হোম গদ্য উপন্যাস বিল্লাল হুসেন ওরফে বিল্যাই মিঞা

বিল্লাল হুসেন ওরফে বিল্যাই মিঞা

বিল্লাল হুসেন ওরফে বিল্যাই মিঞা
698
0

৭ম পর্বের লিংক

পর্ব-৮

মেয়েটির সাথে কথা বলে জানা গেল, ওর নাম শিল্পী। ওদের বাড়ি সাভারের পোড়াবাড়ি এলাকায়। সাভার বাসস্ট্যান্ড থেকে ২০ টাকা রিকশা ভাড়া। এলাকার নাম পোড়াবাড়ি হলেও মান্তাদের বসবাসের কারণে মান্তাপাড়া বললেও সবাই চেনে। মান্তারা দুই ভাগে বিভক্ত। যারা সাপ ধরে, সাপের খেলা দেখায়, এবং নানারকম গাছন্তি ওষুধ বিক্রি করে তাদেরকে বলা হয় মান্তা। আর যারা ব্যবসার জন্য নৌকায় নৌকায় ঘোরে, দাঁতের পোকা খোলে এবং চুড়ি বিক্রি করে তারা হলো সান্ধার। মান্তা এবং সান্ধার একই এলাকায় বসবাস করে। শিল্পী একজন মান্তা। প্রায় ১৫ হাজার মান্তা বসবাস করে ওদের এলাকায়।


মান্তা মেয়েরা প্রেম করলে মা-বাবা বিশেষ কিছু বলে না। কারণ এতে মা-বাবার লাভ। মান্তাদের মধ্যে পণ প্রথা প্রচলিত। মেয়ের বাবাকে ছেলের বাবা পণ দেয়।


শিল্পীর কথাবার্তা আচার আচরণ আলাদা। প্রতিটি বাক্যের শেষের শব্দে একটু জোর দিয়ে, টেনে টেনে কথা বলে। সে-কারণে খুব সহজেই তাকে আলাদা করা যায়। খুব অল্প বয়সেই নাকি মান্তা মেয়েদের বিয়ে হয়ে যায়। ১২/১৩ বছর বয়সে লাইন করা (প্রেম) শেখে। মা-বাবা দেশে দেশে গাওয়াল করে বেড়ায়। বাড়ি আসে বকরীদে। অথবা মান্তা সর্দারের বিশেষ কোনো নির্দেশ পেলে। মান্তা মেয়েরা প্রেম করলে মা-বাবা বিশেষ কিছু বলে না। কারণ এতে মা-বাবার লাভ। মান্তাদের মধ্যে পণ প্রথা প্রচলিত। মেয়ের বাবাকে ছেলের বাবা পণ দেয়। ১০/১২ এমনকি ২০ হাজার পর্যন্ত।

শিল্পী ৬/৭ বছর বয়সেই ফুকা করতে শিখেছে। ফুকা মানে গাওয়াল করা। একই বয়সে সাপ ধরাও শিখেছে। স্মৃতিসৌধ, রমনা পার্ক, ধানমণ্ডি লেক, সংসদভবন, ইউনিভারসিটি, সিনেমা হলের সামনে, বড় বড় দোকান-মার্কেট—এসব হলো শিল্পীদের প্রিয় জায়গা। এসব জায়গায় কাল নাগিনী হাতে নিয়ে দাঁড়ালে কম হলেও ২০০/ ৩০০ টাকা ইনকাম হয়। অনেক সময় ৫০০ পর্যন্ত।

সাপ ধরা ওদের কাছে পানির মতো সহজ ব্যাপার। সাপ ধরার কৌশল শেখে ছোটবেলা থেকেই। মায়ের কাছে, বাবার কাছে।

মান্তা পাড়ার প্রধান রাস্তার দুপাশে অনেকগুলো টং ঘর আছে। সেখানে সাপের বাজারে প্রতিদিন পাইকারি ও খুচরা সাপ বিক্রি হয়। ওরা কাউকে ভয় পায় না। ওদের কাছে ভদ্র-অভদ্র, ধনী-গরিব, মন্ত্রি-মিনিস্টার সবাই সমান। সবার সাথে কথা বলে তুই তুকারি করে। ক্ষেত্র বিশেষ ওরা বেশ ভয়ঙ্করও হতে পারে।

