হোম গদ্য বোধনের ডায়েরি : প্রথম প্রেম বা যৌনাভিজ্ঞতা

বোধনের ডায়েরি : প্রথম প্রেম বা যৌনাভিজ্ঞতা

বোধনের ডায়েরি : প্রথম প্রেম বা যৌনাভিজ্ঞতা
669
0

মা জানিয়েছে, ছোট ভাইটা প্রেমে পড়েছে। মেয়ে হিন্দু। ভিনবাসে আছি প্রায় দু’বছর, পরিবারের সাথে শারীরিক কোনো যোগাযোগ নেই, যোগাযোগ যা তা নেটে। কিছু শব্দ, হাসি-কান্না, মাঝে মাঝে টুকিটাকি সমস্যা, শুভেচ্ছা বিনিময়, শরীরের খবরাদি, এসবেই শেষ। এর-ই মধ্যে সেদিন আচমকা এই আলাদা রকমের খবরটা দিয়ে বসল মা। মেয়ের অনেক গুণ। নাচে, গান গায়, এখানে-সেখানে প্রোগ্রাম করে, এবং সুন্দরী। জানি এসবের কোনোটাতেই মন গলবে না মায়ের, মেয়ে যে হিন্দু, আবার ওদিকে সবেমাত্র ছোট ভাইটার গোফের জায়গায় ঈষৎ খয়েরি মতো রোম উঠতে শুরু করেছে। কত আর বয়স? পনের। পনের বছরে প্রেম, তাও হিন্দু মেয়ে; আমি নিশ্চত হলাম প্রজন্মের এগিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে। মা কিছু জানতে চাইল, কোনো একটা সিদ্ধান্ত চাইল আমার কাছে, অথচ আমি কিছুই বলতে পারলাম না। কী বলব, আর কী-ই বা বলা যেতে পারে?

বলতে গেলে এও বলতে হয়, মা, আমিও প্রেমে পড়েছি, এবং সে মেয়েটিও হিন্দু। শুধু কী তাই, আমি তাকে বিয়েও করব বলে মনস্থির করেছি, আর তোমার ভাবী পুত্রবধূর অস্তিত্ব নিয়ে মহাসুখে আছি এই ভিনবাসে। মা হ্যালো, হ্যালো করতে থাকল আর আমি লাইন কেটে দিয়ে চিৎ হয়ে বিছানায় শুয়ে শুয়ে ভাবতে লাগলাম প্রেম নিয়ে। ভাবতে গিয়ে দেখলাম, প্রেম ব্যাপারটা আমার কাছে তেমন কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়, যেভাবে মানুষ খায়, হাগে কিংবা মুতে, ঠিক সেভাবেই যেন প্রেম করে। ব্যাপারটা এভাবে কেন আমার কাছে ধরা দিল সেটা নিয়ে আরেকটু ভাবব বলে এগুতেই খিচখিচে ভাব হলো, এবং দেখলাম সত্যি সত্যিই আমার মুতু পেয়েছে।


ধীরে ধীরে অজস্র অজানা প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেতে পেতে আমিও ক্রমশ দেখতে পেলাম নতুন এক পৃথিবী


অজ্ঞানতা আমার চিরকালের সঙ্গী, ফলে কোনো কিছুই আজ পর্যন্ত জানা হলো না, সেভাবে। যেমন এত বছরেও জানা হলো না আমার বাড়ির পাশ ঘেঁষেই বয়ে চলা নদীটির নাম বারানয়। ফলে অজ্ঞানতা এখনও আমার পিছু পিছু হাঁটে, আর মাঝে মাঝেই পাশ কাটিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে সামনে! আমি তখন হতভম্বের মতো কিছু একটা মেলাতে চেষ্টা করি, আর না পেরে ফিরে আসি সেইখানে, যেখানে আমার সবগুলো অজ্ঞানতা দিনে দিনে জড়ো হয়ে বিশাল এক আস্তাকুড় তৈরি করেছে, যার সামনে মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকি নিঃশব্দে, যেমন দাঁড়িয়ে ছিলাম সাত বছর বয়সে দাদির ঋতুস্রাবের গোপন ন্যাকড়ার পোটলা ভুল বশত বের করে ফেলায় মায়ের উন্মত্ত প্রহারের নিচে।

