হোম গদ্য উপন্যাস বিল্লাল হুসেন ওরফে বিল্যাই মিঞা

বিল্লাল হুসেন ওরফে বিল্যাই মিঞা

বিল্লাল হুসেন ওরফে বিল্যাই মিঞা
1.65K
0

৪র্থ পর্বের লিংক

পর্ব-৫

বিকেলে বিল্যাই মিঞার উদ্দেশে ধানমণ্ডি লেকে গেলাম। তাকে খুঁজতে খুঁজতে পুরো লেকে একটা চক্কর দিলাম। কিন্তু কোথাও পাওয়া গেলো না তাকে। অনেকক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে টায়ার্ড হয়ে পড়লাম। যে বেঞ্চিটাতে আমি নিয়মিত বসি সেটায় বসলাম। এদিক-ওদিক তাকাতাকি করতে লাগলাম। মনে হতে লাগল, এখনই বিল্যাই মিঞার দেখা পেয়ে যাব। নিজেই নিজেকে আশ্বস্ত করলাম, চিন্তার কিছু নাই—দেখা হবে। কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে—এই যা।


সামনে দণ্ডায়মান লোকটি এমন এক ফ্রি অফার দিয়েছে যা খুবই অভিনব। সরাসরি কিনতে হবে না। শুধু তাকে কিছু টাকা সাহায্য করলেই হবে। তাকে এখন এক টাকা দিলে হাশরের মাঠে সুদাসলে সত্তর টাকা এবং বোনাস পাওয়া যাবে সত্তরখানা নেকি!


যদিও অপেক্ষা করতে আমার কোনো আপত্তি নাই। কেননা আজ আমাকে ‘বিল্যাই-রহস্য’ উদঘাটন করতেই হবে। কারণ এই বিল্যাই মিয়াকে কেন্দ্র করে গতরাতে একফোটাও ঘুমাতে পারি নি। ফলে তার সাথে দেখা না করে বাসায় যাওয়া যাবে না। প্রয়োজনে সারা দিন এখানে বসে থাকব। শুনব—কী কারণে সে একজন ভালো মানুষ।

একজন বয়স্ক ল্যাংড়া ভিক্ষুক এসে আমাকে বাংলা তর্জমাসহ সালাম দিলো, ‘আসসালামু আলাইকুম! জনাব আপনার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক।’

বুঝতে বাকি রইল-না সে একজন মজার মানুষ। আমিও তার মতো করে সালামের উত্তর দিলাম, ‘ওয়ালাইকুম সালাম। আপনার ওপরও শান্তি বর্ষিত হোক!’

ল্যাংড়া ভিক্ষুক খুশি হয়ে বলতে লাগল, ‘ছার, আমার একটা ব্যাটারি কেনা খুব প্রয়োজন। দয়া করে কিছু টাকা সাহায্য করুন। গরিবরে এক টাকা দিলে কাল হাশরে সত্তর টাকা পাবেন। সাথে বোনাস পাবেন সত্তর নেকি।’

এতদিন নানারকম চটকদার বিজ্ঞাপন দেখেছি, শুনেছি। যেমন চা কিনলে চামচ ফ্রি, গরু কিনলে রামদা ফ্রি, ঝালমুড়ি কিনলে ঠোঙ্গা ফ্রি কিংবা বিয়ে করলে শ্যালিকা ফ্রি। (একটু থামুন। যারা নিয়মিত বঙ্গদেশের টিভি নাটক দেখেন তারা এই ফ্রি অফারগুলোর সাথে পরিচিত আছেন নিশ্চয়।) কিন্তু আমার সামনে দণ্ডায়মান লোকটি এমন এক ফ্রি অফার দিয়েছে যা খুবই অভিনব। সরাসরি কিনতে হবে না। শুধু তাকে কিছু টাকা সাহায্য করলেই হবে। তাকে এখন এক টাকা দিলে হাশরের মাঠে সুদাসলে সত্তর টাকা এবং বোনাস পাওয়া যাবে সত্তরখানা নেকি!

আমি তার সাথে একটু মজা করার জন্য বললাম, ‘বোনাসের পরিমাণ এত কম কেন? ১০০% হলে ভালো হতো না?’

মুহূর্তের জন্য সে আমার দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে আমাকে পড়ে নিল। এই কিসিমের মানুষ চোখ দেখে মানুষ বুঝতে পারে। সে হয়তো বোঝার চেষ্টা করছে আমার কাছ থেকে টাকা খসাতে পারবে কি-না।

‘ছার-গো! কত টাকা কতখানে ব্যয় হয়। আজকে না হয় কিছু টাকা গরিবের পেছনে ব্যয় হলো। কিছু টাকা পেলেই আমি একটা ব্যাটারি কিনতে পারি।’

তার অভিনব ভিক্ষা কৌশল জানার জন্য আমি কিঞ্চিৎ আগ্রহী হলাম, ‘ব্যাটারি! কিসের ব্যাটারি কিনবেন?’