একবার এক অফিসের দারোয়ানের সাথে ভয়ঙ্কর ঘটনা ঘটেছিল। শিল্পী অফিসের ভেতরে ঢুকবে কিন্তু দারোয়ান ঢুকতে দেবে না। শেষে দারোয়ান শিল্পীর দিকে বন্দুক তাক করে বলেছিল, ‘এক্কেরে ফুটা কইরা দিমু। ঐ যে দেখছস, রাস্তায় তর বাপের বাপ সার্জন পুলিশ খাড়াইয়া রইছে। এক্কেরে ধরাইয়া দিমু।’

দারোয়ানের কথা শুনে তো শিল্পী হেসে খুন। যদিও ভেতরে ভেতরে ঠিকই রেগে গিয়েছিল। সঙ্গে সঙ্গে দারোয়ানের গলায় তার কাল নাগিনীটি পেঁচিয়ে দিয়ে বলেছিল, ‘আরে বলদ, সার্জনের থিকাও আমরা টাকা লই।’

দারোয়ান তখন ভয়ে অজ্ঞান। রাস্তার মানুষ ছুটে আসে। ছুটে আসে অফিসের ম্যানেজার। শিল্পীকে টাকা দিয়েই তবে বিদায় করে। মান্তা চর্চা আপাতত এখানেই শেষ।


আজ আমার ঘুম আসছে পশ্চিম দিক থেকে। পশ্চিমে মক্কা মদিনা। ইউরোপ। আর দেরি করা যাবে না। দেরি হলেই ঘুম চলে যাবে। আজকে ঘুম পশ্চিম থেকে পূর্বে যাচ্ছে।


রাত এগারটা এক-চল্লিশ। এ সময়টায় আমি যোগ ব্যায়াম করি। এটা করি স্রেফ ঘুমের জন্য। ঘুমাসনে বসে থাকি। ব্যায়ামের সময়ই বুঝতে পারি আমার চোখে ঘুম এসে গেছে। আর তখন চট করে শুয়ে পড়ি। ঘুমাসন খুবই উপকারি। পাঠকদের জ্ঞাতার্থে ঘুমাসন পদ্ধতির অতি সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেওয়া হলো :

ঘুমাসন কী?
ঘুমের নিমিত্তে যে আসন তাই ঘুমাসন।

ঘুমাসনের ধরন?
ঘরের আলো নিভিয়ে মশারির নিচে প্রবেশ করুন। নামাজ পড়ার ভঙ্গিতে বসুন। সামনে পিছে ডানে বামে চারটি বালিশ রাখুন। (ঘুম যেকোনো দিক থেকেই আসতে পারে। আগে যেদিক থেকে আসবে সেদিকে শুয়ে পড়ার জন্য চারটি বালিশের ব্যবস্থা।) চোখ বন্ধ করে সেজদা দেওয়ার ভঙ্গিতে নিচু হয়ে থাকুন। তারপর মনে মনে বলুন :

আজ জোছনা রাতে সবাই গেছে বনে।
আমি যাব না ২ (বার)
(কারণ)  আমি ঘুমাব আমি ঘুমাব॥ (বহুবার)

আজ আমার ঘুম আসছে পশ্চিম দিক থেকে। পশ্চিমে মক্কা মদিনা। ইউরোপ। আর দেরি করা যাবে না। দেরি হলেই ঘুম চলে যাবে। আজকে ঘুম পশ্চিম থেকে পূর্বে যাচ্ছে। আমার পূর্ব পাশের বাড়ির মালিক ডাঙ্কি প্রোফেসর ডক্টর মাখরাজ খান। আমার অপছন্দের মানুষ। নিজের জ্ঞান জাহির করার জন্য সাধু ভাষায় প্রবন্ধ লেখেন। কিন্তু তাঁর বেশিরভাগ প্রবন্ধই চুরি করা বা টুকলিফাই করা।

আমার এক বন্ধুকে ব্যাপারটা বলেছিলাম। বন্ধুটি ভালো মানুষ সাজার জন্য মাখরাজ খানের কাছে কথাটা বলে দিয়েছিলেন। তারপর থেকে মাখরাজ খান আমাকে দেখলে মুখ ঘুরিয়ে নেন। আর এভাবেই আমরা একে অপরের শত্রুতে পরিণত হয়েছি। মাখরাজ খান আমার ঘুম নিয়ে যাবে? তা হতে দেওয়া যাবে না।

