হোম গদ্য বেহালা বাজুক না-বাজুক, রেশ তার কাটছে না

বেহালা বাজুক না-বাজুক, রেশ তার কাটছে না

বেহালা বাজুক না-বাজুক, রেশ তার কাটছে না
265
0
mojid220150419155446
কবি মজিদ মাহমুদকে উত্তরীয় পরিয়ে দিচ্ছেন বিশিষ্ট সাংবাদিক-কলামিস্ট রণেশ মৈত্র
এ বছর ১৬ এপ্রিল কবি মজিদ মাহমুদ ৫০ বছর বয়সে পা রাখলেন। কবির জন্মস্থান পাবনায় তাঁর জন্মদিন পালন হলো বেশ ঘটা করেই। পাবনা সাংস্কৃতিক পরিষদের উদ্যোগে দুদিনব্যাপী অনুষ্ঠানের যে আয়োজন ছিল তাতে অংশগ্রহণ করেছিলেন বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গের সুহৃদ কবিশিল্পীরা।
মুখ্যত কবি হলেও প্রবন্ধসাহিত্যে মজিদ মাহমুদের ভূমিকা সবিশেষ উল্লেখযোগ্য। সাহিত্য ও সংস্কৃতির পুনর্মূল্যায়ন কিংবা পুনর্বিচারে তার দৃষ্টিভঙ্গি যে কোনো উৎসুক পাঠককে প্রেরণা যোগাবে।
তাঁর কবিতা ভালো লাগা না লাগার বাইরে থেকেও পাঠকের অভিনিবেশ কেড়ে নিতে সক্ষম একটা স্বতন্ত্র পরিচয়ের গণ্ডিতে। সাম্প্রতিক বাংলা কবিতা যেভাবে অ্যাবসার্ডনেস ও অ্যাবস্ট্রাকশনে ভর দিয়ে নতুন কোনো উন্মোচনের দিকে যেতে চাইছে, সেখানে মজিদ মাহমুদের কবিতা চিন্তা ও দর্শনের সাথে লড়াই করবার জন্য পাঠককে আত্মখননের দিকে নিয়ে চলে। 
কবির ৫০ বছর পূর্তিতে তাঁকে ‘পরস্পর’-এর শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। পাঠকদের জন্য তাঁর কবিতা থেকে মগ্নচৈতন্যের কিছু ইশারা তুলে এনেছেন  কবি  ফা র হা ন  ই শ রা ক

●   ●   ●

তাঁর কবিতা পড়ে কবিতাদুরস্ত মন পুরোটা বোঝার বায়না ধরে বসলে ভাবের গরজ এমন হতে পারে যে কবিকে তলব না করলে বুঝি উদ্ধার মিলবে না; অর্থসম্ভাবনার সব দ্বার খুলে দেখতে চাইলে ক্ষণেকে এমনও অনুভূত হতে পারে যেন মন বলছে গোঁজামিলের ডরে খিড়কি খুলে সোজা সটকে পড়ি কেতাবের খোলা মুখ বিমুখতায় বুজিয়ে দিয়ে। ঘটনা এমন ঘটে এই হেতুর বশে যে তিনি তার সৃষ্টিমুহূর্তে লিঙ্গুয়িস্টিক মেটোফিজিক্সের কবলে পড়ে আবদুল মান্নান সৈয়দ-কথিত ‘সজ্ঞানতা-অজ্ঞানতা’র খোয়াড়ে আটকে রহস্যসম্পাত করে চলেন—যা বোঝাতে চান এবং যা বোঝাতে চান না তারই বৈভেদ্যে বুঝি কবির উদ্দিষ্ট আটকে যেতে চায়। অনুমানের এই ঋণাত্মক টঙ্কার পুনরাবৃত পাঠে পজেটিভ প্রেরণার জারকে কেমন করে যে গুলিয়ে যায়, ব্যাখ্যা মুশকিল হয়ে পড়ে।

