হোম গদ্য প্রবন্ধ শয়নঘরের দর্শন : মার্কি দ্য সাদ

শয়নঘরের দর্শন : মার্কি দ্য সাদ

শয়নঘরের দর্শন : মার্কি দ্য সাদ
286
0

তোমাদের বলছি, এসো, উপলব্ধি করো, নিজ সম্মতি ছাড়াই

আমরা নিক্ষেপিত হয়েছি এই ভীতিকর জীবনে আর চেতনার বিকাশের পর থেকেই

উত্ত্যক্ত বোধ করেছি সেইসব মানুষের কুতর্কে যারা আমাদের এই সন্দেহ থেকে লাভবান হয়;

যদি আনন্দের একটু ক্ষুদ্র মুহূর্তকে কেড়ে নেই জীবনের পাথুরে পথে যদি ক্বচিৎ

একটি গোলাপও ফোটাতে পারি তাহলে অনুভূতির চাহিদা পূরণের জন্য আমাদের সবকিছুকে

উৎসর্গ করা উচিত; এটাই শয়নঘরের দর্শন…

[শয়নঘরের দর্শন: উৎসর্গ বাক্য, মার্কি দ্য সাদ]

 

এটা হয়তো স্পষ্টই, যে কামের দুটো রূপ: একটি তপশ্চর্যা ধরনের, অন্যটি লাম্পট্য প্রকৃতির। প্রথমটির উদাহরণ রয়েছে সিম্পোজিয়াম-এ, বা দান্তের লা দিভিনা কম্মেদিয়ায়, বা চণ্ডীদাস-রজকিনী প্রেমকাহিনিতে, বা আরও অনেক প্রেমের ঘটনায়; অপরটির উদাহরণ প্রথমত এবং প্রধানত সাদ-এর লেখালেখিতে। আরিস্তোতলের সিম্পোজিয়াম-এ দাইআতাইমা সোক্রাতেসকে বলছেন, ‘‘প্রিয় সোক্রাতেস, … দৈহিক সৌন্দর্য দেখলেই তোমরা এমনভাবে উল্লসিত হয়ে ওঠো যে, তোমাদের ইচ্ছা হয় যেন আহার-নিদ্রা পরিত্যাগ করে বিরামহীনভাবে সেই রূপসীর সঙ্গসুখ কামনা করো, তার তনুদেহের সুধা পান করো, আর কাটিয়ে দাও অনন্তকাল। কিন্তু যে ব্যক্তি দেহমন-সম্পর্কিত সামান্য জড়পিণ্ডের সৌন্দর্যে মুগ্ধ না হয়ে পবিত্র এবং আপামর পরাসৌন্দর্যের দেখা পায়, তার মনের বিমলানন্দ তোমাকে বোঝাব কেমনে?’’ এর বিপরীতে সোক্রাতেস কিছু বলেন নি, কিন্তু মার্কি দ্য সাদ এই কামপীড়ন নিয়ে বলছেন, ‘‘কেউ যেন আমাকে মন্দের সমর্থক হিশেবে অভিযুক্ত না করে; কেউ যেন না বলতে পারে যে খারাপ কাজকে উৎসাহিত করেছি আমি বা সিধেসাপটাভাবে অন্যায়কারীদের মনে অনুতাপের জন্ম দিয়েছি: আমার একমাত্র উদ্দেশ্য হলো বলতে গেলে, জীবনে প্রথম বুঝদার হওয়ার পর থেকেই এসব উদ্যমের মাধ্যমে আমার চেতনায় কুরে কুরে খাওয়া এইসব চিন্তাকে ভাষারূপ দেওয়া; হয়তো এই চিন্তাগুলো অন্য অনেকের চিন্তার সাথে বা অধিকাংশ মানুষের সাথে সংঘর্ষময়, বা আমি ছাড়া বাকি সব মানুষের সাথে দ্বন্দ্বাত্মক হওয়ার কারণেই তাদের কাছে অবদমনযোগ্য বলে আমি মনে করি না। সেসব সন্দেহযুক্ত আত্মারা, যারা আমার লেখার প্রকাশে ‘বিচলিত’ হতে পারে, আমি বলব, তাদের নিজের জন্যই তারা সবচেয়ে খারাপ। আমি কেবল সেইসব মানুষদের জন্যই লিখছি যারা বস্তুনিষ্ঠ চোখ দিয়ে তাদের সামনে যা কিছু রয়েছে, সবকিছুকেই পরীক্ষা করতে সক্ষম। এরাই সততায় অবিচল থাকা মানুষ।’’

আমরা ইংরেজি স্যাডিজম ও ম্যাসোশিজম শব্দ দুটোর সাথে পরিচিত, এই দুটো শব্দই এসেছে দুজন লেখকের নাম থেকে : একজন অষ্টাদশ শতাব্দীর ফরাসি লেখক দোনাঁশিয়েঁ আলফোসঁ ফ্রাসোয়াঁ দ্য সাদ (১৭৪০-১৮১৪) অন্যজন ঊনবিংশ শতাব্দীর অস্ট্রীয় জার্মানভাষী লেখক ও সাংবাদিক লেয়োপোল্ড রিটার ফন জাখার-মাজোখ (১৮৩৫-১৮৯৫)। স্যাডিজম ও ম্যাসোশিজম পরস্পরবিরোধী কামস্বৈরিতা : প্রথমটি হলো কোনো নারীসঙ্গীকে কামবাসনার অঙ্গ হিশেবে পীড়ন ও অত্যাচার, দ্বিতীয়টি হলো কোনো নারীর কাছে কোনো পুরুষের অত্যাচারিত হওয়ার বাসনা। প্রথমটি হলো সুখের অভিজ্ঞতা আর দ্বিতীয়টি হলো কষ্ট পাওয়ার অভিজ্ঞতা। ১৮৮১ সালে শোবাল ভেইল ক্লেভেনগার একটি মৌলিক ও ভিন্ন যৌনপ্রৈতির মডেল উপস্থাপন করেন যেখানে তিনি বলেন, কামোদ্দীপনার উৎস হলো ক্ষুধা। কিছু উন্নত প্রাণীর ওপর গবেষণা চালিয়ে ক্লেভেনগার বলেন : উন্নত প্রাণীর কামড় এমনকি আলিঙ্গনও এই জাতীয় সিদ্ধান্তের উদাহরণ। ক্লেভেনগারের এই মডেল প্রাণিজগতের নানা ধরনের শারীরিক সঙ্গমকে ব্যাখ্যায় কাজে লাগে, বিশেষত প্রাণীদের যৌনমিলনকালে হিংস্র আচরণকে তা দিয়ে ব্যাখ্যা দেওয়া যায়। ক্লেভেনগারের এই যৌনপ্রৈতির জৈব মডেল সম্প্রসারিত হয় : রিশার্ড ফন ক্রাফ্ট-ইবিং তার সাইকোপ্যাথিয়া সেক্সুয়ালিস-এর ১৮৯০ সালের সংস্করণে ধর্ষ ও মর্ষকামকে সাদ ও মাজোখের নামে নামকরণ করে নতুন ব্যাখ্যায় বিষয়গুলোকে উপস্থাপনের চেষ্টা করেন। ক্রাফ্ট-ইবিংয়ের ভাষায় মর্ষকাম হলো: ‘‘মনস্তত্ত্বীয় যৌনজীবনের এক অদ্ভুত বিকৃতি যাতে বিপরীত লিঙ্গের অন্য একজনের প্রভুত্ব, অবমাননা ও অভদ্রতায়, পুরোপুরি এবং শর্তহীনভাবে তার অভীপ্সার নিয়ন্ত্রণের দ্বারা ব্যক্তির যৌনানুভূতি ও ভাবনা আক্রান্ত হয়। এই ধারণা যৌনোপলব্ধির দ্বারা রঞ্জিত হয়; মর্ষকামী বাঁচে এমন এক বিকল্পনে যেখানে সে নিজেই এ ধরনের অবস্থার জন্ম দিতে থাকে, আর এসব কিছুকে বুঝতে সব সময় চেষ্টাই করে না।’’ যা-ই হোক, ধর্ষকামের উৎস-লেখক সাদের জীবন ও রচনা, অপরটির উৎসও মাজোখের লেখা উপন্যাস, বিশেষত ১৮৭০ সালে প্রকাশিত উপন্যাসিকা ভিনাস ইন ফার্স, যা ছিল তার পরিকল্পিত ধারাবাহিক লেখা ‘কেইনের উত্তরাধিকার’-এর অন্যতম একটি খণ্ড। যদিও মাজোখের ব্যক্তিজীবন সাদের মতো এতটা ঘটনাবহুল ও আশ্চর্যকর নয়, তবু একই ধরনের যৌনবিকৃতির ধারণার উদ্‌গাতা হিশেবে তিনি আজ স্মরণীয়। তিনি জন্মগ্রহণ করেন অস্ট্রিয়ার লেমবার্গে, ১৮৩৬ সালের ২৭ জানুয়ারি। প্রাগে এবং গ্রাৎসে তিনি আইনবিজ্ঞান নিয়ে পড়াশোনা করেন, পরে গ্রাৎস বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হন। প্রথম দিকে তিনি বেশকিছু ঐতিহাসিক কাজ করেন, পরে এসব ছেড়ে সাহিত্যে মনোনিবেশ করেন পুরোপুরি। ১৮৯৫ সালের ৯ মার্চ জার্মানির লিন্ডহাইমে তিনি মারা যান।


