হোম গদ্য বিপন্ন বিস্ময়

বিপন্ন বিস্ময়

বিপন্ন বিস্ময়
929
0

‘মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে’ কোনো সাহিত্যিক যখন এমন কথা বলছেন তখন কেউ আবার ‘আত্মহত্যার অধিকার’ গল্প লিখছেন। তো আত্মহত্যা ব্যাপারটা তখন গোলমেলে হয়ে ওঠে যখন ব্যক্তির মধ্যে এটা নিয়ে একটা আত্মদ্বন্দ্ব কাজ করে।

‘বধূ শুয়ে ছিল পাশে—শিশুটিও ছিল;
প্রেম ছিল আশা ছিল—জ্যোৎস্নায়,—তবু সে দেখিল
কোন ভূত?’

জীবনানন্দ দাশ যে-‘ভূত’ দেখার কথা বলেছেন এটাই হলো সেই আত্মদ্বন্দ্ব। সব থাকার পরেও যখন এক ধরনের না-থাকা বিরাজ করে তখনই রাতের আঁধারে একগাছা দড়ি হাতে বের হওয়ার ঘটনা ঘটে।

‘নারীর হৃদয়—প্রেম—শিশু—গৃহ—নয় সবখানি;
অর্থ নয়, কীর্তি নয়, সচ্ছলতা নয়—
আরো এক বিপন্ন বিস্ময়
আমাদের অন্তর্গত রক্তের ভিতরে
খেলা করে;’

আর এইবিপন্ন বিস্ময়’ থেকেই বুঝি মানুষ আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত নেয়! এই ‘বিপন্ন বিস্ময়’ নিয়ে আসলে একক কোনো ব্যাখ্যা কিংবা দৃষ্টিভঙ্গি নেই। মনস্তাত্ত্বিক, দার্শনিক, নিয়তিবাদী, অধ্যাত্মবাদী কেউই আত্মহত্যা বিষয়ে একক কোনো মতবাদে পৌঁছাতে পারেন নি। সাম্প্রতিক কালে আত্মহত্যা-প্রবণতার কয়েকটি কারণ বের করেছেন শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারনাল মেডিসিন ফিজিশিয়ান অ্যালেক্স লিকারম্যান। আত্মহত্যা-প্রবণতার কারণগুলো হলো :

ক. মানসিক চাপ ও বিষাদগ্রস্ততা
খ. মনোবৈকল্য
গ. আবেগতাড়িত হওয়া
ঘ. সহযোগিতা ও সহানুভূতিপ্রবণ কিন্তু আকাঙ্ক্ষা না-পূরণে হতাশ
ঙ. মৃত্যুর প্রতি দার্শনিক অনুভূতিপ্রবণ
চ. ভুলের মাশুল বা প্রায়শ্চিত্ত।


মৃত্যুর আগে মায়াকোভস্কি তার শিল্পভাবনা নিয়ে দ্বিধায় পড়েন।


এসব কারণই সকল আত্মহত্যার পেছনে থাকে এমন তো নয়। আর প্রতিভাবানদের তো ‘বাইপোলার ডিসঅর্ডার’ কিংবা ‘ম্যানিক ডিপ্রেশন’-এর মতো ব্যাপার থাকেই। ‘মুড’ বা ভাবের পরিবর্তনে ইল্যুশন থেকে ডিপ্রেশন-এ চলে যান। এর বাইরেও অনেক কারণ হয়তোবা থাকে আর আত্মহত্যাকারী ব্যক্তি যদি সেটা প্রকাশ না করে যায় তাহলে তো মৃত্যুর পর সেটা প্রচ্ছন্নই থেকে যায়। যেমন অজানাই থেকে গেছে অনেক লেখক-সাহিত্যিকের আত্মহত্যার কারণ। পরবর্তীকালে ‘হয়তোবা’ শব্দটা ধরে চলেছে তাদের আত্মহত্যার কারণ অনুসন্ধান। তাতে কখনও কখনও একটা কাহিনির নাগাল পাওয়া গেছে, আবার কখনও অধরাই থেকে গেছে সেইসব মৃত্যু। যেমন, আর্নেস্ট হেমিংওয়ে (১৮৯৯-১৯৬১)-এর মৃত্যুটা একটা রহস্য তৈরি করে যখন দি ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি আখ্যানের লেখককে আত্মহত্যাকারী ভাবতে হয়। তেমনি ভার্জিনিয়া উলফ (১৮৮২-১৯৪১), ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কি (১৮৯৩-১৯৩০), ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা (১৮৯৯-১৯৭২), অ্যানি সেক্সটন (১৯২৮-১৯৭৪), সিলভিয়া প্লাথ (১৯৩২-১৯৬৩), হান্টার এস. থম্পসন (১৯৩৭-২০০৫), য়ুকিও মিশিমা (১৯২৫-১৯৭০), জন বেরিম্যান (১৯১৪-১৯৭২), কারিন বোয়ে (১৯০০-১৯৪১), রায়ুনোসুকি আকুতোগাওয়া (১৮৯২-১৯৭০), পউল সেলান (১৯২০-১৯৭০), কায়েস আহমেদ (১৯৪৮-১৯৯২), শামশের আনোয়ার (?-১৯৯৩), শামীম কবির (১৯৭১-১৯৯৫)—আরও কত নাম। আত্মহত্যা তারা কেন বেছে নিয়েছিলেন সে প্রশ্নের কোনো উত্তর পাওয়া কি আদৌ সম্ভব? হয়তোবা সম্ভব নয়, তবে কিছু ঘটনা তো জানা যায়। এবার সেদিকেই আলোকপাত করা যাক।

 

ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কি (১৮৯৩-১৯৩০) :

রাশিয়ান কবিতার ‘Raging bull’ খ্যাত কবি, যাকে রুশ বিপ্লবের অন্যতম একজন মান্য করা হয়, সেই সুদর্শন ভ্লাদিমির মায়াকোভস্কি আত্মহত্যা করেন ৩৭ বছর বয়সে। মাত্র ১৪ বছর বয়সে সোশ্যালিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত করেছিলেন নিজেকে। অতঃপর কারাবরণ। তারপর কবিতা লেখা শুরু করেন আর কবিতায় উঠে আসে পুঁজিবাদী সমাজের শোষণ, মানুষের সাম্যের কথা। তার কবিতার অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো প্রতিদানহীন ভালোবাসা, দুর্ভাগ্য, হতাশা, বিষাদ। নারীরা তার প্রতি আকর্ষণ বোধ করত প্রবলভাবে। লিলিয়া ব্রুক নামের এক নারীর প্রেমে পড়েন ১৯১৫ খ্রিস্টাব্দে, যাকে বলা হয় ‘muse of Vladimir Mayakovsky’। লিলিয়ার স্বামী ছিলেন মায়াকোভস্কির প্রকাশক, যার মাধ্যমে পরিচয় হয় অভিনেত্রী ভেরোনিকা পোলানস্কায়ার সাথে। সময়টা ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দ। যখন এক বিক্ষুদ্ধ জীবন পার করছিলেন কবি। এই সময়টাতেই তিনি ভেরোনিকার প্রেমে পড়েন। সম্পর্কের টানাপড়েনে অধৈর্য, বিভ্রান্ত, উন্মাদ, বিপর্যস্ত হয়ে পড়েন। অন্যের ঘরনি ভেরোনিকা পোলানস্কায়াকে বিবাহবিচ্ছেদ ঘটিয়ে এবং থিয়েটার ত্যাগ করে নিজের সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার প্রস্তার করেন। এপ্রিল মাসের শুরুতে তার Nervous exhaustion-এর কারণে তাকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। এর কয়দিন পর ১৩ এপ্রিল পোলানস্কায়ার সঙ্গে তার অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটে। ১৯৩০ সালের ১৪ এপ্রিল সকালে মায়াকোভস্কির সঙ্গে পোলানস্কায়ারের শেষ দেখা হয় এবং সেদিনই রিভলভারের গুলিতে কবি আত্মহত্যা করেন। পোলানস্কায়ারের ভাষ্যমতে জানা যায়, মৃত্যুর আগে মায়াকোভস্কি তার শিল্পভাবনা নিয়ে দ্বিধায় পড়েন।

