হোম গদ্য উপন্যাস বিল্লাল হুসেন ওরফে বিল্যাই মিঞা :১০

বিল্লাল হুসেন ওরফে বিল্যাই মিঞা :১০

বিল্লাল হুসেন ওরফে বিল্যাই মিঞা :১০
592
0

৯ম পর্বের লিংক

পর্ব-১০

আমি বললাম, ‘২/৩ বছর আগে আমি একটা সিনেমার চিত্রনাট্য লিখেছিলাম। সেটি বেশ কয়েকটি বিভাগে রাষ্ট্রীয় পুরস্কার পেয়েছিল। আমি অন্যান্যদের সাথে সিনেমাটির লেখক হিশেবে পুরস্কার পেয়েছিলাম। ঐ ছবিটা সেই পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানের।’

বিল্যাই মিঞা এবার দ্বিগুণ বিস্মিত হয়ে বলল, ‘তার মানে আপনি সিনেমা করেন?’

আর এক বিপদ! তাকে পুরো ঘটনা খুলে বলতে হলো। বললাম, ‘আমি একজন লেখক। উপন্যাস লিখি। মাঝে-মধ্যে কেউ কেউ দু’একটা সিনেমার স্ক্রিপ্ট লিখে দিতে বলে। মানে অনুরোধে ঢেঁকি গিলি! সেই অর্থে সিনেমা করি আর কী।

বিল্যাই মিয়া শান্ত হয়ে বসল।

আমি বললাম, ‘তুমি বসো আমি তোমার জন্য চা নিয়ে আসি।’

আমাকে থামিয়ে দিয়ে বিল্যাই মিঞা বলল, ‘ছার, যদি কিছু মনে না করেন তো একটা কথা জিজ্ঞেস করতাম।’

আমি তাকে অভয় দিয়ে বললাম, ‘তুমি নির্দ্বিধায় জিজ্ঞেস করতে পার।’

বিল্যাই মিঞা আমতা আমতা করে বলল, ‘ইয়ে মানে ছার, আপনি কি ম্যারিড না আনম্যারিড?’

আমি বললাম, ‘আমি ব্যাচেলর।’


এটা খুব স্বাভাবিক ব্যাপার যে, পঁয়তাল্লিশ বছরেও কেউ যদি ব্যাচেলর থাকে তবে তাকে দেখে কেউ চমকে উঠতেই পারে।


আমার কথা শুনে হঠাৎ ফুস করে বাতাস বেরিয়ে যাওয়া বেলুনের মতো একেবারে চুপসে গেল বিল্যাই মিঞা। প্রাণহীন ফ্যাকাশে হাসি হেসে বলল, ‘ও তার মানে…এত বড় বাসায় আপনি একলা থাকেন?’

আমি বললাম, ‘হুঁম…তুমি একদম ঠিক ধরেছ।’

বুঝতে পারলাম আমি ব্যাচেলর শুনে বিল্যাই মিঞা ভেতরে ভেতরে চমকালেও আমাকে তা বুঝতে দিতে চাইছে না। এটা খুব স্বাভাবিক ব্যাপার যে, পঁয়তাল্লিশ বছরেও কেউ যদি ব্যাচেলর থাকে তবে তাকে দেখে কেউ চমকে উঠতেই পারে।

বিল্যাই মিঞা বলল, ‘ছার, আমি কি আপনার সাথে রান্না ঘরে আসতে পারি?’

তার মানে সে চা বানাতে চায়। কিন্তু আমি চাই না। তার বানানো চা আমি খাব কি-না সেটা তো তার ভাবা উচিত। কারণ এই কাজটা আমার ব্যক্তিগত ব্যাপার। সে বেশ স্মার্ট। আমার মনের কথাটা বুঝতে পারল। বলল, ‘না না আপনি যা ভাবছেন ঠিক তা না। আমি প্লেট, কাপ-পিরিচ ধুয়ে দিবো। ওইগুলো ধোয়ার আগে আমার দুই হাত ভালো করে ধুয়ে নিবো। টিভিতে দেখে দেখে আমি হাত ধোয়া শিখেছি। নিশ্চই আপনার বাসায় লিকুইড সাবান আছে। আপনি নিশ্চিত থাকতে পারেন আমার কারণে আপনার কোনো ক্ষতি হবে না।’

এভাবে বললে কাউকে না করা না। বললাম, ‘এস।’

বিল্যাই মিঞা আমার সঙ্গে রান্না ঘরে গেল। আমি জানতে চাইলাম সে চা বানাতে পারে কি-না। কাজটা সে পারে কি পারে-না বুঝলাম না কিন্তু সে চা বানানো শুরু করল এবং দক্ষ মানুষের মতো চা বানিয়ে ফেলল। আরো একটা ব্যাপার লক্ষ করে অবাক হলাম। তার চা পরিবেশন করা খুব সুন্দর। মনে মনে ভাবলাম এসব সে শিখল কোথায়? কিন্তু চায়ে চুমুক দিয়ে বুঝলাম, জঘন্য চা। তবুও খেলাম।

বিল্যাই মিঞা আমার দিকে আগ্রহীভঙ্গিতে তাকিয়ে বলল, ‘চা কেমন হয়েছে, ছার?’