পুরুষ এমন একজন যে আকাঙ্ক্ষা করে আর নারী হলো এমন একজন যে হয় আকাঙ্ক্ষিত।


ভিনাস ইন ফার্স-এর কাহিনির মতোই তিনি তার প্রণয়িনী বা রক্ষিতা বারোনেস ফানি পিস্টর-এর সাথে একই ঘটনা ঘটান, অর্থাৎ ছয় মাসের জন্য নিজেকে তার দাস হিশেবে চুক্তিবদ্ধ করেন এই শর্তে যে, বিশেষত মনমেজাজ খারাপ থাকার সময়ে সে পশমের (ফার) নরম পোশাক পরে থাকবে। মাজোখ এ উদ্দেশ্যে চাকরের চিরপরিচিত ‘‘গ্রেগর’’ নাম গ্রহণ করেন এবং তারা একসাথে ইতালি ভ্রমণে যান। তিনি রেলগাড়ির তৃতীয় শ্রেণিতে ভ্রমণ করেন, অন্যদিকে প্রণয়িনীকে ভ্রমণ করানো হয় প্রথম শ্রেণিতে। তারা ভেনিসে (উপন্যাসে ফ্লোরেন্স) যান, যেখানে তারা ছিলেন অপরিচিত। অস্ট্রীয় মনোচিকিৎসক রিশার্ড ফ্রাইহের ফন ক্রাফ্ট-এবিং ১৮৮৬ সালে প্রথম তার সাইকোপ্যাথিয়া সেক্সুয়ালিস গ্রন্থে ম্যাজোশিজম শব্দটির আমদানি ঘটান এবং মাজোখকে ‘‘ম্যাজোশিজমের কবি’’ বলে আখ্যায়িত করেন যদিও মাজোখের পছন্দ হয় নি এই উপাধি। ভিনাস ইন ফার্স উপন্যাসে মাজোখ বলেন, ‘‘হায়, ভালোবাসা পর্যন্ত নারী থাকে বিশ্বস্ত, কিন্তু তুমি দাবি করো যে প্রেম-টেম ছাড়াই সে থাকবে বিশ্বস্ত আর কোনো আনন্দ ছাড়াই সে কেবল নিজেকে দিতে থাকবে। কে তখন নিষ্ঠুর হয়, নারী নাকি পুরুষ?’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘পুরুষ এমন একজন যে আকাঙ্ক্ষা করে আর নারী হলো এমন একজন যে হয় আকাঙ্ক্ষিত।’’ ‘‘প্রেম কোনো সদ্‌গুণ, কোনো উৎকর্ষের ধার ধারে না, তা শুধু ভালোবাসে যায় আর ক্ষমা করে আর সহ্য করে সবকিছুকে, কারণ তাকে তা-ই হতে হয়। আমরা যুক্তির দ্বারা চালিত নই কোনোভাবেই।’’

ভিনাস ইন ফার্স-এর কাহিনি শুরু হয় এভাবে যে, একজন মানুষ স্বপ্ন দেখে পশমের পোশাক পরা ভিনাসের সাথে সে প্রেমের কথাবার্তা বলছে। নামহীন কথক তার এই কাহিনিটি তার বন্ধু জিসেভেনকে বলে, যে তাকে বলে কিভাবে সে এক নিদয়া নারীর প্রতি জন্ম নেওয়া তার মুগ্ধতাকে কাটিয়ে তোলে অতি কামুকজনের স্মৃতিকথা নামক একটি পাণ্ডুলিপি পড়ে। পাণ্ডুলিপিটি হলো জিসেভেন ফন কুজাইমস্কি নামক একজনের, যে হ্বন্ডা ফন ডুনাইয়ো নাম্নী এক নারীর প্রতি প্রণয়াসক্ত হয়, হ্বান্ডাকে অনুরোধ করে যেন সে তাকে চাকর করে রেখে ধীরে ধীরে তার সাথে খারাপ ব্যবহার করতে থাকে। প্রথমে রাজি না হলেও পরে অনুরোধের অদ্ভুতত্বে ও তামাশায় রাজি হয়ে যায় হ্বান্ডা, যদিও একই সাথে এ কাজ করানোর জন্য জিসেভেনকে ঘৃণাও করতে থাকে। অতি ইন্দ্রিয়পরায়ণতার উপলব্ধির ভেতর থেকে জেফেরিন তার অভিজ্ঞতার বর্ণনা করতে থাকে। জিসেভেন ও হ্বান্ডা ফ্লোরেন্সে বেড়াতে যায়, এই যাত্রায় জিসেভেন রুশ বৈশিষ্ট্যগত চাকরের নাম ‘‘গ্রেগর’’ গ্রহণ করে হ্বান্ডার দাসের ভূমিকা পালন করতে থাকে। ফ্লোরেন্সে হ্বান্ডা জিসেভেনকে চাকর হিশেবে নিদারুণ কষ্ট দিতে থাকে এবং তাকে আরও শাসন করার জন্য তিনজনের একটি আফ্রিকান দল নিয়োগ করে। সম্পর্কের সংকট ঘনীভূত হয় যখন হ্বান্ডা এলেক্সিস পাপাডোপোলিজ নামক বায়রনীয় নায়কের মতো একজনের নিকট নিজেকে নিবেদন করতে চায়। উপন্যাসের সমাপ্তিতে জিসেভেন হ্বান্ডার প্রেমিক এলেক্সিস পাপাডোপোলিজ কর্তৃক অপমানিত হয় এবং হ্বান্ডার প্রতি তার নিবেদনের আকাঙ্ক্ষার অবসান হয়। সে তখন হ্বান্ডাকে বলে : ‘‘সেই নারী, প্রকৃতি যাকে সৃষ্টি করেছে আর বর্তমানের মানুষটি যাকে শিক্ষিত করছে, সেই নারীটি হলো মানুষের শত্রু। সে শুধু হতে পারে মানুষটির দাস বা একচ্ছত্র মালিক, কখনোই হতে পারে না তার সঙ্গী। তখনই তা সম্ভব যখন নারীটি পুরুষটির কর্ম ও শিক্ষার সমান হওয়ার অধিকার অর্জন করতে পারবে।’’