আমি বেরিয়ে সদর দরজার দিকে এগিয়েছি কয়েক পা। একটা গুলির শব্দ। আতংকে চিৎকার করে ছুটে এলাম করিডোরের দিকে। কিন্তু ভেতরে ঢুকতে ভয় হলো। তারপর যখন ভেতরে ঢুকলাম, যেন… যেন একযুগ হয়ে গেছে। সারা ঘরে বারুদের ধোঁয়া, কার্পেটের উপর পড়ে আছেন মায়াকোভস্কি। হাত দুটো ছড়ানো। বুকের ’পর ছোট একটা রক্তের দাগ।

এভাবেই শেষ হন মায়াকোভস্কি, আর কথাগুলো ভেরোনিকার। তার সঙ্গে প্রেম ছাড়াও ১৯২৯ খ্রিস্টাব্দে তাতিয়ানা নামের এক মডেলের প্রেমে পড়া এবং তাতিয়ানার এক ফ্রেঞ্চকে বিয়ে করার ব্যাপারও তার মধ্যে হতাশা তৈরি করে। আবার কম্যুনিজমের আদর্শগত দ্বন্দ্বও তাকে ব্যথিত করেছিল। সবকিছু মিলিয়ে কবি নিজেকে হত্যা করেন। মায়াকোভস্কির সুইসাইড নোট :

Do not blame anyone for my death and please do not gossip. The deceased terribly dislike this sort of thing. Mamma, sisters and comrades, forgive me-this is not a way out (I do not recommend it to others), but I have none other. Lily- love me…Comrades of VAPP- do not think me weak-spirited. Seriously there was nothing else I could do.

তার ‘আনফিনিশড পোয়েম’ থেকেও আত্মহত্যার ইঙ্গিত পাওয়া যায়—

এবং তারা তাই বলে, দুর্ঘটনা ঘটে গেছে
ভালোবাসার তরী হয়ে গেছে চুরমার
প্রিয়তম সাঙ্গ দিনের কাজ
চুকিয়ে ফেলেছি জীবনের লেনদেন
বিমুক্ত আমরা সবাই এখন
সব পীড়া যন্ত্রণা আর অবসাদ থেকে।

 

ভার্জিনিয়া উলফ (১৮৮২-১৯৪১) :

নারী যখন ফিকশন লেখে তখন তার একটি কক্ষ আর কিছু অর্থ খুব প্রয়োজন।

কথাটি বলেছিলেন ইংরেজি সাহিত্যের প্রখ্যাত নারীবাদী লেখক ভার্জিনিয়া উলফ। উনিশ শতকে মডার্নিজমের বৈশিষ্ট্য সম্বলিত লেখালেখি করা ব্রিটিশ লেখকদের মধ্যে তিনি অন্যতম। এছাড়া প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে তিনি লন্ডন লিটারেরি সোসাইটির গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি ছিলেন। প্রতিষ্ঠিত পরিবারের সন্তান উলফ সারাজীবন মানসিক চাপের মধ্যে পার করেছেন। ১৮৯৫ খ্রিস্টাব্দে মায়ের মৃত্যুর পর উলফের মধ্যে মানসিক বৈকল্যের লক্ষণ ধরা পড়ে। তারপর ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দে বাবার মৃত্যুর পর তিনি একেবারে ভেঙে পড়েন। তখন তাকে কিছুদিনের জন্য হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়। তবে এই সময়ে তিনি লেখালেখি চালিয়ে যান। তার সাড়া জাগানো উপন্যাস Orlando (১৯২৮) এই সময়ে বের হয়। সুখকর ছিল তার দাম্পত্য জীবন। কিন্তু তার মৃত্যুর পরে ওটা নিয়ে সমালোচনা হয়। বিশেষ করে তার স্বামীর প্রতি শেষ যে-চিঠিটা তিনি লিখেন সেটা নিয়ে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম তাদের নিজের মতো ব্যাখ্যা শুরু করে। যদিও তার স্বামী লিওনার্দো উলফ সেই চিঠি পড়ে পাল্টা আরেকটি চিঠি লিখে জানান যে, ভার্জিনিয়া সেরকম দাবি-ই করেন নি যাতে প্রকাশিত হয় তিনি আর পারছেন না। বরং তিনি লিখেছেন, এবার হয়তো দুজন মিলে এই খারাপ সময় আর পার করা যাবে না। স্বামীর উদ্দেশ্যে লেখা ভার্জিনিয়া উলফের সেই শেষ চিঠিতে কী লেখা ছিল?

ভার্জিনিয়া উলফের শেষ চিঠি :

‘প্রিয়তম,
আমি উপলব্ধি করছি, আবারও পাগল হওয়ার পথে। আমি টের পাই, এবার হয়তো আমাদের কঠিন সময় আর ফুরোবে না। বহুবর্ণিল স্বর শুনতে পাই, কিছুতেই মন বসাতে পারি না। তাই যা ভালো মনে হয় তাই করতে যাচ্ছি। তুমি আমাকে সাধ্য মতো সুখী রাখার চেষ্টা করেছ যতটুকু একজন মানুষের পক্ষে সম্ভব। আমার মনে হয় না দুজন মানুষ এতটা সুখী হতে পারে যতটা সুখী আমরা ছিলাম, যদি আমার এই ভয়ংকর অসুখটা দেখা না দিত। আমি আর এর সঙ্গে লড়তে পারছি না। বুঝতে পারি তোমার জীবনটা নিঃশেষ করে ফেলছি, আমি হারালেই তুমি কাজ করতে পারবে। এবং তুমি তা করবে এও জানি। দেখো চিঠিটাও লেখার শক্তি পাচ্ছি না। পড়তেও পারি না। আমি হলফ করে বলতে চাই জীবনের সকল আনন্দের উৎস তুমি। আমাকে নিয়ে তুমি অগাধ ধৈর্য ধরেছ আর কী নিখাদ ভালোমানুষী তোমার। আমি তোমাকেই জানাতে চাই এই সত্যটা যা সকলেই জানে। যদি কেউ আমাকে বাঁচানোর সামর্থ্য রাখত তা শুধুই তুমি। তোমার গভীর ভালোবাসা ছাড়া আর সবকিছুই হারিয়েছি। তোমার জীবনে আমি যেন আর পীড়া হয়ে না থাকি। পৃথিবীতে আমাদের মতো সুখী আর কেউ হতে পারবে বলে আমার মনে হয় না।’

