হোম গদ্য বাবার হাত

বাবার হাত

বাবার হাত
1.01K
0

সন্ধ্যা থেকেই ঘরের দরজা বন্ধ করে বালিশে মুখ গুজে শুয়ে আছে চামেলী। এই দরজা খোলা জীবনে এমন করে তার মন খারাপ হয় নি কোনোদিন। জ্যোৎস্না মাসির হাত ধরে  সে অনেকগুলো গলিঘুপচি পেরিয়ে এই ঘরে প্রবেশ করেছিল। তারপর থেকে তার ঘরের দরজা খোলা, যে আসে তাকেই সে সাদরে বরণ করে নেয়। কারও জন্যই  নিষিদ্ধ নয় চামেলীর সুবাস-রঙ-রস। উজ্জ্বল বরন, গড়ন আর বয়স কম বলে তার ঘরের দিকেই সবার নজর। চব্বিশ ঘণ্টায় কতজনকে যে তার ঘরে নিতে হয় সেই হিশেব সে করে নি কোনোদিন। মন খারাপ করার এক-টুকরো অবসরও তার ছিল না। আজকের অসহায় সন্ধ্যা তাকে ঠেলে দিয়েছে একাকিত্বের শামুক-খোলসে। চোখ জুড়ে চাপ-চাপ অন্ধকার আর বুকের ভেতর ভারী নিশ্বাস জমেছিল—তাকে ফাঁকি দিতে—এই আঁধার সন্ধ্যার আগে কখনই বুঝতে পারে নি চামেলী। বালিশে মুখ গুজে চামেলী ফুপিয়ে কাঁদতে শুরু করে। কান্না ও সন্ধ্যা একাকার।

চামেলীর ঘর ছেড়ে যাবার আগে মাতাল লোকটা পকেট হাতড়ে একশ টাকার দুটি নোট চামেলীর ব্লাউজে গুজে দিতে দিতে বলেছিল, ‘তুই হিন্দু না মুসলমান এইটাই কইতে পারলি না, বাপের নাম-ঠিকানা কইবি কেমনে?’ মাতালটাকে চামেলী খুব ভালোভাবে চেনে। এমভি দিলবরশাহ লঞ্চের সারেং খয়বর আলী। ঘরে স্ত্রী, চার-পাঁচটা ছেলে-মেয়ে রেখে খয়বর আসে চামেলীর কাছে। দেশি মদের নেশায় চুর খয়বর আলী লঞ্চ চালানোর ভঙ্গি করে হাঁটলেও ঠিক ঠিক নানা বাঁক ঘুরে চামেলীর খুপরিতে এসে হাজির হয়। কোনো ঝামেলা না করে খাণিকক্ষণ চামেলীকে ওলটপালট করে মুখ বুজে চলে যায়। আজ সন্ধ্যায় খয়বরের মুখে বাবার কথা শুনে চামেলী আর বের হয় নি। অন্য যারা এখনও দরজা বন্ধ করার লোক পায় নি তারা মুখে কমদামি স্নো-পাউডার মেখে ব্লাউজের একপাশ তুলে দিয়ে অনুজ্জ্বল আলোয় ঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে আছে। এই সময় তাদের দলে নাম লেখানোর কথা চামেলীরও। খয়বর আলী চলে যাবার পর চামেলীর দরজা বন্ধ হয়ে যায়।


সে চায় একবার হলেও বাবার মুখোমুখি দাঁড়াতে। শুধু একবার দুই হাত দিয়ে বাবাকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরতে। কেন? বাবার কাছ থেকে সে কি সামান্য কিছুও পেয়েছে? জন্মপ্রক্রিয়ার শেষ আনন্দ নিয়েই বোধহয় বাবা ভুলে গেছে সব।