তাকে খুশি করার জন্য আমি বললাম, ‘চমৎকার হয়েছে। তুমি যে এত ভালো চা করতে পারো তা ভাবতেই পারি নি।’

বিল্যাই মিঞা বলল, ‘ছার, আপনি টাটকা একটা পাপ করলেন।’

আমি বললাম, ‘কেন?

বিল্যাই মিঞা বলল, ‘আপনি লেখক মানুষ। পাপ-পুণ্য আমার চেয়ে ভালো জানেন। তারপরও মিথ্যা বললেন কেন? আমার চা তো মোটেও ভালো হয় নাই।’

আমার ঠোঁট ও চোখের পাতায় মৃদু কম্পন বয়ে গেল। কেবলমাত্র অতি বিস্ময়ে এমনটা হয়ে থাকে। আমি বিল্যাই মিঞার দিকে বিস্মিত হয়ে তাকালাম।

‘তুমি কেমন করে বুঝলে যে আমি তোমাকে খুশি করার জন্য কথাটা বলেছি?’

‘বুঝা যায়, ছার। এটা বুঝার জন্য বাড়তি কোনো জ্ঞানের দরকার পড়ে না। চোখ-কান খোলা রাখলেই বুঝা যায়।’

কিভাবে বুঝা যায় সেকথা জিজ্ঞেস না করে বরং তার স্ত্রীর কথা মনে পড়ল। সেদিন সে বলেছিল, তার স্ত্রী অসুস্থ। বললাম, ‘তোমার স্ত্রীর কী অবস্থা?’

বিল্যাই মিঞা চায়ে চুমুক দিয়ে বলল, ‘ছার, অনেকক্ষণ পর আপনি মূল কথায় আসলেন। আপনি আসলেই বেখেয়ালি মানুষ।’


আমি পিতা হওয়ার পর থেকে বিল্যাই নামটি বাদ দিয়েছি। এখন শুধু বিল্লাল হুসেন। আপনি বলেন, বিল্লাল হুসেন, তোমার পুত্রের মঙ্গল হোক।


আমি তার দিকে আগ্রহী হয়ে তাকালাম। বিল্যাই মিঞা বলতে লাগল, ‘আমার মতো একজন কান খাউজানিকর মানুষের পক্ষে আলাউদ্দিন মিষ্টি কিনে বেড়াতে আসা চাট্টিখানি কথা নয়। অথচ আপনি সে বিষয়ে কথা বললেন এতক্ষণ পরে। যাই হোক—লেখক মানুষ একটু আধটু বেখেয়ালি তো হতেই পারেন। এটা কোনো ব্যাপার না। এবার শুভ সংবাদটা শোনেন। গত পরশু ভোর রাত্রি ৪টা একুশ মিনিটে আমি চাঁদের মতো ফুটফুটে এক পুত্র সন্তানের জনক হয়েছি।’

আমি হা হয়ে বিল্যাই মিঞাকে দেখতে লাগলাম। এটা তো খুব স্বাভাবিক যে, মিষ্টির প্যাকেট দেখেই আমার জানতে চাওয়া উচিত ছিল, কী কারণে সে আমার বাসায় মিষ্টি নিয়ে এসেছে। আমি অবাক দৃষ্টিতে তার গর্বিত ও সফল মুখটি দেখতে দেখতে বললাম, ‘তেমার পুত্রের মঙ্গল হোক মিস্টার বিল্যাই মিঞা।’

বিল্যাই মিঞা জিহ্বায় কামড় কেটে বলল, ‘না ছার। এভাবে না। কথাটা আবার বলতে হবে। আমি পিতা হওয়ার পর থেকে বিল্যাই নামটি বাদ দিয়েছি। এখন শুধু বিল্লাল হুসেন। আপনি বলেন, বিল্লাল হুসেন, তোমার পুত্রের মঙ্গল হোক।’

আমি বললাম, ‘বিল্লাল হুসেন, তেমার পুত্রের মঙ্গল হোক।’

বিল্যাই মিঞা বলল, ‘থ্যাঙ্ক ইউ, ছার। এইমাত্র আমার মনে হলো, আমি রাজকীয় সম্ভাষণ পেলাম।’

তার কথা বলার ধরন দেখে আমি মৃদু হাসলাম। বললাম, ‘কী নাম রেখেছ তোমার পুত্রের?’

বিল্যাই মিঞা বলল, ‘আগে থেকেই দুইটা নাম ঠিক করা ছিল। কিন্তু কোনটা ফাইনাল করব বুঝতে পারছি না। আপনি কি এ ব্যাপারে আমাকে একটু সাহায্য করতে পারেন, ছার?’