একটি ওভারকোট গায়ে চাপিয়ে আর সেটার পকেটে ভারী ভারী পাথরখণ্ড ঢুকিয়ে নিয়ে নদীতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেন এই সাহিত্যিক। দিনটি ছিল ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দের ২৮ মার্চ।

 

রায়ুনোসুকি আকুতোগাওয়া (১৮৯২-১৯২৭) :

জাপানের টোকিওতে জন্ম নেওয়া রায়ুনোসুকি আকুতোগাওয়া গুরুত্বপূর্ণ একজন লেখক। অতি সংক্ষিপ্ত লেখক জীবন সত্ত্বেও তাকে জাপানি ছোটগল্পের জনক হিশেবে আখ্যায়িত করা হয়। তার নামের প্রথমাংশ (Ryunosuke) রায়ুনোসুকি অর্থ হলো ‘ড্রাগন পুত্র’। তিনি ড্রাগন বছরের ড্রাগন মাসের ড্রাগন ঘণ্টায় জন্মগ্রহণ করেন তাই এই নাম রাখা হয়। রায়ুনোসুকির জন্মের অল্পকাল পরেই তার মা মানসিক রোগে আক্রান্ত হলে এক মামার কাছে তিনি থাকেন এবং সেই মামার পদবি আকুতোগাওয়া থেকেই তার নামের শেষাংশ ‘নিহারা’ পাল্টে আকুতোগাওয়া হয়। ছোটকাল থেকেই রায়ুনোসুকি অন্তর্মুখীন বালক হিশেবে বেড়ে উঠতে থাকে এবং চিনা ক্লাসিক সাহিত্যের প্রতি তার প্রবল ঝোঁক দেখা যায়। টোকিওর ইম্পিরিয়াল বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যের ছাত্রাবস্থায় রায়ুনোসুকি কবি ইয়েটস এবং আনাতোল ফ্রাঁস-এর অনুবাদ করেন যা একটি সাহিত্য জার্নালে প্রকাশিত হয়। এর বছরখানেক পরে ১৯১৫ সালে তার প্রথম ছোটগল্প রশোমন প্রকাশিত হয়। লেখালেখিতে সাফল্য পেলেও তার কর্মে, সৃষ্টিশীলতায় প্রশান্তি বোধ করতেন না। তার লেখার মধ্যে জীবনের যন্ত্রণাদায়ক প্রেক্ষাপটে হাজির হয়েছে মনোবৈকল্য, সংশয়, বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দ্বন্দ্ব। আধুনিক মনস্তত্ব ও জাপানি ধ্রুপদি বিষয়ের এক সম্মিলন লক্ষ করা যায় তার লেখায়। তার মায়ের মানসিক বৈকল্য’র উত্তরাধিকার সূত্রতার বিষয়টি নিয়ে সর্বদা উদ্বিগ্ন থাকতেন রায়ুনোসুকি। তার দত্তক মা ফুকি, তার গর্ভধারিণীর মানসিক বৈকল্যতার ব্যাপারটি আরও বেশি করে তাকে জানান দিতেন। এটা তাকে আরও বেশি মুষড়ে দেয়। এই সময়কালে তিনি ১৫০টির মতো ছোটগল্প লেখেন। তার মধ্যে সর্বদা একটা ভয় কাজ করতে থাকে এবং ‘ভিস্যুয়াল হেল্যুসিনেশন’ দ্বারা আক্রান্ত হন। খাবারের মধ্যে পোকা নড়াচড়া করছে এমন দৃশ্যভ্রম তাকে ব্যতিব্যস্ত করে তোলে। অবস্থা এরকম চলতে থাকলে ১৯২৭ সালে অতিরিক্ত ঘুমের বড়ি খেয়ে তিনি আত্মহত্যা করেন। আত্মহত্যার পূর্বে তিনি একটি নোট রেখে যান যার শিরোানাম ছিল ‘A Note to a Certain Old Friend’

এখানে তার জীবনের বিচ্ছিন্নতা, অসুস্থতা এসবের কথা উল্লেখ করেন। আরও লেখেন, ‘অজানা এক অস্থিরতাবোধ থেকে মুক্তি পাবার জন্যেই তিনি আত্মহত্যা করেছেন।’

সাহিত্যে নিজের অভিজ্ঞতাসমূহের সঠিক নিরূপণ এবং প্রলেটারিয়েট আন্দোলনকে যুক্ত করা সম্ভব হচ্ছিল না এটাও তার আত্মহত্যার একটা কারণ হিশেবে অনেকে ধারণা করেন।

তার গল্প ‘রশোমন’ থেকে ‘আকিরা কুরোসাওয়া রশোমন’ (১৯৫০) চলচ্চিত্র নির্মাণ করেন যা ১৯৫১ সালে ভেনিস চলচ্চিত্র উৎসবে শ্রেষ্ঠ চলচ্চিত্র হিশেবে পুরস্কার পায়।


হেমিংওয়ের বোন উরসুলা আর ভাই লেইচেস্টারও আত্মহত্যা করেন।


 

আর্নেস্ট হেমিংওয়ে (১৮৯৯-১৯৬১) :

‘Man can be destroyed but not defeated’ কথাটি আর্নেস্ট হেমিংওয়ে নামক এক নোবেল বিজয়ী (১৯৫৪) মার্কিন সাহিত্যিক তার দি ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি উপন্যাসে বলেছিলেন। তখন ভাবতে অবাক লাগে তাহলে হেমিংওয়ে কি পরাজয় থেকে বাঁচার জন্য নিজেকে শেষ করেন! যে মানুষটা উপন্যাসে আশা আর স্বপ্নের ভিত বুনেন সে নিজেই যখন আত্মহত্যা করেন তখন তো খটকা তৈরি হয়। তবে আত্মহত্যা প্রবণতা হেমিংওয়ের পারিবারিক বলয়ে আগে থেকেই ছিল। ১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে হেমিংওয়ের পিতা ডা. ক্লোরেন্স হেমিংওয়ে আত্মহত্যা করার পর হেমিংওয়ে বলেছিলেন :

I’ll probably go the same way.

বংশগতভাবে তার মধ্যে Hemochromatosis রোগ দেখা দেয় যা শরীরে আয়রন বিপাকে অসমর্থন করে ফলে শারীরিক ও মানসিক বৈকল্য দেখা দেয়। হেমিংওয়ের বোন উরসুলা আর ভাই লেইচেস্টারও আত্মহত্যা করেন। মদ্যপানে আসক্তি, একের পর স্ত্রী বিচ্ছেদ, ১৯ বছর বয়সী এক ইতালিয়ান মেয়েকে প্রেমের প্রস্তাব দিয়ে প্রত্যাখ্যাত হওয়া,  সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হওয়া, মাথায় যন্ত্রণা, উচ্চরক্তচাপ, ওজনজনিত সমস্যা, ডায়াবেটিক এসব মিলিয়ে হেমিংওয়ের স্বাভাবিক কাজকর্ম করতে ব্যাপক সমস্যার সম্মুখীন হতো। তাছাড়া বেশ কয়েকজন সাহিত্যিক বন্ধু : ইয়েটস, ফোর্ড ম্যাডক্স ফোর্ড, ফিটজেরাল্ড, এন্ডারসন, জয়েস, গারট্রুড স্টেইন. ম্যাক্স পারকিন্স ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে মৃত্যুবরণ করেন। এদের মৃত্যু হেমিংওয়ের মধ্যে একটা প্রভাব ফেলে। ১৯৪০ থেকে ১৯৫০ প্রায় দশবছর হেমিংওয়ে কোনো সাহিত্যচর্চাও করেন নি।

