হোম গদ্য বোধনের ডায়েরি—জেগে থাকা কিংবা পাখির জন্য নীরবতা

বোধনের ডায়েরি—জেগে থাকা কিংবা পাখির জন্য নীরবতা

বোধনের ডায়েরি—জেগে থাকা কিংবা পাখির জন্য নীরবতা
363
0

ক’মাস ধরেই দেখছি পেচ্ছাবের রঙ হলুদ! ব্যাপারটা ভালো বুঝতে পারছি এজন্য যে, আমার ঘরে প্লাস্টিকের একটা মগ আছে, যেটা সময় মতো দুই ঊরুর সামনে তুলে ধরে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকি এবং ঘরের মধ্যেই রেখে দিই। এই তুলে ধরার ঘটনাটা দিনে দুই থেকে তিনবার ঘটলেও, রেখে দেওয়ার ব্যাপারটা চলে কয়েকদিন পর্যন্ত। বেশি পানি খাই, ফলে বারবার টয়লেট যাবার ঝামেলা পোহাতে পারি না। পারি না আরও অনেক কিছুই, কিন্তু ‘এই’ না পারাটার জন্য বিশ টাকা দামের একটা মগই যখন যথেষ্ট, তখন কেন আর মাথা ব্যথা। আমি ছাড়া কে আর এসে থাকছে এ ঘরে যে আমাকে অত ভাবতে হবে? ফলে নির্ঝঞ্ঝাটেই ঘটে মগের তুলে ধরা ও রেখে দেওয়া, এবং এই প্রক্রিয়ার পুনরাবৃত্তি ও ক্রমশ নির্বিকার হয়ে উঠার ফলেই বুঝতে পারি যে, আমার পেচ্ছাবের রঙ হলুদ, যা প্রথম দু’একদিন হালকা রঙের থাকলেও পরের দিকে গাঢ় হয়, যা কখনও কখনও বেশ ভালোভাবেই আমার মনোযোগ আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়। প্রথম দিকে ভেবেছিলাম ডাক্তারকে দু’তিনশ’ দিয়ে জেনে নিই, কিন্তু পরে মগের ভেতরে স্থির হয়ে থাকা কয়েকদিনের গাঢ় হলুদ রঙের প্রতি তীব্র ভালোলাগা ও মায়া জন্মাতেই মনে হলো, ‘থাক না, নিজের শরীর থেকে বের হওয়া রঙ, কেন বদলাব’?

কিন্তু, আমি বদলাতে না চাইলেও শরীর নিজে নিজেই বদলে ফেলে, এবং যেদিন মগের ভেতর হলুদের পরিবর্তে দেখি সাদা রঙ, সেদিন হতাশ হই! আশঙ্কা হয়, তবে কি কাল থেকে কেউ আর আমাকে ডাক্তারের কথা শোনাবে না? দিন বা রাতের কোনো না কোনো সময় মা হঠাৎ ডুকরে উঠে আর কাঁদবে না? কিংবা তানিয়া, মাঝে মধ্যে প্রচণ্ড রাগে বেপরোয়া হয়ে মাথার চুল মুঠো করে ধরে আপ্রাণ ঝাঁকুনি দিতে দিতে ক্লান্ত হয়ে গেলে, মাথাটা বুকের মধ্যে চেপে ধরে কি একনাগাড়ে ফোঁপাবে না? সাদা তরল ভর্তি মগটা সামনে নিয়ে বসে এসব ভাবি, আর ভাবনার মধ্যেই নিজেকে প্রশ্ন করতে থাকি, একটানা।


তানিয়া বা অন্যান্য কারও দু’একফোঁটা পেচ্ছাব পাকস্থলীতে গেলেও যেতে পারে, কারণ আমি দেখেছি, যৌনাঙ্গ ও জিভ কাছাকাছি হলে খুব কম মানুষই নির্ভুল ডায়েরি লিখতে পারে।