মার্কি দ্য সাদ, যে কিনা যৌবনে মেতে উঠেছিলেন কামসঙ্গিনীকে আঘাত করে অর্গাজম বা চরমপুলক সৃষ্টির কাজে, এই অভীপ্সাকে নতুন দার্শনিক ভিন্নতায় প্রয়োগ করেছিলেন তার লেখায়। তার ওপর ফরাসি দার্শনিক ওলবাক্ ও লা-মেত্রির প্রভাব ছিল অতিমাত্রায়। তিনি ছিলেন জড়বাদী, নাস্তিক। ইউরোপীয় আলোকপ্রাপ্তি এবং আশাবাদকে প্রত্যাখ্যান করে এক ভিন্ন চিন্তার জন্ম দেন তিনি তার লেখা উপন্যাসগুলোতে। তিনি মনে করতেন, মানুষের জীবন এক অন্তহীন অন্ধকারে আচ্ছন্ন। প্রকৃতি নানা খামখেয়ালিতে নিষ্ঠুর, প্রকৃতিতে টিকতে হলে মানুষকে প্রকৃতির বৈশিষ্ট্যগুলোকে নকল করতে হবে, অর্থাৎ নিষ্ঠুরতাকে আত্মসাৎ ও প্রয়োগ করতে হবে যৌনতার ভেতর দিয়ে। সাদ মনে করতেন, ‘‘কাম হচ্ছে শক্তি’’, তাই এ শক্তির ভয়ংকর ব্যবহার প্রয়োজনীয়। এরই উদ্ভাসন ঘটান তিনি তার উপন্যাস ও লেখাগুলোতে, প্রধানত চারটি উপন্যাসে: জুস্তিন বা সুনীতির দুর্ভাগ্য, শয়নঘরে দর্শনচর্চা, জুলিয়েত বা পাপীর পোয়াবারো, সদমে ১২০ দিন। এছাড়াও তিনি লিখেছিলেন পুরোহিত ও মৃত্যুপথযাত্রীর সংলাপ, শেষ ইচ্ছা এবং ইচ্ছাপত্র এবং কিছু ছোটগল্প; এছাড়াও নাটক এবং উপন্যাসের তত্ত্ববিষয়ক একটি রচনা। এসব লেখায় বালক-বালিকা থেকে শুরু করে মধ্যবয়সী নারীদের ওপর অচিন্ত্যনীয় অত্যাচারের বিশদ বর্ণনা রয়েছে নানা কাহিনির অজুহাতে। চাবুক বা বেত মারা, গলা টিপে হত্যা করার প্রচেষ্টা, শরীরের চামড়া খুলে নেওয়া, শরীরের ওপর জ্বলন্ত মোমবাতির গলে পড়া মোম ঢালা, সর্বসম্মুখে পায়ুকাম ও সমকামিতা ইত্যাদি ইত্যাদির বর্ণনা। এই বর্ণনায় বীর্যপান, পায়খানা-প্রস্রাব করা এমনকি বাতকর্মেরও পুঙ্খানুপুঙ্খ উল্লেখ রয়েছে। মাঝেমাঝে উঁকি দিচ্ছে জড়বাদী দর্শন, নাস্তিকতা, নৈতিকতার আপেক্ষিকতা এবং এতদ্বিষয়ক আলাপে আবির্ভূত হয় স্টোয়িক উদাসীনতা, আবার ইহজাগতিক কল্যাণচিন্তাও। যেমন, পুরোহিত ও মৃত্যুপথযাত্রীর সংলাপ গল্পে মৃত্যুপথযাত্রী এক লম্পটকে যাজক স্বীকারোক্তির সবরকম চেষ্টা করে, কিন্তু ওই ব্যক্তি তার নাস্তিক্যচিন্তায় অটল থাকে শেষপর্যন্ত। শেষমেশ যাজক হাল ছেড়ে দিয়ে তার কিছুই করার নাই বললে (‘‘এরপর আর কিছুই বলার নেই আমার। যতক্ষণ এইসব চিন্তা বাদ দিতে না পারবেন, ততক্ষণ কোনো সাহায্যই করতে পারছি না আমি।’’) ওই ব্যক্তি যাজককে যা বলেন তাতে ফুটে উঠেছে ইহজাগতিকতা ও কল্যাণচিন্তার বীজ :

প্রিয় বন্ধু, আপনি অন্যভাবে আমাকে সাহায্য করতে পারেন। পৃথিবীতে বিচরণ করেন আর আপনার এইসব পুরোনো ক্লান্তিকর ভ্রান্ত যুক্তি বাদ দিয়ে কেবল প্রকৃতির মূল্যবান নৈতিকতার কথা প্রচার করুন : ‘‘সকল মানুষকে এমনভাবে বিবেচনা করুন যেমনটা নিজেকে আপনি বিবেচনা করেন, আর আপনি নিজে যতটুকু ভোগান্তি নিতে পারেন কখনও তার চেয়ে বেশি ভোগান্তির কারণ হবেন না।’’ এটাই একমাত্র মূল্যবান উপদেশ হে উপদেশপ্রদানকারী। অস্বীকার করুন আপনার ‘দেবতাদের’ এবং ধর্মদের; শুধু ‘সত্য বিশ্বাস’-এর নামে মানবতার ঘৃণা এবং হত্যাযজ্ঞ ছাড়া আর কিছুই করতে পারে নি তাদের কেউ। ভুলে যান আপনার পরকালের ধারণা; এটাই একমাত্র জগৎ যেখানে আপনি চাইলে সুখ পেতে পারেন।

শয়নঘরের দর্শন (ফিলোসোফি ইন দ্য বাদিয়ে) উপন্যাসে ইন্দ্রিয়পরায়ণ সাঁতমোজে, কুমারী ইউজেনে এবং লম্পট ও সমকামী দোলমাঁসে-র পারস্পরিক সংলাপে এ বিষয়গুলোর পুনঃপুন প্রতিফলন ঘটেছে:

ইউজেনে : কিন্তু, সাঁতমোজে, সদাচার তো কেবল যৌনতাবিষয়ক নয়। নানাভাবেই হয়তো এর প্রকাশ রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ তুমি ঈশ্বরভক্তি সম্বন্ধে কী ভাবো?

দোলমাঁস : বাহ্! ঈশ্বরভক্তি হলো ধর্মীয় বিশ্বাসের শর্ত, আজকাল কে আর বিশ্বাস করে ধর্মে? এসো আমরা একে এভাবে অভিহিত করি : ধর্ম হলো মানুষ ও তার স্রষ্টার মধ্যকার একটি চুক্তি যেখানে আরাধনার মাধ্যমে মানুষ সৃষ্টির জন্য তার কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে যা ঈশ্বরকর্তৃক তাদের ওপর অর্পিত হয়।

ইউজেনে : আমি ভালোভাবে এটাকে বুঝতে পারি নি।

দোলমাঁস : কিন্তু, মানুষ প্রকৃতির বস্তু ছাড়া কিছুই নয়; সুতরাং ঈশ্বরের প্রতি তার এই কৃতজ্ঞতা ভুলপথে চালিত। কার দরকার ঈশ্বরের?

ইউজেনে : কিন্তু প্রকৃতির রহস্য কি এই যুক্তিই তুলে ধরে না যে সর্বশক্তিমান কর্তৃপক্ষ বলতে একটা কিছু আছে?

দোলমাঁস : না হে বাছা। এক হাজার বার বলা যায় না, না না। যদিও প্রকৃতির কিছু ধরন হয়তো আমাদের কাছে রহস্যময় ঠেকে, এটা হয়, কারণ আমাদের বিজ্ঞান এখনও পর্যাপ্ত প্রমাণাদিসহ অগ্রসরমাণ নয়। ঈশ্বরের অস্তিত্ব ধারণা, যিনি নিজে অন্যান্য অজানার ব্যাখ্যাবিশ্লেষণের মতোই জানার বাইরে, মানবীয় যৌক্তিক বিবেচনায় এক চূড়ান্ত নির্বুদ্ধিতা। এমনকি যদি দেখানোও যেত যে একজন ঈশ্বর সবকিছুর কর্তা, তবুও তিনি এখন হতেন সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয়, কারণ একবার যদি স্থাপিত যন্ত্রপাতি কাজ করতে থাকে, আর তার রক্ষণাবেক্ষণে কোনো কিছু করার থাকে না, তখন সেই স্রষ্টা কর্মহীন।

ইউজেনে : তুমি বলতে চাইছ যে ঈশ্বর বিশ্বাস এক বিভ্রম?

দোলমাঁস : যথার্থই। আর শোচনীয়ও।

….   ….   ….

দোলমাঁস : প্রিয় বালিকা, তুমি তো ভালোভাবেই শুনলে এতক্ষণ আমি কী বললাম; কিন্তু এখনও সদাচারের প্রকৃতি সম্পর্কে অনেক কিছু বলার আছে। উদাহরণস্বরূপ, এমন কোনো কাজ নেই যা পুরোপুরি সদাচার, বা অপরাধ; কাজের মূল্যবোধ সময়- ও ভূগোল-সাপেক্ষ। পেগান ব্যাবিলনে নারীরা রাস্তায় বিজয়িনীর মতো বিচরণ করত আর ব্যাপক আকারের যৌনাচারে পারদর্শিতার জন্য সম্মানিত হতো যা আইনকানুনবদ্ধ স্পেনে ছিল দমনমূলক। দ্যাখো সেই লোকটির ফাঁসির ব্যবস্থা করা হচ্ছিল? এক প্রাচীন জাপানি সদাচার করার অপরাধে সে অনেকটা বোকার মতোই নিজেকে মুক্ত করতে পারল প্যারিসে, সেই সদাচারটি হলো : পায়ুকাম। খোঁজ নাও ইতালীয় বন্দি এবং চীনা সম্ভ্রান্তদের? তারা তা পেয়েছে একই ধরনের রচনা পড়ে—কনফুসীয় দর্শন!

ইউজেনে : কিন্তু আমার কাছে মনে হয় এমন কিছু কর্ম আছে যা তাদের মতোই খারাপ ও মারাত্মক, পৃখিবীর সর্বত্রই এগুলোকে অপরাধ হিশেবে ধরা হয়।

সাঁতমোজে : প্রিয় আমার, তুমি খুবই ভুল করছ; এমন কিছুই নেই: না চুরি, না অজাচার, না খুন এমনকি না পিতৃহন্তা।

ইউজেনে : তাহলে তুমি বলতে চাইছ যে কিছু মানুষ ভয়ংকরকে সহ্য করে?

দোলমাঁস : প্রিয়তমা আমার, শুধু সহ্যই করে না, বরং মূল্যবান কাজ হিশেবে প্রশংসাও করে। যেমনটা কোথাও কোথাও আমাদের দয়ালুতা, দানশীলতা, সতীত্ব ইত্যাদিকে ঘৃণাই শুধু করা হয়।

ইউজেনে : কিন্তু কিভাবে একজন সতীত্বকে খারাপ বলতে পারে? সতীত্বে অপরাধ কোথায়? এতে কার ক্ষতি?