শূন্য ঘর। ঘরবদ্ধ হাওয়ার ভেতর কেমন যেন হাহাকার ভর করে আছে—হাহাকার না গোঙানি? পরিচ্ছন্ন ফুল বিছানায়, অগোছালো চামেলী, একা। মরিচা পড়া টিনের বেড়ার কোণে অলস টিকটিকি, কেন যে তার লেজ নড়ছে! আর ঘরের ভেতর কাকে যেন, কী যেন খুঁজছে মেয়েটি—চামেলী। হঠাৎ তার চোখ আটকে যায় জানালার মাথায় কমদামি আঠায় সেঁটে থাকা ফটোগ্রাফে—ফটোগ্রাফটি রবীন্দ্রনাথের। ভেতরে হিন্দি-বাংলা সিনেমার নায়ক-নায়িকার ছবির নর্দন-কুর্দন ভঙ্গিমার মাঝে শ্বেতশুভ্র রবীন্দ্রনাথের এই ছবি কি একটু বেমানান ঠেকছে? আচ্ছা, এখানে রবীন্দ্রনাথকে কে টেনে এনেছে? চামেলী হয়তো রবীন্দ্রনাথকে চেনে না। দরকারও নেই। তার বোধের পাটাতনে এখন কেবল খেলা করছে একটি শব্দ—বা…বা…বাবা।

বাবা দেখতে কেমন। তার কি মুখভর্তি দাড়ি? পান খেয়ে খলখল করে হাসতে গেলে দাঁতগুলো তরমুজের বিচির মতো দেখায়? ভাবনাগুলো মনের মধ্যে নর্দমার কীট হয়ে মাথাচাড়া দিতেই খটকা লাগে। চামেলী আর এসব ভাবতে চায় না। সে চায় একবার হলেও বাবার মুখোমুখি দাঁড়াতে। শুধু একবার দুই হাত দিয়ে বাবাকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরতে। কেন? বাবার কাছ থেকে সে কি সামান্য কিছুও পেয়েছে? জন্মপ্রক্রিয়ার শেষ আনন্দ নিয়েই বোধহয় বাবা ভুলে গেছে সব। চামেলীর ভাবনা বিকেলের সোনারোদ, মিলিয়ে যায় অন্ধকারে। গাঢ় অন্ধকার থেকে কারও অচিন কণ্ঠস্বর শোনে চামেলী—‘তোর জন্ম আমাদের সকলের পাপে। আমরা তোর বাবা।’ ভাবনায় খেই হারায় আঁধার পাড়ার এই মেয়েটি। একজনের এত বাবা কিভাবে হয় তা জানে চামেলী। তার কান্না পরিচয়ের সুতো ছেঁড়া লাটাইহীন ঘুড়ি—মেঘের সাথে খেলা করতে পাড়ি দেয় যোজন যোজন পথ।

চামেলীর ঘরের দরজা বন্ধ দেখে জ্যোৎস্না মাসি হাসতে হাসতে বলে—‘কী রে, একটারে কি পাশে শুয়াইয়া রাইখা আরেকটারে হান্দাইছস?’ মাসির কথা চামেলীর কানে পৌঁছায় না আজ। অন্যদিন হলে চামেলীর চটপটে জবাব হয়তো এমন হতে পারতো—‘যা করার চামড়া ঝুইলা পড়ার আগেই করতে হইব মাসি, তাই আর কী করা—দুই একটারে খাটের নিচে রাইখা দেই যাতে অবসর না থাহে।’ আজ চামেলীর মুখে কোনো কথা নেই। কেবল চোখের পাতা ভেজা।  চোখের জল-রঙ চুইয়ে ছবি হয়—হাজার ছবি আকৃতি ভেঙে বিকৃতির সীমানায় মিলিয়ে যায়। বাবা থাকে না তাতে।

