হোম গদ্য উপন্যাস বিল্লাল হুসেন ওরফে বিল্যাই মিঞা

বিল্লাল হুসেন ওরফে বিল্যাই মিঞা

বিল্লাল হুসেন ওরফে বিল্যাই মিঞা
834
0

২য় পর্বের লিংক

পর্ব-৩

বিল্লাল হোসেন ওরফে বিল্যাই মিঞা। পিতা মৃত. মো. আবেদালী মোল্লা ওরফে ঢ্যাঙ্গা চেয়ারম্যান। দাদা মো. ছবেদালী মোল্লা ওরফে জমিদার। এই তিনটি নাম বলে বিল্যাই মিঞা প্রমাণ করতে চেয়েছিল, সে একজন ভালো মানুষ। এটা কোনো কথা হলো? তা এইসব অদ্ভুত নামের সাথে ভালো মানুষের কী সম্পর্ক? বিরক্তিতে আমার গা জ্বলে ওঠল। তাড়াতাড়ি ঘরে চলে গেলাম। ঘুম যখন আসছেই না তখন আর কী করা। দরজা বন্ধ করে লেখার টেবিলে বসে পড়লাম। কিন্তু লেখা আসছে না। শুধু বিল্যাই মিঞার কথা মনে পড়ছে। একটা ব্যাপার খেয়াল করলাম, আমি যতই বিল্যাই মিঞাকে অ্যাভয়েড করছি, সে ততই আমার চিন্তার মধ্যে ঢুকে পড়ছে। কোনোভাবেই প্রতিরোধ করতে পারছি না।


ছাগলের মতো ম্যাঁ ম্যাঁ করে ডাকলাম। কাজ হলো না। গরুর মতো হাম্বা হাম্বা ডাকলাম। কাজ হলো না। শেষে অসুস্থ মানুষের মতো চিৎ হয়ে শুয়ে রইলাম।


বিল্যাই মিঞা তার নামকরণ বৃত্তান্ত বলতে চেয়েছিল। আমি তার ওপর বিরক্ত ও রাগান্বিত থাকায় সে বলতে পারে নি। একজন মানুষের নাম কিভাবে বিল্যাই মিঞা হয়, সেটা জানার আগ্রহ সবারই থাকার কথা। অথচ আমার আগ্রহ থাকা সত্ত্বেও আমি তাকে বলতে দেই নি। তাকে নিরাশ করে চলে যেতে বাধ্য করেছি। তাকে কষ্ট দিয়েছি। মনে হলো, তারই ফলস্বরূপ আমার ঘুম আসছে না। এটা কি আমার শাস্তি? নাকি প্রায়শ্চিত্ত? ঠিক আছে—আমি আমার শাস্তি বা প্রায়শ্চিত্ত মেনে নিলাম। নাইবা ঘুমালাম একরাত। তবে একরাতের বিনিময়ে আমি বহুরাত সুন্দরভাবে ঘুমাতে চাই। জানতে চাই, এই নামগুলোর সাথে ভালো মানুষের কী সম্পর্ক। এর উত্তর আমাকে জানতেই হবে। তা না হলে তছনছ হয়ে যাবে আমার আরো অনেকগুলো মূল্যবান রাত! এইসব ভাবতে ভাবতে অনেকক্ষণ কেটে গেল। বিল্যাই মিঞার চিন্তা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলার জন্য নানারকম পদ্ধতি অবলম্বন করলাম। যেমন, ছাগলের মতো ম্যাঁ ম্যাঁ করে ডাকলাম। কাজ হলো না। গরুর মতো হাম্বা হাম্বা ডাকলাম। কাজ হলো না। শেষে অসুস্থ মানুষের মতো চিৎ হয়ে শুয়ে রইলাম।

