁয়ায় ভরে উঠেছে শিশির মঞ্চ, তাঁবু। কিন্তু, প্রশ্ন : স্কুটারের শব্দ কে কিভাবে নেবে?
                                                                                                                   —আবারও স্কুটারের শব্দ

২. তুমি চুল খুলে দিয়েছ আজ প্রকাশ্য সভায়। বলেছ ‘আমিও দ্রৌপদী, হিহি, কফি বলো।’
                                                                                                                        —বৃষ্টির দিনের কথা ২

অনতিদূরে পঁহুছিয়া অক্ষয়বটের দেশ পার হই (প্র. ১৯৯৭) গ্রন্থে সেই তিনিই লিখিতেছেন—

কলকোলাহল থেকে
বিষাদ জন্ম নিল
যখন শারদ মেঘে
অনায়াস কোমলতা

দেখেছি, ছাতিমতলা
মন্ত্রে রয়েছে ঢাকা
যেন এক মহাদেশ
বিষাদ জন্ম নিল
                                                                                            —বিষাদ জন্ম নিল

প্রিয় পাঠিকা প্রিয় পাঠক, খোদ আপনারাই বিচার করুন, ইহা কে স্রেফ এক-আঙ্গিক হইতে অন্য-আঙ্গিকে বাসাবদল, নাকি পুরাদস্তুর এক নয়া উপলব্ধির মহাদেশে অভিবাসন। ‘ঘটনাবলির’ ক্লান্তি হইতে ‘বিষাদ’-এর গভীরতায় উত্তরণ। বলিবার কথার নতুনতা হইতেই বুঝি কথা বলিবার ধরনে এই দৃশ্যমান বদল। অবশ্য রূপ, রূপবান ও রূপকারের ত্রিমুখী ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়াও যে কিভাবে পরস্পরকে নিয়ন্ত্রিত ও প্রভাবিত করে, তাহারও নজির কালীকৃষ্ণের এই পর্যায়ের কবিতায় রহিয়া গিয়াছে। ধরা যাক, এই কবিতাবহিরই ‘চরাচর’ ও ‘পিতাপুত্র’ কবিতা ২টির কথা। ২টি কবিতাই এক বয়স্ক পিতা ও তাহার কিশোর পুত্রের বিশ্বদর্শনের আবহে রচিত। একটি গদ্যস্পন্দে রচিত, অন্যটি ৬মাত্রার কলাবৃত্তে। কবিতা ২টির খানিক অংশ পড়িয়া লওয়া যাক—

১.
বাবা জোরে জোরে কথা বলছে আর ছেলে উত্তর দিচ্ছে মনে মনে। বাবা বলছে ‘এইসব গাছ চিনে রাখো—অশত্থ ডুমুর বট বাবলা আকন্দ নিম কামরাঙা, এইসব পাখি চিনে রাখো, এই রাস্তাঘাট, ওই অচিন পীরের দরগা, শ্মশান পেরিয়ে ওই সাঁকো।’ ছেলে মনে মনে উত্তর দিচ্ছে ‘কিছুই তো দেখতে পাই নি, শুধু এই বিকেলের আলো—অন্ধকার হওয়ার আগে বাড়িতে পৌঁছতে হবে—শ্মশান তাহলে ওইদিকে, ওই মেঘেদের দিকে…’                                                                                —চরাচর

২.
থুরথুরে বুড়ো বাপ
আকাশে তাকিয়ে দ্যাখে
কত-না পুরাণ আর
গতজন্মের ছাপ

আকাশে তাকিয়ে ভাব
নবীনকিশোর ছেলে
কবে ধাবমান ব্যাধ
আকাশ পেরিয়ে যাবে

রাত্রির আবরণ
ঢাকে পিতাপুত্রকে
পাতা ঝরে যায় তবু
ঢাকা থাকে দুইজন
                                                                                                —পিতাপুত্র

