হোম গদ্য উপন্যাস বিল্লাল হুসেন ওরফে বিল্যাই মিঞা

বিল্লাল হুসেন ওরফে বিল্যাই মিঞা

বিল্লাল হুসেন ওরফে বিল্যাই মিঞা
702
0

৫ম পর্বের লিংক

পর্ব-৬

দশ মিনিট পরে খাউজানি বরকত এসে আমাকে সালাম দিয়ে বলল, ‘ছার, আমাকে স্মরণ করছেন?’

সঙ্গত কারণেই আমি বললাম, ‘না।’

‘কিন্তু ব্যাটারি চাচায় যে বলল!’

‘ওই লোকটার নাম বুঝি ব্যাটারি?’

‘জি ছার। পুরান-ধুরান ঐ মোবাইলটা নিয়া ৫/৬ মাস হলো সে নিউলি বিজনেস শুরু করছে। তবে সে লোক ভালো। পরহেজগার। পাঞ্জেগানা নামাজ পড়ে। তো সে বলল, আপনি নাকি আমাকে খুঁজছেন?’

‘না ঠিক তোমাকে নয়, কিন্তু তোমার মতোই একজনকে খুঁজছি।’

‘বুঝলাম না, ছার।’

‘মানে সেও তোমার মতো মানুষের কান খাউজায়।’

‘ও। আপনি মনে হয় বিল্যাই ভাইরে খুঁজছেন?’

‘রাইট। দেখেছ তাকে?’

‘না। আজ আমি তারে দেখি নাই। আপনিও তার দেখা পাবেন না।’

‘কেন, তার দেখা পাব না কেন?’

‘কারণ আজ সে চন্দ্রিমা উদ্যানে আছে। এদিকে আসবে না।’

‘ও আচ্ছা। তথ্যটা দেওয়ার জন্য তোমাকে ধন্যবাদ।’

‘ছার, যদি কিছু মনে না করেন তো একটা কথা বলতাম।’

‘বলো।’


খুশির উত্তেজনায় তার কালো-মোটা ঠোঁট দুটো কেঁপে উঠল। ‘সেইটা আগে বলবেন না, ছার? যে জন্য তাকে খুঁজছেন সে জিনিসও আমার কাছে আছে। একেবারে টাটকা মাল। আবগানিস্তানি।’


‘না মানে বলছিলাম কী, আমিও অনেকদিন ধরে ভদ্রলোকদের কান খাউজাই। তা ধরেন ৭/৮ বছর তো হবেই। এখন পর্যন্ত কোনো অ্যাকসিডেন্ট হয় নাই। আপনি যদি চান তো আমি আপনার কান খাউজাইয়া দেই। আপনি আরাম পাবেন। আপনার ঘুম এসে যাবে। ঘুম না এলে পয়সা ফেরত।’

‘তোমার কথা আমি বুঝতে পেরেছি। কিন্তু আমি আসলে কান খাউজানোর জন্য বিল্যাই মিঞাকে খুঁজছি না।’

‘ও বুঝতে পারছি।’ খুশির উত্তেজনায় তার কালো-মোটা ঠোঁট দুটো কেঁপে উঠল। ‘সেইটা আগে বলবেন না, ছার? যে জন্য তাকে খুঁজছেন সে জিনিসও আমার কাছে আছে। একেবারে টাটকা মাল। আবগানিস্তানি।’

বাটারি চাচার কথার সাথে মিল পেলাম।

আমি বললাম, ‘তুমি গাঁজার কথা বলছ তো। ও জিনিস আমি খাই না।’

‘তাহলে? কোনো সমস্যা, ছার?’

‘তুমি কি এখন বিল্যাই মিঞার সাথে আমার যোগাযোগ করিয়ে দিতে পার?’

‘সম্ভব না, ছার। তার একটা মোবাইল ফোন ছিল। এই মাসেই বিক্রি করে দিয়েছে।’

‘থ্যাঙ্ক ইউ বরকত। আমাকে সময় দেওয়ার জন্য তোমাকে ধন্যবাদ।’

‘থ্যাঙ্ক ইউ দিয়ে ছোট করবেন না, ছার। যদি অনুমতি করেন তাহলে একটা কথা জিগাইতাম।’

‘জিগাও।’

‘বিল্যাই মিঞার সাথে আপনার কত দিনের পরিচয়?’

‘একদিনের পরিচয়।’

‘বলেন কী, ছার! মাত্র একদিনের পরিচয়ে তার জন্য বসে আছেন! আজব ব্যাপার তো।’

‘কেন, আমি কি অন্যায় করে ফেলেছি?’

‘না না আমি তা বলি নাই। সে কি আপনার সাথে বেয়াদবি করেছে?’

‘না। কিন্তু সেরকম অভ্যাস আছে নাকি তার?’

