হোম গদ্য বিপ্রতীপ

বিপ্রতীপ

বিপ্রতীপ
1.80K
0

ঐশী পেছন থেকে এসে মাকে জড়িয়ে ধরে। মা বারন্দার গ্রিল ধরে গুলশান লেকের ওপর ঠিকরে পড়া রাতের আলোটুকু দেখেন। সীমান্ত নদীর-মতো গুলশান আর শাহজাদপুরকে অভিজাত আর অধঃজাত এই দুইভাগে ভাগ করেছে লেকটি। দুইশ গজের ব্যবধানে কী বিষম বিপ্রতীপ দুইটি নাম।

এখন অনেক রাত। রাত মানেই তো অন্ধকার, সঙ্গমের আবহ, চোরের সুখ আর স্মৃতিদের বধ্যভূমি। অনেক রাত, ঐশী বাসায় ফিরেছে একটু আগে। এত রাত অব্দি ঐশী কোথায় থাকে? মেয়ের নামটা ওর বাবারই দেওয়া—নামটা ও কোথায় পেয়েছিল? প্রশ্নটা করার মতো সময় কোনোদিন পায় নি ঐশীর মা। একদা বেগম জামান—জয়নব আরা।

এখানটায় দাঁড়ালে দেখা যায় লেকের গাঁ ঘেঁষে মৌচাকের মতো টিনের ঘর, ঠাসাঠাসি। তার ফাঁক দিয়ে এক চিলতে সরু নারকেল গাছ পতাকার মতো সবুজ ধরে আছে। কিন্তু এখন অনেক রাত, জয়নব আরা বারান্দায় দাঁড়িয়ে কী দেখেন?

 —মা, আজ বাবার কনসার্ট, জানো তো? বাবার অফিসে গিয়েছিলাম, দুপুরে।

ঐশীর কথায় জয়নব আরার কোনো প্রতিক্রিয়া হয় না। কিছুক্ষণ থেমে ঐশী আবার বলে, জানো, বাবাকে না একটু অন্যরকম দেখলাম। কেমন যেন একটু টেনশনে আছে বলে মনে হলো।

—টেনশন কেন হবে, আমি খবর নিয়েছি—সব টিকিটই তো বিক্রি শেষ!

—জানি না, মনে হলো তাই বললাম।

একটা বোয়িং পশ্চিম আকাশ ফুঁড়ে টেক অফ করে, রামপুরার দিকে চলে যায়।

তুই পার্মানেন্টলি তোর বাবার সাথেই থাকতে পারিস। নতুন এপার্টমেন্টে, ঝাঁ চকচক গাড়ির সাথে ঝলমল করা একটা মা’ও পাবি।

ঐশী টুলটা টান দিয়ে মায়ের পা ঘেঁষে বসে পড়ে। নেইল কাটার দিয়ে ডান হাতের তর্জনীর নখ কাটতে কাটতে বলে, সেটা তোমার বলতে হবে না। সময় হলে আমি সুড় সুড় করে এমনিই চলে যাবো।

ডান দিকে তাকালে পাশের বিল্ডিং এর অন্ধকার বেডরুম দেখা যায়, বারান্দায় লতা জাতীয় গাছের টব ঠাসা, ছোট্ট বারান্দায় একটা দড়ি ঘন করে টানানো। নির্লজ্জের মতো একটা নিঃসঙ্গ বক্ষ বন্ধনী শুকনো পাতার মতো তাতে ঝুলছে। হুট করে এত রাতে বেডরুমে লাইট জ্বলে উঠলে জয়নব আরা কিছুটা সরে এসে নিজেকে আড়াল করলে ঐশী হো হো করে হেসে ওঠে—

—লজ্জা পেলে বুঝি?

—মেয়েটার মুখে ইদানীং কিচ্ছু আটকায় না।

কিছুটা গম্ভীর স্বরে বলে, আমি জানি, সময় এলে তুই তোর বাবার কাছেই ফিরবি, শেষ মেষ তুই তো তোর বাবারই মেয়ে, তাই না! কিন্তু এত রাতে তোর বাসায় ফেরাটা আমার ভালো লাগে না, খুব খারাপ লাগে!