২টি কবিতাতেই পূর্বপ্রজন্মের দৃষ্টি স্মৃতিবাহিত চিহ্নগুলির দিকে, আর পরপ্রজন্ম তাকাইয়া আছে ভবিষ্যতের স্বপ্ন-কল্পনায়। ১মটির গদ্যস্পন্দে  উঠিয়া আসিয়াছে পিতাপুত্রের কল্পসংলাপ, ও সেই সূত্রে, দৃশ্যের মায়াময় অনুপুঙ্খতা। কিন্তু এ-কবিতার বয়ান ২চরিত্রেরদিগ্‌দর্শন ২টিকে কালের ২মাত্রায় সোপর্দ করিয়াই ফুরাইয়া যায়। অন্যদিকে ২য় কবিতার চলনটি মিতায়তন। বেশি বলিবার সুযোগ সেখানে নাই। কবির সে-প্রয়াসও নাই। প্রতিবেদনের অনুপুঙ্খতার বদলে, ‘গতজন্মের ছাপ’ বা ‘ধাবমান ব্যাধ/ আকাশ পেরিয়ে যাবে’-র সাঁটে, সেখানে সামান্যেই এই কথা বলা হইয়া যাইতেছে যে, ১টি কালের সমীপতায় দাঁড়াইয়াও পিতা ও পুত্র বিপরীত ২কালের অভিমুখী। আর, অল্পে বলা হইতেছে বলিয়াই হয়তো, ১ম কবিতার মতো এ-কবিতার বয়ান এখানেই ফুরায় না। তাহা আরও সম্প্রসারিত হইবার ফুরসত পায়। আমাদের পৌঁছাইয়া দেয় এমন একটি নজর মিনারের টঙে, যেখান হইতে অনায়াসে আমরা দেখিতে পাই, অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ ত্রিকালের ঊর্ধ্বেই বহিয়া যাইতেছে এক অনন্ত সময়প্রবাহ, যাহাকে হয়তো মহাকাল বলা যায়। পিতা ও পুত্র, যে যেদিকেই তাকাইয়া থাকুক, তাহারা উভয়ই শেষ পর্যন্ত সেই মহাকালের দ্বারা আচ্ছাদিত। এই কবিতায়, বলিবার কথার ধারণা আর কথা বলিবার ধরন, কে যে কাহাকে কতদূর উস্কানি দিয়াছে, তাহা গজফিতা দিয়া মাপিবার উপায় নাই বটে, কিন্তু কথক অর্থাৎ কবি যে সেই গোপন রসায়নের পুরা ফয়দা উঠাইয়াছেন, তাহা বলিবার অপেক্ষা রাখে না। পুনশ্চ, ফয়দা উঠানো কথাখানি আমরা মুগ্ধতাবশত বলিলাম।

৪.
ছন্দে বলিলে, বলিবার কথা কেবলই বাহিরের দিক হইতে বাজিয়া ওঠে, ধ্বনিসৌষম্যের অবান্তর কসরতে ফেনায়িত পল্লবিত হইয়া ওঠে, বাক্‌স্পন্দ হইতে দূরে সরিয়া যায়, এইসব বিবেচনায় কবিরা একদা গদ্যচালের দিকে মুখ ফিরাইয়াছিলেন। আর, কালীকৃষ্ণ গুহ-র ক্ষেত্রে দেখিতেছি, জীবনের প্রথম ৩টি দশক মুখ্যত গদ্যে বা মিশ্রবৃত্তের মিশাল দেওয়া গদ্যে লিখিবার পর তিনি যখন ছন্দ-মিলে আসন পাতিলেন, তাহার কবিতা আরও মিতবাক ও অনুচ্চকিত হইয়া আসিল। তাহার ভিতর হইতে প্রতিবেদনধর্মিতা ঝরিয়া গেল। আধুনিকতার চাপে তাহার যে-স্বধর্ম কষ্ট পাইত, অনেক সময় আধুনিকতার হাতিয়ার লইয়াই তিনি যাহা বাচাইবার কোশেশ করিতেন, আজ যেন সেই প্রশান্তি ও বেদনাবোধের জটিল যুগ্মতা তাহার এই নতুন আঙ্গিকে ভাষা খুঁজিয়া পাইল। কবিতার কাঙ্ক্ষিত অব্যক্তকে তিনি যেন বহুদূর অবধি স্পর্শ করিতে পারিলেন। কিন্তু তাহার বৈচিত্র্যপিপাসা কোনও আঙ্গিককেই অচ্ছুত করিল না। ছন্দ ও অ-ছন্দে তিনি পাশাপাশি ও সচ্ছন্দে লিখিতে লাগিলেন।


কবির এই চলনচিহ্নগুলি বা জ্বলনচিহ্নগুলি, পাঠক হিশাবে আমাদের বিস্মিত প্রাপ্তি হইয়া থাকে।


এই অনুষঙ্গে কয়েকটি কবিতার অংশবিশেষ উদ্ধার করিবার খায়েশ দমাইতে পারিলাম না। জীবনের, সম্পর্কের, সকল রহস্যের, টানাপোড়েনের, শুরু ঠিক কবে হইতে—ইহাই হইতেছে প্রশ্ন। সেই প্রশ্নের উপর দিয়া একবার একদিন এইভাবে জন্মান্তরের বাতাস বহিয়া যায়—

একদিন বলেছিলে
‘শুরু করা যাক তবে—’
বহু বৃষ্টিতে ভিজে
প্রশ্ন করেছি ‘কবে?

