হোম গদ্য বই থেকে গল্প : মঙ্গলহস্তীর ডানা

বই থেকে গল্প : মঙ্গলহস্তীর ডানা

বই থেকে গল্প : মঙ্গলহস্তীর ডানা
574
0

 ‘ভয় করো না বৎস! কাল ভোরে আমার পূজায় যে-মালা নিবেদন করবে তুমি, সেই নির্মাল্য নিয়ে যেও। হস্তিপৃষ্ঠে আমাকে আসীন দেখবে, আর সে-মাল্য আমায় পরিয়ে দিও। দেখবে মত্তহস্তী তোমার সামনে নতজানু হয়ে অভিবাদন জানাবে’

বিজয়ন্তীর পরনের ফ্যানেকটার ময়লা রঙ সন্ধ্যার নিভে যাওয়া আলোতে আরও মলিন দেখায়। বামহাতে সে কোদালটা তুলে নেয় আর ডানপায়ের তলাটা মাটিছাড়া করে সবুজ টমেটো গাছগুলোর ওপর সজাগ দৃষ্টি রাখে। তারপর সারি করে রোপণ করা টমেটো গাছের উপর দিয়ে ডান পা-টা চালিয়ে বাম পায়ের সাথে জড়ো করে। দিনের অবশিষ্ট আলো মাঝেমধ্যে মেঘের আড়াল ফুঁড়ে বেরিয়ে এসে তার কোদাল চালানোর গতিতে রসদ যোগায়। জড়ো করা দু’পা পুনরায় সচল করে ডানের সারিতে রাখে। বাম হাতের কোদালটা কচি চারাগাছগুলোতে বেশ আলতো করে চালায়। শেষবেলার মিঠে রোদে কাজের কাজ যা হলো, পুরো দিনের শ্রম খাটিয়ে মুনাফার খোঁয়াড়ে অল্পই ঠেকছে তার। এখনও একটা সারিতে কোদাল চালানো বাকি। প্রত্যুষে সূর্য উঠি-উঠি সময়ে এসে ক’হাত না চালালে বিকেলে পানি দেয় কী করে! জমি বেশ শক্ত। লাঙলের ফলায় মাটির চামড়া উঠেছে ঠিকই, সৌরেন চিংথামের হিজড়ে বলদ দুটো মাংস নাড়াতে পারেনি। বিজয়ন্তী ঘাড় সোজা করে অলস ও ক্লান্ত দেহটা পথের উপর ঘুরিয়ে নেয়। এবার সে বাড়ি ফিরবে। ফেরার পথে রাস্তার ধারের সারি সারি ঢোলকলমি গাছগুলোর ভেতর দিয়ে তার দৃষ্টিও এঁকেবেঁকে হাঁটে। নতুন একটা সুখ রঙিন হয়ে বুকের উপর চাপে। দুর্বাঘাস বিছানো রাস্তাটার গাঢ় সবুজ দুর্বা সুখটাকে উসকে দেয়। বিদঘুটে চিৎকার করতে করতে ক্ষেতের উপর দিয়ে উড়ে যাওয়া পাখিগুলো তা দেখে ফেলে।

