হোম গদ্য বিশুদ্ধ কবিতা কেন বুঝবার আগেই কমিউনিকেট করে

বিশুদ্ধ কবিতা কেন বুঝবার আগেই কমিউনিকেট করে

বিশুদ্ধ কবিতা কেন বুঝবার আগেই কমিউনিকেট করে
433
0

দান্তের কবিতার উপর আলোচনা করার সময় টি এস এলিয়ট বলেছিলেন :

Genuine poetry can communicate before it is understood.

কী বললেন এলিয়ট?

তিনি শুধু কবিতার কথা বলেন নি, জেনুইন কবিতার কথা বলেছেন। এবং জেনুইন কবিতা কী জিনিস সে-কথাও এই কথার ভিতর বলে দিয়েছেন, মানে, তিনি যেভাবে পেয়েছেন জেনুইন কবিতাকে সেটা বলেছেন। মানে, কমিউনিকেট করার ব্যাপারটা বুঝতে বুঝতে জেনুইন কবিতাকেও চিনবার একটা ব্যাপার আছে তার মতে।


কবিতা ঐরকমই, মানুষ ঐরকমই, প্রকৃতি ঐরকমই, ব্যস? আরও অন্যরকম হতে পারে না? নতুনতর, অভূতপূর্ব হতে পারে না? 


মানে, এ রকম ভাবা যায় যে, বিশুদ্ধ/ খাঁটি কবিতা থাকলে, ভেজাল/ অনুকরণাত্মক কবিতাও আছে। সে ত আছেই। আছে না? থাকবার যুক্তিও আছে। (যেভাবে দেখলে আছে, সেভাবে দেখবার বাইরে অন্যভাবে দেখলে অন্য কিছু থাকতেও পারে।)

কিন্তু বিশুদ্ধ কবিতা, এলিয়ট দেখেছেন, বুঝবার আগেই বুঝ দিয়ে দিচ্ছে।

এ কেমন কথা! কিছু শুনলেন, পড়লেন কিন্তু সেটা বুঝবার আগেই বুঝ দেয় কেমনে! কী বুঝ দেয়? সেটা ডিফাইন কেমনে হয়?  কিন্তু দিচ্ছে যে ব্যাপারটা সহজেই দেখা যাচ্ছে।

তাইলে কমিউনিকেট করাও এক ধরনের বুঝ পাওয়া? কমিউনিকেট করলে সংক্রমিত করা হয়—জ্ঞাপন করা হয়—বুঝ দেয়া হয়—খবর দেয়া হয়। জ্ঞাপন মানে জানাজানি, জ্ঞাপন মানে টের পাওয়া, জ্ঞাপন মানে কিছু আদানপ্রদান হয়ে যাওয়া। হয়ে গেছে বলেই কমিউনিকেট করা হয়েছে। এর ফলে মনকে প্রভাবিত করার কাজটি সারা হয়েছে। এই কমিউনিকেশনের আইডিয়া এলিয়ট পেয়েছেন তলস্তয়ের কাছ থেকে হয়তো।

By words one transmits thoughts to another; by means of art, one transmits feelings. (Leo Tolstoy)

তলস্তয় পেয়েছিলেন এ আইডিয়া সম্ভবত ষোড়শ শতকের ইতালীয় আর্টিস্ট মিকেলেঞ্জেলার কাছ থেকেই। অথবা হঠাৎ অন্য প্রসঙ্গ থেকে পপ আপ হয়েছে তার মনে। আইডিয়া ত কপি হতে থাকেই মানুষের ব্রেইন নামের কপিয়ার মেশিনের দ্বারা। কপি করতে করতে মডিফাই (ধরন নির্ণয় করা) করে বলে বসে—’আই থিংক দিস……’। কিন্তু দুনিয়ার কেয়ামত হওয়ার আগে কেয়ামত হয়ে গেলেও ‘আমি’কে খুঁজে পাওয়ার গ্যারান্টি আছে কি? মার্টিন হাইডেগার দেখলেন সকলেই তুমি।

(Everyone is the other and no one is himself.—Martin Heidegger, Being and Time.)

