হোম গদ্য বাংলাদেশের কবিদের চোখে উৎপল

বাংলাদেশের কবিদের চোখে উৎপল

বাংলাদেশের কবিদের চোখে উৎপল
845
0
এ বছর ৩ অক্টোবর ৭৮ বছর বয়সে মারা গেলেন কবি উৎপলকুমার বসু। বিগত দুই দশকের বাংলা কবিতায়, বিশেষত তরুণ কবিদের কাছে বেশ প্রণম্য হয়ে উঠেছিলেন তিনি। যেন হঠাৎ করেই তাঁর পুনর্জন্ম ঘটে। এক বিনয় মজুমদার ছাড়া তাঁর সময়ের আর কোনো কবিকেই এত প্রভাবসঞ্চারী ভূমিকায় দেখা যায় নি।

 

উৎপলের কবিতার অভিঘাত পাঠকের কাছে অভিনব ছিল বলেই তিনি তর্কাতীত ছিলেন না। এমনকি একটা বিরুদ্ধপক্ষ সক্রিয় ছিল তাঁর জীবৎকালে। হুমায়ুন আজাদ সম্পাদিত ‘আধুনিক বাঙলা কবিতা’ বইতেও খুঁজে পাওয়া যায় না তাঁকে।

 

তবু, একটা সময় এই বাংলাদেশে উৎপল খানিকটা ফেনোমেনা আকারেই হাজির হয়েছিলেন। পরবর্তীকালে তাঁর প্রভাব প্রশমিতও হয়ে এসেছে। সেই সব স্মৃতি-বিস্মৃতির কিছু মুহূর্ত তুলে এনেছেন বাংলাদেশের কবিরা। তাঁদের বয়ানেই কবির প্রতি ‘পরস্পর’-এর শ্রদ্ধাঞ্জলি।

 


ফরিদ কবির

উৎপলের প্রভাব


উৎপলকুমার বসু পঞ্চাশের দশক থেকে লেখালেখি করলেও এদেশে আশির দশকের মাঝামাঝি পর্যন্ত তার নাম আমরা শুনি নি। ৮৪ সালে তার ‘আবার পুরী সিরিজ’ বইটা আমার জন্মদিনে উপহার দিয়েছিলেন কবি কবিতা সিংহ! সে বই পড়ে আমার মনে হলো, এ কবিতাগুলো শক্তি-সুনীল বা ৫০-এর দশকের অন্য কবিদের থেকে আলাদা। তাঁর কবিতা ফটোকপি করে আমি তখন অনেককেই পড়তে দেই। ভাস্কর, জয়, মৃদুল ও রণজিৎ দাশের বইও আমি ফটোকপি করে অনেককে দিয়েছি! এর আগে এই কবিদের নামই কেউ জানত কিনা সন্দেহ! আমি তাদের কবিতা অনেককে পড়িয়েছি এটাই বোঝাতে যে, কবিতা নানাভাবে লেখা যেতে পারে! একইভাবে শহীদুল জহিরের প্রথম বইটির কথাও আমি বলেছি অনেককে। আমার মনে হয়, মোহাম্মদ সাদিক ছাড়া তার বইটি আর কারোর কাছেই ছিল না! আমার কাছ থেকে নিয়ে সাজ্জাদ শরিফ আর সেলিম মোরশেদ বইটি পড়ে। পরে, আরো অনেকে। এর আগে ভিন্ন ধারার কবি বা লেখক হিসেবে আমরা সবাই মলয় রায় চৌধুরী ও সুবিমল মিশ্র’র কথাই জানতাম। সত্তুর ও আশির দশকের শুরুতে যারা কবিতা লিখছিলেন তাদের সবার কবিতাই তখন ছিল একই রকমের, তারা অনুসরণ করছিলেন শামসুর রাহমান ও আল মাহমুদকে, নইলে শক্তি বা সুনীলকেই। মধ্য আশি থেকে উৎপল ও জয়সহ অনেকেরই প্রভাব আমাদের কবিতায় দেখা যায়। এর মূলে আমার কিছুটা ভূমিকা হয়তো ছিল! ৮৮ সালে আমার উদ্যোগে ‘এইসব স্রোতের বিরুদ্ধে’ নামে দুদিনের একটা কবিতা সম্মেলন হয়! যেখানে মৃদুল, রণজিৎ, প্রসূনসহ অনেকেই যোগ দেন। আমাদের সেই উদ্যোগটাও ছিল কবিতায় একটা নতুন ধারা, নতুন স্রোত সৃষ্টি করা। সে সময় তাই তাদের কবিতার প্রভাব আমাদের অনেকের কবিতায় থাকাটা বিচিত্র নয়। কারণ, নানাভাবে কবিতা লেখার তেমন উদাহরণ তো ছিল না আমাদের সামনে! পরে, সেই প্রভাব হয়তো আমরা অনেকে কাটিয়েও উঠেছি। অন্তত, আমার কবিতায় এখন উৎপল বা জয়ের কোনো প্রভাব নেই বলেই মনে করি। কিন্তু, এখনকার কবিদের অনেককে যখন উৎপল কুমার বসুর ভাষায় লিখতে দেখি তখন বেশ বিস্ময় বোধ করি।