যখন সে বাড়ি ফেরে ততক্ষণে পুত্র ও তার অতিথিরা সারারাতের গাড়ির ধকল কাটিয়ে জেগে ওঠে। ঢুলু ঢুলু চোখে জল ছিটিয়েও তাদের আলস্য কাটে না। তারা দেহটা নলকূপের জলে পরিশুদ্ধ করে। মধ্য-কার্তিকের সন্ধ্যা শ্রীমঙ্গলের বয়ঃসন্ধি পেরোনো শীতকে বোঝাই করে আনল তার তুলসীতলার উঠোনে। বাঁশের কঞ্চি দিয়ে ঘেরা কামিনীগাছের ফুলের গন্ধ, উঠোনের কোনায় কোণঠাসা হয়ে বসা বিজয়ন্তীর ব্যস্ততাকে খানিকটা উপহাস করে। চুলোর আগুনে রাতের খাবার সেদ্ধ করায় নিবিষ্ট বিজয়ন্তীর আনত মুখে তার কোনো ছাপ পড়ে না। নতুন ঘরের ইট-সুরকির গন্ধ পুরনো চাটাইঘেরা রান্নাঘরের ফাঁক-ফোকরে উঁকিঝুকি মারে। পুত্র এসেছে সবান্ধবে, রাসপূর্ণিমা বোঝাই করে। কার্তিক মাসের ভরা পূর্ণিমায় সোয়া দু’শো বছরের যুবতি রাসলীলা যেন রাজা ভাগ্যচন্দ্রের মৃদঙ্গ বাজনায় কেঁপে-কেঁপে ওঠে। আর নৃত্যের তালে মোহাবিষ্ট হয়ে বিজয়ন্তী মহারাজা ভাগ্যচন্দ্রের নৃত্যমগ্ন অবয়ব দেখে। অতিথিদের সাগ্রহ উপস্থিতি তাকে আরও বেশি চঞ্চল করে। কত দূর মুল্লুকের মানুষ। পারতপক্ষে তাদের পরিবারে মাংস খাওয়া হয় না। ডিম, পেঁয়াজ ও মাংসের গন্ধ পেলে পূর্বপুরুষের ব্যথিত আত্মা চারপাশে পায়চারি করে। অতিথিদের আপ্যায়নে এই শুচিবাই কাটাতে বেশ কসরত করতে হচ্ছে তাকে। ‘য়েনাম’-এর গন্ধে বধ করে, পেঁয়াজের ঝাঁঝকে পূর্বপুরুষের নাকে পৌঁছাতে দেবে না! মনিপুরি মুসলিম মেইতেই পাঙানদের পোল্ট্রির দোকান থেকে দুই কেজি একশো পঞ্চাশ গ্রাম ওজনের আস্ত হাতিটা কেনার সময় অতিথি সেবাই মুখ্য ছিল। সে কোন যুগে পূর্বপুরুষেরা এ-পথ মাড়িয়েছিল! মহারাজা ভাগ্যচন্দ্র ভাগ্যচক্রের ক্রিয়া সাঙ্গ করে রাজ্যলিপ্সু পুত্রদের মায়াই ত্যাগ করল না শুধু, ব্র‏হ্মবাহিনীর উন্মত্ততার দরজায় পুত্রদের ভাগ্যকেও ছিটকিনি বানিয়ে গেল। সাত বছরের সেই অনিশ্চয়তা ও হত্যাযজ্ঞকালে, যখন মনিপুরি উপত্যকার ভূমিপুত্রদের বংশধরেরা স্বভূমি ছেড়েছিল, ঠিক সে-সময় মেঘের ডানায় ভর করে তারা উড়ে এসেছিল। গম্ভীর সিংহ একদিন মনিপুর উদ্ধার করল, কিন্তু উড়ে আসা স্বজনরা নতুন জমিতেই মজে। সেই দেড়শো-দু’শো বছরের পুরনো পাখায় কত মাটির গন্ধ লেপ্টাল! স্বদেশি সূর্যের শান দেওয়া আলো কার্তিকের পূর্ণিমায় বেশ নজরকাড়া হয়। চার গ্রামের অতিথিরা শামিয়ানা টাঙানো মাঠের সারি সারি চেয়ারে বসে পৃথিবী পত্তনের আদিকথা শেখে পটু বাজিয়েদের বাজনায়। বিজয়ন্তীর চাপাহলুদ মুখ ভাত ফোটার গড়গড় আওয়াজে যতটা চঞ্চল হয়, মনটাও ততটা সচকিত হয়। অতিথিদের চুল মোছা জলগামছায় উঠোন-ছড়ানো সরু ও লটকানো রশির যে-অংশটা ঢাকা পড়ে আছে, পূর্বপুরুষের সুদীর্ঘ আয়নায় দেখা নিজের প্রতিবিম্বটাও যেন সেখানে আড়াল হয়ে যায়! একবার তার পূর্বপুরুষেরাও এভাবে আড়াল হয়ে গিয়েছিল মহারাজা ভাগ্যচন্দ্রের সঙ্গে। ধ্যানমগ্ন রাজা ভাগ্যচন্দ্র সেদিন চন্দ্রমুখখানা মলিন করে আপন রাজ্য মনিপুরের মায়া ছেড়েছিল। প্রতিবেশি রাজ্যের কাছে হার মেনে পালিয়ে বেঁচেছিল আসাম রাজা রাজেশ্বর সিংহের তাঁবুতে! মনিপুর উপত্যকার ইটচাপা মলিন ঘাসগুলোর দীর্ঘশ্বাস আর পাহাড়ি পাথরের শোক ভেসে গেল রাজার শোকের জলে। তথাপি আসামের রাজা রাজেশ্বর সিংহের দুর্ভাবনা ঘোচানো যায়নি। আসামরাজ জানতেন ভাগ্যচন্দ্রের শুভ্র আধ্যাত্মিকতার কথা, যদিও নিশ্চিত হওয়া সম্ভব ছিল না। তাই সভয়ে ও শ্রদ্ধায় রাজার ভাগ্যক্ষমতা মাপতে চায়। বৈষ্ণবরসে আপাদমস্তক ভেজা মহারাজ ভাগ্যচন্দ্রের নির্জন রাতের ধ্যানমগ্ন মূর্তি আসাম রাজার শর্তপূরণে সফল না হয়ে কি থাকে! রাজেশ্বর সিংহের অবাধ্য মঙ্গলহস্তী ‘জয়শা’কে পোষ মানানোর দায় ঘাড়ে নিলে সবার উৎকণ্ঠা উচ্চকিত হয়। রাজার আকুল আর্তি জলের নদীকে ব্যথিত করে। ‘খেদা’র ভেতরে আটকে রাখা জয়শা কতটাই বা আর বিদ্রোহ করতে পারে!