‘তা নাই। তবে বেয়াদবি করতে কতক্ষণ? এক মুহূর্ত সময়ের মধ্যে কত কিছুই তো ঘটে যেতে পারে, তাই না?

‘না সে আমার সাথে বেয়াদবি করে নাই।’

‘তাহলে কি সে আপনার কানে খোঁচা দিয়েছে?’

‘বরকত মিয়া, এত প্রশ্ন করে লাভ নাই। তুমি আসল ব্যাপারটা জানতে পারবে না। মানে আমি তোমাকে বলব না।’

আমার কথায় বরকত লজ্জা পেল। অতি লজ্জায় তার কালো মুখটা আরো কালো হয়ে গেল। আর কিছুই বলতে সাহস পেল না। অবশেষে চলে যাওয়ার জন্য অনুমতি চাইল।

‘আমি যাই?’

আমি বললাম, ‘তুমি আমার কান চুলকে দিতে পার?’


আমি খুশি হয়ে তাকে কিছু দিতে চাইলাম। সে কিঞ্চিৎ বিস্মিত হলো। জানতে চাইল, ‘কী কারণে আপনি আমাকে কিছু দিতে চাইছেন?’


সঙ্গে সঙ্গে সে খুব খুশি হলো। মানুষ তার প্রত্যাশার চেয়ে বেশি কিছু পেলে যেমন খুশি হয় তেমন খুশিতে তার মুখে ঢেউ তুলল। সে আমার কান চুলকে দেওয়া শুরু করল। বুঝলাম সে বেশ যত্ন নিয়ে কাজ করে। আমার ভালোলাগছে। ঘুমও আসছে। কাল সারারাত নির্ঘুম ছিলাম। আমার চোখ ভরা টইটম্বুর ঘুম। বরকত অহঙ্কারের সাথে তার কাজ করতে লাগল। অল্প সময়ের মধ্যে আমার চোখ বুজে এল। কয়েক মিনিটের ঘুম। তারপরও আমি বেশ শান্তি পেলাম।

বরকত মিয়া চলে যাওয়ার পর আমি এক কাপ লিকার চা খেলাম। চা খাওয়ার সাথে সাথে বুঝতে পারলাম  অনেক ক্ষণ ধরে সিগারেট খাই না। সিগারেট ধরাতে যাব এমন সময় দূর থেকে একজন গার্ড ধমকের সুরে বলল, ‘পার্কের ভিতরে ধূমপান নিষেধ।’

আমি লজ্জা পেয়ে সিগারেটটি প্যাকেটে ভরে রাখলাম। লজ্জা পেলেও আমার ভালো লাগল এই ভেবে যে, আমার দেশের মানুষের মন উন্নত হয়েছে। আজ একজন গার্ড আমাকে ঝাড়ি মেরে জানিয়ে দিলো, পার্কের ভিতরে সিাগারেট খাওয়া নিষেধ। কথাটা তো আমিও জানি। দেশের সব মানুষ জানে। কিন্তু কয়জন তা মেনে চলে?

গার্ডের প্রতি আমার মনটা সদয় হলো। আমি খুশি হয়ে তাকে কিছু দিতে চাইলাম। সে কিঞ্চিৎ বিস্মিত হলো। জানতে চাইল, ‘কী কারণে আপনি আমাকে কিছু দিতে চাইছেন?’

‘স্রেফ খুশি হয়ে।’

‘তা, কী দিতে চাইছেন?’

‘টাকা।’

সে বলল, ‘তাড়াতাড়ি দেন। কারণ কেউ দেখে ফেললে তাকে ভাগ দিতে হবে।’

তাকে পঞ্চাশটি টাকা দিলাম। কিন্তু সে তাতে খুব একটা খুশি হলো না।

আমি অবাক হয়ে বললাম, ‘কী ব্যাপার? টাকা পেয়ে তোমার মুখটা খুশি না হয়ে মলিন হয়ে গেল কেন?’

‘না মানে ছার, আজকালকার যুগে পঞ্চাশ টাকা দিয়ে কিছু হয় না। বুঝেনই তো, উপহারের টাকা উপহার খাতেই খরচ হয়।’

‘মানে কী? তুমি এই টাকা কাউকে উপহার দিবে নাকি?’

‘সেটা তো হতেই পারে। আবার দেখা গেলো বন্ধু বান্ধব নিয়ে মোজ করলাম। মানে পঞ্চাশ টাকায় কিছু হয় না।’

‘তাহলে কি আমি টাকাটা ফেরত নিয়ে নেব?’

‘নিলে নিতে পারেন।’

‘আমাদের দেশের ট্রাফিক পুলিশ দুই টাকা দিলেও নেয়। পুলিশ যদি দুই টাকা নিতে পারে তুমি নেবে না কেন?’