—দেখ মা, আমাকে এসব কথা বলে কোনো লাভ হবে না। তোমার নাদুস-নুদুস একটা ছেলে থাকলে এই কথা কি তুমি বলতে? গট গট করে হেঁটে ঐশী ভেতরে চলে যায়।

ফেলে যাওয়া খালি টুলটায় জয়নব আরা বসে পড়েন। দক্ষিণ-পশ্চিম আকাশ আতশ বাজির আলোয় ভরে ওঠলে তিনি বোঝেন কনসার্ট শেষের দিকে। শাহজাদপুরের এই দিক থেকে তাকালে প্রায়ই আর্মি স্টেডিয়ামের এই আলোটা দেখা যায়। এই আলোয় অন্ধকার দূর হয় না।

জয়নব আরাও খুব ভালো গিটার বাজাতেন। অবাক হলেও সত্যি, তিনি একসময় ব্রিটিশ কাউন্সিলের নিয়মিত ক্লাসিক গিটারিস্ট ছিলেন। এই যে ‘ছিলেন’ এটাও একপ্রকার স্মৃতিচারণ; স্মৃতিচারণ ভালো লাগে না জয়নব আরার।

রোকেয়া হলের দিনগুলোকে মনে করে তিনি ইচ্ছে করলেই হাসতে পারেন, কাঁদতেও পারেন; কিন্তু সেটা তিনি করেন না। ভালো লাগে না। কী লাভ ওসব ভেবে? তুমুল শব্দ নিয়ে নৈর্ঋতে আতশবাজি ফাটে, জয়নব আরার হৃদয়েও।


নব্বই এর দশকে গিটার হাতে একটা মেয়ে ক্লাসিক বাজাচ্ছে, এই ইমেজটা সাধারণভাবে নেওয়ার মতো লোকও তখন কম ছিল।


শওকত জামান ইউনিভার্সিটির সাংস্কৃতিক সংগঠনের ক্ষুদে ও ফাঁকিবাজ কর্মী। ইতিহাসে পড়ত অথচ থাকত সবসময় কার্জন হলের গেটে। প্রথম বর্ষেই পরিচয়, দ্বিতীয় বর্ষে সেটা সীমানা অতিক্রম করে যায়। চতুর্থ বর্ষে উঠতে উঠতে তারা দুজন আর আলাদা থাকতে পারে নি।

সময়গুলো কিভাবে যেন সাতরে চলে যায়! কিভাবে?

এই তো সেদিন, একসাথে কত জায়গায় তারা পারফর্ম করেছে, শওকত ক্লাসিক গাইলে গিটারে জয়নব ছাড়া অন্য কেউ তা বাজাতে পারতো? নব্বই এর দশকে গিটার হাতে একটা মেয়ে ক্লাসিক বাজাচ্ছে, এই ইমেজটা সাধারণভাবে নেওয়ার মতো লোকও তখন কম ছিল। মনে পড়ে যায় মানিকগঞ্জের শো’টার কথা। শো শেষ করে ঢাকায় ফিরতে ফিরতে ১১টা। হলের গেট বন্ধ। কোথায় যাবে? শওকত থাকে মুহসিনে, গেলেই ব্যবস্থা হবে, কিন্তু জয়নব? দু একটা রিকশা টিএসসিতে ছিল, তার একটাতে দুম করে ওঠে পড়ে শওকত। জয়নব হা করে দেখে, কোথায় যাবে এখন?