মাসুদ খান

ব্যতিক্রমী অশ্বারোহী


বাংলা ভাষায় উৎপলকুমার বসুর হাতে সূচিত হয়েছে এক গূঢ়লেখ কবিতাধারা। শৃঙ্খলা ভেঙেচুরে অন্য এক অভিনব শৃঙ্খলাসৃজনের কালাকার তিনি। কবির টেক্সট এমনই যে তা পাঠককে বাধ্য করে সক্রিয় অংশগ্রহণে, নিহিত সংকেতরাজির মর্মোদ্ধারে। তাঁর কবিতার বড় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে বিষয়বস্তুহীনতা। তাঁর কবিতায় থাকে না সুনির্দিষ্ট কোনো বিষয়। কোনো একটি থিমকে ঘিরে আবর্তিত হয় না তাঁর কবিতা। অসংখ্য ছোট-ছোট বিষয়, টুকরো ঘটনা, বাগধারা, সংলাপচূর্ণ, দৃশ্যকণা, আচমকা সংবাদ, দমকা প্রবাদ, অনুভবের ক্ষণিক উদ্ভাস… এসবের বর্ণাঢ্য সংশ্লেষ ঘটে তাঁর লেখায়। উৎপলের কবিতার আরো একটি বড় বিশেষত্ব হলো ‘অনুষঙ্গ’-এর অবাধ লীলাবৈচিত্র্য। কবিতার স্তরে স্তরে আমরা ঝলকে উঠতে দেখি বিচিত্র সব উৎস থেকে আহৃত রকমারি প্রসঙ্গ, অনুষঙ্গ, খণ্ডচিত্র, খণ্ডভাষ্য…। অবাধে, অবলীলায়, অতর্কিতে, এবং উপর্যুপরি। বাংলাকবিতায় এ এক অন্যরকম ধারা—‘ফ্রি অ্যাসোসিয়েশন’ বা ‘অবাধ অনুষঙ্গ’-প্রবাহের পরাকাষ্ঠা। চেতন ও অবচেতনের এক গোধূলি-অঞ্চল থেকে উৎসারিত অনর্গল রাশপ্রিন্ট। যেন এক স্বয়ংক্রিয়, স্বতোৎসার-লিখনের ক্ষুরধার স্রোত। দৃষ্টান্ত হিসাবে প্রথমেই মনে পড়বে ‘পুরী সিরিজ’ ও ‘আবার পুরী সিরিজ’-এর অতিব্যতিক্রমী কবিতারাশি। তবে কবি যে কেবল সৃষ্টিসুখের উল্লাসে সৃষ্টি করেই চলেন একের পর এক নান্দনিক নৈরাজ্য, তা নয়। তাঁর কবিতায় মাঝে মাঝেই ঝিকিয়ে ওঠে এমনসব সারল্যমাখা ভাবুকবচন, যে-সারল্য অর্জন করতে হয় দীর্ঘ সাধনার মধ্য দিয়ে, যে সারল্য প্রাজ্ঞের সারল্য, যে সহজতা বহুবিচিত্র জটিলতার সারাৎসার। পরিশ্রুত রোদের মতো উজ্জ্বল সেইসব সহজ ভাবসমৃদ্ধ, রূপঋদ্ধ পঙ্‌ক্তিনিচয়।

প্রকৃতি থেকে উঠে আসা এই জন্মভ্রামণিক কবি, এই ব্যতিক্রমী অশ্বারোহী, জীবন ও জগতের বিচিত্র ভ্রমণশেষে ফিরে গেলেন প্রকৃতিতেই। আমাদের জন্য রেখে গেলেন তাঁর অনবদ্য সৃজনসম্ভার । কবিকে অন্তিম প্রণাম।


সৈয়দ তারিক

স্বস্তিদায়ক নয়


উৎপলকুমার বসুর কবিতা সেই অর্থে আমার কাছে স্বস্তিদায়ক নয়, যে অর্থে—ধরা যাক—তারই সমকালীন শঙ্খ ঘোষ বা অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তর কবিতা চিত্তগ্রাহী। কারণ, যেখানে অন্যদের কবিতা মননকে উদ্দীপিত করে, উৎপলের কবিতা সেখানে হতবুদ্ধি করে দেয় নিরন্তর। দূরান্বয়ী চিত্রকল্পাবলি ও বিচ্ছিন্ন ভাবনারাজি রহস্যময় এক ভাবারণ্য গড়ে তোলে, যেখানে জ্যোৎস্না ও অমাবস্যা অবিরত লুকাচুরি খেলে যায়, অথচ তার পিছনে বুদ্ধিমান এক সত্তার  উপস্থিতি অবিরল অনুভূত হয়। মনন সেই আবহে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে না। তবু বারবার ফিরে ফিরে সেই দুর্জ্ঞেয় কবিতার আবছায়াময় অঞ্চলে যেতে চায় মন কী এক রহস্যের আকর্ষণে। কবিতা—নিশ্চয়ই—অনেক রকম।