এভাবেই আমার বোধহীনতার শুরু, আর এ থেকেই ধীরে ধীরে এগিয়ে যেতে থেকেছি অজ্ঞানতার সবুজ আইল ধরে। এগিয়েই গেছি দিনে দিনে, কেউ বুঝতে পারে নি, জানতে পারে নি কেউ যে, ক্লাস সেভেনে থাকতেই আগ্রহী দর্শক হয়ে ওঠেছি চিকিৎসা সাময়িকীর প্রচ্ছদে, অথবা বুঝে কিংবা না বুঝেই লেডি চ্যাটার্লিজ লাভারের একনিষ্ঠ পাঠক হয়েছি পুনঃপুনঃ পঠনে। আমার সেদিনের সেই অজ্ঞানতাকৃত ভুলে ক্ষতি হয়তো মা কিংবা দাদি কারোর-ই হয় নি, যখন আমি বাস্তবিক জানতাম না ঋতুস্রাব কী, আর কী এমন মহান গোপন বস্তু সেই ন্যাকড়ার পোটলা, যা সর্বসমক্ষে বের করে আনাটা আমার অজান্তেই পরিণত হয় জঘন্য অপরাধে। কিন্তু সেদিন যা ক্ষতি হবার তা একা আমার-ই হয়ে বাকি জীবন প্রতিটি প্রশ্নের উত্তরে পৌঁছাবার চরম দায়ভার নিয়ে ক্রমশ এগিয়ে যেতে যেতে দেখি, এগার বছর বয়সে কোনো এক নির্জন দুপুরে দাঁড়িয়ে আছি সদ্য গোসল সেরে আসা আমার চেয়ে দশ বছরের বড় ফুপাত বোনের আলতো ভেজানো কাপড় ছাড়ার দরজাতে। কয়েক মিনিট ওভাবেই, তারপর কারও গলার আওয়াজে সেখান থেকে প্রাণপণ ছুটতে ছুটতে যখন হাঁফাতে হাঁফাতে দাঁড়ালাম বিলের মাঝখানে, তখন নিজের প্যান্টের দিকে তাকিয়ে দেখি সামনের দিকটা ভিজে গেছে।

বিস্ময় এভাবেই আমাকে উজ্জীবিত করেছে বারবার, যেমন করেছে কোনো অলৌকিক উপায়ে অস্বাভাবিকভাবে নিজের যৌনাঙ্গের আকার পরিবর্তিত হতে দেখে, কিংবা ভিজে যাওয়া প্যান্টের ভেতরে হাত ঢুকিয়ে প্যালপেলে তরল বস্তুর উপস্থিতি টের পেয়ে। কত প্রশ্ন, কত অজ্ঞানতা সে সময়ে কুরে কুরে খেয়েছে। কত দুপুর অস্বস্তিতে হাসফাস করেছি, আর উত্তর পেতে ঘর থেকে ছুটে বাইরে এসে হন্যে হয়ে খুঁজেছি সেই অজানা বিজ্ঞকে, যে আমার সব প্রশ্নের উত্তর জেনে ঘাপটি মেরে বসে আছে অলক্ষ্যে। কেবলমাত্র সে-ই পারে আমার সব প্রশ্ন, সব অজানার উত্তর দিতে। কিন্তু কোথায় সেই বিজ্ঞ, কেমন সেই বিজ্ঞ, যে দেখা না দিয়ে লুকিয়ে থাকে, গোপনে? অবশেষে সহপাঠীদের গোপন আড্ডায় অনেক অনুনয়-বিনয়ে কয়েক মুহূর্ত থাকার সুযোগ পেয়ে যেই মনে হয়েছে এই তো পেয়েছি সেই বিজ্ঞকে, আর আনমনে প্রশ্ন করে বসেছি ‘বাল’ কী, অমনি কয়েক জনের কটমটে দৃষ্টি ও মুহূর্তপরেই তীব্র ব্যঙ্গ আর দম ফাটানো হাসিতে আমাকে নাদান বাচ্চা অপবাদে দল বহির্ভূত করার ঘোষণা প্রমাণ করে দেয়, আসলে ওরা অনেক আগেই দেখা পেয়েছিল সেই বিজ্ঞের। কিন্তু আমি, আজও পাই নি, আর পায় নি বলেই এখনও কান পাতলে শুনতে পাই ওদের সেদিনের সেই দমফাটানো হাসি, যা থেকে প্রতিদিন প্রাণপণ ছুটে পালাতে গিয়ে বারবার ভুল বশত বের করে এনেছি আরো অজস্র ঋতুস্রাবের পোটলা, কিংবা আনমনেই দাঁড়িয়ে পড়েছি অন্য কোনো কাপড় পরিহিতার ভেজানো দরজাতে।