কতক্ষণ কেটে গেছে জানি না, হঠাৎ আমার কপালে একটি হাতের ছোঁয়া অনুভব করলাম। ঘাড় ঘুরিয়ে পেছনের দিকে তাকাতেই হাতটি আমার মাথা চাপ দিয়ে ধরে ফেলল। বুঝলাম পেছনে তাকানো নিষেধ। মুহূর্তে আমার দু’চোখ কালো কাপড়ে বেঁধে ফেলা হলো। হাতটি কপালে রইল আগের মতোই। আমি হাতটি ধরলাম। নরম হাত। যদিও হাতে কোনো চুড়ি নাই তারপরও বুঝতে অসুবিধা হলো না যে, এটি রমণীর হাত। আমার মাথার চুল টেনে দিতে লাগল। আরামে দু’চোখ বন্ধ হয়ে এল। মনে মনে ভাবলাম, নরসুন্দর ফটিক চাঁদ মাঝে মধ্যে এমন আরাম দেয় বৈকি। কিন্তু ফটিক চাঁদের হাত শক্ত। তারপরও সে যখন ম্যাসাজ করে, আরামে ঘুম চলে আসে। রমণীর হাতের পরশে অপার্থিব আরাম পাচ্ছি। সেই আরামের কথা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। এমনকি ভাষা বিজ্ঞানী ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহকে বললেও তিনি এই আরামের কথা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে প্রকাশ করতে পারবেন না। আমি জোর দিয়েই বলছি। কেউ চ্যালেঞ্জ করতে চাইলে সাদরে গ্রহণ করা হবে।

আমি যেন মেঘের দেশে তুলোর মতো ভেসে বেড়াচ্ছি। শরীরের কোনো ওজন নাই, মনে কোনো ক্লান্তি নাই। জগতের সবচাইতে সুখী মানুষ যদি কেউ থেকে তবে এই মুহূর্তে সে মানুষটি আমি।  কিন্তু হায়, আমার সুখ সহ্য হলো না ঘড়ির। কর্কশ শব্দে অ্যালার্ম বাজিয়ে দিলো। আমি ধড়ফড় করে ওঠে বসলাম। সুখ-স্বপ্ন ভেঙে গেলেও আমার কোনোরকম খারাপ লাগা তৈরি হলো না। কারণ তখন সকাল। সকালের স্নিগ্ধ আলোয় ঘর ভরে গেছে। ছানাভরা চোখে সকালের আলো দেখতে লাগলাম আর ভাবতে লাগলাম, অতি অল্প সময়ের জন্য হলেও ঘুমিয়েছিলাম! বেশ, এতেই চলবে। কিন্তু বিল্যাই মিঞাকে আমার চাই।

রাতে ঘুম না হওয়ায় শরীরের ম্যাজম্যাজানি যায় নি। খুবই বিরক্ত লাগছে। এই বিরক্তভাবটা সারাদিন থাকবে। কোনো কাজ না পেয়ে কম্পিউটারে বিভিন্ন ফাইল ঘাঁটাঘাঁটিতে মনোযোগ দিলাম। সময় কাটানোর জন্য এটি অতি উত্তম একটি কাজ। যখন কাজ থাকে না কিংবা কাজ করতে ভালোলাগে না তখন আমি এই মেথডটি কাজে লাগাই। মেথডটি আমিই আবিষ্কার করেছি। হঠাৎ কম্পিউটার স্ক্রিন ঝিরঝির করে উঠল—বুঝলাম এ ফোন কল ইজ কামিং। আমার সেলফোনটি বেজে ওঠল। নাম্বারটি অপরিচিত। রিসিভ করলাম। ওপাশ থেকে ভেসে এল একটি নারী কণ্ঠ।

‘হ্যালো! মহিউদ্দীন আহমেদ বলছেন?’

কণ্ঠে যথাসম্ভব মাধুর্য মিশিয়ে বললাম, ‘হ্যাঁ বলছি।’

ওপাশ থেকে বলল, ‘আমি ডাক্তার অনিতা রহমান।’

আমি বরাবরের মতো কিঞ্চিৎ নার্ভাস হয়ে গেলাম। বললাম, ‘ডু আই নো ইউ?’

