হোম গদ্য ফল্গু বসু : একজন প্ররোচক অশ্বারোহী

ফল্গু বসু : একজন প্ররোচক অশ্বারোহী

ফল্গু বসু : একজন প্ররোচক অশ্বারোহী
1.01K
0

আমাদের সদ্যই ছেড়ে চলে গেলেন প্রিয় কবি ফল্গু বসু। পশ্চিম বাংলার সত্তর দশকের কবি তিনি। পরস্পরের পাঠকের স্মৃতিতে উজ্জ্বল ‘তীব্র ৩০’-এ মুদ্রিত তার কবিতাগুচ্ছ। আরও বহু আলোকণা ছড়িয়ে আছে তার সাতটি প্রকাশিত কবিতার বইতে। কবিতাকে সাথে নিয়ে বেঁচেছেন ফল্গু বসু। পাঠক তার কবিতাকে নিয়ে বাঁচবে। কবির প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে তাকে নিয়ে পরস্পরের পাঠকদের জন্য লিখেছেন কবি শামশাম তাজিল

                                                                                                                   তানভীর মাহমুদ


জীবন এমনই বুঝি, রাতে বৃষ্টিতে কাকভেজা হয়ে ঘরে ঢুকেই শুনেছি ফুফুর মৃত্যুর সংবাদ। আব্বার মন খারাপ। শরীরও খারাপ বেশ কিছুদিন ধরেই। আমি আব্বার সঙ্গে কথা বলি নি। বলতে পারি নি। যেকোনো দুঃসংবাদে আমি চুপ হয়ে থাকি। কান্নার স্বভাব আমার সারা জীবনেরই। বড় হয়ে গেছি, তাই মানুষের সম্মুখে কাঁদা যায় না। আর তা অনুচিতই মনে করি। বেদনা একাই সইতে হয়। আনন্দ ভাগাভাগি করার ব্যাপার। বেদনা আড়াল করার।

এতসব কথার কারণ রয়েছে। কবি ফল্গু বসু আজ মারা গেছেন। কবির সাথে অদ্ভুত একটা সম্পর্ক ছিল। উনার কবিতা ফেসবুকেই প্রথম পড়ি। রিকুয়েস্টও পাঠাই। তিনি তা গ্রহণও করেন। ধীরে ধীরে সম্পর্ক গাঢ় হয়। ইনবক্সে অনেক কথা হতে থাকে। তিনি তার পূর্ব-পুরুষদের গল্প করেন। নরসিংদীতে একটা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চাকরি করি তখন। নরসিংদীর কথা শুনে—বুঝতে পারি—তার ভেতর হাহাকার জেগে ওঠে। তার মামা বাড়ি ছিল নরসিংদীর মাধবদীতে। তিনি তাদের কথা বলতে থাকেন :

মায়ের কাছে নরসিংদীর অনেক কথা শুনেছি। আমার কাছে নরসিংদী নরসিংহদিয়া। আমি জীবনে কখনো বাংলাদেশে যাই নি… আমাদের বাড়ি ছিল বিক্রমপুর মানে মুন্সিগঞ্জের রাউথভোগ গ্রামে। আমার কাকার নাম ছিল বিনয়কৃষ্ণ বসু। ১৯৩০ সালে রাইটার্স বিল্ডিংয়ে বাদল, মানে সুধীরগুপ্ত এবং দীনেশগুপ্তের সঙ্গে ঢুকে তিনি প্রচণ্ড গণ্ডগোল করেন। তারপর নিজের মাথায় গুলি করেন। তাও মারা যান নি। শেষে মাথার ব্যান্ডেজ খুলে আঙুল দিয়ে ঘিলু নাড়িয়ে দেবার পর তিনি মারা যান। ১৯৩৫ সালে আমরা দেশ ছেড়ে কলকাতায় চলে আসি। আমার জন্ম ১৯৫৬ সালে। এখন সাতান্ন চলছে। একবার খুব ইচ্ছে হয় বাংলাদেশে ঘুরে আসতে। জানি না মৃত্যুর আগে একবার দেশে আসতে পারব কিনা।

তিনি বলতে থাকেন তার পূর্ব-পুরুষদের কথা। আমি তাকে বুঝতে চেষ্টা করি। তার জায়গাতে নিজেকে ভাবি। তিনি আলাপের ভেতর একবারও রাজনীতি নিয়ে কথা বলেন না, শুধু তথ্য দিয়ে যান। অথচ তিনি রাজনীতির মানুষও।


