হোম গদ্য ফেবল-প্যারাবল এবং কাফকা-থার্বারের এলিগরিক্যাল পাঠ

ফেবল-প্যারাবল এবং কাফকা-থার্বারের এলিগরিক্যাল পাঠ

ফেবল-প্যারাবল এবং কাফকা-থার্বারের এলিগরিক্যাল পাঠ
327
0

কথারূপক বা ফেবল ও উপরূপক বা প্যারাবল

ফেবল ও প্যারাবল লোকজসংস্কৃতি বা ওরাল ট্রাডিশন থেকে এসেছে। ফেবল হলো সংক্ষিপ্ত ও সরল গদ্যে কোনো গল্প উপস্থাপন করা, যার অবশ্যই একটা নৈতিক শিক্ষা থাকবে। এবং ফেবলের চরিত্র হবে পশুপাখি, জীবজন্তু, গাছপালা বা প্রাণহীন কোনো বস্তু। তাদের বিভিন্নভাবে পারসনিফাইড বা মানবিক গুণসম্পন্ন করে উপস্থাপন করা হবে। ঈশপের গল্পগুলো ফেবলের উপযুক্ত উদাহরণ। অন্যদিকে প্যারাবল হলো, অনুরূপ সংক্ষিপ্ত সরল ফিকশন; যেখানে নৈতিক শিক্ষা থাকবে। এখানে মোটাদাগে ফেবলের সঙ্গে প্যারাবলের পার্থক্য হলো, ফেবলে সরাসরি হিউমান বা মানবচরিত্র থাকে না, কিন্তু এখানে থাকে। প্যারাবলের উৎকৃষ্ট উদাহরণ হলো জর্জ ওরওয়েলের এনিমাল ফার্ম। এখানে জীবজন্তুর পাশাপাশি মানুষও গল্পের চরিত্র হিশেবে উপস্থাপিত হয়েছে। কাফকা ও বোরহেসও বেশ কিছু প্যারাবল লিখেছেন। মহাভারত এবং বাইবেল হলো প্যারাবলের আদি উৎস।


কাফকার প্যারাবল ‘আইনের দরজায়’

প্যারাবলের যথার্থ উদাহরণ হলো ফ্রানৎস কাফকার ‘আইনের দরজায়’ গল্পটি। বিংশ শতকের সবচেয়ে প্রভাবশালী লেখক ফ্রানৎস কাফকা। শেকসপিয়ারের পরে বিশ্ব সাহিত্যে কাফকার ওপর সবচেয়ে বেশি গবেষণা করা হয়েছে। অথচ তার রচনাসম্ভাব খুবই সীমিত। তাও আবার তিনি তার সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধুকে তার মৃত্যুর পর পুড়িয়ে ফেলবার অনুরোধ করেছিলেন। আমাদের সৌভাগ্য যে সেই বন্ধুটি কাফকার শেষ ইচ্ছাটা রাখতে পারেন নি। কাফকা বড়গল্পের পাশাপাশি বেশকিছু প্যারাবল রচনা করেছেন। ‘বিফোর দ্য ল’ বা ‘আইনের দরজায়’ গল্পটি কাফকার দ্য ট্রায়াল উপন্যাসে আছে। উপন্যাসের মূল চরিত্র কে প্রিস্টকে গল্পটি শোনায়। আইনের দরজায় প্যারাবলে একটি লোক জ্ঞান অর্জন করতে চায় এবং আইনের কাছে আসতে চায়। কিন্তু আসতে দেওয়া হয় না। সে অপেক্ষা করতে করতে মারা যায়। মারা যাওয়ার আগে জানতে পারে, আইনের এই দরজাটি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে কারণ এটি শুধু তার জন্যেই বানানো ছিল। এই হলো আপাত গল্পটা। প্যারাবল সব সময় আপাত গল্পের ভেতর অন্য একটা গল্প লুকিয়ে রাখে। এই গল্পতেও সেটা আছে। গল্পের প্রধান দুটি চরিত্র হলো দারোয়ান ও গ্রাম থেকে আসা একটি লোক। এখানে আইনকেও আমরা একটি চরিত্র হিশেবে বিবেচনা করতে পারি। এখন এই তিন চরিত্রকে আমরা অ্যালিগরিক্যাল বা রূপক ধরে নিয়ে ভিন্ন কতগুলো সিদ্ধান্তে আসতে পারি। একধরনের ব্যাখ্যা আমরা দ্য ট্রায়াল উপন্যাসে কে এর সার্বিক অবস্থা বিশ্লেষণ করে করতে পারি। কে-কে একদিন পুলিশ এসে ধরে নিয়ে যায়। কে তার অপরাধ জানে না। তাকে পুলিশ ধরে নিয়ে যাওয়া পর নিজের অপরাধের সন্ধান চালাতে হয়। তাকে তার জন্য নির্ধারিত আইনের দরজায় যেতে হয়।


