হোম গদ্য উপন্যাস বিল্লাল হুসেন ওরফে বিল্যাই মিঞা

বিল্লাল হুসেন ওরফে বিল্যাই মিঞা

বিল্লাল হুসেন ওরফে বিল্যাই মিঞা
1.15K
0

৩য় পর্বের লিংক

পর্ব-৪

‘মীনা বাজার থেকে কিছু নাস্তা নিয়ে আস।’

‘ওকে ছার, যাচ্ছি।’

আসগর মিয়ার ভাবখানা এমন যে, নিজের টাকায় আমার জন্য নাস্তা কিনে আনবে। ‘আহা এত ছটফট করছ কেন? টাকা নিয়ে যাও।’

আসগর চলে যেতে চাচ্ছিল। তাই একটু ধমকের সুরে ওকে কথাটা বললাম। পাঁচশত পাঁচ টাকা দিলাম আসগর মিয়ার হাতে। সঙ্গে একটি ফর্দ। মানে নাস্তার লিস্ট।

আসগর মিয়া বলল, ‘ছার, পাঁচ টাকা কি এক সাথেই রাখব?’

আসগর মিয়া খুব ধুরন্ধর প্রকৃতির মানুষ। সে এরই মধ্যে বুঝে ফেলেছে পাঁচটি টাকা আমি তাকে অগ্রিম বকশিস দিয়েছি। কিন্তু এটা যে বকশিস তা সে কনফার্ম হতে পারছে না। আমিও তার সাথে একটু ধুরন্ধরপনা করলাম।

‘হ্যাঁ, পাঁচশত টাকার সাথেই রাখ।’

আসগর মিয়া বলল, ‘ঠিক আছে, ছার।’


আল্লাহ জানে, আজ আমার কপালে কী আছে। কম্পিউটারে রবীন্দ্রসঙ্গীত ছেড়ে একটা উপন্যাসে চোখ বোলাতে বোলাতে মহিলার কথাগুলো মনে করার চেষ্টা করলাম।


আমি দরজা বন্ধ করে দিলাম। কিন্তু দু’মিনিট পরে দরজায় ঠকঠক শব্দ হলো। বুঝলাম আসগর মিয়া। দরজা খুলতেই আসগর মিয়া কাঁচুমাচু করে বলল্, ‘ছার, মীনা বাজারের পাশে মিষ্টিপান বিক্রি হয়। দাম পাঁচ টাকা। আপনার জন্য আনব এক খিলি?’

‘না। আমি পান খাই না।’

আসগর মিয়া এরপর আর কী বলবে বুঝে ওঠতে পারল না। কৃত্রিম বিনীতভঙ্গির ঢঙ করে চলে গেল। আমি মৃদু হাসলাম। ঘটনাটা খুব চিত্তাকর্ষক মনে হলো। পৃথিবীর কোনো মজাই বেশিক্ষণ স্থায়ী হয় না। আমার বর্তমান মজার ক্ষেত্রেও তেমনটা হলো। আমি ইন্টারকমে ফোন করলাম। যথারীতি আসগর মিয়া ফোন রিসিভ করল। আমি জানতাম আমার ফ্ল্যাট থেকে এতক্ষণে সে গ্রাউন্ড ফ্লোর পর্যন্ত গিয়েছে। পাঁচটি টাকা যে তাকে আমি বকশিস হিশেবে দিয়েছি, সেটা তাকে জানিয়ে দিলাম। কিন্তু সে খুশি হলো কি-না তা বুঝতে পারলাম না। যদিও খুশি না হলে আমার কিছু করার নাই। আমি কালো টাকার মালিক না। আমার টাকা শাদা। পাঁচ টাকা আমার কাছে অনেক টাকা।

আসগর মিয়া নাস্তা দিয়ে গেল। আমি দ্রুত গোসল সেরে লাঞ্চ করলাম। টি-শার্ট আর ট্রাউজার ছেড়ে পাজামা-পাঞ্জাবি পরলাম। যাকে বলে সত্যিকারের লেখক-ড্রেস। আর কিছুক্ষণের মধ্যে আমার অতিথি আসবে। আল্লাহ জানে, আজ আমার কপালে কী আছে। কম্পিউটারে রবীন্দ্রসঙ্গীত ছেড়ে একটা উপন্যাসে চোখ বোলাতে বোলাতে মহিলার কথাগুলো মনে করার চেষ্টা করলাম। তার কণ্ঠ শুনে ভদ্রোচিতই মনে হয়েছে। কত হতে পারে তার বয়স? চল্লিশ কী পঁয়তাল্লিশ? নাকি আরো বেশি?