কবির কবিতার সঙ্গে যতই পরিচিত হতে থাকি, বুঝি, তিনি এমন এক ঘোড়সওয়ার যার লক্ষ্য আপাত নির্ধারিত নয়। তাতে যা ঘটে তা হলো, ভ্রমণ শেষ হয় না। যে রাস্তায় তিনি চলেন তা সোজাই, কিন্তু তার শেষ সীমায় দিগন্তের দেখা মেলে না।


সত্তর দশকের পশ্চিম বাংলার এই কবি নকশাল আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। আজ রাজনীতির কথা থাক। ব্যক্তিগত আলাপের প্রসঙ্গও তুলে রাখছি অন্য সময়ের জন্য। তার কবিতার কথাই হোক। তাকে পড়তে গিয়ে এক অপরিচিত রাস্তার সন্ধান পাই। কিন্তু কোনো গন্তব্য মেলে না। তাতে কোনো অসুবিধা হয় না, গন্তব্যহীন পথ চলার যে আতঙ্ক ও আনন্দ তা যুগপৎ পেতে থাকি। আর এইটুকু উপলব্ধি করি, বাস্তবতা সকল সময় ভাষাসূত্রে প্রতিফলিত হয় না। মাঝে মাঝে ভাষা থেকেও বাস্তবতা উৎপন্ন হয়। তার কবিতার ভাষা যে জগৎ সৃষ্টি করেছে সে সম্পর্কে তাকে একবার জিজ্ঞাসা করেছিলাম, সকল কবিতা তো বুঝে উঠতে পারি না। তিনি সোজা কোনো উত্তর দেন নি। শুধু বলেছিলেন, কবিতাতেই মনোনিবেশ করার জন্য। আর ধীরে ধীরে আমিও উপলব্ধি করি, কবিতাই কবিতাকে বুঝিয়ে দেবে। কারণ কবিতা নিজেই সম্পূর্ণ এক ভাষা।

কবিতার ভূগোল কবির মনোজগৎ। বহির্জগৎ তাকে কেবল বেঁচে থাকার অনুষঙ্গ জোগায়। কিন্তু আদতে তিনি বসবাস করেন অন্তর্জগতে। কবিতা তার অন্তর্জগৎকে প্রতিফলিত করেন! তার উপলব্ধির উন্মোচন ঘটে ভাষার মধ্য দিয়ে। সে ভাষা প্রথাগত ভাষাশৃঙ্খলাকে বিপর্যস্ত, যুক্তিহীন করে দেয়। তবে সেটা অযৌক্তিকও নয়। সেটা অপর-শৃঙ্খলা। হয়তো আমাদের কাছে অপরিচিত। তাতে করে তার গুরুত্ব কমে না, বরং অপরিচিতের সঙ্গ পাওয়া যায়। আর অপরিচয়ের ভেতরেও ঘটে তুমুল সংবেদনার উদ্ভাস।

তিনি বলেন :

খোঁজ নিয়ে জানা গেল দক্ষিণের
লোক উর্বশীর হাট দেখে চমকে গিয়েছে
ভেবেছে সত্যিই হাট, নিজেদের সাথে
নিজেদের লীলাবন বুঝতে পারে নি।

নিজের সঙ্গে নিজের বোঝাপড়া খুব সহজ নয়। কারো কারো সারাটা জীবন কেটে যায়। নিজেকে বোঝা হয়ে ওঠে না। আত্মগত সত্যতা আর বস্তুবিশ্বের সূত্রবদ্ধ সত্যতার ফারাক জানা হয় না সকল সময়।

ধারণার চিত্ররূপ দেখে অনেক সময় খুব
ভয় পাই, ক্লান্ত হই, উদ্দেশ্য বিধেয়
কিছুই বুঝি না।

খালি বাটি উল্টো করে হাওয়া ফেলে দিই
কেউ দ্যাখে কেউ দেখেও দ্যাখে না।

এই যে পরিচিত ভাষার ভেতর দিয়ে এগিয়ে চলা তাতে চলতে গিয়ে হোঁচট না খেলেও বুঝতে পারি—সবকিছু বোঝা সহজ নয়। এবং এক নান্দনিক দুর্বোধ্যতা প্রতি মুহূর্তে প্রসারিত করেই চলে চিন্তার বিপর্যয়। সেটা ফল্গু বসুর ‘যুগলসেতু’ কবিতার শেষে অপরিমেয়ভাবেই ধরা দেয়।