আমার কি উচিত বাইরে থেকে ঘুরে আসা? বেশি দূরে না হোক কাছে-পিঠেই, এই যেমন পাবনা, রংপুর, কিংবা মহাস্থানগড়। নিদেনপক্ষে, নাটোরের রাজবাড়ি অথবা রাজশাহীর জাদুঘর। তাও যদি না হয়, পদ্মার পাড়ও কি ঘুরে আসা যায় না কোনোভাবে? যখন যে নাম মনে আসে তখন সেখানে যাবার জন্যই নিজেকে প্রশ্ন করি, আর মন সমস্ত অথর্বতা সমেত একভাবে মগের সাদা তরলে স্থির থাকতে থাকতে পৃথিবী ছেড়ে উঠে যায় মহাশূন্যে। চাঁদের মাটি কত করে বিঘে? মঙ্গলে পানির লিটার কত হতে পারে? বুধ থেকে প্লুটোতে যেতে ক’দিন লাগবে? শনির বলয়টা হঠাৎ ভেঙে গেলে কিভাবে সেটা জোড়া লাগানো যাবে? ক’টা পারমাণবিক বোমা দিয়ে উড়িয়ে দেওয়া যাবে এই মহাবিশ্ব? কিংবা একটা অত্যাধুনিক রকেটে চড়ে অজানা কোনো গ্রহে পালালে আমাকে কি কেউ আর খুঁজে পাবে? এসব বহুবিধ প্রশ্ন থেকে কোনো একটা সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে না পেরে রাগ হয়, আর তখন সব প্রশ্ন ছেড়ে সামনে রাখা সাদা তরল হলুদ নয় কেন, এই প্রশ্নটা উত্তরহীন রেখে দেওয়ার জন্য, মগটা মুখের কাছে তুলে ধরতে ইচ্ছে হয়, আর  সেই ইচ্ছেটা ততক্ষণ পর্যন্ত ধুম মেরে বসে থাকে যতক্ষণ পর্যন্ত না সাদা তরল হলুদ, গাঢ় হলুদে গিয়ে ঠেকে। না, পেচ্ছাব আমি পান করি নি, না নিজের না অন্যের। তবে অজান্তে ও উত্তেজনায় তানিয়া বা অন্যান্য কারও দু’একফোঁটা পেচ্ছাব পাকস্থলীতে গেলেও যেতে পারে, কারণ আমি দেখেছি, যৌনাঙ্গ ও জিভ কাছাকাছি হলে খুব কম মানুষই নির্ভুল ডায়েরি লিখতে পারে।

আমি জানি, আমি সুস্থ। তবুও আমাকে ওষুধ খেতে হয়। কী জন্য যে খেতে হয়, তা কেউ বলে নি, আর আমিও জানতে চাই নি, কারণ লক্ষ্য করেছি অন্তত ওষুধ খাবার সময় আমার চিন্তা-ভাবনা বদলে যায়, এবং আমি যে অসুস্থ—এমন ভাবনার মধ্যে কিছুক্ষণের জন্য হলেও ডুবে থাকা যায়। তখন, ওষুধ খেতেও ভালো লাগে, ফলে নিরাময় ব্যাপারটা শেষ অব্দি এড়িয়ে যেতে পারি না আর এবং এই না পারাটা আমাকে দীর্ঘকালীন অস্বস্তির দিকে ঠেলে দেয়। তখন আমার ঘুম আসে! স্বপ্ন দেখি, বেগুনি রঙের স্বপ্ন। বেগুনি রঙের সবকিছু। বেগুনি রঙের ছোট ছোট শিশু, বেগুনি রঙের আকাশে ঘুড়ি হয়ে উড়ছে আর তাদের বুকে বাঁধা বেগুনি রঙের সুতা, মাটির দিকে নেমে জড়িয়ে যাচ্ছে বেগুনি রঙের বাঁশঝাড়ে। হঠাৎ একটা কিছু, একটা লাফ দিয়ে পড়ে সামনে! ঘুম ভেঙে যায়, বিছানায় উঠে বসি! অনেকক্ষণ চোখ খুলতে পারি না! খুললেও দেখতে পাই না কিছুই, কারণ চোখের ভেতরে তখনও পড়ে থাকে গাঢ় বেগুনি রঙ!