সাঁতমোজে : সব মানুষেরই! কুকুরীর মতোই নারীরা চটুলপ্রকৃতির; যারা তাকে চায় সে তাদেরই হয়: সুতরাং একজন মাত্র প্রেমিকের কাছে নিজেকে সীমাবদ্ধ করে রাখা প্রকৃতির বিরুদ্ধে অপরাধের সামিল; তার প্রবৃত্তি এর বিরুদ্ধে চিৎকার করে ওঠে।

ইউজেনে : কিন্তু তাহলে বিয়েতে নারীর ভূমিকা কী? বিয়ের সাধারণ শর্ত অনুসারে সে কি স্বামীর প্রতি ভক্তি ও দায়িত্ব দেখাবে না? তার প্রতি কি বিশ্বস্ত থাকবে না?

সাঁতমোজে : যে-কোনো নারীরই, সে অবিবাহিত, স্ত্রী বা বিধবা যা-ই হোক না কেন, যে-কোনো অবস্থাতেই সকাল থেকে রাত পর্যন্ত নিজেকে লাম্পট্য প্ররোচনায় নিবদ্ধ রাখা ছাড়া অন্য কোনো উদ্দেশ্যই তার থাকা উচিত নয়; এই উদ্দেশ্যেই প্রকৃতি তাকে সৃষ্টি করেছে। ভাবো, ইউজেনে, তোমার মতো একজন তরুণী বালিকা, পিতৃগৃহ থেকে বেরই হয় না বলতে গেলে; সে জানে কম আর অভিজ্ঞতা আরও কম। হঠাৎ করে কোনো পুরুষের বাহুলগ্না হবে সে তা ভাবতে পারে না। তাকে জোর করে বাধ্য ও বিশ্বস্ততার শপথ করানো হয় প্রথম আসা সেই পুরুষটির প্রতি যা সুচিন্তিত বিচারের জন্য খুবই আনাড়িপনা। সে এর বিনিময়ে নিজ প্রতিজ্ঞা রক্ষা করতে বাধ্য হয়, মানতে গিয়ে জীবনের নিগড়ে আবদ্ধ হয়, তাদের আবার উপেক্ষা করলে সমাজদ্বারা নিশ্চিহ্ন হয়। অন্যথায় হতাশাই তার অবস্থা। এটাই নারীর উদ্ভট উভয়সংকট, সমাজ যা তার জন্য সৃষ্টি করে। এটাই কি একমাত্র সুস্থির প্রতিক্রিয়াসুলভ দ্রোহ নয়?

ইউজেনে : উত্তম, ধরে নিচ্ছি যে বিয়ে নারীর ওপর এক অন্যায্য বোঝা চাপিয়ে দেয়। কিন্তু একজন স্ত্রী বিবেচনা করবে না যে তার কার্যকলাপ তার সন্তানদের ওপর প্রভাব বিস্তার করবে? তাদের গর্ব ও শ্রদ্ধা কি অনেক মূল্যবান নয় এ ব্যাপারে ন্যায্যতা দিতে?

সাঁতমোজে : তাদের গর্ব আর শ্রদ্ধার নিকুচি করি। আমরা সবাই যার যার মতো করে মৃত্যুর দিকে ধাবমান, আর কবরে সদাচার আর কদাচারের কোনো তফাত নেই। তুমি কি মনে করো যে, খুব ‘গুণান্বিত’ জীবন যাপন করলাম এই ব্যাপারটাকে আমাদের উত্তরজীবীরা আমলে নেবে? তা না হলে সদাচারের মানে কোনো না কোনোভাবে বদলে যাবে, সুতরাং এর জন্য অনুশোচনা অর্থহীন। গবেট লোকটিও কোনোকিছু পাবার বা স্বীকৃতির আশা ছাড়াই আগন্তুক হিশেবে আনন্দের সাথে জীবন কাটিয়ে দেয়।

এই উপন্যাসটির গঠন নাটকীয় অন্তর্ভাষ ধরনের যার মূল বিষয় হলো নায়িকাকে কাম-পাঠশালার শিক্ষাদান। মূল কাহিনি হলো মায়ের সাথে নায়িকা ইউজেনের সম্পর্ক; ঘৃণিত কাম-পাঠশালা থেকে তার মেয়েকে উদ্ধারের যে-চেষ্টা মা করে, পরিণামে তার ভাগ্যে জুটে ধর্ষণ, কলুষতা। সাতটি নাটকীয় সংলাপে উপন্যাসটি বিন্যস্ত যা শুরু হয় পনের বছর বয়স্ক ইউজেনের মাদাম সাঁতমোজের খাসকামরায় আগমন দিয়ে, এই সাঁতমোজে হলো তার লম্পট পিতার শিক্ষিকা। কামকলা শিখতে গিয়ে সে সাঁতমোজের সঙ্গে সমকামিতায় জড়িয়ে পড়ে। ছাব্বিশ বছর বয়স্ক বিধবা কামুক সাঁতমোজে তার কাম-পাঠশালায় শিক্ষক হিশেবে নিয়োগ করে তার ভাই, শেভিলে দ্য মিরভেল, আর লম্পট (লিবারটাইন) দোলমাঁসকে, যে শেভিলের প্রেমিক। সে সাঁতমোজের আমন্ত্রণে শুধু তার সাথে পায়ুকাম করার জন্যই আসে, কারণ এছাড়া সে কোনো উপায়েই নারীর সাথে সঙ্গম করে না। সে সাঁতমোজের কাম-পাঠশালায় সভাপতির দায়িত্ব পালন করে। তত্ত্ব ও বাস্তব অনুশীলনের মাধ্যমে শুরু হয় পাঠদান। সাঁতমোজে তার ভাই শেভিলকে দায়িত্ব দেয় ইউজেনের সামনের রন্ধ্রের শিক্ষাদানে আর দোলমাঁসকে দায়িত্ব দেওয়া হয় পেছনের রন্ধ্রের শিক্ষাদানে। ইউজেনেকে একটি শারীর সংস্থান বিদ্যার শিক্ষাও দেওয়া হয় যেখানে সাঁতমোজের শরীরকে ব্ল্যাকবোর্ড ভেবে ভগাঙ্কুরকে দেখিয়ে বলা হয় যে এটাই নারীর সকল সংবেদনকেন্দ্র। দোলমাঁসের শিশ্ন ও অণ্ডকোষকেও দেখানো হয় এবং তাকে হস্তমৈথুন করা শেখানো হয়। এভাবেই মায়ের ধর্ষণের মাধ্যমে কাহিনির যবনিকাপাত ঘটে। এ যেন এক বিপরীত অয়দিপুস কমপ্লেক্স যেখানে মেয়ে ধর্ষণ করে মাকে। সফোক্লেসের অয়দিপুস নিয়তির এক অন্ধখেলায় আপন মাকে বিয়ে করে তার সাথে যৌনসম্পর্ক করে যা এক অজাচার। প্রকৃত ঘটনা জানার পর অয়দিপুস নিজের চোখ উপড়ে ফেলে অন্ধ হয়ে যায়। কিন্তু ইউজেনে অপরাধ জেনেও মাকে ধর্ষণ করে, কিন্তু অয়দিপুসের মতো কখনোই নিজেকে অন্ধ বা অন্যভাবে শাস্তি দেয় না, বরং নিজেকে ভাবে আলোকদীপ্ত। এজন্যই মেয়ে মাকে বলতে পারে : ‘‘আমার লক্ষ্মী মা, নিজের মেয়ের কাছ থেকে স্বামীর ভূমিকা পেয়ে তোমার কেমন লাগছে? যে-কারও কাছে তা মনে হবে আশ্চর্যের কিন্তু তুমি এতে অভ্যস্ত হও মা আমার: তুমি কাঁদছ! এটা তোমাকে কষ্ট দিয়েছে? নাহ, মন্দ নয়। আমি কিন্তু কোনো কষ্ট পাই নি। তোমার সাথে সুরতক্রিয়া করতে আমার ভালোই লাগে।’’


ধর্ষকাম ঐতিহাসিকভাবে নানারূপে বহমান ছিল সমাজ ও সভ্যতায় : প্রাচীন ভারতের রাক্ষসবিবাহ বা পৈশাচিক বিয়ের মধ্যে তার প্রমাণ পাওয়া যায়