এই পল্লীর নিস্তারী বেগমকেই মা বলে জানে চামেলী। নিস্তারী বেগমের সাথে চামেলীর সম্পর্ক খুব ভালো নয়। এই ঘরে আসার পর খুব একটা যাতায়াতও নেই নিস্তারী বেগমের ঘরে। জ্যোৎস্না মাসি বলেছে—চামেলীর জন্মের আগে তার মা-ও এই পল্লীতে ছিল না। মা ঢাকা শহরে এক বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করত। বয়স আর শরীর সমানতালে বেড়ে ওঠায় সেখানে নিস্তারী বেগমের নিস্তার মেলে নি। এককণা পুরুষানন্দ দেহে ধারণ করে নিস্তারী ফিরে আসে বাবার বাড়ি। দরিদ্র বাবা নিস্তারী বেগমকে ফিরে পেয়ে আহলাদে আটখানা না হয়ে বিচলিত হয়। সময়ের হাত ধরে বেড়ে উঠে ক্ষুদ্র ভ্রূণকণা… কানে কানে ছড়িয়ে পড়ে নিস্তারীর মাতৃবার্তা। ‘মাইয়ার জামাই তো দেখাইলা না কছর মুন্সি,  নাতি হইচ্ছে শুনলাম!’ কছর মুন্সি বানিয়ে বানিয়ে জামাইয়ের গল্প বলে। তবে অলীক জামাইয়ের গল্প বললেও কছরের বুক থেকে বেরিয়ে আসে দীর্ঘশ্বাস। কেননা সে  জানে নিস্তারীর বুকে পাপের সাগরের ঢেউ। সেবার যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে নিস্তারী বেগম মহাপাপী হয়ে হত্যা করে ভ্রূণ। এরপর  ক্ষোভে রাগে সে চলে আসে গোয়ালন্দ ঘাটে। ঘাটের হোটেলে রান্নার কাজ নিয়ে ভালোই ছিল দিন-কয়েক। কিন্তু ভরা যৌবন আর পদ্মা নদীতে জাল ফেলবার মানুষের অভাব হয় না। হাত বদল হতে হতে তার ঠাঁই মেলে জ্যোৎস্না মাসির ঘরে।


প্রসাধনের নামে যে রঙ মুখে মেখে ওরা দরজার সামনে দাঁড়ায়, সেই রঙ চেটে খাওয়া মানুষগুলোর হল্লা শোনা যায় মাঝে মাঝে।


চামেলীর আয় রোজগার ভালো বলে অন্যদের মতো নিস্তারী বেগমও তাকে হিংসা করে। নিস্তারী চামেলীকে মেয়ে বলেও মাঝে মাঝে স্বীকার করে না। এখানে অন্য যাদের জন্ম—যারা খোলা দরজা সমিতির সদস্য, তাদের মা-ও একইভাবে অস্বীকার করে সম্পর্ক। সন্ধ্যার পর কেউ কারও খোঁজ নেয় না এখানে। ঘরগুলো থেকে ভেসে আসা হিন্দিগানের সুর এবং দেশি মদের উৎকট ঘ্রাণ একাকার হয়ে গন্তব্য হারায়। প্রসাধনের নামে যে রঙ মুখে মেখে ওরা দরজার সামনে দাঁড়ায়, সেই রঙ চেটে খাওয়া মানুষগুলোর হল্লা শোনা যায় মাঝে মাঝে। মাতালগুলোই বেশি ঝামেলা করে। একজনের ঘরে যেতে যেতে আরেকজনের হাত ধরে টান দিলে ঝগড়া বাধে প্রতিরাতেই। আজ রাতেও তার ব্যতিক্রম হচ্ছে না। শুধু একটি ঘরে আলো নেই, আলো আঁধারের খেলা নেই। চামেলী অন্ধকার রাজ্যে রানি-মহারানি হতে হতে ভিখারি হয়ে যাচ্ছে ক্ষণে ক্ষণে।