মৃত্যুর কয়েকদিন আগে তিনি খুব হতাশা আর বিষণ্নতায় ভুগতে শুরু করেন। তখন মাইয়ো ক্লিনিকে চিকিৎসা নেওয়ার পর তিনি আত্মহত্যার চেষ্টা করে ব্যর্থ হন। তারপর ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দের ২ জুলাই ডাবল ব্যারল শর্টগানের গুলিতে আত্মহত্যা করেন।

 

ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা (১৮৯৯-১৯৭২) :

ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা ১৯৬৮ সালে সাহিত্যে নোবেল পান। জাপানি এই সাহিত্যিক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর-এর পর দ্বিতীয় এশিয়ান হিশেবে এটা অর্জন করেন। জাপানের ওসাকা নগরীতে জন্মগ্রহণকারী এই সাহিত্যিক অতি অল্পবয়সে বাব-মা হারান। তারপর দাদি আর বোনের মৃত্যু এরপর দাদার মৃত্যু তাকে পুরোপুরি নিঃসঙ্গ করে। তার প্রথম দিককার লেখা জুরকু সাই নো নিককি গ্রন্থে শৈশবের এইসব চিত্র উঠে এসেছে। তার লেখায় ভর করে আছে নৈরাশ্যজনক প্রকৃতি আর মৃত্যুপ্রসঙ্গ। আর এজন্য তার শৈশবের নিঃসঙ্গতার প্রভাবকেই কারণ হিশেবে মনে করা হয়। তিনি ১৯২০ সালে টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি সাহিত্যে ভর্তি হন কিন্তু সেখান থেকে পরের বছর জাপানি সাহিত্য বিভাগে চলে যান। ১৯২৪ সালে এখান থেকে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা আরেক জাপানি সাহিত্যিক য়ুকিও মিশিমা-কে তার গুরু হিশেবে মান্য করতেন। সাহিত্যের পাশাপাশি তিনি চলচ্চিত্রের সঙ্গেও জড়িয়ে পড়েন এবং তার লেখা চিত্রনাট্য থেকে নির্মিত চলচ্চিত্র ‘কুরুত্তা ইপ্পেইজি’ ক্লাসিকের মর্যাদা পায়। জীবনের শূন্যতা আর মৃত্যুভাবনা তার লেখার অন্যতম অনুষঙ্গ যা লক্ষ করা যায় আসাকুসা কুরেনাই দান এবং মাৎসুগো নো মে তে। নোবেল পুরস্কার গ্রহণের পর ইয়াসুনারি কাওয়াবাতা বলেন :

তার কর্মে তিনি চেয়েছেন মৃত্যুকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করতে; মানুষ, প্রকৃতি ও শূন্যতার মাঝে সাযুজ্য অনুসন্ধান করতে এবং সারা জীবন তিনি সৌন্দর্যকেই খুঁজে বেড়িয়েছেন।

নোবেল প্রাপ্তির তিন বছর কয়েক মাস পর ১৯৭২ সালের ১৬ এপ্রিল তার বাড়ি হতে কিছু দূরে একটি অ্যাপার্টমেন্টের গ্যাস ভর্তি একটি কক্ষে তার মৃতদহে পাওয়া যায়।

 

পাউল সেলান (১৯২০-১৯৭০) :

জার্মানভাষী কবি পাউল সেলান ১৯২০ সালে উত্তর রুমানিয়ার বুকোভিনায় জন্মগ্রহণ করেন। পাউল আনসেল তার প্রকৃত নাম। পাউল সেলানের পিতা মাতা ইহুদি হওয়ায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন ১৯৪০-এর দিকে তাদেরকে কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পে আটকে রাখা হয়। সেখানেই টাইফয়েডে তার বাবা মারা যায় আর মায়ের ঘাড়ে গুলি করে হত্যা করা হয়। মরার কথা ছিল পাউল সেলানেরও কিন্তু ভাগ্যক্রমে তিনি বেঁচে যান। কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প থেকে বেঁচে যাওয়া কবি যখন আত্মহত্যা করেন তখন ব্যাপারটা বিস্ময়কর ঠেকে। ২৮ বছর বয়সে তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ Der Sand aus den Umen প্রকাশিত হয়। পাউল সেলান-কে ‘বাণপ্রস্থের কবি’ হিশেবেও অনেকে বলে থাকেন। ‘জৈবনিক যন্ত্রণাকে আত্মার ভাষায় ভারহীন করে নিয়েছেন সেলান তার কবিতায়। ফলে জাগতিক যন্ত্রণা পেরিয়ে আরও অনেক গভীরে প্রবেশ করে সেই কবিতা।’ হয়তোবা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্পের বিভীষিকা তার কাব্যে এই বৈশিষ্ট্য আনে।

জার্মান দার্শনিক মার্টিন হেইডেগার-এ মুগ্ধ ছিলেন পাউল সেলান। আর হেইডেগার-এর সঙ্গে দেখা করতে গিয়ে সেলান-এর পরিচয় হয় কবি ইঙ্গেবোর্গ বাখম্যানের। তারপর তারা পত্র চালাচালির মাধ্যমে এক বায়বীয় প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলেন। পরবর্তীকালে জিসেল লেস্ত্রাঁজ নামে এক ফরাসি গ্রাফিক শিল্পীর সঙ্গে আলাপ হয় এবং ১৯৫২ সালে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। বিয়ের পর জিসেল লেস্ত্রাঁজ স্বামী পাউল সেলান-এর সঙ্গে ইঙ্গেবোর্গ বাখম্যানের বায়বীয় প্রেমের কথা জানতে পারেন তবে পরবর্তী সময়ে তা মেনে নেন। জিসেল লেস্ত্রাঁজ স্বামী পাউল সেলানকে সারা জীবনে প্রায় ৭০০ চিঠি লেখেন আর এসব চিঠি ২০০২ সালে তাদের পুত্র এরিক সেলান গ্রন্থাকারে প্রকাশ করেন। প্যারিসের দিনগুলিতে এবং জার্মান সফরকালে পাউল সেলান জ্যঁ কখতো, আঁরি মিশো, উঙ্গারেত্তি, মান্ডেলস্টাম, ফার্নান্দো পেসোয়া, আতুর র‌্যাঁবো অনেকের কবিতা জার্মান ভাষায় অনুবাদ করেন। এরপর একটা বিপত্তি ঘটে। ১৯৬০-এর গোড়ার দিকে কবি ইভান গ্যোলের স্ত্রী ক্লোয়ার গ্যোল অভিযোগ করেন পঞ্চাশের দশকে তার স্বামীর কবিতা চুরি করেছেন পাউল সেলান। যদিও এই অভিযোগ সেলান-এর বন্ধু এবং পাঠকেরা আমলে নেয় না তবুও তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন এবং ধীরে ধীরে মানসিক বৈকল্যের দিকে তাড়িত হন। ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত সেলান গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন এবং তাকে স্যানাটোরিয়ামে থাকতে হয়। এরপর ১৯৭০ সালের ২০ এপ্রিল সকালবেলা স্যেন নদীর উপর মীরাবো সেতুতে তিনি যান। তারপর মীরাবো সেতু থেকে স্যেন নদীতে ঝাঁপ দেন। সেতুতে পড়ে থাকে তার টুপি। কয়েকজন পথচারী দেখে চিৎকার করলে তার নিস্তরঙ্গ দেহ স্যেন থেকে উদ্ধার করা হয়। অ্যামিল জোলা এভেনিউয়ের যে ফ্ল্যাটে তিনি থাকতেন সেখানে ওইদিনের খোপে সেলান লিখেছিল ‘যাও পাউল।’ হয়তোবা স্যেন নদীর এই চিরযাত্রার কথাই তিনি লিখেছিলেন।

