হোম গদ্য ‘বিশ্বসাহিত্যের কথা’ : যে-কথা চেয়েছি জানতে

‘বিশ্বসাহিত্যের কথা’ : যে-কথা চেয়েছি জানতে

‘বিশ্বসাহিত্যের কথা’ : যে-কথা চেয়েছি জানতে
432
0

দু-চারখানা বই পড়তে গিয়ে নিজেরও একখানা বই লেখার ইচ্ছে হলো। এ অবশ্য মন্দ নয় [মন্দের ভালো বলেও তো একটা কথা আছে]। কিন্তু ইচ্ছে হলেই কি হয়? ইচ্ছে পূরণের উপকরণ থাকতে হবে না? জানা থাকতে হবে না লেখালেখির কলাকৌশল? তো ঐ যে, বনের কাকটি যেমন একটা একটা করে পাথর জমিয়ে কলসি থেকে পানি পান করেছিল, আমিও তেমনই একটু একটু করে এগুতে লাগলাম এ পথে। এদিকে আবার আমাকে তাড়া করতে লাগল ‘লেখকরা কিভাবে লেখে রে’, ‘কেন লেখে রে’—এসব প্রশ্ন। এমন সময় মানিক বললেন, ‘লেখা ছাড়া অন্য কোনো উপায়েই যে-সব কথা জানানো যায় না, সেই কথাগুলি জানানোর জন্যই আমি লিখি।’—একইসঙ্গে এও খোলসা করে দিলেন—’অন্য লেখকেরা যাই বলুন, আমার এ বিষয়ে কোনো সন্দেহই নেই যে, তারা কেন লেখেন সে-প্রশ্নের জবাবও এই।’ [কেন লিখি, লেখকের কথা; মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়]। একটা উত্তর না-হয় জানলাম। কিন্তু এ-জানা থেকেই যে জন্ম নিল নানা জিজ্ঞাসা। নিজেকেই নিজে শুধোতে থাকলাম, আচ্ছা জীবনধর্মী বলতে কি যাচিত জীবনের কথা বোঝায় নাকি এইসব জনম-জমিনে-জন্মানো নতুন জীবনকে বোঝায়? সাহিত্য কি নতুনত্বের সন্ধান, নাকি প্রবহমান জীবনের প্রতিচ্ছবিই সাহিত্য?—না, প্রশ্নের পা-বেড়ি ডিঙিয়ে আর এগুতে পারি না। আর তেমনই একটা সময় কেউ একজন সযত্নে জানান, হে পথিক—

‘প্রত্যেক মানুষের একটা গল্প থাকে—খুব চিরায়ত, চিরন্তন গল্প। মোটাদাগে সেই গল্পটা লিখে ফেলা সাহিত্যের কাজের মধ্যে পড়ে না। যে গল্পটা তৈরি, সেটা সাহিত্য নয়। সেটা খবরের কাগজের প্রতিবেদন মাত্র। মানে দশজন লিখলে যদি দশ রকম সম্ভাবনা বের হয়ে না আসে তবে সেটা গল্প বটে কিন্তু সাহিত্য নয়। অর্থাৎ সাহিত্যের প্রধান কাজ হলো, ব্যক্তির সম্ভাবনাগুলো খুঁজে খুঁজে বের করা। ব্যক্তির সেই সম্ভাবনাগুলো বাস্তবে বিদ্যমান থাকতেও পারে, নাও থাকতে পারে। মার্ক টোয়েন যথার্থই বলেছেন :

Fiction is obliged to stick to possibilities, Truth isn’t.


সাহিত্য হলো অন্য এক বাস্তবতা, যেখানে বায়বীয় চরিত্রগুলো বাস্তবের চরিত্রদের পথপ্রদর্শক হিশেবে কাজ করে।


সম্ভাবনাকে খুঁজে বের করার জন্যই রবার্ট ফ্রস্টকে হাঁটতে হয়েছে যে পথে মানুষ কম হেঁটেছে সেই পথে। তিনি বলেছেন :

Two roads diverged in the wood and I–/ I took one less traveled by,/ And that has made all the difference.

যদি সম্ভাবনা থেকেই সাহিত্য হয় তাহলে সাহিত্য জীবনের সরাসরি বা হুবহু দর্পণ নয়। অ্যারিস্টটলের ‘আর্ট ইজ ইমিটেশন অব লাইফ’ বক্তব্যের ভেতর ইমিটেশনের মাত্রা নিয়ে গণ্ডগোল দেখা দেয়। যদি অস্কার ওয়াইল্ডের মুখের কথা কেড়ে নিয়ে বলি—’Literature always anticipates life. It does not copy it, but molds it to its purpose.’—তাহলে ইমিটেশনের অর্থটা এখানে পরিষ্কার হয়। একটু ভেঙে বললে, সাহিত্য হলো অন্য এক বাস্তবতা, যেখানে বায়বীয় চরিত্রগুলো বাস্তবের চরিত্রদের পথপ্রদর্শক হিশেবে কাজ করে।’