শ্রোতার উদ্দেশে যিনি গল্প বলেন, পয়লা বিচারে ধরে নেওয়া যায় সেই গল্পের ভাষ্যকার তিনি নিজেই, কিন্তু মজিদ মাহমুদ যখন কবিতায় কাহিনি বয়ান করেন তখন পেছনে আরও একজন নীরব কমেন্টেটর থাকে, যার কাজ বলে-যাওয়া গল্পটাই আবার নবায়ন করে সম্ভাব্য কয়েক স্তরে তার সাঙ্কেতিক বিস্তার ঘটানো। কবিতার পেছনে গল্প থাকলে অন্তরালের সে গল্প টেক্সস্টের আন্ডারগ্রাউন্ডে অনেকটাই গডফাদার অফ সেমানটিক্স হিসেবে কাজ করে যায়, কিন্তু উন-দরকারে বাইরে এসে অযথা ঝনৎকারে গোলমাল করে না, কেননা চেলার হাকডাকই সে ক্ষেত্রে গল্পের গিঁট খুলে দেখাতে পারে। গাল্পিকতা যদিবা টানা কথার গলদ হয়ে উঠতে চায় তবে এবং তখনই তিনি দর্শনের দরোজা দেখিয়ে পাঠককে প্রবেশ্যতার টানে কব্জা করে নিতে পারেন। দর্শনের প্রসঙ্গ তুললাম বটে, সে দর্শন তত্ত্বজগতের প্রথাপ্রতিষ্ঠার তোয়াক্কা না করে প্রাত্যহিকের তহবিল থেকে অভিজ্ঞার সারকথাকে তরল করে কাজে লাগায়। পুথিগন্ধা জ্ঞানের বেসাতি সাজিয়ে তত্ত্বচিন্তার মুদিঘর রমরমা করার কায়দা অধ্যাপকের হাতের জিনিস মাত্রই না, কবির হাতেও তা রপ্ত থাকতে পারে, কিন্তু রসায়নের বুদ্বুদ আত্মার ভেতরে কান পেতে নিজে নিজে শুনতে না শিখলে তা মরা কাগজের শ্মশানে রূপ নিতে পারে। মজিদ মাহমুদের পুথিজ্ঞান অধ্যাপকের অহমিকা টলাতেও যে অ-যথেষ্ট হবে তা বলব না, কিন্তু অনুভূতির ভাষাবিবরণ পেশ যেভাবে তিনি করতে চান তাতে পড়ে দেখার সহজ ইচ্ছা মার তো খায়ই না, পৃষ্ঠা উল্টে কবির সাথে একেবারে পাতালে নামতেও দ্বিধা থাকে না।

অনুভবের খাস-কারবারিরূপে তাঁর আসন তো পাতাই থাকে, কিন্তু তাঁর যে মন, তাকে চিন্তক মন না বলে এগোবার উপায়ও থাকে না, না হলে পাঠের ধাক্কায় শেষ পাতায় প্রবেশের আগে বারবার অমন মাথা নেতিয়ে পেটের ভেতর ডুবে যেতে ইচ্ছা করবে কেন! জাদুশাস্ত্রের স্বাদু প্রহার তার প্রকাশে আনে বিস্ময়ের মৃদুচমক, হরমুহূর্ত তিনি চিন্তার নানা ফুলকি উড়িয়ে যেতে থাকেন; সে চিন্তা চেনা অনুকারের নানা নতুন চেহারা দেখিয়ে ভাবের জারকে ডুবখেলা খেলতে চায়। সমুদ্রে কত মাছ কত স্তরে সাঁতরে বেড়ায়; মাটি-পানি-লবণের ইকোসিস্টেম বুঝে নিয়ে মাছ যেমন নিজের বসত ঠিক করে নেয় তেমনি তার সুরাশ্রয়ী নাব্যযাত্রা গল্পের ছলে স্কেল বদলাতে থাকে। যা বলেন তার সঙ্গে বহু শাস্ত্রের মিশেল-করা ব্যঞ্জনা জড়িয়ে থেকে মজিদীয় ভাবমহাদেশ রচনা করে নেয়, যদিও না বললে বিপদ যে তার ভাব জ্ঞানভাব, তার যাত্রা বহু ক্ষেত্রেই দিব্যযাত্রা, যদিও বস্তুযাত্রাও তার কম না। তিনি যে পুরুষ তা বোঝা যায় যখন দেখি প্রাবল্যের পুরোহিতরূপে একটা সেলফ-ইগোর পূজা তার বুকের বেদিতে ফুলের আস্তর বিছিয়ে পোক্ত করে তুলছে। তবে নারীকে দেখার একটা চোখ তাঁর তৈরি হয়েছে, যে চোখ নারীর অঙ্গচমকের চেয়ে গোশতের আড়ালে অকথ্য রূপবিদ্যুতের দাহকেই বড় করে তুলতে চায় এবং ধর্ম ও নৃতাত্তিক প্রবোধের একটা পাতলা প্রলেপ বসিয়ে নারীকে তিনি ফসিলায়িত করতে ভালোবাসেন। বর্তমানের দ্রাঘিমাজোড়া গার্হস্থ্যচারী নারী কিংবা সমাজপটের জীবিতরেখায় জীবনবিহারী নারীর চিত্র তাঁর লেখায় আশঙ্কাজনকভাবেই কম এবং নারী, ধার্মিকতা আর নৃতাত্ত্বিক সারাৎসারের যুগ্ম ভোল্টেজ নিজস্বতায় মাখানো বলে তাঁর সৃষ্টি গড়চিন্তার চলতি অভ্যাসের সঙ্গে অমিলজনিত মৃদুবিচ্ছেদও ঘটিয়ে দিতে পারে—সেই নাজুক বিন্দুর চূড়ায় তাঁর নতুনতা চিড়িক মারতে চায়; তাঁর কাব্যগড়নে বহুতার বাহানা আর বাস্তবতা দুই-ই আছে বলে রসতৃপ্তির মজমাও জমে উঠতে বারণ থাকে না।