মজার ব্যাপার হচ্ছে সে আমার উপন্যাসের কাহিনি নিয়ে কথা বলতে চেয়েছে। এটাই ভরসা। গুণ্ডা মহিলা হলে এসব বলত না। ১২ টা ৪৫। বন্যার পানির মতো টেনশন বেড়ে চলেছে। ঘড়ির কাঁটার মতো টিকটিক করছে আমার হার্টবিট। লক্ষ করলাম আবার ঘামছি। এসি ছাড়লাম। ১২ টা ৫৫-তে ইন্টারকমে আসগর জানাল আমার অতিথি এসে পড়েছে।

আমি জানতে চাইলাম ‘অতিথির নাম কী?’

আসগর জানাল, ‘ম্যাডামের নাম অনিতা রহমান।’

আমি বললাম, ‘সাথে কেউ আছে কি-না?’

আসগর বলল, ‘জি না, ছার। তিনি একা।’

আমি বললাম, ‘পাঠিয়ে দাও।’


টেলিফোনে তার কণ্ঠ শুনে তার বয়স অনুমান করেছিলাম ৪০/৪৫। কিন্তু সেই তাকেই সামনাসামনি দেখে মনে হচ্ছে ২১/২২। প্রকৃতির কী অদ্ভুত লীলা!


আমার ফ্ল্যাট ৬ তলায়। একটু পর কলিংবেল বেজে ওঠল। দরজা খুলে অবাক হলাম। আমার দরজায় একজন তরুণী দাঁড়িয়ে। তার মানে কী? ব্ল্যাকমেইল শুরু হয়ে গেল নাকি? তরুণীটি আমাকে সালাম প্রদর্শন করে বলল, ‘আমিই অনিতা রহমান।’

আমি সপ্রতিভ হেসে বললাম, ‘প্লিজ ভেতরে আসুন।’

অনিতা রহমান ভেতরে প্রবেশ করল। টেলিফোনে তার কণ্ঠ শুনে তার বয়স অনুমান করেছিলাম ৪০/৪৫। কিন্তু সেই তাকেই সামনাসামনি দেখে মনে হচ্ছে ২১/২২। প্রকৃতির কী অদ্ভুত লীলা!

কফিতে চুমুক দিয়ে অনিতা রহমান আমার দিকে তাকাল। একটা ব্যাপার লক্ষ করলাম, সে সরাসরি চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলে। আমার বাবা বলতেন, যারা চোখের দিকে তাকিয়ে কথা বলতে পারে তারা দৃঢ় প্রত্যয়ী। তাদেরকে ভয় পাওয়ার কিছু নাই।

আমি কফিতে চুমুক দিতে যাব এমন সময় সে বলল, ‘আপনি এত ভীতু কেন?’

আমি আঁৎকে ওঠলাম। ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে তার দিকে তাকালাম।

অনিতা রহমান খিলখিলিয়ে হাসতে হাসতে বলল, ‘আমি চোরও না ডাকাতও না—স্রেফ একজন মানুষ। তার-ওপর মেয়ে মানুষ। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ থেকে সদ্য এমবিবিএস পাশ করা একটি মেয়ে। একজন মেয়ে মানুষকে আপনার এত ভয়? সত্যিই আমি বিস্মিত না হয়ে পারছি না।’

হ্যাঁ, বিস্মিত আমিও হচ্ছি। মনে মনে বললাম কথাটা। টেলিফোনে কথা বলার সময় তোমাকে মনে করেছিলম ৪০/৪৫ বছরের মহিলা। এখন তুমি বলছ সদ্য এমবিবিএস পাশ। বিস্ময়ের কি শেষ আছে?

মেয়েটি বলল, ‘আপনি কি সত্যি সত্যি ভয় পেয়েছিলেন?’

আমি বললাম, ‘না না কিসের ভয়? আমি আপনাকে ভয় পেতে যাব কেন?’

‘তাহলে দারোয়ানকে কেন জিজ্ঞেস করলেন, আমার সাথে কেউ আছে কি-না?’