ঘুমাতে যাব এমন সময় ফোন বেজে উঠল। খুবই বিরক্ত হলাম। এখন কিছুতেই ফোন রিসিভ করা যাবে না। পর পর দুইবার ফোন বেজে থামল। আমি পুনরায় ঘুমাসন শুরু করলাম। ঘুমাসন কোনো কারণে ব্যাঘাত ঘটলে পুনরায় শুরু করতে হয়। এটাই নিয়ম। কিন্তু আবার ফোন। আমি রেগেমেগে একাকার হয়ে, ঘুমাসন ভঙ্গ করে ফোন রিসিভ করলাম।


মুহূর্তে ওপাশের কণ্ঠের অপরাধ মুছে গেল। ভর করল শঙ্কা। মানে আমার জন্য চিন্তিত হয়ে পড়ল। বলল, ‘কেন, কী হয়েছে? প্লিজ টেল মি। আপনার কিছু হয়েছে শুনলে আমার ভালো লাগবে না। সারারাত ঘুমাতে পারব না।’


আমি হ্যালো বলতেই ও পাশ থেকে একটি কম্পমান অপরাধী কণ্ঠ শুনতে পেলাম। তাকে চিনতে অসুবিধা হলো না। অনিতা। ছোট্ট একটি প্রশ্ন ভেসে এল তারবার্তায়, ‘কেমন আছেন?’

বহুল প্রচলিত ও জিজ্ঞাসিত এই প্রশ্নটির উত্তরে বিশ্বজাহানের মানবজাতি বরাবরই ‘ভালো আছি’ বলে থাকে। কিন্তু আমি উল্টা বললাম, ‘ভালো নাই।’

মুহূর্তে ওপাশের কণ্ঠের অপরাধ মুছে গেল। ভর করল শঙ্কা। মানে আমার জন্য চিন্তিত হয়ে পড়ল। বলল, ‘কেন, কী হয়েছে? প্লিজ টেল মি। আপনার কিছু হয়েছে শুনলে আমার ভালো লাগবে না। সারারাত ঘুমাতে পারব না।’

হাঁটুর বয়সী একটা মেয়ের মুখে এমন কথা শুনে আমার মেজাজ চড়ে গেল। চট করে বলে ফেললাম, ‘তোমার আম্মুকে দাও।’

বুঝলাম ঘটনার আকস্মিকতায় অনিতা যারপরনাই অবাক হয়ে পড়েছে। আমতা আমতা কণ্ঠে বলতে লাগল, ‘ইয়ে মানে আম্মুকে দেবো মানে! আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না। আম্মুর প্রসঙ্গ আসছে কেন?’

আমি বললাম, ‘না এমনিই।’

‘এক মিনিট হোল্ড করুন আমি আম্মুকে ডেকে দিচ্ছি। আম্মুও কিন্তু আপনার ফ্যান।’

আমি বললাম, ‘না না, ডাকতে হবে না।’

‘কেন?’

‘মনে হয়েছিল তার সাথে কথা বলি কিন্তু এখন ইচ্ছে করছে না। তুমি কি কারণে ফোন করেছ বলে ফেল?’

অনিতা বলল, ‘তার আগে বলো, ‘তুমি আমার সাথে এত রাগ করছ কেন?’

ও মাই গড! আমি দেখছি পুরোপুরি ধরা খেয়ে যাচ্ছি! আমাকে সে তুমি সম্বোধন করে ফেলেছে। এখন আমি কী করব? বিষয়টা যে আমার ভালোলাগছে না, সেটা বলে দেওয়া কি উচিত হবে?—হ্যাঁ, বলে দেবো। আমি যা পছন্দ করি না তা বলতে সঙ্কোচ করব না। না হলে পস্তাতে হবে।

আমি বললাম, ‘এই মেয়ে, আমার সাথে তুমি করে কথা বলছ কেন?’

৯ম পর্বের লিংক

মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ

মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ

জন্ম ১ জুলাই ১৯৭৮, ধামরাই, ঢাকা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। পেশায় স্ক্রিপ্ট-রাইটার।

সম্পাদিত ছোটকাগজ : জলসিঁড়ি।

ই-মেইল : mohiuddin_neil@yahoo.com
মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