অনুভবপত্রে লেখা… বন্ধুরা অনেকে একান্তই
বন্ধুদের জন্য
মনে মনে রণবীর সেনা পুষে রাখে।

এইসব সাংঘাতিক সহজ চিন্তারাশি অতর্কিতে পাঠকের মনে আঘাত করে। মগজে পাঠায় নিগূঢ় সাংকেতিক সফরের আয়োজন। তখন পাঠক ভ্রমণোন্মুখ হয় এমন কবিতারাজ্যে যা কেবল ভ্রম বাড়ায় বৈ কমায় না। এই কবির কবিতার সঙ্গে যতই পরিচিত হতে থাকি, বুঝি, তিনি এমন এক ঘোড়সওয়ার যার লক্ষ্য আপাত নির্ধারিত নয়। তাতে যা ঘটে তা হলো, ভ্রমণ শেষ হয় না। যে রাস্তায় তিনি চলেন তা সোজাই, কিন্তু তার শেষ সীমায় দিগন্তের দেখা মেলে না। তখনই ঘটে বিপত্তি। একই শব্দ নানা অর্থব্যঞ্জনা নিয়ে হাজির হয়। আর কে না জানে কবিতার শক্তি তার অর্থমুক্তিতেই। তবু তা নিরর্থক নয়। বস্তুর এই অর্থময়তা সাধারণত স্বতঃসিদ্ধ মনে করা হয়—জগৎ তেমনই যেরূপে তাকে প্রত্যক্ষ করি, কবিতা তেমন নয়। আমাদের অনুসন্ধিৎসু মনের অন্বেষার শেষ নাই। কবিমাত্রেই এই কথা জানেন। তাই কবির সংযম শব্দ ব্যবহারে সীমাবদ্ধ হলেও চিন্তায় নয়। তাই ‘গমনবৃত্ত’ কবিতায় আমরা দেখি—

… অভিজ্ঞতা ব্যবহারে যন্ত্র
নিরুপায়। কেবল পিপাসার পেছনে বেশ দ্রুত
বয়ে চলে ঠান্ডা পরিচয়ের আবহমান স্রোত।
ভবানীপুরের নীল ঘোড়া এঞ্জিনের কাছে এসে
আচমকা থমকে দাঁড়ায়। তারপর তীব্রগতি
আকাশছায়াকে অনুমান করাও এখন স্পষ্টত দুরূহ।


কবিতা জীবনের ‘ভ্রমণকথা’র উষ্ণ উপত্যকায় বৃষ্টি নামার গান।


মানুষ সামঞ্জস্যতা খোঁজে। কবি খুঁজেন এমন এক শব্দভঙ্গিমা যা তার ভেতরকে প্রকাশ করতে সহায়তা করে। কেবল প্রকাশে তার অন্বিষ্ট নয়। তিনি সমাহিতির নির্মাণও করেন। কেবল খুঁজে নেওয়াতে তার আনন্দ নাই। তার আনন্দ সৃষ্টিতে। তাই আপন ভাষাভঙ্গিমা নির্মাণের ভেতর দিয়েই কেবল পেতে পারেন অগম্য গন্তব্য। তখনই তিনি পান স্বস্তি। আর পাঠকের মেলে পাঠমাধুর্য।

তিনি লেখেন—

পুনর্বাসনের আগে একবার অসম্ভব দেখে যাব
ঝড় নিয়ন্ত্রণ হয় নিজের ইচ্ছায়। চেয়ে দেখি
চূড়ায় কঙ্কাল,কণা অব্দি ক্রোধ অবশিষ্ট নেই

ডানায় শস্যের শব্দ দৃষ্টিতে লবণ দেখে বুঝি
কৃষিকাজ জলভাত বলেই পাখির নাম প্রতিভা হয়েছে।