তবু একটা লেবেলে ত ‘আমি’ শিল্পের মাধ্যমে ‘তুমি’তে প্রবেশ করছে, আচ্ছন্ন করছে, আদানপ্রদান করছে, ম্যান টু ম্যান ইন্টারকোর্স করছে, সম্বন্ধ পাতাচ্ছে, কমিউনিকেট করছে। ‘আমি’ একভাবে আছে আবার ধরতে গেলে নাই কিন্তু অন্য কোনোভাবে ভেতরে ভেতরে থাকা একটা ‘আমি’ পাওয়া যেতেও পারে।

তলস্তয়ের কথাটাকে এভাবেও বলা যায়— 

…essential role of art as a vehicle of communication and empathy.

এমপ্যাথি শব্দটির ভেতর সহজ বাংলা ভাব থাকছে—মায়া। মায়াতে কী আছে? ম্যাগনেটিজম আছে। এই ম্যাগনেটিজমে কী হয়? পারস্পরিক বোঝাপড়া। মানে, পাঠবস্তু আর পাঠকের মধ্যে বোঝাপড়া। (বোঝাপড়ার ভিতরে লড়াইয়ে কনোটেশন থাকতেই পারে।)। তলস্তয় বলছিলেন :

বোঝাপড়া যত স্ট্রং হবে, শিল্পটি তত উত্তম বিবেচিত হবে। (The stronger the infection, the better is the art as art.)

মানে বোঝাপড়ার ডিগ্রি আছে, বুঝের ডিগ্রি আছে। শক্ত করে ধরা আছে, নরম করে ধরা আছে।

কিন্তু বুঝবার আগে টের পাওয়ার যে-বুঝ এই বুঝ এমন এক বুঝ, যে-বুঝ আসলে ঠিক-ঠিক বুঝ পাওয়া না, আবার বুঝ পাওয়াও। একটা বুঝ আক্রান্ত করেছে, একটা অর্থ আচ্ছন্ন করেছে। আচ্ছন্ন হয়েও কেউ বলতে পারেন ‘বুঝি নাই ঠিক কিন্তু ভালো লাগছে।’ তার মানে, না বুঝেও ভালো লাগার ব্যাপারটা রিয়ালিটিতে আছে। আর সেই ভালো লাগার ভিতরে একটা ছায়ামায়া বুঝও আছে। যে-বুঝ কমিউনিকেট করল।

আর বাক্যটির শেষ মাথায় এলিয়ট আন্ডারস্টুড হওয়ার কথা বলেছেন। আন্ডারস্ট্যান্ড হওয়া মানেও বুঝ পাওয়া—অনুধাবন করা—উপলব্ধি করা। মানে এই বুঝ পাওয়া যে, ‘আই লাভ ইউ’ অর্থ ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’ বলা হয়েছে পরিষ্কারভাবে।  এই কারণে পরিষ্কার যে, ‘আমি তোমাকে ভালোবাসি’-এর অর্থ প্রতিষ্ঠিত আছে সমাজে এবং সেটা শেখান হয়েছে। স্থির করা অর্থে বুঝে নেই ভালোবাসার বার্তা। (তবে বলতে পারার মধ্যেই সব সময় ভালোবাসা ষোলআনা আছে কী নাই সেটা অন্য আলাপ।)

আমরা কবিতা, মানুষ ও সামগ্রিক প্রকৃতি কি চিনি? কতটুকু চিনি? কতটুকু জানি? যারা চিনিয়েছেন, যারা জানিয়েছেন, তারা কি নানাভাবে চেনা-জানা করেন নি? তাদের চেনা-জানা ধরেই আমাদের চেনা-জানা হতেই হবে? মানে কবিতা ঐরকমই, মানুষ ঐরকমই, প্রকৃতি ঐরকমই, ব্যস? আরও অন্যরকম হতে পারে না? নতুনতর, অভূতপূর্ব হতে পারে না? ধারণাতীত বা কল্পনাতীত কিছু কি আসতে পারে না আমাদের  বোঝাবুঝির বাউন্ডারির ভিতরে?

