হোম গদ্য প্রবন্ধ স্বনির্বাসিত শহীদ কাদরী

স্বনির্বাসিত শহীদ কাদরী

স্বনির্বাসিত শহীদ কাদরী
4.65K
0
বাইশ বছর আগে ১৯৯৪ সালে ‘শহীদ কাদরীর কবিতা’ নিয়ে মজিদ মাহমুদ-এর এই রচনাটি ইত্তেফাকের সাহিত্য-সাময়িকীতে ছাপা হয়েছিল। তারও প্রায় একযুগ আগে কাদরী সাহেব সুখের লাগি স্বদেশ ছেড়ে বিদেশে পাড়ি দিয়েছিলেন। কবি দেশে না থাকলেও তার পরবর্তী প্রজন্মের তরুণ কবিরাও তার কবিতা নিয়ে ভাবতেন, এটি তারই প্রমাণ বহন করে। এই প্রবন্ধটি ২০০৩ সালে ‘বিশ্ব সাহিত্য ভবন’ প্রকাশিত মজিদ মাহমুদের ‘কেন কবি কেন কবি নয়’ গ্রন্থে ঠাঁই পেয়েছে। কিছু পরিমার্জন না করেই পাঠকদের জন্য এটি পুনর্মুদ্রণ করা হলো। যদিও এতদিন আগের রচনা প্রকাশে প্রবন্ধকারের দ্বিধা ছিল, তবু ধারবাহিকতার অংশ হিশাবে এর প্রকাশ।

সুধীন্দ্রনাথ দত্তের ‘অর্কেস্ট্রা’ আলোচনা প্রসঙ্গে বুদ্ধদেব বসু বলেছিলেন—‘কবিদের মধ্যে দুটো জাত আছে; যারা ঝোঁকের মাথায় লিখেন, আর যারা ভেবে-চিন্তে লিখেন, যারা কবিতা লিখেন, না লিখে পারেন না বলে, আর যারা লিখেন লিখতে হবে বলেই। কোনো কোনো কবি আছে স্বভাবতই মাতাল, কোনো কোনো কবি নিতান্তই প্রকৃতিস্থ। প্রথম জাতের কবিদের আবেগই হলো উৎস, দ্বিতীয় জাতের কবিরা বুদ্ধিনির্ভর। কবিতার এ দুটি ভাবে কখনো মেলামেশা হয় না এমন নয়, তবু আলাদা দুই জাত স্পষ্ট চেনা যায়। শেলি, ওয়ার্সওয়ার্থ, রবীন্দ্রনাথ প্রথম জাতের; মিলটন মধুসূদন মোহিতলাল দ্বিতীয় জাতের।’

কিন্তু কাব্যালোচনায় শহীদ কাদরী বোধ করি বুদ্ধদেব বসু উল্লিখিত কোনো জাতেই পড়েন না। ঢাকার কাব্যাঙ্গন থেকে একজন স্বনির্বাসিত কবির নাম শহীদ কাদরী। আজ থেকে প্রায় দেড় যুগ আগে তার তৃতীয় এবং এখন পর্যন্ত শেষ কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল। তিনি বর্তমানে বাংলা কাব্যে জীবন্ত সচল কবিদের দলভুক্ত নন; এমনকি প্রবাসীও। অতএব সামন্য হলেও সময়ের নিরিখে তার কাব্যকীর্তি বিগত কবিদের মতো নিরপেক্ষ বিচারের দাবি রাখে। তিনি আবার যদি কখনো কবিতা লিখেন, তার জন্য হয়তো নতুন বিবেচনার দরকার হবে। এখন পর্যন্ত আমরা অকালপ্রয়াত আবুল হাসান এবং শহীদ কাদরীর মধ্যে এক্ষেত্রে খুব একটা পার্থক্য করব না। কারণ একজন দুনিয়াতে না থেকেও কবিতাতে আছেন, আরেকজন কবিতায় না থেকেও কবিতায় আছেন। পঞ্চাশের শেষের দিকে শহীদ যাদের সঙ্গে কবিতা লিখতে শুরু করেছিলেন তারা এখনো সমান সচল। কেবল কবিতাতে নয়, কলহপ্রিয়তা ও দলাদলিতেও। তবু তাদের কারো কারো হাতে নিত্য নতুন রসোত্তীর্ণ কবিতার জন্ম হচ্ছে। এক্ষেত্রে শহীদ কাদরী সম্পূর্ণ নিরত, আর আমরা তাঁর তরতাজা কবিতা পড়তে না পারার বিরহে কাতর।