রিকশায় উঠে বসতেই শওকত বলে ‘কমলাপুর’, এতরাতে কমলাপুর! ফাঁকা রাস্তা, হালকা শীত। কুয়াশারা হ্যালোজেন লাইটগুলো এরই মধ্যে ঘিরে ধরেছে। জয়নব আরা ভয়ে কাঁপে। হাতের অ্যাকুয়াস্টিকটা পড়ে যাবে এখনই, মনে হয়। তড়িঘড়ি করে ছেড়ে যায় যায় এমন একটা কক্সবাজারগামী বাসে তারা ওঠে পড়ে। স্বপ্নের মতো গাড়িটা তাদের নিয়ে ছুটে চলে চিটাগাং রোড ধরে। জয়নব আরার মনে হয়, পেছন থেকে অন্ধকারে বাসের চলে যাওয়াটা বিস্ময়ভরা-চোখে দেখছে তাঁর বাবা। বাবা কিছুতেই চান নি মেয়ে ঢাকায় থাকুক। এর চেয়ে ভালো ছিল রাজশাহীতে বাংলায় পড়া। জয়নব আরার বাংলা ভালো লাগে না। রাজশাহীতে বড় মামার বাসায় থেকে পড়তেও তার ভালো লাগে নি।

সারাদিন ধকলে-ক্লান্তিতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছিল বোঝে নি, ঘুম ভাঙলে দেখে—জানালার বাইরে রহস্যময় বেলে জ্যোৎস্নায় ভেসে যাচ্ছে পথ ঘাট। কালো সরু চুলের দিগন্তরেখা, ঘূর্ণায়মান বৃত্তের মতো বাসের জানালার বাইরে সরে যায়। ধকল সামলে শওকতও বেশিক্ষণ জেগে থাকতে পারে নি। গভীর ঘুমে শওকতের মুখটা খুব ভালো লাগে জয়নব আরার।

অনেকদিন হলো সেই মুখটা দেখা হয় নি।

ছোট বেলার জ্যোৎস্নার কথা মনে পড়ে। ছোট মামার সাথে কোষা নৌকায়, নদীতে, সরপুঁটির ঝাঁকের ওপর দিয়ে তির তির করে বয়ে চলা! ছোট মামার গানের গলাটাও বেলে জ্যোৎস্নার মতো মোহনীয়। সে গলায় মান্না দে ধরলে নদীর দুই ধারের ঘুমন্ত গ্রামে কেমন ঘোর লেগে যেত। ছোট ছোট পুতে রাখা বাঁশের সাথে জাল পেতে, গেল ফিরতি ভাটায় সরপুঁটি আর সাদা বাঁশপাতা মাছ একটা একটা করে ছাড়িয়ে নৌকায় তুলতো জয়নব আরা। ছোট মামার কথা খুব মনে পড়ে! একদিন গ্রামে পুলিশ এসে ছোট মামাকে ধরে নিয়ে গেল—আর ফেরে নি। নানী এখনো বলে, ‘তোর মামার মাথার ভেতরে ‘নীলমণি’ ছিল! পুলিশ এটা জেনে গিয়েছিল বলেই তারা আর ফেরত দেয় নি।’

নিখোঁজ ছোট মামার বইয়ের আলমারিটা উত্তরাধিকার সূত্রে জয়নব-ই পেয়েছিল।

বাসের জানালার ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়া প্রবল বাতাস চুলগুলো এলোমেলো করে দেয় শওকতের। শওকতের কপালটা কি ছোট মামার মতো? হ্যাঁ, কিছুটা তো বটেই!

ছোট মামার দরাজ গলার কিছুটা আঁচ কি শওকত পেয়েছে?

নিঝুম নদীর তীরে আছড়ে পড়া সেই সুর যেন বাসের জানালা দিয়ে ফিরে আসে—“তীর ভাঙ্গা ঢেউ আর নীড় ভাঙ্গা ঝড়..” সেই সুরের মূর্ছনায় বাইরে ধাবমান বেলে জ্যোৎস্নার ভেতর শওকতের কাঁধে মাথা রেখে তাঁর কৈশোরের নায়ক ছোট মামাকে খোঁজে, শওকত কি তা জানে? ঘুমের সোহাগ মাখা শওকতের মুখের দিকে তাকালে জয়নব আরার মায়া হয়।

