হোম গদ্য বোধনের ডায়েরি : লাল-বউ নাকি জাদু

বোধনের ডায়েরি : লাল-বউ নাকি জাদু

বোধনের ডায়েরি : লাল-বউ নাকি জাদু
517
0

ছোটবেলা থেকেই আমার বাপটা থেকেও ছিল না, আর ছোট যে ভাইটা মায়ের পেট থেকে বেরিয়ে এল দশ বছর পর, সে বড় হবার আগেই আমার মাথার বেশিরভাগ চুল সত্যি সত্যিই পেকে গেল। মাঝে মাঝে নিজের আবর্জনাভর্তি মাথাটা পরিষ্কার করব বলে যেই মায়ের কোলের মধ্যে ডুবিয়ে দিই, অমনি কে যেন হেসে ওঠে খিলখিলিয়ে! অস্থির হয়ে উঠি, কিন্তু মা খুব আলতো করে একটানা বুলিয়ে যেতে থাকে হাত। জাদুতে আমার বিশ্বাস-অবিশ্বাসের নড়বড়ে অবস্থান স্থির হয়, আর চুলগুলো অলৌকিক স্পর্শ পেয়ে ধীরে ধীরে যেমন তাদের পূর্ব রঙ ফিরে পেতে শুরু করে, তেমনি আমিও এক দৌড়ে কুড়ি বছর পেছনে এসে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকি আকাশের দিকে মুখ করে। ঘুটঘুটে অন্ধকারে! সত্যি বলতে আকাশ নয়, বরং আমার চোখ থেমে থাকত বাড়ির পাশের মায়াবী তালগাছে, লাল-বউ থাকত যেখানে। ঘুম ভেঙে নিজের ন’বছরের সন্তানকে বিছানায় না পেয়ে মা যত জোরেই ডাকুক বা কাঁদুক না কেন, আমার কি আর কান থাকত? সন্ধ্যা এল, এল ঘুম, এবং লাল-বউ, সন্তর্পনে; কানের কাছে মুখ নিয়ে কত সোহাগেই না ডাকল, তারপর উড়ে গিয়ে বসল তালগাছে। যত ছোটই হই না কেন, আমার না গিয়ে উপায় ছিল?

লাল-বউ অতসব বুঝত না, এমনকি ওর মায়া-মমতাও ছিল কম। না হলে ঐটুকুন ছেলেকে রোজ রাতে কিভাবে পারত সে ডাকতে, যখন সে জানত, ও ডাকলেই আমি আসব। এভাবেই চলল ডাকাডাকি, উড়ে যাওয়া, মাঝরাতে তালগাছের নিচে আকাশমুখো হয়ে থাকা, এবং মায়ের কাঁদতে কাঁদতে কোলে করে আমাকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনা, কয়েক বছর। তারপর একদিন সকালে উঠে দেখি লাল-বউ আমাকে ডাকে নি! এরপর কখনোই সে ডাকল না আর! আজ কুড়ি বছর সে আমাকে আর ডাকে না। কোথায় যে চলে গেল আমার টুকটুকে লাল শাড়ি পরা বউ-টা, যে কানের কাছে মুখ নিয়ে ডেকে হাসতে হাসতে উড়ে যেত তালগাছের মাথায়, আর মনের আনন্দে পান সাজিয়ে খেতে খেতে মুচকি হাসত আমার দিকে তাকিয়ে। আমি ওর সেই মায়াবী হাসি তখনও যেমন দেখতে পেতাম, তেমনি পাই এখনও, কিন্তু কখনও দেখি নি ওর ঠোঁটের ফাঁক গলিয়ে একফোঁটাও লাল রঙ বেরিয়ে এসেছে।


জেগে জেগে হাসতে পারি না বলেই তো সেই থেকে আজ এতটা বছর আমি ঘুম খুঁজে মরছি। প্রগাঢ় একটা ঘুম, যেখানে আমিই শুধু হাসব, অথচ কেউ দেখবে না, কেউ না।