এই যে এতক্ষণ যিনি আমাকে বা আমাদেরকে ভেঙে ভেঙে কথামৌচাকের মধু পান করাচ্ছিলেন, তিনি হচ্ছেন মোজাফ্ফর হোসেন। গল্পের আদলে এমন করেই সাহিত্যের স্বরূপটা পাঠকের সামনে উন্মোচন করছিলেন তিনি তার ‘সাহিত্যের কাজ অকাজ’ প্রবন্ধে। এটি তার ‘বিশ্বসাহিত্যের কথা’ বইটির প্রথম প্রবন্ধ। অমর একুশে বইমেলা-১৮ উপলক্ষে বইটি প্রকাশিত হয়েছে বেঙ্গল পাবলিকেশনস থেকে। মেলার দ্বিতীয় দিন সংগ্রহ করলেও ব্যক্তিগত কিছু ব্যস্ততার কারণে বইটি অপঠিতই থেকে যায় বেশ কয়েকদিন। তারপর এরইফাঁকে একবার শুরু করলাম। হয়তো প্রথম প্রবন্ধটি পড়েই উঠে যেতাম। কিন্তু না, তা আর হল না। বইটিই আমাকে আটকে রাখল পড়ার টেবিলে। আর আমার অন্তর্লোকে উদ্ভাসিত হতে থাকল রবীন্দ্রনাথের ‘রতন’ থেকে নিয়ে রলিংসের ‘জেরি’। ‘পোস্টমাস্টার’ আর ‘আ মাদার ইন ম্যানভিল’-এর মতো তলস্তয়ের ‘ডেথ অব ইভান ইলিচ’ আর কাফকার ‘মেটামরফোসিসে’ও আগ্রহ জন্মাল পুনঃপাঠের। যেন আবার নতুন করে দেখলাম শহীদুল জহিরের সেই ‘কাঠুরে ও দাঁড়কাক’কে। আর হেমিংওয়ের ‘বৃষ্টিভেজা বেড়াল’, জেমস জয়েসের ‘এরাবি’ কিংবা কেট শপার ‘এক ঘণ্টার গল্প’ এসব নিয়ে আলোচনা তো আছেই। বিশটি প্রবন্ধের মধ্যে উপন্যাস বিষয়ক প্রবন্ধ সাতটি, গল্প বিষয়ক নয়টি আর বাকি চারটির তিনটি চারজন বিশ্ববিশ্রুত সাহিত্যিক ও তাদের সাহিত্যকর্ম নিয়ে এবং শেষ প্রবন্ধটি হচ্ছে, ‘অনুবাদের তত্ত্ব ও প্রসঙ্গ কথা’। সবমিলিয়ে একমলাটেই অনেক কিছুর প্রাপ্তি ঘটে পাঠকের।

বইটির ‘কুন্দেরার আধুনিক উপন্যাস ভাবনা’ থেকে জানতে পারি, ‘অনেক পাঠক ইন্টারনেটে জানিয়েছেন যে, কুন্দেরার এই বইটি দি আর্ট অব নভেল তাদেরকে কাফকা, প্রুস্ত, বালজাক, ফ্লবেয়ার, ভলতেয়ার, মান, মুসিল প্রমুখ লেখককে পুনঃপাঠে অনুপ্রাণিত করেছে।’—অনেকটা এমনই কথা খাটে মোজাফ্ফর হোসেনের এই বইটির বেলাও। কাজুও ইশিগুরো, মিলান কুন্ডেরা, হুয়ান রুলফো, হারপার লি, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, রেলিংস, হেমিংওয়ে, জেমস জয়েস, কেট শপা, মুরাকামি, কাফকা, শহীদুল জহিরসহ অন্যান্য প্রভাবশালীদের গল্প-উপন্যাস নিয়ে, সাহিত্যের নানা তত্ত্ব-তথ্য-উপাত্ত নিয়ে, পাণ্ডিত্যপূর্ণ অথচ প্রাঞ্জল আলোচনা করেছেন এই সাহিত্যালোচক তার ‘বিশ্বসাহিত্যের কথা’য়। তাই তার ‘রবীন্দ্রনাথ ও রলিংস: ছোটগল্পের অভিন্ন কথক’ প্রবন্ধটি আগেও কয়েকবার পড়ার পরও আবার পড়ি। যেমন বারবার পড়ি রবীন্দ্রনাথের ‘পোস্টমাস্টার’। লেখাটি পড়তে গিয়ে বেশ কয়েক বছর আগে পড়া মারজরি কিনান রলিংসের ‘আ মাদার ইন ম্যানভিল’-এর সেই জেরি সমুজ্জ্বল হয়ে ওঠে আমার কল্পাকাশে। গতানুগতিক প্রবন্ধের কাছ থেকে যেটা পাবার প্রত্যাশা খুব একটা করা যায় না।


মোজাফ্ফর হোসেনের পরিশ্রমের তেমন কোনো ফাঁকফোকর আমাদের চোখে পড়ে না। আমরা বরং বিমুগ্ধ হই তার প্রকাশশৈলীর কৌশলে, প্রচেষ্টার প্রগাঢ়তায়।


