হোম গদ্য প্রুফ্রক ও পাউন্ড

প্রুফ্রক ও পাউন্ড

প্রুফ্রক ও পাউন্ড
1.28K
0

১৯১৪ সালের আগস্টে, যুদ্ধের মাসে যুক্তরাজ্যে আসেন এলিয়ট। ২৫ বছর বয়সে। হার্ভার্ড থেকে মেরটন কলেজে ১ বছরের বৃত্তি নিয়ে পড়তে আসা এলিয়টের কাছে লন্ডন এক নতুন দেশ। দর্শনের ছাত্র এলিয়ট এখানে নবাগত। প্রবাস তার কাছে নতুন কিছু নয়। মাতৃভূমি আমেরিকা ছেড়ে পড়াশোনার সূত্রে থেকেছেন প্যারিসে। ঘুরে বেড়িয়েছেন ইউরোপের শহর বেলজিয়াম, ইতালি, জার্মানিতে। আধুনিকতার প্রাণকেন্দ্র, শিল্পের শহর প্যারিস থেকে আসার পর প্রথমে ভালো লাগে নি লন্ডনের পরিবেশ। বোদলেয়ারের প্যারিসের মতো লন্ডনকেও মনে হয়েছে অবাস্তব নগর।

এলিয়ট লন্ডনে আসার মাসেই শুরু হয়ে গেছে প্রথম বিশ্বযুদ্ধ। লন্ডন হারিয়েছে তার স্বাভাবিক জীবনযাত্রা, চিরায়ত অবয়ব। সমর্থ পুরুষ, যুবকেরা যোগ দিয়েছে যুদ্ধে। শহরে শুধু নারী, শিশু আর বৃদ্ধরা। পথে পথে এলিয়টের দেখা হয়েছে এমন সব মানুষের সাথে যারা বৃদ্ধ, অসমর্থ, বিকলাঙ্গ। নাগরিকদের চোখেমুখে যুদ্ধের আতঙ্ক, অনিশ্চয়তা। ইউরোপ থেকে লন্ডনে আসার পথে জার্মানিতেও দেখে এসেছেন মানুষের অসহায়তা, সম্পর্কের মানবিক সংকট। যুদ্ধে যাওয়ার আগে মা তার পুত্রকে বিদায় জানাচ্ছেন। রেল স্টেশনে স্ত্রী তার স্বামীকে দেখে নিচ্ছে শেষ বারের মতো। মা পুত্রকে, স্ত্রী স্বামীকে, সন্তান পিতাকে যেন দেখে নিচ্ছে শেষ বারের মতো ।


বিশ্ববিদ্যালয় শহরকে ইলিয়টের মনে হয় মৃত এক জনপদ।


লন্ডনকে তার মনে হয় গুজব আর কোলাহলের শহর। বাতাসে ভাসছে উড়ো খবর। গরম আবহাওয়ায় প্রথমে মানিয়ে নিতে কষ্ট হয়। এই প্রথম এত বড় শহর দেখা। সবচে বড় কোলাহলের উৎস ফুটপাতের হকার। পথে পথে উচ্চস্বরে তারা ফেরি করে খবর। হাতে তাজা খবরের কাগজ। সেখানে যুদ্ধের সর্বশেষ খবর। উচ্চস্বরে তারা নগরবাসীকে জানায় শিরোনাম। মহান জার্মানির বিপর্যয়ের খবর, ইংল্যান্ডের মৃত ও নিহতের সংখ্যা। এখানে তার নিজেকে মনে হয়েছে পর্যটক, স্থানীয় আচার-ব্যবহারে অনভ্যস্ত। স্বাভাবিক জীবনযাত্রা অনুপস্থিত এক শহরে এলিয়টের চোখে পড়েছে ফুটপাতে পয়সার জন্য গাওয়া বৃদ্ধার গান, দোকানি মেয়ের নকল দাত, পথচারীর মাথায় কদাকার হ্যাট। ২৪ বেডফোর্ডের মেসের লোহার রেলিংয়ে পর্দাঘেরা জানালা থেকে এ শহরকে তার মনে হয় অদ্ভুত, নিষ্প্রাণ। এলিয়টের পাঁচ বছর আগে লন্ডনে আসার পর আরেক আমেরিকান কবি এজরা পাউন্ডের চোখেও লন্ডনকে মনে হয়েছিল এক মৃত, বৃদ্ধ শহর। কিন্তু পাশাপাশি লন্ডনকে তার মনে হয়েছিল কাব্যের শহর।

প্রথম কদিন লন্ডনে কাটিয়ে অক্সফোর্ডে ফিরে যান। লন্ডনে মানিয়ে নিলেও অক্সফোর্ড তার ভালো লাগে না। পড়াশোনার মন দেয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু লন্ডনকে যাও মেনে নেয়া যায় অক্সফোর্ডের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনকে মনে হয় নির্বাসন এক। এই বিশ্ববিদ্যালয় শহরকে ইলিয়টের মনে হয় মৃত এক জনপদ। ১৯১৪ সালের নববর্ষের সন্ধ্যায় কলেজের বন্ধু, কনরেড এইকেন যে কিছুদিন আগেও লন্ডনে ছিল, এখন ফিরে গেছে হার্ভার্ডে, তাকে জানান অক্সফোর্ড সম্পর্কে প্রতিক্রিয়া—

যেকোনো বিশ্ববিদ্যালয় শহরেকে ঘৃণা করি আমি। ঘৃণা করি বিশ্ববিদ্যালয়ের মানুষগুলোকে। যারা সবসময়, সবখানে একইরকম। সাথে সন্তানসম্ভবা স্ত্রী, কিচিরমিচির করে ঘুরে বেড়ানো ছেলেমেয়ে। ঘরে একগাদা বইপত্র। আর দেয়ালে ঝোলানো জঘন্য সব ছবি। অক্সফোর্ড খুবই সুন্দর। কিন্তু আমি মরতে চাই না।

অক্সফোর্ডকে তার জীবিত মনে হয় নি। কারণ হিশেবে বলেছেন, শৈশব থেকে নারী-পরিবেষ্টিত হয়ে বড় হওয়ার কারণে নারীদের ওপর নির্ভরশীলতার কথা। মা শার্লট, ৪ বোন ও নার্স অ্যানির সাহচর্যে বেড়ে ওঠা এলিয়ট জন্ম থেকেই পরিবারে দেখেছেন নারীদের প্রাধান্য। ভাই হেনরি ছাড়া পরিবারের পুরুষ সদস্য বলতে সে। কর্মব্যস্ততার কারণে অধিকাংশ সময় বাড়ির বাইরে থাকতেন বাবা। নারীদের ওপর নির্ভর করতে অভ্যস্ত এলিয়ট অক্সফোর্ডে তখনো পর্যন্ত কোনো নারীর দেখা পান নি। কারণ তখনো পর্যন্ত ইংল্যান্ডে উচ্চশিক্ষার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির অনুমতি পায় নি মেয়েরা। অবশ্য আরো কিছুদিন পর এই অক্সফোর্ডে এক বন্ধুর মাধ্যমে দেখা হয় ভিভিয়েনের সাথে। প্রথম ক’মাসে অক্সফোর্ডের নির্বান্ধব নিরানন্দের জীবন থেকে বাঁচতে নিজেকে জাগাতে ধর্মীয় চিন্তায় ডুব দেন। মায়ের সামাজিক ব্যস্ততায় ছোটবেলায় যে আইরিশ নার্স তার দেখাশোনা করেছে, ক্যাথিলিক গির্জায় আসা-যাওয়ার সময় যে সাথে নিয়ে গেছে টমকে, ছয় বছরের টমের সাথে যে কথা বলেছে ঈশ্বরের অস্তিত্ব নিয়ে, ক্যাথলিক গির্জায় কাটানো সেসব মুহূর্ত শিশু টমের মনে দাগ কেটে যায়, যা বড় হয়ে তার ধর্মচিন্তাকে প্রভাবিত করে। এখানে এই নিঃসঙ্গতায় সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ে। ধর্মচিন্তায় নিজেকে জাগাতে ব্যর্থ হয়ে বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন এলিয়ট।