সাবলিমিটির আভা, সত্যসারের আভাস এবং আলোকায়নের ঝিল্লি তাঁর কবিতাকে কালের চিহ্ন ঘুলিয়ে দিয়ে কালোত্তরের উপযোগে বিশেষ করে তুলতে চায়। অন্য ভাষার স্বকীয় বিভূতি ফলানো কবিতা তরজমার জোড়াতালি উতরিয়েও যখন নতুন ভাষায় উঠে আসে তখন তার অলঙ্কারপরা বউ-ভাতি রূপটা আর টিকতে চায় না, ভাষাবাণীকেই তার সুচিসূক্ষ্ম বিশেষতা নিয়ে হাজির হতে হয়, কেননা গদ্যচেহারার ছল ধরেই প্রধানত তার গরিমা প্রকাশ পায়। মজিদ মাহমুদের কবিতা সাজঘরের পোশাক চাপিয়ে নিজেকে আপিসি স্মার্টনেসে তুলে ধরতে চায় না বলে ঘরোয়া দরদের ছোঁয়াচ তাতে একটু বেশি মাত্রায়ই থাকতে দেখা যায়, যদিও তাঁর বাক্যের গড়ন গড়পড়তায় ভঙ্গুরই বলা চলে।


মজিদ মাহমুদ আনকোরা কোনো স্টাইল গড়তে পেরেছেন—সোজাসাপ্টা এমন বলা না গেলেও দৃশ্যমান অঙ্গরূপের ওপারে তিনি একটা অনঙ্গ নতুনতা চমকিয়ে তুলতে পেরেছেন মনে হয়


ভঙ্গিপূজার কলাকৈবল্য আড়ালের ভঙ্গিটাকে ভোগে খাটাতে পলিটিক্স আর ডিপ্লোম্যাসির হাতজোড় করে কম বসে থাকে নাই, ভঙ্গি তবু মজিদ মাহমুদেও বড় মাত্রায় বলবৎ, কিন্তু সে তো চিন্তার ভঙ্গি, অঙ্গের ভঙ্গি নাই বললেই চলে। ভঙ্গির কবিও বাজারে জায়গা পেতে পারে, গবেষণার টেবিল-আলমিরাও তো আছে, ভাবের কবি তো অ্যানাটমির ঘর কিংবা বাণিজ্যের টঙ এড়িয়ে হৃদয়েই তাজা থাকে বেশি। ভঙ্গির একটা বৈভব যে এতকাল কবিতায় ভর করে ছিল তাও অসত্য না, তত্ত্ব-বাজারে চিকন চালাকি সবসময় রাজনীতির পাবন্দি করে বিশেষ-রকম নপুংসকতার দিকে ডাকে—সে ডাকে কয়েক শতাব্দী উজাড় করে বাংলাভাষার সৃজনকারিগর এখন আবার স্বরূপে ফেরার সিধা রাস্তা খুঁজে ফিরছে। মজিদ মাহমুদ আনকোরা কোনো স্টাইল গড়তে পেরেছেন—সোজাসাপ্টা এমন বলা না গেলেও দৃশ্যমান অঙ্গরূপের ওপারে তিনি একটা অনঙ্গ নতুনতা চমকিয়ে তুলতে পেরেছেন মনে হয়। তাঁর তরিকায় অপরাপর কবিকণ্ঠও যদি কোথাও মুখর হয়ে থাকে আসন বিচারে এমনকি সংখ্যার গুণে হলফ করে তাঁর জন্যই এটা সাব্যস্ত হয়ে যায় এবং পোয়েটিক ডিকশনের নিজস্ব ডঙ্কা তিনি বাজিয়ে যান, সে-ই তাঁর আপন মনের একমাত্র অনুসার। যে-যে মশলা মিলে কবিতার রান্না মুখের কাছে রোচকতার তারিফ শুনতে পারে তার কোনোটাকেই মাপের বাইরে আন্দাজে ঢালতে দেখি না তাঁকে। সঙ্কেত আছে, কিন্তু সঙ্কেতের কারাগারে মাথা কোটে না তাঁর কবিতা, অলঙ্কারের কূটাভাসে কটমট করেও কপর্দক হারাতে চায় না, উপরন্ত প্রাত্যহিকের গড়ভাষা বড় কথার বরমাল্য পেয়ে যায়।