নতুন নতুন বিস্ময় যেন সর্বদাই আমার জন্য অপেক্ষা করে থাকত চারপাশে, আর তার দেখা পাওয়া মাত্রই অস্থির হয়ে ওঠতাম, নিজেকে উন্মাদ করে তুলতাম একের পর এক প্রশ্ন করে, যার উত্তর আমার কাছে না থেকে থাকত সেই বিজ্ঞের কাছে, যে বরাবর লুকিয়ে থাকত অলক্ষ্যে। অথচ প্রতিদিন নানাবিধ প্রশ্ন আর নিত্য নতুন বিস্ময়ের ব্যুৎপত্তি আমাকে একটু একটু করে ঠেলে দিত অজ্ঞানতার দিকে। যেমন কোনো এক দুপুরে বাবা-মার মিলন দৃশ্য দেখে বুঝি নি যে তা মারামারি নয় কিছুতেই, আর তা জিজ্ঞেস করতেও নেই কাউকে। অথচ রাতে খেতে বসে সেটাই করে ফেলা, আর আচমকা ভাত পূর্ণ গালে ঠাস করে নেমে আসা থাপ্পড়ে চুপ হয়ে যাওয়া সাত বছরের এক শিশু বরাবরের মতোই নিজের কৃত অজানা অপরাধটার কারণ জানার জন্য ক্রমেই চোখ রাখতে শুরু করল বিভিন্ন ফাঁক-ফোকরে, আর তখনও কোনো বিজ্ঞ তাকে দেখা দেয় নি, দিয়ে বলে দেয় নি তার অপরাধটা কী ছিল, আর দু’জন মানুষের উপুর্যপুরি অমন ধস্তাধস্তি মারামারিই বা হয় না কিভাবে?

বলে দেয় নি এও, কোনো এক ভোরে আম কুড়াতে গিয়ে দেখা, চাচা-চাচির গোসল করা ও চুপিচুপি বাড়ি ফেরা, আর তা জানতে চাইলে অপরাধ হয়ে যায় কিভাবে? কী করা উচিত আর কী নয়, তা আমাকে কখনোই বলে দেয় নি কেউ, কিন্তু রোজকার নির্মম প্রহার আর চড় থাপ্পড়গুলো যেন সব সময় তৈরি থাকত তাদের আনুগত্য প্রকাশ করতে। কত প্রশ্ন, আর কত না জানা উত্তর! শীতের সকালে কুয়াশার চাদর যেভাবে ধীরে ধীরে খুলে গেলে দেখা যায় মুগ্ধ পৃথিবীর শরীর, তেমনি ধীরে ধীরে অজস্র অজানা প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেতে পেতে আমিও ক্রমশ দেখতে পেলাম নতুন এক পৃথিবী, যেখানে রোজকার সেই বিস্ময় নেই, নেই আচমকা জেগে ওঠা বহুবিধ প্রশ্ন ও তার উত্তর জানতে খুঁজে মরা সেই বিজ্ঞকে। এমন একটা পৃথিবী যেখানে অন্তত প্রশ্ন শুনে কেউ কখনও হেসে উঠলেও, কেউ কাউকে অজানা কোনো কারণে অপরাধী প্রতিপন্ন করে চড়-থাপ্পড় মারে না কিংবা অপবাদ দিয়ে করে না দল বহির্ভূত।