‘ও এই কথা? হয়েছে কী, এই তো ক’দিন আগে, আমাদের বাড়ির ঠিক তিনটা বাড়ির পরে একটি বাড়িতে দিনের বেলা ডাকাতি হলো কি-না…তাছাড়া…’

আমাকে থামিয়ে দিয়ে অনিতা রহমান বলল, ‘বুঝতে পেরেছি আপনি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছেন। এবার আসল কথায় আসি।’

আমি নড়েচড়ে বসলাম। কী তার আসল কথা, কী তার নকল কথা আমি কিছু জানি না। অনিতা রহমানের সাথে কথা বলে কয়েক মিনিটের মধ্যে নিশ্চিত হওয়া গেল যে, বাজে কোনো মতলব নিয়ে সে আমার ফ্ল্যাটে আসে নি। যদিও এখনো পর্যন্ত তার আসার কারণ সম্পর্কে আমি পুরোপুরি নিশ্চিত নই। একারণে এখনও দুশ্চিন্তার মেঘ পুরোপুরি কাটে নি।


আমি রীতিমতো ভরকে গেলাম। তার দৃষ্টির মধ্যে ছিল মায়াবী অভিমানমিশ্রিত রাগ। অর্থাৎ সে যেতে চাচ্ছে না। তারপরও আমি তাকে থাকতে বলছি না।


অনিতা রহমান বলল, ‘আপনার লেখা শাদা শাদা মেঘ খণ্ড খণ্ড প্রেম এবং মিস অনিতা বইয়ের মিস অনিতার সাথে আমার জীবনের অনেক মিল পাওয়া যাচ্ছে। এটা কিভাবে হলো সেটা জানার জন্যই আপনার কাছে আসা।’

এটা কাকতালীয়। লেখকরা মানুষের গল্পই লেখেন। কারো জীবনের গল্পের সাথে মিলে যাওয়া অস্বাভাবিক কিছু নয়।

‘আমি তো মনে করেছিলাম আপনি আমার জীবনের গল্পটিই লিখে দিয়েছেন।’

‘না না সেটা কিভাবে সম্ভব? আমি তো আপনাকে আজকের আগে চিনতামই না।’

‘হতে পারে না আপনি কারো কাছ থেকে আমার গল্প শুনেছেন?’

‘না, আমি আপনার গল্প কোনোদিন শুনি নি।’

বুঝতে পারলাম এগুলো ফাও প্যাচাল। সে আমার সাথে কিছুক্ষণ গ্যাঁজানোর জন্য এসেছে। যা যা বলছে এগুলো হয়তো বলার জন্যই বলা। কোনো ভিত্তি নাই। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে জিজ্ঞেস করলে উত্তর দিতে পারবে না। ধরা খেয়ে যাবে। যদিও আমার কোনোরকম ইচ্ছা নাই মেয়েটিকে খোঁচানোর। তার চেয়ে বরং সে চলে গেলে আমি বাঁচি। অনেক লেখার কাজ পড়ে আছে আমার টেবিলে। তার ওপর বিল্যাই মিয়ার কারণে কাল সারারাত ঘুমাতে পারি নি। আজ বিকেলের মধ্যে ধানমণ্ডি লেকে গিয়ে তাকে ধরতে হবে।

আমি বললাম, ‘আপনাকে আর এক কাপ কফি দেবো কি?’

মেয়েটি বলল, ‘নো থ্যাঙ্কস। আমি এখন ওঠব। আমাকে সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ। প্রিয় লেখকের পাশে বসে জীবনে প্রথম কথা বললাম। এটা আমার জন্য সৌভাগ্যের ব্যাপার।’

অনিতা রহমান চলে গেল। যাওয়ার সময় এমনভাবে আমার দিকে তাকাল, আমি রীতিমতো ভরকে গেলাম। তার দৃষ্টির মধ্যে ছিল মায়াবী অভিমানমিশ্রিত রাগ। অর্থাৎ সে যেতে চাচ্ছে না। তারপরও আমি তাকে থাকতে বলছি না।

৫ম পর্বের লিংক

মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ

মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ

জন্ম ১ জুলাই ১৯৭৮, ধামরাই, ঢাকা। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের নাটক ও নাট্যতত্ত্ব বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। পেশায় স্ক্রিপ্ট-রাইটার।

সম্পাদিত ছোটকাগজ : জলসিঁড়ি।

ই-মেইল : mohiuddin_neil@yahoo.com
মহিউদ্দীন আহ্‌মেদ