আর আসবেই বা কেন? ও তো ছিল মাথা থেকে পা পর্যন্ত লাল। হয়তো আমার সরল রক্তের অগুনতি কণা হতে ওর অমন জাদুময়ী রূপান্তর ঘটেছিল। তাছাড়া ও যে জানত আমি বিছানায় পেচ্ছাব করি। শুধু এটা জানত না যে, ও ছেড়ে যাবার পরও আমি দেদারসে ভিজিয়েছি বিছানা, কী শীত, কী খরা, আর মা ঘাটে সেইসব দুর্গন্ধযুক্ত কাঁথা, চাদর ধুতে ধুতে নীরবে শুনে গেছে পাশের বাড়ির মুখরা রমণীর অকাতর আন্তরিকতা, ‘ও বউ, তুমার বেটার নুনুত রাতে দড়ি বাঁনধ্যি রাখতে পারো না’? লাল বউ এসবের কিছুই জানত না। জানত না এও, কিরকম ভয়ে আমি সিটকে থাকতাম রাতে ঘুম ভেঙে গেলে, আর বিছানাটাকে মনে হতো বিশাল ধূধূ মাঠ। যদিও আমি ওকেই বলতাম সবকিছু, তবুও সে বুঝত না, খালি হাসত আর একের পর এক পান মুখে পুরে মুচকি হেসে চেয়ে থাকত আমার মুখের দিকে। তবুও আমি ওর কাছেই ছুটে যেতাম, নতুন হাফপ্যান্ট পেলে, কিংবা দামি ম্যাচের খোল অথবা চকচকে মার্বেল নিয়ে। শুধু কী তাই, যেদিন যেদিন প্যান্ট ছিঁড়ে যেত বা ফাটিয়ে ফেলতাম, সেদিনও তো তালগাছটার কাছে গিয়ে মনে মনে ওকেই বলে আসতাম, ‘জানো বউ, আমার প্যান্টটা না ছিঁড়ে গেছে, দেখ মা আমাকে আজ অনেক মারবে। আমার যে খুব ব্যথা লাগে।’ সে শুনত কী না জানি না, তবে আমি আমার সব কথাই ওকে বলতাম খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে। আসলে আমি যে প্যান্টের চেয়ে তালি বেশি পরেছি সেটা ও বুঝেছিল, আর তাই যখন সবকিছু ডুবে যেত অন্ধকারে, কেবল তখনই সে ডাকত আমাকে। সারাদিনের ক্লান্ত আমি যত গভীরেই ঢুকে যাই না কেন বিছানার, ও ডাকামাত্রই ছুটে যেতাম মন্ত্রমুগ্ধের মতো, যেন-বা ও ডাকবে বলেই আমি ওভাবে ঘুমিয়েছি অপার্থিব অন্ধকারে!

মা আমার পশুর মতো মারলে কী হবে, পরে ঘরের দরজা বন্ধ করে একলা একলা কাঁদত আর রাতে খেত না। কোনো কোনো দিন আমি বুঝতে পারলে, গলা জড়িয়ে ঝুল পেড়ে অথবা মুখের সাথে মুখ ঘষে রাজি করাতাম ঠিকই, কিন্তু যেই ও ডাকত অমনি ছুটতাম তালগাছ মুখে। কত রাত এমন হয়েছে, আমি ছুটছি সামনে আর মা ভেজা চোখে হ্যারিকেন হাতে পেছনে। সেই লাল-বউ আমাকে না জানিয়েই চলে গেল, আর আমি রাতের পর রাত বিছানা ভিজিয়ে চললাম পরের আরও কয়েকটা বছর। লাল-বউ যেমন হাসত, তেমনি বাকিরাও। আমার হাফপ্যান্টের পেছনটা যতদিন পর্যন্ত না সম্পূর্ণ তালিহীন হয়ে উঠল, ততদিন পর্যন্ত তারা হাসল অকাতরে। এরপর সময় এল আমার হেসে উঠার, কিন্তু ততদিনে তো আমার ঘুম হারিয়ে গেছে। জেগে জেগে হাসতে পারি না বলেই তো সেই থেকে আজ এতটা বছর আমি ঘুম খুঁজে মরছি। প্রগাঢ় একটা ঘুম, যেখানে আমিই শুধু হাসব, অথচ কেউ দেখবে না, কেউ না।

