হোম গদ্য বাংলাদেশের ঈদসংখ্যাগুলো কি পাঠকেরা পড়ে

বাংলাদেশের ঈদসংখ্যাগুলো কি পাঠকেরা পড়ে

বাংলাদেশের ঈদসংখ্যাগুলো কি পাঠকেরা পড়ে
1.52K
0

প্রশ্নটা আমাকে ছুড়ে দিয়েছেন পরস্পরের সম্পাদক কবি সোহেল হাসান গালিব। তিনি জিজ্ঞাসা করেছিলেন, সেই সুবাদে মনে পড়ল, আমাদের তারুণ্যের প্রথম দিকে গত শতাব্দীর আশির ও নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশে খুব বেশি ঈদসংখ্যা ম্যাগাজিন হিসেবে বের হতো না। বিচিত্রা, রোববার, সন্ধানী, চিত্রালী বা পূর্বাণী ছাড়া হঠাৎ হঠাৎ দু-একটা পত্রিকা ঈদসংখ্যা করত। আমরা যারা লেখালিখি করতাম তাদের তো আগ্রহ ছিলই, যারা লেখালিখি করতেন না, তরুণ বয়সী তেমন অনেককেই আমরা এইসব পত্রিকার ঈদসংখ্যার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে দেখতাম।

তখনকার তুলনায় এখন অনেক বেশি ঈদসংখ্যা বের হয় এ কথা সত্যি! যেমন দেশের উল্লেখযোগ্য প্রায় সবগুলো দৈনিক পত্রিকাই ঈদসংখ্যা বের করে। গালিব আমার কাছে জানতে চাইছিলেন দুই সময়ের মধ্যে তুলনা করে কি বলতে পারি যে ঈদসংখ্যার প্রতি এখন পাঠকদের আগ্রহ বেশি? আমি অবশ্য তার এই প্রশ্নের উত্তরে ঈদসংখ্যার প্রতি আনুপাতিক হারে আগ্রহ এখন বেশি এমন কথা বলতে পারলাম না । চ্যানেল আইয়ে ঈদের দু-একদিন আগে ঈদসংখ্যা নিয়ে আলোচনা অনুষ্ঠানে অংশ নিতে গিয়ে ২০১৬ সাল পর্যন্ত পরপর বেশ কয়েক বছর নিয়মিত ঈদসংখ্যার খোঁজ রাখতে হয়েছিল আমার। তখন মূলত দুতিনটির বেশি পত্রিকার প্রতি পাঠকদের আগ্রহী হতে দেখি নি। তাও আবার কাটতির দিক থেকে লক্ষ করেছি প্রথম দ্বিতীয় তৃতীয় করতে গেলে প্রথমের সঙ্গে দ্বিতীয়র ব্যবধান অনেক বেশি। প্রথমের সঙ্গে তৃতীয়ের ব্যবধান এত বেশি পেয়েছি যে ঈদসংখ্যায় লিখতে আলাদা করে আগ্রহ বোধ করি নি।

প্রধান প্রধান স্টলগুলোতে দুইতিন দিন পরেই অধিকাংশ পত্রিকার খোঁজ পাওয়া যেত না। প্রথমে ভাবতাম খুব কাটতি বলে সব কপি শেষ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু পরে কত কপি বিক্রেতারা এনেছেন তা শুনে বুঝলাম কেন পাওয়া যায় না। তারা খুব বেশি আনতে চান না, কারণ পড়ে থাকবে। সামান্য ময়লা হয়ে গেলে পাঠকেরা আর হাতে নিতে চায় না। আবার ঈদসংখ্যা কিনবার আগ্রও তেমন দেখা যায় না বেশি মানুষের মধ্যে। প্রশ্ন উঠতে পারে প্রতি বছর প্রায় গোটা চল্লিশেক ঈদসংখ্যা বের হয় কেন? পত্রিকা কর্তৃপক্ষের ব্যবসাই হয় কিভাবে!

দু-তিনটি ব্যতিক্রম বাদে ঈদসংখ্যাগুলোর ব্যবসা কাটতির ওপর মোটেও নির্ভরশীল মনে হয় নি আমার। আবার লেখকদের মধ্যে তাঁদেরই উৎসাহ যাঁরা ঈদসংখ্যায় লিখছেন। অনেক লেখককে জিজ্ঞাসা করে জেনেছি সামান্য ব্যতিক্রম ছাড়া তাঁরা অনেকসময় লেখককপিও পান না। যদি বের হবার সময় বাজার থেকে সঙ্গে সঙ্গে কিনে ফেলতে না পারেন তাহলে কখনো কখনো কপি দেখারও সুযোগ হয় না তাঁদের। প্রশ্নটা তাহলে আরো গভীর হবার কথা যে, পাঠকই যদি না থাকে তাহলে কিভাবে ব্যবসা হয় ঈদসংখ্যা দিয়ে?