মূলত শহীদ কাদরীর নাগরিক বোধ তিরিশের কবিতার সম্প্রসারিত রূপ।


কবিতা শুরুর কিছুদিন পর থেকেই শহীদ কাদরী নামের সঙ্গে নাগরিক অভিধা যুক্ত হয়ে আছে। এই অভিধার সঙ্গে ঐকমত্য পোষণ করলেও কিছু প্রশ্ন থেকেই যায়। অর্থাৎ একজন কবি নাগরিক উপাধিতে ভূষিত এবং তিনি কি পুরোপুরি নাগরিক? এখন প্রশ্ন, নাগরিক বলতে আমরা কী ধরনের বৈশিষ্ট্য প্রধান্য দিয়ে থাকি? তাছাড়া শহীদ কাদরী নাগরিক উপাধির দাবিদার হলে তার সমসাময়িক কিংবা কিঞ্চিদধিক পূর্বেও শামসুর রাহমানের সহজ পরিচয়যোগ্য একটি শিরোনাম প্রযোজ্য। কেননা নগর-কাতরতা শামসুর রাহমানের কোনো অংশে কম ছিল না। ‘হে শহর, হে অন্তর আমার’ কবিতায় তিনি প্রেমিকের অহঙ্কার নিয়ে বলেছেন—‘আমি তো ছিলাম প্রথম আবিষ্কার তোমার সৌন্দর্যের।’ এমনকি ‘খড়ের গম্বুজ’-এর আল মাহমুদ যখন বিচালির গাদায় উপবিষ্ট হয়ে মারফতি গান, পানের বরজ আর হুঁকোতে সুখটান মারার মতো স্মৃতিকাতরতায় আক্রান্ত, তখনো শহরের নিভাঁজ পোশাক খামচে ধরে তার হাঁটু। যা তাকে স্বজনের সাহচর্য আর দেশের মাটির ‘বুকে’ অনায়াসে বসতেই দেয় না। শহরের নিভাঁজ পোশাকের হাতে বন্দি হয়ে থাকেন শিকড়চ্যুত এক কবি। এমতবস্থায় আল মাহমুদকেও অনাগরিক বলা যায় না। এখানে অপ্রাসঙ্গিকভাবে শহীদ কাদরির ‘নিসর্গের নুন’ উদ্ধৃত করা যেতে পারে। কবিতাটি কবি রাফিক আজাদকে উদ্দেশ্য করে রচিত হলেও তার সমসাময়িক কালের কবি এবং তার কাব্যভাবনার একটি চিত্র এতে ফুটে উঠেছে—‘ইতিহাসের তমসায় সশঙ্কিত শামসুর রাহমান দাঁড়িয়ে আছেন চন্দ্রালোকিত মুখে আর মুহ্যমান আল মাহমুদ চট্টগ্রাম টিলার ওপর বুকে পুরে ঝড়ো আবহাওয়ায়—

বেঁচে আছে তোমারই অশেষ কৃপায়
বাংলাদেশ তুমি নাকি কখনো কাউকে
করো নি বিমুখ?
আমাকেই দেখে তুমি
ঘোমটা তবু তুলে দিলে বধূ? তোমার খ্যামটা নাচ
কে দেখে নি। আজীবন রবীন্দ্রনাথ থেকে
শুরু করে তিরিশ ও তিরিশোত্তর অনেকেই’