আমি বললাম, ‘নাম না শুনে তো কিছুই বলা সম্ভব না।’

বিল্যাই মিঞা বলল, ‘এক নম্বর চয়েজ সাদ্দাম হুসেন। দুই নাম্বার চয়েজ ওবামা হুসেন।’

আমি বললাম, ‘এক নাম্বারটাই রাখ।’

বিল্যাই মিঞা বলল, ‘কিন্তু ছার, এইখানে একটা ঘাপলা হয়ে গেছে। আমার উয়াইফ সাদ্দাম হুসেন রাখতে রাজি হচ্ছে না। তার মতে, মরা মানুষের নামে পুত্রের নাম রাখলে পুত্রের অমঙ্গল হবে।’

‘তাহলে তো ওবামা ছাড়া গতি থাকছে না।’

বিল্যাই মিঞা বলল, ‘এইখানেও ঘাপলা, ছার। কারণ ওবামার উপর আমি বর্তমানে নাখোশ হওয়া শুরু করেছি। মানে আমি তাকে যা মনে করেছিলাম, সে আসলে তা কি-না সেটা নিয়ে আমার মনে সন্দেহ দেখা দিয়েছে।’

বিল্লাল হুসেনের বিশ্বনেতাদের প্রতি দুর্বলতা দেখে আমি অবাক হলাম। তার সিদ্ধান্ত নেওয়ার ব্যাপারে আমি কোনো সাহায্য করতে পারলাম না। বরং মনে হলো এ ব্যাপারে সে নিজেই ভালো সিদ্ধান্তটা নিতে পারবে। তাই আর কথা বাড়তে দিলাম না। বিল্যাই মিঞা মিষ্টির প্যাকেট খুলে একটা মিষ্টি হাতে নিয়ে বলল, ‘ছার, হা করেন। আমি নিজ হাতে আপনাকে একটা মিষ্টি খাইয়ে দেই।’


আমাকে মিষ্টি খাওয়ানোর পর বিল্যাই মিঞা আমার দিকে মুখ বাড়িয়ে বোয়াল মাছের মতো বিশাল হা করে বলল, ‘ছার, আমাকে একটা মিষ্টি খাইয়ে দেন।’


আমি মিষ্টি খুব একটা খাই না। তারপরও বিল্যাই মিঞার জন্য একটি মিষ্টির চার ভাগের এক ভাগ খেলাম। যদিও বিল্যাই মিঞা পুরোটা খাওয়ানোর জন্য জোড়াজুড়ি করল কিন্তু তাতে কাজ হলো না।

আমাকে মিষ্টি খাওয়ানোর পর বিল্যাই মিঞা আমার দিকে মুখ বাড়িয়ে বোয়াল মাছের মতো বিশাল হা করে বলল, ‘ছার, আমাকে একটা মিষ্টি খাইয়ে দেন।’

আমি বিল্যাই মিঞার মুখে একটা মিষ্টি ছেড়ে দিলাম। সে ৎচ ৎচ শব্দসহযোগে খেতে লাগল আর বলল, ‘আলাউদ্দিনের মিষ্টি অপূর্ব সৃষ্টি।’

মিষ্টিপর্ব শেষ হলে তার স্ত্রীর খবর নিলাম। সংসারের খবর নিলাম। জানা গেল কান খাউজানির পেশায় তার উপার্জন মন্দ না। ছোট্ট সংসার। ভালোই চলে যায়। তাছাড়া বিল্যাই মিঞা বা তার স্ত্রীর অর্থ-বিত্তের প্রতি লোভ-লালসা নাই। কোনোমতে খেয়ে-পরে বেঁচে থাকতে পারলেই সবর্দা সৃষ্টিকর্তার প্রতি শুকরিয়া জানাতে প্রস্তুত বিল্যাই দম্পতি।

আমার পেটে চিনচিনে ব্যথা করছে। তারমানে এখনই ব্রেকফাস্ট করতে হবে। ভাবলাম, বিল্যাই মিঞা গেলেই ব্রেকফাস্ট করব।

কিন্তু বিল্যাই মিঞার চলে যাওয়ার কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। বিল্যাই মিয়া বলল, আমি অনুমতি করলে সে আমার জন্য আর এক কাপ চা বনাতে চায়। সে আশা করছে, এবার ভালো চা বানাতে পারবে। আমি তাকে চা বানাতে বললাম। জানতে চাইলাম, সে নাস্তা করবে কি-না। বিল্যাই মিয়া জানাল সে নাস্তা করে এসেছে।

সে চা বানাতে গেলে আমি ব্রেকফাস্ট শুরু করলাম। জেলি মাখানো দু’পিছ ব্রেড। অল্প সময়ের মধ্যে ব্রেকফাস্ট শেষ হলো।

১১ পর্বের লিংক

মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ

জন্ম ১ জুলাই ১৯৭৮, ধামরাই, ঢাকা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। পেশায় স্ক্রিপ্ট-রাইটার।

সম্পাদিত ছোটকাগজ : জলসিঁড়ি।

ই-মেইল : mohiuddin_neil@yahoo.com