তাইলে এলিয়ট কি বললেন না বিশুদ্ধ কবিতাটি বোধগম্য হওয়ার আগে কমিউনিকেট করে, পাঠকের মনকে আচ্ছন্ন করে, এবং তা করার পর একটা সামগ্রিক বুঝও দিল? দশ জন পাঠক দশ ধরনের বুঝ নিতে পারেন কিংবা দশ জন অভিন্ন বুঝ পেতে পারেন।


কবিতার স্বর-সুর, চিত্রকল্প, উপমা, দৃশ্যনির্মাণ, প্রতীক ইত্যাদি পাঠকের মন ছুঁতে পারে কবিতাটির কথার অর্থ বুঝবার আগেই।


এখন শব্দদের স্থিরকৃত অর্থেই এলিয়ট তার উপরোক্ত কথাটির দ্বারা আর কী অর্থ প্রকাশ করলেন দেখা যাক। আবার স্মরণ করি, এলিয়ট কথাটি বলেছিলেন, দান্তে-র কবিতার উপর আলাপ করবার সময়। (Eliot’s essay on Dante, from 1929, included in Selected Essays.)
 দান্তের কবিতার সারপ্রাইজিং দিকটা বলতে গিয়েই কথাটি বলেছেন তিনি। তার আগে বলেছেন :

The enjoyment of the ‘Divine Comedy’ is a continuous process. If you get nothing out of it at first, you probably never will.

সেই কবেকার কবি দান্তে—চতুর্দশ শতকের, জালালউদ্দিন রুমির এক শতক পরের কবি ইতালির দান্তে, এই যুগে, এই একবিংশ শতকে ইতালির ‘সুপ্রিম পয়েট’ বিবেচিত কেবল নন, ক্রিশ্চিয়ান মিস্টিসিজম বুঝবার অতুলনীয় কবি হিশাবেও বিবেচিত।

এলিয়টের কথাটি থেকে এও বের হয় যে, কবিতার স্বর-সুর, চিত্রকল্প, উপমা, দৃশ্যনির্মাণ, প্রতীক ইত্যাদি পাঠকের মন ছুঁতে পারে কবিতাটির কথার অর্থ বুঝবার আগেই। এ হলো এমন ব্যাপার—কেউ ক্লাসিক মিউজিক শুনছে বা জাজ শুনছে, যেখানে কথা নাই, ভাষা নাই কিন্তু মন টানে। শ্রোতা মজা পাচ্ছে। এ যেন এমন যে, একটা প্রাকৃতিক দৃশ্যের দিকে বিমুগ্ধ চেয়ে থাকা দৃশ্যটির বিশ্লেষণ বোঝার আগেই। কবিতার ইমেজও পাঠককে এভাবে ধরে ফেলে? ইমেজ বা সিচুয়েশন বা সিকোয়েন্স আবেগের বিষয়গত সম্পর্ক (objective correlation) রচনা করে ফেলে তাৎক্ষণিকভাবে? যেনবা তা-ই। এছাড়া খাঁটি কবিতাটি সব মিলিয়ে এক ধরনের স্বকীয় প্রভাব (idiosyncratic impact) অন্তর্নিবিষ্ট করে। বাংলা উর্দু ফার্সি ইংরেজি ভাষার বহুপঠিত বিখ্যাত কবিতাগুলো জেনুইন কবিতার উদাহরণ।

আর সুনিশ্চিতভাবে বলা যায়, উপরোক্ত কথাটির মাধ্যমে এলিয়ট এও বললেন যে, কবিতার আসলে কোনো অবজেক্টিভ সেট অব ক্রাইটেরিয়া নাই। নির্ধারিত কন্সট্রাকশন রুলস লঙ্ঘন করেও অসাধারণ নুতন কবিতা আসতে পারে নতুন একটা কন্সট্রাকশন রুল সঙ্গে নিয়ে। বিদ্যমান যৌক্তিক নির্মাণের এপ্রোপ্রিয়েশন-কে ম্লান করে দিয়ে নুতন খাঁটি কবিতা আসতে পারে।