আমার মনে হয়েছে পত্রিকার ব্যবসার উপায় এখন আর প্রধানত পাঠকের কাছে পৌঁছা নয়। তাদের লক্ষ্য বরং উপলক্ষের বিজ্ঞাপন ধরা। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাংলাদেশের বৈধ-অবৈধ ব্যবসা-বাণিজ্য যে রকম বিস্তার লাভ করেছে বিভিন্ন উপলক্ষে তার কিছু অর্থ বিজ্ঞাপন বাবদ বরাদ্দ হয়, এ শুধু বিজ্ঞাপন নয়, প্রতিষ্ঠানের অন্যতর বিষয়কে আড়াল করার উপায়ও। কমসংখ্যক পত্রিকা ছেপে এইরকম অনেকগুলো সাময়িক উপলক্ষের বিজ্ঞাপন মিলিয়ে যে অর্থাগম হয় তা দিয়েই পত্রিকার লাভ হয়ে যায়। আজকাল এভাবে লাভ করাটাই তাঁদের ব্যবসা হয়ে উঠেছে। আর্থিক লাভ কোনো কোনো ক্ষেত্রে যদিওবা না হয় তাদের লাভ হয় সামাজিক মর্যাদা। একটা মোটা ঈদসংখ্যা বের করতে না পারলে বাজারে অবস্থান থাকবে কী করে?

মোটা ঈদসংখ্যা বের করার জন্য সাধারণত যোগাযোগসমর্থ তরুণ কাউকে দায়িত্ব দেয়া হয় যারা পরিচিত দু-একজন লেখকের কাছ থেকে লেখা আনতে পারেন। সে কারণেই দেখা যায় স্বল্প সংখ্যক লেখক ঈদসংখ্যার লেখার জন্য চাপে থাকেন। গল্প-উপন্যাস তো আর গণ্ডায় গণ্ডায় লেখা যায় না! আর আমাদের গল্প-উপন্যাসের লেখকদের মধ্যে পরিচিত লেখকও তো সংখ্যায় বেশি নেই। আবার নতুন প্রজন্মের লেখকেরা যাঁরা লিখছেন তাঁদের লেখা ঈদসংখ্যায় পড়েছেন এমন পাঠকও তো তেমন একটা আমি পাই নি। কবিদের বেলায়ও অবস্থা কতটা সুখকর তা বলা কঠিন হবে। কারণ কে কয়টা ঈদসংখ্যায় লিখেছেন তার হিসেব নিজেরা কেউ কেউ হয়তো করেন। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই দেখেছি কারো কারো নাম শোনা পর্যন্তই সার, কবিতা পড়ে পাঠকেরা পত্রিকাকে বা  কবিকে প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন এমন নিদর্শন বিরল!


যেমন আমি লক্ষ করেছি ‘দেশ’, ‘আনন্দবাজার’, ‘আনন্দলোক’ বা এ জাতীয় পত্রিকাগুলোর শারদীয় সংখ্যার সঙ্গে বাংলাদেশের জনপ্রিয়তম ঈদসংখ্যার অনুপাতিক বিক্রির ব্যবধান ৮০% থেকে ৯০%।