মজিদ মাহমুদ

আমার বিপন্ন বোধে উত্পল


আমার কবি-রুচি গড়ে ওঠার অনেক পরে, আশির দশকের শেষে কিংবা নব্বইয়ের শুরুর দিকে আমি প্রথম উত্পলের কবিতা পড়েছিলাম। উত্পল বিলম্বিত পঞ্চাশের কবি হলেও ঢাকার কবিরা তাকে খুব কম জানতেন; কারণ সাতচল্লিশের দেশ বিভাগের পর কোলকাতা কেন্দ্রিক বাংলাভাষার কবিদের জানার সুযোগ তেমন ছিল না; অবশ্য আজকাল সে প্রতিবদ্ধকতা কিছুটা অহেতুক কমে গেছে। তাকে কম জানার আরেকটি কারণ, তার বই সহজলভ্য ছিল না; তাছাড়া বহুদিন তিনি বিদেশ ছিলেন; ১৯৯১ সালে তার ‘শ্রেষ্ঠ কবিতা’ প্রকাশের পর সেই সংকট কেটে যায়। ঠিক এ সময়ে দুজন কবি অন্তর্ধান থেকে যবনিকায় চলে আসেন, তার আরেকজন হলেন বিনয় মজুমদার; দুজনই একই সময়ের কবি, দুজনই হাংরি জেনারেশন; দুজনার কবিতাতেই অশ্লীলতার অভিযোগ রয়েছে। কবিতার মরণোত্তর জেগে ওঠার যে মিথ চালু আছে, আমার মনে হয়, এই দুজনা সে-ক্ষেত্রে ক্রাইস্টের মর্যাদা পেতে পারেন। কারণ, দ্বিতীয় পর্যায়ে বিনয় পুনরুত্থানের পর, তার বোধশক্তি কবিতার পক্ষে ছিল না; আর উত্পল নতুন করে শুরু করলেও পূর্ব-চেতনার ইতর বিশেষ হয় নি। আগেই বলেছি, আমার কাব্যরুচি গঠনপর্বে উত্পল অনুপস্থিত থাকলেও তার কবিতা পাঠকালে চমকিত না হয়ে পারি নি; একবাক্যে নিজের মধ্যে স্বীকার করতে হয়েছে, এই যা পড়লাম, তা আগে পড়ি নি। অর্থাৎ বাংলা কবিতার কয়েকটি ধরনের সঙ্গে এর আগে আমরা পরিচিত ছিলাম, তার একটি মাইকেল, অন্য ধরনগুলো পর্যায়ক্রমে রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, জীবনানন্দ ও তিরিশের কবিতা; এছাড়া যে সব ধরন ছিল সেগুলো হয় এসবের মধ্যে আত্মীকৃত হয়েছিল, কিংবা আমাদের সময়ে কবিতার পথে হাঁটার ক্ষেত্রে খুব একটা ভূমিকা ছিল না, যেমন জসীমউদ্‌দীন-বন্দে আলী কিংবা ফররুখীয় চেতনা। তবে উত্পলের সমকালে কিংবা অব্যবহতি আগে ঢাকায় কিংবা কোলকাতায় যে-সব কবিরা লব্ধ প্রতিষ্ঠিত তারা একটি অবদান রাখতে শুরু করেছেন। সে যাই হোক, উত্পলের কবিতা পাঠ করতে আমি বেশ বিপন্ন হয়ে পড়েছিলাম। কারণ সেগুলো যেমন কবিতার অর্থ জানার দায় থেকে মুক্তি দিচ্ছিল, তেমন জলের মতো ঘুরে ঘুরে কানের কাছে অহেতুক গুঞ্জরনমালা সৃষ্টি করছিল; ভাষার সহজতাও যে অর্থকে এমন বিপন্ন করে তুলতে পারে; একই সঙ্গে গদ্যে লিখিত রবীন্দ্র-উত্তর কবিতা যে লিরিক হতে পারে, তা তার আগে, তার মতো করে কেউ দেখাতে পারেন নি। আমি অনেকদিন ধরে ভেবেছিলাম, উত্পল অননুকরণীয়; যদিও সাম্প্রতিক তরুণ কবিদের অনেকের মধ্যে উত্পলীয় প্যারাডক্স সৃষ্টির প্রবণতা দেখা যায়, তবু আমার কেন যেন মনে হয় উত্পলীয় আধ্যাত্মিকতা না থাকলে তা বমনক্রিয়ায় পর্যবসিত হতে পারে। অবশ্য উত্পলকেও আমি জীবনানন্দ ঘরানার কবি হিসাবেই মনে করি; কিন্তু জীবনানন্দ দাশের অন্য ডিসাইপলদের যে নাকাল অবস্থা হয়েছে, সে বিনয়-জয় কিংবা শক্তি যেই হোক না কেন, উত্পলের জন্য সে দুর্দশা হয় নি। উত্পলের কবিতার মর্মমূলে যা-ই থাক না কেন, বাংলা ভাষা-সাহিত্যের অন্য মহীরুহদের মতো দৃশ্যযোগ্য হওয়ার মতো তার ব্যাপক সম্ভার রয়েছে বলে আমার মনে হয় না; তবে বিশাল বাংলা কবিতার ভালে তিনি একটি কালো তিল হয়ে থাকবেন সে সম্ভাবনাও কবিজীবনে বিরল অর্জন। এই কবির সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত পরিচয়ের সুযোগ ঘটেছিল; ২০১১ সালে একটি সম্মাননা অনুষ্ঠানে কোলকাতা গিয়ে কফি হাউসে বেশ দীর্ঘ সময় তার সঙ্গে কাটানোর দুর্লভ মুহূর্ত আমার স্মৃতিতে আছে; এই আড্ডা আমার জন্য একটি দাবি বয়ে এনেছিল, কারণ এর বেশ কয়েক বছর আগে তার কবিতা নিয়ে একটি প্রবন্ধ লেখার সুযোগ হয়েছিল। তার কবিতা ছাড়াও চেহার সৌন্দর্য, ব্যক্তিত্ব ও পাণ্ডিত্য আমাকে মুগ্ধ করেছিল।


সরকার আমিন

উৎপলকুমার বসু


তাঁর কবিতায় চমকপ্রদ একটা মনন আছে। লুকিয়ে থাকে কৌতুকপূর্ণ পানার ভেতর সলজ্জ ডাহুকের মতো। একটা বোধ দেয়, নাড়া দেয়। উপরে তুলে আঁৎকা ছেড়ে দেয়। পাঠক ব্যথার বদলে আনন্দে উথলে ওঠে।


চঞ্চল আশরাফ

যে পরাগায়ন গ্রহণযোগ্য


উৎপলকুমার বসুর কবিতা ক্রীড়াময় কিন্তু আচ্ছন্ন করার সামর্থ্য এর রয়েছে। জীবনানন্দ দাশের পর সাম্প্রতিক বাঙালি কবিদের ওপর অঙুলিমেয় যে-ক’জন কবির প্রভাব রয়েছে আজও, তাঁদের মধ্যে উৎপল সম্ভবত সবচেয়ে শক্তিমান। বিশেষত নব্বইয়ের দশকের বাংলাদেশের কবিতায় তাঁর প্রকাশভঙ্গির প্রভাব খুব দেখা যায়। আমার মনে হয়েছে, এই প্রভাব ক্ষতিকর হয় নি কবিতার জন্য, কেননা এতে কবিদের অনুশীলনে সৃষ্টিশীলতা সঞ্চারিত হয়েছে এবং এই পরাগায়নের বদৌলতে সাম্প্রতিক কালে কিছু গুরুত্বপূর্ণ কবির আবির্ভাব ঘটেছে। তাঁর কবিতা সমকালীন কবিদের আকৃষ্ট করতে পারে নি; কিন্তু অন্তত দুই দশক পরের কবিদের ওপর তাঁর প্রভাবের দিকে তাকালে এই কবির শক্তি টের পাওয়া যায়।


মজনু শাহ

ভালোবাসা থেকে দূরে রেখেছ কি মদ?