ইংল্যান্ডে আসার পর পড়াশোনার জন্য অক্সফোর্ডে থাকলেও লন্ডনেও আসা যাওয়া চলে। হার্ভার্ডের সহপাঠী কনরেড এইকেন লন্ডনে এসেছেন তার ক’বছর আগে। কিছুদিনের জন্য আমেরিকা গেলেও আবারো ফিরেছেন লন্ডনে। লন্ডনে এলিয়ট ওঠেন এইকেনের সস্তা মেসবাড়িতে। যেটা এ শহরে আসা নতুন ছাত্রদের, বিশেষ করে স্বল্প আয়ের প্রবাসীদের আস্তানা। এখানে এলিয়ট প্রতিবেশী হিশেবে পেয়েছেন শিল্পী, গায়ক, লেখককে। তাদের কেউ আমেরিকান, কেউ ফরাসি, বেলজিয়াম, ইতালীয়ান, জাপানিজ। এমনকি জার্মানের নাগরিকও রয়েছে। নানা দেশের নানা ভাষার উপস্থিতির এই ব্লুমবারি এলাকাকে এলিয়টের মনে হয়েছে পৃথিবীর সবচে কোলাহলের এলাকা। ব্লুমবারি লন্ডন শহরের ঘনবসতি এলাকা, অনেকটা নিউইয়র্কের গ্রিনউইচ গ্রামের মতো। যেখানে কবি, ঔপন্যাসিক, চিত্রশিল্পীদের বাস। বাস উদ্বাস্তু, ভাসমান মানুষের। লন্ডনকে প্রথম অপছন্দ করলেও এই শহরে থেকেছেন জীবনের অধিকাংশ সময়। এই শহর তাকে দিয়েছে সাহিত্যিক প্রতিষ্ঠা, পরিচয় নির্মাণ খ্যাতি। জীবনের শেষদিকে তিনি এই শহরের ঋণ স্বীকার করে বলেছেন, লন্ডনে জন্মালে আমার কবিতা এরকম হতো না। আমেরিকায় থেকে গেলেও তা হতো না। দুটো দেশে বাস করার ফলে দুই দেশের সংস্কৃতির সমন্বয় ঘটেছে আমার সাহিত্যে। তবে কবিতায় যে আবেগ, তার শেকড় পড়ে আছে আমেরিকায়।

লন্ডনে আসার পর দুজন মানুষের সাথে পরিচয় তার জীবন বদলে দেয়। একজন কবি এজরা পাউন্ড। এর মাঝে হার্ভার্ডে পড়ার সময় হাতেখড়ি হয়েছে কবিতার। লিখে ফেলেছেন প্রিলিউডস, র‍্যাপসডি অন এ উইন্ডি নাইট সহ প্রথম দিকের কবিতাগুলো। আর সব কবির মতো তিনিও প্রথমদিকে অনুকরণ করেছেন স্বভাষা, বিভাষার অগ্রজ কবিদের। নিজের কবিতার উপাত্ত সংগ্রহ করেছেন তাদের কাছ থেকে। এলিয়টের প্রথম দিকের কবিতায় প্রভাব পড়েছে রবার্ট ব্রাউনিংয়ের, প্রতীকবাদী কবি লাফর্জের কবিতার বিচ্ছিন্নতাবোধের। প্রাথমিক কবিতাগুলোতে প্রাধান্য পেয়েছে নৈতিকতা, মূল্যবোধ ও বিশ্বাস। পাশাপাশি পরিহাস, শ্লেষ আর দুর্বোধ্যতাও এসব কবিতার বৈশিষ্ট্য। ১৯১০ থেকে ১৯১১ সালের মধ্যে লেখা হয়েছে পোট্রেট অব এ লেডি ও সং অব লে জে প্রুফ্রক নামে কবিতা দুটো। ২১ বছর বয়সে নিজের নোটবুকে প্রুফ্রকের প্রথম খসড়া লেখার সময় নোটবুকের ৪ পৃষ্ঠা খালি রাখেন এলিয়ট। ১৯১০ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে শুরু করা কবিতাটি শেষ করেন দুবছর পর মিউনিখে। ১৯১২ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে। ১৯১২ সালে কবিতাটি পরিমার্জন ও পুনঃপাঠের সময় এই খালি রেখে দেয়া ৪ পৃষ্ঠায় নতুন করে যোগ করেন ৩৮টি পঙ্‌ক্তি। তবে বন্ধু কনরেড এইকেনের পরামর্শে এই নতুন যোগ করা ৩৮ লাইন বাদ দেন। বহু বছর পর আবারো মূল কবিতার সাথে যোগ হয় বিসর্জন দেয়া ৩৮ লাইন। এই দীর্ঘ কবিতাটির প্রথমে নাম রাখা হয় প্রুফ্রক অ্যান্ড আদার উইমেন। পরে নাম পরিবর্তন করা হয়। এটিকে প্রেমের কবিতা বলেই মনে করতেন এলিয়ট। ১৮৮৮ সালে প্রকাশিত রুডইয়ার্ড কিপলিংয়ের কবিতা ‘দ্য লাভ সঙ অব ডায়াল’-এর অনুকরণে নিজের কবিতার নাম রাখেন এলিয়ট। প্রথম দিকের অন্যান্য কবিতার মতো এই কবিতাটি লিখতে গিয়েও এলিয়ট ঋণ নিয়েছেন পূর্বজ কবিদের। প্রুফ্রকের কাঠামো নির্মাণে এলিয়টকে প্রভাবিত করেছেন দান্তের এলিজেরি, বাইবেল, শেক্সপিয়রের নাটক পঞ্চম হেনরি, হেমলেট এবং টুয়েলভ লাইফ। আর সতের শতকের মেটফিজিকাল কবি জন ডান এবং উনিশ শতকের ফরাসি প্রতীকবাদী কবিদের প্রভাবও পড়েছে এই কবিতায়।