ব্যক্তিমজিদের সঙ্গে আমার ব্যক্তিসত্তার আলাপনটা কীভাবে ঘটে সেটার যদি একটু ইশারা দিয়ে নিই তাহলে বোধ করি কবিতার আলাপে আরও বেশি আরাম পাওয়া যাবে। বিষয়গরজের জের ধরে তাঁকে জানাচেনার লগন আসে পুরোহিতের (কবি সঞ্জীব পুরোহিত) ছুতা ধরে, মেপে বললে সোয়া দশক আগে, যখন খামখেয়ালের নাম ভাঙিয়ে বাপের ঘরের তালুকখোয়ানো পয়সায় বিশ্ববিদ্যার রিহার্সেলটা জারি রাখা অভাবের চেয়ে স্বভাবদোষে কিছুতেই যে সম্ভবপর হতে চাইছিল না। দশকগুজারি অনার্সপড়া মন্থরতার বেগে একেবারে জমে যাওয়ার জো হলে তো টাকার টনক নড়তেই পারে আর অভাবের দেখাও তখন মিলে যেতে বাধা থাকে না। সেই অবেলাকার অনটন-দায় সেরে সাহিত্যভাবের লেনাদেনা তার পরে সেই যে শুরু, ছেদ পড়লো না। গানের গলা যা-ই থাক বাজনার সাথে ভাব হলো না, তবু বাদ্য কিনে বদনাম কামাই থামতে চাইত না, নানা বাদ্য খরিদ করে মনের বাসনা পুরা করার চেষ্টা চলত। কবি দিয়েছিলেন চায়না বেহালা উপহার, শখের ভরির—শখ যত ক্ষুদে বা খুচরো হোক না কেন—দামটা চড়িয়ে তুলতে চাইলে বেকারের তো আত্মম্ভরিতা চলে না, বাফায় (বুলবুল ইনস্টিটিউট অফ ফাইন আর্টস) বসে তালিমের যে কী ঘটা! ভাব-অভাবের বেহাল দশা পাড়ি দিতে তাঁর সেই বেহালা তালের ঘরে তাল পেটাতে না শেখালেও হতাশার খাজনা কিছু পরিমাণ পুষিয়ে দেওয়ার আয়োজন তো করেই থাকবে, সময়টা পেরিয়ে এসে মালুম করি।

কবিতার কয়টা কথা এখন শেয়ার করি, যে-কথাগুলো বুক থেকে মুখ হয়ে নানা মুহূর্তে আজারে-বাজারে, দরকারে-অদরকারে বেরিয়ে এসেছে, কিন্তু লিপির কাছে ঠাঁই করে উঠতে পারে নাই। ‘মাহফুজামঙ্গল’ থেকে উঠে-আসা নারী, সে কেমন শিল্প-বাটপারি—ছফার সুলুকে ‘অর্ধেক নারী অর্ধেক ঈশ্বরী’—নারীকাঠামোর বাটনবোতাম টেপার বেলায় পুঁজিতন্ত্রীরা যেখানে রতিপুতুল বা লালসার মেশিনরূপে দেখছে নারীকে এবং যেখানে কামলিপ্সার ভাঁপ পুরুষকে ছাইয়ের দানিতে উড়িয়ে-পুড়িয়ে দেবার কথা সেখানে এবাদতের ইশারা টেনে যা তিনি ঘটাতে চাইলেন তাতে নারীসত্তার শাস্ত্রগত পূতরূপ যেমন ঝলসায় তেমনি আবার তজবি-টেপার সেই ম্যাজিক-মারেফত নারীকে তরণ-উত্তরণের প্রতীকায়নে পুরুষের চোখে হাজির করে। যে নারী মানবজাতের ইতিহাসের আড়েধারে ছড়িয়ে-গড়িয়ে পুষ্ট হতে থাকে, এবং যে নারী সভ্যতার সমান-বয়সী সেই মাহফুজার দেহ তাঁর ‌‌‍‌‍তজবির দানা, তিনি নেড়েচেড়ে দেখেন আর তাঁর এবাদত হয়ে যায়। যে কাল চলে গেছে, যে কাল চলছে এবং যে কাল চলতে থাকবে তার পুরো প্রসার জুড়ে যত নারী দুনিয়ায় বালিধুলায় পা টিপে হাঁটার কথা তাদের ভেঙে-গুলিয়ে সমস্ত সার-দ্রব্য একত্র করে তিনি একটা মডেলরূপ হাজির করবার আয়োজন করলেন, যা নারীকলার ঐতিহাসিক-নৃতাত্ত্বিক বিস্তারের ক্রমরূপ তুলে ধরতেও সমান সক্ষম।