বছর দশেক আগে উৎপলকুমার বসু যেবার ঢাকায় এলেন একুশে বইমেলার সময়, কাঁটাবন থেকে মেলার দিকে যেতে যেতে একটু কথা হয়েছিল। এটা ওটা কুশল বিনিময়ের ফাঁকে ওনার কবিতার স্টাইল সম্পর্কে একটা কথা বলেছিলেন যেটা পরে তাঁর কবিতাগুলো পড়ার সময় নতুন করে খেয়াল করেছিলাম। যে, উনি শব্দ নয়, বাক্যকে আক্রমণ করেন।

এতে হয় কী, একটা ভিন্ন ব্যঞ্জনা আসে, যা ইউনিক! বাক্য নিজেই যখন বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে, তখন মিনিং-এর পরিসর বাড়তে থাকে। সৌন্দর্যের মধ্যে উনি কিছুটা বুনো ব্যাপার রেখে দিলেন। যেটা অ-মর‍্যাল বলেই হয়ত অধিক আকর্ষণীয় হলো!

‘ছিল আঠারো/উনিশ মাইল টিকিট অথচ বেড়ালাম অনেক…’

এমন প্রচুর। তবে ঐ সূক্ষ্ম খেলাটা পরের দিকে অন্যরকম। ধীরে ধীরে বিমূর্ত করে বলার ভঙ্গি থেকে খানিকটা সরে এসে খণ্ড খণ্ড ছবি ও আখ্যান উনি জুড়ে দিয়েছেন। কবিতার মধ্যেকার নাট্যমুহূর্তটুকু পাঠককে কল্পনা করে নিতে হয়।

তাঁর স্বপ্নের ভিতর দিয়ে চলে যায় আরোহীবিহীন পদ্মাবোট, পাঠকের কাছে তা যেমন সুন্দর ভয়ের, অপার্থিব স্পর্শেরও।


সৈকত হাবিব

বাংলা ভাষার অন্যতম মৌলিক কবি


উৎপল কুমার বসু সেই সময়ের কবি, যখন জীবন আর মাহাত্ম্যবান নয়, বরং প্রায়শ সে অর্থহীন, নিরানন্দ, হাস্যকর। মানুষ এখন পুঁজির উৎপাদন-কীট। বিশ্বব্যাপী পুঁজির যে বিশাল গভীর ঘূর্ণি চলছে মানুষ তাতে কেবল পাক খেয়ে চলেছে। একসময় মানুষ ছিল ধর্মের ক্রীড়নক, এখন পুঁজির। আর এই ক্রীড়া উৎপল দেখছেন পৃথিবীর এক দরিদ্র জগতের বাসিন্দা হিসেবে। তার কবিতায় সেই সব মানুষের পুঁজির হাতে, মানুষরচিত নিয়তির হাতে লাঞ্ছিত হওয়ার এবং তাদের জীবনের অর্থ-অনর্থকতা, মাহাত্ম্য-অক্ষমতা, তাদের আনন্দ-বেদনা-যাতনা, হাস্য-ব্যঙ্গ-লাঞ্ছনার কথা তিনি নিজের তৈরি নিরাবেগ ভাষায় প্রকাশ করে গেছেন। এই বস্তুভোগ-আক্রান্ত পার্থিবতায় আবেগ যে এখন অনেকটাই অনর্থক ও মূল্যশূন্য—এ কথা তার মতো করে খুব কম কবিই বুঝেছেন। তাই তার কবিতা এই সময়ের নির্মমতারই প্রতিনিধি।

খুব স্পষ্ট করেই, উৎপল কুমার বসুর কবিতার স্বাদ নতুন। এবং তিনি, বাংলা ভাষার অন্যতম মৌলিক কবি। তার কবিতা বুঝতে হয় বুদ্ধিমত্তা দিয়ে; আমাদের সময়-সমাজ-রাজনীতি-বাস্তবতা ও বর্তমান বিশ্বব্যবস্থার নিরিখে। কেবল কাব্যরস তার কবিতায় মুখ্য নয়, অন্বিষ্টও নয়। বরং তার রসের আকর নিহিত তার অভিজ্ঞতার জগতের সঙ্গে আমাদের অভিজ্ঞতার সংশ্লেষের মধ্যে, তার চিন্তার সঙ্গে আমাদের চিন্তার বিরোধ/নৈকট্যের মধ্যে। আর তার দাবি সেই সচেতন পাঠকের, যিনি কেবল কাব্যভোক্তাই নন, বরং সমাজ-সমকাল-বিশ্বরাজনীতির গতিপ্রকৃতির দিকেও যার আছে সংবেদনমগ্ন নজর।

উৎপল বাংলা কবিতার নতুন দ্রষ্টা। আর পাঠকের চেয়ে পরবর্তী কবিদের ওপর তার প্রভাব এ কথা মনে করিয়ে দেয়, তিনি যতটা সাধারণ পাঠকের, তারচে বেশি কবিদের কবি। তার কবিতায় এই সময়ের কূটরাজনীতি, মধ্যবিত্তের জীবন, তাদের ভোগবাসনা, মানুষের মনের গহন আর যাপিত জীবনের বহুরূপী যে অভিজ্ঞতা, তার সঙ্গে আমাদের আছে গভীর আত্মীয়তা। এমনকি তার ভাষাও অনেক সময় আমাদের চিন্তার সঙ্গে একাত্ম হয়ে যায়।

উৎপলের আরেক শক্তি স্যাটায়ার। বিষয় যতই সিরিয়াস হোক, উৎপল ঠিক ঠিক বের করে নেন তার আরাধ্য ভাষা। কান্নার ভেতর থেকেও তিনি খুঁজে নেন হাস্য ও রঙ্গ। আর তাই বাংলা কবিতা তাকে তার ঠিক আসনে বসিয়ে দিয়েছে বহু আগেই।