আইনের কাছে পৌঁছানোর পথ হলো আইন অমান্য করা! এটাই এই গল্পের আয়রনি।


সাধারণভাবে আমরা গল্পটিকে একটি রাজনৈতিক-সামাজিক অ্যালিগরি হিশেবে ভাবতে পারি। আমাদের শেখানো হয়, আইনের দরজা সবসময় খোলা, সকলের সমান অধিকার সেখানে। বিচারকের পেছনে এর প্রতীক হিশেবে দেখা যায়, একটি দাঁড়িপাল্লা ধরে আছে চোখবাঁধা এক ব্যক্তি। দাঁড়ির পাল্লা দুইদিকে সমান। অর্থাৎ আইন কোনো মানুষ দেখে বিচার করে না। সবাই তার কাছে সমান। কিন্তু বাস্তবজীবনে আমরা ঠিক তার উল্টোটাই ঘটতে দেখি। ক্ষমতাসীন ব্যক্তিরা সবসময় আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে মুক্তি পেয়ে যায়, আর নিরাপরাধ অসহায় ব্যক্তিরা দিনের পর দিন আইনের পথে হেঁটে পায়ের জুতো ক্ষয় করে ফেলে। এই গল্পেও সেটা হয়েছে। গ্রামের মানুষটি জানত আইনের কাছে সবার সবসময় যাওয়ার অধিকার আছে। কিন্তু সে আইনের দ্বারমুখে আটকে যায়। এখানে প্রবেশ করতে হলে শক্তি নিয়ে প্রবেশ করতে হবে। এক একজন দারোয়ান বসে আছে, হয় তাদের খুশি করে নয়তো পরাজিত করে আইনের কাছে যেতে হবে। অর্থাৎ আইনের কাছে পৌঁছানোর পথ হলো আইন অমান্য করা! এটাই এই গল্পের আয়রনি।

এর সঙ্গে অস্তিত্ববাদী চেতনাও জড়িত। গল্পটি মুক্তচেতা বা ফ্রি উইলের ওপর জোর দিয়েছে। একজন ব্যক্তি তার নিজের ভবিষ্যতের জন্যে নিজেই দায়ী। আইনের দরজায় গল্পটি যে জিনিসটির প্রতি ইঙ্গিত দেয় সেটা হলো, উদ্দেশ্যহীন জীবন নিরর্থক বা অযৌক্তিক। গল্পে গ্রাম থেকে আসা লোকটির ওপর সিদ্ধান্ত নেয়ার ভার চাপিয়ে দেওয়া হয়—হয় সে অপেক্ষা করবে নয় সে দরজার ভেতর প্রবেশ করবে। লোকটি অপেক্ষা করার সিদ্ধান্ত নেয়। এ থেকে তার সিদ্ধান্ত না নিতে পারার কারণে জীবনটি অর্থহীনভাবে কেটে যায়। তার মৃত্যুর পর দরজাটি বন্ধ হয়ে যায়। অর্থাৎ পৃথিবীতে প্রতিটা ব্যক্তির জন্যে একটা মুক্তির পথ থাকে, সেটা তাকে বেছে নিতে হয়। কষ্ট শিকার করে অর্জন করতে হয়। নিজের অদৃষ্টের দিকে তাকিয়ে থেকে অনিবার্যভাবে মুক্তি আসবে না।


জেমস থার্বারের ফেবল ‘খরগোশ, যারা সকল সমস্যার কারণ ছিল’