এমনই কোনো পৃথিবীতে প্রবেশের সময় কোনো এক বিকেলে আমার পাড়াতুতো দাদা হাসি ঠাট্টার ছলে সবার সামনেই আমার যৌনাঙ্গ আচমকা মুঠো করে ধরে, ‘আরে শালা তুর বাটাল তো দেখছি মেলা বড় হয়ি গেছ, ভালো কাজ করা যাবে রে!’ বলেই হাসি, যেন-বা বছর কয়েক আগের আমার সেই সহপাঠীদের দল পুনরায় এসে সামনে দাঁড়িয়েছে, এবং তারা ও আমার আশেপাশে দাঁড়িয়ে থাকা গ্রাম্যবন্ধুর দল, সবাই মিলে অনুরূপ হাসিতে পুনরায় আমার ‘কাজ’ বিষয়ক যাবতীয় অজ্ঞানতাকে চরম গ্লানিতে পরিণত করে দিল নিমিষেই, এমনকি শ্যামলী নিজেও সেখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তাদের অনুরূপ হাসি হেসে।


পতিতা আর আমার বর্তমান প্রেমিকা, যারা সবাই বরাবর আমার চেয়ে বেশি যাবতীয় বিষয়ে সম্যক জ্ঞান রাখত


এত বছর পর হিশেব-নিকেশ করে দেখি, আমার যৌনাঙ্গে এ যাবৎ তিনজন মানুষ হাত দিয়েছে। এক. সেই পাড়াতুতো দাদা, দুই. চট্টগ্রামের এক পতিতা, তিন. আমার বর্তমান প্রেমিকা। আর এও সত্যি, সেই দাদা ছাড়া আর কেউ-ই আমাকে বলে নি যে আমার একটা অস্ত্র আছে, এবং তা দিয়ে ভালো কাজ করা যায়। অথচ দাদার বলা কথাটা আমি বিশ্বাস করেছিলাম ততদিন পর্যন্ত, যতদিন পর্যন্ত না আমি সত্যিই বুঝতে পারলাম কাজের প্রকৃত সংজ্ঞা, আর সেদিন এও বুঝতে পেরেছিলাম দাদা ভুল ছিল আর ছিল বলেই জীবনে প্রথমবার নারী শরীরে গমন করে দু’মিনিটের মাথায় সেই পতিতার ঘর থেকে বেরিয়ে আসতে গিয়ে যখন কানে আসল তার সহকর্মী পতিতাদের স্বর, ‘এমন কাস্টমার পেলে বড়লোক হতে আর ক’দিন, দু’মিনিটেই তিনশ’, তখন কিভাবে যেন আমার চোখে জল চলে এসেছিল! ঘটনাটা আমার প্রেমিকা জানে, এবং যতবারই সে তা মনে করে, ততবারই হেসে বাঁচে না, আর হাসতে হাসতেই প্রয়োজনের চেয়ে একটু বেশি আদর বা চুমা খেয়ে সেও দাদার অনুকরণে বিশ্বাসী হয়ে আমার যৌনাঙ্গের দিকে হাত এগিয়ে আনতে আনতে বলে, ‘কই দেখি, কত বড়?’

জীবনে যতবার চেয়েছি সামনে আসতে, ততবারই নিজেকে দেখেছি পেছনে, একদম পেছন! কী স্কুল, কী খেলার মাঠ, শৈশব, যৌবন, বেকার অথবা চাকরি জীবন; শুধু বাদ ছিল বিকেলে বাড়ির পাশে ধান মাড়াইয়ের মাঠে খেলার সময়টুকু ছাড়া, যেখানে বরাবর নিজেকে পেয়েছি সামনে। আর সে-ক্ষেত্রেও আমাকে সাহায্য করেছিল কোনো মেলায় ত্রিশ টাকায় মায়ের কিনে দেয়া কাঠের বন্দুক, যা থেকে আবার সত্যি সত্যিই গুলি বেরুত। পুরো গ্রামে সেই প্রথম অমন অভিনব অস্ত্রের আবির্ভাব, আর জীবনে সেই প্রথম সবাইকে পেছনে ফেলে আমার সামনে এসে দাঁড়ানো, যার দরুণ অকুতোভয়ে পৃথিবীর সব ভিলেন, সব খারাপ মানুষগুলোকে ঠা ঠা আওয়াজে মেরে শেষ করে দিতে থাকতাম নিমিষেই। মারতে শুরু করলে যেন আর থামি না, কিন্তু কতক্ষণ আর ওভাবে পড়ে পড়ে মিছেমিছি মরা যায়? আর যায় না বলেই ভিলেনরা উঠে দাঁড়ায়, প্রতিবাদ করে, এবং স্পষ্ট ভাষায় এতবার মরতে না পারার অসম্মতি জানিয়ে আমার-ই বন্দুক কেড়ে নিয়ে, আমাকেই মারার জন্য সদলবলে ক্ষেপে ওঠে, পুনরায় পাঠিয়ে দিত পেছনে। কিন্তু, ওদের আমি বোঝাতে পারতাম না যে, নায়ক কখনও মরে না, মরতে পারে না। অবশেষে সবাই যখন এক এক করে ছেড়ে চলে যেত আমাকে, তখন পৃথিবীর সব নায়কের লাশ পড়ে থাকত চারপাশে আর সেইসব লাশের মুখগুলো কী করে জানি হয়ে যেত অবিকল আমার মুখের মতো!