মূলত শহীদ কাদরীর নাগরিক বোধ তিরিশের কবিতার সম্প্রসারিত রূপ। প্রকৃতার্থে তিরিশের কবিরাই বাংলা কবিতায় নাগরিক পরিমণ্ডলের জন্ম দিয়েছিলেন। ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক বিষ্ণু-দে’র প্রাচ্য পুরাণের কাহিনি, আর সুধীন্দ্রনাথের নিখিল নাস্তির হাহাকার নগরজনের শহরস্য পুরাণ। তারপরেও নিভৃতচারী লক্ষ্মীপেঁচা জীবনানন্দের নাগরিক যন্ত্রণা ভিন্ন মাত্রা যোগ করেছে। এক আশ্চর্য বিস্ময়ে তিনি নগরজনের যন্ত্রণা ও একাকিত্বের বেদনা অঙ্কন করেছেন। এমনকি তিনি যে রূপসী বাংলা রচনা করেছেন তাও নাগরিক স্মৃতি-শ্রুতির বাংলা বই নয়। তাছাড়া যখন ‘হাইড্যান্ট খুলে কুষ্ঠরোগী চেটে নেয় জল।’ কিংবা ‘নগরীর মহৎ রাত্রিকে তার মনে হয় লিবিয়ার জঙ্গলের মতো। তবু অনুপূর্ব-অতিবৈতনিক বস্তুত কাপড় পড়ে লজ্জাবশত।’ তিনি যখন বলেন—‘সহস্র চোখ না যোনি এতদিন পর আজ কলকাতার শরীরে।’ তখন নগর সম্বন্ধে রূপসী বাংলার কবির এই নাগরিক বোধকেও অনাগরিক মনে হয় না। উপরন্তু বুদ্ধদেব বসু আর পুরোমাত্রায় নাগরিক অমিয় চক্রবর্তীকে বাদ দিলেও তিরিশোত্তর বাংলা কবিতা মূলত নগরসংশ্লেষ। অন্যভাবে বলা যায়, আধুনিক কবিতা মানেই নাগরিক কবিতা। মধুসূদনের হাতেই যার সূচনা হয়েছিল।

অবশ্য এ কথাও ঠিক, এ পর্যন্ত বাংলাদেশ কতখানি নগরায়ন হয়েছে! নগর-বাসিন্দাদের অধিকাংশের এখনো শিকড় প্রবিষ্ট গ্রামে। চেতনার কেন্দ্রভাগ দখল করে আছে গ্রাম। শহীদ কাদরীর কবিতাও গ্রামীণ অনুষঙ্গ-বিচ্ছিন্ন নয়। তবে গ্রামের জন্য হাহাকার শহীদ কাদরীর প্রথম পর্যায়ের কাব্যে অনুপস্থিত। তবু কবির কোনো অভিধা তার সমগ্র সৃষ্টির পরিচয় বহন করে না।