জানি মা-ই একমাত্র যে আমাকে পারে ঠিকঠাক পড়তে, শুধু কী তাই, আমার জীবনের সবগুলো অনুচ্ছেদ, লাইন, এমনকি প্রতিটি শব্দ তিনি খুব সহজেই মুখস্থ বলে দিতে পারতেন। মায়ের কোমল হাত আমাকে আরও খানিকটা পরিচ্ছন্ন করে তোলে আর আমি রাতের অন্ধকার ছেড়ে বেরিয়ে আসি ঝকঝকে বিকেলের আলোয়, হাটের পথে, পকেটে ব্যাগ গুজে। সারের বস্তা দিয়ে বানানো ব্যাগ, যত ভাঁজেই রাখি না কেন, প্যান্টের সামনের দিকটা উঁচু হয়ে থাকে বেঢপভাবে। মাঝে মাঝে হাত দিয়ে চেপে দিই পকেট আর মনের আনন্দে হাঁটতে থাকি এভাবে, যেন কোনো রাজপুত্র চলেছে রাজ্য জয় করতে, পকেটে রয়েছে তালিকা, কোন কোন রাজ্য জয় করতে হবে। মা জানত ঠিকই, যে তার রাজপুত্র কোনো রাজ্য জয় না করেই ফিরবে, তবু সাথে করে আনতে ভুলবে না গুড়ের মোয়া অথবা চিনির গজা। সত্যি বলতে কিসের রাজ্য, কিসের জয়, আমি তো চলেছি মোয়া আর গজার লোলুপ দেশে। যতই এগিয়ে যাই ততই প্রাণটা আনন্দে নেচে ওঠে। আমার উদ্দাম ক্রমশ বেড়েই চলে। নিজের খুশিভাব লুকাতে না পেরে জনসাধারণকে কখনও কখনও জানিয়েও দিতাম, কোন মহান উদ্দেশে আমার এই উৎফুল্ল যাত্রা। কেউ কেউ হাসত, কেউ বা আবার তুলে নিত সাইকেল অথবা ভ্যানে, আর হাটের স্বপ্নে বিভোর আমি অজান্তেই ভালোবেসে ফেলি সপ্তাহের দুটো মাত্র দিনকে, শনি ও মঙ্গলবার। কে আর তখন বলে দেবে, অমঙ্গলকে অমন পাগলের মতো ভালোবাসতে নেই। শনি বলয়ের যে হৃদয়গ্রাহী মোহনীয়তা, কেবল গ্যালাক্সিই পারে তা ধারণ করতে।


লোকজনের স্বতঃস্ফূর্ত সমাবেশ আমাকে প্রায়শই টানত আর হাটে এসে অগুনতি লোকের ভীড়, চাপাচাপি, ঠেলাঠেলি ও পাশ গলিয়ে যখন এ মাথা থেকে ও মাথা অবদি ঘুরতাম উদ্ভ্রান্তের মতো, তখন দারুণ লাগত। মনে হতো, সত্যি সত্যিই এ আমার রাজ্য।


তাছাড়া আমি জানবই বা কী করে অতসব। ততদিন পর্যন্ত তো হাট মানে আমি এই জেনেছি, মাস দু’মাসে বাপ-চাচার সাথে সাইকেলের সামনে একপ্রস্থ আড়াআড়ি রডে বসে পাছা ব্যথা করে হাটে গিয়ে নাপিতের একটুকরো ইটের উপর নিজের সমস্ত সহনশীলতা জড়ো করে চোখ-মুখ বুজে পাথরের মূর্তির মতো অনড় বসে থাকা, যাতে এই বোধ কখনও থাকত না যে আমি রাজপুত্র, বরং পনের-বিশ মিনিট পর নাপিত বাবাজি আমার সামনেই জন্মদাতা অথবা চাচার কাছে আমার প্রশংসাপত্র দাখিল করত এভাবে, ‘না, লক্ষ্মী ছেলে, একটুও নড়ে নি’, তাতেই উৎফুল্ল হয়ে উঠে সবকিছু ভুলে গোলাকার পাটওয়ালা সন্দেশের একপাট খুব সাবধানে আলগা করে মুখে ঢুকিয়ে, আরেকপাট হাতে রেখে চিরতরে ভুলে যেতাম নাপিতের যথেচ্ছ কান ধরে টানা, ঘাড় কখনও উপরে, কখনও বা নিচে, আবার কখনও সম্পূর্ণ অস্বস্তিকর অবস্থানে নিয়ে স্থির থাকতে বলার কর্কশ হুকুম আর একটু নড়লেই চাটিসমেত ভর্ৎসনা হজম। হয়তো হজম করার প্রকৃত বয়স ছিল সেটাই, শুধু এই পৃথিবী কেন, পুরো মহাবিশ্বটাই হজম করে ফেলা যেত নিমেষেই।