কোনখান থেকে শুরু?’
উত্তর নেই কোনো
গতজন্মের হাওয়া
বলে গেছে ‘শোনো শোনো—’
                                                     —গতজন্মের হাওয়া/ স্মৃতিহীনতার মধ্যে নিস্তব্ধ পুরাণ, প্র. ১৯৯৯

আমাদের হৃদয়ানুভূতিগুলির বাস্তবিক যেন কোনও শুরুশেষ নাই। শেষ বিচারে তাহা যেন এক মহাজগতিক রহস্যের সাথে সুদূরপ্রসারী তারে তারে বাঁধা। তবু, এহেন নৈর্ব্যক্তিক অভিব্যক্তির মর্মমূলে পড়িয়া থাকে কিছু রক্তমাংসের ঘটনাবৃত্ত। দার্শনিকতাও যেমন সত্য, জীবনও কিছু মিথ্যা না। সেই বৃত্তান্তও পিছু ছাড়ে না। এক বহি টপকাইয়া অপর বহিতে গিয়াও সে নিজের বয়ান কবুল করাইয়া লয়। তবে সেই বয়ানের অন্বয় ও প্রস্বর স্বতই আলাহিদা। কারণ স্মৃতি ছানবিল করিয়া তাহাকে পেশ করিতে হইতেছে ঘটনার আনুপূর্বিকতা—

আমাদের সম্পর্কের মধ্যে কত-না চিৎকার আর ধুলোর আস্তরণ। একদিন তুমি বললে, ‘যা ঘটে গেছে, ধীরে ধীরে তার সবটুকু বুঝে নিতে হবে।’ বললাম, ‘তুমি চলে গিয়েছিলে, অনেক দেরিতে হলেও ফিরে এসেছ আবার। এইখান থেকে বোঝাপড়া শুরু।’ কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললে, ‘আরও কিছুটা আগে থেকে বুঝতে চাই। যেদিন তোমাকে প্রথম দেখলাম সেদিন থেকে।’ বললাম, ‘তাহলে সেই স্কুটারের কথাও এসে পড়বে; বরং সেই ছাতিমগাছ রৌদ্র এবং দিনাবসানের কথা থেকে শুরু করা যায়।’
                                                                —সম্পর্ক ৭/গতজন্মের গ্রীষ্মকাল, প্র. ২০০১

শুরুর কথা লইয়া এই আলাপ-চারিতা একসময় শেষ হয়। একদিন শেষ হয় সেই আলাপের স্মৃতিচারণাও। সময় বহিয়া যায় আরও। তাহার পর হয়তো আবার একদিন বুঝা যায়, শুরুর কথাগুলি কিছুই ঠিক মতো বলা হয় নাই। আবার এক অনিশ্চয়তার পাঠে গিয়া পৌঁছাইতে হয় তখন—

আরম্ভের কথাগুলি
হয় নি বলা বুঝি আজো
শেষের কথাগুলি থাক
না-বলা সময়ের মাঝে।

সকল পাঠে ভয় জমে
সকল বিশ্রাম ফাঁকা
ও কোন গ্রহ জ্বলে, ভাবি
স্মৃতি যে কোন ছবি আঁকে!
                                                            —আরম্ভের কথা/অপার যে বিস্মরণ  প্র. ২০০৬

এইভাবে, গ্রন্থ হইতে গ্রন্থান্তরে, কবির এমন কিছু অনুভাব পরিকীর্ণ হইতে থাকে, যাহা হয়তোবা সমমেল অভিজ্ঞতার প্রস্থানভূমি হইতে উৎসারিত। কিন্তু উপলব্ধির ক্রমিক বিস্তারে তাহাদের পাঠ কেবলই বদলাইয়া যায়। আঙ্গিকও। কবির এই চলনচিহ্নগুলি বা জ্বলনচিহ্নগুলি, পাঠক হিশাবে আমাদের বিস্মিত প্রাপ্তি হইয়া থাকে। যেমন, বিগত শতকে রচিত তাহার আখেরি কবিতাবহিটির একটি দীর্ঘকবিতার এই অংশে শুনি স্থিরতার প্রত্যয়ে পঁহুছিবার এমন সব সংকল্প—

সমস্তরকম অস্থিরতা থেকে মুক্তি চেয়েছিলাম আমরা—
আমি বলেছিলাম ‘এই-যে আকাশ, যা অস্তিত্বহীন—শূন্যতা মাত্র
এরই মধ্যে মাথা ডুবিয়ে বাঁচতে হবে, স্থির হতে হবে’
তুমি বলেছিলে ‘যে বিরহের মধ্যে রয়েছি সেখানেই থাকতে চাই,
সেখানেই স্থির হতে চাই—’
                                                                    —কাক ডাকছে/ গতজন্মের গ্রীষ্মকাল