পঞ্চাশের বিনির্মীয়মাণ ঢাকা নগরীতে শহীদ কাদরী বেড়ে উঠেছিলেন। তার বর্ধিষ্ণু কৈশোর আর যৌবন কেটেছিল এই নগরে। দ্রুত পরিবর্তনশীল নগর শহীদ কাদরীকে আহত ও উদ্বেলিত করেছিল। শহীদ কাদরীর প্রথম কাব্যগ্রন্থ উত্তরাধিকার প্রকাশিত হয় ১৯৬৭ সালে। শহরসংশ্লিষ্ট শব্দ বোধ আর বিষয় নির্বাচন করেছেন তিনি এই কাব্যে। এই গ্রন্থের প্রথম কবিতা ‘বৃষ্টি, বৃষ্টি’। যা আধুনিক বাংলা কাব্যে একটি বিশিষ্টতা দাবি করতে পারে। কারণ এ কবিতায় বৃষ্টির সংবেদ নতুন করে রচিত হয়েছিল। বাংলাকাব্যে রবীন্দ্রনাথ বর্ষার নতুন রূপ দিয়েছিলেন। বলা চলে বাংলা কাব্যে বর্ষাকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তিনি। তারও আগে বৈষ্ণর কবিদের বর্ষা রাধার মনোবেদনা প্রকাশের বাহন হয়ে বর্তমান সময়কেও স্পর্শ করেছিল। আর কবি কালিদাসের বর্ষা তো রীতিমতো মানুষের অনুভূতির সমান্তরালে রয়ে গেছে। মেঘদূত, পবন যার বাহন তাকেই কুবেরের শাপগ্রস্ত যক্ষ বন্ধু ও আশ্রয় ভেবেছেন। বন্দির মনোবেদনা প্রকাশের আর কোনো উত্তম উপায় তার জানা ছিল না। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, ‘বিষয় কর্মের এই ক্ষুদ্র সংসারে আমরাও যক্ষের মতো বন্দি হয়ে আছি। কিন্তু যখন আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে স্নিগ্ধঘনমেঘ দিকচক্রবাল আচ্ছন্ন করে আসে তখন আমাদের মন উজ্জয়িনীর অলকা নাম্নী এক অপরিচয়ের আত্মীয়ের কাছে ছুটে যেতে চায়।’ রবীন্দ্রোত্তর বাংলা কাব্যেও বর্ষা বন্দনা কম হয় নি। অবশ্য আশ্চর্য বটে জীবনানন্দের কাব্যে বর্ষার উপস্থিতি প্রায় দুর্লভ। এমনকি বর্ষা সংক্রান্ত অাদিখ্যেতাও অনুপস্থিত। জীবনানন্দ সচেতনে না অবচেতনে বর্ষা এড়িয়ে গেছেন, তা আমাদের জানা নেই। কিন্তু শহীদ কাদরী তাঁর যুগ ও প্রতিবেশগ্রাহ্য বৃষ্টির এক নবরূপ অঙ্কন করেছেন। যা পুরাতন বৃষ্টিবোধের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়।


মানবের সীমাবদ্ধতা ও অপারগতার আবিষ্কার। এক বিবর্ণ গোষ্ঠীর শেষ বংশজাত তিনি। কিন্তু সত্যসন্ধ দুরন্ত সন্তান।


‘সহসা সন্ত্রাস ছুঁলো। ঘর ফেরা রঙিন সন্ধ্যার ভীড়ে/ যার ছিল তন্দ্রালয় দিগ্বিদিক ছুটল চৌদিকে ঝাঁকে ঝাঁকে লাল আরশোলার মতো।’ নগরবাসীর বর্ষা সংক্রান্ত বোধ তিনিই প্রথম অঙ্কন করলেন।

বৃষ্টি পড়ে মোটরের বেনেটে টেরচা
ভেতরে নিস্তব্ধ যাত্রী, মাথা নিচ
ত্রাস আর উৎকণ্ঠায় হঠাৎ চমকে
দ্যাখে,—জল
বিমর্ষ স্মৃতির ভার নিয়ে সহর্ষে সদলবলে
বয়ে চলে জল পৌরসমিতির মিছিলের মতো
নর্দমার ফোয়ারার দিকে,—

শহীদ কাদরীর আগে বৃষ্টিকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি বাংলা কাব্যে লক্ষ করা যায় নি। সামন্য হলেও একে আমরা বাংলা কবিতায় সংযোজন বলতে পারি। যাকে মৌলিকতা বলা যায়। তার প্রথম কাব্যগ্রন্থের দ্বিতীর কবিতার নাম ‘নপুংশক সন্তের উক্তি’। এই কবিতাটি মূলত কবি আত্ম-আবিষ্কারের কাহিনি। যা প্রত্যেক মহৎ কবির থাকে। অর্থাৎ কবির ‘আমি’র উদ্বোধন। রবীন্দ্রনাথের ‘নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গ’ নজরুলের ‘বিদ্রোহ’সহ একাধিক কবিতায় তা লক্ষ করা গেছে। তিরিশের কবিতাতেও পূর্ববতী কবিদের সম্প্রসারিত বোধের প্রকাশ আমরা দেখেছি। ‘অকেস্ট্রা’ কবিতাতে সুধীন্দ্রনাথ যার দীর্ঘ বর্ণনা দিয়েছেন। আবার জীবনানন্দ দাশ—