রাজা ভাগ্যচন্দ্র স্বপ্নাদিষ্ট হন। স্বপ্নে নিয়তি নির্ধারণ করে দেন তার প্রভু, ‘ভয় করো না বৎস! কাল ভোরে আমার পূজায় যে-মালা নিবেদন করবে তুমি, সেই নির্মাল্য নিয়ে যেও। হস্তিপৃষ্ঠে আমাকে আসীন দেখবে, আর সে-মাল্য আমায় পরিয়ে দিও। দেখবে মত্তহস্তী তোমার সামনে নতজানু হয়ে অভিবাদন জানাবে’!

স্বপ্নাদিষ্ট রাত ঘুমন্ত ব্রহ্মাণ্ড ‏জাগিয়ে ভোর হয়। মত্তহস্তী পোষ মানানোর খেলায় আসামরাজ রাজেশ্বর সিংহ সপারিষদ ঔৎসুক্য নিয়ে অপেক্ষা করে। প্রজারা চোখে উৎকণ্ঠা নিয়ে যোগ দেয়। মহারাজা ভাগ্যচন্দ্র তুলসীমালা হাতে আনত পায়ে মত্তহাতির মুখোমুখি হয়। অবাক বিস্ময়ে সবাই হাতিকে রাজার সামনে নতজানু হতে দেখে! রাজা ভাগ্যচন্দ্র হাতির পিঠে চড়ে। অবাধ্য হাতি মহারাজার ভাগ্যকে নিজের পিঠে আসীন করে। জয়শাকে জয় করে ভাগ্যচন্দ্র সিংহাসন পুনরুদ্ধার করে। কৃষ্ণের মূর্তি গড়ে। রাসনৃত্যের পত্তন হয়। বিজয়ন্তীর পূর্বপুরুষ সে-রস উড়িয়ে আনল এই ভূমিতে। মনিপুর উপত্যকায় গৌড়ীয় বৈষ্ণব ধর্ম আসন গাড়ে। পাহাড়, পাথর আর মাটি তাতে নতজানু হয়। তাদের পূর্বপুরুষের শান্ত-সুবোধ হৃৎপিণ্ডও তাতে ঘায়েল হয়। চৈতন্যদেবের ইন্দ্রবাণে মনিপুর কাবু হল বটে, প্রাচীন গাছের শিকড়গুলো ঠিকই বেঁচেবর্তে আছে।