বুঝিতে অসুবিধা হয় না, উদ্ধৃত অংশে শোভিত প্রশান্তির আড়ালে আসলেই বিগত গ্রীষ্মের দহন হইতে বাহির হইয়া আসিবার একটি টানাপোড়েন ছটফট করিতেছে। বাস্তবে, প্রকৃত স্থিরতায় পঁহুছিবার পথ কেবলই দীর্ঘ হইতে থাকে। দীর্ঘ হইতে থাকে কথোপকথনের বিস্তার। প্রলম্বিত হইতে থাকে বিদায় গ্রহণের মুহূর্ত। পরবর্তী বহিতে পঁহুছিয়া, আরও এক দীর্ঘকবিতায় কবিকে তাই কবুল করিতে দেখি—

বললাম ‘যা-কিছু হারিয়ে গেছে তার জন্য হঠাৎ
চিৎকার করে উঠতে ইচ্ছে করে
অথচ যা-কিছু হারিয়ে গেছে তার মধ্যে শান্তি খুঁজে পাই।
তার সবকিছুর জন্যই নীরবতা পালন করি।’

এই কথোপকথনের পর পরস্পরের কাছ থেকে
বিদায় নিয়েছি আমরা। তখন
মাথার ওপর অবিশ্বাস্য সেই জারুলগাছ।
                                                                        —আনন্দযাত্রা/অপার যে বিস্মরণ

কিন্তু বারবার ঘোষণা দিলেও, চট করিয়া বিদায় লওয়া যায় না। বা লইলেও, পিছুটান রহিয়া যায়। জীবনের ‘এই গোধূলি-ঘেরা বেলা’য় মাঝে মাঝে সেই টান কিছুটা ভয়ও দেখায় বই কি! সেই ‘অগ্রন্থিত ভয়’-এর কথাটি ধরা পড়ে এই বহিরই অপর এক কবিতায়, ফের এক ভিন্ন উপস্থাপনায়—

তোমায় বলি, ‘সামনে দূরে কেন
আমায় নিচ্ছ টেনে?
এখন এই গোধূলি-ঘেরা বেলা
নশ্বরতায় মেনে

নিয়েছি এক নিথর কৌতুকে—
আর তো কিছু নয়’
বলেই ভাবি সামনে আছে কিছু
অগ্রন্থিত ভয়।

ভয়ের দিকে আরও অনেক পথ
তোমার থেকে দূরে
পেরিয়ে যাব। রাত্রি। বহুতারা
গগনতল জুড়ে।                                                                        —কৌতুক/

এইবার তবে অজানা সুদূরের দিকে নতুন এক পদযাত্রা গড়িয়া উঠিবার সময় হইল। নৈর্ব্যক্তিক প্রৌঢ় সৌন্দর্যের একাগ্রতায় তাহারই নির্মোহ গদ্য-ইস্তাহারটি যেন শোনা গেল এইভাবে—

সবকিছু বুঝে নিতে হবে।/ এখন নারীকে বুঝতে হবে কিছুটা দূর থেকে।/ সময় ও শিল্পকেও কিছুটা দূর থেকে বুঝতে হবে।/ সবকিছুই দূরে সরে গেছে কিছুটা।/ প্রতিবেশীরা দূরে সরে গেছে/ পিতৃলোক দূরে সরে গেছে।
                                                                                        —বিরতি /

আর সেই পালটাইয়া যাওয়া পরিপ্রেক্ষিতের উদাসীন আত্মমগ্নতাটুকু যেন অস্ফুট স্বগতোক্তির মতো ঝরিয়া পড়িল এই অনুচ্চকিত ছন্দে—

আকাশে তাকানো/ রাত্রির/ এই শুধু তার/ বাকি কাজ/ #/ দিনগুলি যায়/ ঊর্ধ্বে/ পাখি ওড়াউড়ি/ মন্তাজ।/ …/ ভোর থেকে ডাকে/ পাখি সব/ ফেরিঅলা বলে,/ ‘দিন যায় –’/ #/ সন্ধ্যায় কত/ ঝিঁঝিঁ ডাক/ মাঝে মাঝে তারও/ ঘুম পায়।
                                                                                        —রাত্রিগাথা/


আমরা ভাষা পড়ি না, মন পড়ি।


৫.
এতদূর আসিবার পর ২টি বাক্য স্মরণে আসায় খানিক নাচার বোধ করি। ২টিই কবি কালীকৃষ্ণ গুহ-র উক্তি। নিজের শ্রেষ্ঠ কবিতা-র ভূমিকায় করা একটি মন্তব্য মোতাবেক, কালীকৃষ্ণর কাছে কবিতা ব্যাপারটি ‘অব্যক্ত থেকে অব্যক্তে পৌঁছোনো… শেষ পর্যন্ত’।অব্যক্ত থেকে অব্যক্তে শিরোনামে কবির একটি স্মরণীয় নিবন্ধও আছে। যেখানে তিনি আরও একটি ধুয়া উচ্চারণ করেন–‘আমরা ভাষা পড়ি না, মন পড়ি’। এই বাক্য ২টির অমোঘতা যেমন আমাদের অভিভূত করে, তেমনই এই উচাটনেও পড়ি, যে, আমরা তো কবির কবিতায় কী ব্যক্ত হইয়াছে, তাহারই পিছু ধাইতেছি। আমরা বুঝি কবির মন না পড়িয়া ভাষাই পড়িতেছি।