তার সবচেয়ে ভয়াবহ উপন্যাস সদোমের ১২০ দিন, যাতে ফরাসি পাঁচ-অক্ষর শব্দ ‘‘মের্দ’’ (merde), বা ইংরেজি ফোর-লেটার ওয়র্ড বা চার-অক্ষর শব্দ ‘‘ফাক’’ (fuck), বা বাংলা দুই-অক্ষর শব্দ ‘‘চোদা’’ এমনভাবে ব্যবহৃত হয়েছে যা অস্বাভাবিকভাবে শিউরে ওঠার মতো, বলা যায় শব্দটির এক জাতীয় উত্থান ঘটেছে এই রচনায় যা তাবৎ সমাজকে ভয় ধরিয়ে দিয়েছে। এর সাথে যুক্ত হয়েছে নানাধরনের ব্যাভিচার ও তার বীভৎসতার বর্ণনা। বলা হয়ে থাকে, বাস্তিল কারাগারে লেখা এই বইটির পাণ্ডুলিপি তিনি ভাঁজ করে তার গরাদকক্ষের দেয়ালের কুলুঙ্গিতে লুকিয়ে রাখেন, উপন্যাসটি লোকচক্ষুর আড়ালেই থেকে যায় এবং বিংশ শতাব্দে বলা যায় তা আবিষ্কৃত হয়। উপন্যাসটির শুরুতে ‘লেখকের মুখবন্ধ: লাম্পট্য-পাঠশালার ভূমিকা’য় সাদ বলেন :

ব্যয়বহুল যুদ্ধের কারণে চতুর্দশ লুইয়ের শাসনামলে সাধারণ মানুষের জীবন কষ্টকর হয়ে পড়েছিল; রাজার কাছে ঘুরঘুর রক্তপিপাসুরা যে-কোনো দুর্যোগ থেকেই সুবিধা নিতে তৎপর থাকত, তাদের জন্য সময়টা আশীর্বাদের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। আহা পরজীবীরা! কিভাবে যে ফ্রান্সকে তারা শেষ করে দিল! জাতির বিধ্বস্ত রক্তমাংস থেকে পড়া শেষ রক্তবিন্দুটিও তারা চেটে চেটে খেয়ে ফেলল! হ্যাঁ, চামড়া আর হাড় ঠুকরে আর চিবিয়ে কয়েক ফোটা উচ্ছিষ্ট রেখে সব শেষ করল তারা! শেয়ালেরা! বজ্জাতেরা!

কিন্তু এই প্রমোদ-পরিক্রমণ শেষ পর্যন্ত টিকল না; ইত্যবসরে হিশেব চুকানোর দিন এসে গেল, ভিলেনদের বিচারের আওতায় আনা হলো। কিন্তু সবাইকে নয়। চার জন দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ভিলেন বিচারের শেষ জয়ডঙ্কা বাজার আগেই পালাতে সক্ষম হলো, পাখির মতো মুক্ত হয়ে গেল উড়ে। আর এই চারজন এমন অর্থের মালিক হয়েছিল যা দশ জীবনেও শেষ করা যাবে না, তারা সব ধরনের ব্যবসাবাণিজ্য ছেড়ে দিয়ে শেষমেশ একত্রে লাম্পট্য ও কামুকতায় নিবদ্ধ হয়ে পড়ল।

এভাবেই এই চারজনদলের নেতা ডিউক অব বুঁজি, বিশপ এক্স, জর্জ কারভাল, দুরসেত একটি লাম্পট্য দল গঠনের পর সাধারণ তহবিল গঠন করে পারির শহরতলিতে একটি বাড়ি কিনে এবং আটজন সংগ্রাহককে নিয়োগ দেয়, যাদের মধ্যে চারজন বালিকা আর বাকি চারজন বালক সংগ্রহের কাজ পায়। যৌন উপভোগকে আরও বাড়ানোর তাগিদে তারা একটি কামাচার স্থান (অরজি) স্থাপন করে এবং সপ্তাহে চারটি পৃথক ধরনের উৎসবের আয়োজন করতে থাকে। প্রথম রাতেরটি ছিল সমকামী পরব, যার নাম হলো ‘পৌরুষত্বের প্রাক্কালে’ বা ‘দ্য ইভ অব ম্যাসকুলানিটি’, দ্বিতীয় রাতেরটি বালিকাদের জন্য যেদিন সংগ্রাহকরা বারো জন উচ্চবংশীয় গরম মহিলাকে দুর্গে নিয়ে আসে যার নাম তারা দিল ‘গানির প্রাক্কালে’ বা ‘দ্য ইভ অব হিউমিলিয়েশন’। তৃতীয় রাতটি ছিল বিভিন্ন ধরনের বালিকাদের জন্য, সেখানে কেবল বেশ্যাদের রাখা হলো যার সংখ্যা ছিল একশ; সেখানে চলল মল-মূত্র-লালা ভক্ষণ, বমিকরণ এবং দুর্গন্ধ আস্বাদন। এই পরবের নাম দেওয়া হলো ‘অন্ধকারের প্রাক্কালে’ বা ‘দ্য ইভ অব ব্যাকনেস’। চতুর্থ রাতে থাকল কুমারী যুবতীরা, যাদের কুমারিত্ব পরীক্ষিত। এই পরবের নাম হলো ‘কুমারিত্বনাশের প্রাক্কালে’ বা ‘দ্য ইভ অব ডেফ্লোরেশন’। প্রতি সপ্তাহের চারদিন চলতে লাগল এই লাম্পট্যসন্ধ্যা, বাকি তিন দিন ব্যক্তিগত ফুর্তি। এভাবে কয়েক মাস চলল তাদের কামাচারকেন্দ্র বা ‘‘অরজি’’, তারপর তারা একত্রে বসে এর নতুনত্ব আনয়নের সিদ্ধান্ত নিল। দলীয় প্রধান প্রস্তাব দিল নতুন আনন্দ উদযাপনের জন্য স্থাপন করতে হবে এক লাম্পট্য-পাঠশালা, যা হবে দূরে, যা হবে আল্পসের খাড়াইয়ে, যা হবে দুষ্প্রবেশ্য, যেখানে থাকবে আট জন কুমারী বালিকা, আট জন ছোট বালক, আট জন সঙ্গমকারী, চার জন মাদাম, চার জন স্ত্রী, চার জন প্রবীণা, আর চাকরবাকর। নভেম্বর, ডিসেম্বর, জানুয়ারি, ফেব্রুয়ারি এই চার মাস (১২০ দিন) ধরে চলবে এই কাম-পাঠশালা। এই পাঠশালার দৈনিক কার্যক্রমও ঠিক করা হলো। এভাবেই ঠিক হলো সদোমের ১২০ দিন-এর কাহিনি, আমরা দেখব সেই লাম্পট্য-পাঠশালার ভয়াবহ ও আঁতকে ওঠার মতো ঘটনাবলি সব। আমরা জানি, সদোম হচ্ছে বাইবেলের সেই অভিশপ্ত নগরী, সমকামিতার ব্যাপকতার কারণে ঈশ্বর যা ধ্বংস করে দিয়েছিলেন, আর সাদের সদোম হলো এই চারজনের স্থাপিত কাম-পাঠশালা যেখানে চলবে সর্বকামিতার মহোৎসব, যার কথা শুনে শিউরে উঠবে পাঠককুল। এরপর সাদ তার কাম-পাঠশালার গল্প বলার কথা বর্ণনা করলেন:

আর এখন, প্রিয় পাঠক, নিজেকে প্রস্তুত রাখুন সবচেয়ে মন্দ গল্প শোনার জন্য যা এখন অব্দি বলা হয় নি। এমন এক পছন্দ-গ্রন্থ যা নিয়ে আপনি প্রাচীন বা আধুনিক কারও মুখোমুখি হতে পারবেন না। বোকা ঈশ্বর বা প্রথা দ্বারা যেসব আনন্দ স্বীকৃত, তাকে এখানে বাতিল করা হয়েছে; যা বাকি আছে তা অপ্রয়োজনীয় হলেও নয় কলঙ্কিত।

বহু অপচয়, যার সাক্ষী আপনারা, তা আপনাদের অসন্তুষ্ট করবে; কিন্তু এর মধ্যে কিছু এমন জিনিস আছে যা আপনাদের উষ্ণ করে তুলবে অঙ্গ জাগিয়ে, আর এ-ই, প্রিয় পাঠক, এটাই আমরা চাই। আমরা আপনাদের মনের খবর জানতে চাই না; আমরা অনুমান করতে চাই না কী আপনাদের মন-পছন্দ : কোনটা পছন্দের আর কী বাতিলের তা আপনাদের বিষয়; অন্য কোনো পাঠক হয়তো এমনই করবে, আর অন্য এক পাঠকও এভাবেই করবে যতক্ষণ না সবাই সন্তুষ্টি খুঁজে পায়।