অন্যদিকে জেমস থার্বারের ‘খরগোশ, যারা সকল সমস্যার কারণ ছিল’ (১৯৩৯) গল্পটি আধুনিক ফেবল। এই গল্পের চরিত্ররা হলো খরগোশ, নেকড়ে ও প্রতিবেশী অঞ্চলের জীবজন্তু। লেখক মানবজগতের কোনো বিশেষ বিষয় বা দিক তুলে আনতে এ ধরনের গল্প লিখে থাকেন। সাধারণত এ ধরনের গল্প শিশুদের জন্য লেখা হয়ে থাকে। তবে বড়দের জন্যও কেউ কেউ ফেবল লিখে থাকেন। যেমনটি জেমস থার্বার করেছেন। সমাজ বা রাষ্ট্রের কিছু বিষয় সমালোচনা করার জন্যে প্রতীকী উপস্থাপনের পথ বেছে নেন। এর কারণ, চাইলেও অনেক সময় সরাসরি অনেক কথা বলা যায় না।

জেমস থার্বার ছিলেন জনপ্রিয় মার্কিন কার্টুনিস্ট, নাট্যকার ও কথাসাহিত্যিক। পেশায় সাংবাদিক। জন্ম ১৮৯৪ সালে এবং মৃত্যু ১৯৬১ সালে। নিউইয়র্কারে প্রকাশিত ছোটগল্প দিয়ে থার্বার জনপ্রিয়তা অর্জন করেন। তার সময়ে তাকে মানা হতো অন্যতম রসিক লেখক হিশেবে। রসবোধটা থার্বার তার মায়ের কাছ থেকে শেখেন। নিজের মাকে থার্বার ‘বর্ন কমেডিয়ান’ বলে মনে করতেন।

ফেবলের সবসময় একটা নীতিবাক্য বা মোরাল থাকে। এ গল্পের মোরালে বলা হয়েছে—run, not walk, to the nearest desert island|

গল্পটির আরো অনেক অন্তর্নিহিত অর্থ আছে। প্রথমেই রাজনৈতিক এলিগরি হিশেবে আমরা এটিকে বিশ্লেষণ করতে পারি। এটি লেখা হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রাককালে। গল্পকার থার্বার হয়তো খরগোশ বলতে জার্মানির ইহুদিদের বুঝিয়েছেন। আর নেকড়েরা হলো নাজি। কিংবা খোরগোশদের সঙ্গে উনিশ শততে আমেরিকার রেড ইন্ডিয়ানদের তুলনা চলে। ক্ষমতাসীনরা হলো নেকড়ে। আরও ব্রডভাবে বিশ্বের যে কোনো সম্প্রদায়ের সংখ্যালঘুর অবস্থাকে খরগোশের অবস্থার সঙ্গে তুলনা করা যায়। আর সংখ্যাগুরুরা হলো নেকড়ে।

সম্প্রতি, মায়ানমারে রোহিঙ্গাদের অবস্থা আমরা জানি। তাদের নানা অজুহাতে শেষ করে দেওয়া হচ্ছে। রোহিঙ্গারা সমস্যার সমাধানে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলো ও জাতিসংঘের দ্বারস্থ হয়েছে। সবাই যুৎসই সমাধানের আশ্বাস দিয়েছে। মায়ানমারের ওপর চাপও সৃষ্টি করা হয়েছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছু হয় নি। মাঝখান থেকে রোহিঙ্গারা জাতিগতভাবে বিলুপ্তের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বাংলাদেশে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়রা নানাভাবে অবহেলিত ও নৃশংসতার শিকার হয়ে সংখ্যায় বহুগুণে কমে গেছে। এই গল্পে বলা হয়েছে, পলাতকদের জন্যে এ পৃথিবীতে কোনো স্থান নেই। এটি ঐতিহাসিক সত্য। রোহিঙ্গারা যদি কোথাও পালিয়েও যায়, তাদের অবস্থা একই হবে। ইনফ্যাক্ট, বাংলাদেশে পালিয়েও এসেছে রোহিঙ্গাদের একটা উল্লেখযোগ্য অংশ। বাংলাদেশ সরকার তাদের ফেরত পাঠানোর জন্যে জোর চেষ্টা চালিয়ে আসছে। যারা এখানে জোর করে আবাস গাড়ার চেষ্টা করছে তারা প্রতিনিয়ত স্থানীয়দের হাতে নির্যাতিত হচ্ছে।


