হোম গদ্য প্রসঙ্গে ফেরা : সোমেন চন্দ

প্রসঙ্গে ফেরা : সোমেন চন্দ

প্রসঙ্গে ফেরা : সোমেন চন্দ
1.08K
0

বাংলা সাহিত্যমোদী মানুষের কাছে সোমেন অপরিচিত নন। প্রগতি ও মার্কসবাদী লেখক হিশেবে তিনি আমাদের কাছে খুব চেনা-জানা একজন। শ্রেণি শোষণের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা ও অসাম্প্রদায়িক মানসে তিনি আমাদের পরোক্ষভাবে অনুপ্রেরণা যুগিয়ে চলেছেন। ‘তরুণের প্রেরণা’, ‘গল্পকার’, ‘সাহিত্যিক’ কিংবা ‘বিপ্লবী’, যে নামেই তিনি বিশেষিত হোন না কেন, প্রকৃত আদর্শ তিনি। সেইসব উদ্যমযোগ—স্বপ্নবান তরুণের কাছে তিনি হয়ে উঠেছেন প্রেরণার অফুরন্ত উৎসধারা। রাজপথে শোষিত মানুষের অধিকার আদায় ও শ্রেণি বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার সংগ্রাম আর লেখালেখির মাধ্যমে সমাজের অসঙ্গতি তুলে ধরার অবিচল অঙ্গিকারে ছিল তার দৃঢ়চেতা মনোভাব। সোমেন চন্দের সাহিত্যে ছিল কৃষক-শ্রমিক-মেহনতি মানুষকে ঘিরে। শোষণ-বৈষম্য থেকে মানুষকে মুক্ত করাই ছিল তার উদ্দেশ্য ও স্বপ্ন। শৈশব থেকে এ স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য নিজেকে তৈরি করতে থাকেন। ইস্পাতদৃঢ় সংকল্প নিয়ে শোষণমুক্তির লড়াই-সংগ্রামের পাশাপাশি তিনি সাহিত্যে বিপ্লব ঘটাতে চেয়েছিলেন। সোমেন চন্দ এমন একজন মানুষ, যার সৃষ্টি হতাশাগ্রস্ত প্রতিটি মানুষকে নতুন আশায় জাগিয়ে তোলে। তিনি যে শুধু তার আপন ভূখণ্ড বাংলাদেশে সাহিত্য অনুরাগীদের অনুপ্রাণিত করেছেন তা কিন্তু নয়। তার ক্ষণজন্মা যাপিত জীবন, মানুষের প্রতি ভালোবাসা এবং নিপীড়িত মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনে কাজ করার তাগিদে অকুতোভয় যোদ্ধা হয়ে ওঠা, শেষ পর্যন্ত মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে নেওয়া—প্রায় সবই অপরিহার্য উপাদান হয়ে উঠেছে তার বিপ্লবী অন্বেষায়। দুই বাঙলায় বিভিন্ন প্রগতি-সৃষ্টিশীল কাজের ক্ষেত্রে সোমেন ও তার জীবনের প্রভাব এখনো দৃপ্তমান।


নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেয়া সোমেন পরিবর্তনে বিশ্বাসী ছিলেন।


১৯২০ সালের ২৪ মে ঢাকার পার্শ্ববর্তী বুড়িগঙ্গার পশ্চিম পারে শুভাড্ডা ইউনিয়নের তেঘরিয়া গ্রামে সোমেন চন্দের জন্ম, মামার বাড়িতে (নরসিংদী জেলার আশুলিয়া গ্রামে)। তবে বাংলা একাডেমি থেকে প্রকাশিত সোমেন চন্দ জীবনী গ্রন্থমালা-এ হায়াৎ মামুদ লিখেছেন : ‘সোমেন চন্দের জন্ম কেরানীগঞ্জ থানার অধীনস্থ পারজুয়ার এলাকায় অবস্থিত ধিতপুর গ্রামে।’ তার বাবার নাম নরেন্দ্রকুমার চন্দের আদিনিবাস ছিল তৎকালীন ঢাকার অন্তর্ভুক্ত নরসিংদী জেলার বালিয়া গ্রামে। ব্রিটিশ শাসিত ভারতে কৃষক শ্রমিক, মেহনতি মানুষের উপর প্রবল আঘাত-নির্যাতন-নিপীড়নের পটভূমিতে তৈরি আবহাওয়ায় মানুুষ নরেন্দ্র চন্দ আদর্শবান মানুষ ছিলেন। বাবার আদর্শ সোমেনের ভেতরে ছোটবেলা থেকেই গড়ে ওঠে।