 

য়ুকিও মিশিমা (১৯২৫-১৯৭০) :

জাপানি লেখক য়ুকিও মিশিমা-এর প্রকৃত নাম কিমিতা হিরাওকা। য়ুকিও মিশিমা যুদ্ধপরবর্তী জাপানের বিখ্যাত লেখক এবং নোবেল পুরস্কারের যোগ্য দাবিদার ছিলেন। মিশিমা একজন গুরুত্বপূর্ণ ঔপন্যাসিক, নাট্যকার, মঞ্চাভিনেতা, পরিচালক, চলচ্চিত্রাভিনেতা, অর্কেস্ট্রা পরিচালনাকারী। কিন্তু শিল্পসাহিত্যের এইসব অঙ্গনের পরিচিতি ছেড়ে তিনি রাজনৈতিক এক্টিভিস্ট হয়ে পড়েন। ১৯৪৭ সালে য়ুকিও মিশিমা টোকিও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন আর এই সময়ে শিল্পসাহিত্য চর্চায় জড়িয়ে পড়েন। জাপানের বিভিন্ন বিখ্যাত পত্রিকায় তার লেখা প্রকাশিত হতে থাকে। মাধ্যমিক স্কুলে থাকাকালীন ‘বুনগেই বুনকা’ পত্রিকায় এত কম বয়সী একজন ছাত্রের লেখা ছাপা নিয়ে সম্পাদনা পর্ষদ দোটানায় পড়লে শিক্ষকের পরামর্শে প্রকৃত নাম ‘কিমিতা হিরাওকা’ বাদ দিয়ে ‘য়ুকিও মিশিমা’ ছদ্মনামে লেখা ছাপানো হয়। তারপর ওই নামেই তিনি পরিচিত হয়ে ওঠেন। যদিও তার বদরাগী বাবা লেখালেখি একদম সহ্য করতে পারতেন না এবং মিশিমার কোনো লেখা পেলে তা নষ্ট করে ফেলতেন। যুদ্ধপরবর্তী জাপানের ধ্বংসযজ্ঞতা, জাতীয়তাবাদী মূল্যবোধ ও আবহমান ঐতিহ্যের অবক্ষয়-চিত্র মিশিমা-কে দারণ বিরক্ত করে। মিশিমা রুগ্‌ণতা, বিকারগ্রস্ততা, মর্ষকামিতা দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন এবং তার পুরো অহমিকাযুক্ত ক্যারিয়ারে বরাবরই মৃত্যু ভাবনা এসেছে। কিন্তু তিনি কখনওই হতাশার কাছে পরাজয় স্বীকার করে স্বীয় জীবনকে মাদক কিংবা গ্যাসের চুলায় সমর্পণ করেন নি।  একজন দক্ষ সামুরাই হিশেবে মিশিমা জাপান সেলফ ডিফেন্স ফোর্স (JSDF)-এ যোগ দেন এবং পরবর্তীকালে শিল্ড সোসাইটি নামে নিজস্ব বাহিনী গড়ে তোলেন। ‘১৯৬৭ সালে তিনি গোপনে প্রায় একমাস প্রতিরক্ষা প্রশিক্ষণ নেন এবং ১৯৬৮ সালে একশত লোকের একটি ব্যক্তিগত সেনাবাহিনী গড়ে তুলেন, যারা সম্রাটের প্রতিরোধের শপথ নিয়েছিল।’ ১৯৭০ সালের ২৫ নভেম্বর মিশিমা এবং শিল্ড সোসাইটির চারজন সদস্য সেলফ ডিফেন্স ফোর্স (JSDF)-এর টোকিও সদর দফতরে হামলা চালিয়ে তার কমান্ডার জেনারেল মাসউদা-কে বেঁধে রেখে হাতে একটি সোর্ড নিয়ে হুমকি দেন, জেনারেলের আট শ সৈন্যকে মিশিমার ভাষণ শুনতে কোর্টইয়ার্ডে আসার জন্য। সেই ভাষণে তিনি সৈন্যদের যুদ্ধপরবর্তী গণতন্ত্র ছেড়ে প্রাচীন জাপানের সামুরাই শাসনে পুনরুজ্জীবিত হওয়ার কথা বলেন। তার আধঘণ্টার ভাষণ সৈন্যদের কাছে ভালো মতো পৌঁছার আগেই সাত মিনিটের মাথায় তারা বিদ্রূপ আর চিৎকার শুরু করে। যখন তিনি সমবেত সৈন্যদের কাছে তার ভাষণের মূল উদ্দেশ্য পৌঁছাতে পারছিলেন না তখন আত্মহত্যার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন এবং এতিহ্যবাহী seppuku পদ্ধতিতে নিজের পেট ধারাল অস্ত্র দিয়ে চিরে আত্মহত্যা করেন। সামুরাইরা শত্রুর হাতে ধরা পড়ার পর আত্মসমর্পণ না করে এই প্রথায় আত্মহত্যা করে।

 

সিলভিয়া প্লাথ (১৯৩২-১৯৬৩) :

আমেরিকান কবি সিলভিয়া প্লাথ-এর নাম এলেই ব্রিটিশ কবি টেড হিউজ চলে আসে। বিশ শতকের এই কবি দম্পতি প্রায় সাড়ে ছয় বছরের মতো সংসার যাপন করেন। আমেরিকার বোস্টনে জন্ম নেওয়া কবি সিলভিয়া প্লাথ-এর মধ্যে আগে থেকেই আত্মহত্যার প্রবণতা ছিল। বিশেষ করে তার পিতার মৃত্যু তাকে ভীষণ নাড়া দেয়। ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে তার পিতার মৃত্যু সংবাদ পাওয়ার পর বলেছিলেন :

I’ll never speak to God again.

১৯৪১-এ তার প্রথম কবিতা ছাপা হয়। তারপর ১৯৫০-এর তিনি নিজের লেখনী নিয়ে সংশয়ে পড়েন। আর তখন তার মধ্যে হতাশা, বেদনা এসে ভর করে। এই সময়ে তিনি ইনসমনিয়া আক্রান্ত হন এবং আত্মহত্যার কথা চিন্তা করেন আর লিখেন :

আমি নিজেকে হত্যা করতে চাই। পালাতে চাই দায় দায়িত্ব থেকে। মাতৃজঠরে ফিরে যেতে চাই… শোচনীয় হামাগুড়ি দিয়ে।

এরপর ১৯৫৩-র জুন মাসে নিউইয়র্কের মাদামোয়েজেল ম্যাগাজিনের অতিথি সম্পাদক হন আর পরিচয় হয় কবি টমাস ডিলানের সঙ্গে। এই সময়ও তিনি মারাত্মক ইনসমনিয়া আক্রান্ত  হন এবং রাতের পর রাত নির্ঘুম কাটাতে থাকেন। এক রাতে তার মাকে বলেন :

আমি নাড়িভুড়ি দেখতে চাই। I want to die.