ভাব আর ভঙ্গি অন্তর্লীন চিন্তার পারস্পর্যে একাত্ম হয় ভাষার মারফতে। তাতেই মারফতি। তখন ভাষা থেকে চিন্তাকে আলাদা করা যায় না। আপাত বহু প্রসঙ্গ আর প্রসঙ্গহীনতা এক অনন্য দ্যোতনায় উৎকীর্ণ করে চলে কবির জগৎ। সে জগৎ নিয়ত ইশারা রেখে যায় শব্দের ঘরে ঘরে। পাঠক সেখান থেকে সংগ্রহ করে নিতে পারেন আপন অর্থব্যঞ্জনা। তাই তখন হয়ে ওঠে প্রাসঙ্গিক। সেই কথাই কবি বলে যাচ্ছেন। শুধু দেখে যাওয়াতে পাঠকের তৃপ্তি মেলে কিনা না জানলেও শুনি ফল্গু বসু লেখেন—

… দ্যাখো
এখনও লতাদের স্নান করাচ্ছে মেঘ, আমার স্বভাব নিয়ে দ্যাখো
অনিচ্ছে থাকলেও চোখ আর মন খোলা রাখলে তুমি ও আমি এক…

একজন পাঠক হিশেবে এখানেই কবিতার সঙ্গে একাত্ম হই। কবির সঙ্গেও! কবিতা নিয়ে এত কথা বলার কারণ কেবলই কি ফল্গু বসুর প্রতি মুগ্ধতা? এই জিজ্ঞাসা যদি কারো জাগে, তবে তার উত্তরে আই এ রিচার্ডের সঙ্গে একমত হয়ে বলতে হয়, ‘কবিতা আমাদের বাঁচানোর ক্ষমতা রাখে, সর্বৈব বিশৃঙ্খলা থেকে বাঁচবার নির্ভুলভাবে সম্ভাব্য উপায় হচ্ছে কবিতা।’ কবিতা জীবনের ‘ভ্রমণকথা’র উষ্ণ উপত্যকায় বৃষ্টি নামার গান।

যদিও কবি বলছেন, চোখ ও মন খোলা রাখলে—’তুমি ও আমি এক’—তবু এক নন। কবির মাহাত্ম্য—কবি প্রকাশ করতে পারেন; অকবিরা, যার অন্তর্ভুক্ত কবি ছাড়া সবাই, প্রকাশ করতে চান। মহাজগৎ কবিকে প্রকাশ করার দায়িত্ব দিয়েছে।

তা’ই শুনি—

শুনছি আদিগন্ত ঝড়ের অপ্রকাশ্য ভক্তিগীতি
আজন্মকাল তৈরি হওয়া সহজসাধ্য নয় যদিও
আকাশপত্রে নীলচে আভা অপ্রকাশ্য রীতিনীতি
ধরে থাকতে কষ্ট হলে আমায় বরং ত্রিশূল ধরার আদেশ দিয়ো।

কবি রাজনীতিক নন, তবে ফল্গু বসুর জীবনে রাজনীতি আত্যন্তিকভাবেই জড়িয়ে ছিল। কবিতায় তার প্রবণতা আইডোলজির প্রচার নয়। তিনি উচ্চকিত নন। অন্তর্লীনভাবে বয়ে চলা রক্তপ্রবাহের মতোই তিনি কবিতায় রাজনীতিক প্রসঙ্গ আনেন। তার স্বাভাবিকতা আর সহজতার জন্য তা ধরাই পড়তে চায় না যেন।

আগুননিঃশ্বাস থেকে নিজেকে বাঁচাতে ডুব দেবে
সমুদ্র কোথায়? লতাপাতা সাপ হয়ে গেল।
সারি সারি হেঁটে আসছে চন্দনভূমির লোকজন

অবস্থার চাপে পড়ে মানুষ কঠোর হলো আরো
দর্শক নির্বাক। যেন যুদ্ধের পরের কথা জানে
ভাঙা অস্ত্রে লেগে থাকে পিপাসার্ত নীল শস্যদানা।

সন্দেহ থেকেই শুরু… অবশেষে জানা গেল
আঙুল ছিল না যার সে শুধুই আংটি জমাত।

কবিতা সৃষ্টির মুহূর্তে নানা ঘটনা কবির মাথায় কাজ করে। কবি হয়তো দেখা যায় সেই ঘটনার প্রসঙ্গ উল্লেখ না করেই লিখে চলেছেন কবিতা। এইভাবে বাস্তবকে লুকিয়ে ফেলেন। সেটাই কবির যাপন। পাঠক এখানেই পেতে পারেন তার মতো ভাবার অবসর। কবি কোনো অর্থ চাপিয়ে দেন না। তাতে করে পাঠকের চিন্তা সক্রিয় হয়ে ওঠে।