ছোটকাল থেকে বইয়ের প্রতি আগ্রহ থেকেই সোমেন পাঠাগারমুখী হন। ঢাকার জোড়পুল লেনের প্রগতি পাঠাগার ছিল সাম্যবাদে বিশ্বাসী মানুষদের পরিচালিত। পাঠাগারে পড়তে পড়তে সোমেন বাংলা সাহিত্যে আগ্রহী হয়ে ওঠেন এবং অনুরক্ত হয়ে পড়েন কার্ল মার্কসের তত্ত্বে। ১৯৩৭ সালে সোমেন প্রত্যক্ষভাবে নিষিদ্ধ ঘোষিত কমিউনিস্ট পার্টির কমিউনিস্ট পাঠচক্রে যোগ দিয়ে মার্কসবাদী তত্ত্বে মানব মুক্তির সূত্র খুঁজে পান সোমেন। ওই সময় তিনি কমিউনিস্ট পাঠচক্রের সহযোগী প্রগতি পাঠাগারের পরিচালকের দায়িত্ব নেন। এ সময় তিনি আন্দামান-ফেরত কিংবদন্তি বিপ্লবী সতীশ পাকরাশীর মতো আজীবন বিপ্লবী শিক্ষকের রাজনীতি ও দর্শনের পাঠ নেন। অগ্নিযুগের কথা বইতে স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘১৯৩৯ সালের মাঝামাঝি সোমেন তার দক্ষিণ মৈশুণ্ডী পাড়ায় আমাদের কমিউনিস্ট পাঠচক্রে যোগ দেয়। গোপনে ক্লাস হতো। সে সমস্ত মন-প্রাণ দিয়ে শুনত বেশি, প্রশ্ন করত না।’ রণেশ দাশগুপ্তের সান্নিধ্যে থেকে বঙ্কিম, রবীন্দ্রনাথ, শরৎচন্দ্র, বিভূতিভূষণ, ম্যাক্সিম গোর্কি, মোপাঁসা, রঁলা, বারবুস, জিদ, মারলোসহ আরো অনেকের লেখা পড়েন। জ্ঞান চক্রবর্তীর মতে, ‘কেবল কলম নিয়ে বসে থাকাকে তিনি দায়িত্ব এড়ানোই মনে করতেন।’

স্কুলে পড়াকাল থেকেই গল্প লিখতেন সোমেন। তখন তার প্রকাশিত লেখা বা লেখালেখির কথা পরিবারের কেউ জানত না। ১৯৩৭ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে সাপ্তাহিক দেশ পত্রিকায় প্রকাশিত হয় সোমেনের প্রথম গল্প ‘শিশু তপন’। এরপর আরো উল্লেখযোগ্য কিছু লেখা বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় ওই বছরেই দেখা যায়। বাংলাদেশে বন্যার যে প্রাকৃতিক দুর্যোগ ও দুর্ভোগ, তা নিয়ে সম্ভবত বাংলা সাহিত্যে প্রথম উপন্যাস বন্যা লেখেন সোমেন। তার প্রথম উপন্যাস প্রকাশিত হয় নবশক্তি পত্রিকায়।