এরপর তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে জানা যায়, তার এই আবেগের কারণ হলো ওই সময়ের ভাবনাকেন্দ্রিক। হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়ে সুস্থ হয়ে বাসায় ফেরার পর ১৯৫৩ সালের ২৪ আগস্ট বাড়িতে একা থাকা অবস্থায় একটা নোট লিখলেন :

এক দীর্ঘযাত্রায় যাচ্ছি…

তারপর সেলর এর ভেতর দিয়ে পোর্চে প্রবেশ করে হামাহুড়ি দিয়ে যাওয়ার মতো এক স্থানে ঢুকে চল্লিশটা ঘুমের বড়ি খেয়ে ফেলেন। পরদিন পত্রিকায় প্রকাশিত হলো তার নিখোঁজ সংবাদ। তার মা খোলা লকবক্স আর খোয়া যাওয়া স্লিপিং পিল থেকে বুঝতে পারলেন আসল ঘটনা। স্লিপিং পিলের প্রসঙ্গে তার মা অরেলিয়া বলেন, লেখার অক্ষমতার কারণে তার মেয়ে হতাশ হয়ে পড়ে। এর দুইদিন পর সেলার থেকে তাকে উদ্ধার করা হয়। তারপর হাসপাতালের মনোরোগ বিভাগে ইলেকট্রোশক ট্রিটমেন্টের মাধ্যমে তাকে সুস্থ করা হয়। ১৯৫৪ খ্রিস্টাব্দে প্লাথ তার চেয়ে অনেক বেশি বয়সী একজনের সঙ্গে সম্পর্কে জড়ান। আর সেখানে ঘটে এক ভয়াবহ নির্যাতনের ঘটনা। যা প্লাথের মনে এক স্থায়ী ক্ষত তৈরি করে। তারপর ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দে স্কলারশিপ নিয়ে তিনি সাহিত্য পড়ার জন্য কেমব্রিজের নিউনহাম কলেজে সুযোগ পান। আর এখানেই কবি টেড হিউজের সঙ্গে তার পরিচয়, সম্পর্ক অতঃপর বিয়ে। তাদের সাড়ে ছয় বছরের দাম্পত্য জীবন সুখের ছিল না। কারণ হিশেবে অবশ্য টেড হিউজের অসংযমী জীবন যাপনকেই বেশি ইঙ্গিত করা হয়। আত্মহত্যা করার দিন দুয়েক/ তিনেক আগে সিলভিয়া প্লাথ স্বামী টেড হিউজকে একটা চিঠি পাঠান। চিঠিতে লিখেছিলেন :

আমি লন্ডন ছেড়ে চলে যাচ্ছি। আর কোনোদিন তোমার মুখ দেখতে চাই না।

চিঠি পাওয়ার পর হিউজ লন্ডনের প্রিমরোজ হিলে প্লাথের সঙ্গে দেখা করতে আসেন। তখন সিলভিয়া হিউজের কাছ থেকে চিঠিটি কেড়ে নিয়ে সিগারেট অ্যাশট্রেতে পুড়িয়ে দেন। ‘লাস্ট লেটার’-এ যার উল্লেখ করেন হিউজ : Burning your letter to me, in the ashtray, এটিই ছিল তাদের শেষ দেখা। এই শেষ চিঠি দ্বারা তাড়িত হয়ে টেড হিউজ ‘লাস্ট লেটার’ লেখেন :

What happened that night? Your final night.
Double, treble exposure
Over everything. Late afternoon, Friday,
My last sight of you alive.
Burning your letter to me, in the ashtray,
With that strange smile. Had I bungled your plan?

অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির শিক্ষক, গবেষক জোনাথন বেট উল্লেখ করেন, ‘শনিবার সিলভিয়া ফোন করেন হিউজকে। ফোনের রিসিভার তোলেন হিউজের প্রেমিকা সোসার এলিস্টন। এই ঘটনায় মনে চরম আঘাত পান সিলভিয়া। পরদিন হিউজ তাকে ফোন করে এটাকে সহজভাবে নেওয়ার কথা বলেন। কিন্তু ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দে যে-বাসায় বিয়ের প্রথম রাত কাটান হিউজ সিলভিয়া দম্পতি সেই বাসায় আরেক নারীর উপস্থিতিকে সহজভাবে নিতে পারে নি সিলভিয়া। তারপর যা করলেন : বাচ্চাদের রুমে রেখে আসেন রুটি আর দুধ। তারপর জানালা বন্ধ করেন আর ট্যাপ দিয়ে সিল করেন দরজা। নিচতলায় নেমে নিজেকে আবদ্ধ করেন রান্নাঘরে। হাঁটু গেড়ে চুলার সামনে বসে মাথা লাগিয়ে ছেড়ে দিলেন গ্যাস। পরদিন নার্স তাকে মৃত অবস্থায় পায়। দিনটি ছিল ১৯৬৩ খ্রিস্টাব্দের ১১ ফেব্রুয়ারি। আর ১৯৬৩-তে লেখা ‘লাস্ট লেটার’ প্রকাশিত হয় ২০১০ সালে যার শেষ লাইন :

Then a voice like a selected weapon
Or a measured injection,
Coolly delivered its four words
Deep into my ear: ‘Your wife is dead.’

 


অ্যানি সেক্সটন চায় নাই জীবিত থাকাকালে তার এই কবিতা-গ্রন্থটি প্রকাশিত হোক।


অ্যানি সেক্সটন (১৯২৮-১৯৭৪) :

আমেরিকান এই কবিকে confessional বা স্বীকারোক্তিমূলক কবি হিশেবে আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে। তিনি কবিতায় এমন সব ব্যক্তিগত আচরণাদিকে হাজির করেছেন যা অন্য কবিরা পারেন নি। তার কবিতার রজঃস্রাব, গর্ভপাত, হস্তমৈথুন, অজাচার, প্রাপ্তবয়স্কতা, নেশাগ্রস্ততা এইসব বিষয়আশয় ঘিরে আছে। সেক্সটন জীবনের বড়ো একটা সময় মানসিক অসুস্থতার মধ্যে পার করেন। ১৯৫৪-তে তার মধ্যে প্রথম মানসিক বিকারগ্রস্ততা দেখা দেয়। তারপর ১৯৫৫-তে দ্বিতীয়বার আক্রান্ত হলে তিনি চিকিৎসকের শরণাপন্ন হন এবং তার দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসা চলে। ওইসময় চিকিৎসক তাকে কাব্যচর্চায় আগ্রহী হতে উদ্বুব্ধ করেন এবং কবিতাচর্চার মাধ্যমে মানসিকচাপ কাটিয়ে ওঠার পরামর্শ দেন।

১৯৬০-এর শেষের দিকে মানসিক বিকারগ্রস্ততা তার সাহিত্যচর্চায় বিপত্তি ঘটালেও লেখালেখি, প্রকাশনা, পাঠ সমানতালে চলতে থাকে।