সদ্য কাটা ধানি জমিগুলোর ন্যাড়া পিঠের একাংশ দখল করে শামিয়ানা টাঙিয়ে শত শত চেয়ার বিছানো হয়েছে। সেসব চেয়ারে বসা অসংখ্য মানুষের দৃষ্টি আটকে আছে পূর্বপুরুষের হাত থেকে পাওয়া প্রাচীন শেকড়গুলোতে। এই পূর্ণিমা রাতে তারা আদিনৃত্য ‘লাইহারাওবা’র ওমে মন্ত্রমুগ্ধ হয়। গভীর মগ্নতায় আবিষ্ট হয়ে পৃথিবী ও মানবসৃষ্টির ইতিহাস প্রত্যক্ষ করে। প্রাগৈতিহাসিককালের পূর্বপুরুষরা হাজির হয়। জলতরঙ্গে দেবী ‘লাইনুরা’দের আনন্দময় নৃত্য আর স্বর্গ থেকে দেবতাদের নিক্ষিপ্ত মাটির ঢেলায় উৎসববেদিতে ক্রমশ স্পষ্ট হয় জগৎসৃষ্টির খতিয়ান। বেদিতে নৃত্যরত মাইবা-মাইবীরা অলৌকিক হয়ে ওঠে।

 তার ক্ষোভ ও বেদনায় হঠাৎ যে-শ্লেষ উঠে আসে, তার বেগ রেশাদের হৃৎপিণ্ডের গতি খানিকটা কেড়ে নেয়। প্রায় তন্দ্রালু হয়ে মাইবা-মাইবীদের মোহনীয় নৃত্য উপভোগরত হামিদের কানেও শ্লেষটা ধাক্কা খায়

অতিথিদের নিয়ে বিজয়ন্তীর ছেলে সনাতন বসেছে একেবারে প্রথম সারিতে। পুরো শামিয়ানাজুড়ে পিনপতন নীরবতায় মাঝেমাঝে দুয়েকটা কাশির শব্দ নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেয়। সনাতনের অস্পষ্ট ফিসফিসানির আওয়াজ সেই কাশির শব্দে আড়াল হয়ে যায়। কৌতূহলী দুয়েকজন ঘাড় ফিরিয়ে তার ফিসফিসানিতে কান পাতার চেষ্টা করে। সনাতন বিষয়টা লক্ষ করে অপেক্ষাকৃত অধিক মনোযোগ দিয়ে লাইহারাওবা নৃত্য উপভোগে মন দেয়। তারা কেবল দেখেই ক্ষান্ত হয় না, একটা অচিন ভাবনাও তাদের তাড়িত করে। তাদের ভাবনায় একটি অনিবার্য শঙ্কা ভর করে। সনাতনের ডান পাশের তিনটি চেয়ার দখল করে বসেছে রেশাদ, হামিদ ও রবি। তাদের সারিতেই কয়েক-চেয়ার দূরত্বে সনাতনের পিতা সৌরেন চিংথামের সজাগ মুখ মাঝেমধ্যে চোখে পড়ে। অতিথি আপ্যায়নের তৃপ্তি তার চোখে চিকচিক করে।

রেশাদ হঠাৎ করে মুখ ফসকে কিছু একটা বলতে চাইলে গলার আওয়াজটা আচমকা একটু বড় হয়ে যায়। তার কণ্ঠে কথাটি স্পষ্ট হল কি না বোঝা যায় না।