সেই একই হাটে এবার আমি চলতে থাকি রাজপুত্রের মতো, যেন সেটা আমার রাজ্য আর আমি চলেছি প্রজাদের বিশাল সমাবেশে। হাটের কাছেই ছিল স্কুল। শনি ও মঙ্গলবার স্কুলে যাবার সময় টুক করে সহপাঠীদের ছেড়ে আমি গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতাম খাঁ-খাঁ করা হাটের চারটে বাঁশের খুটির উপর মাথা উঁচিয়ে ঘুমিয়ে থাকা সেইসব সারি সারি খড়ে ছাওয়া চারচালার সামনে। মনে হতো ওরা যেন অঘোরে ঘুমোচ্ছে, তাই শব্দ করতাম না, এবং ওদের জেগে ওঠা দেখার জন্য সেখানেই বসে থাকতে ইচ্ছে হতো বিকেল পর্যন্ত। কিন্তু থাকা হতো না, ফলে কোথা থেকে অবুঝ হাহাকার জেগে উঠত, আবার পরক্ষণেই যেত মিলিয়ে। লোকজনের স্বতঃস্ফূর্ত সমাবেশ আমাকে প্রায়শই টানত আর হাটে এসে অগুনতি লোকের ভীড়, চাপাচাপি, ঠেলাঠেলি ও পাশ গলিয়ে যখন এ মাথা থেকে ও মাথা অবদি ঘুরতাম উদ্ভ্রান্তের মতো, তখন দারুণ লাগত। মনে হতো, সত্যি সত্যিই এ আমার রাজ্য। নিজেকে বেশ বড় মনে হতো আর নানাবিধ খাপছাড়া ভাবনায় আপ্লুত হতে হতে, হাতে ধরে থাকা তালিকার কোনো না কোনো একটা চোখ এড়িয়ে যেত, কিংবা কখনও কখনও পুরো তালিকাটায় ভেলকিবাজিতে হয়ে যেত গায়েব। তারপরও মা আমাকেই পাঠাত, পাঠাতে বাধ্য হতো। বাপটা তো থেকেও নেই আজ দশ বছর আর ছোটভাইটা, সেও ঠিকঠাক হাঁটা শিখতে লাগিয়ে দেবে আরও আট-দশ বছর।

এমনই কোনো দিনে হাটে ঢোকার মুখে লক্ষ করি একটা খোলা জায়গায় বৃত্তাকার হয়ে এক দঙ্গল মানুষ দাঁড়িয়ে আছে। কৌতুহল আমার কখনোই পাছ ছাড়ে নি, সুতরাং এগিয়ে গেলাম, এবং উঁচু উঁচু লোকগুলোর পাছার কাছাকাছি মুখ নিয়ে একজনকে ঠেলে প্রথম যে দৃশ্য চোখে পড়ল, তা হলো, একটা লোক বেশ বড়সড় ছোরা হাতে বৃত্তের মাঝখানে দাঁড়িয়ে চিল্লায়ে চিল্লায়ে কী সব জানি বলছে আর একটা সাত-আট বছরের ছেলে কাছেই মাটিতে বসে মিটমিট করে লোকটার হাতে ধরা ছোরাটার দিকে তাকিয়ে আছে। লোকটা অনেকক্ষণ ধরে আগের মতোই চিল্লায়ে গেল আর মাঝে মাঝে তার করা দু’একটা প্রশ্নের জবাব অদূরে বসা ছেলেছি যত জোরে সম্ভব দিয়ে গেল। লোকটা চিল্লানোর সাথে সাথে জনসাধারণকে এ বলেও সাবধান করে দিল, যেন তারা কোনোভাবেই হাতের মুঠ বন্ধ না করে, কিংবা যে যেখানে আছে সেখান থেকে একধাপও না নড়ে। যা শোনামাত্রই গোপনে আমি কয়েকবার হাতের মুঠ বন্ধ করলাম, এবং পূর্বের অবস্থান থেকে নড়ে আরও খানিকটা এগিয়ে গেলাম। তখনও বুঝতে পারি নি কী ঘটতে যাচ্ছে, ফলে যখন ছেলেটির দু’হাত পেছনে বেঁধে মাটিয়ে কাত করে শুইয়ে, বড় লাল রঙের কাপড় দিয়ে তাকে পুরোপুরি ঢেকে দিল, তখনও আমি মনে মনে হাসছি আর মজা পাচ্ছি। একসময় লোকটি হাটুমুড়ে বসল, এবং ছোরাসমেত হাতটা চাদরের নিচে ঢুকিয়ে কয়েকবার সামনে পেছনে করতেই কাপড়ের ভেতর থেকে প্রচণ্ড আর্তনাদ বেরিয়ে এল।