প্রিয় পাঠিকা প্রিয় পাঠক, আমাদের অসহায়তা আমরা কবুল করি। কিন্তু বেহুদা বিনয় করিয়া ফয়দা নাই। কারণ কবিই অন্যত্র আমাদের ভরসা জুগাইয়াছেন—ভাব থেকে ভাষা/ ভাষা জেগে থাকে দেহে। তাই আপাতত ভাষাতুতো সেতুবন্ধের ভিতর দিয়াই কাঠবিড়ালির মতো আমাদের আরও কিছুদূর আগাইতে হইবে। টের পাইতে হইবে ভূসমলয় কক্ষপথে স্থিত এক আকাশযানের ভাবগতিক। দুনিয়া হইতে উৎক্ষিপ্ত হইয়াও যে মাটি পৃথিবীর সাথে নিবিড় টানে বাঁধা। ওই আমাদের স্থিতপ্রজ্ঞ কবি, শুরু হইয়াছে তাহার নিরাসক্ত অথচ মগ্ন,  নয়া সফরনামা।

পথিকতার মানে আসলে এক ধরনের উদাসীনতা। পটভূমির সকল মায়াময়তার ভিতর দিয়া হাঁটিতে হাঁটিতে নিজেকে অংশত প্রত্যাহার করিয়া লওয়া। পথিকতা মানে এক নির্লিপ্ত নিরন্তর উদ্যম। সূর্যোদয় হইতে সূর্যাস্ত, সমস্ত পরিসরটুকুই পথিকের কাম্য। কিন্তু সে জানিয়াছে—সমস্ত রকম প্রস্তুতির উৎসে অন্ধকার (নিষ্পলক/ পথনাটকের আসরে স্তব্ধতা, প্র. ২০০৮)। সে জানিয়াছে—অন্ধকার রাত।/ অন্ধ সহযাত্রীদের সঙ্গে এগিয়ে চলেছি/ অন্ধত্বের সাধক একজন (সমান্তরাল/)। সে জানিয়াছে—… তুমি দীর্ঘ একটা/ ভ্রমণে বেরিয়েছ।/ অস্পষ্ট সব রাস্তাঘাট ধরে বিশ্বাস-অবিশ্বাসের/ ভিতর দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছ তুমি/#/ আর ফিরবে না…
                                                                                (বধিরতা/ একাকিত্ব/ )।

‘অস্পষ্ট সব রাস্তাঘাট’এর ‘বিশ্বাস-অবিশ্বাসের ভিতর’ লিপ্ত না হইয়াও পথিকের মনে প্রশ্ন জন্ম হয় তবু। নিরুত্তর স্তব্ধতার উদ্দেশে এইপ্রশ্ন উচ্চারণের অনুষঙ্গ কিছুদিন হইতেই কবির ব্যাকুল স্বগতোক্তির ভিতর দিয়া  উঠিয়া আসিতেছিল—

১. প্রশ্ন করে নারী/ সময় প্রশ্ন করে/ প্রশ্ন করে পথিক/ সকল স্তব্ধতায়—/ নিশানগুলি উড়ে/ পাতারা ঝরে যায়।
                                                            —যেদিকে চাও পাথর/গতজন্মের গ্রীষ্মকাল

২. নীরবতা ভেঙে জ্যোৎস্না ভেঙে পুরাণবাস্তব ভেঙে/ প্রশ্ন করেছি/ প্রশ্নের ভিতরে ভিক্ষা/ প্রশ্নের ভিতরে কত ঝরাপাতা আমের মুকুল।
                                                                —রাস্তাঘাট /অপার যে বিস্মরণ

এইভাবে, উত্তরের পরোয়া না করিয়া, এমনকি, হয়তো উত্তর আদৌ নাই, এই কথা জানিয়া, প্রশ্ন তোলার স্বাধীনতা বহাল রাখাও পথিকতার এক ধর্ম। ইহাও এক ধরনের নির্লিপ্তি। আকাঙ্ক্ষাহীন, তবু নিরলস প্রশ্ন উচ্চারণের নির্মোহতার ভিতর দিয়াই হালফিল এই ভ্রামণিকতায় কবি গড়িয়া তুলিয়াছেন অবিস্মরণীয় সব কবিতার মুহূর্ত –