মনস্থির করেন, কবিতা নয়, দর্শনই হবে তার ভবিষ্যৎ।


প্যারিসে থাকার সময় সেখানকার গ্যালারি, চিত্রকর্ম আর ভাস্কর্য দেখে একবার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন আর আমেরিকায় ফিরে গিয়ে কাজ নেই, থেকে যাবেন প্যারিসেই। শিল্পসাহিত্যের আবর্তে কাটিয়ে দিবেন বাকি জীবন। কবিতা, শুধু কবিতাই হবে ভবিষ্যৎ। ইংরেজি ছেড়ে লিখবেন ফরাসি ভাষায়। কারণ এর আগে ভালো করে রপ্ত করেছেন ফরাসি ভাষা। কিন্তু সেই কবিতাকেন্দ্রিক আবেগ ও রোমান্টিক ভাবনা থেকে সরে আসতে হয়। তরুণ বয়সে ততটা মনোবল ছিল না, যতটা হলে নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে মা-বাবার অনড় মনোভাবের বিপরীতে দাঁড়িয়ে নিজের ইচ্ছেটাকে বাঁচিয়ে রাখা যায়। বাবা-মার প্রত্যাশা তাদের সন্তান আমেরিকার প্রচলিত শিক্ষাপদ্ধতিতে নিজের উপার্জনের পথ খুঁজে নেবে। হার্ভার্ডে পিএইচডি শেষে দর্শনের অধ্যাপক হবে। বাবা-মায়ের প্রত্যাশাকে কুর্নিশ করে ১০১১ সালের গ্রীষ্মে কনরেড এইকেনকে বলেন, প্যারিস থেকে হার্ভার্ডে ফিরে দার্শনিক হবেন। এর মাঝে প্যারিসে পশ্চিমা সভ্যতার সব কেন্দ্রগুলো ঘুরে দেখেছেন। কিন্তু কোথাও নিজের সময়ের সত্যকে খুঁজে পান নি। তাই কবি হওয়ার স্বপ্ন নিয়ে প্যারিসে আসা এলিয়ট আমেরিকায় ফিরে যান দার্শনিক হওয়ার লক্ষ্য নিয়ে। তার মনে হয়েছে, দার্শনিক হওয়ার পথে কবিতা বাধা হয়ে দাঁড়াবে না। কথা মতো প্যারিস থেকে হার্ভার্ডে ফিরে দর্শনে পিএইচডি শুরু করেন। মনস্থির করেন, কবিতা নয়, দর্শনই হবে তার ভবিষ্যৎ।

লন্ডনে আসার পর বদলে যায় সব। ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, বাস্তবতা, জীবন ও স্বপ্নের গতিপথ। আটলান্টিক পাড়ি দেয়া সেই সমুদ্রযাত্রা আর তাকে ফিরতে দেয় নি শেকড়ে। বরং পৌঁছে দিয়েছে ভিন্ন এক গন্তব্যে। প্রথমে খাপ খাওয়াতে কষ্ট হলেও ধীরে ধীরে সয়ে যায় সব। মনে হয় সবকিছুর পরও এখানে নিজের কাজ চালিয়ে যাওয়া সম্ভব। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে জড়িয়ে পড়া যোদ্ধা দেশের বিপর্যস্ত বাস্তবতা থেকে বেরিয়ে তার প্রিয় হয়ে ওঠে বৃটিশ জাদুঘর, বুকশপ, লাইব্রেরি আর ব্লুমবারি গ্রুপের আড্ডা। প্যারিসেও প্রথম অপরিচিতি পরিবেশে নিঃসঙ্গতা পেয়ে বসেছিল। পরে প্যারিসের সভ্যতা, গ্যালারি, আর শিল্পবান্ধব জীবনের কারণে প্যারিস হয়ে উঠে স্বপ্নের শহর। লন্ডনে এসেও মনে হয়েছে প্যারিসকে তিনি আগের চেয়ে বেশি ভালোবাসেন। তবে ধীরে ধীরে লন্ডনের জীবনে অভ্যস্ততা বাড়ে, বাড়ে পরিচিতি যোগাযোগ। এখানে এসে পেয়ে যান পরম সুহৃদ কনরেড এইকেনকে। কনরেডের কাছে আগে থেকেই ছিল প্রুফ্রকের ফটোকপি। কনরেড তা পাঠিয়ে দেন  প্রধান প্রধান দৈনিকের সাহিত্য-সম্পাদকের কাছে। কিন্তু কেউ ছাপতে রাজি হন না। একজন তরুণের এমন উদ্ভট লেখা পড়ে বিরক্ত হন কেউ কেউ।

এলিয়ট নিজেও প্রথমদিকে লন্ডনের সব সাহিত্য-সম্পাদকের কাছে ডাকে পাঠিয়েছেন তার প্রথম জীবনের সেরা কবিতাটি। ১৯১০ সাল থেকে ১৯১১ পর্যন্ত লেখা এই স্বপ্নটি বুক পকেটে নিয়ে ঘুরেছেন; নানা পরিবর্তন, পরিমার্জন, কাটছাঁট করে লেখাটিকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দিয়েছেন। ভেবেছেন কোথাও ছাপা হবে একদিন। হয়তো কোনো একজন সম্পাদকের মনঃপূত হবে লেখাটি। কিন্তু কোনো সাড়া পাওয়া গেল না। অগত্যা দীর্ঘদিনের সহপাঠী, বন্ধু কনরেড হয়ে উঠলেন প্রুফ্রকের অবিভাবক। হাতের কাছে যাকেই পেয়েছেন, তাকেই কনরেড পড়তে দিয়েছেন কবিতাটি। কেউ কবিতাটির মর্ম বুঝতে পারেন নি। রুপার্ট ব্রুকের মাধ্যমে কনরাডের পরিচয় হয় পোয়েট্রি বুকশপের মালিক হ্যারল্ড মনরোর মাথে। এক বছর আগে প্রতিষ্ঠিত পোয়েট্রি বুক শপের মালিক মনরোর কাছে কবিতাটি নিয়ে যান কনরেড। পিন দিয়ে আটকানো পোকার মতো ছটফট করতে থাকা প্রুফ্রকের চরিত্রটিকে তার মনে হয় অদ্ভুত। যার মনে হয় মানুষ নয়, তার হওয়া উচিত ছিল সমুদ্রের কাঁকড়া; ঘুমন্ত, ক্লান্ত, নিস্পৃহ কাঁকড়া। মধ্যবয়সী যুবকের এমন নৈরাশ্য, আত্মবিশ্বাসহীনতা ভালো লাগে না তার। পাগলের প্রলাপ বলে কবিতাটিকে কনরাডের দিকে ছুড়ে দেন মনরো। বলেন, এর লেখক বদ্ধ-উন্মাদ।

প্রচলিত ইংরেজ কাব্যরুচির বিপরীতে দাড়ানো প্রুফ্রক তখনো পর্যন্ত সমাদর পায় নি। কনরেড বন্ধুর কবিতার কথা বলেন আমেরিকান কবি এজরা পাউন্ডকে। পাউন্ড তখন প্রতিভাবান তরুন কবির ভালো কবিতার খোঁজ করছেন। কনরাডের কাছে এলিয়টের কথা শুনে পাউন্ড তার সাথে এলিয়টকে দেখা করতে বলেন। কনরাড এলিয়টকে বলেন, অক্সফোর্ড থেকে লন্ডনে এলে পাউন্ডের বাসায় যেতে। হার্ভার্ডে থাকতেই পাউন্ডের কিছু কবিতা পড়া হয়েছে এলিয়টের। যদিও কবিতাগুলো পড়ে খুব একটা ভালো লাগে নি।

১৯১৪ সালের ২২ সেপ্টেম্বর। লন্ডনের হোনাল্ড পার্কের বাসায় পাউন্ড ও তার স্ত্রীর সাথে দেখা হয়। কেসিংটনের ফ্লাটে ২৫ বছর বয়সী এলিয়ট আর ২৮ বছর বয়সী পাউন্ডের যে আলাপ শুরু হয়, এক কাপ চায়ের সাথে, তা সাহিত্যের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এই দেখা দুজন সমমনা কবির ব্যক্তিগত সম্পর্কের সূত্রপাত মাত্র নয়। ইংরেজি সাহিত্যের যুগান্তকারী পরিবর্তনের অভিষেক। সেদিনের স্থাপিত হওয়া সম্পর্ক, যুথবদ্ধ পথচলা একদিকে আধুনিক কবিতার স্থিতি ও বিকাশের পথ নির্মাণ করেছে, অন্যদিকে বদলে দিয়েছে এলিয়টের জীবনের মোড়।