টোকন ঠাকুর

উৎপলকুমার বসু গড় নন


কোলকাতায়, ২০০২ সালে সার্ক রাইটার্স ফাউন্ডেশনের দাওয়াতে কবিতা পড়তে গেলাম, তরুণ কবি হিসেবে। সাহিত্য অাকাদেমি অায়োজিত এক সন্ধ্যায় কবিতা পাঠের পর অারো বেশ কজন সিনিয়র কবি-সাহিত্যিকের যখন অালাপ হচ্ছিল, সেই সিনিয়রদের মধ্যে উৎপলকুমার বসুও ছিলেন, এক খণ্ড অালাপও হলো সেদিন। এরও বছর দশেক অাগে, ঢাকার রামপুরায় যখন জুয়েল মাজহার ও মাসরুর অারেফিন একসঙ্গে ভাড়াটে ছিলেন, তখন অামি খুলনা থেকে ঢাকায় এসে মাসরুরদের সেই বাসায় উঠতাম। মাসরুরের তখনো ছাত্রত্ব শেষ হয় নি, শেষ হয় নি অামারও। জুয়েল ভাই সংবাদপত্রে। রাতে ব্যাপক অাড্ডা। রাইসুও বাড্ডা থেকে অাসত ওই অাড্ডায়। সেইভাবে একবার ওই বাসায়, রাতে, তামাক-মদের কম্বিংয়ের মধ্যে জুয়েল ভাই অামাকে পড়তে দিলেন উৎপল কুমার বসুর শ্রেষ্ঠ কবিতা। সেই বই পাঠান্তে জুয়েল ভাইকে ফেরৎ দেবার কথা ছিল, কিন্তু দেব দেব করেও তা অাজও দেওয়া হয় নি। পরবর্তীতে অামি ঢাকাবাসী হয়ে যাওয়ার পরেও জুয়েল ভাই উৎপলকুমার বসুকে অামার কাছে ফেরৎ চাইতেন। মাঝেমধ্যে পড়েছি উৎপলকে। খুব মজে যেতে চেয়েছি হয়তো তারও কবিতায়, কখনো মজেছি। কখনো মজতে পারি নি। মজামজি ইচ্ছে করে হয় না, অাপনাঅাপনিই হয়। উৎপল বসুর বলার ভঙ্গিটা তার স্বতন্ত্র, কাটা কাটা বাক্যে, কাটা কাটা অনুভূতি। তবে খুব মেতে থাকা হয় নি তেমন উৎপলে, যেমন অামার উঠতি কবিতাকালে অাবুল হাসানে মেতেছিলাম। মজেছিলাম। তবু উপলব্ধি, উৎপলকুমার বসু গড় নন, এটাই তার শক্তি। শক্তিকে অগ্রাহ্য করে কে?


মুক্তি মণ্ডল

উৎপলকুমার বসু


উৎপলকুমার বসুর কবিতা আমার ভালো লাগে। তাঁর অনেকগুলি কাব্যগ্রন্থ আমার খুব প্রিয়। তিনি আমার অত্যন্ত প্রিয় কবিদের একজন। আমার পর্যবেক্ষণে তিনি বাংলা ভাষার এলিট ও আধুনিক কবি। তাঁর কবিতা ভালো লাগে কারণ তাঁর কবিতা বহুস্বরের, অনেক পথের দিকে দৃষ্টি ফেরাতে আহ্বান করে ও আকর্ষণীয় প্রলোভনে টেনে নিয়ে যায়, যেন অনেক গল্পের ভেতর অনেক অনেক মানুষ, এরা চেনা পরিসরের ভেতর থাকে অথচ আমরা টের পাই না, উনার কবিতা পড়লে এগুলো ঠাহর হয়, দারুণ এক ভ্রমণও ঘটে উনার কবিতা পড়তে পড়তে। অপরদিকে উনার কবিতার বহুমাত্রিক ব্যঞ্জনায় আধুনিক মানুষের ব্যক্তিগত সম্পর্ক এবং সামাজিক সম্পর্কের চৌহদ্দিতে অদেখা অচেনা নানা অনুষঙ্গ ভেসে ওঠে, মনে হয় এ তো আমাদের বাড়ির পাশের কারো মুখ, কারো মুখোশ, কারো বা দেহাংশ, প্রতিবেশীর খড়ের গাদাও দারুণ এক মহিমায় আমাদেরকে ভাবনার তরঙ্গে ঠেলে দেয়, আমরা মানুষের গল্পের ভেতর ঢুকে পড়ি, পশুপাখির সংসারেও আমাদের মনোবীক্ষণ থ হয়ে রয়। এসবের দোল-তরঙ্গই আমাদের টেনে নিয়ে যায় নতুন এক বাস্তবতার মধ্যে, কোনো আড়ষ্টতা থাকে না, ওসবের ভেতর মাথা গুঁজে দিতে ভালো লাগে, সত্য নয় তবু মনে হয় সত্যের মতোই তাঁর কবিতার চোয়াল, বাহু ও বাহুভঙ্গি, যেন তাঁর কবিতা ব্যক্তির সৌখিন মনোভঙিমার তাবৎ কৃৎকৌশলকে প্রকাশ করে দেয় নানা উছিলায়।

উৎপলকুমার বসু আধুনিক চিন্তা কাঠামোর উপরতলার কবি। তাঁর কবিতার ভাষাভঙ্গি বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসরে অত্যন্ত সৌখিন ও নান্দনিক। কবিতার বহুমাত্রিক ভাষার মধ্যে ওই সৌখিন ও নান্দনিকতার যে আবহ সৃষ্টি করে তা বাংলা কবিতাকে বহুদূর নিয়ে যাবে বলে আমার বিশ্বাস। সন্দেহ, নাদান পাঠক তাঁর আধুনিকতারে নিতে পারে কি না!