কাঁটাচামচ (ফারহান ইশরাক, সোহেল হাসান গালিব এবং সাব্বির আজম সম্পাদিত কবিতাকাগজ) নির্বাচিত মজিদ মাহমুদের কবিতা সংকলনের ভূমিকায় যে বলেছিলাম ডি-থিয়োলাইশেনের বাজিখেলা না বুঝলে মজিদ মাহমুদের কবিতা বিভ্রান্ত অনুমানের দিকে নিতে পারে পাঠককে, সে কথা এখনো মনে হয়, তা এজন্য যে ফাঁপা মাথার সুশীল হারামিরা কথার স্বর না বুঝে সুর করে বলতে থাকে ইহার মধ্যে এছলামি টার্মের টঙ্কার দেখিতে পাই, কাজে-কাজেই ইহা জঙ্গি মানসের বা পেছনমুখা প্রবৃত্তির ফলন বৈ নহে। হাফিজ-খৈয়াম যে ঈশ্বরের প্রশাসন এবং খোদ-কর্তৃত্ব বিষয়ে চ্যালেঞ্জ করে কথা বলেন তার একটা এক্সটেনশনও ‘মাহফুজামঙ্গল’ বা ‘দেওয়ান-ই-মজিদ’ গ্রন্থ দুটিতে দেখা যাবে; দেওয়ান অবশ্য দুর্বল ও ত্যজ্য মনে হয় আমার কাছে তার পুনরাবৃত্তি এবং ফর্মের প্রাচীনতায়। তবে এইসবের সঙ্গে প্রতিক্রিয়ার সম্পর্ক না থেকে বরং যে পরম-মানবতার যোগ আছে সেটা বোঝার জন্যই ডি-থিয়োলাইজেশনের কথা পেড়েছিলাম। ‘পুত্র ডুবে যাচ্ছে’ কবিতার সাহায্যে ডি-থিয়োলাইজেশনের উদাহরণ টানা যায়, যেখানে দেখতে পাই নুহ নবী অবাধ্য পুত্রকে নিজের সত্যাদর্শে কিস্তিতে তুলতে না পেরে নবুয়্যতের মায়া ছেড়ে পুত্রপ্রেম তথা মানবতার পক্ষে কিস্তি থেকে নেমে যাচ্ছেন আর বলছেন: ‘পুত্র ডুবে যাবে আর পিতা থাকবে প্রমোদতরীতে!/ সেই ভীতুদের নবী আজ গতায়ু প্রভু’ এবং ‘এক দিকে নবুয়ত অন্য দিকে পুত্রের মায়া/ আমি পুত্রের মায়া চাই’।

লম্বাচুলের রূপক যদি তিনি ধরেই ফেলতেন আর নিজের বিষয়ে মিথ-গঠনের মজাটাও কিছু লুটে নিতে চাইতেন তাহলে বোধ করি কবি হিসেবে তাঁর নামডাকের পসার থাকত আরো একটু হাই স্কেলে। পয়সা এবং তার বিপরীতে প্রবৃত্তিপ্রশমনের দুই গুণে তাঁর একটা আলাদা চেহারা দেখতে পেয়ে বুঝলাম রবীন্দ্রসমন্বয়বাদী একটা ব্যাপ্তপটের সাহিত্য ঘরানার গঠনপ্রচেষ্টা এযুগেও চলতে পারে এবং তা মনে হয় তিনি করে দেখানোর গোপন অভীপ্সার মধ্যে এগিয়ে যাচ্ছেন। এনজিওঘেঁষা সমাজকল্যাণ এবং দপ্তরসম্মত করপোরেট জামায় নিজেকে জড়িয়ে পাঠকপাবলিকের মন জয় করে নেওয়া সবটা বুঝি সম্ভব না, হয়তো বলবেন তিনি—যাপনভঙ্গির অঙ্গীকারে শিল্পের সনাতন মর্ম যদি ধরতে না পারি তাহলে কালের পাঠকে তাতে পুলকসঞ্চার না হলেও অনতিভবিষ্যতের দিনে যখন কবি তাঁর গতরি হাজিরা গুটিয়ে নেবেন তখন তো আর যাপনবেলার গুণ-বেগুণ, ভুলচুক নিয়ে কেউ মুখ খুলবে না, রচনার ঘরেই তারা জীবনের আয়না পেতে কবিত্বের মুখ দেখতে চাইবে। কে জানে সেই কথায় যুক্তি কতটুকু, যখন কবিতার রেকর্ড ছাপিয়ে জীবনের ইতিকথাও প্রযুক্তির প্রশ্রয়ে তাজা থাকার তরফদারি পয়দা হয়ে গেছে।