১৯৭৪ সালের ৪ অক্টোবর, অ্যানি সেক্সটন তার এক বন্ধু ক্যুমিন-এর সঙ্গে কাব্য সংকলন The Awful Rowing Toward God এর পাণ্ডুলিপি নিয়ে আলোচনা শেষে বাড়ি ফেরার পর তার মায়ের পশমী কোট গায়ে দেয় তারপর হাতের সব আংটি খুলে ফেলে একগ্লাস ভোদকা নিয়ে গাড়ির গ্যারেজে নিজেকে তালাবন্দি করে এবং গাড়ির ইঞ্জিন স্টার্ট দেয়। অতঃপর কার্বন মনোক্সাইড গ্যাসের প্রতিক্রিয়ায় তার মৃত্যু হয়। তার মৃত্যুর এক বছর পূর্বের এক সাক্ষাৎকার থেকে জানা যায় যে, অ্যানি সেক্সটন চায় নাই জীবিত থাকাকালে তার এই কবিতা-গ্রন্থটি প্রকাশিত হোক।

 

কারিন বোয়ে (১৯০০-১৯৪১) :

সুইডিশ কবি ও ঔপন্যাসিক কারিন বোয়ে গোথেনবার্গ শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তারপর ৯ বছর বয়সে স্টকহোম চলে আসেন। উপশালা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার সময়ে তিনি Swedish Clarté League নামে একটি এন্টি ফ্যাসিস্ট সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে জড়িত হন। তার লেখায় প্রতীকধর্মীতা, বিষণ্নতা, বিপন্নতা, বিয়োগাত্মক বৈশিষ্ট্যে ভরপুর। তিনি টি.এস. এলিয়টের কবিতা সুইডিশ ভাষায় অনুবাদ করেন। কারিন বোয়ে কবিতার ক্ষেত্রে বেশি পরিচিতি পান Yes, of course it hurts বইটির জন্য। ১৯৩২ সালে স্বামীর সঙ্গে ছাড়াছড়ির পর তিনি সমকামী সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। ১৯৪১ সালের ২৩ এপ্রিল বোয়ে বাড়ি থেকে বের হয়ে যায়। তারপর ২৭ এপ্রিল পাহাড়ের উপর একটি পাথরের কাছে তার মৃতদেহ পাওয়া যায়। অতিরিক্ত ঘুমের বড়ি খেয়ে আত্মহত্যা করে এই লেখক। মানসিক অবসাদ থেকে তিনি আত্মহত্যা করেন বলে মনে করা হয়।

হান্টার এস. থম্পসন (১৯৩৭-২০০৫) :

মার্কিন সাহিত্যিক ও Gonzo journalism-এর সূচনাকারী হান্টার এস. থম্পসন বিখ্যাত হয়ে আছেন তার Fear and Loathing in Las Vegas উপন্যাসের জন্য। কল্পনা আর বাস্তবতার এক অপূর্ব মিশেল ঘটিয়ে তিনি তার লেখার জগৎ নির্মাণ করেন। তার লেখায় বাস্তব আর কল্পনা মিলেমিশে একাকার হয়ে একই রেখায় চলে আসে। এটা তার লেখনীর বৈশিষ্ট্য। পুলিশের হাতে লস এঞ্জেলস-এ এক সাংবাদিক হত্যার খবর সংগ্রহ করতে গিয়ে তার মাথায় Fear and Loathing in Las Vegas উপন্যাসের ভাবনা আসে। ব্যক্তির গোপনীয় তথ্য সংরক্ষণ অধিকার আর আগ্নেয়াস্ত্র রাখার ব্যাপারে তিনি ভীষণ সোচ্চার ছিলেন। তার নিজের সংগ্রহেও প্রচুর গোলাবারুদ আর আগ্নেয়াস্ত্র ছিল। থম্পসন মারিজুয়ানা আর অন্যান্য মাদক ব্যবহারের আইনি অধিকার দাবি করতেন। দীর্ঘদিন ধরে বিকলাঙ্গতা আর বয়স বৃদ্ধিজনিত হতাশায় ভুগছিলেন এই ঔপন্যাসিক। বিশেষ করে তার ভাঙা পা আর হিপ পুনঃস্থাপন ব্যাপারে। হান্টার এস. থম্পসন ২০০৫ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারির ২০ তারিখ স্ত্রীর সঙ্গে টেলিফোনে কথা বলার সময় গুলি করেন নিজেকে। এর চারদিন আগে তিনি স্ত্রী আনিতাকে উদ্দেশ্য করে ফুটবল খেলার মৌসুম শেষ নামে একটি নোট লিখেন। যদিও বুঝার উপায় নাই এটা তার সুইসাইড নোট কি-না। তারপরও কথাগুলোর তাৎপর্য আসলে সেদিকেই যায়। হান্টার এস. থম্পসন-এর শেষ নোট :

ফুটবল খেলার দিন শেষ

আর কোনো খেলা নেই। আর নেই বোমা। চলনও নেই। ঠাট্টাও নেই। সাঁতারানো নেই। ৬৭। ৫০ পেরিয়ে আরও ১৭টি বছর। আমার প্রত্যাশার বাইরে ১৭টি বছর। অসহ্য। আমি সর্বদা আমুদে। কারো জন্য কোনো মজা অবশিষ্ট নেই। ৬৭। তুমি লোভী হয়ে যাচ্ছ। নিজেকে সামলাও। শান্ত হও-তোমাকে আঘাত দেবে না।

এটাই ছিল তার শেষ লেখা। মৃত্যুর ৩০ মিনিট পর তার পুত্র মৃতদেহ পায়।

 

জন বেরিম্যান (১৯১৪-১৯৭২) :

আমেরিকান কবি জন বেরিম্যান ওকলাহোমায় জন্মগ্রহণ করেন। আমেরিকান কাব্যজগতে তিনি স্মরণীয় হয়ে আছেন বিশ শতকের দ্বিতীয় পর্যায়ে Confessional কবিতার জন্য। যখন তার বয়স ১১ বছর তখন পিতার আত্মহত্যা তার বালক মনে এক দীর্ঘ প্রভাব ফেলে। যা থেকে তিনি আর বের হতে পারেন নি। তার পিতার এই আত্মহত্যা নিয়ে তিনি কবিতা লিখেন। ‘That mad drive [to commit suicide] wiped out my childhood. I put him down/while all the same on forty years I love him/stashed in Oklahoma/besides his brother will’  তিনি বিখ্যাত হয়ে আছেন The Dream Songs কাব্যের জন্য। এই কাব্যের জন্য তিনি পুলিৎজার পুরস্কার পান। অতিরিক্ত আবেগী আর মাদকাসক্ত হওয়ার ফলে ১৯৭২ সালের ৭ জানুয়ারি ওয়াশিংটন এভিনিউ ব্রীজ থেকে লাফ দিয়ে আত্মহত্যা করেন।

 

কায়েস আহমেদ (১৯৪৮-১৯৯২) :