আজকাল অনেকেই আশেপাশে ফিসফাস করে। ওদের সব কথা শুনতে না পেলেও, অভিব্যক্তি দেখে স্পষ্ট বুঝতে পারি, ওরা আমাকে ভয় পাচ্ছে। এই ব্যাপারটা বুঝতে পারার পর থেকেই আমি রোজ কয়েকবার আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াই। দাঁড়িয়েই থাকি, একভাবে। এক সময় আয়নার ভেতরে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটির মুখ ছুঁয়ে দেখার জন্য হাত বাড়াই। আমার হাত ডুবে যায় আয়নার কাচে আর হাতের সাথে লেপ্টে যায় বেগুনি রঙের কোনো শিশুর মুখ। আমি হাত সরাতে পারি না। দাঁড়িয়েই থাকি। আয়না ক্রমশ আমাকে ভেতরের দিকে টানে, টানতে টানতে এক সময় সম্পূর্ণরূপে ভেতরে টেনে নেয়, আর তখন দেখি, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে সেই বেগুনি রঙের শিশুটি, যে তার কচি হাত আমার মুখের দিকে বাড়িয়ে ধরেছে, অথচ কিছুতেই ছুঁতে পারছে না আমাকে। আমার অস্বস্তি হয় এবং অপরিসীম মায়াসহ নিজের মুখটা ওর কচি হাতের দিকে এগিয়ে আনার চেষ্টা করি, কিন্তু ব্যর্থ হই, কেননা আয়না আমাকে এমনভাবে জাপটে ধরে রাখে যে, আমার বিন্দুমাত্র নড়া-চড়ার ক্ষমতা থাকে না। আমার অসহায়, স্থবির মুখের দিকে বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে থাকতে থাকতে শিশুটি একসময় প্রচণ্ড শব্দে হেসে ওঠে আর আয়নার কাচ টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে যায়!