‘নো। আই অ্যাম ইউর ফ্যান। আমাকে আপনার চিনবার কথা নয়।’

‘ও আচ্ছা।’

‘উম…আমি কি আপনার সঙ্গে কিছু সময় কথা বলতে পারি?’

‘সিওর।’

‘না মানে লেখালেখি বিষয়ে কিছু কথা ছিল আর কী। আই মিন আপনার লেখালেখি নিয়ে।’

‘বলুন।’

‘গতরাতে আপনার লেখা একটি বই পড়লাম। বইটির নাম শাদা শাদা মেঘ খণ্ড খণ্ড প্রেম এবং মিস অনিতা। ওই বইটি নিয়ে কিছু কথা বলতে চাচ্ছিলাম।’

‘বলুন।’


আমি আপনার সাথে দেখা করি, এক খিলি পান খাইয়ে আমাকে নিঃস্ব করে আপনি লাপাত্তা হন, তাই না? আমি লাজুক হতে পারি কিন্তু অতটা বোকা নই ম্যাডাম।


‘সত্যি বলতে কী, এটি একটি অদ্ভুত বই। না পড়লে বুঝতাম না। বুঝতেই পারছেন আমরা ডাক্তাররা লিটারেচার পড়ার খুব একটা সময় পাই না। মানে ইচ্ছে থাকলেও পড়ে ওঠতে পারি না। কিন্তু আমার এক ফ্রেন্ড আপনার বইটা আমাকে দিয়ে বলেছিল, এটি রিয়েলি অন্যরকম বই। পড়ে দেখিস। মজা পাবি। সেই আগ্রহ থেকেই বইটা পড়া শুরু করেছিলাম। ঘুম আসছিল না। হঠাৎ বন্ধুর কাছ থেকে পাওয়া বইটির কথা মনে পড়ে যায়। সঙ্গে সঙ্গে পড়া শুরু করি। প্রথম পৃষ্ঠা পড়ে আর থামতে পারি নি। খুব স্পিডি লেখা। আপনি সত্যিই চমৎকার লিখেন।’

সামনা-সামনি কেউ আমার প্রসংশা করলে আমি লজ্জায় লাল হয়ে যাই। ভাগ্যিস ভদ্রমহিলা টেলিফোনে আমার প্রশংসা করছেন। তারপরও আমি যথেষ্ট লজ্জা পাচ্ছি। আসলে আমি একজন লাজুক প্রকৃতির মানুষ কিনা। যাই হোক তাকে ছোট্ট করে বললাম, ‘থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ।’

‘আসলে আমি আপনার বইটির গল্প বিষয়ে কিছুু কথা বলতে চাচ্ছিলাম।’

‘অ্যাঁ?’ কিঞ্চিৎ ধাক্কা খেলাম। মনে হচ্ছে আমার গলার ফুলের মালা খুলে জুতোর মালা পরিয়ে দেওয়া হলো। তারপরও বললাম, ‘ঠিকাছে বলুন।’

‘আমি যা বলতে চাচ্ছি তা আসলে ফোনে বলা সম্ভব নয়।’

‘তাহলে ফোন করেছেন কেন?’

‘আই অ্যাম সো স্যরি। মনে হয়েছিল ফোনেই বলব। কিন্তু বলতে গিয়ে বুঝলাম আমি হয়তো ক্লিয়ারলি বলতে পারব না। বলতে পারলেও বোঝাতে পারব না। অথবা আপনি আমাকে ভুল বুঝবেন। হয় না এ-রকম, বলুন?’