বালিশের কোণ চুইয়ে চোখের জল বিছানার চাদরে গিয়ে মিশছে। শুষে নিচ্ছে কার্পাস তুলো কিংবা ফ্যালনা গার্মেন্টস সুতো। শোয়া থেকে উঠে বসে সে। অন্ধকার হাতড়ে খুঁজে পায় মদের বোতল। খাণিকটা এখনও বাকি। খাটের মাথার দিকে একটা ছোট্ট চারকোনা প্যাকেট। তাতে নারী ও পুরুষের গভীর আলিঙ্গন কিংবা চিতা বাঘের ছবি। আলোহীনতার মাঝেও চামেলীর বুঝতে অসুবিধে হয় না কিছুই। এই ঘরেই তার কেটেছে নয় বছর, হয়তো আরও বেশি হতে পারে। এই আয়োজন উপকরণ সব বিনোদন-সামগ্রী। বন্ধ দরজায় এবার কড়া নাড়ার শব্দ শোনা যায় । সে ভীত পায়ে এগিয়ে যায় দরজার দিকে। আবার ফিরে আসে—‘কিডা আইছেন ফির‌্যা যান আইজ।’ আবারও কড়া নাড়তে শুনে ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে চামেলী—‘আমার কথা কি কানে যায় না, যদি আমার বাজান হয়া থাকেন তাইলে আসেন।’ দরজা খুলে দেয় চামেলী। সাদা-কালো গোঁফ বাগিয়ে কুৎসিত হাসি দিয়ে ঘরে প্রবেশ করে একজন—‘এত দেমাগ ক্যান রে চামেলী? না-হয় দুইদিন পরে আইলাম, তাই বইলা ফিরায়া দিবি।’ বলেই লোকটা বিছানায় লাফিয়ে ওঠে।

চামেলী সুইচ টিপে আলো জ্বেলে দেয় ঘরে। বিদ্যুৎ ঝিলিকে লোকটার চোখে ধাঁধা লাগে। চামেলী সোজা লোকটার চোখে চোখ রাখে। কাঁপা কণ্ঠে বলে, ‘যদি আমার লগে শুইবার চান তাইলে স্বীকার করতে হইব আপনে আমার বাপ। আইজ ট্যাহা নিয়া কাম করুম-না বাপ বইলা স্বীকার করলেই….।’ চামেলীর কথা শেষ হওয়ার আগেই লোকটা তড়াক করে বিছানা থেকে নেমে দৌড়ে ঘর থেকে বেরুতে গিয়ে হোঁচট খায়। চামেলী তাকে জাপটে ধরে, ‘বাজান, কই যাইতাছেন?’ হতবিহ্বল লোকটা চামেলীর বুকের মধ্যে হাঁসফাঁস করে ওঠে। ‘কি কইতাছত, কেডা তোর বাজান, বাজান হইলে কি তোর কাছে আসি?’ চামেলী তাকে বিছানায় ফেলে আবারও জাপটে ধরে। ‘কাম শেষ কইরা কইরা কইবেন তোর বাপের ঠিক নাই, তা হইব না—আইজ কেডা আমার বাপ তার পরিচয় জানবার চাই।’ চামেলীর কথার উন্মত্ততায় সুযোগ পেয়ে লোকটা বলে, ‘হেইডা আমারে ক্যান, তোর মায়েরে জিগা।’

ফেরি ঘাটের কুলি সর্দার কুন্টু মিয়া চামেলীকে কথাটি বলে মনে মনে ঘর থেকে বের হবার পথ খুঁজতে থাকে। চামেলী কুন্টু মিয়ার মুখ দুই হাতে আগলে ধরে জানতে চায়—‘বাজান তোমার কি একটুও মায়া হয় না, আমার কাছেই আসো রাতের রাখাল হতে। তুমি এত পাষাণ ক্যান বাজান? একবার দেখো—এই চামেলী তোমার মেয়ে, তোমারই তো মেয়ে।’ কুন্টু মিয়া এর কোনো জবাব না পেয়ে অনেকটা হতাশ কণ্ঠেই বলে, ‘রোজ রাইতে আমিই আসি মাতাল হইয়া, তয় আইজ দেহি তুই নিজেই মাতাল—দুই মাতালে মিলতে গেলে গোল বাঁধবরে—আমি যাই।’ এরপর কুন্টু মিয়া তাড়া খাওয়া কুকুর হয়েই দৌড়ে পালায়।

