হোম গদ্য বাংলাদেশের কবিতা : সত্তরের দশক

বাংলাদেশের কবিতা : সত্তরের দশক

বাংলাদেশের কবিতা : সত্তরের দশক
435
0

বাঙলা কবিতার কালানুক্রমিক আলোচনায় সত্তরের দশক বলতে বোঝানো হয়ে আসছে মুক্তিযুদ্ধোত্তর আট বছরকে; যদিও ’৭০-৭১’-এ বাংলাদেশের কবিরা বিশ্রাম নেন নি। দশকটির ওই অংশটুকু উহ্য থেকে যাওযার কারণ আবেগ। এর মূলে আছে রাজনীতি। শিল্পকলা তখনই অপদার্থ হয়ে যায়, যখন তাতে রাজনীতির স্থূল কম্পন এসে পড়ে। যদিও পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় কিছু মহৎ শিল্পকলা রয়েছে, যেগুলোর প্রেরণা ও আবেগ এসেছে রাজনীতি থেকে; সেগুলো রাজনীতির কাঁপুনিতে কাহিল হয়ে পড়ে নি, বরং সেই আবেগকে অতিক্রম ক’রে গেছে। এমন-কি যুদ্ধের প্রেরণা বা প্রতিক্রিয়া থেকে সৃষ্ট শিল্পকলাও পেরিয়ে গেছে তার ভাবউৎসকে, সৃষ্টি করেছে অন্যতর মহৎ অর্থ ও সৌন্দর্য। পিকাসোর গোয়ের্নিকা এর বড় উদাহরণ। চেসোয়াভ মিউশ, ভাস্কো পোপা, পাবলো নেরুদা, লুই আরাগঁ প্রমুখের কিছু কবিতাও এ-প্রসঙ্গে স্মরণযোগ্য হতে পারে। আমাদের আবেগে রাজনীতি যুক্ত হলে আমরা দিশাহারা হয়ে পড়ি, বেসামাল হয়ে পড়ে আমাদের শিল্পকলা। কারণ, আমরা সেটি অর্থ ও সৌন্দর্যের স্তরে ধারণ করতে পারি না, আর তা পারি না ব’লে শিল্পকলায় উত্তরণ ঘটানো আমাদের পক্ষে সম্ভব হয়ে ওঠে না।

সত্তরের দশকের কবিরা সেই অর্থে ধারণ করতে পারেন নি উনসত্তরের সেই উত্তাল সময়কে, সত্তরের অস্থিরতা, হতাশা ও ক্ষোভকে, মুক্তিযুদ্ধকে; স্বাধীনতার আনন্দ ও বেদনাকে; ফলে এইসব আত্মস্থ এবং অতিক্রম করা তাদের পক্ষে হয়ে ওঠে নি সম্ভব।


বাঙালিকে সত্তরের কবিরা উপহার দিয়েছেন হতাশা, উল্লাস, দেশাত্মবোধ, স্বাধীনতা-উত্তর অপ্রাপ্তির রাশি-রাশি তরল ও সরল কবিতা।


এটা ঠিক, উপচে-পড়া আবেগ সত্তরের দশকের কবিতার সর্বনাশ করেছে। ফলে, এই সময়ে কবিতা হিসেবে যা রচিত হয়েছে, তার খুব বিপুল অংশ কবিতাই নয়। স্লোগান, বিবৃতি, শিল্পরিক্ত উচ্চারণে জর্জরিত এই ‘কবিতা’গুলো। অধিকন্তু এই সময়ে যারা আবির্ভূত হয়েছেন, তাদের দু’একজন বাদে প্রত্যেকের কবিতা পড়লে মনে হয়, জীবনদৃষ্টি ও শিল্পবোধ নিয়ে তারা মোটেই আগ্রহী নন। বিশেষ কোনও সংবেদনশীলতা তাদের আকর্ষণ করতে পারে নি, যেমন আধুনিকতাবাদ আকৃষ্ট করেছিল তিরিশের কবিদেরকে। ফলে সত্তরের কবিদের চিহ্নিত করা মুশকিলই বটে। চিহ্নিত করার উপায়টি তা হলে কী? বৈশিষ্ট্য দিয়ে তা করতে গেলে কেবল আবিদ আজাদকেই আলাদা ক’রে চেনা যায়। কিন্তু সত্তরে তাকে একমাত্র কবি হিসেবে তুলে ধরারও আছে বিপদ। এক্ষেত্রে একমাত্র উপায় হলো সময়। কারণ, সেই সময়ে রচিত কবিতার সম্ভবত কোনওটিই কালোত্তীর্ণ হতে পারে নি। একটা সময়ের দলিল হিসেবেই এগুলো নিজেদের পরিচয় বহন করছে।