দূরের আকাশ ফর্সা করে আরেক দফা আতশবাজি ফাটে। জয়নব আরা এবার শোবার ঘরে ফিরে আসেন। দরজার পর্দা বাতাসে দুলে উঠলে দেখা যায় ঐশী উপুড় হয়ে বিছানায় সাপের ফণার মতো; সামনে ল্যাপটপ।

ঐশী খুব সচেতন ভাবে বাবার খ্যাতিটাকে নিজের পালকে গুঁজে রাখে। বাবার পরিচয় সচারচর সে দেয় না, কিন্তু সবাই যেটা জানে তাকে ও অস্বীকার করতেও সে চায় না। কিছুটা মনখারাপ লাগা সত্ত্বেও তিনি এটা মেনে নেন, বাবা মেয়ের ভালোবাসার মাঝখানে তিনি অভিমান হয়ে ঢুকতে চান না। জয়নব আরা জানেন,  ঐশীর সাথে প্রায়ই শওকতের দেখা হয়—রেস্টুরেন্টে দেখা করে। জয়নবের স্কুলের এক কলিগ গুলশানের কোন এক রেস্টুরেন্টে তাদের দেখে এসে বলেছিল। গত মাসে দুবাই এর শো শেষ করে ঐশীকে এয়ারপোর্টে ডেকেছিল, একটা আইফোন আর একটা অন্য জিনিস দিয়েছে। বাসায় নাচতে নাচতে সেই আই ফোন দেখায় মা’কে। ক্লাসে বেরোবার সময় একবার বলে যায় তোমার ড্রয়ারে একটা জিনিস আছে, চেক করে নিও। ঐশী বেরিয়ে গেলে দুবাই থেকে আনা একটা ডায়মন্ডের নাকফুল চোখের পানির ফোটার মতো জ্বলজ্বল করে জয়নবের ড্রয়ারে। ইচ্ছে করেই ওটা আর দেখেন নি তিনি। রাতে ঐশী বাসায় ফিরলে খুব বকেছিল, ঐশী খুব কেঁদেছিলও। কাঁদা ভালো, মাঝে মাঝে কিছুটা কান্না জীবনকে সুন্দর করে, নির্মল করে।

মেয়েদের জীবনটাই যেন কেমন, দোষ আর গুণ বুঝতে বুঝতে সোনালি সময়টা কেটে যায়—জয়নব চান না ঐশী সেই সময়টা হেলায় কাটিয়ে দিক। সেবার শওকতের সাথে জয়নব কক্সবাজার যেতে চায় নি, কিন্তু ভাগ্য আর পাগলামি সেইখানে তাদের টেনে নিয়ে গিয়েছিল। পরদিন খুব সকালে তারা কক্সবাজার পৌঁছে যায়। জয়নব আগে কখনও সাগর দেখে নি। তাই বলে এইরকম পরিস্থিতিতে তার সাগর দেখার অভিপ্রায় কখনোই ছিল না। মানিকগঞ্জের শো শেষ করে কিছু টাকা পকেটে ছিল বলে পাগলামিটা সাহস পেয়েছিল।

কক্সবাজার বাস স্ট্যান্ডে সকালের নাস্তা করতে করতে জয়নব দেখছিল টেকনাফের প্রথম গাড়িটা স্ট্যান্ড ছেড়ে যাবে যাবে, মন্দ হয় না যদি প্রথম সমুদ্র দর্শন সেন্টমার্টিনেই হয়! শওকত দুইবার ভাবে নি, জয়নবের আইডিয়াটা লুফে নিয়ে তারা টিকিট কেটে ওঠে পড়ে টেকনাফের বাসে। যখন তারা  সেন্টমার্টিনে পৌঁছায় ততক্ষণে সাগরের বুকে বিস্তীর্ণ কমলা রঙ সূর্যটাকে গিলে খাবার প্রতীক্ষায়! মাত্র একটা অতিরিক্ত জামা আর একটা হালকা সাইড ব্যাগ নিয়ে তারা হোটেলে ওঠে। অনেক রাত অব্দি দুটা ভিন্ন বিছানায় দুজন সমুদ্রের শো শো ধমক শুনতে শুনতে ক্লান্ত হয়ে পড়েছিল। তারপর রাত আরও গভীর হলে মরা কাটালের টানে দুটো খাটের ব্যবধানটুকু  বিলীন হয়ে যায়। লখিন্দরের ভাসানের মতো নীল ছোবলে জর্জরিত শওকতকে ধরে রাতটুকু পার করে দেয় জয়নব।