‘হু।’

আজকাল ঢাকা শহরের যে অবস্থা—বোরখা পরে মেয়েরা ইয়াবা ব্যবসা করছে। চুরি ছিনতাই রাহাজানিতে তাদের অংশগ্রহণ ভয়ঙ্কররকম। আমি আপনার সাথে দেখা করি, এক খিলি পান খাইয়ে আমাকে নিঃস্ব করে আপনি লাপাত্তা হন, তাই না? আমি লাজুক হতে পারি কিন্তু অতটা বোকা নই ম্যাডাম। মনে মনে কথাগুলো ভাবলাম। বুঝতে পারছি আমি ফেঁসে যাচ্ছি। সুতরাং কথাবার্তায় আরো সাবধান হতে হবে। যেন সে কোনোভাবেই আমাকে আটকাটাতে না পারে। অবাক লাগছে এটা ভেবে যে, একজন লেখকের কি-বা সম্পদ আছে আর ওরা কি-বা নেবে? অথচ সেজন্য কত কষ্ট করে আমার বই জোগাড় করেছে। আমার সম্পর্কে জেনেছে। এখন নিজেকে ডাক্তার পরিচয় দিয়ে সাহিত্যের প্রতি মুগ্ধতা দেখাচ্ছে। বাহ ছিনতাইকারী অনিতা রহমান বাহ!

‘আমি কি আপনাকে বিরক্ত করছি?’

‘না না ঠিক আছে।’

‘আমি কি আপনার সঙ্গে কোথাও দেখা করতে পারি?’

যা ভেবেছিলাম ঠিক তাই। একজন মহিলা চিটারনির খপ্পরে পড়ব ভাবি নি কোনোদিন। এও ছিল কপালে! ‘দেখুন সামনে বইমেলা। প্রচুর লেখালেখির চাপ যাচ্ছে। এখন আমার পক্ষে বাইরে বের হওয়া একদমই সম্ভব না। কোয়াইট ইমপসিবল। স্যরি!’

‘ইটস ওকে। আপনি যদি অনুমতি করেন তো আমি আপনার বাসায় আসতে পারি। বেশি সময় নেব না। এই ধরুন মোর দ্যান থার্টি মিনিটস।’

ও মাই গড! বাসায় এলে তো সব হরিলুট হবে। আমার হাত পা বেঁধে খাটের নিচে ঢুকিয়ে দিয়ে আরামসে সব কিছু ব্যাগে ভরবে। আমার এক দূরাত্মীয় মোস্তফা। কিছুদিন আগে ওদের বাড়িতে এ-রকম ঘটনা ঘটেছিল। মুখোশ পরা ডাকাতরা মোস্তফাদের বাড়ির সব মানুষকে দড়ি দিয়ে বেঁধে খাটের নিচে ঢুকিয়ে দিয়েছিল। তারপর বাসার সব কিছু হরিলুট করে চলে যাওয়ার সময় পুচকে এক ডাকাত বিএসসি ইঞ্জিনিয়ার মোস্তফার পাছায় একটা লাথি মেরে বলেছিল, তিন দিন অফিসে যাবি না। বাসা গোছগাছ করবি। তিন দিন না, মোস্তফা পুরো ৭ দিনের ছুটি নিয়েছিল। হরিলুট তো যেন-তেন ব্যাপার নয়। উদাহরণ দিলেই পাঠককূল বিষয়টা ভালোভাবে অনুধাবন করতে পারবেন। ডাকাতরা মোস্তফাদের বাসার বাথরুমের কলটা পর্যন্ত খুলে নিয়ে গিয়েছিল। আশা করি উদাহরণ যথপোযুক্ত হয়েছে। এদিকে ভদ্রমহিলা আমার কাছে থার্টি মিনিটস সময় চাচ্ছে। আমি এখন কী করব?

‘আপনি চাইলে আমি আজই আসতে পারি। আমার বাসাও ধানমণ্ডিতেই। ১৯ নাম্বার রোডে। আর আপনার বাসা তো—৮/এ। তাই না?’

‘হুঁম! কিন্তু আপনি আমার বাসার ঠিকানা জানলেন কিভাবে?’

‘এ আর তেমন কী? আপনার মতো সেলিব্রেটি লেখকের ঠিকানা জানা কি খুব কঠিন? মোটেই না। তো আজ দুপুরে আসি, কি বলেন?’