‘ভুল বললেন। ওদের চাইতে আমরা ভালো আছি। আমাগো ইজ্জত আছে।’

লোকটার সাহসের তারিফ না করে পারছি না। বড় কলিজার মানুষ। আমি মুহূর্তে তার ভক্ত হয়ে গেলাম। একশ টাকা দিলাম। একশ টাকা পেয়ে সে মোটামুটি খুশি হলো। বলল, ‘এইবার ঠিক আছে, ছার।’

আমি বললাম, ‘তুমি কি জানো, আমি তোমাকে কেন টাকাটা দিলাম?’

সে বলল,  ‘একটু আগেই তো বললেন খুশি হয়ে দিলেন। জানব না কেন?’

আমি বললাম, ‘কারো প্রতি খুশি হওয়ার তো একটা কারণ থাকে, তাই না?’

সে বলল ‘অবশ্যই, ছার। কারণ না থাকলে খুশি হবেন কিভাবে? কারণ ছাড়া গাছের পাতাও নড়ে না। দেখেন গাছের পাতা সব নড়তেছে। কারণ? বাতাস।’


জীবনে আজিব মানুষ অনেক দেখছি। কিন্তু আপনি হচ্ছেন আজিবের আব্বা। আপনি আবার এলে আমি আপনার আশে-পাশেই থাকব।


আমি বললাম, ‘হ্যাঁ বুঝতে পেরেছি। এবার আমার কথাটা শোনো। তোমার সচেতনতা জ্ঞান দেখে আমি তোমাকে ১০০ টাকা দিয়েছি।’

সে বলল, ‘কী জ্ঞান?’

আমি বললাম, ‘সচেতনতা জ্ঞান। মানে একটু আগে আমি সিগারেট ধরাতে যাচ্ছিলাম। কিন্তু তুমি আমাকে ধমকের সুরে বললে, লেকের ভিতরে ধূমপান করা নিষেধ।’

সে এক গাল হেসে বলল, ‘আপনি দেখি খুবই বোকা মানুষ। এইরকম ফালতু কারণে কেউ কাউরে টাকা দেয়? এটা তো আমার কথা না। সরকারের কথা। সাইনবোর্ডে লেখা আছে। দেখেন নাই?’

‘তারপরও এর কৃতিত্ব তোমার। আমি কি নিজে জানি না, এখানে সিগারেট খাওয়া নিষেধ? অথচ সেই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে সিগারেট ধরাতে যাচ্ছিলাম। কিন্তু তুমি আমাকে সাবধান করায় আমি ভুলটা করতে পারলাম না। তাহলে কৃতিত্বটা কার?’

সে বলল, ‘ধন্যবাদ, ছার। ভাবছিলাম এই টাকা দিয়ে মোজ করব। এখন মনে হলো এই টাকা দিয়ে মোজ করা যাবে না। ভালো মানুষের টাকা! নিজের সন্তানের হাতে দেবো।’

গার্ডের কথা শুনে আমার খুব ভালো লাগল। বললাম, ‘তোমার কয়টা সন্তান?’

সে বলল, ‘আবার জিগায় কয়টা! একটা। ছেলে হোক মেয়ে হোক একটাই যথেষ্ট, জানেন না?’

আমি বললাম, ‘ও আচ্ছা। তা ছেলে না মেয়ে?’

সে বলল, ‘মেয়ে। নাম শাবনূর।’

আমি বললাম, ‘ও আচ্ছা। খুব ভালো। খোদা হাফেজ।’ আমি চলে যাচ্ছিলাম। সে আমাকে থামাল।

‘ছার, আমার মেয়ের নাম আপনার পছন্দ হয় নাই?

‘পছন্দ হবে না কেন? সুন্দর নাম।’

‘শাবনূর কে, আপনি জানেন?’

‘জানি। সে একজন অভিনেত্রী।’

‘বাহ আপনি দেখি সব খবরই রাখেন। আবার কবে আসবেন?’

‘ঠিক নাই। কেন বলো তো?’

‘আপনারে আমার খুব ভালো লেগেছে। জীবনে আজিব মানুষ অনেক দেখছি। কিন্তু আপনি হচ্ছেন আজিবের আব্বা। আপনি আবার এলে আমি আপনার আশে-পাশেই থাকব।’

‘ও আচ্ছা।’

‘কেন আশে-পাশে থাকব জিগাইলেন না?’

‘বল।’

‘আমি দূর থেকে দেখব আপনি কখন সিগারেট ধরান। যখন সিগারেট ধরাতে যাবেন ঠিক তখনই আপনাকে একটা ধমক দেবো হা হা হা…

৭ম পর্বের লিংক

মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ

মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ

জন্ম ১ জুলাই ১৯৭৮, ধামরাই, ঢাকা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। পেশায় স্ক্রিপ্ট-রাইটার।

সম্পাদিত ছোটকাগজ : জলসিঁড়ি।

ই-মেইল : mohiuddin_neil@yahoo.com
মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