সনাতন তাকে থামিয়ে দেয়। তারপর বলে, এমনিতে উপজাতি অভিধা বাংলাদেশের মনিপুরিদের জন্য একটি অভিশাপ। সংখ্যাস্বল্পতা কিংবা চেহারাগত সাদৃশ্য যতটা না দায়ী, প্রকৃত অবস্থান সম্পর্কে বাংলা ভাষাভাষি জনগোষ্ঠীকে পরিচয় করাতে আমাদের অক্ষমতা তার চেয়ে কম নয়। ফল হচ্ছে এই, পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর সঙ্গে নিজেদের কাতারভুক্ত হওয়ার অভিশাপ মাথায় বইতে হয়।

উত্তর দিক থেকে আসা একটি ফিসফিসানির আওয়াজ হঠাৎ আড়াল হয়ে যায়। কথার রেশটুকু আশেপাশের চেয়ারে ধাক্কা খেয়ে শামিয়ানার ভেতর পাক খায়। ইতিহাসের পৃষ্ঠা উলটিয়ে যে-সত্য সহপাঠীদের বয়ান করছে, তাতে নিজের আবেগকে সে নির্মোহ রাখতে ব্যর্থ হয়। ইঙ্গবাহিনীর পতাকা ভারতবর্ষের মুক্ত আকাশকে কব্জায় আনার অনেক পরও প্রায় দেড়শো বছর পর্যন্ত তার স্বজাতিরা নিজ দেশে মুক্ত ছিল। ভাষার সমৃদ্ধ ইতিহাস বৃটিশ বাহিনীর করতলগত হওয়ার পর ইটচাপা পড়লেও, তার পূর্বপুরুষেরা ক্ষীণভাবে হলেও টিকিয়ে রাখে। যে-পাখায় চড়ে উড়ে এসেছিল এই বাংলায়, গোটা একটা ইতিহাস ও চৌত্রিশশো বছরের বৃদ্ধ ভাষাও সে-পাখায় চড়েছিল।

সনাতন পুনরায় বলে, নাউ দে সিক টু ফলো জিসাস খ্রিস্ট ইন হিজ আইডেন্টিফিকেশন উইথ দ্য পুওর, দ্য অপরেসড্, দ্য মারজিনালাইজড এন্ড ইন হিজ লাভ ফর অল পিপল উইদাউট ডিসক্রিমিনেশন। তরুণরা বিষয়টা নিয়ে অতটা স্বচ্ছ ধারণা রাখে না। কেউ কেউ সহজে বিষয়টা গ্রহণ করে ফেলছে। অর্থবিত্তের ব্যাপার তো আছেই।

তার ক্ষোভ ও বেদনায় হঠাৎ যে-শ্লেষ উঠে আসে, তার বেগ রেশাদের হৃৎপিণ্ডের গতি খানিকটা কেড়ে নেয়। প্রায় তন্দ্রালু হয়ে মাইবা-মাইবীদের মোহনীয় নৃত্য উপভোগরত হামিদের কানেও শ্লেষটা ধাক্কা খায়। সে-কারণেই হয়তো বা ‘পেনা’ বাজানোয় রত মাইবাদের বাজনার তালে বিভোর হয়ে নৃত্যরত মাইবীদের শরীরী মুদ্রায় সৃষ্টিতত্ত্বের যে-বিবরণ উঠে আসে, তা ঘোলাটে হয়ে যায়। গুরু শিদাবা যেন নয় জন দেবতার মুঠোমুঠো মাটির ঢেলা নিক্ষেপণ দেখছে। আর লাইনুরা দেবীরা মোহনীয় পাছা দোলানো নৃত্যে, মাটির ঢেলাগুলো দিয়ে জলময় বিশ্বে সমতলভূমি সৃষ্টি করছে। হামিদের ঘুমঘোর চৈতন্যে এই অভিনব কায়দায় দুনিয়া পয়দা হওয়ার কাহিনি তরতাজা অনুভূতির খোরাক হয়। শামিয়ানার পর্দা আঁটানো বাঁশের খুঁটিগুলোতে ব্যবধান রেখে রেখে প্রচুর আলোর ব্যবস্থা করা হয়েছে। শীতের রাতে আলো পেয়ে অসংখ্য পোকা ভিড় জমায়। পোকার উৎপাতে মাঝেমধ্যে কেউ কেউ বিরক্তি প্রকাশ করে। কিন্তু হামিদের মনোযোগ পুনরায় সনাতনের দিকে নিবদ্ধ হওয়ায় পোকার জ্বালাতন সে টের পায় না।

