হোম গদ্য উপন্যাস বিল্লাল হুসেন ওরফে বিল্যাই মিঞা

বিল্লাল হুসেন ওরফে বিল্যাই মিঞা

বিল্লাল হুসেন ওরফে বিল্যাই মিঞা
677
0

৬ষ্ঠ পর্বের লিংক

পর্ব-৭

ফেরার পথে গেইটে হঠাৎ বিল্যাই মিঞাকে দেখতে পেলাম। সে ভিড়ের মধ্যে ধাই ধাই করে হেঁটে যাচ্ছিল। আমি তাকে সজোরে ডাক দিলাম, ‘এই বিলাই মিঞা!’

বিল্যাই মিঞা পেছন ফিরে তাকাল এবং আমাকে চিনতে পারল। সে দ্রুত আমার কাছে এসে কিঞ্চিৎ ফিসফিস কণ্ঠে বলল, ‘ছি! বুঝদার একজন মানুষ হয়ে আপনি এটা কী করছেন, ছার? রাস্তাঘাটে কাউকে বিল্যাই মিঞা বলে ডাকা কি ঠিক? আমার একটা নাম আছে না?’

আমি রীতিমতো ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেলাম। ভ্যাবচ্যাকা খাওয়া চেহারা দেখে বিল্যাই মিঞা আমার মনের অবস্থা বুঝতে পারল।


মানুষ গরিব হলেও স্বাস্থ্য সচেতন হতে পারে—এটা আমি সব সময় বিশ্বাস করি। বিল্যাই মিঞাকে দেখে আমার সে বিশ্বাস আরো সুদৃঢ় হলো।


‘ঠিক আাছে, ছার। আপনার সাথে আমার একদিনের পরিচয়। আমার সবটা না জানলে তো বিল্যাই মিঞা নামে ডাকাটাই স্বাভাবিক। যাই হোক, কিছু বলবেন? আমার আবার একটু তাড়া আছে।’

আমি বললাম, ‘তোমার সাথে আমার কিছু কথা ছিল।’

বিল্যাই মিঞা বলল, ‘তাহলে চলেন পার্কের ভিতর গিয়ে বসি।’

আমি বললাম, ‘কিন্তু তুমি যে বললে তোমার তাড়া আছে?’

বিল্যাই মিঞা বলল, ‘অসুবিধা নাই, চলেন। আপনার কথা শুনে তারপর যাব।’

বিল্যাই মিঞাকে অনুসরণ করে পার্কের ভেতরে প্রবেশ করলাম।

বিল্যাই মিঞা বলল, ‘কোথায় বসবেন?’

আমি নিয়মিত যে বেঞ্চিটাতে বসি সেখানেই বসলাম। বিল্যাই মিঞা পাশে দাঁড়িয়ে রইল।

আমি বললাম, ‘তুমিও বসতে পার। আমি কিছু মনে করব না।’

বিল্যাই মিঞা ইতস্তত করে বলল, ‘না না। আমি বসব না, ছার। কি বলবেন, বলেন?’

বুঝলাম সে আমার প্রতি সম্মান দেখানোর জন্য বসতে চাচ্ছে না। তারপরও তাকে বসতে বললাম। ‘আরে বসো তো। কিচ্ছু হবে না।’

অবশেষে সে কাঁচুমাচু হয়ে বসল। কোনো কথা বলল না। আমি তার দিকে তাকালাম। ৩৮ কি ৪০ হবে তার বয়স। কিছু চুলে পাক ধরেছে। দাঁতগুলো পরিষ্কার। ক্লিন সেভড। গায়ে ঘিয়ে রঙের ফুলহাতা শার্ট ও কালো প্যান্ট। লোকটাকে দেখে মনে হলো—সে মোটামুটি স্বাস্থ্য সচেতন। ভালো লাগল। মানুষ গরিব হলেও স্বাস্থ্য সচেতন হতে পারে—এটা আমি সব সময় বিশ্বাস করি। বিল্যাই মিঞাকে দেখে আমার সে বিশ্বাস আরো সুদৃঢ় হলো।

বিল্যাই মিঞা অস্বস্তিতে পড়ে গেল। বলল, ‘ছার, এভাবে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন কেন? আমার কিন্তু লজ্জা লাগছে।’

প্রসঙ্গ পাল্টানোর জন্য আমি বললাম, ‘তোমার নাম তো বিল্যাই মিঞাই নাকি?’