এরই মধ্যে প্রকাশিত হয়েছে পাউন্ডের ৫টি কাব্যগ্রন্থ। তার সময়ের যেকোনো মানুষের চেয়ে কবিতা সম্পর্কে সবচে বেশি জানতে আগ্রহী ছিলেন পাউন্ড। এরই মধ্যে তিনি ঘোষণা দিয়েছেন ৩০ বছরে পা দেয়ার আগেই জীবিত যেকোনো ব্যক্তির চেয়ে কবিতা নিয়ে বেশি জানতে চান তিনি। তার চারপাশে তখন থাকবে শুধু কবিতা আর কবিতা, যে কবিতাগুলো অনুবাদে হারিয়ে যাবে না। পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষার কবিতা মূলভাষায় পড়ার জন্য ৯টি বিদেশি ভাষা শিখেছেন। কবিতা ছাড়া অন্য কিছু শেখাতে চেয়েছেন, তাকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার দিকে ফেরাতে চেয়েছেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় এমন শিক্ষকদের সাথে ঝগড়া করেছেন পাউন্ড। এই স্বদেশি তরুণের মাঝে পাউন্ড খুঁজে পান অপার সম্ভাবনা। দুজনের শেকড় আমেরিকার মধ্য-পশ্চিমাঞ্চলে। দুজনেই নিজেকে প্রস্তুত করেছেন একই সাংস্কৃতিক ও ঐতিহ্যের পরিমণ্ডলে। আর একই ধরনের সাহিত্যরুচি, কাব্যভাবনা নিয়ে লন্ডনে এসছেন তারা। লন্ডনে আসার আগে পাউন্ডও থেকেছেন প্যারিসে। ইউরোপের সাহিত্য ও সংস্কৃতি সম্পর্কে দুজনের ধারণাও কাছাকাছি। প্রথম আলাপেই মুগ্ধ পাউন্ড এলিয়টকে বলেন তার কবিতা পাঠাতে।


প্রুফ্রক পড়ে রীতিমত চমকে ওঠেন পাউন্ড।


এলিয়টের সাথে দীর্ঘ কাব্য-আলোচনায় পাউন্ড উচ্ছ্বসিত, উচ্চকণ্ঠ। যদিও প্রকৃত অর্থে পাউন্ড চুপচাপ এবং ইগোসম্পন্ন মানুষ। দেখা হওয়ার আগে পাউন্ডের কবিতা পড়লেও এসব কবিতা সম্পর্কে এলিয়টের উচ্চ ধারণা ছিল না। তাই পাউন্ডের সাথে আলোচনায় এলিয়ট ছিলেন শান্ত, ভাবগম্ভীর, sardonic। এই সাক্ষাতের পর এইকেনকে এলিয়ট বলেন, বক্তা হিশেবে পাউন্ড খুবই বুদ্ধিমান। তার কবিতা অর্থপূর্ণ। কিন্তু টেকনিকের দিক থেকে অসম্পূর্ণ। কিন্তু তার মন্তব্য খুব চমৎকার। যদিও পাউন্ডের কবিতা নিয়ে এলিয়টের এই ধারণা পরে পাল্টে যায়। এলিয়ট পরে পাউন্ডকে তার হার্ভার্ডের শিক্ষক ইরভিং বেবিটের সাথে তুলনা করেছেন। বেবিট তাকে পড়িয়েছেন ফরাসি সাহিত্য সমালোচনার ধারা। বেবিট তাকে সংস্কৃত এবং ওরিয়েন্টাল ধর্মের প্রতি উৎসাহী করে তুলেছেন। অন্য সব শিক্ষকের চেয়ে এলিয়টের ওপর ইরভিংয়ের প্রভাব বেশি।  তরুণ এলিয়টের কাব্যরুচি নির্মাণেও তার অবদান রয়েছে।

প্রুফ্রকসহ প্রথমদিকের কিছু কবিতা পাউন্ডকে ডাকে পাঠান এলিয়ট। প্রুফ্রক পড়ে রীতিমত চমকে ওঠেন পাউন্ড। এ তো নতুন ধরনের কবিতা। মনে হয় এর আগে যেসব কবিতা লেখা হয়েছে সেসব অ্যাংলো স্যাক্সন যুগের কবিতা। টেনিসন, ওয়ার্ডওয়ার্থ—এলিয়টের তুলনায় তাদের কবিতাকে মনে হয় বাসি, পুরোনো ধাঁচের।

চলো তাহলে বেরিয়ে পড়ি
তুমি আর আমি

কবিতার শুরুতেই প্রুফ্রক পাঠককে আমন্ত্রণ জানান তার কাব্যভ্রমণের সঙ্গী হতে। এই আহবান কোনো নারীর প্রতিও হতে পারে। যাকে সে ভালোবাসে। অথচ, আবেগ প্রকাশের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় একরাশ দ্বিধা। এই আবেদনে মন্ত্রমুগ্ধের মতো পাউন্ড চোখ বুলান কবিতায়।

তখন সন্ধ্যা ছড়ানো আকাশ
শুয়ে আছে টেবিলের ওপর
যেন অচেতন রোগী

সন্ধ্যার অনেক উপমা দেখেছেন পাউন্ড। কিন্তু টেবিলে শোয়ানো নিস্তেজ রোগীর সাথে আকাশের তুলনা নতুন ঠেকে। এরকম তাজা উপমাই তো খুঁজেছেন এতদিন।

ঘরের ভেতর নারীদের আসা যাওয়া
তারা কথা বলে মিকেলাঞ্জোলাকে নিয়ে

একে একে প্রুফ্রক দিয়ে যায় তার চারপাশের বর্ণনা। অস্থির রাত, ঝিনুকের খোসা ছড়ানো কাঠের গুঁড়ো ভরা রেস্টুরেন্ট, হলুদ কুয়াশা হলুদ ধোঁয়া, জানালার কাচ, নর্দমা, নম্র রাতের উপমায় প্রুফ্রক বলে যায় তার মানসিক অস্থিরতা, সিদ্ধান্তহীনতা, দ্বিধা, উদ্বেগ ও মানসিক অস্থিরতার কথা। তার মাথায় সদ্য উঠা টাক। গলায় নেকটাই। সেখানে সাধারণ টাইয়ের পিন। সাধারণ উপকরণ হলেও  বর্ণনা এ ব্যতিক্রম কাব্যভাষার উদাহরণ হয়ে ওঠে। পাউন্ডের কাছে স্পষ্ট ওয়ে ওঠে এলিয়টের স্বতন্ত্রতা। কবিতার সমঝদার পাউন্ডের মনে হয় আমেরিকায় এলিয়টের আগে বা সমকালীন কারো কবিতাই এরকম নয়। এমনকি তার সময়ে লন্ডনেও কেউ এভাবে লিখছেন না। এক এক নতুন অভিব্যক্তি, নতুন কণ্ঠস্বর। পাউন্ডের মনে হয় একদিন প্রুফ্রকই হয়ে উঠবে আধুনিকতার স্বীকৃত কণ্ঠস্বর।