এক সকালে দেখি বাড়ির সবাই ব্যস্ত। আমাকে কেউ কিছু বলছে না, কিন্তু আমি বুঝতে পারছি ওরা আমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবে আজ। মনে মনে বললাম, যাক-না নিয়ে, তাতে কি, আমি তো এখনও মনে করতে পারি কেটু সিগারেটের প্যাকেটের কথা। প্লাস্টিকের স্ট্রর ভেতরে ভরা চারআনা দামের বিলেতি দুধের কথা। কিংবা সেই কাঠের বন্দুক ও সারাদিন ধরে বাবুই, শালিক শিকারের কথা কিংবা মুখ দিয়ে লাগাতার বেরিয়ে আসা ঢিস্যিইয়া, ঢিস্যিইয়া শব্দের কথা। এমনকি মনে করতে পারি এও, ছোট ভাইটির জলে ডুবে যাবার কথা, এক পেট জল নিয়ে মাথাটা পানির নিচে রেখে জলের উপরে ফুটবলের মতো ভেসে থাকা। অথবা সুফিয়ার কথা, যার সাথে কোনো এক দুপুরে খড়ের গাদায় বানানো ঘরে ঘণ্টা খানেকের জন্য পাতা সংসারের কথা, কিংবা কোনো কোনো সকালে গেরস্থের মঙ্গলের জন্য লাল সিঁদুরে মাখানো ছোট্ট মূর্তি নিয়ে গোয়াল ঘরের সামনে বসে জুগির কীর্তনের কথা। জুগি চাপা স্বরে একটানা কীর্তন করে, তারপর মূর্তির শরীর থেকে সিঁদুর নিয়ে গোয়ালের চালে ফোঁটা এঁকে দেয়, বিনিময়ে ধামা ভর্তি চাল বা গম নিয়ে রাখে চটের বস্তায়, আর আমি অপলক তাকিয়ে থাকি লাল দগদগে ঘা-এর মতো সিঁদুরে ডোবানো মূর্তিটার দিকে। কিসের যে মূর্তি সেটা আর তাকে দিয়ে কিভাবে গেরস্থের মঙ্গল হয়—এই প্রশ্ন থেকে বেরুবার আগেই জুগি যেমন করে এসেছিল, ঠিক তেমন করেই ভার কাঁধে চলে যায়। আমি দাঁড়িয়ে থাকি, দাঁড়িয়েই থাকি। এক সময় গোয়ালের চালে সদ্য এঁকে দেওয়া ফোঁটাগুলোর দিকে চোখ যায়। আচমকা গা গুলিয়ে ওঠে এবং পেট চেপে বসে পড়ি বাড়ির পাশের পেয়ারা গাছ তলায়। কেউ দেখে না, কেউ লক্ষ্য করে না, আর ওভাবেই সারা সকাল খালি পেটে ঘুরতে ঘুরতে এক সময় টের পাই, রাগ বাড়ছে এবং সেটা ক্রমশ বাড়তে বাড়তে আমাকে জাপটে ধরে প্রবল। অসহায় আমি ছটফট করি, অস্থির হয়ে ছুটে বেড়াই বিলের মধ্যে, পুকুর পাড়ে, বাঁশের ঝাড়ে কিংবা আম বাগানে। আমার মনে হয়, শীঘ্রই কান ফোঁড়ানো দরকার। মায়েরও হয়তো মনে হয়, মনে হয় দাদিরও। একদিন আবারও জুগি আসে, কীর্তন করে, মঙ্গল তিলক এঁকে ধামা ভরে গম নিয়ে যায়, আর রেখে যায় তার সিঁদুরে ল্যাপটানো মূর্তির ঘরের একটুকরো তার, যা দিয়ে সত্যি সত্যিই ঘটা করে আমার কান ফোঁড়ানো হয়।


সকালে সবার আগে আমিই দেখলাম ল্যাংড়া আম গাছে ঝুলে থাকা জীবনের প্রথম মৃতদেহ, নগ্ন ও বীভৎস।


ডাক্তার আমাকে দেখে, খুব ভালো করেই দেখে এবং প্রথম প্রশ্ন করে, বয়স কত? আমি চমকে উঠি, ডাক্তারের চোখের দিকে তাকাই, তানিয়া বা মা দু’জনকেই খুঁজি, অথচ ওরা আমাকে রেখে গেছে একা। যদিও কান ফোঁড়ানোর পর আমার রাগ সত্যি সত্যিই কমে গেছে, তবু যেটুকু রয়ে গেছে, তা দিয়েই ওদের দিকে ছুঁড়ে দিই ক্রোধ, কিন্তু আমার প্রকাশ ঠিকঠাক হয় না! ডাক্তার পুনরায় জিজ্ঞেস করে, বয়সের কথা। আমার মনে হলো আমি জানি আমার বয়স কত, কিন্তু ত্রিশ বলতে যাবার আগেই মনে হলো, সত্যিই কি আমার বয়স ত্রিশ? আমি কি সত্যিই জানি আমার বয়স কত? এই যে আমি মনে করছি আমার বয়স ত্রিশ, সেটা কি বাস্তবিক আমার বয়স, নাকি অন্য কারও বয়স এভাবে এতটা বছর নিজের বলে জেনে এসেছি। তাহলে আমার সত্যিকার বয়স কত? সাত কি, যখন ফুফু গলায় দড়ি দিল আর সকালে সবার আগে আমিই দেখলাম ল্যাংড়া আম গাছে ঝুলে থাকা জীবনের প্রথম মৃতদেহ, নগ্ন ও বীভৎস। কিংবা আট, শ্রীপুরের বিলে সাত সকালে দৌড়াতে দৌড়াতে আচমকা দাঁড়িয়ে পড়লাম শিলুর ক্ষত-বিক্ষত কাদা-মাখা লাশের সামনে। দশও তো হতে পারে, জীবনে প্রথমবার যখন বিড়ির পরিবর্তে মিষ্টি কুমড়ার শুকনো ডালে আগুন ধরিয়ে জোরে টান দিয়ে খক খক কেশেছি। ছোট ভাইটা পানিতে ডুবেছিল যখন, তখন এগারো, সুতরাং এগারোও হতে পারে। এভাবে বারো, তেরো, চৌদ্দ, পনেরো—কোনটা বাদ দিই? আমার বয়স সত্যিই কত আমি বলতে পারি না দেখে ডাক্তার প্রসঙ্গ বদলায়।