শুভাশিস সিনহা

উৎপল, বাংলা কবিতার অন্যতম অধুনা-আফিম এবং আমাদের বন্দিঘোর


ঘাসের জঙ্গলে কার ব্যক্তিগত বসন্তদিনের চটি পড়ে আছে তার কোনো সুরাহা না হলেও বাংলা কবিতা এই সুরৎহাল না-বোঝার বিচ্ছিন্ন অতি-স্বাধীন অনুভূতির চমকি প্রকাশের মধ্য দিয়ে যখন থেকে তার আধুনিক কিংবা আধুনিক-উত্তর অবয়ব রচনা করতে শুরু করেছে, সেই অবয়বের মন্ত্রমুগ্ধ পরবর্তী প্রজন্ম হিসেবে তখন থেকেই উৎপলকুমার বসুকে আমাদের অন্যতম উজ্জ্বল কাব্য-অগ্রজ ভাবতে এতটুকু কষ্ট হয় না বোধ করি।

(উৎস :  ‘তারপর ঘাসের জঙ্গলে পড়ে আছে তোমার ব্যক্তিগত বসন্তদিনের চটি…’ – পুরী সিরিজ/উৎপলকুমার বসু)

‘বৃষ্টিশেষে মেঘের ফাঁক দিয়ে বাংলার আকাশে যে নীল রঙটুকু দেখা যায়,’ ‘তারই মতো হাল্কা কিছু বলার চেষ্টা করব’ বললেও উৎপল বসু হালকা কিছু বলেন নি, (‘সলমা-জরির কাজ’ থেকে), ভারী সব কথাই বলেছেন। বলেছেন সে-কাহিনি, যা  ‘সকালের রৌদ্রের পালক দিয়ে ঢাকা যাবে।’ (গুপ্তচর)

‘পায়ের নীচের তৃণমণ্ডলীর তুচ্ছতাকে ভুলতে’ যেমন পারেন নি, তেমনি তিনি ভুলেন নি যে,

‘পেরেক ও সুতোয় বাঁধা এই চার দেয়ালের ঘর
আমাদের অস্ত্রের দোকান—
এখানে মাটির নীচে গোলাবারুদের স্তূপ,
কলহের কোপন দেবতা হেথায় আসীন।’

জীবনের চলমানতা বা যাত্রাপথকে দৈনন্দিন দেখাবোঝার মধ্য দিয়ে তৈরি করা মুহূর্তের রোমান্টিক অথচ নির্লিপ্ত বিলাপ আর কখনো বা বাস্তবকে নিজের মতো করে হাস্যপরিহাসে বুঝে নেবার টুকরো টুকরো বয়ান—এ দুয়ের মধ্যেই উৎপলকুমার বসুর কাব্যিক অধিষ্ঠান; সেখানে বয়নের গড়ন ভাঙার মুহুর্মুহু নান্দনিক স্বেচ্ছাচার আছে (যেমন : আমার অনন্ত রক্ত ঝরে যায় অগ্নির সমাজে – ‘বকুল’), আছে বাকপ্রতিমা ব্যবহারের সরল শক্তি (যে-জলস্রোত লাফিয়ে পার হয়েছিলাম তাকে ঘুরিয়ে চাষজমির দিকে নিয়ে যাওয়ার কথা ছিল –  ‘সলমা-জরির কাজ’), উপমা ব্যবহারের অভিনবত্ব (হাতে-বোনা খদ্দরের হিংসাহীনতা হয়ে তুমি যেন আমাদের সবার চৈতন্যে ছড়িয়ে পড়তে থাকো- ‘কহবতীর নাচ’)…

কিন্তু কিছু একটা নেই। কী? বাংলা কবিতা-গীত-আখ্যান সবকিছুর মধ্যে সম্পূর্ণ হয়ে ওঠা এক ঐক্য বা এক হয়ে ওঠা এক সম্পূর্ণতা, প্রবল টুকরো টুকরো বিচ্ছিন্নতার ভিন্ন ভিন্ন দ্যুতি নয় বরং সংঘর্ষে-সংঘর্ষে জ্বলে ওঠা এক দার্শনিক (পুস্তকি অর্থে দর্শন নয়, কবির দেখা আর দেখানোর ছবি বা রূপের অর্থে) অভিপ্রায়—পাঠান্তে যা একটি রেখার মতো সব ভগ্নরেখাকে আপনলুপ্ত করে রাখে। সেই অভিপ্রায়কে যখন থেকে আমরা হারিয়েছি তখন থেকেও উৎপলকুমার বসু ‌হয়তো আমাদের প্রিয়।

এবং এ-কথা বোধ হয় স্বীকার-সম্ভব, উৎপল-পূর্ববর্তী কবিতাসাম্রাজ্যকে মন ও মনন থেকে গুঁড়িয়ে দেবার তৎপরতায় আমরা সামিল থাকার চেষ্টা করলেও উৎপল (এবং বিনয়)-পরবর্তী কবিতাঘোরকে কাটানোর সবেগ উৎসাহ দেখাই নি এখনও। (‘এখনও’ বলছি এ কারণে যে, উৎপল মাত্র মৃত্যুবরণ করলেও তাঁর কাব্যভাষাভঙ্গি কিবা আত্মা রচিত হয়ে গেছে বহুকাল আগেই।)

এ ভাষাভঙ্গি একটা আফিমের মতো আমাদেরকে বুঁদ করে রাখলেও, এটা আমাদের বয়ানধরনের নান্দনিক স্বাভাবিকতা (বা স্বাভাবিক পরিণতি) নয়, বরং একটা লিঙ্গুয়া-কমপ্লেক্স (যা সম্ভবত স্বকীয় ও সহজাত বয়ন নয়, অন্য কোনো ভাষা-বয়ানের অন্তর্গত অনুবাদের মতো করে কথাকে প্রকাশ করে)—এ-কথা ভাবারও একটা সময় বোধ হয় হয়ে এসেছে।

সদ্যপ্রয়াত শক্তিমান এ-কবির প্রতি শ্রদ্ধা আর মুগ্ধতা রেখে, আগামীতে বিশদ বাখানের আকাঙ্ক্ষা উজিয়ে এই ভাষ্যের ইতি টানলাম।