এখন মনে পড়লে সেইসব কখনও হাসি, কখনওবা নিজেকে বকা দিই, আবার কখনও কখনও আনমনেই ভিজে উঠে চোখ। আমি যে নির্বোধদের অন্যতম ছিলাম সেটা এখন মনে হলে কোনো প্রশ্ন ছাড়াই বিশ্বাস করি, বিশেষ করে ক্লাস নাইন পর্যন্ত, যা এতবছর পর চরমভাবে প্রমাণ করেছে আমার ছোট ভাই ক্লাস সিক্স থেকেই লুকিয়ে লুকিয়ে নীল ছবি দেখা শুরু করে, আর আমি নিজেও, চৌদ্দ-পনের বছর আগে সহপাঠীদের গোপন আলোচনায় ‘বাল’ বিষয়ক সেই অযাচিত প্রশ্নটা উত্থাপন করে।

এতবছর পর দেখি আমার শৈশব স্মৃতি সুখের চেয়ে পীড়া দেয় বেশি। কত ব্রিবতকর আর অসহায় সেইসব সময়, যা মনে পড়লে আজও অস্থির হয়ে ওঠি ভেতরে ভেতরে, অজানা কষ্টে ভারি হয়ে ওঠে বুক। যেমন কষ্ট বোধ হয় এতদিন পরেও, এক সন্ধ্যায় শ্যামলীকে একলা পেয়ে ওর ঠোঁটে চুমু খাওয়ায় মুখে থুতু ছুঁড়ে দেওয়াতে। যদিও তার পরের ঘটনাগুলো ভিন্ন, তবুও জীবনের প্রথম চুমু যদি থুতু অভ্যর্থিত হয়, তবে পুরুষ হিশেবে বাকি জীবন সেই থুতু মোছা দায়। এক শ্যামলীই পারত, হয়তো বা পেরেওছিল কিছুটা, কিন্তু সেই মোছাটা সম্পূর্ণ হবার আগেই সে গর্ভবতী হয়, এবং গ্রাম্য সালিশে ছদরের পিতৃত্ব স্বাচ্ছন্দ্যে স্বীকার করে সারা জীবনের জন্য ওর সেই থুতু আমার মুখেই রেখে যায়। তারপর থেকে ‘নারী’, শব্দটা ভয় পাই।

যখন পৃথিবীর ইতিহাস পড়ি, সেই শুরু থেকে, ডাইনোসর পর্যায় থেকে বির্বতনের ধারায় ক্রমান্বয়ে মানুষের আর্বিভাব দিয়ে সভ্যতার নানাবিধ অধ্যায় পার হতে গিয়ে দেখি, আমার ডাইনোসর সম্পর্কে, বানর সম্পর্কে, এমনকি নানাবিধ সরীসৃপ সম্পর্কেও ভীষণ জানতে ইচ্ছে করছে, অথচ ‘নারী’, শব্দটা মনে হলেই সেই বিজ্ঞকে বলি, ‘আপনি অলক্ষ্যেই থাকুন, দয়া করুন।’ না, দয়া তিনি করেন নি বরং উদার হয়ে দিয়েছিলেন শ্যামলী, চট্টগ্রামের সেই পতিতা আর আমার বর্তমান প্রেমিকা, যারা সবাই বরাবর আমার চেয়ে বেশি যাবতীয় বিষয়ে সম্যক জ্ঞান রাখত, এবং রেখেছে।