আমি সেই পুরোহিত—সেই পুরোহিত
যে নক্ষত্র মরে যায়, তাহার বুকের শীত
লাগিতেছে আমার শরীরে

এসব কবিতাতে কবির মৌল চেতনার সাযুজ্য রয়েছে। এতে রয়েছে কবির অহং এবং Fillings of Existence-এর বর্ণনা। যার সঙ্গে বিলম্বিত পঞ্চাশের কবি শহীদ কাদরীর নপুংশক সন্তের তফাত রয়েছে। কবির পুরোহিত এখানে বিদ্রোহী ভৃগু কিংবা রবিকর নয়। মানবের সীমাবদ্ধতা ও অপারগতার আবিষ্কার। এক বিবর্ণ গোষ্ঠীর শেষ বংশজাত তিনি। কিন্তু সত্যসন্ধ দুরন্ত সন্তান।

শহীদ কাদরীর কবিতা একটি সময়কে ধারণ করে আছে। তার কয়েকটি পঙ্‌ক্তি একটি গুরুত্বপূর্ণ সময়ের ইতিহাস রচনা করেছে। যেখান থেকে স্খলিত হবার আশঙ্কা কম। সময়ের রূপদান তার শ্রেষ্ঠ কীর্তি। শামসুর রাহমানের বহু কবিতা দখল করে আছে স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ। তাছাড়া তৎকালীন সময়ের অনুপস্থিতি কোনো কাব্যকারের ম্যধ্যই ছিল না। তবু শহীদ কাদরী ছিলেন এক্ষেত্রে ব্যতিক্রম। শামসুর রাহমানের তৎকালীন কবিতাতে ছিল যুদ্ধবিরোধী প্রত্যাশা এবং মানুষকে সংগঠিত করার ইতিবাচক উত্তেজনা। আর আল মাহমুদে ছিল ভিন্ন বাংলাদেশ পুনর্গঠনের প্রত্যাশা, কিন্তু শহীদ কাদরী এক্ষেত্রে প্রত্যক্ষ্যদর্শী নিরপেক্ষ ইতিহাসানুগ। এখানে তিনি নপুংশক সন্ত—তার প্রথম কাব্যগ্রন্থ উত্তরাধিকার —এই নাম কবিতার মধ্যেই তিনি তৎকালীন বাংলাদেশ এবং তার মানসিক মানচিত্র অঙ্কন করেছেন—

‘কাঁটাতারে ঘেরা পার্ক, তবু কুচকাওয়াজ সারিবদ্ধ/ সৈনিকের। হিরন্ময় রৌদ্রে শুধু জ্বলজ্বলে গম্ভীর কামান,/ ভোরবেলা সচকিত পদশব্দে ঝড়ো বিউগলে গাছপালা, ঘরবাড়ি হঠাৎ বদলে গেছে রাঙা রণাঙ্গনে/ শৃঙ্খলিত, বিদেশির পতাকার নিচে আমরা শীতে জড়ো জড়ো/  নিঃশব্দে দেখছি প্রেমিকার দীপ্তি মুখ থেকে জ্যোতি ঝরে গেছে/ এই মতো চলে জীবনের সাথে কানামাছি খেলা…

কিংবা তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা কাব্যে ‘রাষ্ট্র মানেই লেফ্‌ট রাইট’ কবিতা—