খৃস্টতত্ত্বের ট্রিনিটির কথা বাদ দিয়েও বাইবেলের প্রস্তাবে ঈশ্বর পুরুষরূপ আর সৃষ্টি নরারীরূপ, কিন্তু তাসাউফতত্ত্বের ঐতিহ্যে ঈশ্বরকে নারীরূপে-বঁধুরূপে কল্পিত হতে দেখা যায়


বহুদিন এই কথা মনে ক্রিয়া করেই যাচ্ছিল যে মজিদ মাহমুদের কবিতায় গঠনশৈথিল্য একটা বড় প্রবলেম এবং সেই বিবেচনা একটু কমে আসলেও একেবারে তা থেকে বেরিয়ে যেতে পারছি না। খুলে দেখানোর প্রবণতা পেশাদারিত্ব পেয়ে গেলে যেমন দুর্নাম রটে যায় তেমনি কবিতার বেলায়ও আড়ালের দাম একেবারে কমে যায় নাই, হোক না সত্য যে প্রগতিবাদের প্রপাগান্ডা কবিতার সাজপোশাক খসিয়ে অকৃত্রিম পুতুলরূপটা বানিয়ে তুলতে চাইছে। ন্যারেশনের নট একেবারে খোলা থাকলে ক্লান্তি আসতেই পারে, তাই তিনি অনেকটা ঢেকেই রাখেন কনজারভেটিভ বলে কে মুখ খারাপ করে সেদিকে না তাকিয়েই। ‘ঈশ্বরকে ডাক দিলে’ মাহফুজা যদি ‘সামনে এসে দাঁড়ায়’ তাহলে তা কি প্রার্থনায় কবির ধ্যানচৈতন্যের ঘাটতি নাকি তিনি আসলে নারীরূপের ঈশ্বরায়িত উত্তরণের কথা বলতে চান তা ভেবে দেখতে হয়। হাসন যে বলেন, ‘মম চক্ষু হইতে পয়দা হৈছে আসমান ও জমিন’, এমকি ঈশ্বরও, সেই অর্থে নিলে নারীর বেলায়ও তা ঘটতে বারণ নাই। খৃস্টতত্ত্বের ট্রিনিটির কথা বাদ দিয়েও বাইবেলের প্রস্তাবে ঈশ্বর পুরুষরূপ আর সৃষ্টি নরারীরূপ, কিন্তু তাসাউফতত্ত্বের ঐতিহ্যে ঈশ্বরকে নারীরূপে-বঁধুরূপে কল্পিত হতে দেখা যায়। কাজেই ঈশ্বরকে ডাক দিলে মাহফুজা সামনে এসে দাঁড়ালেও অসুবিধা হয় না, ঈশ্বরকে মানতে হলে মানুষের মধ্যেই তাঁকে জায়গা করে দিতে হবে।

মাটির মাহফুজা কামের আগুন ধারণ করে রক্তমাংসময় হয়ে উঠলে তাকে মানবীয়তায় স্বীকার করতে ভারবোধ করতে হয় না কিন্তু তার ‘সান্নিধ্যে এলে’ ‘যে প্রবল ঈশ্বর’ জেগে ওঠার কথা শুনি সেই ঈশ্বরের খোদ-পরিচয় নিয়ে সন্দেহ জাগতে বাধা নাই, তার অধিষ্ঠান কি শিশ্নে নাকি আসমানে তা নিয়ে প্রশ্ন থেকে যায় যখন বলা হয় ‘তুমি তখন ঢাল হয়ে তার তির্যক রোশানি ঠেকাও’—কেননা ‘রোশানি’ শব্দটায় কামব্যঞ্জনার চাইতে আধ্যাত্মিক ব্যঞ্জনা কোনোমতেই কম না এবং ভাবপরবশ পাঠক একে আধ্যাত্মিক সারাৎসারে হজম করতে চাইলে তাতে বাধা দেওয়াও কাজের কাজ না। ‘আনাল হক’ বা ‘আমি খোদা’র হেল্লাজিতত্ত্ব মজিদে জারিত-মথিত-শমিত হয়ে প্রকাশ পেতেও কার্পণ্য দেখি না। মজিদীয় খুদিভাব ফানা’র মগ্নচেতন থেকে বাকা’র সমাজচেতনে প্রবাহিত হয়ে আারো অজস্র বিজ্ঞানভাবের মধ্যে লয় হতে চায়, কেননা মারেফতে এশতেমায়ি বা সামাজিক আধ্যাত্মিকতায় তাঁর একটা ঝোঁকটান দেখা যায়। তাঁর প্রকাশে ‘মুড অফ সারেন্ডার’ বা সোপর্দভাব প্রচল তরিকার সাধকসত্তার মতো কমন বা বশীভূত না, যার ফলেই ডি-থিয়োলাইজেশনের স্মরণ নিয়েছিলাম। ভারতের ভাবতত্ত্বের চাইতে তাঁর বেলায় সেমেটিক মনস্তত্ত্বই প্রধান মনে হয়, তবে সত্য যে আন্তঃমহাদেশীয় মিথকল্পের প্রয়োগ তার বেলায় অস্বচ্ছন্দ নয়।