তবু এই কালপর্বে অঙ্গুলিমেয় ভালো কবিতা সৃষ্টি হয়েছে। সেগুলোর অধিকাংশই অবশ্য লিখেছেন ষাটের কবিরা। তাদের কবিতায়ও সঞ্চারিত হয়েছে সেই রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত আবেগ, যা বিপন্ন করেছে সত্তরে আবির্ভূত কবিদের; যদিও এর মধ্য থেকে এমন কয়েকজন কবির দেখা মেলে, যারা নিজেদের কবিতায় প্রকাশ করতে পেরেছেন শিল্পকলার প্রতি গভীরনিবিড় দায়; চেষ্টা করেছেন সমকালীনতা থেকে উত্তরণ ও মুক্তির। হয়তো সেই চেষ্টা সচেতন নয়। অকবিতা ও কবিতার মধ্যে পার্থক্য বোঝার সহজাত ক্ষমতা থেকে এমনটি ঘটেছে। সত্তরের অগণন কবিদের মধ্যে উজ্জ্বল হয়ে আছেন আবিদ আজাদ, সমুদ্র গুপ্ত, ত্রিদিব দস্তিদার, রুদ্র মুহম্মদ শহীদুল্লাহ, সুরাইয়া খানম, নাসিমা সুলতানা, কামাল চৌধুরী, ময়ুখ চৌধুরী, জাহিদ হায়দার, হাবিবুল্লাহ সিরাজী, দাউদ হায়দার, আবিদ আনোয়ার, আসাদ মান্নান, আবু হাসান শাহরিয়ার, ফারুক মাহমুদ, মিনার মনসুর প্রমুখ। তবে এদের অনেকের বিকাশ আশির দশকে, কেউ-কেউ নব্বইয়েও সক্রিয় থেকেছেন পুরোদমে। কেউ স’রে এসেছেন সত্তরের সর্বনাশা গড্ডলিকা থেকে; আশির অন্তিমে ও নব্বইয়ের শুরুতে এসে তারা কবিতার নিজস্ব নন্দনে সমর্পিত হতে চেয়েছেন। বিশেষত কামাল চৌধুরী এক্ষেত্রে অগ্রগণ্য, এবং তার কবিতার যে-পরিবর্তন লক্ষ করা যায় উন্মেষপর্ব থেকে, তা অকল্পনীয়।

যাদের নাম এইমাত্র উচ্চারিত হলো, তাদের কবিতা কেমন? কিছু কবিতাংশ পড়ে নেয়া যেতে পারে :

একটি দরোজা খুলে বাতাসের বন্ধু হয়ে লোকালয় ছেড়ে
গভীর অরণ্যে দেখি : তসবি হাতে ধ্যানমগ্ন বুড়ো চিতাবাঘ
হরিণ শিশুর ক্ষুরে স্বাধিকার বেঁধে দিলে তার লেজ নেড়ে
শিয়াল সাঁতার কেটে গঙ্গাজলে ভুলে যায় সব অনুরাগ :
স্বর্ণের আংটির মতো দরোজা সে খুলে দিয়ে হাত ইশারায়
দ্রুত পায়ে কাছে আসে—নামহীন, চোখে মুখে বুকে চুমু খায়।
[সবুজ রমণী এক দুঃখিনী বাংলা/আসাদ মান্নান]

নিরিবিলি ক্ষতস্থান চেটে
আহত হরিণ যায় চারণভূমিতে,
বারুদের গন্ধ শুঁকে সাহসী পাখির ঝাঁক ফিরে যায় বিলে—
আমিও তেমনি যেন কালের কয়েদী, গায়ে তবু জীবনের জামা,
স্বপ্নখেকো সময়ের বীভৎস থাবার পাশে
অবাক জ্বালিয়ে রাখি ব্যক্তিগত চাঁদের পূর্ণিমা।
[কবলিত মানচিত্রে/আবিদ আনোয়ার]

তোমার চুলের মধ্যে চিত্রার্পিত যে দিন ও রাত্রির আনাগোনা
তোমার চোখের মধ্যে যে অসীম আকাশের সম্ভাবনা
তোমার হাতের আঙুলগুচ্ছের মধ্যে যে তারার আগুনের খেলা
তোমার পায়ের পাতার কিনারায় যে জ্যোৎস্নার বিস্তার
এমনকি তোমার চিবুক ছুঁয়ে যে রৌদ্র যে ছায়া তোমায় আল্পনাময়
করে তোলে
[সকল প্রশংসা কবিতার/আবিদ আজাদ]