ওদিকে সায়েন্টিফিক গবেষণা দেখায়, কবিতার আনকনশাস এপ্রিসিয়েশন হয়। সেটা হতে পারে ভাষা ছাড়া, ভাষিক অর্থ ছাড়া, শুধু কবিতার মিউজিক্যাল সাউন্ড থেকে নির্দিষ্ট কাব্যবুননশৈলীর সাথে সংযোগ। (‘study has shown that the brain displays a positive electrophysiological response…’। জার্নাল ফ্রন্টিয়ার্স, সায়েন্সডেইলিডটকম)।

ব্যাপারটা মজারই। দেখা গেল, ওয়েলশ (welsh) কবিতার ট্রেডিশনাল একটি নিয়মে (নিয়মটি—Cynghanedd) কিছু পঙ্‌ক্তি রচনা করে এবং কিছু পঙ্‌ক্তি এ নিয়ম ভঙ্গ করে বানিয়ে শ্রোতাদের শোনানো হলো। স্টাডিতে অংশ নিয়েছে ওয়েলশ ভাষার লোকেরাই। তারা Cynghanedd নিয়ম সম্পর্কে কিছুই জানে না। শোনার পর তাদেরকে বলা হলো, তাদের মজা (aesthetically pleasing to the ear) লাগল কিনা।

তারা পরিষ্কার জানায় Cynghanedd নিয়মে রচিত পঙ্‌ক্তিগুলো মজাদার—সুন্দর। মানে, তারা ঐ নিয়মে রচিত পঙ্‌ক্তিগুলো মজাদার বলেছেন ঐ নিয়ম সম্পর্কে কিছুই না জেনে। তাদেরকে যখন জিগ্যেস করা হলো—নিয়ম অনুযায়ী কোন পঙ্‌ক্তিগুলো শুদ্ধ? তারা বলতে পারেন নি। মানে, তাদের ভালো লাগার সাথে নিয়ম জানার কিছু নাই। ফলে এই প্রশ্ন সামনে এল যে, কবিতার বিশেষ শৈল্পিক গঠনের দিকে শ্রোতার সাড়া দেবার ব্যাপারটি কি মস্তিষ্কে সেট করা (hardwared)?

Professor Guillaume Thierry বললেন :

It is the first time that we show unconscious processing of poetic constructs by the brain, and of course, it is extremely exciting to think that one can inspire the human mind without being noticed!

এখন প্রশ্ন, জেনুইন কবিতা, যেটি একটি অনবদ্য শিল্প, এটি কতটুকু শেখানো যায়? ব্যাপারটা কি কিঞ্চিত দিশাদান পর্যন্ত সীমিত?

জংলি ফুলটি পরিচর্যা ব্যতিরেকে মনোহর হয়ে ফুটল। এটি কারো কাছ থেকে কি শিক্ষা পেয়ে ফুটেছে? কে তার ঘ্রাণ নিচ্ছে, কে তাকে দেখে মোহিত হচ্ছে, এসব নিয়ে ফুলটি কি খুব মাথা ঘামাচ্ছেন? ফুলটি অক্ষরবৃত্তে না মাত্রাবৃত্তে না স্বরবৃত্তে না মন্দাক্রান্তা না তোটক ইত্যাদি ছন্দে ফোটে নাই বলে তাকে সুন্দর ফুল বলা থেকে বিরত থাকতে হবে? নতুন সুন্দর নতুন বলেই নতুন সুন্দর।

যদি ভুল হওয়াটাই নতুন সৃজনের দ্বার উন্মোচন করে দিতে পারে, তাহলে শিল্পের সমালোচনাই-বা কী? শিল্প যদি হয় ওয়ান্ডারফুল কিছু, যদি হয় অভিনব ফ্রেশ অ্যাকসেস, তাইলে তা তো অভূতপূর্ব মনোহর কিছু হতেই পারে। সেই অভিনব কিছু আমার বৃত্তাবদ্ধ ধারণার বাইরে হওয়ার কারণে আমার পছন্দ না-হওয়াতে আমি কি বলতে পারি তা শিল্প হয় নি? যদি রায় দেই—’এটা হয় নি’, ‘এভাবে নয়, অন্য কিছু হোক, হওয়া উচিত, এভাবে হওয়া অনুচিত’ ইত্যাদি, তাহলে কি অভিনব শিল্পের জন্যে ধাবমান স্বতঃস্ফূর্ততাকে বাধা দিয়ে ফেলছি না?