ছয়শ ভিন্ন ভিন্ন যৌনবাসনার বহুধাকরণে আপনি হয়তো নিশ্চিত হবেন যে প্রত্যেকটাই সাচ্চা, এমনকি কখনও কখনও কিছু যৌনবাসনা একটি অপরটির মতো একই রকম মনে হতে পারে; কিন্তু আমি বলব, অনুসন্ধান করুন কোনটাকে আপনার বিরক্তিকর মনে হয় আর দেখবেন বস্তুত ভিন্ন একটা রয়েছে তার আর সঙ্গীর মাঝখানে, আর এটি, যদিও কিছুটা তুচ্ছ মনে হবে, এই পার্থক্য যথার্থই শুদ্ধিকর, যা আপনাকে স্পর্শ করবে, যা লম্পটদের চরিত্রের পার্থক্য দেখাবে, যা করতে আমরা এখানে হাজির।

সুতরাং, আমি আপনাদের দিচ্ছি সদোমের ১২০ দিন। এটা অসাধারণ এক সাড়ম্বর ভোজসভার কাহিনি। ছয়শ ভিন্ন ভিন্ন থালা আপনার রসনানিবৃত্তির জন্য নিবেদন করা হচ্ছে। আপনি সবকটাই খাবেন? নিশ্চয় না। কিন্তু বিস্ময়কর বৈচিত্র্য আপনার পছন্দের পরিসরকে বাড়িয়ে দেবে। যা ভালো লাগে তাকে গ্রহণ করুন আর বাকিসব বাদ দিন, কিন্তু বাদ দেওয়ার বিষয়ে গলা চড়াবেন না দয়া করে, না, কারণ তারা বড় জোর আপনাকে সন্তুষ্ট করার ক্ষমতা রাখে না, এটুকুই। নিজেকে ভাবুন একজন দার্শনিক: নিজেরটা নিন আর অন্যদের তাদের মতো করে পছন্দ করতে দিন তাদের নিজ নিজ কামবাসনাকে।

এভাবেই অতঃপর কামপাঠশালার ১২০ দিনের কাহিনি উপস্থাপন করেন লেখক। এই উপন্যাসে অসংখ্য বর্ণনার মধ্যে কয়েকটি এরকম: ‘‘একজন পুরুষ পেছনের দিক থেকে একটি বালিকাকে চুদল, যখন বালিকাটি একটি বড় ক্রুশবিদ্ধ যিশুর মূর্তির ওপর ঝুঁকে থাকে আর তার ভগাঙ্কুর দিয়ে যিশুর মাথা ঘষে দেয়।’’ ‘‘ভাই আর বোনকে সঙ্গম করতে বাধ্য করাল একজন পুরুষ যা সে নিজে দেখল, তারপর সে নিজে মেয়েটিকে চুদল; তারপর তাদের দুজনকে মল ত্যাগ করতে আদেশ করল।’’ উপন্যাসটির অন্য একটি নাম লাম্পট্য-পাঠশালার কল্পকাহিনি (দ্য রোমান্স অব দ্য স্কুল অব লিবারটিনেজ)। বইটিতে চারজন মাদাম, যথাক্রমে মাদাম দুক্লুস, মাদাম শেমভিরে, মাদাম মার্তেইঁ, মাদাম দেগ্রসেঁ-র মাধ্যমে চারটি সর্গে প্রত্যেকটিতে ১৫০টি করে সংরাগের বর্ণনা দেওয়া হয়েছে যা ভযংকর-রকম বিবমিষাকর। সাধারণ সংরাগ বা সিম্পল প্যাশান, জটিল সংরাগ বা কমপ্লেক্স প্যাশান, অপরাধী সংরাগ বা ক্রিমিনাল প্যাশন আর খুনে সংরাগ বা মার্ডারাস প্যাশান শিরোনামে এমন সব বর্ণনা তিনি দিয়েছেন যা রিরংসার সীমাকে ছাড়িয়ে গেছে সব অর্থে। শুধু যে কামের নৃশংস বর্ণনা রয়েছে তাতে তা-ই নয়, সমাজ ও দেশবিরুদ্ধ অনেক কথা বলা হয়েছে এখানে। উপন্যাসটির একটি উত্তরভাষাও তিনি দিয়েছেন যেখানে বরাবরের মতোই নৈতিকতা বা ধর্মের বিরুদ্ধে তাঁর বিষোদ্‌গার প্রতিফলিত:

প্রিয় পাঠক, এখন আপনারা আমাদের লাম্পট্য-পাঠশালার গল্প পড়ে শেষ করলেন। আপনাদের লেখকের এটাই আশা যে আপনারা এর থেকে সন্তুষ্টি খুঁজে পাবেন আর বইটা রেখে দেবেন একটি বিবেচক শিক্ষা নিয়েই।

আপনারা কি আমাদের লম্পটদের এইসব পাপের অনুশীলনকে ঘৃণা করবেন? করেন, তবে মনে রাখবেন তারাও আপনাদের এইসব সদাচার অনুশীলনকে ঘৃণা করবে। শেষমেশ বিন্দুমাত্রও কিছু হবে না…

এটা কি আপনাদের আঘাত করে, হে সদাচারীরা? এটা কি আপনাদের সেই শ্রবণশক্তিকে নষ্ট করে দেয় যা ছোটবেলা থেকেই গির্জার কল্পকাহিনি শুনে শুনে উত্ত্যক্ত? ভালো, শান্তিতে থাকুন: যদি আপনাদের শুনে আসা অর্থহীন কথাগুলো সত্য হয়; যেমনটা আপনারা শুনে আসছেন যে অপরাধীরা নরকে শাস্তি পাবে, তাহলে, কোনো সন্দেহ নেই যে আমরাই সেখানে পুড়ব অনলে,…

সুতরাং হে সদাচারীগণ, নিজের আরামের অন্বেষণ করুন; আপনাদের ক্রুশবিদ্ধ নেতার কথা শুনুন গে, যিনি বলেছেন যদি তা আমি ঠিক মতো বুঝে থাকি ‘‘সদাচার নিজেই নিজের পুরস্কার।’’ ইন্দ্রিয়পরায়ণতার নৈপুণ্যে আমরা অসদাচারেই খুঁজে পাই পুরস্কার, আর যদি ভবিষ্যৎ শাস্তি পাওনা থেকে থাকে, তবে সকল লম্পটরাই তা মাথা পেতে নেবে…

সাদের এই স্যাডিজমকে বুঝতে গেলে যার মাধ্যমে তা উপস্থাপিত সেই লেখক সাদের জীবনকে জানা আবশ্যক, কারণ সাদের জীবন ও সৃষ্টি একটি অন্যটির ভেতর অনুপ্রবিষ্ট। তবে এটাও ঠিক, এই ধর্ষকাম ঐতিহাসিকভাবে নানারূপে বহমান ছিল সমাজ ও সভ্যতায় : প্রাচীন ভারতের রাক্ষসবিবাহ বা পৈশাচিক বিয়ের মধ্যে তার প্রমাণ পাওয়া যায়, যেখানে নৃশংসতা ও বলপ্রয়োগের মাধ্যমে কন্যাকে সম্ভোগের উপাচার চালু ছিল।


সাদই বস্তুকামবাদ, পাশবিকতা, পায়ুগামিতা, মুক্তধর্ষ, মূত্রগলাধঃকরণ বা ইওরোপেগি, মলভক্ষণ বা স্কোপোফিলিয়া, মৃতদেহসংসর্গ বা নেক্রোফিলিয়া, যৌনদর্শনগ্রাহ্যতা ইত্যাদির প্রথম প্রচারক।