এতসব মনে হলেই ভাবনাগুলো কেমন জানি অসংযত হয়ে পড়ে, ঠিক যেন শ্যামলীর ওড়না। অথচ একটু গভীরভাবে ভাবলেই দেখি, ওরটা তো সংগত কারণেই অসংযত, অথচ আমারটা? না, আমার তেমন কোনো সংগত কারণ নেই, কিন্তু ও সবে যখন চৌদ্দ, তখন ওর ওড়নার অসংযত না হবার সংগত কোনো কারণই আজ আর খুঁজে পাই না, যেমন পাই না পনের’য় গর্ভবতী হওয়ায়। অথচ একটা প্রশ্ন আজও অজানা রয়ে গেছে মনে। যে শ্যামলী এক গভীর রাতে আমাকে সবার অলক্ষ্যে বিলের মধ্যে ডেকে নিয়ে, মাথায় ওড়নার ঘোমটা টেনে পায়ে সালাম করে আমাকে স্বামী বলে স্বীকার করে, সেই শ্যামলী কী করে বছর ঘুরতে না ঘুরতেই ছদরের দেয়া মাতৃত্ব মেনে নেয় সর্বসমক্ষে? যদিও ওর মা হওয়ায় আমার কোনো ক্ষোভ কখনোই ছিল না, কিন্তু পিতৃত্ব হতে আমাকে কেন বঞ্চিত করল ওভাবে? হয়তো আমার সব প্রশ্ন, সব উত্তর আমার-ই অলক্ষ্যে ঝুলে ছিল ওর অসংযমি ওড়নাতে।

তারপরও প্রশ্ন, তারপরও উত্তর আর সবশেষে জঞ্জাল! এতসব মনে হলেই দাদিকে মনে করা উত্তম, কী শীত, কী বর্ষা, প্রতিটি সকাল, প্রতিটি ভোর দাদির অক্লান্ত ঝাঁটা, যুগের পর যুগ, নিয়ম মাফিক পরিষ্কার করে চলেছে বাড়ি, বাড়ির আশপাশ, উঠোন, কলতলা থেকে শুরু করে বসবাসের যাবতীয় ময়লা, আবর্জনা। হ্যাঁ, সেই ভালো, থাক না শ্যামলীর থুতু মুখে লেগে, কী হয়েছে তাতে, আমার বর্তমান প্রেমিকা তো আছে, যে পাশে শুয়ে গাল চাটে, আর আমিও গরুর বাছুরের মতো ওর নিচে শুয়ে শুয়ে কখনও হাসি, কখনও ঘুমিয়ে পড়ি, আবার কখনও কাঁদতে থাকি, গোপনে। জানি না কার কথা বা কোন কথা মনে পড়ে আমার কান্না আসে। আমি সত্যিই জানি না, তবে শ্যামলীর জন্য যে আসে না, তা বেশ ভালো করেই জানি।


বোধহীন আমি এখনও চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছি, শ্যামলীর সেই নগ্ন শরীরের সামনে