আর্ট, মানে সামগ্রিক শিল্প বুঝতে, মানে কেমনে শিল্প হয়, তা কি শিখতে হয় না? হয় এবং হয় না দুইই।


‘স্কুল অব আর্ট ইনস্টিটিউট অব শিকাগো’-এর শিক্ষক জেমস এলকিনস। তিনি শিল্প ইতিহাসবিদ হিশাবে খ্যাত। কোনো শিল্প মাধ্যম নিয়েই পুরুতমশাইগিরি/ ইমামতি/ ওস্তাদি/ নেতাগিরি করবার সুযোগ-যে নাই তা খুব কনভিন্সিং ওয়ে-তে বয়ান করেছেন তিনি। তার কিতাবের নাম ‘হোয়াই আর্ট ক্যাননট বি টট’। ২০৯ পৃষ্ঠার বইটিতে নানা অধ্যায়ে শিল্প নিয়ে বিস্তর বিবেচনা/ আলোচনা বিতর্ক উল্লেখ করেছেন।

এলকিন্সের মতে, শিল্প শেখানোর প্রয়াস হলো, ‘curious endeavor to teach the unteachable’। মানে, যা শেখানো যায় না তা শেখানোর কৌতূহলী প্রয়াস। আর বইটির উপসংহারে ‘The idea of teaching art is irreparably irrational. We do not teach because we do not know when or how we teach.’ জেমস এলকিন্স’র বইটি গুগুলবুকস-এ আছে। তার আরেকটি আলোচিত বই ‘হোয়াট হেপেনড টু আর্ট ক্রিটিসিজম’। তিনি তার আলোচনায় এও এনেছেন যে, কোনো শিল্প ‘শিক্ষা’ পাওয়ার কারণে জনম নেয় না। তিনি কোর ক্যারিকুলাম নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন। এবং তিনিও বলেন : We know very little about what we do’ জেমস এলকিন্স ফিনোমেনন অব আর্ট ক্রিটিকসের অসারতা সম্পর্কেও বিস্তর কথা বলেছেন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এক চিঠিতে জীবনানন্দ দাশকে লিখেছিলেন :

তোমার কবিত্বশক্তি আছে তাতে সন্দেহমাত্র নেই। কিন্তু ভাষা প্রভৃতি নিয়ে এত জবরদস্তি কর কেন বুঝতে পারি নে। কাব্যের মুদ্রাদোষটা ওস্তাদিকে পরিহাসিত করে। বড় জাতের রচনার মধ্যে একটা শান্তি আছে যেখানে তার ব্যাঘাত দেখি সেখানে স্থায়িত্ব সম্বন্ধে সন্দেহ জন্মে। জোর দেখানো যে জোরের প্রমাণ তা নয় বরঞ্চ উল্টো।

কেউ ভাবতেই পারেন, অনেকটা তাই-ই যে, রবীন্দ্রনাথ এই কথা কয়টি দ্বারা সুকৌশলে জীবনানন্দ দাশের স্বতঃস্ফূর্ততাকে আঘাত করেছিলেন। হয়তো জীবনানন্দ মনে কষ্ট পেয়েছিলেন, কেউ জানে না। কিন্তু তার অভিনব ধারাতে তিনি অবিচল থাকেন। ‘শনিবারের চিঠি’ দ্বারাও জীবনানন্দ দাশকে আঘাত করা হয়। তবু তিনি যা করবার জন্যে এসেছিলেন তা-ই করে গেছেন। তার কবিতা বোধগম্য হওয়ার আগেই কমিউনিকেট করে। তার কবিতা ইনফেকশাস।