পড়তে পড়তে পাউন্ড পরিচিত হন মধ্যবয়সী প্রুফ্রকের চিন্তার সাথে, যে বলে, সে মৃতদের দেশ থেকে আসা ল্যাজারাস। যে স্বীকার করে সে কোনো প্রেরিত পুরুষও নয়। তার দেখা আছে মহত্ত্বের নান্দনিক মুহূর্ত। প্রুফ্রকের সংকট, অনাস্থা, ভঙুর ব্যক্তিত্ব, ভীতি প্রকাশিত হয় উত্তম পুরুষে দেয়া স্বীকারোক্তিতে। চল্লিশে দাঁড়িয়ে তার মনে হয় বেড়ে যাচ্ছ বয়স। দৈনন্দিন জীবনের খুঁটিনাটি বিষয়ের মাঝে প্রকট হয়ে ওঠে তার আত্মবিশ্বাসহীনতা। নিজের প্রতি আত্মবিশ্বাস নেই বলেই সে প্রশ্ন করে যায়, একের পর এক প্রশ্ন। পেছন দিক থেকে চুল আচড়াবে কিনা, সামান্য পিচফল খাওয়ার ধৃষ্টতা দেখাবে কিনা, পৃথিবীকে বিঘ্নিত করবে কিনা—এসব নিয়েও দ্বিধান্বিত ৪০ বছর বয়সী প্রুফ্রক। ফ্লানেলের শাদা প্যান্ট পরে বেলাভূমিতে হেঁটে যেতে যেতে তার কানে আসে সমুদ্রের নিচে থাকা প্রাণীদের গান। সে তার চারপাশের জীবনকেও ভালোভাবে চেনে।

যেহেতু আমি ইতোমধ্যে চিনেছি
ওদের সবাইকে
চিনেছি ভোর, সন্ধ্যা, বিকেল
কফির চামচে আমি মেপেছি জীবন

জীবনের মাঝপথে দাঁড়িয়ে প্রুফ্রক বলে যায় জানালায় হেলান দিয়ে দাঁড়ানো ফুলহাতা শার্ট পরা নিঃসঙ্গ মানুষ, ধোঁয়া ওঠা পাইপ, সংকীর্ণ পথ আর দূরের কামরা থেকে ভেসে আসা গানের গল্প। খণ্ড খণ্ড এসব প্রসঙ্গে সে বাড়িয়ে তোলে পাউন্ডের কাব্যপাঠের মুগ্ধতা। তার কান্না, উপবাস, প্রার্থনা, ভালবাসাহীন নিঃসঙ্গ জীবন, জীবনকে দেখার চোখ অভিনব মনে হয় নতুন কাব্য-আন্দোলনের প্রবক্তা পাউন্ডের কাছে। মনে হয় এলিয়টের কবিতা ইংরেজি ভাষার আধুনিকতার আন্দোলনের সেরা কবিতা। প্রুফ্রকপাঠের মুগ্ধতা শেষ হওয়ার আগেই অক্সফোর্ডে থাকা এলিয়টকে পাউন্ড লেখেন, এখন পর্যন্ত এত ভালো কবিতা আমি পড়ি নি। একদিন এসো, এসব কবিতা নিয়ে আলোচনা হবে। শিকাগো থেকে প্রকাশিত কবিতার কাগজ ‘পোয়েট্রি’ ম্যাগাজিনে এটি ছাপার জন্য উদ্যোগ নেন। ২ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত পত্রিকাটির তিনি বৈদেশিক প্রতিনিধি। পোয়েট্রির সম্পাদক হেরিয়েট মনরোকে তিনি এই কবিতা সম্পর্কে বলেন: ‌‌‍

এ পর্যন্ত কোনো আমেরিকান লেখকের লেখা শ্রেষ্ঠ কবিতা এটি। এলিয়ট সত্যিকার অর্থে নিজেকে প্রশিক্ষণ দিয়েছে। পাশাপাশি নিজে নিজেই হয়ে উঠেছে আধুনিক। তার সমসাময়িক অন্য তরুণ কবিরা যেকোনো একটি কাজ করেছে। তাদের কেউ একসাথে দুটো কাজ করে নি। এরকম একজনের সাথে দেখা হওয়াটা সত্যি স্বস্তির, যাকে বলে দিতে হয় না, এটা করো, ওটা করো। ওর সাথে পরিচয় সত্যি ক্যালেন্ডারে দাগ দিয়ে রাখার মতো একটি দিন। মনরোকে বলেন, এলিয়ট কবিতাটিকে ছাপার উপযোগী করার জন্য নিয়ে গেছে। একটু কাটছাঁট করে ছাপার উপযুক্ত করে পাঠাবে। কদিনের মধ্যেই লেখাটা পেয়ে যাবেন আপনি। এলিয়ট প্রসঙ্গে বলতে পেরে আমার ভালো লাগছে। ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করুন যেন এটিই তার লেখা একমাত্র সফল কবিতা না হয়।

পাউন্ড জানতেন কে কবি, কে নয়। হাঁড়ির একটি ভাত টিপে পাকা রাঁধুনি যেমন বলে দিতে পারেন বাকি সব ভাতের খবর, পাউন্ড একটি কবিতা পড়ে শব্দের ধার দেখেই বুঝে নিতেন কবিতার নাড়িস্পন্দন।  সারাজীবন পাকা জহুরির মতো সম্ভাবনাময়, প্রতিভাবান কবিদের পৃষ্ঠপোষকতা করেছেন। তাদের পরিচিত করেছেন, প্রতিষ্ঠিত করেছেন মূলধারার সাহিত্যে। শুধু এলিয়ট নন, সম্পাদক ও সমালোচক হিশেবে এমন অনেক লেখকেকে আবিষ্কার করেছেন যারা পরে আলো ছড়িয়েছেন বিশ্বসাহিত্যে। এ প্রসঙ্গে বলা যায় জেমস জয়েস, রবার্ট ফ্রস্ট, আর্নেস্ট হেমিংওয়ের নাম। নিজের সৃষ্টিশীলতা ছাড়াও পরিচিত-অপরিচিত, চেনা-অচেনা সম্ভাবনাময় লেখকেদের পাশে  দাড়িয়ে পাউন্ড তার প্রজন্মের মেধা বিকাশে এগিয়ে এসেছেন।


শুধুমাত্র একটি দেশের কবিতার পক্ষে না দাঁড়িয়ে বিশ্বকবিতার জন্য কাজ করা চাই।


১৯১৫ সালে হেরিয়েট মনরোকে লেখা চিঠিতে পাউন্ড বলেছেন:

তিনি তার সময়ের ক’জন সম্ভাবনাময় কবিকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন। যেন তারা তাদের শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখে টিকে থাকতে পারে, সঠিক নির্দেশনা পেয়ে।

আর্নেস্ট হেমিংওয়ে তার প্রতি ঋণ স্বীকার করে বলেছেন:

আমাদের প্রধান কবি পাউন্ড নিজের সময়ের ৫ ভাগের এক ভাগ খরচ করেছেন কবিতার জন্য, বাকি সময় নিজের বন্ধুদের ভাগ্যের উন্নয়নে বিশেষ করে বস্তুগত ও শৈল্পিক উন্নতির জন্য ব্যয় করেছেন। তারা আক্রান্ত হলে তিনি তাদের পক্ষ নিয়েছেন, তাদের কারাগার থেকে মুক্ত করে লেখালেখিতে ফিরিয়ে এনেছেন। অর্থিক সংকটে প্রয়োজনে টাকা ধার দিয়েছেন।। অসুস্থ হলে হাসপাতালের বিল মিটিয়েছেন। এবং বিষণ্নতায় আত্মহত্যার পথ থেকে ফিরিয়েছেন। আর শেষ পর্যন্ত যাদের জন্য তিনি এত কিছু করেছেন তাদের কেউ কেউ প্রথম সুযোগে তার বুকে ছুরি বসিয়েছেন।