সোহেল হাসান গালিব

প্যারাডাইম শিফটিং


আইডিয়া লেখাকে ডমিনেট করবে না আইডিয়াকেই লিখনভঙ্গিমা—এমন একটা ধাঁধার মুখোমুখি এসে উৎপলকুমার বসু আমার কাছে এক নতুন অভিজ্ঞতা। দর্শন নয়, চৈতন্যের একটা বিশেষ অভিক্ষেপ—কিভাবে পাতার শব্দে জাগিয়ে তোলে সন্ত্রাসে, তাই যেন দেখতে পেলাম। বিষয়হীনতা থেকেও জানলাম ‘স্বপ্নের ভেতর এক বাস্তবতা লেজ গুটিয়ে থাকে’।

তাঁর কবিতা মুখে মুখে ছড়াবার জিনিশ নয়, মনে মনে সঞ্চারিত হবার নিঃশব্দ উচ্চারণ। এবং খুব নিঃশব্দে বাংলা কবিতার পারাডাইম শিফটিং ঘটে গেছে উৎপলের হাত ধরেই—এ কথা এতদিন পর স্বীকার করাটা মুগ্ধতা নয় শুধু।

বক্তব্যনির্ভর, দর্শনাক্রান্ত আর ঔচিত্যশাসিত কবিতার মৃত্যুসংবাদটি সংগোপনে, কিন্তু বিশ্বাসযোগ্যভাবে আমাদের কাছে রেখে বাংলা কবিতায় তাঁর প্রস্থান।


মৃদুল মাহবুব

ব্যক্তিরুচির কাঠি-লজেন্স ও উৎপলকুমার বসুর বাংলা কবিতা


১.
শিল্প হয়ে ওঠা কোনো ন্যাচারাল ব্যাপার না, এই ঘটনা সুপার-ন্যাচারাল, একে গড়ে তোলা হয়, শিল্পী এর স্রষ্টা, তাই তাঁর এত মহিমা, ইউনিকনেস। যেকোনো মহৎ শিল্পের ইনডিফারেন্সি আর ইউনিকনেস আপনাই জাগ্রহ হয়, কোনো কিছুকে ব্যাহত না করে ব্যাপক অদ্বিতীয় কাঠামো বা ফর্ম নিয়ে তার উপস্থিতি। দ্বিতীয়ত, মনে হবে এটা আপনি আগেও দেখেছেন, খুব চেনা চেনা কম্যুনিকেটিভ মাধ্যমে বিস্তৃত। বিমূর্ত মাধ্যম মূর্ততারই ভিন্ন রূপায়ণ। চিন্তা বা যোগাযোগ মূর্ত-বিমূর্ত দুই রকমই। চেতনের সাথে যেমন অবচেতন মিলে মিশে একাকার, উভয়ের ব্যালান্সিং হলো অস্তিত্ব, বিংনেস। ‘কম্যুনিকেটিভ’ মানে শুধু মূর্ত চেতনাই না কিন্তু, অধরা চাঁদটাও ভেসে থাকে দিঘির তলে। যেকোনো মহৎ শিল্প হোক তা গান, কবিতা বা চিত্রকলা, তার মহৎ হয়ে ওঠার জন্য ইউনিকসেন আর ইনডিফারেন্সি সর্ব মৌলিক। অন্যন্যতা বা স্বতন্ত্রতা এই উভয়ের মিথোজীবিতায়  মহৎ শিল্প হয়ে ওঠে উদাসী, তার কোনো আইডেন্টিক্যাল টুইন নাই। তবে তাকে চেনা চেনা লাগে। কারণ তার জন্ম ঐহিত্য, ধারাকাহিকতা, চলমান মাধ্যমের জরায়ুতে। ঐতিহ্য বা ধারাবাহিকতাই শিল্পকে মানুষের জন্য ইন্টারপেট করে। আবহমানতার পুলসিরাত পার হয়েই তবে দাঁড়াতে হয় নতুনত্বের শিল্প-স্বর্গে। মহৎ শিল্প জনপ্রিয় ও অজনপ্রিয় উভয়ই। উইলিসিস তেমন জনপ্রিয় কোনো উপন্যাস না, কেননা যারা উপন্যাস পড়ে থাকেন তারা অনেকেই এটা পড়েন নাই।  হ্যামলেট সর্বকালের জনপ্রিয় নাটক বা কবিতায় ওয়েস্টল্যান্ড পড়ে নাই এমন কবিতাবোদ্ধা জগতে নাই। তাই আপনি কি পড়েছেন বা  যা পড়েন নি বা যা আপনার খুব ভালো লাগে বা লাগে না তা শিল্পের ব্যাপার না। রুচির স্কেল শিল্পের মাপকাঠি হতে পারে না। দরিদ্র দেশের শিল্প-সমালোচকদের মিজারমেন্ট টেপ কেনার মতো দৈন্যই অবশিষ্ট আছে। আর তাই শিল্পমিতিতে এত এত রুচির দৌরাত্ম্য। দৈববিড়ম্বনা। রুচির শাসনে শাসিত শিল্প-সমালোচনার শেষ কথা হলো যুক্তিহীন গ্রহণ বা বর্জন, মিসএন্টারপিটেশন। রুচি-শাসনহীন নৈর্ব্যক্তিকতা বিরল, নাই সাহিত্য-সমালোচনায়। ওয়েটেড স্কোরড স্কেল নামে একটা ব্যাপার আছে। কতগুলো পরস্পর শর্তযুক্ত ফ্যাক্টে বিবেচনায় কোনো কিছুর মাপ দেওয়া হয়। আমাদের শিল্প-ইনটেলেকচুয়ালরা শিল্পকে দড়ি-ছাড়া গরুই ভাবেন আর নিজেকে ভাবেন পুরোহিত, শেষতক বিচারক। সেই জন্য এই বাংলাভাষী দেশে যেকোনো কিছুকে মহৎ শিল্প আর যেকোনো কিছুকে হিসাবহীন খারিজ করা যায় খুব সহজেই। শিল্প-সমালোচক আগেই জানান দেন শিল্পের কোনো মাপজোক নাই, এইটা স্কেলহীন, মাথামুণ্ডহীন ধড়। তারপর তারা নিশর্তভাবে বলে দিচ্ছেন, এইটা কোনো কবিতা না বা এইটাই একমাত্র মহৎ কবিতা। বুদ্ধিবৃত্তিক দীনতা আর কাকে বলে! মহৎ শিল্পের সম্ভাবনা, প্রাথমিক শর্ত বা লক্ষণগুলো চিহ্নিত করার সময় এসে গেছে। এই ফ্যাক্টরগুলো আবিষ্কার ও তা কী কী বিষয়ের সাথে সম্পর্কিত তা খুজেঁ দেখার আছে। তা না হলে সমালোচক-ষাঁড়ের উপদ্রব মেনে নিয়েই চলতে হবে।