কিন্তু আর্ট, মানে সামগ্রিক শিল্প বুঝতে, মানে কেমনে শিল্প হয়, তা কি শিখতে হয় না? হয় এবং হয় না দুইই। মানে, ব্যাপারটা এতটুকু কি-না যে শিল্পের সাথে পরিচয় করিয়ে দেন শিল্পের শিক্ষক। কোনো একটা ক্রাইটেরিয়া বা মানদণ্ডের পক্ষে থেকে শিল্প বানানোর তরিকা শেখান তিনি। এই তরিকাটা পক্ষপাতদুষ্ট। কেননা তিনি ত মূলত কোনো এক শর্তের অধীন থেকে উপায় বাৎলে দিচ্ছেন। ইংরেজিতে বলে provide means শিখবার জন্যে। এই শিখানোর পদ্ধতিতে একটা value judgement থাকছেই। একটু মনোযোগে দেখলেই আমরা দেখি সব ধরনের ভ্যালিউ জাজমেন্ট subjective হয়, মানে পক্ষপাতদুষ্ট হয়। তারপর ঐ শর্তসাপেক্ষ শিক্ষা পেয়ে ভবিষ্যতের অসাধারণ শিল্পী ধীরে ধীরে বা কখনও নিজের অজান্তে শিক্ষা পাওয়া শর্ত অমান্য করে উন্মোচন করেন অভূতপূর্ব অনবদ্য একটি শিল্প। তার মানে কি শর্ত বিষয়ক শিক্ষা পেয়েই শর্ত লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটে? নাহ। অবারিত প্রকৃতি থেকে পাঠ নিয়েও ঐ জংলি ফুলটির মতো কারো দ্বারা অসাধারণ শিল্প ফোটান সম্ভব।

শিক্ষা ব্যাপারটার মাঝে ঠিক আর বেঠিক ধারণা হাজির। সেখানে কিছু একটা ঠিক হওয়ার জন্যে অনেক ব্যাপারকে বেঠিক মানতে হয়। অথচ ঠিক বেঠিক মিলে, আলো আর অন্ধকারের সমন্বয়েই শিল্পের সামগ্রিক পরিচয়। আর শিল্প কতটুকু শিখানো যায় তা বুঝে নিতে আমরা ভাবতে পারি এটা যে, কারো মধ্যে যদি শিল্পের ইনবর্ন ফ্যাকাল্টি না থাকে তিনি শিল্পশিক্ষিত হয়ে উঠলেও অসাধারণ শিল্পের জনম দিতে পারবেন না বলা যায়। আর শিল্পকে নানাভাবে ডিফাইন করতে থাকবার পরও ডিফাইন করা বাকি থাকে। থাকে না?

সারওয়ার চৌধুরী

জন্ম ২৪ ডিসেম্বর, ১৯৬৬; চট্টগ্রাম। নানাবাড়িতে। কবি, গল্পকার, প্রবন্ধিক ও অনুবাদক। প্রাক্তন সদস্য, সিলেট প্রেসক্লাব। পড়াশোনা করেছেন ‘ফেঞ্চুগঞ্জ ডিগ্রি কলেজ’-এ (বিকম পরীক্ষা দেন নি)। সহকারী সম্পাদক হিশেবে কাজ করেছেন ‘দৈনিক জালালাবাদ’-এ (১৯৯৩- ১৯৯৭)। বিশ বছর ধরে প্রবাসে। একটি পারফিউম কোম্পানিতে সেলস এগজিকিউটিভ হিশেবে কর্মরত আছেন।

প্রকাশিত বই—

একমুঠো ল্যাবিরিন্থমাখা মায়াবী জীবন তৃষ্ণা [উপন্যাস; শুদ্ধস্বর, ২০০৬]
অচিন মানুষটির নানা রঙের গল্প [উপন্যাস; শুদ্ধস্বর, ২০০৭]
বচনে বন্ধনে ঘ্রাণে প্রশ্নোত্তর ফোটে [প্রবন্ধ; আদর্শ, ২০১২]
শিশির ও ধূলিকণা মায়া [গল্প; শুদ্ধস্বর, ২০১৪]
হারুকি মুরাকামির গল্প ও বচনামৃত [অনুবাদ গল্প; চৈতন্য, ২০১৫]
ভালবাসার চল্লিশ নিয়ম [অনুবাদ উপন্যাস; চৈতন্য, ২০১৬]

ই-মেইল : sarwarch@gmail.com