পশ্চিমবঙ্গের হুগলি জেলায় জন্ম নেন কথাসাহিত্যিক কায়েস আহমেদ। দেশভাগের পর বাবামায়ের সঙ্গে এদেশে চলে আসেন। এরপর তিনি একটু বড় হলে বাবা মা ফিরে গেলেও তিনি আর যান নি । মামার কাছে থেকে যান ঢাকায়। ১৯৬৯ সালে তার বাবার মৃত্যুর পর গ্রামে যাওয়ার চেষ্টা করেও যেতে পারেন নি পাকিস্তানের পাসপোর্ট না থাকায়। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে গেলে মায়ের সঙ্গে কিছুদিন থাকা হয়। কায়েস আহমেদ এক অন্তর্মুখীন মানুষ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগে ভর্তি হওয়ার বছরখানেক পরে পড়া ছেড়ে দেন। কিছুদিন সাংবাদিকতাও করেছিলেন কিন্তু থিতু হতে পারেন নি। শিক্ষকতার প্রতি তার আগ্রহ ছিল। ১৯৮০ সালে ঢাকার একটি প্রথম শ্রেণির স্কুলে চাকরি পান। পাঠককে ধরে রাখার ভাষা আর কৌশল রপ্ত করার পরেও তিনি বরাবরই নিজেকে ভেঙেছেন নতুন আঙ্গিক আর কাহিনির সন্ধানে। তাই বরাবর-ই তিনি নতুন লেখক। চারটি বই তার সম্বল। মানসিক রোগাক্রান্ত স্ত্রীকে সারিয়ে তোলার জন্য তিনি অনেক সেবা আর চেষ্টা করেন কিন্তু শেষ পর্যন্ত পারেন নি। ১৯৯২ সালের ১৪ জুন, তিন তলা বাড়ির ছোট ফ্ল্যাটে লোহার দরজা ও কাচের জানালা আটকে দিয়ে সিলিং ফ্যানের সঙ্গে নিজের গলাটা টাইট করে বেঁধে সটান ঝুলে পড়লেন কায়েস আহমেদ।

 

শামশের আনোয়ার (… -১৯৯৩) :

পশ্চিমবঙ্গের ষাটের দশকের অন্যতম কবি শামশের আনোয়ার। তিনটি কবিতার বই আর কিছু প্রবন্ধ-ই তার সম্বল। তবে এই দিয়ে শামশের আনোয়ারকে পুরোপুরি উদ্‌ঘাটন করা যায় না। শামশের আনোয়ার ষাট দশকের বাংলা কবিতায় পুরোধা ব্যক্তি, যিনি বাজার চলতি পত্র-পত্রিকার নিয়মিত কবি হয়েও ছিলেন বাজার চলতি সাহিত্যের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, স্বাতন্ত্র্যে উজ্জ্বল এক কবি। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের কৃত্তিবাস পত্রিকা থেকে প্রথম পুরস্কার পাওয়া তরুণ কবি হলেন শামশের আনোয়ার। নিজের কবিতা নিয়ে তার মত ছিল, ‘ইনসমনিয়া নাইট মেয়ার, নার্ভাস ব্রেকডাউন অর্থাৎ ফিয়ার অব সাইকোসিস ছাড়া আমার পক্ষে সম্ভব হতো না কবিতা লেখার আর এটা প্রকাশ করে একজন প্রকৃত কবির কবিতা লেখার অথেন্টিক প্রসেস।’ সামন্ত পরিবারে জন্মেছিলেন শামশের আনোয়ার। লেখক বশীর আল হেলাল ছিলেন তার মামা। তার মা ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় এম.এ-তে প্রথম শ্রেণি পাওয়া শুরুর দিকের নারী শিক্ষার্থী। এক আড্ডায় মৃত্যু প্রসঙ্গে শামশের বলেন :

আমার পছন্দ, শাদা ছটফটে বিছানায় শুয়ে মুঠো মুঠো স্লিপিং পিল খেয়ে, ধীরে ধীরে মৃত্যু উপভোগ করতে করতে নিঃশব্দে চলে যাব।

১৯৯৩ সালের ১২ জুন সকাল আটটায় ঠিক এমনভাবেই স্বেচ্ছামৃত্যুকে বরণ করেন শামশের আনোয়ার। তার মৃত্যু নিয়ে সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় ডায়েরিতে লিখেন :

আজ সকাল ৮ টায় শামশের আনোয়ার শামশেরকে মেরে ফেলল। আত্মহত্যা করার কথা অনেকেরই, অনেকেই করে না। প্রয়োজনও থাকে না। কারণ মৃত্যু তো আগেই হয়ে গেছে, শামশের ভীষণভাবে বেঁচেছিল। তাই, কলকাতার সাহিত্য সংসারে সে ছিল একজন প্রকৃত একঘরে কবি।

 

শামীম কবির (১৯৭১-১৯৯৫) :

নব্বই-এর গোড়ার দিকে ঢাকায় লিটল ম্যাগাজিনকেন্দ্রিক সাহিত্যের এক অনন্য নাম কবি শামীম কবির। বগুড়ার কাহালু থানায় নানাবাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন শামীম। রংপুর ক্যাডেট কলেজ মাধ্যমিক আর রাজশাহী কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাশ করার পর প্রথাবদ্ধ প্রাতিষ্ঠানিক পড়াশোনায় তার অনীহা ভর করে। বোহেমিয়ান জীবনের হাতছানি কবির রক্তে মিশে যায়। কিন্তু পরিবার থেকে তা মেনে নেওয়া হয় নি। যাপিত জীবনে শামীম কবির কবিতাকেই ধারণ করেছিলেন। মনস্তত্ত্বের বহুস্তরিক জটিলতা, একাকিত্ব, নিঃসঙ্গতা, যন্ত্রণা, বিচ্ছিন্নতা এইসব বিষয় নিয়ে শামীম গেঁথেছেন তার কবিতা। লোকজ অনুষঙ্গও এসেছে তার কবিতায়। লেখালেখির পাশাপাশি এই কবির ছবি আঁকার হাত আর গানের গলাও ছিল। ১৯৯৫ সালের ২ অক্টোবর বগুড়ার নিজ বাড়িতে কবি শামীম কবির আত্মহত্যা করেন। মৃত্যুর দুই বছর পর ১৯৯৭ সালে শামীম কবির সমগ্র বের হয়। তারপর ২০১০ সালে অ্যাডর্ন থেকে প্রকাশিত হয় নির্বাচিত কবিতা : শামীম কবির।

 

দায় :
জাপানের সাহিত্য ও সাহিত্যিক; মুহাম্মদ নাসির উদ্দিন; নিপ্পন একাডেমি; ফেব্রুয়ারি ১৯৯৯; চট্টগ্রাম।
আখতারুজ্জামান ইলিয়াস, সংস্কৃতির ভাঙা সেতু; মাওলা ব্রাদার্স; সেপ্টেম্বর ২০০৫; ঢাকা।
কবিতার অন্যকোনখানে-১; আর্যনীল মুখোপাধ্যায়; পত্রলেখা; ২০১০;কলকাতা।
স্বপ্নপরিব্রাজকেরা; গৌতম গুহ রায়; চিহ্ন; ফেব্রুয়ারি ২০১৪; রাজশাহী।
আত্মঘাতী লেখকেরা; শরীফ আতিক উজ জামান।
Masud Parvaj

মাসুদ পারভেজ

জন্ম ২১ জানুয়ারি, ১৯৮৫; দিনাজপুর।

শিক্ষা : স্নাতক ও স্নাতকোত্তর, বাংলা, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

পেশা : শিক্ষক, বাংলা বিভাগ, শাবিপ্রবি, সিলেট।

প্রকাশিত বই—

জীবনানন্দের ট্রাঙ্ক [কবিতা, চৈতন্য, ২০১৬]
বিচ্ছেদের মৌসুম [গল্প, দেশ পাবলিকেশন্স, ২০১৫]
ঘটন অঘটনের গল্প [গল্প, বটতলা, ২০১১]

ই-মেইল : parvajm@gmail.com
Masud Parvaj