নিম্ন মধ্যবিত্ত পরিবারে জন্ম নেয়া সোমেন পরিবর্তনে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন বিপ্লবে। রাজনীতির কলুষ বিবর্জিত দরুন শিল্পের হঠকারিতা তার মধ্যে ছিল না। সাধারণ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রার অনুষজ্ঞ হিশেবে রাজনীতি চলে আসে তার লেখায়। প্রাত্যহিক সাংসারিক কাজের মধ্যে তিনি সহজ-সরলভাবে দেখিয়ে দেন শাসনযন্ত্রের কূপমণ্ডুকতা, সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে থাকা ক্ষমতালিপ্সু সুক্ষ্ম জাল। চেতনাকে এক ধাক্কা দিয়ে জাগিয়ে দেয় তার সরল শব্দগুলো—ভাবতে বাধ্য করে। আত্মপরিচয়ের অনুসন্ধান প্রয়াসে অনুপ্রাণিত করে। ইতিহাসের সবচেয়ে ঘটনাবহুল—ব্রিটিশ উপনিবেশের বিদায়কালে সোমেন আঞ্চলিক সমস্যা যে আন্তর্জাতিক রাজনীতির সমীকরণের একটি উপাত্ত, তা নির্দ্বিধায় বলা যায়। আর তাইতো ‘একটি রাত’ গল্পের সনাতনী মা ছেলের রাজনৈতিক মতাদর্শ বুঝে নিতে বই খুলে বসেন। ১৯৪১ সালের দাঙ্গাকে কেন্দ্র করে সোমেন গল্প লেখেন ‘দাঙ্গা’। এ গল্পে দুই ভাইয়ের আদর্শগত বিরোধের মধ্য দিয়ে রূপক আকারে বেরিয়ে আসে উপনিবেশবাদের শেষ ছোবল জাতিগত বিভেদের ভয়াবহ চেহারাটি। ‘ইঁদুর’ গল্পের ইঁদুরগুলো যেন দারিদ্রেরই প্রতিঘাতের রূপ, যা ক্রমাগত শ্রেণিস্বাতন্ত্র্য টিকিয়ে রাখার লড়াইরত নিম্ন মধ্যবিত্তদের একদণ্ড শান্তিতে থাকতে দেয় না। ‘ইঁদুর’ গল্পটি অনূদিত হয় বিভিন্ন ভাষায়। সোমেন চন্দের ‘ইঁদুর’ ও ‘বনস্পতি’ গল্পের কথা বারবার উল্লেখ করেন হাসান আজিজুল হক, শওকত আলী, আহমদ ছফা। ইঁদুর প্রসঙ্গে লেখক হুমায়ূন আহমেদ বলেন :

সোমেন চন্দের লেখা অসাধারণ ছোটগল্প ‘ইঁদুর’ পড়ার পর নিম্ন মধ্যবিত্তদের নিয়ে গল্প লেখার একটা সুতীব্র ইচ্ছা হয়। ‘নন্দিত নরকে’, ‘শঙ্খনীল কারাগার’ ও ‘মনসুবিজন’ নামে তিনটি আলাদা গল্প প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই লিখে ফেলি।

সোমেন ‘প্রগতি লেখক সংঘ’-তে যোগ দেন এবং মার্কসবাদী রাজনীতি ও সাহিত্য আন্দোলনের সঙ্গে সম্পৃক্ত হন। বাংলা সাহিত্যে প্রথম গণসাহিত্যের ওপর কাজ করেন তিনি। সোমেন চন্দ বলতেন :

বিপ্লবের জন্য একজন লেখক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারেন। আমাদের সেভাবে প্রস্তুত হতে হবে। গোর্কির কথাই চিন্তা করো। শৌখিন সাহিত্য করার আর সময় নেই।