11012270_10153090045274581_940568624_n
প্রকাশক : বাঙলায়ন, অমর একুশে বইমেলা

দেয়ার এ্যাপ্রোচ ইজ টু ওয়ার্ক ইন পার্টনারশিপ উইথ দ্য পুওর। সনাতনের গলার আওয়াজ খানিকটা দ্রুত হয়। তার ভেতর একটা চাপা উত্তেজনা ধীরে ধীরে জমা হতে শুরু করে, মেইতেই পাঙানরা খানিকটা ব্যতিক্রম হলেও, মেইতেই কিংবা বিষ্ণুপ্রিয়াদের ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীতে ঢুকে পড়া সহজ হয়। লাভ-ক্ষতি নয়, কেবল কার্তিক মাসের পূর্ণিমা আরও ক্ষীণ হয়। এক অপয়া মেঘ পূর্ণিমার আলোকে গ্রাস করছে।

সনাতন তার চাপাস্বরের নিয়ন্ত্রণে খানিকটা সফল হতে না হতে অকস্মাৎ সামনের বেদিতে নীরবতা নেমে আসে। মাইবা-মাইবী সেজে বাজিমাত করা নৃত্যশিল্পীরা লাইহারাওবা নৃত্যের সমাপ্তি ঘটিয়ে বেদিতে নীরবতা নামায়। বাঁশের খুঁটিতে টাঙানো লাইটগুলোতে লম্ফঝম্প করা পোকাগুলোর পাখার আওয়াজ তখন অনেক স্পষ্ট হয়। সুনসান নীরবতার মাঝে পোকাগুলোর ওড়াউড়ির শব্দ ঠেসাঠেসি করলে ভিন্ন এক সুরের ব্যঞ্জনা সৃষ্টি হয়। শত শত মুখ মগ্ন হয়ে যে-সৌন্দর্য আবিষ্কার করছিল, আচমকা তাতে ছেদ পড়ে। বেদির নীরবতা তাদের বুকটা খালি ও শূন্য করে দেয়। কার্তিকের ভরা পূর্ণিমায় তাদের সবার বুকে একটা ব্যথা চিনচিন করে জেগে ওঠে। এর কোনো সুরাহা তারা খুঁজে পায় না।

রাত প্রায় বারোটায় লাইহারাওবা ও ‘খাম্বাথোইবী’ নৃত্যের ঘোর-লাগা কুয়াশা রাতকে পাশ কাটিয়ে সনাতন তার অতিথিদের মুগ্ধ উচ্ছ্বাসে ব্যাঘাত ঘটায়। আর গোটা কয়েক চেয়ার খালি করে বেরিয়ে আসে। অদূরে মণ্ডপে নট-সংকীর্তনের আওয়াজ শোনা যায়। বাঁশের কঞ্চির বেড়া দিয়ে তৈরি কাঁচা দোকানে বাহারি খাবারের পসরা সাজিয়ে বেচাবিক্রি চলছে বেশ। ধীরে ধীরে নীরব হতে থাকা শামিয়ানার মানুষেরা ক্রমশ মণ্ডপের দিকে পা বাড়ায়। গ্রামের আপামর মানুষে মণ্ডপ কানায় কানায় ভরে উঠতে শুরু করেছে। ভক্ত-শ্রোতাদের চোখেমুখে রাসনৃত্য দেখার লোভ চিকচিক করে। সনাতন তার অতিথিদের নিয়ে মণ্ডপের একপাশে দাঁড়িয়ে যুতসই জায়গা খোঁজার জন্য কেউ কেউ এদিক-ওদিক চোখ রাখে।