রাষ্ট্র বললেই মনে হয় নিষিদ্ধ প্যামপ্লেট
গোপন ছাপাখানা, মেডিক্যাল কলেজের মোড় ‘ছত্রভঙ্গ জনতা’—
দুইজন নিহত, পাঁচজন আহত—রাষ্ট্র বললেই
সারি সারি ক্যামেরাম্যান
দেয়ালে পোস্টার

অথবা ‘নিষিদ্ধ জার্নাল থেকে’ কবিতা—

শহর ছেড়ে চলে যাবে সবাই
(এবং চলে যাচ্ছে দলে দলে)
কিন্তু ধ্বংসগুণ স্পর্শ করে আমরা কয়েকজন
আাজীবন রয়ে যাব বিদীর্ণ স্বদেশে, স্বজনের লাশের আশে-পাশে
তাই তার দেখা পাব বলে দানবের মতো থাকি ট্রাকের
অনুর্বর উল্লাস উপেক্ষা করে, বিধ্বস্ত ব্যারিকেডের পাশ ঘেঁষে
বেরিয়েছি ২৭শে মার্চের সকালে কান্নাকে কেন্দ্রভূত করে


আধুনিক বাংলা কবিতায় ব্যঙ্গ ও বিরোধাভাসে শহীদ অনন্য


যুদ্ধের বিনাশী তৎপরতার মধ্যেও শহীদের কাব্যে তীক্ষ্ণ রোমান্টিক কৌতুকবোধ কাজ করেছে। যুদ্ধ কবির সহজাত আনন্দ কেড়ে নিতে পারে নি। যুদ্ধ তাকে শাণিত করেছে। বেঁচে থাকার বিকল্প পথ-নির্দেশনা দিয়েছে। গভীরভাবে লক্ষ করলে শহীদের কাব্যে একটি ব্যতিক্রম লক্ষ করা যাবে—তা হলো, শহীদ তার কবিতাকে সময়ের প্রয়োজনে খাপ খাওয়াতে পেরেছেন। সময়ের উত্তরণ কিংবা অবতরণ তার লক্ষ্য নয়। সময়ের রূপদানের অসীম স্পৃহা তাকে ব্যতিক্রম করেছে। তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা কাব্যগ্রন্থের, ‘রাষ্ট্র প্রধান কি মেনে নেবেন’ শীর্ষক কবিতায় কবির যুদ্ধ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতি তীব্র কটাক্ষ এবং আত্মসচেতনমূলক উচ্চারণ লক্ষ করা যায়। আধুনিক বাংলা কবিতায় ব্যঙ্গ ও বিরোধাভাসে শহীদ অনন্য—

রাষ্ট্র-প্রধান কি মেনে নেবেন আমার প্রস্তাবগুলো
পররাষ্টনীতির বদলে প্রেম মন্ত্রীর বদলে কবি
জেনারেলদের হুকুম দেবেন রবীন্দ্রচর্চার
মন্ত্রীদের কিনে দেবেন সোনালি গিটার

শহীদ কাদরী ‘প্রেম’ শিরোনামে একটি কবিতা রচনা করেছিলেন। এতে প্রথমেই অডেনের একটি চরণ ছিল : ‘We must love one another or die’ শহীদ কাদরী বলছেন, ‘মাঝে মাঝে মনে হয় শীতরাতে শুধু কম্বলের জন্য, দুটো চাপাতি এবং সামান্য শব্জির জন্য কিংবা একটু শান্তির আকাঙ্ক্ষায়, কেবল স্বস্তির জন্য বেদনার অবসান চেয়ে তোমাকে হয়তো কিছু বর্বরের কাছে অনায়াসে বিক্রি করে দিতে পারি। কিন্তু এখন এই মুহূর্তে এই স্বীকারোক্তির পরে মনে হলো, হয়তোবা আমি তা পারি না—হয়তো আমি তা পারব না।’ প্রেমের শাশ্বত স্বীকারোক্তির পরেও শহীদ এখন অকপট। কাম ও রিরংসা তার কাব্যে শৈল্পিক রূপ নিয়েছে—

কালো রাত্রির সফেদ অশ্বারোহী
নেচে ওঠে যেনো তাল-মান-ছেঁড়া লয়ে
এই দ্যাখো ফের উজ্জ্বল উত্থান!