জীবোৎসার সম্পর্কীয় বিবর্তনী ত্তত্ত্বভাবনার ফলনও যে মজিদ মাহমুদের কবিতাকে আশ্রয় করে সেটা বোঝা যায় যখন তাঁর মুখে উচ্চারিত ‘আমি তো বৃক্ষ ছিলাম’, এবং পরিবেশচিন্তার সংবেদও স্পষ্টতর যখন তিনি বলেন: ‘আমার বুকের মধ্যে একটি ঘুঘু পাখি/ তাইরেসিয়াসের চোখের মতো দু’টি ডিম/ পেড়ে রেখেছে’। ‘গাছ-জীবন’ কবিতায় কাঠুরিয়ার কোপে পরের দিন ভোরে ভূমিস্যাৎ হবে এমন আয়রনির কবলে-পড়া গাছ তার ‘নিবিড় ডালপালা একমাত্র আশ্রয় করে/ একটি মা পাখি দুটো ডিম বুকে নিয়ে’ ‘নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে’ থেকে নিজের অজান্তে যে আসন্ন পরিণতির অপেক্ষা করছে তারই এক আর্তিভরা কাব্যরূপ প্রকাশ করেছে যা মর্মস্পর্শী এবং মহাকাব্যিক। মর্মস্পর্শিতার মাত্রা তখনই ড্রামাটিক ক্লাইম্যাক্সে রূপ নেয় যখন জানা যায় সেই পাখির বয়ে আনা বীজেই গাছটার জন্ম হয়েছিল, আর দার্শনিক চরমতার আভাস তখনই পাই যখন দেখি বৃক্ষের গোড়ায় বুদ্ধের বোধিপ্রাপ্তি এবং গাছ ও মানুষের সত্তাগত অভেদের বরাত দিয়ে ‘করাতকলের শব্দে’ তিনি ‘সেই মুক্তির আহ্বান’ শুনতে পাচ্ছেন। গাছকে ‘বৃত্তের মধ্যম পর্যায়’ বলতে শুনে আবারো সেই বিবর্তনকলার রেশ এসে ভর করে এবং জগৎ-বৃত্তের বিকাশধারা কবির চেতনায় কী গভীরভাবে উপস্থিত হতে পারে তারই এক জ্যান্ত ছবি প্রকাশ হয়ে পড়ে। ‘সঙ্গম এবং সঙ্গগহীনতা ছাড়া’ নর-নারীতে ‘পার্থক্য’ না দেখে (‘কী পার্থক্য ছিল আমাদের’) মাটির মানুষের বিভেদী লিঙ্গচিহ্নে অঙ্গমিলন বিষয়ে তিনি বলেন ‘যে মাটি থেকে উৎপন্ন আমি সেই / মাটিতেই বপণ করেছি আমার বীজাণু’, ‘আমি তো দেখি তোমার সবুজ স্তন, আগুনের ক্ষেত’।