রাস্তার ওপরেই নিহত হন এই তরুণ শ্রমিক নেতা সোমেন চন্দ।


১৯৪১ সালে সোমেন চন্দ প্রগতি লেখক সংঘের সম্পাদক নির্বাচিত হন। মেধাবী সোমেন চন্দের লেখা সাধারণত প্রগতি লেখক সংঘের সাপ্তাহিক বা পাক্ষিক সভাসমূহে পাঠ করা হতো। ১৯৪০ সালে তার ‘বনস্পতি’ গল্পটি ‘ক্রান্তি’ পত্রিকায় ছাপা হয়। মৃত্যুর পর বিভিন্ন গল্প সংকলন প্রকাশিত হয়। ১৯৭৩ সালে রণেশ দাশগুপ্ত তার গল্পসমূহের একটি সংকলন সম্পাদনা করেন। কিন্তু জীবিতাবস্থায় তার কোনো গ্রন্থ প্রকাশিত হয় নি। সোমেন চন্দ পুরস্কারের প্রবর্তন করে পশ্চিমবঙ্গের বাংলা আকাদেমি। পঁয়তাল্লিশ বছরের নিচে গল্পকারদের এ পুরস্কার দেয়া হয়।

১৯৪১ সালের ২২ জুন। হিটলার সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নে আক্রমণ করে। বিশ্বযুদ্ধ নতুন দিকে মোড় নেয়। এ সময় ভারত উপমহাদেশের প্রগতিবাদী জনগণ ফ্যাসিস্ট হিটলারের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় এবং স্তালিনের নেতৃত্বে সংগ্রামরত সোভিয়েত যোদ্ধাদের প্রতি সমর্থন জানিয়ে জনযুদ্ধ ঘোষণা করে। এই আগ্রাসনের বিরুদ্ধে হীরেন মুখোপাধ্যায় ও স্নেহাংশু আচার্যকে আহ্বায়ক করে কবি, শিল্পী, সাহিত্যিক ও রাজনীতিবিদদের নিয়ে বাংলায় গড়ে ওঠে ‘সোভিয়েত সুহৃদ সমিতি’। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৪২ সালের জানুয়ারি মাসে ঢাকায় প্রগতি লেখক সংঘের উদ্যোগে গড়ে ওঠে ‘সোভিয়েত সুহৃদ সমিতি’। এর যুগ্ম সম্পাদক ছিলেন কিরণশঙ্কর সেনগুপ্ত ও দেবপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়। এই সমিতির প্রধান প্রধান কাজগুলোর মধ্যে একটা অন্যতম কাজ ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের আর্থ-সামাজিক ব্যবস্থার অগ্রগতি প্রসঙ্গে চিত্রপ্রদর্শনী করা। এই প্রদর্শনীতে প্রগতি লেখক সংঘে সোমেন চন্দের ভূমিকা ছিল অনন্য। তার অবিরত প্রচেষ্টার ফলে ঢাকায় অল্পদিনের মধ্যে প্রগতি লেখক সংঘ ও সোভিয়েত সুহৃদ সমিতি ফ্যাসিবাদ বিরোধী জনমত গড়ে তুলতে সক্ষম  হয়।

১৯৪২ সালের ৮ মার্চ ঢাকায় এক সর্বভারতীয় ফ্যাসিবাদবিরোধী সম্মেলন আহ্বান করে। পূর্ব বাংলা রেল শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন সোমেন চন্দ। মিছিলটি লক্ষ্মীবাজার হৃষিকেশ দাস লেন মোড়ে গেলে তার উপর অতর্কিত আক্রমণ করে গুণ্ডার দল তাকে নির্মমভাবে হত্যা করে তার চোখ উপড়ে ফেলে, ভোজালি (এক রকম বড় ছোরা বা ছোট তলোয়ার) দিয়ে তার পেট চিরে নাড়ি-ভুঁড়ি বের করে নেয়। যে জিভ দিয়ে তিনি শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের জয়গান করতেন, ফ্যাসিবাদ বিরোধী স্লোগান দিতেন, তার সেই জিভ টেনে বের করে কেটে ফেলে দেয়। গুন্ডা বাহিনী সোমেনের দেহ নিথর-নিস্তব্ধ না হওয়া পর্যন্ত তার চারপাশে আনন্দ উল্লাস করে। রাস্তার ওপরেই নিহত হন এই তরুণ শ্রমিক নেতা সোমেন চন্দ। ফ্যাসিবাদ বিরোধী প্রথম শহিদ লেখক। সরদার ফজলুল করিম তার এই প্রয়াণে স্মৃতিচারণ করেন এইভাবে :

ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলন বাংলার সব জেলা শহরে ছড়িয়ে পড়ে যার মধ্যে ঢাকা শহর ছিল অন্যতম শক্তিশালী কেন্দ্র। ১৯৪২ সালের ৮ মার্চ ঢাকার বুদ্ধিজীবী, লেখক প্রভৃতি শহরে এক ফ্যাসিবাদবিরোধী সম্মেলন আহ্বান করেন। স্থানীয় জেলা পার্টির অনুরোধে কমরেড বঙ্কিম মুখার্জি ও জ্যোতি বসু সেখানে বক্তা হিশেবে যান। সম্মেলন উপলক্ষে শহরে খুবই উত্তেজনা সৃষ্টি হয় এবং রাজনৈতিক মহল প্রায় তিন ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে। প্রথম যারা সম্মেলনের পক্ষে, দ্বিতীয় যারা সরাসরি বিপক্ষে, তৃতীয় যারা মোটামুটিভাবে তূষ্ণীভাব অবলম্বন করে নিরপেক্ষতার আবরণ নিয়েছিলেন। শেষোক্তদের মধ্যে প্রধানত কংগ্রেস মতবাদের অনুসারীরা ও দ্বিতীয় দলে ছিলেন জাতীয় বিপ্লবী, বিশেষত শ্রীসংঘ ও বিভির লোকেরা। যাই হোক, সম্মেলনের দিন সকালে উদ্যোক্তাদের অন্যতম তরুণ সাহিত্যিক সোমেন চন্দ আততায়ীর হাতে নিহত হন। তিনিই বাংলার ফ্যাসিবাদী বিরোধী আন্দোলনের প্রথম শহিদ। কিন্তু এই হত্যাকাণ্ডের পরও যথারীতি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় এবং আমাদের প্রতি আরো লোক আকৃষ্ট হয়। [কিছু স্মৃতি কিছু কথা]

সোমেন চন্দ নৃশংসভাবে নিহত হওয়ার পরে পরিচয় পত্রিকার জ্যৈষ্ঠ ১৩৯৪ সংখ্যার সম্পাদকীয়তে লেখা হয়:

লক্ষ লক্ষ লোকের মৃত্যুর পটভূমিকায় একটি মাত্র লোকের মৃত্যু তুচ্ছ ব্যাপার মনে হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু বিশেষ পরিবেশে একজনের মৃত্যু বহু মৃত্যুর চাইতে বেশি অর্থবহ হতে পারে। সোমেন চন্দের মৃত্যু এই জাতীয়। সোমেনের বয়স বেশি হয় নি, কিন্তু এই অল্প বয়সেই মূল্যবান কাজ করে সে তার তরুণ জীবনকে বিশ্বসম্পদে ঐশ্বর্যবান করেছিল। এই সংখ্যার গত সংখ্যায় ‘ইঁদুর’ নামে যে গল্পটি প্রকাশিত হয়, তাতে তার জীবনের একটিমাত্র দিকের পরিচয় পাওয়া যায়। এই পরিচয় আমাদের আশ্চর্য করে দেয়, কিন্তু এই তার পুরো পরিচয় নয়। সাহিত্যের ক্ষেত্রে তার কৃতিত্ব জীবনের বিস্তৃততর ক্ষেত্রে তার অন্তরঙ্গ অভিজ্ঞতার প্রতিভাস মাত্র। তাকে প্রাণ দিতে হলো বর্বরতার যূপকাষ্ঠে।


আমাদের বিপ্লবী চিন্তাধারায় সোমেনের দৃষ্টিভঙ্গিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।