যেন গল্প করছেন, এমন করেই আলোচিত হয়েছে একেকটি প্রবন্ধ। তাই একবার শুরু করলে পুরো বইটা পড়ার স্পৃহা পেয়ে বসে পাঠককে। প্রবন্ধের বই মানেই রসকষহীন কাঠখোট্টা, ওমা ওর ধারেকাছেও যাস নে যেন—এমন ভয়ে আমরা যারা সিটিয়ে থাকি, তাদের জন্য গদ্যে একনদী প্রাঞ্জলতা এনেছেন মোজাফ্ফর হোসেন। পাঠকমাত্রই তাই সে-নদীতে সাঁতরাতে পারে, ডুব দিয়ে আহরণ করতে পারে মণিমাণিক্য। আর মাঝেমাঝেই চমকে ওঠে, ‘একি! আমি প্রবন্ধের বই পড়ছি, নাকি গল্পের?’ চমকে ওঠাটাও স্বাভাবিক। কেননা এই কৃতী প্রাবন্ধিক আবার সুদক্ষ গল্পকারও বটে। অবশ্য মোজাফ্ফর হোসেন তার ‘লেখকের নিবেদনে’ অর্থাৎ বইটির ভূমিকায় বলেও দিয়েছেন সে-কথা, ‘ছোটগল্প আমার সাহিত্যচর্চার মূলক্ষেত্র। সেই কারণে আমি প্রবন্ধ লিখতে চেয়েছি কিছুটা গল্পের গদ্যে। প্রচলিত প্রবন্ধের গুরুগম্ভীর ভাব বা মেজাজ যাই বলি না কেন, আমার প্রবন্ধে অনুপস্থিত। এতে প্রবন্ধে খামতি কিছুটা ঘটতে পারে। তবে সহজবোধ্য বা উপাদেয় হলো কিনা সেটিই আমার কাছে বিবেচ্য বিষয়।’—তার বিবেচনা যথার্থ, বইটির একজন পাঠক হিশেবে এ আমার অকপট অভিমত। আর তাছাড়া আমরা যারা সাহিত্যাকাশ সম্পর্কে কৌতূহলী; আমরা যারা চন্দ্রনাথ হতে না-পারলেও জ্যোৎস্নাচারী হতে চাই; তারা অনেক কিছুই পাই এই বইটি থেকে। তাই মোজাফ্ফর হোসেনের পরিশ্রমের তেমন কোনো ফাঁকফোকর আমাদের চোখে পড়ে না। আমরা বরং বিমুগ্ধ হই তার প্রকাশশৈলীর কৌশলে, প্রচেষ্টার প্রগাঢ়তায়।

যদিও কয়েকটি প্রবন্ধে একই তথ্যের পুনরাবৃত্তি ঘটেছে, তবে সচেতন পাঠকমাত্রই সেটা সহজে বুঝতে পারেন যে, পরিপ্রেক্ষিতের প্রয়োজনেই ঘুরেফিরে এসেছে সেসব তথ্য। কথাগুলো পুনরুক্ত না-হলে সেই পঠ্যমান প্রবন্ধটি পাঠকের কাছে অস্পষ্ট থেকে যেতে পারত। এদেশে সাহিত্যচর্চার এমতাবস্থায় এসে সত্যাশ্রয়ী পাঠোপলব্ধিও অনেকের কাছে ফাঁকা আস্ফালন ঠেকে। তাই আপাতত এখানেই থামছি। তবে ‘এদেশে সমালোচনা সাহিত্য গড়ে উঠছে না’, ‘তরুণরা তেমন পড়াশোনা করছে না’—বড়দের এমন গালভরা বুলির বিপরীতে দাঁড়িয়ে শুধু এটুকু বলব, বিশ্বসাহিত্যের কথা তাদের কতটুকু কাজে আসবে জানি না; তবে নবযাত্রীদের জন্য এ এক অন্যরকম প্রাপ্তি। কথাসাহিত্যের প্রতি আমাদের দুর্বলতা আর দুর্নিবার আগ্রহ যেমন আছে, তেমনই সদিচ্ছাও তৈরি হোক বিশ্বসাহিত্যের কথা জানার প্রতি। তারপর, মোজাফ্ফর হোসেনের এই প্রাঞ্জল কথানদীতে ডুবসাঁতারের পর, পাঠকই বলে দিন, কী পেলেন আর কী পেলেন না তিনি।

মুহিম মনির

জন্ম ২০ জ্যৈষ্ঠ; ১৪০১ বঙ্গাব্দ (০৩ জুন, ১৯৯৪ খ্রি.); নেজামপুর, নাচোল, চাঁপাইনবাবগঞ্জ। চতুর্থ বর্ষের ছাত্র : এমবিবিএস; এম আব্দুর রহিম মেডিকেল কলেজ, দিনাজপুর।

ই-মেইল : monirulislamdjmc24@gmail.com