ডাক্তার প্রশ্ন করতে থাকে আর আমি চুপচাপ দেখতে থাকি উনার মুখ। খুব চকচকে মুখ, অনেকটা বদি দাদার মতো। মোটা মানুষ ছিল, সারাক্ষণ খালি গায়ে থাকতেন আর মুখের মধ্যে দাঁতে চিবিয়ে ধরে রাখতেন গামছার কোনা। তোতলিয়ে কথা বলতেন আর গোসল করতে নামলে মোষের মতো চুপচাপ সারা শরীর ডুবিয়ে শুধু মাথাটা বের করে রাখতেন পানির উপরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। আমার কেন জানি উনাকে ভালো লাগত। সেই উনিও তো মারা গেলেন পনেরোতে। সবাই গেল উনার লাশ দেখতে, কেবল আমি গেলাম না। মাঝরাত পর্যন্ত নারী-পুরুষের কান্না আমাকে অতিষ্ট করে রাখল আর আমার নিজের ঘরের মধ্যে বসে বসে নিজের ক্রোধ সহ্য করতে না পেরে জুগির তার ছাড়াই লেপ সেলাইয়ের সুঁই দিয়ে ফুঁড়িয়ে দিলাম আরেক কান।

কতক্ষণ হয়ে গেছে জানি না। হঠাৎ খেয়াল হতে দেখি পাশে মা ও তানিয়া দু’পাশে দাঁড়িয়ে, আর ডাক্তার আমার কাঁধ ধরে ঝাঁকি দিয়ে চলেছেন। ওদের সবার মুখেই এক ধরনের আতঙ্ক। আমার হাসি পেল এবং হেসেও দিলাম। তারপর মাকে বললাম, ‘মা ডাক্তার আমাকে জিজ্ঞেস করল, আমার বয়স কত, তুমি কি জানো আমার বয়স কত’? মা এতক্ষণ দূরে ছিল। প্রথমে তানিয়া এগিয়ে আসে, তারপর মা। ওরা আমাকে ধরে, মা ডাক্তারের চেম্বারেই আঁচলে মুখ ঢেকে লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদে আর তানিয়া থমথমে মুখে আমার শরীর ঘেষে দাঁড়িয়ে হাত ধরে বলে, ‘চলো বাড়ি যাই’। ওর বলা শব্দ তিনটি আমাকে ভীষণ আরাম দেয়। খুব ঠান্ডা বাতাস ছুঁয়ে যায় শরীর। একটা অনাবিল সন্ধ্যা আচমকা ঢুকে পড়ে বয়সে, মনে পড়ে, তানিয়ার নিঃশ্বাসের ঘ্রাণ, ঠোঁটের উষ্ণতা, বাতাসে উড়তে থাকা চুল। তবে কি আমার বয়স পচিশ? এই প্রশ্নটা নতুন করে অস্থির করে। তানিয়া আমার পাশাপাশি চলতে থাকলেও, আমি ওর থেকে একটু একটু করে সরে যেতে যেতে একসময় গিয়ে দাঁড়াই সেই নদীটার পাড়ে, যেটা রোজ আমার সাথে সাথে স্কুল যেত, ক্লাস করত এবং আমার সাথেই ফিরে আসত বাড়িতে। আমি তাকে ভালোবাসতাম, ওর সাথে আমার কথা হতো আর মাঝে মধ্যেই সে আমাকে দেখিয়ে বলত, ‘ঐ যে দেখছ এতসব টাংনা, দেখ, মানুষ কিভাবে প্রলোভনের ফাঁদ পাতে’? আমি দেখতাম, বড়শি পিঠে টাংনায় ঝুলে থাকা সেই সব মাছের ছটফটানি। আমি খুব সহজেই প্রলোভনের টোপ হওয়া সেসব মাছের যন্ত্রণার সাথে একাত্ম হতে পারতাম, কেননা তাদের মতো আমিও অনুভব করতাম, দিন অথবা রাতের কোনো না কোনো মুহূর্তে কিছু একটা আচমকা গ্রাস করবে!