সেন্টমার্টিনের দক্ষিণ বীচে বসে বিকেল বেলা গানটা লেখা হয়েছিল। যে গানটা গেয়ে আজো শওকত কনসার্ট শেষ করে। গানটা তৈরি হওয়ার ইতিহাসটাও মজার, দুটো লাইন শেষ করে তিন ঘণ্টা বসে ছিল শওকত। জয়নব সেই রাতে বাকি লাইনগুলো শুধু লিখেছিলই না, সুরটাও করেছিল। সেসব কথা কে মনে রাখে? মনে রাখার অনেক কিছুই তো জীবনে ছিল, শুধু উপলক্ষগুলি বিলীন হয়ে গেছে সময়ের সাথে।

অনার্স ফাইনাল ইয়ারে। সেন্টমার্টিন থেকে ফিরে পরের মাসেই জয়নব ব্যাপারটা বুঝতে পারে, শওকতও আর দেরি করে নি। মিজান, টুটুল আর বর্ষা এই তিনজনকে সাক্ষী রেখে নীলক্ষেত কাজী অফিসে তাদের বিয়ে হয়। ১৯ জুলাই’ ৯৩। পরে জেনেছিল ১৯ জুলাই ছিল ছোট মামার জন্মদিন।


খ্যাতির আফিমে বুদ হয়ে গেলে কেউ কেউ অমানুষ হয়, জয়নব জেনে গেছে।


ঐশীকে ধারণ করতে যেয়ে সবচেয়ে বড় ত্যাগ স্বীকারটা জয়নবকেই করতে হয়েছে। থার্ড ইয়ার পর্যন্ত তার রেজাল্ট ভালোই ছিল, কিন্তু ফাইনাল ইয়ারে সেটাকে ধরে রাখা আর সম্ভব হয় নি। পরিবারের প্রচণ্ড চাপ, পেটে ঐশী, কর্মহীন ও অর্থহীন শওকত এখানে-সেখানে অল্প টাকার শো করতে করতে ক্লান্ত। এসব সামলাতে সামলাতে কখন যে সংগ্রামমুখর জীবনে জয়নব প্রবেশ করে ফেলেছে—বুঝতেই পারে নি। ২১ বছর আগেকার সেইসব কষ্ট এত হাসিমুখে জয়নব কিভাবে সয়ে গিয়েছিল—ভাবতে গেলে নিজেই আশ্চর্য হয়!

গত সাতটি বছর আলাদাই থাকেন জয়নব। এর মধ্যে দেশ জোড়া নাম ছড়িয়ে পড়ে শওকতের। খ্যাতির আফিমে বুদ হয়ে গেলে কেউ কেউ অমানুষ হয়, জয়নব জেনে গেছে। শওকত তার মেয়ের বয়সী নিলুকে বিয়ে করলে একসাথে থাকার আর কোনো সম্ভাবনাও থাকে নি। সময় তো কেটেই যায়, গুলশানের একটা স্কুলে নিভৃতে ফিজিক্স পড়ান। ভালোই আছেন।

রানওয়ে ছেড়ে কাঁপতে কাঁপতে ঢাকার আকাশে উঠে আসে আরও একটি বিমান। থরথর করে কাঁপে পাশের টেবিলে রাখা পানির গ্লাস। এখন কত রাত? কনসার্ট কি শেষ? ঐশী কি ঘুমিয়ে পড়েছে? মোবাইলে খুব একটা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন না জয়নব। চেষ্টা করলে শওকতের নতুন নাম্বারটা ঐশীর ফোনে পাওয়া যাবে, একটা ফোন কি দেয়া যায়? ওর শরীর কি খুব খারাপ? তাহলে এত টেনশন কিসের? জয়নব জানে স্পন্সরের লগ্নি ফেরত আসবে, সব টিকিট তো বিক্রি হয়েছে—তবে?

