হোম গদ্য বইমেলা বাইট

বইমেলা বাইট

বইমেলা বাইট
335
0
11118862_932510290127426_747552439_n
অলঙ্করণ : সারাজাত সৌম

বরং আট মাসের পেট নিয়ে কোনো উড-বি মা এসে পড়লে, তার উড-বি বাচ্চাকে আমি ফ্রেমে নেব

সেভেন-আপের বোতলের মতো সবুজ ট্রাংক মাথায় নিয়ে ফ্রেমের মধ্যে ঢুকে পড়ছে যে লোকটা, তার বাড়ি বসিরহাটের দিকে হতে পারে আবার নাও হতে পারে। ট্রাংকটা তার, না তার বাপ-মা অথবা অতিবৃদ্ধ পিতামহের, এও জানা যায় না। চারপাশের লোকজন একটুআধটু দেখছে তাকে। লোকটা পাত্তা দেয় না। এত কনফিডেন্টলি একশো চুয়াল্লিশ নম্বর টেবিলে পৌঁছোয় যেন গোটা মেলার হিস্ট্রি-জিওগ্রাফি মায় অ্যালজেব্রা-জিওমেট্রি অব্দি মুখস্থ। ট্রাংক নামায়। ঝুলি থেকে বেড়াল বের করার মতো ট্রাংকের তালা খুলে রেল কোম্পানির সাদাটে ডাস্টার বের করে টেবিল ঝাড়ে। পাশের লোকটা নাকে হাত চাপা দেয়। পাশের লোকটা, ফ্রেমে ঢোকার চেষ্টা করছে। ওকে আমি চিনি। নাম মনে পড়লেও বলা যাবে না, ছিনে জোঁকের মতো পেছনে লেগে যাবে। ও আমার সাবজেক্ট নয়।

আমার সাবজেক্টগুলো একটু অড। জরা হটকে। আনন্দ পাবলিশার্স অথবা বেনফিস-আলিবাবার সামনের আদেখলে লাইন, মেয়েদের পুজোর প্যান্ডেলের মতো সাজগোজ, পুরস্কারের আলো, বড় লেখকের বাইট, চ্যানেলের স্টলের সামনে মুখ দেখানোর হ্যাংলামি, এসবে আমি নেই। বরং আট মাসের পেট নিয়ে কোনো উড-বি মা এসে পড়লে, তার উড-বি বাচ্চাকে আমি ফ্রেমে নেব। বাইট নেব তার। জিজ্ঞেস করব, কী হে, কীরকম বুঝছ? জিজ্ঞেস করব, ধরো তুমি ব্যাটাছেলে হয়ে জন্মালে, আরও গোটা তিরিশ বছর পর, গামবাট মুখ আর দেমাকি বউ নিয়ে ঘুরে বেড়াতে তোমার কেমন লাগবে? আর যদি মেয়ে হও, দেমাকি মুখ আর গামবাট বর নিয়ে…?

বাইট দেবে তারা জানি। দিয়েছেও। আমি সমস্ত রকম সম্ভাবনার বাইট নিয়ে থাকি। তা সে রক্তমাংসের হোক বা নাই হোক। পয়সা পাই এর জন্য। ‘হোকপসিবল্’ চ্যানেল আমাকে ফুল ইকুয়িপমেন্টস আর ফ্রিডম দিয়ে রেখেছে এর জন্য। যেমন আজ। ওই বসিরহাট না আজিমগঞ্জের লোকটা। ও আমার সাবজেক্ট নয়। আমার সাবজেক্ট ওই ট্রাংকটা। ওই ফিকে হয়ে আসা সেভেন-আপের বোতলের মতো সবুজ ট্রাংক। গত এগারো বছর ধরে বইমেলায় আসতে আসতে যে নিজেই একটা চলমান বইমেলা হয়ে উঠেছে। হয়ে উঠেছে কথার পাহাড়। কত কথা যে জমে আছে ওর পেটে। আড়াই ঘন্টার স্লট রাখা হয়েছে ওর জন্য। পিক টাইমে। ব্রেক আর ফোন-কলস্ নিয়ে সিরিয়ালি একঘন্টা করে তিনদিন। টিআরপি বাড়ানোর জন্য উঠেপড়ে লেগেছে চ্যানেল।

হাতের সামান্য দু-চারটে ক্যারিকেচারে সে দেখিয়ে দেয় বাংলাভাষার ভবিষ্যৎ

দাশদা পই পই করে বলে দিয়েছিল চাকরির শুরুতে, তোমার সাবজেক্ট কিন্তু বর্তমান নয়, তোমার সাবজেক্ট ভবিষ্যৎও নয়, তোমার সাবজেক্ট হল ভবিষ্যতের সম্ভাবনা। কী হবে তা নয়, কী হতে পারে। এটাই হল চ্যানেলের পলিসি। আর এখানেই অ্যাস্ট্রোলজির চ্যানেলগুলোর সঙ্গে আমাদের পার্থক্য। আমরা কোনও গ্রহরত্ন দিই না। নিদান হাঁকি না। লোকের পকেট কাটি না। লোকে যেন ভবিষ্যতে মিলিয়ে দেখতে পারে আমরা কতটা ঠিক ছিলাম। আমি মাইক্রোফোন বার করি।

—কদ্দিন আসবেন আর মেলায়?

ট্রাংকটা উসখুস করে ওঠে একটু। কী বলে বোঝা যায় না।

—এই লিটল ম্যাগ প্যাভটা কি উঠিয়ে দেওয়া হবে নেক্সট টেন ইয়ারসে?

ট্রাংক কান চুলকোয়। কানের পাতার রং উঠে যায় একটু।

—ময়দান, সল্টলেক, মিলন, এরপর কোথায়? নেচার-লাভাররা যে এখানেও ক্যাওড়া-কেত্তন করবেন না—তার গারান্টি কী?

ট্রাংক যেন আমার কথা শুনতেই পাচ্ছে না। টিআরপি পড়ছে হুড়মুড় করে, দেখতে পাচ্ছি। মরিয়া হয়ে জিজ্ঞেস করি, বাংলা লিটরেচার কোনদিকে যাচ্ছে মশাই?

একচোখে আমাকে দেখে নিয়ে এবার মুখ খোলে সেই বাপ-পিতিম্মোর আমলের মনখারাপ কালারের ট্রাংক—

—কোনও বোবা আর ছিটিয়াল লোককে মুদিখানা থেকে পাঁচশো-এক বার সাবান কিনতে দেকেচ? এই দ্যাকো।

হাতের সামান্য দু-চারটে ক্যারিকেচারে সে দেখিয়ে দেয় বাংলাভাষার ভবিষ্যৎ।

mitul@gmail.com'
mitul@gmail.com'

Latest posts by মিতুল দত্ত (see all)