তবে তার প্রেমের কবিতার মধ্যেও অঙ্কিত হয়েছে আধুনিকতার সংকট ও হাহাকার। অমিয় চক্রবর্তীকে লেখা ‘সঙ্গতি’ কবিতার মধ্যে ধরা পড়েছে আধুনিক কালের মৌল সঙ্কট। আবিষ্কার করেছেন উপস্থিত সত্য—

বন্য শূকর খুঁজে পাবে প্রিয় কাদা
মাছরাঙা পাবে অন্বেষণের মাছ
কালো রাতগুলো বৃষ্টিতে হবে শাদা
ঘন জঙ্গলে ময়ুর দেখাবে নাচ

প্রেমিক মিলবে প্রেমিকার সাথে ঠিকই
কিন্তু শান্তি পাবে না, পাবে না—

কেউ কেউ শহীদ কাদরীকে নিসর্গবোধের বিপরীত বোধের কবি হিশাবে উল্লেখ করে থাকেন। শহরের ঝামা ইট আর কাঠের বাস্তবতার সঙ্গে নিসর্গের বিরোধ কোথায় বোঝা মুস্কিল। একার্থে মানুষ তো নিসর্গের সন্তান, কবিরা তো বটেই। শহীদ কাদরীও তার ব্যত্যয় নন। যদিও তিনি বলেছেন—

আমি করাত কলের শব্দ শুনে মানুষ
আমি জুতোর ভেতর মোজার ভেতর
সেঁধিয়ে যাওয়া মানুষ

তবু নিসর্গের জন্য শহীদ কাদরীর হাহাকার কোনো অংশে কম ছিল না। তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা কাব্যগ্রন্থের একটি কবিতা ‘ব্যক্তিগত বিপর্যয়ের জার্নাল থেকে’—

রাত্রে গাছের পাতা আর ঘাসের ফাঁকে ফাঁকে
খুচরো পয়সার মতো ছড়ানো জ্যোৎস্নারাজি দেখে
ভিক্ষুকের মতো বারবার আমি দাঁড়িয়েছি—
হাতের রুক্ষ তালু প্রসারিত করে
সেবাপরায়ণ গাছগুলো নিপুণ নার্সের মতো
দাঁড়াবে আমার কাছে
ওষুধের ফোঁটার মতো বিন্দু বিন্দু
প্রতিশ্রুতিশীল শিশির গলাধঃকরণ করে
নিন্দ্রা যাব নিশ্চিন্তে নিশীথে।’

শহীদ কাদরীর কবিতা পড়তে পড়তে আমার মনে হয়েছে, তাকে নাগরিক কবি বলা হলেও শেষ পর্যায়ের কবিতাতে তিনি নিসর্গের সান্নিধ্য পেতে চেয়েছেন। ‘নিসর্গ আবার তার মোহন ছদ্মবেশ’ ধরে কবিকে ভুলিয়ে ভালিয়ে তার কাছে টেনে নিয়েছে। তাই শহীদের শেষ কাব্যগ্রন্থ তোমাকে অভিবাদন প্রিয়তমা’র অধিকাংশ কবিতায় নিসর্গের সংশ্লেষ লক্ষ করা যায়। এসব কবিতায় ব্যবহার হয়েছে ফুল, পাখি, পুষ্পদল, গ্রীষ্মের জোনাক-জ্বলা-রাত, চমৎকার হাওয়া, বটগ্রামের শিউলিতলা, মোরগের চোখের মতো খুব ছেলেবেলা, পোকা-মাকড় ভরা হৃদয় প্রজাপতি, মধুপুর ডাকবাংলো, ছ’ফুট উচু ঘাস, তাল তাল কাদা, মেধার চেয়ে অধিক মেধাবী জ্যোৎস্নায়, তরমুজের ক্ষেত, টমেটোর লাল, ডুবসাঁতার, চিৎসাঁতার, হীরের পাতের মতো জ্বলে উঠে তোমাদের নিজস্ব বনেট প্রভৃতি শব্দ ও বাক্যবন্ধ। এইভাবে শহীদ কাদরীর কবিতা শহর থেকে প্রকৃতির দিকে ধাবিত হয়েছে। তিনি হয়ে উঠেছেন স্বতন্ত্র কণ্ঠস্বর। সীমাবদ্ধ দৃষ্টিভঙ্গি তাঁকে সংকীর্ণ করে তোলে নি। সময়ের পরিবর্তনে আজকের বাংলা কবিতা কিছুটা রূপ পাল্টালেও শহীদ কাদরী একটি সময়ের অতি ব্যতিক্রমী কণ্ঠস্বর।