বাইরে গাড়ির অহেতুক হর্নের শব্দ ধীরে ধীরে পাতলা হয়ে আসে। জয়নব আরার মনে হয় ঐশী হয়তো লাইট অফ-না করেই ঘুমিয়ে পড়েছে। ঐশীর রুমে কি যাবেন এখন? সত্যিই তাই! মেয়েটা সরল বৃত্তের মতো কুণ্ডলী পাকিয়ে ঘুমাচ্ছে। লাইটটা অফ করে ফিরে আসার সময় জয়নব আরা একটু দাঁড়ান। ঐশীর মোবাইলটা কি দেখবে একটু? এতক্ষণে হয়তো শওকতের শেষ গানটি গাওয়া শেষ—শওকত কনসার্ট শেষ করেই ঐশীকে ফোন দেয়। কিন্তু অবিশ্বাস্য নীরবতা নিয়ে তিনি বেরিয়ে আসেন। বেরিয়ে আসতে আসতে তার শরীরের ভেতরে ক্লান্তি ভর করে—সেই মানিকগঞ্জ থেকে হুট করেই কক্সবাজার ভ্রমণের ধকলটা যেন আজ ফিরে এসেছে।

রুমে ফিরে এসে বিছানায় শরীরটা এলিয়ে দিলে তিনি ভেসে যেতে থাকেন আষাঢ়ের প্রথম ঢলের নতুন পানিতে। সেই কোষা নৌকায়, দ্যুতিময় একটা হাত তার চিরপরিচিত গিটারের তার ছুঁয়ে যায়, সুরের শব্দ দুপাশের গ্রামের নুয়ে পড়া বাঁশ ঝাড়ে লেগে ফিরে আসে বারংবার। মাছ নয়, সুরের এই তালে ছোট মামা গাইছেন মান্না দে’র গান। নৌকা বয়ে যায়, বেলে জ্যোৎস্নার ভেতর পানির বুক চিরে ঠিকরে পড়া আলো যেন এই শাহজাদপুরের ইটের ঘরের ভেতর পুনঃ পুনঃ প্রতিফলিত হয় আর ঘরের বাইরে ডেকে নিয়ে যায়।

জয়নব বুঝতে পারে সেই অতলের আহবান, দূর দিগন্তে জোয়ারের টানে যেন একেকটা গ্রাম ফেলে এগিয়ে যেতে থাকে নৌকাটি। ছোট মামার এমন হাসিমুখ এতদিন পর যেন চোখ ভরে দেখছে! ভুলে যাওয়া গিটারের প্রতিটা তার যেন নির্ভুলভাবে ছুঁয়ে যাচ্ছে প্রতিটা আঙুল, শওকত দেখলে হিংসা করত।

শওকত জানলও না জয়নব তার জন্য আর কী কী ত্যাগ করেছিল!

ঘুমের ভেতর এসব ভাবতে ভাবতে জয়নব বুঝতে পারে ও রুমে বেজে চলেছে ঐশীর ফোন। এক অদ্ভুত রিংটোন তাতে। মনে হচ্ছে শওকত কাঁদছে! শওকতের কান্না ভালো লাগে না।

কিন্তু,

ঐশী ফোনটা রিসিভ করে না কেন?

মির্জা মুজাহিদ

মির্জা মুজাহিদ

জন্ম ২৫ জানুয়ারি, নড়াইল। চারুকলা অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। পেশা : ক্রিয়েটিভ ডিরেক্টর, স্পেলবাউন্ড কমিউনিকেশন লিমিটেড।

প্রকাশিত বই : বিপ্রতীপ [গল্প], একুশে বইমেলা ২০১৬, অনুপ্রাণন প্রকাশন।

ই-মেইল : me@mirzamuzahid.net
মির্জা মুজাহিদ

Latest posts by মির্জা মুজাহিদ (see all)