মানসনায়িকা ‘মাহফুজা’ তাঁর দৃষ্টিতে এন্টার্কটিকা মহাদেশতুল্য যাতে ‘অসম্ভব বিশ্বাসে নগ্ন হয়ে’ থাকে ‘তুষার স্তন’ এবং ‘মানুষের সন্তানেরা’ যাকে ছুঁতেও পারে না, তিনিও ছুঁতে পারেন না, সে কারণে তাঁর ‘বড় হিংসা হয়’, কারণ তাঁকে বলতে শুনি: ‘তোমার ঐ বিশাল দেহে হেঁটে বেড়ায় পেঙ্গুইন’, যে পেঙ্গুইন আবার কর্পোরেট ক্ষমতাপ্রভুর প্রতীকও হতে পারে, এজন্য যে তাঁর ভাষ্যে পাচ্ছি: ‘দংশিত ক্ষতে পচে ওঠে আমাদের বহু ব্যবহৃত শরীর’, তবে তাতে আপাত-প্রতিবন্ধক একটা আছে, যেহেতু তিনি বলে রেখেছেন, মানুষের সন্তানেরা তা ছুঁতে পারে না—সেক্ষেত্রে প্রতিবন্ধক কাটাতে চাইলে কর্পোরেট-অলাদের মানুষের অধিক কিছু স্বীকার করে নিতে হয়, ঝক্কি এটুকুই। মধ্যবিত্তের অধিকার থেকে মাহফুজার মতো মাঙ্গলিক নারী যখন ন্যান্সি রিগানের মতো শক্তিমানের হাতের পুতুল তখন তাঁর জিজ্ঞাসা ‘তোমার আত্মা বলো কার অঙ্কশায়িনী’—যখন তিনি জানেন সেখানে ‘লেখা আছে তৃতীয় বিশ্বের বাঁচবার হিসাব’। মজিদ মাহমুদ নৃতাত্ত্বিক ইতিহাসের গল্প কবিতার মধ্যে পুরে দিয়ে মানুষের এগিয়ে চলার ক্রমধারা কবিত্বের অক্ষরে ফুটিয়ে তুলেছেন, তবু তা অবসিত না এজন্য যে, ভাষায় প্রাণসঞ্চারের কায়দা তিনি জানেন। তাঁর সাথে কথা বলার সময় তিনি যে ভাবটা অবলম্বন করে থাকেন সেটাই তাঁর কবিতার ধরন, উত্তরাধুনিকতার চিন্তা তাঁর মধ্যে দেখতে পাই, কিন্তু সত্য বলতে তা কেবল চিন্তার বেলায় খাটে, ভাষায় তাঁর লক্ষণ দানা বাঁধতে দেখি না।

‘পার্সোনাল ফিলোসোফি’ বা যাপনসাপেক্ষ দর্শন জিনিসটা তাঁর হাতে এসে একটা গড়ন পেয়ে যায়, অনেক জায়গায় একেবারে সহজ কথা যা সবাই অনুভব করে কিন্তু দর্শনের মতো করে হয়তো বয়ান করতে পারে না, সেটা তিনি সহজ ঢঙে বলে দেন, যা বিশ্বাস করতে বা মেনে নিতে একেবারেই ক্লেশবোধ হয় না, এমনকি সঙ্গে সঙ্গে মনে হয়, হ্যাঁ, এ তো সত্যই এবং আমার নিজের পক্ষেই তা বলতে পারলে ভালো হতো। অনেক ক্ষেত্রেই তাঁর কথার মিস্টিক ভাবদ্রবণ বহুমাত্রিক তারল্যে সঞ্চারিত এবং তারই ফলে তাঁর কোনো কোনো প্রকাশ বৈজ্ঞানিকতা, যুক্তিজাল বা সেমানটিক্স পুরোটা মেনে চলছে না বলে মালুম হয়; এ-প্রকার অভিব্যক্তির অর্থ করা মুশকিল, হয়তো সব মিলে অখণ্ডতা পাওয়া যাচ্ছে না এবং সব জুড়ে দিয়ে সংহতি আবিষ্কারও কঠিন, কিন্তু এমন একটা রস সেখানে সঞ্চার করা হয়েছে যে রহস্যজনিত আনন্দ বলতে যা বোঝায় সেটা ঠিকই পাওয়া যাচ্ছে এবং তার ফলে মনও সঙ্গে সঙ্গে তাকে অ্যাপ্রুভ করে নিচ্ছে। ভাষ্যধর্মী বিবরণ তাঁর লেখায় যথেষ্ট পরিমাণে বিদ্যমান বলে খুলে দেখানোর আয়োজন তাঁর আছে, কিন্তু পুরোটা খুললে পাঠকের আর খোলার মতো কিছু থাকে না, সেটাও তিনি মনে রাখেন। শব্দযোজনে যে বাবুইবাসা তিনি বুনে যান তাতে দু-চারটা জোনাকপোকা হয়তো বসিয়ে দিলেন আর অমনি তাতে এমন আন্তরিকতা তৈরি হয়ে পড়ল যে পাঠক হিসেবে মনে হলো এই আন্তরিকতার মধ্যে মাথা গুঁজে একটু জিরিয়ে নিই।