‘আমার এই মোবাইলটার ব্যাটারি, ছার।’ পাঞ্জাবির পকেট থেকে পুরনো একটা মোবাইল বের করে অভ্যস্ত হাতে সেটি পটাপট খুলে ফেলল।


সে সুর করে বলতে লাগল, ‘কান থাকতেও যেমন কোনো কোনো মানুষ শুনতে পায়-না আমার অবস্থাও ঠিক সেরকম। আমার মোবাইল আছে কিন্তু কারো সাথে যোগাযোগ করতে পারছি না।


মোবাইলের ব্যাটারি খুলে বলতে লাগল, ‘দেখেন, ছার। আজ থেকে পাঁচ মাস আগে আপনার মতো এক সাহেব আমাকে ভালোবাসে এই মোবাইলটা গিফট করেছিলেন। তখন কত ভালো ছিল জিনিসটা। কিন্তু এখন এই যন্ত্রটার কারণে গত তিনদিন ধরে আমি কারো সাথে যোগাযোগ করতে পারছি না। আপনি অবশ্যই জানেন, এই আধুনিক যুগে আউট অব নেটউয়ার্ক থাকলে কিরকম অসুবিধা হয়।’

কথা সত্য। আমি তার বাকি কথাগুলো শোনার জন্য আগ্রহীভঙ্গিতে তার দিকে তাকালাম। সে সুর করে বলতে লাগল, ‘কান থাকতেও যেমন কোনো কোনো মানুষ শুনতে পায়-না আমার অবস্থাও ঠিক সেরকম। আমার মোবাইল আছে কিন্তু কারো সাথে যোগাযোগ করতে পারছি না। ছার, একটু দয়া করেন। আপনার এতটুকু দয়ায় আমি পেয়ে যাব একটা ব্যাটারি। শুনেছি অনিক ব্যাটারির দাম কম। তবে টেকে ভালো। ছার, দিবেন আমারে কিছু সাহায্য?’ বলে সে আমার দিকে নিষ্পলক তাকিয়ে রইল।

লোকটার দীর্ঘ বক্তৃতা শোনার পরও তার প্রতি আমার কোনো দয়া বা আগ্রহ জন্মাল না। আমি না-বোধক মাথা দুলিয়ে মৃদু স্বরে বললাম, ‘আমি আপনার জন্য কিছুই করতে পারছি না। দুঃখিত। ’

‘ইটস ওকে। দুঃখিত হওয়ার কিছু নাই। গুডবাই।’

আমি লক্ষ করলাম প্রথমে সে আমাকে সহিভাবে সালাম প্রদর্শন করলেও যাওয়ার সময় তার মুখে একেবারে মডার্ন ফর্ম : ইটস ওকে। গুডবাই।

সে চলে যাচ্ছিল। তাকে আমার ডাক দিতে ইচ্ছে হলো। ডাকলাম। ‘এই যে চাচা মিয়া, শোনেন।’

সে আমার দিকে ফিরে তাকিয়ে বলল, ‘আমাকে ডাকছেন?’

‘হ্যাঁ, আপনি ছাড়া আশেপাশে তো আর কেউ নাই। আপনাকেই ডেকেছি।’

সে পুনরায় আমার কাছে এল, ‘জি বলেন, ছার।’

‘আমি আপনাকে পাঁচ টাকা দিতে পারি কিন্তু বিনিময়ে আমাকে একটা কাজ করে দিতে হবে।’

‘টাকাটা আগে দেন, ছার।’

‘জিজ্ঞেস করলেন না, আমাকে কী কাজ করে দিতে হবে?’

‘আমি জানি। জিজ্ঞেস করতে হবে না।’

‘আপনি জানেন মানে!’

‘হ্যাঁ জানি। আমাদেরকে অনেক কিছুই জানতে হয়। কিন্তু আপনি আমাকে যা ভেবেছেন আমি আসলে তা না।’

আমি বিস্মিত হয়ে বললাম, ‘আরে কী বলছেন আপনি? আমি তো আপনার কথা কিছুই বুঝতে পারছি না।’

‘মানে, আমি জানি না এই পার্কে কে গাঁজা বিক্রি করে। তাই আপনার গাঁজার সন্ধানও আমি দিতে পারব না।’


বেয়াদবি নিবেন না, ছার। এই শহরে কে যে গাঁজাখোর আর কে গাঁজাখোর না তা বলা মুস্কিল। বাদ দেন, ছার। আপনার সম্পর্কে ভুল ধারণা করার জন্য আমি মাফ চাইছি।


সর্বনাশ! লোকটা আমাকে গাঁজাখোর ভেবেছে। লোকটার কথা শুনে আমি যেন আকাশ থেকে পড়লাম। ক্ষিপ্ত কণ্ঠে বললাম, ‘দেখেন মিয়া, আপনার সাথে আমার মশকরা করার সম্পর্ক নয়। আর আপনি আমাকে যা ভেবেছেন আমি মোটেও তা নই। আমি গাঁজা খাই না। বুঝতে পেরেছেন আমার কথা?’