‘ঠিকাছে। কিন্তু আগেই বলে রাখছি, কিছু মনে করবেন না, আমি কিন্তু বেশি সময় দিতে পারব না।’

‘দ্যাট’স নো প্রব্লেম। আপনার এক মিনিটই আমার জন্য অনেক।’

‘ঠিক আছে। রাখি।’


বুঝলাম তুমি অর্থমন্ত্রীর জ্ঞাতি ভাই। যারা পাঁচ টাকা দেয় তাদের দরজায় গিয়ে নক কর। ভুলেও কখনো এ দরজায় আসবে না।


ফোন রাখার পর লক্ষ করলাম আমি দরদর করে ঘামছি। উত্তেজনায় আমার ডান হাতের তর্জনী কাঁপছে। একটা সিগারেট ধরালাম। স্বস্তি পেলাম না। দ্রুত বাথরুমে ঢুকে মুখে পানি দিয়ে এলাম। আজ সেকেন্ড নভেম্বর। শীত কাল। তারপরও এসি ছাড়তে হলো। না হলে কোনোভাবেই শরীরের ঘাম শুকানো যাচ্ছিল না। প্রায় আধ ঘণ্টা পরে এসি বন্ধ করলাম। কিন্তু মনের অশান্তভাবটা কোনোভাবেই দূর করতে পারলাম না। শেষে কফি বানিয়ে বারান্দায় গিয়ে বসলাম। দুটো বা আড়াইটার মতো বাজে। এ-সময় বারান্দায় বসে কফি খাওয়াটা বেরসিকের কাজ। পাশের বাড়ির কেউ দেখলে ঠোঁট চেপে হাসতে পারে। তাই ঘরে চলে এলাম। কে এই অনিতা রহমান? বেচারি পেশায় ডাক্তার। লিটারেচার পড়ার সময় নেই। কিন্তু একজন প্রতিষ্ঠিত লেখকের গল্প বিষয়ে কী বলতে চায়? একটার পর একটা সিগারেট শেষ হতে থাকল। কিন্তু কোনোভাবেই দুঃশ্চিন্তামুক্ত হতে পারলাম না।

হঠাৎ কলিংবেলের শব্দে চমকে ওঠলাম। আস্তে আস্তে দরজার কাছে গেলাম। এরই মধ্যে আরো একবার কলিংবেল বাজল। আজ কলিংবেলের শব্দ এত তীব্র হচ্ছে কেন? কেমন ভয় ভয় লাগছে। দরজা খুলে দিলাম। একজন ভিক্ষুক দাঁড়িয়ে। আমার মেজাজটা যতটা-না ভিক্ষুকের ওপর চটলো তার চেয়ে বেশি চটলো দারোয়ানের ওপর। পকেট হাতরে দুই টাকার একটা কয়েন পেলাম। সেটি ভিক্ষুককে দিলাম। কয়েনটা পকেটে ঢুকিয়ে ভিক্ষুক বলল, ‘জনাব! বড়ই আশাহত হইলাম।’

ভিক্ষুক চলে যাচ্ছিল। আমি তাকে ডেকে থামালাম। তার পা থেকে মাথা পর্যন্ত দেখলাম। মধ্য বয়স্ক লোক। ভাঙা স্বাস্থ্য। পরনে ময়লা জামা। সব মিলিয়ে আর দশটা ভিক্ষুকের মতোই দেখতে। শুধু তার বলা বাক্যটি ছাড়া। ‘জনাব! বড়ই আশাহত হইলাম।’ বুঝলাম এটা হচ্ছে আধুনিক ভিক্ষুকের ভড়ং। খুব একটা গায়ে মাখলাম না। বললাম, ‘তুমি আমার কাছে কত টাকা আশা করেছিলে?’