কে যেন অদৃশ্য ডাস্টার হাতে
আমাদের সব বীরগাথা মুছে দিয়ে যায়?
আগামী শিশুরা শুধু বসে থাকে
চিবুকে দু’হাত রেখে
চোখের সামনে নিয়ে এক বিবর্ণ ব্ল্যাকবোর্ড।
[ব্ল্যাকবোর্ড/ত্রিদিব দস্তিদার]

ষাটের শেষদিককার কাব্যভাষা যেমন আছড়ে পড়েছে এইসব কবিতায়, তেমনি সমকালীন পরিস্থিতির স্পন্দনও মিলেছে। লক্ষ্যযোগ্য, বিষয় ও প্রকরণে সত্তরের কবিতা খুব নিরীহ, অধিকন্তু অনুষঙ্গেও ষাটের প্রতিধ্বনি দুর্লক্ষ্য নয়; যদিও কিছু ভালো কবিতা এ-কালপর্বেও রচিত হয়েছে। যাদের নাম একটু আগে উল্লেখ করা হয়েছে, নিশ্চিতভাবে, তারাই লিখেছেন সেই কবিতাগুলো। কিন্তু বিপুল বাজে কবিতার মধ্যে তারা অসহায়; কেননা বাঙালি পাঠক গ্রহণ করেছে সেই কবিতাগুলো, যেগুলোর সঙ্গে শিল্পকলার কোনও সম্পর্কই নেই। পাঠকদের রুচির এই পতনের মূলে সময় যেমন দায়ী, আমাদের কবিদেরও তাতে বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। বিশেষত মহাদেব সাহা, যিনি কবিতায় পাঠককে কাতরতা উপভোগের পথ দেখিয়েছেন, এরপর উনসত্তর-সত্তরের নির্যাতিত ও উত্তেজিত, একাত্তরের যুদ্ধজয়ে আনন্দিত ও স্বপ্নভঙ্গের যন্ত্রণায় কাতর বাঙালিকে সত্তরের কবিরা উপহার দিয়েছেন হতাশা, উল্লাস, দেশাত্মবোধ, স্বাধীনতা-উত্তর অপ্রাপ্তির রাশি-রাশি তরল ও সরল কবিতা। রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ তারল্যের জন্যে খুব বিখ্যাত। দাউদ হায়দারও; কিন্তু রুদ্র কিছু ভালো প্রেমের কবিতা লিখেছেন, যদিও আশির দশকের অনেক কবিকে তার তারল্য গ্রাস করেছে।


সত্তরের কবিতার বিপুলতা অসৌন্দর্যের দিকেই গেছে, কবিতা সম্পর্কে পাঠক ও নবীন কবির ধারণায়ও ঘটেছে পতন।