২.
কবি উৎপলকুমার বসু অান্ডার-রেটেড, ওভার-ওয়েট কবি। স্বল্প পাঠ বা অধিক পাঠ কোনো কবিতারই মাপকাঠি নয়। তার কবিতা সম্পর্কে অনেক মিথ বাজারে চালু। যেমন: তিনি সচেতন কবিতাপাঠক দ্বারা পঠিত, কবিদের কবি, তার পাঠক ক্রমর্ধমান, তিনি ফরাসি সিনট্যাক্সে বাংলা কবিতার আমদানিকারক, তিনি ছন্দেই ছিলেন বা ছন্দের নতুন রূপ তাঁর কবিতা, তার কবিতা ইউরোপীয় কবিতার এক্সটেনশন, ইউরোপীয় কবিতার সাথে যাদের ভালো ওঠাবসা তাদের কাছে এগুলো সেকেলে। এবং তিনি যুক্তিহীনভাবেই মধ্যম-শ্রেণির কবি। এমন নানবিধ মিথে উৎপলকুমার বসু জর্জরিত। মিথ সাধারণত সত্য-মিথ্যা উভয়ই হয়ে থাকে। এই সমস্ত মিথ তাকে ঘিরে গড়ে উঠেছে তার বাজে অর্ধ-উৎপল-শিক্ষিত সমালোচকদের জন্যই। উৎপলের মাপ সাধারণ গজফিতের ধারাণা থেকে মাপতে গিয়েই যত গোল। উৎপলকে সঠিকভাবে পরিমাপ করতে হলে আমাদের সর্বপ্রথম যা ভেবে দেখতে হবে তা হলো, মহৎ শিল্পের ফ্যাক্টরগুলো কী কী তা আবিষ্কার করা। বাংলা কবিতাকে বাংলা কবিতার জায়গা থেকে না দেখে ইন্দো-ইউরোপীয় কবিতা-মাধ্যম হিসাবে দেখার এবং শোনার অভ্যাস তৈরি করা দরকার। কেননা আধুনিক বাংলা কবিতাই না শুধু, অপরাপর আধুনিক বা সমকালীন শিল্পমাধ্যম বলে যার চল তা ইউরোপীয় কনটেক্সটেই গড়ে ওঠা। এসময়ের বাংলা কবিতা ভাবে ইউরো-পাস্টোরাল, কর্মে অলস, ভাষায় বাংলা (একমাত্র ভাষাটাই তার ঐতিহাসিক অলংকার), নৈতিকতায় ও সৌন্দর্যবোধে ভিক্টোরীয়। শেষ অব্দি একটা বার্তা আমরা পেতে চাই কবিতার কাছে।

আর উৎপলকুমার বসুর বাংলা কবিতা? ভাবে প্রান্ত-আধুনিক ইউরোপীয়, কর্মে স্থির, ভাষায় বাংলা, নৈতিকতাহীন ও সৌন্দর্যবোধবর্জিত, অসমাপ্ত বক্তা। শেষ অব্ধি বার্তাহীন, হলাহলমুখর। উৎপলকুমার বসুর ইন্দো-ইউরোপীয় বাংলা কবিতা (রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, জীবনানন্দ এবং তৎপরবর্তী সবাই একই ঘরানার, যে যার ভিন্ন গায়কী নিয়ে) ইউনিক এবং ইনডিফারেন্ট, তাই মহৎ। আপনি পড়লেন কি পড়লেন না, ভালো লাগলো কি ভালো লাগলো না তা দিয়ে মহৎ শিল্পের উদাহরণ হয় না। মহৎ শিল্পের কোয়ালিটি সেন্স না থাকলেই তৈরি হয় প্রতিনিয়ত খারিজ করার খেলা। আপনার ব্যক্তিগত রুচি মহৎ শিল্পের মাপ হতে পারে না, বড়জোর এইটা আপনার ব্যক্তিত্বের মাপ।

তার কবিতা এ সবেরই উদাহরণ। রুচির বাঁধন টপকে তাকে আপনাকে দেখতেই হবে যদি আপনি রবীন্দ্র-জীবনানন্দ পরবর্তী বাংলা কবিতার জাদুঘরে যান। তার মরদেহ সংরক্ষিত আছে পাঠক। না গেলেও সমস্যা তো নাই। ব্যক্তিরুচির কাঠি-লজেন্স দিয়ে বাংলা কবিতার মাপ! কঠিন বিষয়!

‘পাবে আমাকেও। বাদার জঙ্গলে
এক পোর্তুগিজ অশ্বতর তোমাকে দেখাবে
আমি ও হেঁতাল কাঁটা ও-পশুর মাংসে বিঁধে আছি।
লৌহকণার গান শুনে যাও। শ্বেতকণিকার ক্ষিপ্ত নৃশংসতা শোনো।
বিষণ্ণ যার চোখ নেই, বৃদ্ধি আছে, খসে-পড়া আছে,
নেই ত্বক, শুধু ঝুলন্ত প্রদর আছে, পুঁজ আছে,
—এঁকে নমস্কার করো।’