হোম গদ্য উপন্যাস বিল্লাল হুসেন ওরফে বিল্যাই মিঞা

বিল্লাল হুসেন ওরফে বিল্যাই মিঞা

বিল্লাল হুসেন ওরফে বিল্যাই মিঞা
712
0

৮ম পর্বের লিংক

পর্ব-৯

মেয়েটি খিলখিল করে হেসে বলল, ‘বা রে! এই মডার্ন যুগে বয়ফ্রেন্ডকে কেউ কি আপনি বলে? তাছাড়া আমি তো আর মোল্লাবাড়ির বউ হচ্ছি না যে, পর্দানশীল হয়ে, সব সময় আদব-কায়দা মেনটেইন করে চলতে হবে। নট অনলি দ্যাট, তুমি নিজেও তো অবচেতন মনে আপনি থেকে তুমিতে চলে এসেছ। আমি এলে প্রবলেম কী, মাই ডেয়ার?’

আমি চুপ হয়ে গেলাম। যাকে বলে ’থ বনে যাওয়া। প্রথম যখন তার ফোন পেয়েছিলাম তখন মনে হয়েছিল, আমি একজন নারী চিটারনির খপ্পড়ে পড়ছি। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, চিটারনি নয়, লাইফ হেল করা তরুণীর বেড়াজালে আটকা পড়ছি। তার সাহসের তারিফ না করে পারছি না। সে সত্যিকার অর্থেই অদ্ভুত।


বয়ফ্রেন্ড মানে হচ্ছে, কন্ট্রাক্ট বা চুক্তিভিত্তিক পোষা প্রেমিক। চাহিবামাত্র তাকে যখন তখন পাওয়া যাবে। যেকোনো কাজ করানো যাবে। সপ্তাহের ছয়দিন হাড্ডি এবং সপ্তাহান্তে এক টুকরা মাংস খাওয়ালেই সে খুশি থাকবে।


আজকাল মেয়েরা যে এতটা বেলাজ-বেহায়া হয়ে পড়েছে, তা আমার জানা ছিল না। বাবার বয়সী একজন মানুষকে তারা অনায়াসে বয়ফ্রেন্ড বলে সম্বোধন করতে পারে। ছি ছি ছি! ভাবতেই আমার কেমন লাগছে! মেয়েটি তার দীর্ঘ সংলাপে কয়েকটি গুরুতর শব্দ বলেছে। আমি মার্ক করে রেখেছি। যেমন: ক. বয়ফ্রেন্ড খ. বউ (মানে বিয়ে) ও গ. মাই ডিয়ার।

বয়ফ্রেন্ড মানে হচ্ছে, কন্ট্রাক্ট বা চুক্তিভিত্তিক পোষা প্রেমিক। চাহিবামাত্র তাকে যখন তখন পাওয়া যাবে। যেকোনো কাজ করানো যাবে। সপ্তাহের ছয়দিন হাড্ডি এবং সপ্তাহান্তে এক টুকরা মাংস খাওয়ালেই সে খুশি থাকবে। অনিতা মনে করে আমিও ওই ধরনের প্রেমিক হব। পোষা কুকুরের মতো আমিও তার পেছনে ঘুরঘুর করব। এটা যেন মামাবাড়ির আব্দার।

পরের শব্দটি বউ। অর্থাৎ খুব বেশি দিন সে আমার প্রেমিকা হয়ে থাকতে চাচ্ছে না। তার মনে অতি দ্রুত বউ হওয়ার খায়েশ। কেন এত লোভ? আমার কি অনেক টাকা পয়সা?—না। তাহলে সে কেন আমার মতো পঁয়তাল্লিশ বছরের এক লেখকের সঙ্গে নিজেকে জড়াবে? নিশ্চয় তার মনে কোনো গোপন ফন্দি আছে! কী সেটা? আমার সবকিছু হরিলুট করা?—অসম্ভব নয়। তবে আমি অত কাঁচা নই।

মাই ডিয়ার শব্দটি নিয়ে খুব বেশি আপত্তি তুলছি না। শব্দটি এখন বাঙালির খুব আপন হয়ে গেছে। ধারণা করা যেতে পারে, অচিরেই আরো অনেকগুলো শব্দের সাথে (যেমন : স্যরি, বাই, শিট, ওকে, ও ইয়া ইয়া, ফাইন ইত্যাদি।) এই শব্দটিও বাংলা ভাষায় যোগ হবে। তারপরও কি সে আমাকে মাই ডিয়ার বলতে পারে?—না। মাই ডিয়ার বলার মতো রিলেশন আমাদের মধ্যে হয় নি। সুতরাং এটা বলা যায় যে, সে খুবই বিপজ্জনক একটি মেয়ে।

এখন থেকে আমিও সাবধান থাকব। একে এড়িয়ে চলব। আশা করছি, সে আমাকে তার মায়াজালে আটকাতে পারবে না।