‘স্যরি, ছার।’ বলে লজ্জিতভাবে হাসল। তারপর বলল, ‘তাহলে আমি আপনার জন্য কী করতে পারি?’

‘সে উত্তর পরে দেবো। তার আগে বলেন, আপনার কেন মনে হলো যে, আমি গাঁজাখোর? আমার কি গাঁজাখুরী চেহারা?’

‘বেয়াদবি নিবেন না, ছার। এই শহরে কে যে গাঁজাখোর আর কে গাঁজাখোর না তা বলা মুস্কিল। বাদ দেন, ছার। আপনার সম্পর্কে ভুল ধারণা করার জন্য আমি মাফ চাইছি। টাকাটা দেন। আর বলেন, আমাকে কী করতে হবে?’

এ-ব্যাপারে আমি আর কথা না বাড়িয়ে বললাম, ‘আমাকে বিল্যাই মিঞার সন্ধান দিতে হবে। এই যে নেন টাকা।’

সে টাকা নিতে হাত বাড়িয়েও সঙ্গে সঙ্গে হাত ফিরিয়ে নিল, ‘স্যরি, ছার। আমি বিল্যাই মিয়া নামে কাউকে চিনি না।’

‘চেনেন না?’

‘না।’

‘ঠিক আছে। না চিনলেও টাকাটা রাখেন। আমি আপনাকে টাকাটা দেওয়ার নিয়ত করেছি। ফেরত নেওয়ার জন্য বের করি নি। এটা এখন আপনার হয়ে গেছে। ’

‘ধন্যবাদ, ছার। কিন্তু একটা কথা। বিল্যাই মিঞাটা আসলে কে? আপনিই-বা কেন মনে করলেন যে, আমি তাকে চিনি?’

মহাবিপদরে বাবা! কেন আমি মনে করলাম সে বিল্যাই মিঞাকে চেনে, সে ব্যাখ্যাও দিতে হবে! মনে মনে বিরক্ত হলেও তা প্রকাশ না করে স্বাভাবিক কণ্ঠে বললাম, ‘বিল্যাই মিঞা নামক এক ভদ্রলোক এই পার্কেই থাকে।’

‘উঁহু! আমি আপনার সাথে একমত না। কারণ যার নাম বিল্যাই মিঞা, সে কখনোই ভদ্রলোক হতে পারে না। বিল্যাইরা হচ্ছে ম্যাউ প্রজাতির প্রাণী। তারা মানবের সমান মর্যাদা পেতে পারে না।’


আমার বেশ কাছে এসে ফিসফিস করে বলল, ‘সাবধান, ছার। খাউজানি বরকতের আসল ব্যবসা কিন্তু গাঁজা বিক্রি করা। যতটা সম্ভব ওর সাথে কম কথা বলবেন।’


কথা সে যথার্থই বলেছে। বুঝতে পারলাম এই লেকের সবাই কম-বেশি পেজগি টাইপের মানুষ।

‘বিল্যাই মিঞা কী করে? মানে তার প্রফেশন কী?’

‘সে মানুষের কান পরিষ্কার করে। মানে কান খাউজানিকর।’

‘ও আচ্ছা, এইবার চিনতে পেরেছি। ওর নাম তো বিল্যাই না। খাউজানি বরকত। একটু আগেই আমার সাথে দেখা হয়েছিল। দাঁড়ান, এক্ষুণি আপনার কাছে পাঠিয়ে দিচ্ছি।’

ল্যাংড়া লোকটা কিছু দূর গিয়ে আবার ফিরে এল। আমার বেশ কাছে এসে ফিসফিস করে বলল, ‘সাবধান, ছার। খাউজানি বরকতের আসল ব্যবসা কিন্তু গাঁজা বিক্রি করা। যতটা সম্ভব ওর সাথে কম কথা বলবেন।’

৬ষ্ঠ পর্বের লিংক

মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ

জন্ম ১ জুলাই ১৯৭৮, ধামরাই, ঢাকা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। পেশায় স্ক্রিপ্ট-রাইটার।

সম্পাদিত ছোটকাগজ : জলসিঁড়ি।

ই-মেইল : mohiuddin_neil@yahoo.com