সোমেন চন্দ প্রয়ানের পর ১৯৪২ সালে কলকাতায় সম্মেলনের সময় ‘প্রগতি লেখক সংঘ’র নামকরণ হয় ‘ফ্যাসিস্টবিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘ’। ১৯৪৫ সালে কলকাতায় আবার এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘প্রগতি লেখক ও শিল্পী সংঘ’। প্রগতি লেখক সংঘ তার স্মরণে প্রতিরোধ নামে একটি বিশেষ সংখ্যা প্রকাশ করে।

আমাদের বিপ্লবী চিন্তাধারায় সোমেনের দৃষ্টিভঙ্গিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবী লালঝাণ্ডায় তার আদর্শকে, তার প্রাসঙ্গিকতাকে ফেরাতে হবে। যদিও সোমেন এখন অনেক বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে। অনেক বেশি জাগ্রত। মানুষের দৈনন্দিন জীবনে, প্রতিবাদে, সংগ্রামে সোমেন রক্তধারার মতো মিশে আছেন। মানুষের জাগরণে অনুপ্রেরণা হয়ে, প্রণোদনা হয়ে প্রতিদিনের সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে চলছেন। যখনই শ্রমজীবী নিপীড়িত মানুষের আলোচনা সামনে আসে, উগ্র সাম্প্রদায়িকতা, মৌলবাদ, ফ্যাসিবাদ ও সাম্রাজ্যবাদ মাথা চাড়া দেয় তখনই সোমেন চন্দের আদর্শ সমুজ্জল হয়ে ওঠে। এটা বিশ্বাস করতে পারি, তাকে নিয়ে লেখা একটি উপযুক্ত শোকগাথায় অবশ্যই তার হত্যার বিরুদ্ধে কেবল উচ্চকিত আমাদের শাণিত প্রতিবাদই নয়, একই সঙ্গে তার জীবনের বেদনাদায়ক উপাখ্যান প্রতিধ্বনিত হবে পরম শ্রদ্ধায়। আমি সেই অলখের শব্দের দিকে তাকিয়ে দেখব, যতক্ষণ না তা আমাদের হৃদয় ও আমাদের রক্তের শিরায় সঞ্চারিত হয়। তাকে ভালোভাবে বুঝতে হলে তার লেখার প্রতি আমাদের জানতে হবে। তাকে পাঠ করতে হবে। অধ্যয়ন করতে হবে তার জীবনসমগ্রতা। তার প্রাণবান সংগ্রামী আদর্শ গণমানুষের হৃদয় দুয়ারে পৌঁছে দেয়া সময়ের জোরাল দাবি। সেই গণদাবির প্রেক্ষাপটেই তিনি আলোচিত হচ্ছেন।

হাবীব ইমন

জন্ম ৭ এপ্রিল ১৯৮০; মাইজদী, নোয়াখালী। এমবিএ। জার্নালিজমে ডিপ্লোমা। পেশা : সাংবাদিকতা।

প্রকাশিত বই :
কবিতা—
অন্ধকার, নীল গান [স্বরাজ প্রকাশনী, ২০১১]
কালো মেয়ের প্রতি ভালোবাসা [স্বরাজ প্রকাশনী, ২০১২]
কবি হয়ে জন্মাতে চাইনি [অভিযান পাবলিশার্স, ২০১৬]

গদ্য—
লেখা-অলেখা [কলামসমগ্র; দেশ পাবলিকেশন্স, ২০১৫]
একুশে ফেব্রুয়ারি : আঁধারে বাঁধা অগ্নিসেতু [সাকী পাবলিকেশন্স, ২০১৩]
মুক্তিযুদ্ধের আগুনমুখো গল্প [সাকী পাবলিকশেন্স]
অধ্যক্ষ আবদুল জলিল [স্মারক, যৌথ সম্পাদনা; স্বরাজ প্রকাশনী, ২০০৯]

ই-মেইল : emonn.habib@gmail.com