বিল্যাই মিঞা বলল, ‘জি ছার, কথা ঠিক। কিন্তু সে নামে আমাকে যেখানে সেখানে সবাই ডাকুক এটা আমি চাই না। এটা প্রেস্টিজের ব্যাপার।’

‘ও। কিন্তু তুমি গতকাল ঠিক এইখানটাতে দাঁড়িয়েই আমাকে বলেছিলে যে, তোমার নাম বিল্যাই মিঞা।’


মেয়েটা আবারও এক গাল হেসে বলল, ‘আমি ডাকলেও আসি না ডাকলেও আসি।’ বলে কাল নাগিনী সাপটা সে আমার সামনে এমনভাবে ধরল, গায়ে লেগে যায় যায় অবস্থা।


‘ছার, এটা আসলে আপনাকে বুঝিয়ে না বললে আপনি বুঝবেন না। পরে কোনো একদিন আপনাকে বলব। আজ সময় কম। আর কিছু বলবেন?’

‘হ্যাঁ। গতকাল তুমি আমাকে বলেছিলে, তুমি একজন ভালো মানুষ। এটা প্রমাণ করার জন্য তোমার নিজের নাম এবং তোমার বাবা ও দাদার নাম বলেছিলে। এটা আমার জন্য একটা অদ্ভুত ব্যাপার মনে হয়েছে। গতরাতে এই ব্যাপারটার জন্য আমি ঘুমাতে পারি নি। আসলে এই নামগুলোর মধ্যে ভালো মানুষের সম্পর্ক কী?’

‘সম্পর্ক আছে, ছার। গভীর সম্পর্ক আছে।’

‘আমি এই ব্যাপারটার ব্যাখ্যা জানতে চাই। গতকাল তুমি আমাকে বলতে চেয়েছিলে কিন্তু আমি শুনি নি। সেজন্য আমি দুঃখিত। আজ শুনতে চাই।’

‘একটা অসুবিধায় ফেলে দিলেন, ছার।’

‘কিরকম?’

‘মানে হয়েছে কী—আমার ওয়াইফ হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েছে। খবর পেয়ে আমি ছুটে আসছি। পথে আপনার সাথে দেখা।’

‘ও। তা কথাটা তুমি আরো আগে বললেই পারতে। তুমি এক্ষুণি যাও।’

‘তাহলে ছার, আপনার ফোন নাম্বারটা দেন। পরে আমি আপনার সাথে যোগাযোগ করব।’

আমি বিল্যাই মিঞাকে আমার ভিজিটিং কার্ড দিলাম। সে আমাকে সালাম প্রদর্শন করে দ্রুততার সাথে চলে গেল।

তার চলে যাওয়া দেখতে দেখতে মনে হলো, স্ত্রীর অসুস্থতার দোহাই দিয়ে সে হয়তো আমাকে অ্যাভয়েড করল। নাকি সত্যি সত্যিই তার স্ত্রী অসুস্থ?

এখানে মন্দ লাগছে না। আমি একা মানুষ। বাসায় ফেরার তাড়া নেই। তবে বেশ ক্ষুধা অনুভব করছি। পেটে চিনচিন ব্যথা করছে। এক প্লেট চটপটি খাওয়া যেতে পারে। অদূরে সালু কাপড়ের বর্ডার দেওয়া চটপটির দোকান। লাউড স্পিকারে মাইজভাণ্ডারী গান বেজে চলেছে। কাস্টমারে সরগরম চটপটির দোকান। দোকানের পিচ্চিটাকে হাত ইশারায় ডাকলাম। কিন্তু সে ভীষণ ব্যস্ত। অন্যদিকে তাকানোর ফুসরত নেই তার। বুঝলাম হাত ইশারায় তাকে পাওয়া যাবে না। তাই সজোরে ডাকলাম। তাতেও কাজ হলো না। এমন সময় হাজির হলো হাতে সাপ প্যাচানো একটি সাপুড়ে মেয়ে।

একগাল হেসে যুবতী মেয়েটা বলল, ‘আমারে ডাকছিস নাকি বাবু?’