মাঝরাত। চামেলী নিস্তারী বেগমের দরজায় কড়া নাড়ে। ভেতরে এক সদ্য যৌবনাগতের কণ্ঠ। স্পষ্ট শুনেও চামেলী দ্বিতীয়বার কড়া নাড়ে। নিস্তারী বেগম খাকারি দিয়ে বলে ওঠে ‘দরজা বন্ধ দেইখাও বুঝেন না কিছু, নয়া আইছেন নাকি।’ চামেলী এখন খুব শান্ত অথচ তীব্র কণ্ঠ—‘আমি চামেলী, বাপের পরিচয় জানবার চাই।’ ‘কী যে ঝামেলা কর না নিস্তারী, কার বাপ কে দিবে পরিচয়—যত্তসব খানকির কারবার।’ ভেতরে থাকা যুবকের ক্ষুব্ধ কণ্ঠ শোনা যায়। নিস্তারী দরজা খুলে দিলে এক খণ্ড ঝড় হয়ে ঘরে ঢুকে চামেলী। সোজা তার মা—মানে নিস্তারী বেগমের মুখোমুখি দাঁড়ায়। ক্রুদ্ধ চোখ দুটি এক লহমায় গিলে খাবে সব—‘সবাই বলে আমার বাপের হদিশ তুমিই জানো। যদি জানো তো আমারেও জানাও।’ ‘তোর বাপ কি গুপ্তধন, তারে লুকাইয়া রাহা যায়?’ এই কথায় আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠে চামেলী। ‘তাইলে কও কে আমার বাপ, কী নাম, কোনহানে নিবাস?’ নিস্তারী চুপ করে থাকে।


বাপ ছাড়া মানুষ আর জন্তু জানোয়ারের ফারাক নাই মাসি। মানুষের সমাজ থেইকা তোমরা আমারে জন্তুর সমাজে আইনা ফালাইছ। আমি আর মানুষ নাই মাসি। তোমরাও মানুষ না…


মাঝরাতে মা-মেয়ের ঝগড়ায় এগিয়ে আসে জ্যোৎস্না মাসি। ‘কী রে চামেলী, হঠাৎ বাপের কী ঠ্যাকা পড়ল। তোর বাপ কি তোরে বুকে আগলাইয়া নিব? এই জনমে আর বাপের হদিশ কইরা লাভ নাই রে বেটি।’ চামেলীর ক্ষোভ এবার জ্যোৎস্নার ওপর—‘বাপ ছাড়া মানুষ আর জন্তু জানোয়ারের ফারাক নাই মাসি। মানুষের সমাজ থেইকা তোমরা আমারে জন্তুর সমাজে আইনা ফালাইছ। আমি আর মানুষ নাই মাসি। তোমরাও মানুষ না…’ বলতে বলতে নিস্তারী বেগমের ঘর থেকে সে একছুটে বেড়িয়ে আসে। তাকে অনুসরণ করে জ্যোৎস্না মাসি। ‘বাজান তোমার দেহা চাই, জানতে চাই তোমারে—বাজান তোমার দেহা চাই, জানতে চাই তোমারে…’ চামেলী গন্তব্যহীন দৌড়াতে থাকে। জ্যোৎস্না মাসি ছোটে পেছনে পেছনে। চামেলী একটি ঘূর্ণি হাওয়া, হতে পারে ঝড়ই তার পরিণতি।