একেক সময় মা সামনে আসে না। তানিয়া আমার সাথে কথা বলে না। হয়তো ওদের ধারণা আমি ইচ্ছে করেই এসব করি। আমার হাসি পায় ওদের বোকামো দেখে, কারণ ওরা তো জানে না আমি কতবার ওদের খাবারে বিষ মিশিয়েছি। রোজ রাতে ওরা ঘুমিয়ে গেলে আমি ওদের খাবারে বিষ মিশিয়ে রেখে আসি আর সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করি কখন ওরা ঘুম থেকে উঠবে, বিষাক্ত খাবারগুলো খেয়ে মারা যাবে। অথচ কখনই ওরা মরে না দেখে আমার নিজের প্রতি বিরক্তি আসে আর তখন নিজের খাবারেই যথেচ্ছ পরিমাণে বিষ মিশিয়ে খাই এবং শেষ অব্দি নিজেও মরছি না দেখে হেসে উঠি, জোরে! ওরা এসব কিছুই জানে না, শুধু আমার হাসির শব্দ শোনো আর কখনও কখনও সহ্য করতে না পেরে তানিয়া ছুটে এসে আমার উপর তার সব ক্রোধ ঢেলে দেয়। মা হয়তো কাঁদে এবং আশাহীনতা কিংবা আশার মাঝেই নিজেকে বোঝায়। এমন সময় আমার প্রবল ঘুম পায়, চোখ-মাথা-শরীর জুড়ে ঘুম আসে। সমগ্র পৃথিবীর ঘুম। আমি ঘুমিয়ে পড়ি আর ঘুমের মধ্যেই দেখি বেগুনি রঙের এক বালক সারা বিকেল ঘুড়ি উড়িয়ে সন্ধ্যার সময় মনের আনন্দে ঘরে ফিরছে।  তার হাতে বেগুনি রঙের ঘুড়ি, ঘুড়ির বেগুনি লেজ তখনও ইতস্তত উড়ছে একটু আধটু হাওয়া পেয়ে। বালকটি আপনমনেই ফিরছে ঘরে। সারা বিকেল  ঘুড়ি উড়ানোর আনন্দে বিভোর ছিল বলেই সে হয়তো খেয়াল করে নি, যে এই ভর সন্ধ্যায় সে বাঁশঝাড়ের কাছে চলে এসেছে এবং কোনো কিছু বুঝে উঠার আগেই একটা রাক্ষস আমচকা বাঁশঝাড় থেকে বেরিয়ে এসে তার সামনে দাঁড়ায় আর মুখ চেপে ধরে বাঁশঝাড়ের ভেতরে নিয়ে যায়।


শরীর থেকেই চামড়ার সাথে সাথে মাংসও তুলতে শুরু করেছি, আর চারপাশ, মেঝে, বিছানা, বালিশ, টেবিল-চেয়ার, জামা-কাপড় সবখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে আমারই খুবলে তোলা বিভিন্ন আকারের টুকরো।