ঠিক সে-মুহূর্তে অকস্মাৎ জোড়া আলোর তীব্র ঝলকে সবার চোখ ছোটো হয়ে যায়। মণ্ডপের জীর্ণ অবয়বে খেলা করা পূর্ণিমার আলোও তাতে আচমকা ম্লান হয়! সেই সাথে গোটাকয়েক গাড়িতে একসাথে হর্ন বেজে উঠলে অনতিদূরের মণ্ডপ থেকে নট-সংকীর্তনের যে-আওয়াজ আসছিল তা ক্ষীণ হয়ে যায়। মণ্ডপের চারপাশে জড়ো হতে শুরু করা ভক্ত-শ্রোতারা রাসনৃত্যানুষ্ঠানের জন্য প্রস্তুত হয়ে গেলেও হঠাৎ করে এতগুলো গাড়ির উপস্থিতি দেখে ঔৎসুক্য নিয়ে সেদিকে দৃষ্টি নিবদ্ধ করে। ‘পলয়’ পরিহিত ভক্তশিল্পীরা একপাশে থমকে দাঁড়ায়। মুখের ওপর পাতলা শাদা কাপড়ের আবরণ ‘মাইখুম’ জড়িয়ে থাকায়, তাদের চেহারার পরিবর্তন লক্ষ করা যায় না। পরনের সবুজ শাটিনের পেটিকোটের জমির মাঝে অজস্র চুমকি। নিম্নভাগে পিতলের তবক দিয়ে মোড়ানো হয়েছে গোলাকার আয়না। ওপরে রুপালি কারুকাজ করা ঘাঘরা ও কাঁধের ওপর ঝোলানো হয়েছে জরির কারুকাজ করা ‘খাওন’। মখমলের কোমরবন্ধনী ‘খাংনপ’। মধ্যরাতের রাসলীলায় ভক্তিরসে মজা নর্তক-নর্তকীরা বিনম্রচিত্তে নৃত্যার্ঘ অর্পণে প্রস্তুত হলে ঠিক সে-মুহূর্তে একজন হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসে জানায় স্বয়ং সাংসদ এসেছেন রাধা-কৃষ্ণের লীলা উপভোগের জন্য। সনাতনকে অনুসরণ করে রেশাদ, হামিদ ও রবির দৃষ্টি ম-পের সামনের খোলা জায়গায় রক্ষিত গাড়িটিতে নিবদ্ধ হয়।

জয়শা তখন মণ্ডপের একপাশে টাঙানো ব্যানারের সামনে দাঁড়িয়ে গভীর মনোযোগ দিয়ে দুর্বোধ্য মনিপুরি শব্দের পাঠোদ্ধারে নিমগ্ন।⌈⌋

শিক্ষা- চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। লেখালেখির সাথে সম্পৃক্ত এক যুগ ধরে। প্রকাশিত লেখাসমূহ উলুখাগড়া, পুষ্পকরথ, সূনৃত, ছান্দস, কথা, চারবাক, সমুজ্জ্বল সুবাতাস, ঘুড়ি, উত্তরাধীকার ইত্যাদি ছোটকাগজসহ বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক ও অনলাইন কাগজে প্রকাশিত হয়েছে।
Fazlul Kabir

ফজলুল কবিরী

জন্ম ৯ অক্টোবর ১৯৮১; হাটহাজারী, চট্টগ্রাম। ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর। বেসরকারি আর্থিক প্রতিষ্ঠানে বৈদেশিক বাণিজ্য বিভাগে কর্মরত।

প্রকাশিত বই :
বারুদের মুখোশ [গল্পগ্রন্থ, ২০১৫, বাঙলায়ন]

ই-মেইল : fazlulkabiry@yahoo.com
Fazlul Kabir