উচ্চকণ্ঠ চিৎকারে নিশীথ রাতের নীরব পতিতা-পল্লি মগ্নতা ভেঙে জেগে ওঠে। ‘কী হলো, কী হয়েছে?’ অনেকগুলো বন্ধ দরজা খুলে যায়। কারও কারও প্রশ্নের জবাব দেয় জ্যোৎস্না মাসি। মধ্যরাতে সুনসান মাতাল পল্লিতে নেমে আসে মৃত্যুশোক। একে একে অনেকেই জড়ো হয় চামেলীর ঘরের সামনের সরু পথে। সবাই নিশ্চুপ। শুধু একা থেমে থেমে চিৎকার করছে চামেলী। ‘যারা জানতে চায় আমার বাপের হদিশ, আমারে বলে খানকির ঝি, তারাই আমার বাপ। দুনিয়ায় সবার বাপ থাকলে আমারও আছে, আমার বাপ সভ্য সমাজেই আছে। ঘাটের কুলি কুন্টু মিয়া, সারেং খয়বর শাহ, দোকানদার হরিপদ দাশ, মন্টু মহাজন কেউই বাদ নাই—সবাই আমার বাপ…আমারে বলে খানকির ঝি…দুনিয়ায় সবার বাপ থাকলে আমারও আছে…।’

এসময় জ্যোৎস্না মাসি ধমকের সুরে জড়ো হওয়া সকলকে তাড়িয়ে দিতে দিতে বলে—‘মাগিরা তামশা দেখতে আইছো, তোমাগো মনে লয় বাপের ঠিক আছে—এইহানকার কারও বাপের ঠিক নাই—চল চামেলী, মা, ঘরে চল।’ পাগলপ্রায় মেয়েটিকে কোনোভাবে টেনে হেঁচড়ে ঘরে নিয়ে আসে জ্যোৎস্না মাসি। চামেলীর কণ্ঠ থেকে তখন আর আওয়াজ বেরুচ্ছে না। বুকের চাপা কান্না গলা দিয়ে নিঃশব্দে বেরুতে গিয়ে হাঁস-ফাঁস করছে মাত্র। জ্যোৎস্না মাসি তাকে আদর করতে করতে বলে—‘এই পল্লিতেই তোর জন্ম, তোর-মা চার বছর বয়সে তোরে পাটুরিয়া ঘাটে ফালাইয়া আইছিল—যদি কেউ তোরে মানুষ করে নিজের সন্তান মনে করে; তা হয় নাই রে চামেলী। ঘাটের নজু মুন্সি তোরে দিয়া কাম করাইছে বছর কয়েক। পরে শরীল বাড়লে মুন্সি হাত দিছে, দিছে আরও অনেকেই। মাগনা মাগনা শরীলডারে শেষ করতেছিলি বইলা আমিই তোরে এইহানে আনি। আমারই দোষ… পদ্মা নদীর পাড়ে বড় হইছস। এহন তুই নিজেই পদ্মা—পদ্মার ঘাট। সক্কলেই খালি পারাপার হইতে আসে… জাইলা নাও আর ফেরি সবই তুই ভাসায়া নিবি, পদ্মার কি আর বাপ থাহে?’

সন্ধ্যায় এখনও চামেলীর (কার্ড নং ০৯৫৪) ঘরে আলো জ্বলে। একই রকম ফুল-বিছানা। দেশি মদের গন্ধে হিন্দিগানের চটুল সুর ভাসে। তবে ঘরের সেই রবীন্দ্রনাথের ছবিটি ঢেকে গেছে কোনো হিন্দি ছবির নায়িকার বক্ষপিঞ্জরে। এখন যারা যারা ওর ঘরে সওয়ার হয়, প্রত্যেককেই চামেলী বাবা বলতে চায়, বাবা বলে ভুল করে। কিন্তু বাবার হাতটি যে তার দিকেই এগিয়ে আসছে…।

নূর সিদ্দিকী

নূর সিদ্দিকী

জন্ম ৩১ ডিসেম্বর ১৯৮১, মানিকগঞ্জ। নাটক ও নাট্যতত্ত্বে স্নাতকোত্তর, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়। পেশা : সাংবাদিকতা (সিনিয়র রিপোর্টার, মাছরাঙা টেলিভিশন)।

প্রকাশিত বই :
শিশুতোষ গল্প—
ইশকুল দুশকুল [রুম টু রিড, ২০১৩]

ছড়া—
আমি একটি ছড়া বলবো [দীপালোক, ২০০৮]

ই-মেইল : nursi31@gmail.com
নূর সিদ্দিকী