সংখ্যালঘুদের পৃথিবী এটি না, কারণে-অকারণে তাদের নাশ হবে—এ কথা আর নতুন কথা নয়।


গল্পটিকে আমরা বর্তমান মার্কিন আগ্রাসনবাদের রূপকগল্প বা এলিগরিক্যাল টেল হিশেবেও দেখতে পারি। আমেরিকা বিভিন্ন অজুহাতে আফগান-ইরাকে হামলা চালিয়েছে। অনন্যা দেশ এর উপযুক্ত কারণ আমেরিকার কাছে চেয়েছে। আমেরিকা জানিয়েছে, তারা বিশ্বের ভালোর জন্যেই সন্ত্রাস নিধনে নেমেছে। খোরগোশদের ধরে নিয়ে যাওয়ার সময় নেকড়েরা যেভাবে বলেছে যে খোরগোশদের ভালোর জন্যে তাদের ধরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে; তেমনি করে আফগান-ইরাকি-পাকিস্তানি জনগণকে মার্কিন প্রশাসন বোঝাচ্ছে যে তারা কাড়ি কাড়ি টাকা খরচ করে যে ড্রোন হামলা কিংবা সামরিক হামলা চালাচ্ছে এটা আসলে স্থানীয়দের মঙ্গলের জন্যেই। কেউ মানছে, কেউ মানছে না। এই মানা, না-মানা মার্কিন আগ্রাসী চেতনাসংশ্লিষ্ট কোনো বিষয় না। তারা শত সমালোচনার মাঝেও হামলা ঠিকই চালিয়ে আসছে। ভূমিকম্প, কিংবা বন্যার মতো প্রাকৃতির দুর্যোগের জন্যে পৃথিবীর সবচেয়ে নিরীহ প্রাণী খরগোশকে দায়ী করা হয়েছে। এটা আবসার্ড, আমরা জানি। কিন্তু তবুও প্রতিবার বলা হয়েছে— ‘সবাই জানে যে, যারা গাজর কুরে কুরে খায় এবং যাদের বড় বড় কান আছে তাদের কারণেই বন্যা হয়।’ অর্থাৎ ঘোষণার মধ্যেই বলে দেওয়া হচ্ছে যে, তুমি মান আর না মান, বিষয়টা সবাই জানে! এখানে একটা মিথ্যেকে সত্য বলে চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। আমেরিকাও নানাভাবে কাজটি করে চলেছে।

এই মিথ্যেকে চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতাটি আমাদের দেশের প্রতিটা রাজনৈতিক দলের মধ্যে দেখা যায়। যখন হরতাল ডাকা হয়, তখন বলা হয়—এটা জনগণের দাবি। আবার যখন, হরতাল কিংবা আন্দোলনে গুলি করা হয়, তখনও বলা হয়—এটি জনগণের দাবি। অর্থাৎ জনগণ কী বলল, কী বলল না সেটি বিবেচ্য বিষয় নয়। রাজনৈতিক দলগুলোর ইচ্ছাটাকে এভাবেই জনগণের দাবি বলে জোর করে প্রতিষ্ঠিত করা হচ্ছে।

গল্পটিকে সামাজিক-ধর্মীয় এলিগরি হিশেবেও দেখার সুযোগ আছে। পৃথিবীর বহু ধর্ম ও ক্ষুদ্র ভাষাভাষী নৃগোষ্ঠী খরগোশদের মতো কালের অতল গহ্বরে হারিয়ে গেছে। প্রতিদিন একটু একটু করে আরও অনেক জনগোষ্ঠী বিলুপ্তির পথে এগিয়ে চলেছে। সংখ্যালঘুদের পৃথিবী এটি না, কারণে-অকারণে তাদের নাশ হবে—এ কথা আর নতুন কথা নয়।

মোজাফফর হোসেন

জন্ম ২১ নভেম্বর; ১৯৮৬।

শিক্ষা : ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতকোত্তর।

পেশা : কর্মকর্তা, বাংলা একাডেমি।

দ্বিধা [গল্প; অন্বেষা ,২০১১]
আদিম বুদবুদ অথবা কাঁচামাটির বিগ্রহ [গল্প; রাত্রি, ২০১২] বিশ্বগল্পের বহুমাত্রিক পাঠ [অনুবাদ ও আলোচনা গ্রন্থ; অনুপ্রাণন, ২০১৩]
আলোচনা সমালোচনা [প্রবন্ধ; ২০১৪, অনুপ্রাণন প্রকাশনী]
অতীত একটা ভিনদেশ [গল্প; ২০১৬, বেহুলা বাংলা] বিশ্বসাহিত্যের নির্বাচিত প্রবন্ধ [সম্পাদিত গ্রন্থ; দেশ, ২০১৭]

ই-মেইল : mjafor@gmail.com