যা-ই হোক, বিষয় ও প্রকরণে ষাট থেকে দূরে নয় সত্তরের কবিতা। যেটুকু পার্থক্য—তা উচ্চকিত স্বরে, প্রকাশের তারল্যে। কিছু ক্যাটালগধর্মী কবিতা রচিত হয়েছে এ-সময়ে, কিন্তু সেগুলোর বেশির ভাগ লিখেছেন পঞ্চাশ ও ষাটের কবিরা। ফলে, ধ’রে নিতে পারি, সত্তরের যে-সব কবি ক্যাটালগধর্মী কবিতা লিখেছেন, তারা পূর্বসুরিদেরই অনুকরণ করেছেন; যদিও পূর্বসুরিরা এই আঙ্গিকটির নকল করেছেন চল্লিশ ও পঞ্চাশের ‘পেঙ্গুইন পোয়েট্রি’ থেকে। তবে পঞ্চাশ ও ষাটের কবিরা সত্তরে ভালো কিছু কবিতা লিখেছেন। এই তালিকায় আছেন সৈয়দ শামসুল হক, আল মাহমুদ, আব্দুল মান্নান সৈয়দ, সিকদার আমিনুল হক, রফিক আজাদ, আবুল হাসান ও নির্মলেন্দু গুণ। সত্তরের কবিরা তাদের কবিতার পাশে ঠিকমতো দাঁড়াতেই পারেন নি; যদিও দু’তিন জন কবি পরবর্তী দু’দশকে বৈপ্লবিক উত্তরণ ঘটিয়েছেন নিজের কবিতায় সমকালীন বোধ ও ভাষাকে ধারণ ও আত্মস্থ ক’রে। কামাল চৌধুরীর কথা আগেই বলা হয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সত্তরে যারা আবির্ভূত হয়েছেন, তাদের হাতে সেই সময়ে ভালো কবিতা রচিত হয় নি। এবং যে-আবিদ আজাদ ও আবিদ আনোয়ারকে তুলে ধরা হয় এই সময়ের অগ্রগণ্য কবি ব’লে, তারাও শুরুতে কোনও ভালো কবিতা লেখেন নি। তা লিখতে-লিখতে তারা আশির দশকে এসে পড়েছেন। ততক্ষণে বাঙলার শিল্পকলা তারল্যে দূষিত হয়ে গেছে। এই দূষণের আগে ও পরে আবিদ আজাদ আত্মগত কিছু কবিতা লিখেছেন, যেগুলো পাঠসুখকর; কিন্তু শিল্পমনস্কতায় উত্তীর্ণ নয়, নিছক ব্যক্তিগত রচনায় পর্যবসিত হয়েছে সেগুলো। আর আবিদ আনোয়ার শিল্পের প্রতি দায়বদ্ধ থাকার চেষ্টা করলেও তার কবিতাগুলো অন্যতর অর্থ ও সৌন্দর্য সৃষ্টিতে ব্যর্থ হয়েছে। তবে আসাদ মান্নানের কিছু কবিতা বেশ ভালো। জীবনানন্দীয় কম্পন তাতে আছে; তবু তার কবিতায় আচ্ছন্নতার যে-ভাষা নির্মিত হয়েছে, তা তুলনারহিত। কিন্তু সমকালীন পাঠক তাকে গ্রহণ করে নি, কোনও নবীন কবিও তাতে সাড়া দেয় নি। আমাদের পাঠকদের প্রবণতা হলো, তারা সব সময় যায় প্রচারসর্বস্ব সুখকর ও অশৈল্পিক গড্ডলের দিকে। ফলে সত্তরের কবিতার বিপুলতা অসৌন্দর্যের দিকেই গেছে, কবিতা সম্পর্কে পাঠক ও নবীন কবির ধারণায়ও ঘটেছে পতন।

নিশ্চিতভাবেই, আজ, সত্তরের দশক মানেই প্রায় অকবিতার দশক। এটা এমন এক পর্ব, যখন শিল্পকলার ওপর চেপে বসে সময়; সময় মানে পরিস্থিতি ও পাঠক; এটা এমন এক সময় যখন কবিরা তাৎক্ষণিক অভিজ্ঞতা ও অনুভবের দাসত্ব বরণ করেন; কোনও মহৎ শিল্পকলা বা তার প্রেরণা সেই কবিদের কাছে হয়ে পড়ে গৌণ বা অর্থহীন; তারা পরিস্থিতি ও পাঠকের খোরাক যোগাতেই খালি হয়ে যান। এই অবস্থা কবিতার ভাষায় ভর করলে তাতে অনিবার্য হয়ে পড়ে অর্থের চেয়ে অনর্থ, সৌন্দর্যের চেয়ে অসৌন্দর্য। এভাবেই কবিতা শিল্পকলা থেকে স’রে যায় দূরে।


আগের কিস্তি : বাংলাদেশের কবিতা : ষাটের দশক
চঞ্চল আশরাফ

চঞ্চল আশরাফ

জন্ম ১২ জানুয়ারি, ১৯৬৯; দাগনভুইয়া, ফেনী। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে সম্মানসহ স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। পেশা : সাংবাদিকতা।

প্রকাশিত বই :
কবিতাগ্রন্থ : চোখ নেই দৃশ্য নেই (১৯৯৩), অসমাপ্ত শিরদাঁড়া (১৯৯৬), ও-মুদ্রা রহস্যে মেশে (২০০২), গোপনতাকামী আগুনের প্রকাশ্য রেখাগুলো (২০০৮), খুব গান হলো, চলো (২০১৩)।

উপন্যাস : কোনো এক গহ্বর থেকে (১৯৯৭), যে মৎস্যনারী (২০১১)।

গল্পগ্রন্থ : শূন্যতার বিরুদ্ধে মানুষের জয়ধ্বনি (১৯৯৯), সেই স্বপ্ন, যেখানে মানুষের মৃত্যু ঘটে (২০০৭), কোথাও না অথচ সবখানে (২০১৩)।

স্মৃতিগ্রন্থ : আমার হুমায়ুন আজাদ (২০১০)।
প্রবন্ধগ্রন্থ : কবিতার সৌন্দর্য ও অন্যান্য বিবেচনা (২০১১)

ই-মেইল : chanchalashraf1969@yahoo.com
চঞ্চল আশরাফ