১. প্রশ্ন করেছি, খুঁজি নি তো/উত্তর/ সকল কাব্য অতিথিশালার/ রাত্রি।
                                                                                            —না-জানা /পথনাটকের আসরে স্তব্ধতা

২. এই না-জানার সৌন্দর্য ঘিরে আমাদের বসবাস—/অশ্রু, সাধনা, মৃত্যুবোধ।/ আনন্দও অনেক।
                                                                                                                                  —পাপপুণ্য/

৩. অনেক দিনের প্রশ্ন নিয়ে/ গড়ে উঠছে জীবনবীক্ষা/ এক মুহূর্ত তাকিয়ে থেকে/ তার কাছে যাই ছন্দভিক্ষু।
                                                                                                                                  —ছন্দভিক্ষু/

৪. শুরু নেই শুরু ধারাবাহিক/ শেষও নেই, শেষে অজানা বাঁক
                                                                                                             —ধারাবাহিক/

৫.
—কথা শেষ হলো?
—কথা শেষ কখনো হবে না
—শেষকথা কিছু নেই?
—ধন্যবাদ ক্রমঅগ্রসরমাণ নিরবয়ব মৃত্যু
—নতুন বছর ২০১১, বৃষ্টির দিনে ভ্রমণ, প্র. ২০১২

৬. যদি শেষ হয় বাক্য/ প্রশ্ন করেন শিক্ষক/ বাক্যের শেষে অর্থ/ যারা খোঁজে তারা প্রার্থী
                                                                                                   —অক্ষর/পানসুপারির বন্ধন, প্র. ২০১৩

৭. প্রশ্ন কী আজ?/ প্রশ্ন দূরের থেকেও সুদূর/ দিগন্তপার উন্মোচনে/ জীবনধারা কিভাবে পায়/ মন্দ্রস্বরের পথিকভাষা।/ একটি কুপি/ জ্বালিয়ে রাখে পথের কবি।
                                                                                        —পথিকভাষা/

আমাদের মনে পড়িতে পারে, পুরানো একটি পথ শেষ হইয়াছিল এক ‘অগ্রন্থিত ভয়’ দিয়া। তুমি-র সাথে আমি-র এক জটিল বোঝাপড়ার রহস্যে। আজিকার পথটি যেন গড়িয়া উঠিয়াছে সেই তুমি-কে যথাযথভাবে মোকাবিলা করিবার সাফল্যে। তাই আজিকার এই পথিকতাকে মনে হয় যেন কোনও গ্রহান্তরের আলোয় অভিষিক্ত। তাহার একটি পাঠে ‘বাসনাহীনের ভাঙা হাটে একা একা ঘুরি’য়া বেড়ানোর নির্মোহতা। অপর পাঠে, ‘ব্রত পালনের শেষে আমরা সবাই পথিক’, এমন এক সানন্দ উপলব্ধি। তুমি-র পুনর্নির্মাণনা-করিতে পারিলে, আমি-র এই নির্ভার পরিক্রমণ কি আদৌ সম্ভব হইত?

যে-নিরুত্তরতাকে পাথেয় করিয়া এই অভিযাত্রা, দেখি, তেমন এক না-জবাব প্রশ্নের বিপরীতেই এইবার আসিয়া দাঁড়াইয়াছে সেই তুমি। সে এক অ-জ্ঞাত তুমি। যেন তাহার সেই অস্পষ্ট অথচ নিশ্চিত অস্তিত্বকে লইয়াই গড়িয়া উঠিয়াছে আমি-র সকল প্রশ্নের নিরলসতার উৎসার—

‘দাঁড়িয়ে রয়েছ ও কে, তুমি?
এই প্রশ্ন যাকে করি তার
মুখ দেখা যায় নি কখনো
প্রশ্নের ভিতরে মরুভূমি।
                                                        —প্রতীক্ষা/ পথনাটকের আসরে স্তব্ধতা

যদি সেই মুখ দেখা যায়ও, ধরা পড়ে, চিরদিনই তাহা ছিল অস্পষ্ট, আংশিক। আজ সেই অস্পষ্টতা শনাক্ত হইল—

বহুদিন পর দেখলাম তোমাকে। তোমার নাম মনে রাখি নি, রূপ মনে রেখেছি… কেউ তোমার মুখের পুরোটা দেখতে পেত না।…
এতদিন পরেও দেখলাম তোমার মুখ অংশত ঢাকা।
                                                                —দেশকালের কথা/ বৃষ্টির দিনে ভ্রমণ