হাতের চামড়া উঠে যাচ্ছে। কতদিন ধরে উঠছে মনে নেই। উঠে যাচ্ছে তো যাচ্ছেই। হয়তো সপ্তাহ ধরে, কিংবা বছর ধরে, অথবা অনন্তকাল ধরে। উঠছে তো উঠছেই, থামার আর নাম নেই। আমি হাতের দিকে মাঝে মাঝেই একভাবে তাকিয়ে থাকি। পরতের পর পরত চামড়ার উঠে যাওয়া নির্বিকারভাবে দেখতে দেখতে ভাবি, ‘এই বুঝি, এই বেরিয়ে পড়বে হাড় আর টকটকে লাল তরলে ভেসে যাবে শরীর, ঘর-দোর। অথচ একেক পরত চামড়া উঠতে না উঠতেই নতুন আরেক পরত চামড়া সেখানে গজিয়ে যায়। কিভাবে গজায় বুঝতে পারি না, শুধু দেখি উঠে আসা চামড়ার নিচে আরেকটা চামড়া, তার নিচে আরও একটা, এভাবে একটার নিচে আরেকটা, তার নিচে আরেকটা, অজুত-লক্ষ চামড়ার স্তর আমাকে আমূল ঢেকে রাখে। ঢেকে রাখে আমার হাড়-মাংস, রক্ত-পূঁজ, এমনকি রোগ-শোক, দুঃখ-কষ্ট-জরা। অথচ আমি অপেক্ষা করি, চামড়ার পরত এভাবে উঠতে উঠতে একসময় বেরিয়ে পড়বে সব এবং সবকিছুই, আর আমি নেড়ে-চেড়ে দেখব তারা কিভাবে দিনের পর দিন, বছরের পর বছর নিশ্চিন্তে বাস করছে আমার ভেতর, এভাবে। আমার অপেক্ষা ক্রমশ দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হতে থাকে আর অস্থির হয়ে কখন কখনও নিজেই খুবলে খুবলে তুলতে থাকি চামড়া। এক ধরনের ভালোলাগা কাজ করে যায় আর তোলার গতি বাড়তে থাকে। বাড়তে বাড়তে একসময় খেয়াল করি শুধু হাত নয়, কখন যেন সমস্ত শরীর থেকেই চামড়ার সাথে সাথে মাংসও তুলতে শুরু করেছি, আর চারপাশ, মেঝে, বিছানা, বালিশ, টেবিল-চেয়ার, জামা-কাপড় সবখানে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে আমারই খুবলে তোলা বিভিন্ন আকারের টুকরো। খুব মনোযোগ সহকারে সেইসব টুকরোগুলো দেখতে দেখতে তাজ্জব হই, কোথাও এক ফোঁটা রক্ত নেই। হঠাৎ একটা কাঠঠোকরা ডানার শব্দসহ কোথা থেকে উড়ে এসে বসে মাথার উপরে। এদিক-ওদিক তাকিয়ে কি যেন দেখে নেয়, তারপর ওর শক্ত ও লম্বা ঠোঁট দিয়ে মাথার মাঝখানে নিশ্চিন্ত মনে গর্ত করতে শুরু করে। এক সময় সে আমার করোটি ফুটো করে ফেলে, তখন কেন জানি আরাম বোধ হয় এবং এই ভাবনায় দু’চোখে ঘুম নামে, ‘এতদিনে তবে কোনো পাখি বাস করবে মাথার ভেতরে’!

অরণ্য

অরণ্য

জন্ম ১৯৮১, রাজশাহী। এইচ. আর.-এ এমবিএ। পেশা : ম্যানেজার, এইচ. আর.।

প্রকাশিত বই :
যে বেলুনগুলো রংহীন [কবিতা]
কাক সিরিজ [কবিতা]
এখন আমি নিরাপদ [ছোট গল্প]

ই-মেইল : mail.aronno@gmail.com
অরণ্য