‘না ইয়ে মানে…খানদানি এলাকা। এ এলাকায় পাঁচ টাকার কম কেউ দেয় না কি-না তাই আর কী…’

আমার টাকা ফেরত দাও।’ তার কাছ থেকে আমি দুই টাকার কয়েনটি ফেরত নিয়ে বললাম, ‘বুঝলাম তুমি অর্থমন্ত্রীর জ্ঞাতি ভাই। যারা পাঁচ টাকা দেয় তাদের দরজায় গিয়ে নক কর। ভুলেও কখনো এ দরজায় আসবে না।’ ভিক্ষুকের আর কোনো কথা না শুনে দরজা বন্ধ করে দিলাম। তারপর দারোয়ানকে ডেকে এনে আচ্ছা মতো ঝাড়ি দিলাম।

আমাদের দারোয়ানের নাম আসগর। আসগরের ভাবখানা এমন যে, সে ঝাড়ি খাওয়ার জন্য রেডি হয়েই ছিল। যত ঝাড়ি দেওয়া হবে সানন্দে পুরোটাই হজম করবে। বিষয়টা বুঝতে পেরে বেশিক্ষণ ঝাড়ি দিতে মন চাইল না। বরং মনে হলো, আজ অন্তত তার সাথে সম্পর্কটা ভালো রাখা জরুরি। অনিতা রহমান আসবে দুপুরে। যদি কোনো বিপদে পড়ি তখন একেই কাজে লাগবে। তাই রাগ কমিয়ে শান্ত কণ্ঠে বললাম, ‘কাজে ফাঁকি দেওয়া ঠিক নয় আসগর মিয়া। তোমার অবহেলার কারণে আজ আমার বড় ধরনের ক্ষতি হয়ে যেতে পারত। ভিক্ষুক না হয়ে সে যদি ডাকাত হতো? যদি বাসার সব কিছু হরিলুট করত?’

‘ছার, আমি অনেক বড় অন্যায় করে ফেলছি। আমারে আরো ঝাড়ি মারেন। কম পক্ষে আধা ঘণ্টা ধরে ঝাড়ি না মারলে আমার উচিত শিক্ষা হবে না।’

‘না এত সময় ধরে ঝাড়ি দেওয়ার মতো শক্তি বা ইচ্ছা কোনোটাই আমার নাই। তার চেয়ে তুমি নিজে নিজেই ভুল শুধরে নাও।’

‘ঠিক আছে, ছার। নিচে গিয়া আমি ৫০ বার কান ধরে ওঠবোস করব। এখন যাই। ছিলামালাইকম।’ যেতে উদ্যত হয়েও বলল, ‘ছার, ঝাড়ি তো দিলেন না। কোনো কাজ থাকলে বলেন, ঝটপট কইরা দিয়া যাই।’

‘দুপুরে আমার বাসায় একজন গেস্ট আসবে। তুমি দায়িত্বে অবহেলা করো না। গেটেই থেক।’

‘জি ছার, অবশ্যই।’

আসগর চলে যাওয়ার পর শরীর ছেড়ে দিয়ে সোফায় বসলাম। মনে মনে বললাম, আমি কোন অনিতা রহমানের খপ্পরে পড়ছি একমাত্র আল্লাহ-ই জানেন। আচ্ছা, এখন আমার কী করা উচিত? বিষয়টা থানায় জানিয়ে রাখব কি? না, তা বোধহয় ঠিক হবে না। এতে আমার নামে স্ক্যান্ডাল ছড়াবে। তাছাড়া মানুষ তো আমার কথা কেউ শুনবে না। অনিতা রহমান যা বলবে সেটাই সঠিক বলে ধরে নেবে। এটাই আমাদের দেশের নিয়ম। যাকে বলে লেডিস ফার্স্ট!

৪র্থ পর্বের লিংক

মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ

জন্ম ১ জুলাই ১৯৭৮, ধামরাই, ঢাকা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। পেশায় স্ক্রিপ্ট-রাইটার।

সম্পাদিত ছোটকাগজ : জলসিঁড়ি।

ই-মেইল : mohiuddin_neil@yahoo.com