আমি রীতিমতো ভড়কে গেলাম, ‘না তো!’

তা মেয়েটা আবারও এক গাল হেসে বলল, ‘আমি ডাকলেও আসি না ডাকলেও আসি।’ বলে কাল নাগিনী সাপটা সে আমার সামনে এমনভাবে ধরল, গায়ে লেগে যায় যায় অবস্থা।

‘কাল নাগিনীরে কিছু দে বাবু!’


ছিপছিপে গড়নের মেয়েটি। পরনে পাড়বিহীন কালো শাড়ি। গায়ে ছোট্ট ব্লাউজ। কোমরে বিছা। নাক, কান ও গলায় সুন্দর গহনা। হাত ভর্তি চুড়ি। একগাল হেসে যা বলল, তা প্রিন্ট অনুপযোগী।


চিন্তা করতে লাগলাম এর হাত থেকে কিভাবে বাঁচা যায়। শুনেছি সাপুড়ে মেয়েরা খুব জাঁদরেল হয়। মানুষকে নাকানিচুবানি খাওয়াতে তারা ওস্তাদ। এখন হাতে নাতে প্রমাণ পাচ্ছি। আজ হয়তো সে আমার বারোটা বাজিয়ে ছাড়বে। আমি লেখক মানুষ। ভয় পাওয়া যাবে না। এই মেয়েটিও হতে পারে আমার পরবর্তী উপন্যাসের নায়িকা। সুতরাং তাকে ভালোভাবে জানা দরকার। মনে সাহস সঞ্চয় করে বললাম, ‘তোমার নাগিনীকে আমি টাকা দেবো। তার আগে তুমি আমার সঙ্গে কিছুক্ষণ কথা বলো।’

ছিপছিপে গড়নের মেয়েটি। পরনে পাড়বিহীন কালো শাড়ি। গায়ে ছোট্ট ব্লাউজ। কোমরে বিছা। নাক, কান ও গলায় সুন্দর গহনা। হাত ভর্তি চুড়ি। একগাল হেসে যা বলল, তা প্রিন্ট অনুপযোগী।

বুঝলাম তার বেফাঁস কথা বন্ধ করতে হলে টাকা খসাতে হবে। ১০০ টাকার একটা নোট দিলাম।

সে খুশি হয়ে বলল, ‘তুই কী কোটিপতি না লাখপতি?’

আমি বললাম, ‘আমি লাখপতিও না কোটিপতিও না। আমি হাজারপতি।’

‘বিশ্বাস হলো না। হাজারপতি হলে কেউ ১০০ টাকা দেয় না।’

আমি বললাম, ‘আমি তোমাকে আরো ১০০ টাকা দেবো। বিনিময়ে তুমি আমাকে স্যার বলো।’

সঙ্গে সঙ্গে সে বলল, ‘দে স্যার। আরো ১০০টাকা দে।’ বলেই সে আমাকে ঘেঁষে দাঁড়াল।

আমি নড়েচড়ে বসলাম। কাল নাগিনী দেখে ভয় পেলেও ওকে বুঝতে দিলাম না। একটু সরে বসলাম।

বললাম, ‘সাপটি ঝাপিতে ঢুকিয়ে আমার পাশে বসো।’

মেয়েটি আমার কথা শুনল। ঝাঁপিতে কাল নাগিনী রেখে বলল, ‘আগে টাকা দে, পরে কথা।’

আমি বললাম, ‘আমাকে ‘আপনি’ সম্বোধন করে বললে টাকা দেবো।’

মেয়েটি সঙ্গে সঙ্গে বললো, ‘আপনি টাকা দে, স্যার।’

আমি বললাম, ‘বলো, ১০০ টাকা দেন, স্যার।’

সে শুদ্ধভাবে বলল। আমি তাকে ১০০ টাকা দিলাম।

৮ম পর্বের লিংক

মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ

জন্ম ১ জুলাই ১৯৭৮, ধামরাই, ঢাকা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। পেশায় স্ক্রিপ্ট-রাইটার।

সম্পাদিত ছোটকাগজ : জলসিঁড়ি।

ই-মেইল : mohiuddin_neil@yahoo.com