সৌভাগ্যবশত এলিয়ট বিশ শতকের এমন এক সময়ে ইংরেজি সাহিত্যের কেন্দ্রে পা রেখেছেন যখন সেখানে এক বিপ্লব ঘটছে। ৫ বছর আগে লন্ডনে আসা এজরা পাউন্ড তখন নেতৃত্ব দিচ্ছেন ইমেজিস্ট আন্দোলনের। ক’জন ইমেজিস্টকে নিয়ে কবিতার মানচিত্র পরিবর্তনে ব্যস্ত। পাউন্ডের মনে হলো, জাদু আছে এলিয়টের হাতে। তার স্বতন্ত্র কাব্যভাষা, দুঃসাহসী চিত্রকল্প, ব্যতিক্রমী উপমা নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করবে কবিতায়। নিশ্চিত বুঝতে পারেন সদ্য লন্ডনে আসা এই তরুণ আমেরিকান কবির হাতে ঘটবে অ্যাংলো আমেরিকান কবিতার পালাবদল। এলিয়টকে পাউন্ড মনে করেন নতুন এক চারা, যার গোড়ায় জল ঢাললে, পরিচর্যা করলে সে একদিন বটবৃক্ষ হয়ে ছায়া দেবে বিশ্বকবিতায়।  কবিতার সেই চারাগাছের পরিচর্যায় মন দেন পাউন্ড।

পুরোনো অ্যাংলো স্যাক্সন কবিতাকে পেছনে ফেলে নতুন ফর্মে নতুন কবিতা লেখার এই তো সময়। বিশেষ করে ক্লিশে রোমান্টিকতা থেকে সরে এসে কবিতার নতুন কাঠামো তৈরির এটাই উপযুক্ত মৌসুম। বিশ শতকের প্রথম দশকে না এসে আরো কিছুটা আগে লন্ডনে আসলে সেটাও অসময় হতো। কারণ তখনো তৈরি হয় নি নতুন পথ নির্মাণের পরিবেশ, সৃষ্টি হয় নি নতুন ধারার কবিতাকে মেনে নেয়ার কাব্যরুচি, মানসিকতা। ১৯১৪ সালের দিকে না এসে আরো আগে আসলে স্বদেশি অন্যান্য আমেরিকান লেখকের মতো যারা তার আগে লন্ডনে এসেছেন তাদের মতো নিজের পরিচিতি তৈরি করতেই করতেই হারিয়ে যেতে হতো। এলিয়ট এখানে এসেছেন কিছুটা দেরিতে, পোক্ত হাতে। নিজের প্রথমদিকের কবিতা যেগুলোতে লাফর্জ, সুইনবার্ন, জন ডানসহ পূর্বজদের ছায়া রয়েছে তাদের প্রভাবের বলয় থেকে বেরিয়ে প্রেম-আবেগের আতিশয্য পেছেনে ফেলে কিটস, শেলির মতো রোমান্টিক কবিদের খারিজ করে, নিজের নতুন স্টাইলের কবিতা নিয়ে হাজির এখন এলিয়ট। ধীরে ধীরে কবিতায় পাউন্ডের প্রভাব কাটিয়ে হয়ে ওঠেন সমকালীন ইংরেজি কবিতার প্রভাবশালী ব্যক্তি।

পাউন্ড তাকে পরিচয় করিয়ে দেন লন্ডনের সাহিত্যিকদের সাথে। এই দলে আছেন ‘ইগোইস্ট’ পত্রিকার সম্পাদক মিস ওয়েভার, পাউন্ডের কলেজের বন্ধু আমেরিকান লেখক হিলডা ডলিট, তার ইংরেজ স্বামী সমালোচক রিচার্ড এডিংটন। পাউন্ডের ত্রিকোনাকার ফ্লাটে এলিয়টের দেখা হয় শিল্পী ও ‘ব্লাস্ট’ পত্রিকার সম্পাদক ওয়েন্ডাম লুইসের সাথে। পরিচয় হয় আমেরিকান লেখক জন গোল্ড ফ্লেবারের সাথেও। ১৯১৫ সালের মাঝামাঝিতে এলিয়ট তাদের বৃহস্পতিবারের রাতের আড্ডার অংশ হয়ে যান। সোহো এবং রিজেন্ট রেস্টুরেন্টের সেই আড্ডায় সমকালীন শিল্পী-সাহিত্যিকদের সাথে মেশার সুবাদে এলিয়টরে প্যারিসে ফেলে আসা কবিতাকেন্দ্রিক বাঁচার স্বপ্নটা আবারো সামনে এসে দাঁড়ায়। এই প্রথমবারের মতো ইংল্যান্ডের শিল্পবোদ্ধাদের মাঝে প্রবেশাধিকার পান।