প্রেমিকা যদিও সে নয়, তবুও বিয়ে ব্যাপারে শৈশবের অস্পষ্ট ধারণা ও অজ্ঞাত সুখকর কিছু কল্পনার বশবর্তী হয়ে বউ ওকে ভাবা যেতেই পারে, অন্তত সে রাতে, যে রাতে ও নিজেই আমাকে স্বীকার করেছিল স্বামী হিশেবে, অথচ প্রতিউত্তরে আমি তাকে একটিবারও ডাকি নি বউ বলে। কারণ অত অজ্ঞানতার মাঝেও এ আমি ততদিনে বিস্তর দেখেছি শুধুমাত্র এক কবুলের জোরে কী করে আস্ত একেকটা মেয়ে মানুষ সকলের চোখের সামনেই বউ হয়ে যায় অন্য মানুষের, যেমন করে ও নিজেও হয়েছিল পরে, ছদরের। তবে সে রাতে হয়তো ওর স্বীকারোক্তি সত্যিই ছিল, আর তাই আমাকে সব, সবকিছুই চেয়েছিল দিতে। কিন্তু, নারী থেকে কী নিতে হয় তা সেদিনও যেমন জানতাম না, তেমন আজও। শরীর, সে কি নেয়া যায়? মন, তা কি বাস্তবিক পারে কোনো নারী কাউকে দিতে? তাহলে ঠিক কী নেয়া যায়? আমার বর্তমান প্রেমিকা এইসব শুনে, খান কয়েক এক্সট্রা চুমো আমার জন্য বরাদ্দ করে, বুকের মধ্যে আরেকটু বেশি টেনে নিয়ে যা বলে তার সারমর্মে যা বুঝি তা হলো এই, ‘কিছুই নেয়া যায় না, আর সেই ‘কিছু না’-টাই নিতে হয় কায়মনে।

এসব তো পরের বা এখনকার কথা, কিন্তু সেদিন রাতে ওর নিজে থেকে আমার দিকে এগিয়ে আসা, এবং স্বামী হিশেবে আমার অবশ্য করণীয় সম্পর্কে কানে কানে ওয়াকিবহাল করে, তা পালনে উদ্বুদ্ধ করতে যখন সব পরিধেয় এক এক করে খুলে শুয়ে পড়ল বিলের মাটিতে, তখন অজানা এক ঘোরের মধ্যে ওর নগ্ন শরীরের সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে এই ভেবেছিলাম, ও তো আমার থেকে বয়সে বড় নয়, তবে এতসব জানে কী করে? প্রশ্নটা সেই রাত থেকে এখনও আমায় তাড়া করে ফেরে, আর এত বছর পর অন্তত এটুকু বুঝেছি, শরীরই যাদের একমাত্র সম্বল, তাদের শরীর সম্পর্কিত জ্ঞান না রাখলে চলে? চলে না বলেই তো রতিক্রিয়ায় সময় যখন আমার প্রেমিকা আমাকে রোজ রোজ নিত্য-নতুন ব্যাপার, কলা-কৌশল সম্পর্কে অবগত করে আর আমি বাধ্যানুগতের মতো সেইসব পালন করতে গিয়ে দেখি, বোধহীন আমি এখনও চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছি, শ্যামলীর সেই নগ্ন শরীরের সামনে, ঘুটঘুটে অন্ধকারে, সীমাহীন অজ্ঞানতা নিয়ে।

ও ডেকেছিল, আর আমিও ডাক শুনে হাঁপাতে হাঁপাতে কিছুদূর এগিয়ে যখন ওর যৌনাঙ্গে হাত রাখলাম তখন আবিষ্কার করলাম সেই গোপন রোম, যা সম্পর্কে অজ্ঞানতা বশত আমার সহাপাঠীরা আমাকে করেছিল ব্যঙ্গ, সেই সাথে করেছিল দল বহির্ভূত, এবং যা প্রায় চারমাস পর কাদের নামের অন্য এক সহপাঠী টিফিন পিরিয়ডে আমাকে পোগনে টয়লেটে নিয়ে চাক্ষুস দেখালেও, এ বিষয়ে তখন যেমন বলে নি, এমনকি পরেও, ঐ গোপন বস্তু কেবল পুরুষে নয়, নারীরও থাকে। ফলে সেদিনের সেই রাতে, ভয়ানক চমকে উঠে হাতটা সরিয়ে নিয়ে, সম্পূর্ণ আলাদা এক অবিশ্বাস্য বোধ নিয়ে ছুটে পালিয়ে এসেছিলাম ওকে ফেলে রেখেই।

অরণ্য

অরণ্য

জন্ম ১৯৮১, রাজশাহী। এইচ. আর.-এ এমবিএ। পেশা : ম্যানেজার, এইচ. আর.।

প্রকাশিত বই :
যে বেলুনগুলো রংহীন [কবিতা]
কাক সিরিজ [কবিতা]
এখন আমি নিরাপদ [ছোট গল্প]

ই-মেইল : mail.aronno@gmail.com
অরণ্য