‘কি ভাবছ ডিয়ার?’ কথা বলছ না কেন?’ অনিতা বলল।

আমি চমকে উঠলাম। মনেই ছিল না আমার কানে রিসিভার। ভুলে গিয়েছিলাম অনিতার সাথে ফোনে কথা বলছি।

আমতা আমতা করে বললাম, ‘না ইয়ে মানে…’

‘বুঝতে পেরেছি, তুমি সঙ্কোচ করছ। সে-কারণে নিজের অর্ধেক বয়সের একটি মেয়ের সাথে অন্তরঙ্গ ডিসকাশন করতে পারছ না। জড়তা ফিল করছ। যদি আমার ধারণা ঠিক হয়ে থাকে তাহলে আমি মনে করব তুমি এখনও যথেষ্ট ইমম্যাচুউরড। তুমি দেশের নামকরা সাহিত্যিক। গ্লোবালাইজেশনের যুগে তুমি নিশ্চই জানো, পৃথিবী সম্পর্কে। চোখ মেলে তাকিয়ে দেখ, প্রেমের ক্ষেত্রে বয়স কোনো ফ্যাক্টর নয়। দৃষ্টিভঙ্গিটাই আসল কথা। তোমার চারপাশে ভুরি ভুরি উদাহরণ পাবে। অসম বয়সে প্রেম বা বিয়ে কোনো ব্যাপারই না। এগুলো হরহামেশাই হচ্ছে। সো গেট আপ ম্যান!’

অপেক্ষাকৃত আরও দীর্ঘ সংলাপ। মনে হচ্ছে আমি তার ছাত্র। সুযোগ পেয়ে সে আমাকে রীতিমতো পড়িয়ে নিচ্ছে। না এর সাথে আর কথা চালিয়ে যাওয়া ঠিক হবে না। মনে হয় মেয়েটার মাথায় ছিট আছে। আমার উচিত হবে দ্রুত ফোন কেটে দেওয়া।


না বলছ কেন ডিয়ার? আজ থেকে আমাদের নতুন জীবন শুরু হলো। কাল আমরা একে অপরকে সেলিব্রেট করব। আমি একটা গান করব। তুমি শুনবে। অথবা তুমি করবে আমি শুনব।


‘কি, মাইন্ড করলে নাকি?’

আমি বললাম, ‘না ঠিক আছে। মাইন্ড করব কেন?’

‘ইউ আর সো সুইট বয়।’

সে আমাকে টেলিফোনে চুমো দিলো। ঘটনার আকস্মিকতায় আমি হতভম্ব হয়ে গেলাম।

‘এখন ঘুমিয়ে পড়ো। কাল দেখা হবে।’

তার কথা বলার ধরন এমনই আগ্রাসী যে, মনে হচ্ছে সে আমাকে জয় করে নিয়েছে, আমি তার বয়ফ্রেন্ড মানে পোষা কুকুর হয়ে গেছি। এখন থেকে আমি তার কথায় উঠবোস করব। যখন তখন তাকে খুশি করার জন্য ফেউফেউ করব। ঘেউঘেউ করব।

আমি বললাম, ‘না না কাল দেখা হবে না। আমি কাল খুব ব্যস্ত থাকব।’

‘না বলছ কেন ডিয়ার? আজ থেকে আমাদের নতুন জীবন শুরু হলো। কাল আমরা একে অপরকে সেলিব্রেট করব। আমি একটা গান করব। তুমি শুনবে। অথবা তুমি করবে আমি শুনব।’

‘কী গান?’

‘রবীন্দ্রসঙ্গীত। দাঁড়াও এক্ষুণি দু’লাইন শুনিয়ে দিচ্ছি: এসো নীপবনে ছায়াবীথি তলে/কর স্নান নবধারা জলে॥ কেমন লাগল আমার গান?’

‘ভালো।’

‘অনেক দিন প্র্যাক্টিস করি না। প্র্যাক্টিস করা গলায় আমার গান শুনলে তুমি টাস্কি খেয়ে যাবে। কাল শোনাব। আচ্ছা তুমি কী গান পছন্দ কর?’

‘রক গান।’ আমি মিথ্যা বললাম।

‘ও তাই! খুব ভালো। আমিও এখন থেকে রকগান শুনব। আমার ফ্রেন্ড তমাল অবশ্য বলে—বক প্রকৃতির লোকেরা রকগান শোনে।’

‘তুমি তোমার বন্ধুকে আমার হয়ে কষে একটা থাপ্পর দিয়ে দিয়ো।’

‘সত্যি বলছ?’

‘হ্যাঁ।’

‘আচ্ছা দেবো। এবার বলো, আমার সাথে এতক্ষণ কথা বলে তোমার অনুভূতি কী?’

‘অনুভূতি মারাত্মক।’

‘মানে?’

‘দেখা হলে বলব।’

এ পর্যন্তই আমাদের টেলি-কথোপকথন।


আমার পা সালাম শেষে আমার দিকে তাকিয়ে বিল্যাই মিঞা বলল, ‘আপনি বড় কেউ না হলে কি মন্ত্রীসাহেব আপনার গলায় ওড়না পরিয়ে দেয়?’