মজিদ মাহমুদ

মজিদ মাহমুদ

জন্ম ১৬ এপ্রিল ১৯৬৬, পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার চরগড়গড়ি গ্রামে। এম.এ (বাংলা), ১৯৮৯, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। লেখালেখি ঠিক রেখে কখনো সাংবাদিকতা, কখনো শিক্ষকতা; আর পাশাপাশি সমাজসেবা।

প্রকাশিত বই:
কবিতা—
মাহফুজামঙ্গল (১৯৮৯), গোষ্ঠের দিকে (১৯৯৬), বল উপখ্যান (২০০০), আপেল কাহিনী (২০০১), ধাত্রী ক্লিনিকের জন্ম (২০০৫), নির্বাচিত কবিতা (২০০৭), কাঁটাচামচ নির্বাচিত কবিতা (২০০৯), সিংহ ও গর্দভের কবিতা (২০১০), শ্রেষ্ঠ কবিতা (২০১১), দেওয়ান-ই-মজিদ (২০১১), গ্রামকুট (২০১৫), কবিতামালা (২০১৫)।

প্রবন্ধ ও গবেষণা—
নজরুল তৃতীয় বিশ্বের মুখপাত্র (১৯৯৭), কেন কবি কেন কবি নয় (২০০১), ভাষার আধিপত্য ও বিবিধ প্রবন্ধ (২০০৫), নজরুলের মানুষধর্ম (২০০৫), উত্তর-উপনিবেশ সাহিত্য ও অন্যান্য (২০০৯), রবীন্দ্রনাথের ভ্রমণ-সাহিত্য (২০১১), সাহিত্যচিন্তা ও বিকল্পভাবনা (২০১১), রবীন্দ্রনাথ ও ভারতবর্ষ (২০১৩), নির্বাচিত প্রবন্ধ (২০১৪), সন্তকবীর শতদোঁহা ও রবীন্দ্রনাথ (২০১৫), ক্ষণচিন্তা (২০১৬)।

গল্প-উপন্যাস—
মাকড়সা ও রজনীগন্ধা (১৯৮৬), মেমোরিয়াল ক্লাব।

শিশু সাহিত্য—
বৌটুবানী ফুলের দেশে (১৯৮৫), বাংলাদেশের মুখ (২০০৭)

সম্পাদনা—
বৃক্ষ ভালোবাসার কবিতা (২০০০), জামরুল হাসান বেগ স্মারকগ্রন্থ (২০০৩); পর্ব (সাহিত্য-চিন্তার কাগজ)

অনুবাদ—
অজিত কৌড়ের গল্প (২০১৬), মরক্কোর ঔপন্যাসিক ইউসুফ আমিনি এলালামির নোমাড লাভ এর বাংলা অনুবাদ ‘যাযাবর প্রেম’

ই-মেইল : mozidmahmud@yahoo.com
মজিদ মাহমুদ