তথাপি, অজানা বা অংশত জানা হইলেও, আজও সেই তুমি-কে ঘিরিয়া সম্পর্কের কত অভাবিত অঙ্কপাত অনুভূত হয়, আজও জাগিয়া উঠে আরও কত সংকেতবাহী প্রশ্ন—

১. তোমার আমার বাধ্যতা তো/ হঠাৎ-নামা বজ্রপাতে!
                                                                        —সম্পর্ক/ পানসুপারির বন্ধন
২. তোমায় নিয়ে যাত্রা ছিল/ বৃষ্টিভেজা পথে/ আমার মধ্যে অনন্ত রাত/ পথটি গেল কোথায়?
                                                                                                                             —বিস্তৃতি/
৩. কোথায় ছিলে তুমি/ নিদ্রাহীনের রাতে?/ প্রশ্ন করে বুঝি/ সব আলো সাংকেতিক।
                                                                                                                      —সাংকেতিক/

অজানা উত্তরের এইসব প্রশ্নগুলি, অনুভবগুলি, লালন করিয়া যেমন আজিকার এই চলাচল, তেমনই সেই অজানা তুমির সহিত অধিবাসে এই চলার আনন্দের উদ্ভাস—

তোমাকে কেউ জানে না
তুমি অনন্ত অপার
না-জানার আনন্দরূপ
তোমাতে রোরুদ্যমান।
                                                                              —ঝিঁঝিঁডাক/পানসুপারির বন্ধন

কিন্তু এত কথা ঘনাইয়া উঠে কাহার উদ্দেশে, তাহা কি বিন্দুবিসর্গও টের পাওয়া যাইবে না? তবে কি এই সকল আলাপই এক কিসিম প্রলাপ মাত্র! নাকি শ্রোতা একজন কেহ আছে। কথকের নিজেরই ভিতরে বুঝি টইটম্বুর হইয়া আছে সেই আয়োজন—

তবু   কথা বলেছ অনেক
কথা   নিজের সঙ্গে শুধু
যেন   একাই দুইজনা
যেন   পাত্র ভরছে সুধায়!
                                                                                          —বুড়ি-ছোঁয়ার খেলা/

এইভাবেই বুঝি সেই পুরানো তুমি-র পুনর্নির্মাণ আসিয়া একটি বিন্দুতে স্থিত হয়। ব্যক্তি মুছিয়া গিয়া ধারণার জন্ম হয় অবশেষে। একটি কবিতা পাঠ করি এই প্রস্তাবের সমর্থনে—

তোমাকে দিই নি কিছু—
তবুও আগুন জ্বেলে
রেখেছিলে তুমি নিজে;
আজ এই কথা বলি।

কাকে বলি এই কথা?
স্মৃতিহীনতার দিকে
তাকিয়ে থেকেছি শুধু—
যেন শূন্যতা আঁকা!

শ্রোতা পাই নি তো খুঁজে
নিজেকেই বলেছি তা
আলো জ্বেলেছিলে তুমি
নিদ্রাহীনের শীতে।

ঝাউ-দেবদারু ঘেরা
গহন তোমার বাসা
তোমাকে গ্রহণ করি
পুরোনো কাব্যভাষায়।
                                                                                             —নিদ্রাহীনের শীত/


বিশুদ্ধ কবির অসহায়তা দ্বিবিধ।


৬.
টেবিলের উপর তুরুপের তাসের মতো একটি কবিতাকে ঠকাস করিয়া ফেলিয়া একজন কবির মর্মলোকের হদিশ দিবার চেষ্টার ভিতর কিছু নাট্য রহিয়া যায়। অনাগত পাঠকের মতলবের দিকে তাকাইয়া তো কবিতা রচিত হয় না। কবিতা রচনার পিছনে কবির এক ধরনের অসহায়তাই কাজ করে। চালাকির কবিতা, মাঞ্জামারা কবিতা বা দুনিয়া উল্টাইয়া দিবার প্রণোদনায় লিখা কবিতা সকলের কথা হইতেছে না। অন্যথায়, বিশুদ্ধ কবির অসহায়তা দ্বিবিধ। পহেলা, রচনার কর্তাগিরি লইয়া রচিত ও রচয়িতার দ্বান্দ্বিকতা তিনি মানিয়া লন। ধূসর কুয়াসার ভিতর ভাসিয়া উঠা একটি সেতুর ছবির উদ্ভাস হইতে ক্রমে তিনি ২টি বিচ্ছিন্ন পরিসরকে জুড়িয়া দেন বটে, কিন্তু নিছক প্রকৌশলীর কায়দায় নয়। মাঝের শূন্যতাটুকুও তাহাকে এন্তার সম্মোহিত ও প্রভাবিত করে। ফলে, সকল কর্মসূচি তত্ত্ব নীতিকথা মতাদর্শ সমগ্র নির্মাণটির ভিতর বিলীন হইয়া যায়। কবির দোসরা মুশকিল এই যে, এইসব কথা বুঝাইবার জন্য তিনি পাঠকের সামনে সশরীর হাজিরায় থাকেন না।