দুই দিন পরের এক সকালবেলা। কলিংবেল বেজে চলেছে। কিঞ্চিৎ বিরক্ত হয়ে দরজা খুললাম। দেখি, বিল্যাই মিঞা। হাতে মিষ্টির প্যাকেট। মনে মনে ভাবলাম বিল্যাই মিঞা আমার বাসা চিনল কিভাবে?

‘স্যরি স্যার! ফোন না করে সরাসরি বাসায় চলে আসলাম। রাগ করেন নি তো?’ বিল্যাই মিয়া অস্বস্তিমাখা হাসি হেসে বলল।

আমি শান্ত কণ্ঠে বললাম, ‘না ঠিক আছে। এস।’

বিল্যাই মিয়া ভেতরে ঢুকল। আমি তাকে বসতে বললাম। কিন্তু সে দাঁড়িয়েই রইল।

‘তুমি ঠিকানা পেলে কোথায়?’

বিল্যাই মিয়া স্বাভাবিক হেসে বলল, ‘কেন স্যার, ঠিকানা তো কার্ডেই লেখা আছে।’

‘ও!’

এত ক্ষুদ্র ও সহজ একটা ব্যাপার অথচ আমি বুঝতে পারি নি ভেবে বিল্যাই মিঞা হয়তো হাসল। হয়তো মনে মনে ভাবল আমি কতটা বেখেয়ালি মানুষ। বিল্যাই মিঞাকে ড্রয়িং রুমে বসতে বলে আমি ফ্রেশ হতে গেলাম। যেতে যেতে ভাবলাম নতুন করে একটা ভিজিটিং কার্ড বানাতে হবে, যেখানে বাসার ঠিকানা থাকবে না। কখন কোন উটকো ঝামেলা হয়ে যায় কে জানে। টের পাই ইদানীং ভালোই নাম-ডাক হয়েছে আমার। পত্রিকায় ছবি ছাপা হচ্ছে, টেলিভিশনে সাক্ষাৎকার দিচ্ছি। নামডাক হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু মুশকিল হলো—আজকাল নামডাকঅলা লোকেরা হরহামেশা বিপদে পড়ছেন।

মিস অনিতার ব্যাপারটাই ধরা যাক না। সে হয়তো ভিজিটিং কার্ড থেকেই আমার ঠিকানা সংগ্রহ করেছে। সুতরাং খ্যাতির বিড়ম্বনায় পড়ে নাস্তানাবুদ হওয়ার আগে ভিজিটিং কার্ডটা না বদলালেই নয়। হাত-মুখ মুছতে মুছতে ড্রয়িং রুমে এসে দেখি বিল্যাই মিঞা বিস্মিত হয়ে দেয়ালে টানানো আমার ছবি দেখছে। আমি ঘরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে আঁৎকে উঠে বিল্যাই মিঞা বলল, ‘ছার, আপনি যে এত বিখ্যাত মানুষ তা তো জানতাম না।’

ছবিতে সংস্কৃতি মন্ত্রী মহোদয় আমার গলায় বাসন্তি রঙের একটি উত্তরীয় পরিয়ে দিচ্ছেন। মন্ত্রী মহোদয়ের পাশের সুন্দরী তরুণীর হাতে সুদৃশ্য একটি ক্রেস্ট। উত্তরীয় পরানোর পর ওটি আমার হাতে তুলে দেওয়া হবে। বিশিষ্ট ফটোগ্রাফার এমন মুহূর্তে শাটারে চাপ দেওয়ার সাথে সাথে যে ছবিটি উঠেছিল এটি হচ্ছে সেই ছবি।

আমি বললাম, ‘না না, তুমি যা ভাবছ ব্যাপারটা ওরকম নয়। আমি মোটেও বিখ্যাত নই।’

আমার কথাকে বিল্যাই মিঞা বিনয় মনে করল। তারপর আমার দিকে এমনভাবে তাকাল যার অর্থ হলো, আপনি বললেই হলো? হাতের সামনেই তো প্রমাণ রয়েছে আপনি কতটা বিখ্যাত। সে মিষ্টির প্যাকেট রেখে, গায়ের জামায় হাত মুছে নিয়ে ঝুপ করে নিচু হয়ে আমার পা ছুঁয়ে সালাম করতে লাগল।

‘আরে আরে এসব কি করছ!’

আমার পা সালাম শেষে আমার দিকে তাকিয়ে বিল্যাই মিঞা বলল, ‘আপনি বড় কেউ না হলে কি মন্ত্রীসাহেব আপনার গলায় ওড়না পরিয়ে দেয়?’

১০ম পর্বের লিংক

মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ

জন্ম ১ জুলাই ১৯৭৮, ধামরাই, ঢাকা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। পেশায় স্ক্রিপ্ট-রাইটার।

সম্পাদিত ছোটকাগজ : জলসিঁড়ি।

ই-মেইল : mohiuddin_neil@yahoo.com