গত এক বছর ধরে আমি নিউইয়র্ক নগরীতে বসবাস করছি। এখানে আসবার আগের বছরগুলোতে আমার অধিকাংশ সন্ধ্যাগুলো কাটত ঢাকার শাহবাগ এলাকার বইয়ের দেকানগুলোতে। শাহবাগ এলাকার আশপাশের এলাকার কয়েকটা বইয়ের দোকান ছাড়া সারা দেশে ক’টাই-বা বইয়ের দোকান? এই দোকানগুলোর দু-একটাতে গুটিকয়ের বেশি ঈদসংখ্যা দেখি নি। শাহবাগ এলাকার বইরের পত্রিকাস্টলগুলোতে ঘুরে ঘুরেও দেখেছি বড় কেন্দ্রগুলোর দু-একটি স্টলে প্রধান চার পাঁচটির বেশি ঈদসংখ্যা নেই! এক বছরে অবস্থার খুব বেশি উন্নতি হবার লক্ষণ দেখছি বলে তো মনে পড়ছে না! তাহলে এই প্রশ্ন ওঠা কি সংগত নয় যে তাহলে  ঈদসংখ্যা পাঠকের কাছে যায় কী করে? এই প্রশ্ন করলেও যে এর কোনো সঠিক প্রত্যুত্তর পাওয়া যাবে তার কোনো উপায় নেই! কারণ বাংলাদেশের কোনো প্রতিষ্ঠান ব্যবসার স্বার্থে বা সমাজকে বুঝবার জন্য ঈদসংখ্যা পড়ে কি পড়ে না তা জানার জন্য গবেষণা করে দেখি নি। ফলে আমাকে দৈবচয়ন ও অভিজ্ঞতা ভিত্তিক তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ নির্ভর কথা বলতে হচ্ছে। আমার মতকে যদি কেউ অগ্রহণযোগ্য বলে গাল দেন তাহলে আমি তা প্রতিহত করতে পারব না। কিন্তু তাতেও আমার প্রশ্ন থেকে নিস্তার পাওয়া যাবে না। ঈদসংখ্যার পাঠকেরা তাহলে কই যান? কয়জন লেখক পাঠকদের কাছ থেকে কোনোরূপ চিঠি বা ইমেইল বা ফোন পান! প্রবল ধর্মীয় ও রাজনৈতিক স্পর্শকাতর বিষয় ছাড়া কোনো ভুল তথ্য দিয়ে থাকলে তার প্রতিবাদ পান, কিংবা কোনো সুচিন্তিত ভাষ্যের জন্যে পাঠকদের প্রতিক্রিয়া পান! ঈদসংখ্যার পাঠক থাকলে তো পত্রিকায় বা ফেসবুকে আমরা লেখা নিয়ে অন্তত পাঠকের ন্যূনতম বিতর্ক পেতাম। স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে যদিওবা মাঝে মধ্যে বিতর্ক হয়, সেক্ষেত্রেও লক্ষণীয় যে টেক্সট পড়েছেন এমন কাউকে খুব কমই দেখা যায়!

আলাদাভাবে ঈদসংখ্যার পাঠক কম এমন কথা হয়তো বলা যাবে না, কারণ সামগ্রিকভাবেই আমাদের পাঠক সমাজ গড়ে ওঠে নি। তা নাহলে দেড় কোটি জন-অধ্যুষিত নগরীতে বইয়ের দোকানসংখ্যা এত কম কেন? যদি যথার্থ শিক্ষিত সমাজ গড়ে উঠত তাহলে পাঠকও বেশি হতো। কারণ পদে পদে বইয়ের দ্বারস্থ হতে হয় শিক্ষিত মানুষকে। বইয়ের দোকানগুলোতে আমি নিয়মিত যাতায়াতসূত্রে খোঁজ করে দেখেছি যে-পরিমাণ বই বিক্রি হয় এবং তাতে যে পরিমাণ লাভ হয় তা দিয়ে বইয়ের ব্যবসায় বাংলাদেশে কেউই প্রায় আসত না।  নিতান্ত ভালোবাসা না থাকলে বা অন্য কোনো উপায়ে জীবন ধারণ করা না গেলে ছোট আকারের সে ব্যবসা করতে কেউ এখন আর এগিয়ে আসে না। সে কারণেই দু-একটি ব্যতিক্রম ছাড়া ব্যক্তিবিশেষের লয়প্রাপ্তির সঙ্গে সঙ্গে সেই ব্যক্তি-পরিচালিত বই বিপণন প্রতিষ্ঠানকে নিঃশেষিত হতে দেখা যাচ্ছে।

বইবিক্রির পরিমাণ যাযথভাবে হিসেব করলে দেখা যাবে লাভজনক বইয়ের দোকান প্রায় পাওয়াই যাবে না। এখন দু-একটি বইয়ের দোকান বাংলাদেশে গড়ে উঠতে শুরু করেছে খানিকটা পেশাদারি দৃষ্টিভঙ্গিতে। কিন্তু এখনো এই ব্যবসা টেকসই কিনা তা নিশ্চিত বলা যাচ্ছে না।