এমনতর অবস্থায় পাঠকের এলেমদারি নিরঙ্কুশ হইয়া ওঠে বটে। যা-ইচ্ছা-তাই গ্রহণ-বর্জন করিবার স্বাধীনতা তাহাতে বর্তায়। তাই বলিয়া কাটা-ছেঁড়ার যাচ্ছে তাই রকম বাড়াবাড়িও কবিতার ধর্মে সহে না। অতএব আমাদের এইবার ক্ষান্ত দেওয়াই উচিত। থামিবার আগে, আমরা কবির আর একটি কবিতা পড়িয়া লইতে পারি—

এবছর বৃষ্টির দিনগুলিতে তোমাকে
কাছে পাই নি।
না-পাবারই কথা—
না-পাওয়াতেই আজ আমাদের যা-কিছু বাঁচার গৌরব।

নিঃসঙ্গতার ভিতর দিয়ে গিয়ে
আমরা যে-গৌরব অর্জন করলাম
তা অবশ্য প্রকাশ করার নয়।
সেই গৌরবের চারপাশে গাছপালা
সেই গৌরবের নিঃসঙ্গতার পশ্চিমে সূর্যাস্ত।

সেই গৌরবই প্রকাশ পাচ্ছে
আজ শ্রাবণ শেষের এই অবিরল বৃষ্টিধারায়…
                                                                —গৌরব/ নিঃসঙ্গতার পশ্চিমে সূর্যাস্ত, প্র. ২৫ বৈশাখ ১৪২০

অঝোর বৃষ্টির ভিতর দিয়া প্রকাশমান শ্রাবণের এই গৌরব, ব্যক্তিকে পিছনে ফেলিয়া জাগিয়া উঠা এক ধারণার গৌরব। একটি কবিতাজীবনের দীর্ঘ পদপথযাত্রার গৌরব। সেই গৌরব সমস্ত প্রকৃতির উপর বিস্তারিত হইয়া আজ এই পৌষরাত্রির হিমানির ভিতর দিয়া আমাদেরও কিছু স্পর্শ করে। সেই সূত্রে, কবি কালীকৃষ্ণ গুহ-কে আমাদের প্রণাম ও কৃতজ্ঞতা জানাই।

 

গৌতম চৌধুরী

গৌতম চৌধুরী

জন্ম ১৮ ফাল্গুন ১৩৫৮, ২ মার্চ ১৯৫২, কানপুর, উত্তর প্রদেশ, ভারত। শিক্ষা : উচ্চ মাধ্যমিক। পেশা : লেখালেখি।

প্রকাশিত বই :
কবিতা—
কলম্বাসের জাহাজ [১৯৭৭, উলুখড়, হাওড়া]
হননমেরু [১৯৮০, উলুখড়, হাওড়া]
পৌত্তলিক [১৯৮৩, উলুখড়, হাওড়া]
অমর সার্কাস [১৯৮৯, আপেক্ষিক, হাওড়া]
চক্রব্যূহ [১৯৯১, আপেক্ষিক, হাওড়া]
নদীকথা [১৯৯৭, যুক্তাক্ষর, হাওড়া]
আমি আলো অন্ধকার [১৯৯৯, অফবিট, কলকাতা]
সাঁঝের আটচালা [২০০২, কীর্তিনাশা, কলকাতা]
আধপোড়া ইতিহাস [২০০৪, কীর্তিনাশা, পুরুলিয়া]
অক্ষর শরীরে মহামাত্রা পাব বলে [২০০৬, কীর্তিনাশা, পুরুলিয়া]
নির্বাচিত কবিতা [২০১০, সংবেদ, ঢাকা]
আখেরি তামাশা [২০১৩, ছোঁয়া, কলকাতা]
ঐতরেয় [২০১৩, রূপকথা, ক্যানিং]
উজানি কবিতা [২০১৪, মনফকিরা, কলকাতা]
ধ্যানী ও রঙ্গিলা [২০১৫, চৈতন্য, সিলেট]
কলম্বাসের জাহাজ (২য় সং) [২০১৬, রাবণ, কলকাতা]
বনপর্ব [২০১৬, সংবেদ, ঢাকা]

গদ্য—
গরুররচনা (বৈ-বই বা ই-বুক) [২০১২, www.boierdokan.com]

যৌথ সম্পাদনা—
অভিমান (১৯৭৪-৯০), যুক্তাক্ষর (১৯৯২-৯৬), কীর্তিনাশা (২০০২-০৫)

ই-মেইল : gc16332@gmail.com
গৌতম চৌধুরী