পাউন্ড মনে করতেন নিজের কবিতার প্রচারের দায়িত্ব কবির নয়। তাই এলিয়টরে কবিতা প্রচারের ভার তুলে নেন নিজের কাঁধে। শুধু কবিতা নয়, এই তরুণ কবির চাকরি, দারিদ্র্য এবং প্রকাশনা নিয়েও মাথা ঘামিয়েছেন। চেয়েছেন প্রুফ্রকের কাব্যমানের ধারাবাহিকতা বজায় রাখার জন্য উপযুক্ত জীবন যেন যাপন করতে পারেন এলিয়ট তার ব্যবস্থা করতে। চেয়েছেন ইংল্যান্ড আমেরিকাসহ সবখানে ছড়িয়ে যাক তার কবিখ্যাতি। তিনি জানতেন তরুণ আমেরিকানদের হাতেই রচিত হবে নতুন দিনের কবিতা। তবে তা আঁচ করলেও প্রথমে ইংরেজ প্রকাশক ও সাহিত্য সম্পাদকদের কাছে আগ বাড়িয়ে তার ঘোষণা দেন নি। কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ভাই, বন্ধু, অভিভাবক হয়ে বিশ শতকের কথাসাহিত্যের বিশেষ করে ফ্লবার্ট ও জেমস জয়েসের মতো এলিয়টকে সামনে এগিয়ে যেতে অনুপ্রেরণা দিয়েছেন। কবিতায় যে কাজ এলিয়ট করেছেন তার সমসাময়িক লেখক জেমস জয়েস একই ধরনের বিপ্লব এনেছেন কথাসাহিত্যে। আইরিশ কবি ইয়েটসের সেক্রেটারি হয়ে কাজ করা পাউন্ড এরই মধ্যে লন্ডনের সাহিত্য-সংস্কৃতির কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছেন। তিনি জানতেন, কার সমাদর করতে হবে, কাকে আক্রমণ, আর এড়িয়ে চলতে হবে কাকে। সবচে উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো নিজের সবটুকু সাহিত্যচিন্তা, জ্ঞান নিয়ে এলিয়টের চিন্তাকে আরো শাণিত, সমৃদ্ধ করার চেষ্টা করেছেন পাউন্ড। বিশেষ করে সমসাময়িক ফরাসি সাহিত্য সম্পর্কে পাউন্ড তার ধারণাকে আরো স্পষ্ট, ধারালো করেছেন। পাউন্ডের উৎসাহেই এলিয়ট মধ্যযুগীয় ইতালীয়ান কবিদের সম্পর্কে রেমি ডে গরমেন্টের মতো কবিদের প্রতি আগ্রহী হয়েছেন। যার সাথে কখনো দেখা হয় নি সেই টি. ই. হালমের গ্রন্থ নতুন সমালোচনা এবং ধর্মীয় কবিদের দ্বারা প্রভাবিত হয়েছেন। পাউন্ড নিজেও এ ধারায় কবিতা লিখেছেন তখন। আর এলিয়ট কবিতার চেয়ে তার সাহিত্য-সমালোচনার দ্বারা বেশি প্রভাবিত হয়েছেন। এভাবে বেশ কিছু তরুণ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে পুরোনো রোমান্টিকতা এবং ধর্মীয় ক্লাসিসিজমকে পুনর্নির্মাণের সময় এসেছে। এ বিষয়ে একাত্ম হয়ে কাজ করেন সকলে। তাদের সাথে মিশে এই প্রথম নিজেকে আবিষ্কার করেন এমন এক পরিবেশে যেখানে শিল্প এবং সাহিত্য বেঁচে থাকার মূল চালিকাশক্তি। এখানে এলিয়টের নিজের কবিতা নিয়ে আর ততটা রক্ষণাত্মক হওয়ার প্রয়োজন নেই, যেমনটা হাভার্ডের দিনগুলোতে ছিলেন। তবে অনুকূল পরিবেশ পেলেও নিজের কবিতার ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চিত এলিয়ট এই আনুকূল্য পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারছিলেন না। তার মনে পড়ে প্যারিসের কথা, যেখানে গ্যালারিতে ঘুরে ঘুরে দেখেছেন বিশ্বসেরা সব চিত্রকর্ম। শিল্পবোদ্ধা, সৃষ্টিশীল মানুষের সাথে ওঠাবসা সমৃদ্ধ করেছে তার শিল্পরুচি। যেখানে ৪ বছর আগে খুঁজে পেয়েছেন অনুপ্রেরণা। এখন এই অনুকূল পরিবেশকে কাজে লাগিয়ে নিজেকে বিকাশের জন্যে প্রতিশ্রুত হতো নিজের কাছে। প্রুফ্রক হাতে পাওয়ার কদিনের মধ্যেই পোয়েট্রি পত্রিকায় ছাপার জন্য শিকাগোতে পাঠিয়ে দেন পাউন্ড। কিন্তু দীর্ঘদিন লেখাটি ফেলে রাখেন মনরো। এ নিয়ে মনরোর সাথে দূরত্ব তৈরি হয়। একবার এই পত্রিকায় কাজ না করার সিদ্ধান্তও নেন। এই পত্রিকার প্রকাশনার সময় থেকেই এর সাথে যুক্ত পাউন্ড। ১৯১২ সালে প্রত্রিকাটির প্রতিষ্ঠার সময় মনরোর সাথে তার অনেক মত-বিনিময়, আলোচনা হয়েছে। আদানপ্রদান হয়েছে চিঠির। হেরিয়েট মনরো তখন শিকাগোর ট্রিবিউন পত্রিকার চিত্রসমালোচক। মনরো তার পত্রিকায় পাউন্ডের মতো একজন কবির সমর্থন এবং ছাপার জন্য একগুচ্ছ কবিতা চান। স্বদেশি এই কবিকে নিজের পত্রিকার লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের কথা জানান। জানান একটি মানসম্পন্ন কবিতার কাগজ করতে চান তিনি। এজন্য শিকাগো শহরের ধনী ব্যক্তি, রেলপথ নির্মাতাদের কাছ থেকে অনুদানও নিয়েছেন। আমেরিকায় কবিতাকেন্দ্রিক একটি প্রথম শ্রেণির সাহিত্য পত্রিকার শূন্যতা দীর্ঘদিন অনুভব করেছেন। মনরোর উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে তিনি বলেন, তার মনে হয় আমেরিকায় এমন কোনো পত্রিকা নেই যা সৎ শিল্পী ও তার শিল্পের প্রতি, অপমানস্বরূপ নয়। দীর্ঘ চিঠিতে পাউন্ড আমেরিকার মার্কিন কবিদের কাব্যবোধ, শিল্পমান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। নিজের পূর্ব-তিক্ত-অভিজ্ঞতার প্রসঙ্গ তুলে মনরোকে মনে করিয়ে দেন মার্কিন কবিদের সীমাবদ্ধতার কথা। মনরোর কাছে জানতে চান, আপনি কি পারবেন, আমেরিকায় যারা কবিতা লেখে তাদের শেখাতে যে কবিতা একটি উচ্চাঙ্গ শিল্প? আর এই শিল্পের নিজস্ব ভাষাভঙ্গি রয়েছে। প্রতিনিয়ত বদলে যাচ্ছে এই  ভাষা। কবি হিশেবে যে টিকে থাকতে চায়, তাকে সময়ের সঙ্গে নিজের কন্ঠস্বরকে বদলে নিতে হয়।

মনরোকে পাউন্ড বলেন, নিজের দেশে তার সর্বশেষ তিক্ত ভ্রমণের কথা। সবশেষ যখন আমেরিকা গেছেন তখন একজন মাত্র সমালোচক ছাড়া আর কোনো লেখককে দেখেন নি যার কবিতার মতো উচ্চাঙ্গ শিল্প নিয়ে উল্লেখযোগ্য বোধ রয়েছে। পাউন্ড জানতে চান মনরো কার পক্ষে? সামগ্রিক কবিতার, না আমেরিকান কবিতার? তিনি বলেন, শুধুমাত্র একটি দেশের কবিতার পক্ষে না দাঁড়িয়ে বিশ্বকবিতার জন্য কাজ করা চাই। এতেই মঙ্গল হবে কবিতার।


মনরোর অভিযোগ ছিল প্রুফ্রক ব্যর্থতার চিত্র।


মনরোকে পাউন্ড প্রতিশ্রতি দেন, তিনি যদি কবিতাকে একটি স্বতন্ত্র মাধ্যম হিশেবে মর্যাদা দেন তাহলে এখন থেকে আমেরিকায় একমাত্র মনরোর কাগজেই ছাপা হবে তার কবিতা। অন্য কোথাও নয়। তিনি আশা প্রকাশ করেন, মনরো নিশ্চয়ই সব মার্কিন কবিকে অন্য সব কাগজ বাদ দিয়ে তার কাগজে লেখা ছাপতে অনুপ্রেরণা দিতে পারবে। এই চিঠির সাথে হাতের কাছে থাকা সব লেখা মননোর ঠিকানায় পাঠিয়ে দেন পাউন্ড। কাজ করেন পোয়েট্রির বৈদেশিক প্রতিনিধি হিশেবে।