আমি আমার জীবনের সমস্ত বিস্ময় আর ভয় জড়ো করে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে, অপলক দেখতে থাকলাম ছেলেটার পেটে এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে গেঁথে থাকা রক্তাক্ত ছুরিটা। আশেপাশেও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়েছে টকটকে লাল রক্ত…


তখনও চাদর উঠে নি আর যখন উঠল তখন আমি আমার জীবনের সমস্ত বিস্ময় আর ভয় জড়ো করে পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে, অপলক দেখতে থাকলাম ছেলেটার পেটে এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে গেঁথে থাকা রক্তাক্ত ছুরিটা। আশেপাশেও ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়েছে টকটকে লাল রক্ত আর ছেলেটি তার মধ্যে পড়ে থেকে মাগো-বাবোগো বলে কাটাগরুর মতো কাতরাচ্ছে! লোকটি ততক্ষণে উঠে দাঁড়িয়েছে আর আগের চেয়েও দৃঢ় ও উচ্চস্বরে জনগণকে সাবধান করে চলেছে, খবরদার আপনারা কেউ হাতের মুঠ বন্ধ করবেন না, কিংবা জায়গা থেকে এক পা-ও নড়বেন না। আমি নড়ি নি, সত্যিই নড়ি নি একচুলও, এবং ততক্ষণ পর্যন্ত বোবা মূর্তির মতো দাঁড়িয়েছিলাম যতক্ষণ না ছেলেটি কাতরাতে কাতরাতে একসময় নেতিয়ে পড়ল, এবং আগেকার সেই লাল কাপড় তার স্থির হয়ে আসা শরীরের ওপর নেমে এল। এরপর আর মনে নেই। শুধু মনে আছে, যখন হাট থেকে ফিরছিলাম, তখন সেই ছেলেটি সেখানেই বসে, যেখানে তার পেটে ছোরা ঢুকিয়ে দেয়া হয়েছিল, খুব মনোযোগ আর তৃপ্তি সহকারে চিনির গজা একটার পর একটা মুখে পুরছিল। আমি ওর দিকে এগিয়ে গেলাম, এবং ওর পেটের সেই অংশটা ভালো করে দেখতে চাইলাম, যেখান দিয়ে একটা বড় ছোরা ওকে এফোঁড়-ওফোঁড় করে বেরিয়েছিল। যদিও ও বসেছিল আমার দিকে পেছন ফিরে। তাই সামনের দিকে ধীরে পায়ে এগিয়ে যেতে যেতে, দরগা থেকে এনে দেওয়া মায়ের মানত করা তাবিজের রক্ষাকবচ ভেঙে আচমকা ঢুকে পড়লাম নতুন জাদুময় এক জগতে, যেখানে নির্মম ক্ষতরাও দ্রুত মিলিয়ে যায় অলৌকিক নিয়মে।

অরণ্য

অরণ্য

জন্ম ১৯৮১, রাজশাহী। এইচ. আর.-এ এমবিএ। পেশা : ম্যানেজার, এইচ. আর.।

প্রকাশিত বই :
যে বেলুনগুলো রংহীন [কবিতা]
কাক সিরিজ [কবিতা]
এখন আমি নিরাপদ [ছোট গল্প]

ই-মেইল : mail.aronno@gmail.com
অরণ্য