লটারির টাকায় আচমকা পেয়ে যাওয়া
সূর্যের আটটা ঘোড়া নিয়ে
কী করব ভেবে পাচ্ছিলাম না।
সান্তনাদির ঘর তাক করে
ছুড়ে দিলাম একটা ঘোড়া
সান্তানাদি খুব চটপট ঘোড়াটাকে
লুকিয়ে ফেলল মেয়ের ফ্রকের ভেতর।


কবি ফল্গু বসুর কবিতা-শক্তি পাঠকের কাছে তেমন অভিনিবেশ দাবি করে। তিনি কবিতায় নৈরাজ্য সৃষ্টি করেন না। কিন্তু নীতি আর নিয়মের শৃঙ্খলা ভেঙেই তার পথপরিক্রমণ।


এই কবিতার থেকে লুকিয়ে ফেলা ঘোড়াকে উদ্ধারের মতোই অর্থোদ্ধার করার ভেতরই কবিতার শক্তি লুকায়িত। এখানেই পাঠক স্বাধীন। তবে এই স্বাধীনতার সুযোগ নিয়ে কবির বিরুদ্ধে দুর্বোধ্যতার অভিযোগ আনার চেষ্টা নেহায়েত বোকামি। কারণ আধুনিক কবিতা পাঠের অলিখিত শর্ত প্রাক-প্রস্তুতি মানে কবিতার গভীরতা উপলব্ধির জন্য প্রয়োজন অভিনিবেশ।

কবি ফল্গু বসুর কবিতা-শক্তি পাঠকের কাছে তেমন অভিনিবেশ দাবি করে। তিনি কবিতায় নৈরাজ্য সৃষ্টি করেন না। কিন্তু নীতি আর নিয়মের শৃঙ্খলা ভেঙেই তার পথপরিক্রমণ। তার কবিতার সারল্যও আমাদের ভাবিয়ে তোলে। তা বহন করে কবির প্রজ্ঞা। রচিত হয় উজ্জ্বল সব পঙ্‌ক্তিমালা।

চলুন তেমনি এক রূপস্নিগ্ধ কবিতা ‘মানসাঙ্ক’ পাঠ করি—

ভেবেছিলাম রামকৃষ্ণের ব্রহ্মদারুতেও আগুন লাগাব
কেন ভেবেছিলাম সে কথা আপাতত থাক, বরং
বলি… বৃষ্টির গণিত সযত্নে শিখেও
আমার মেজদা অসুস্থ লিভার নিয়ে
ভুগেছে অনেক।

লিখতে বসে তোমার মুখ মনে পড়ার কারণ
জানাশোনা মেয়েদের মধ্যে একমাত্র
তুমিই উলু দিতে পারো। অথচ জানো না
উটমার্কা দেশলাই তুমি
পছন্দ করো না শুনে মরুভূমি সজোরে হেসেছে।

এই কবিতা যখন সারল্যের উদাহরণ হয়ে আসে তখন আমাদের মাথায় কাজ করে ‘অশ্বারোহী ‘কবিতার শেষ স্তবক। যেখানে তার ঘোড়া দ্রুত বেগে ধাবমান। সে ধাবমানতা ইতিহাসের এক গুরুত্ববহ ঘটনাকে স্মরণ করিয়ে দেয় যেখানে ফাঁসির সময় পার হয়ে যাচ্ছে বলে ক্ষুদিরামকে দেখি শশব্যস্ত। আমরাও কবির সাথে সে মঞ্চের দিকে এগিয়ে যাই। তার প্ররোচিত পথে, দেখি আমাদের আগে আগে যাচ্ছে এক অশ্ব। যার নাগাল পেতে আমাদেরকে পাঠ করতে হয় ফল্গু বসুর কবিতা। সে কবিতা প্ররোচনা আর প্রণোদনায় সমান দক্ষ, কবিতাই ফল্গু বসুর কাঙ্ক্ষিত নকিব।

শামশাম তাজিল

জন্ম ১ এপ্রিল, ১৯৮৪; বি-বাড়িয়া, চট্টগ্রাম।

শিক্ষা : ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতকোত্তর, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

পেশা : একটি বেসরকারি কলেজে প্রভাষক হিশেবে কর্মরত।

প্রকাশিত বই :
আদম পাহাড় [কবিতা, তিতাসনামা, লিটলম্যাগাজিন, ২০১৬]

ই-মেইল : shamshamtajil@gmail.com