পোয়েট্রিতে শুরু থেকে এই পত্রিকার সাথে যোগাযোগ রাখা মনরোর সাথে সৌহার্দ্যপূর্ণ বন্ধুত্ব এবং পাউন্ডের সুপারিশের পরও এই কাগজে ‘প্রুফ্রক’ ছাপতে রাজি হন না সম্পাদক। কবিতাটি হাতে হাওয়ার পর ৮ মাস ফেলে রাখার প্রধান কারণ এলিয়টের কবিত্ব নিয়ে সন্দেহ। এই তরুণের লেখা নিয়ে পাউন্ডের উচ্ছ্বাস, উচ্চাশার সঙ্গেও একমত হতে পারেন নি। ছাপা হওয়ার অপেক্ষায় ৮ মাস প্রুফ্রক কবিতাটি পড়ে থাকে মনরোর টেবিলে। ১৯১৪ সালের অক্টোবরে কবিতাটি মনরোকে ডাকে পাঠানোর একমাস পরই পাউন্ড আশা করেছিলেন কবিতাটির নতুনত্ব, বা তার তদবির যে কারণেই হোক কবিতাটি হাতে পাওয়ার পরই পরবর্তী সংখ্যায় ছাপা হবে। ভেবেছিলেন এতদিনের আলাপে তার কাব্যবোধ এবং মতামতের উপর ভরসা তৈরি হয়েছে মনরোর। কিন্তু কবিতাটি নিয়ে পাউন্ডের আবেগকে অগ্রাহ্য করায় আহত হন পাউন্ড। তিন বছর বয়সী ‘পোয়েট্রি’ এরই মধ্যে কবিতার কাগজ হিশেবে এক আলোচিত নাম। এখানে ছাপা হয়েছে বিশ্বের আলোচিত কবিদের লেখা। পাউন্ড ছাড়াও এই কাগজে লিখেছেন আইরিশ কবি ডব্লিউ বি ইয়েটস, বাঙালি কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ছাপা হয়েছে উইলিয়াম কার্লোস, কার্ল স্যান্ডবার্গ, মারিয়ান মুর, জন অ্যাশবেরি সহ খ্যাতিমানদের কবিতা।

এতদিন প্রুফ্রক না ছাপার কারণ ব্যাখ্যা করে আসা চিঠিটি পান নভেম্বরে। ১৯১৪ সালের ৯ নভেম্বর মনরোকে লেখা চিঠিতে আরো অনেক বিষয়ের সাথে প্রুফ্রকের প্রসঙ্গ তোলেন পাউন্ড। বলেন আপনার দীর্ঘ চিঠিটি এখন আমার হাতে। আমি বিষণ্ন ও নিরুৎসাহিত বোধ করলেও আপনার কথাগুলো অনেকটা সময় নিয়ে পড়েছি। বোঝার চেষ্টা করেছি এলিয়ট নিয়ে আপনার বিরোধিতার কারণ। এলিয়টের লেখা নিয়ে আপনার যে অভিযোগ, সেটাই কিন্তু এই কবিতার মূল বিষয়। কয়েক ঘণ্টা পর একই দিনে আবারো এলিয়টের পক্ষে, প্রুফ্রকের দুর্বলতার বিরুদ্ধে ওকালতি করতে কলম তুলে নেন এলিয়টের সবচেয়ে বড় শুভার্থী পাউন্ড। মনরোকে লেখেন:

জোর গলায় বলতে চাই, এলিয়টকে আমি কখনোই পাঠকের মন জোগাতে তাদের রুচির কথা ভেবে কবিতা লিখতে বলব না। পাঠকের মনোরঞ্জন করা কবির কাজ নয়। আমি দৃঢ়ভাবে বলতে চাই ১ বছর আগে যখন আপনার পত্রিকার স্বেচ্ছাসেবী কাজ থেকে অব্যাহতি চেয়েছিলাম তখনো আমার মনে কোনো খেদ ছিল না। খোলা মন নিয়েই সরে যেতে চেয়েছিলাম। আপনি এলিয়টের ঠিকানা চেয়েছেন। তার ঠিকানা আপনাকে কখনোই জানাব না। যেন তাকে আরো অপমানিত হতে না হয়।

প্রুফ্রক নিয়ে মনরোর সাথে যুদ্ধ এখানেই থেমে যায় নি। ৩১ জানুয়ারি আবারো এই কবিতা নিয়ে মনরোর তোলা অভিযোগগুলো খণ্ডনের চেষ্টা করেন। মনরোকে বোঝানোর চেষ্টা করেন এবং দাবি করেন, কবিতার শেষদিকে প্রুফ্রকের যে অবস্থান তা হেরে যাওয়ার নয়, শেষ পর্যন্ত জীবনের কাছ থেকে সরে যান নি প্রুফ্রক।

মনরোর অভিযোগ ছিল প্রুফ্রক ব্যর্থতার চিত্র। সে জীবনের কাছে পরাজিত এক ব্যক্তি। যদি এ নিয়ে হৈ চৈ করা হয়, যদি সবখানে প্রুফ্রকের জয়জয়কার পড়ে যায় তাহলে তা হবে নকল শিল্পকে উৎসাহিত করা। মনরোর যুক্তির বিপরীতে পাউন্ড বলেন, আমিও হ্যামলেটকে নিয়ে অনুচ্ছেদটা অপছন্দ করি। এটা এলিয়টের ২১ বছর বয়সের লেখা, একদম প্রাথমিক লেখা। টি এস এলিয়ট এই অধ্যায়টা তার কবিতা থেকে বাদ দেবেন না। এটি এই কবিতার একমাত্র অংশ যেটা ভালো লাগবে পাঠকের। আমার মনে হয় না এতে খুব ক্ষতি হবে কবিতার। শেষ কথা হলো এটি বিদ্রূপের চিত্র। একটি কবিতা এভাবে নিরর্থক সারাংশ হিশেবে শেষ হতে পারে না। আমার চোখে মি প্রুফ্রক একটি সংশোধিত চরিত্র।  যে শূন্যের ওপর ভেসে এবং আগুনের মাঝে দাঁড়িয়ে শ্বাস নিচ্ছে।

অনেক দেন-দরবারের পর শেষ পর্যন্ত ১৯১৫ সালের জুন সংখ্যায় হেরিয়েট মনরো সম্পাদিত পোয়েট্রি পত্রিকায় ছাপা হয় ১৪০ পঙ্‌ক্তির প্রুফ্রক কবিতাটি। দুবছর পর ১৯১৭ সালে লন্ডনের ছোট্ট প্রকাশনা সংস্থা ইগোইস্ট থেকে এটি বই হিশেবে প্রকাশিত হয়। প্রকাশের উদ্যোগ নেয়া ছাড়াও এই বই প্রকাশের জন্য টাকা ধার করেন এজরা পাউন্ড। মোট ১২টি কবিতা রাখা হয় এখানে। প্রথমেই রাখা হয়  ‘দ্য লাভ সঙ অব জে আলফ্রেড প্রুফ্রক’। বইয়ের নাম রাখা হয় প্রুফ্রক অ্যান্ড আদার অবজারভেশন। এই কবিতাটি তাকে প্রথম পরিচিত করে তোলে পাঠকের কাছে। প্রুফ্রকের মাধ্যমেই সাহিত্যে অভিষেক হয় তার।

Jahanara Per

জাহানারা পারভীন

জন্ম ৩০ মে ১৯৭৫, ভৈরব। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় সম্মানসহ স্নাতকোত্তর। পেশায় সাংবাদিক। বর্তমানে বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছেন ইনডিপেনডেন্ট টেলিভিশনে।

প্রকাশিত বই :
কবিতা—
নোঙরের গল্প বাচাচ্ছি [বর্নায়ণ, ২০০২]
নিদ্রাসমগ্র [সময়, ২০০৫]
মা হাওয়ার সন্তান [সময়, ২০০৯]
জলবৈঠক [সময়, ২০১০]
স্কুল বলতে তোমাকেই বুঝি [দীর্ঘকবিতা, নালন্দা, ২০১৫]

প্রবন্ধ—
রিলকে : নৈঃশব্দ্যে ও নিঃসঙ্গতায় [সময়, ২০১০]

ই-মেইল : jahanaraperveen@gmail.com
Jahanara Per

Latest posts by জাহানারা পারভীন (see all)