আমি বছরখানেক ধরে নিউইয়র্কে বসবাস করছি। এখানে বাংলা বইয়ের দোকান বলতে একটিই—মুক্তধারা নিউইয়র্ক। আরো দু-একটি আছে যাদের বই-ই মূল ব্যবসা নয়। দু-একটি ক্ষেত্রে দেখা যায় প্রধানত ভারত বা বাংলাদেশ থেকে আমদানি করা ধর্মীয় বইই বিক্রি হয়। এর সঙ্গে সামান্য কিছু সাধারণ পাঠ্য বইও থাকে। আমি মুক্তধারায় নিয়মিতই যাই। সেখানে পিক আওয়ারে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে থেকেও দেখেছি বাংলা বইয়ের ক্রেতা বাংলাদেশিদের মধ্যেই খুব উল্লেখযোগ্য নেই। পশ্চিমবঙ্গের বই ও পত্রিকা যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন রাজ্য থেকে সংগ্রহ করার ক্রেতা কিছু আছে।

অনুপাতিক তুলনায় বাংলাদেশিদের মধ্যে ক্রেতা  খুবই কম। একটা দৃষ্টান্ত দেয়া যেতে পারে পূজাবার্ষিকীগুলোর সঙ্গে তুলনা করে। যেমন আমি লক্ষ করেছি ‘দেশ’, ‘আনন্দবাজার’, ‘আনন্দলোক’ বা এ জাতীয় পত্রিকাগুলোর শারদীয় সংখ্যার সঙ্গে বাংলাদেশের জনপ্রিয়তম ঈদসংখ্যার অনুপাতিক বিক্রির ব্যবধান ৮০% থেকে ৯০%। তাও বাংলাদেশি পত্রিকা বিক্রি করতে হয় খানিকটা জোর করেই। পূজাবার্ষিকীর স্বতঃস্ফূর্ত পাঠক এখনো উল্লেখযোগ্য। অথচ নিউইয়র্কে বাংলাদেশি কমিউনিটির মানুষই দেখা যায় বেশি। তারাই দাপুটে জীবন যাপন করছে।

পাঠকসংখ্যা কমার কারণ আমার মতে রাজনৈতিক তথা রাষ্ট্রিক। আমার সাধারণ জ্ঞান বলে অর্থনীতির এ রকম উত্থানের সঙ্গে পাঠকসমাজও বৃদ্ধি পাবার কথা। কারণ রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড যত বিস্তার লাভ করবে ততই মানুষের বিভিন্ন ক্ষেত্রে জ্ঞান অর্জন দরকার হবার কথা। এর সঙ্গে বিস্তার ঘটবার কথা শিক্ষারও। কিন্তু আমাদের আমাদের দেশের রাজনৈতিক অর্থনীতি এখনো সেই পরিণতি পায় নি। প্রকৃত শিক্ষা গ্রহণ করে যোগ্যতা অর্জন না করেও সাফল্য অর্জন করা যায়, কিংবা ক্ষমতা দ্বারা শিক্ষার বিকল্প ফল অনেক ক্ষেত্রে নিয়ে যাওয়া যায়, এবং  প্রকৃত শিক্ষা অর্জন ছাড়া প্রয়োজনীয় ডিগ্রিও অর্জন করা যায়। ফলে প্রকৃত সৃজনশীলতার চর্চা অানুপাতিক হারে বাড়ে নি বাংলাদেশে। তৈরি হয় নি ভোক্তা শ্রেণী। ফলে যারা লেখক হিসেবে অবতীর্ণ হচ্ছেন তারাও পাঠক সন্ধান করতে পারছেন না। তাছাড়া বাংলাদেশের সমাজজীবনে একসময় সাহিত্যরসিক মানুষকে সমাজের অগ্রসর ও ক্ষমতাশালী মানুষ মনে করা হতো, যে ধারণা এখন প্রায় নেই বললেই চলে। এখন বরং লেখককেও হতে হয় অন্য ক্ষমতায় ক্ষমতাবান। পাঠক যখন অন্য ক্ষমতায় ক্ষমতাবানের লেখা পড়েন তখন বুঝে যান যে তিনি প্রকৃত লেখকীয় ক্ষমতাবানের লেখা পড়ছেন না। এভাবে প্রবঞ্চিত হতে হতে পাঠবিমুখতাও ঘটে পাঠকের। ঈদসংখ্যাগুলোর লেখা ও লেখক আর এর চেয়ে আলাদা হবেন কী করে। বঞ্চিত পাঠক একসময় লেখককেও বঞ্চনা করেন। ঈদসংখ্যার পাঠক না থাকার পেছনে এই বঞ্চনাও হয়তো ক্রিয়াশীল রয়েছে।


ঈদসংখ্যা ২০১৮

আহমাদ মাযহার

ই-মেইল : mazhar.boierjagat@gmail.com