মার্কি দ্য সাদের জন্ম অভিজাত বংশে সোনার চামচ মুখে দিয়ে, আর মৃত্যু পাগলাগারদে, নিঃস্ব অবস্থায়। ১৭৪০ খ্রিস্টাব্দের ২ জুন সূর্যালোকিত দক্ষিণ ফ্রান্সের প্রভাঁস রাজ্যে তাঁর জন্ম। তাঁর পূর্বপুরুষদের মধ্যে রয়েছেন: মার্সেইয়ের প্রথম গভর্নর পিয়েরে দ্য সাদ, কাভেইয়ুঁ-র বিশপ জাঁ বাপ্তিস্ত দ্য সাদ এবং বিখ্যাত ফরাসি জেনারেল জোসেফ দ্য সাদ প্রমুখ। তার পিতা কাউন্ত জাঁ বাপ্তিস্ত জোসেফ ফ্রাঁসোয়া দ্য সাদ সাঁজোয়া বাহিনীর কর্নেল ছিলেন। তার পিতামহী লউরা দ্য সাদ পেত্রার্কের বিখ্যাত সনেটে বর্ণিত মাদোনা লউরা ছিলেন বলে মনে করা হয়। দশ বছর বয়সে সাদকে পারির জেসুইট বর্ডিং হাউস কলেজে লু-লে-গ্রঁ-এ ভরতি করিয়ে দেওয়া হয়। চার বছর পর, ১৭৫৪ সালে, তাকে স্কুল থেকে বহিষ্কার করা হয়; স্কুল কর্তৃপক্ষের ভাষ্য ছিল, তারা তার জন্য যা করার সম্ভাব্য সবকিছুই করেছিল। তিনি ফিরে আসেন তার পিতার কাছে। কিন্তু পিতা কাউন্ট দ্য সাদ ছিলেন জেসুইটদের চেয়েও কম সহ্যক্ষমতাসম্পন্ন, কয়েক সপ্তাহ পরই তরুণ মার্কিকে আবার পাঠিয়ে দেওয়া হয় বোর্ডিংয়ে, এবার সেনাবাহিনীর বোর্ডিং স্কুলে। পরবর্তীকালে পিতা তার এক বিশপ ভাইয়ের কাছে লেখা চিঠিতে অনুযোগ করে বলেছিলেন, দোনাঁশিয়োঁর (সাদ-এর ডাক নাম) ‘কোনো গুণপনাই ছিল না’। অন্য একটা চিঠিতে তিনি বলেছিলেন তার স্ত্রী একজন ‘ভয়ংকর রমণী’, আর ‘তার সন্তান তার মতোই হয়েছে’। ১৭৫৫ সালে পনের বছর বয়সে সাদ রাজকীয় রেজিমেন্টের সাবলেফ্টেন্যান্ট পদে উন্নীত হলেন; ১৭৫৯ সালে হলেন লেফ্টেনেন্ট। ১৭৫৯ সালে তিনি ক্যাপটেন পদে পদোন্নতি পান। এ সময়েই তিনি জার্মানির সাথে ফ্রান্সের সাত বছরের যুদ্ধের ক্রিয়াকলাপ দেখেন। ১৭৬৩ সালের মার্চ মাসে, তাঁর তেইশতম জন্মদিনের কয়েক মাস আগে, তিনি কমিশন থেকে পদত্যাগ করে পারিতে ফিরে আসেন এবং এখানে দু মাস পর তিনি রেঁনে-পিলাজি কোরদিয়ে দ্য লুনে দ্য মোঁত্রাইকে বিয়ে করেন, বিয়ে হয় বর ও কনের পিতার সম্মতিতে। এ বিয়েতে সাদ মোটেই সন্তুষ্ট ছিলেন না, দ্য মোঁত্রাই পরিবারকে বলেছিলেন যে হবু স্ত্রীর ছোট বোনকে বিয়ে করতে চান তিনি, যদিও তা বাতিল হয়ে যায় এবং ১৭৬৩ খ্রিস্টাব্দের ১৭ মে সাঁ-রোখ গির্জায় যথারীতি এই বিয়ে সম্পন্ন হয়। বিশপের সামনে সাদকে শপথ করতে হয় যে মৃত্যুতে বিচ্ছিন্ন হওয়ার আগ পর্যন্ত তিনি রঁনে-পিলাজিকে ছাড়বেন না। একজন বলেছিলেন যে, ‘আমি তা করব’ এই উচ্চারণের আগে সাদ তার আঙুল ক্রস করে এমন চিহ্ন প্রদর্শন করেছিলেন যা বোঝায় অসারতা, অর্থাৎ তিনি ব্যঙ্গ করেছিলেন যাজকের এই কথাকে। বিয়ের চার মাস পর ‘বেশ্যালয়ে অতিরিক্ত গমনের জন্য’ পারির পুলিশের হাতে তিনি গ্রেফতার হয়ে যান। ১৭৬৩ সালের ২৯ অক্টোবর বিচারে দোষী হওয়ায় তার কারাদণ্ড হয়ে যায়, পনের দিন পর শ্বশুরের দিকের এক আত্মীয়ের জিম্মায় তিনি মুক্ত হন। পরবর্তী পাঁচ বছর সাদের কাটে লাম্পট্যচর্চায় যার ফলাফল তার সাহিত্যে প্রতিফলিত হবে অচিরেই। পারি, ভার্সাই ও আর্কাইয়ুতে ঘর ও কুটির ভাড়া করে তিনি তার কাজ চালিয়ে যেতে থাকেন এবং একই সাথে ভনদুম এবং পিগাল নামক বেশ্যালয়ে গমনাগমনে এমনভাবে আসক্ত হয়ে পড়েন যে ১৭৬৪ সালের ৩০ নভেম্বর বেশ্যালয়ের মেয়েদের কাছে সাদের গমনাগমনকে বন্ধ করার জন্য একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিদর্শক সংশ্লিষ্ট সংগ্রাহককে চিঠি দেন। ১৭৬৮ সালের ৩ এপ্রিল ইস্টার-সকালে আর্কাইয়ুতে তার ভাড়া করা কটেজে ফেরার সময় পথে রোজে কেলার নামীয় এক অসহায় বিধবাকে পথে ভিক্ষা করতে দেখে সাদ তাকে পাকড়াও করে বসেন। সাদ তাকে ঘরগৃহস্থালি দেখভালের চাকরির আমন্ত্রণ জানান, অসহায় বিধবা মহিলা কৃতজ্ঞচিত্তে সম্মতি জানাতেই সাদ তাকে গাড়িতে উঠিয়ে সোজা আর্কাইয়ুতে তার পেতিত মিসোঁ বা ছোট্ট ঘরে নিয়ে আসেন। ঘরে ঢোকার পর মহিলা আশ্চর্য হয়ে লক্ষ করেন যে ঘরটির প্রতিটি জানালা দুটো ঝাঁপ দিয়ে ঢাকা এবং দেয়ালে এমনভাবে আস্তরণ লাগানো যেন কোনো শব্দ বাইরে যেতে না পারে। সাদকে বিষয়টি জিজ্ঞাসা করাতে সাদ রহস্যময় হাসি হাসলেন, তারপর একতল ও দ্বিতলের সবকটি ঘর দেখানোর পর চোরা দরজা দিয়ে ঠেলে তাকে চিলেকোঠায় নিয়ে যান। চিলেকোঠায় নেওয়ার পর কী ঘটেছিল এ নিয়ে মতভেদ আছে তবে জনৈকা মাদাম দু দেফাদঁ ইংরেজ ঔপন্যাসিক হোরেস ওয়ালপুলকে ১৭৬৮ সালের ১৩ এপ্রিল যে-চিঠি দেন তাকে সাদীয় বিশেষজ্ঞ মরিস হাইনে বিশ্বস্ত বলে মন্তব্য করেন। চিঠিতে মাদাম দু দেফাদঁ লেখেন : ‘‘তিনি (সাদ) মহিলাটিকে সম্পূর্ণ নগ্ন হতে আদেশ দেন। মহিলাটি তখন তার পা আঁকড়ে ধরে তাকে ছেড়ে দিতে অনুরোধ করে এই বলে যে সে একজন সম্মানিত মহিলা। তিনি তখন পকেট থেকে পিস্তল বের করে তাকে ভয় দেখাতে থাকেন এবং আদেশ পালনে বাধ্য করেন। তারপর তিনি মহিলাটির দুই হাত একসাথে বেঁধে নিষ্ঠুরভাবে চাবুক দিয়ে পেটান। যখন মহিলাটি সম্পূর্ণভাবে রক্তাক্ত তখন তিনি রক্তাক্ত ঘায়ে মলম লাগান এবং তাকে শুইয়ে ফেলেন। আমি জানি না সেই মহিলাটিকে কোনো জলখাবার দেওয়া হয়েছিল কি না। একইভাবে পরদিন সকালে প্রথমে তিনি আবার মলম কাজ করেছে কিনা তা নিশ্চিত হওয়ার জন্য সেই মহিলার ঘাগুলো পরীক্ষা করেন। তারপর তিনি একটি ছুরি নিয়ে মহিলাটির পুরো শরীর চিরে ফেলেন, আবারও তাতে মলম লাগিয়ে তাকে ফেলে রাখেন। অবশেষে সেই অত্যাচারিত মহিলা কোনোরকমে বাঁধন ছিন্ন করে জানালা দিয়ে পালিয়ে রাস্তায় এসে পড়লেন… বলা হয়ে থাকে যে সাদের এই মারাত্মক কার্যকলাপের কারণ ছিল তার মলমের গুণাগুণ প্রমাণ করা।’’ এই ঘটনায় সাদকে সামুরে সাময়িক কারাদণ্ড দেওয়া হলো, পরে তাকে পারির বিখ্যাত সংশোধনী কারাগার লু কসিঁয়েরেসর্গি দু পালে-তে স্থানান্তর করা হয়। সেখানে, ১৭৬৮ সালের ১০ জুন তিনি স্বীকার করেন যে, এক বিশেষ ‘কামকৌতূহলতা’-র বশবর্তী হয়ে তিনি এই ধরনের অপরাধ করেন। নির্যাতিতা মহিলাটিকে ক্ষতিপূরণ হিশেবে ১০০ লিভার দেওয়ার সম্মতিতে তিনি তারপর জেল থেকে ছাড়া পান। ছাড়া পাওয়ার পেছনেও ছিল তার স্ত্রীর দিকের আত্মীয়ের প্রভাব। এই ঘটনার পরবর্তী চার বছর অপেক্ষাকৃত শান্তভাবেই সাদ তার পিতার প্রভাসেঁর জমিদারিতে কাটিয়ে দেন। এখানেই তার দ্বিতীয় পুত্র ও কন্যার জন্ম হয়। প্রথম পুত্রসন্তান হয়েছিল পারিতে। আর এখানেই তিনি কারমেলিত কনভেন্টে শিক্ষানবিশি সমাপনান্তে গ্রীষ্মের ছুটিতে প্রভাসেঁ আসা তার শ্যালিকা আন-প্রোসপ্যের দ্য রুনে দ্য মোঁত্রাইকে ফুসলিয়ে তার সাথে যৌনসম্পর্ক করেন, যাকে, স্ত্রীর পরিবর্তে, বিয়ে করার জন্য তিনি পূর্বে অভিলাষ ব্যক্ত করেছিলেন। কিন্তু এমন অবৈধ যৌনসম্পর্ক সত্ত্বেও আপাত সুখের জীবনকে নিরানন্দময় মনে হতে লাগল তার। ১৭৭২ সালের ২৭ জুন তিনি এ জীবন থেকে বের হয়ে খানসামাদের সঙ্গে করে নিয়ে মার্সেইতে গিয়ে স্থাপন করলেন ব্যাভিচার পার্টির, যা অচিরেই পুরো ফ্রান্স জুড়ে ‘দ্য কঁদারিদিক বুমবুম অর্জি’ নামে বিখ্যাত হয়ে পড়ে। মার্সেল বাশোমঁঁ নামের একজন দিনপঞ্জিলেখক সেই উৎসবের বর্ণনা দিলেন : ‘‘আমাকে বলা হয় যে কাউন্ট দ্য সাদ, যিনি ১৭৭৮ সালে একজন মহিলাকে আরোগ্য করার পরীক্ষার নামে অপরাধে জড়িত হয়ে পড়েছিলেন, মার্সেইতে প্রদর্শনীর শুরু করেন, যা প্রথমে ছিল আনন্দদায়ক, কিন্তু পরিণতিতে হয়ে ওঠে ভয়াবহ। তিনি একটি নৃত্যানুষ্ঠানের আয়োজন করেন, যেখানে অনেককে তিনি আমন্ত্রণ জানান আর শেষ খাবার হিশেবে দেওয়া হয় চুষে খাওয়ার জন্য চকোলেট পাস্তিল, যাতে মিশিয়ে দেওয়া হয়েছিল ‘স্পেনিশ ফ্লাই’-এর পাউডার। আর এর কাজ সকলেরই ভালো জানা। যারা তা খেয়েছে তারা সকলে নির্লজ্জ শারীরিক তীব্রতায় ও কামোত্তেজনায় কুপোকাত হয়ে পড়ল এবং শুরু করল অসভ্য কামলীলা। উৎসব যেন পরিণত হলো প্রাচীন রোমক লাম্পট্য অনুষ্ঠানে। অতি সুভদ্র মহিলারাও নিজেদের সামলে রাখতে পারল না…অতিরিক্ত ক্রিয়ায় অনেকে মারা গেল আর অনেকে এখনও পেটের ধারাবাহিক পীড়ায় ভুগছে।’’ এই প্রতিবেদনটির ভিন্ন বর্ণনাও রয়েছে যাতে জীবনহানির কথা উলেখ করা হয় নি। প্রভাঁসে ১৭৭২ সালের ১১ সেপ্টেম্বর পার্লামেন্ট অফ এক্স-এ তার বিচার হলো এবং সমকামিতা ও বিষ প্রয়োগের অপরাধে তাকে মৃত্যুদণ্ড প্রদান করা হলো। কিন্তু একদিন পরই সাদ কারাগার থেকে পালালেন এবং শ্যালিকা আন-প্রোসপ্যেরকে নিয়ে ইতালি পালিয়ে গেলেন। তারা দুজনে ইতালির পিয়েদমন্ত অঞ্চলের দিকে অগ্রস্রর হলে ৮ ডিসেম্বর ফরাসি সরকারের মিত্র সারদিনিয়ার রাজার সৈন্যরা তাদের গ্রেফতার করে মিয়োলঁ দুর্গে অন্তরীণ করে রাখে। এটা এখন আর পরিষ্কার নয় যে কেন মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার জন্য সাদকে ফ্রান্সে ফিরিয়ে আনা হয় নি। যা-ই হোক, ১৭৭৩ সালের ১ মে পর্যন্ত তাকে মিয়োলঁতেই রাখা হয়। সেদিনই সন্ধ্যায় সহচর এক কুখ্যাত কয়েদির সাথে পালিয়ে জেনেভা চলে যান সাদ। তারপর সেখান থেকে তিনি একা প্রভাঁসে আসেন এবং স্ত্রীর সাথে দেখা করেন। তার স্ত্রী সব ভুলে সাদের সাথে থেকে যেতে লাগলেন, যতক্ষণ না সাদ ১৭৭৬ সালের প্রথমদিকে ইতালি চলে যান। ১৭৭৬ সালের নভেম্বরে সাদ তার নিজ দেশ প্রভাঁসে ফিরে আসেন এবং তার স্ত্রীর সাথে থাকতে থাকেন। এবারও তিনি দুরহওঁ নামের এক স্থানীয় যাজকের সহযোগিতায় তার শার্তু বা দুর্গে বালিকাদের এনে যৌনানুষ্ঠানের আয়োজন করতে থাকেন। ১৭৭৭ সালের ১৭ জানুয়ারি কাথারিন ত্রিয়ে নামের এক বালিকার পিতা পুলিশসহ তার বাড়ি ঘেরাও করেন। সাদকে ধরে পারি নেওয়া হয় এবং ১৭৭২ সালে প্রদত্ত মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার জন্য আটক করে রাখা হয়। কিন্তু মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার আগেই ১৭৭৮ সালের ৩০ জুন সাদের আইনজীবী, জোসেফ-জেরোম সিমোঁ, প্রভাঁসের উচ্চ আদালতে আপিল করে অপ্রতুল সাক্ষ্যের কারণ দেখিয়ে আগের প্রদত্ত রায়কে রদ-রহিত করে ফেলেন। সাদ এখন মুক্ত, কিন্তু এখনও রাজার কয়েদি। আবার পালিয়ে এসে সাদ তার প্রাসাদে আশ্রয় নেন, পুনর্বার গ্রেফতার হন ১৭৭৮ সালের ৭ সেপ্টেম্বর, ১৭৮৪ সাল অবধি তাকে থাকতে হয় আগের জেলখানায়। কিন্তু ১৭৮৪ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি এক রাজকীয় আদেশে তাকে বাস্তিল দুর্গে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। এই বাস্তিলেই তিনি তেরো গজ লম্বা ও চার ইঞ্চির একটু বেশি প্রশস্ত রোল কাগজে লিখলেন তার উপন্যাস সদোমে ১২০ দিন এবং পুরোহিত ও মৃত্যুপথযাত্রীর সংলাপ। একটি ছোট গল্পকে বড় করে লিখলেন জুস্তিন বা সুনীতির দুর্ভাগ্য। ১৭৮৯ সালের ২ জুলাই বাস্তিলের টাওয়ার উইনডোতে কাজ জুটিয়ে ওপর থেকে ম্যাগাফোনে রাজা-রানির বিরুদ্ধে জনসাধারণকে কথা বলার অপরাধে তাকে পাগলাগারদে স্থানান্তর করা হয়, ফলে অল্পের জন্য তিনি ব্যক্তিগতভাবে বাস্তিল দুর্গ পতনের বিপ্লবে অংশগ্রহণ করতে ব্যর্থ হন, যা শুরু হয়েছিল ১৪ জুলাই। যা-ই হোক ১৭৯০ সালের ১৩ মার্চ গণপরিষদের এক ডিক্রি বলে তার সাজা মাফ হয়, ২ এপ্রিল গুডফ্রাই ডে-র দিন তিনি পাগলাগারদ থেকে ছাড়া পান। কপর্দকহীন মার্কি তার এক আইনজীবী বন্ধুকে বুঝিয়ে-সুজিয়ে তার ঘরের ভূ-গর্ভস্থ কক্ষে থাকার অনুমতি পান। সেখানে থাকাকালে তিনি লেখেন অমিত্রাক্ষরে এক অঙ্কের একটি এবং পাঁচ অঙ্কের আরেকটি নাটক। ওই সময় যদি পঞ্চাশ বছর বয়স্ক মার্কি কোনো যৌনাকাঙ্ক্ষা মেটানোর সময় পেতেন, তাহলে তা তিনি সাবধানেই করতেন, কিন্তু তার সাহিত্যিক উৎসার প্রমাণ করে যে ওই সময়টুকুতে তিনি তা পান নি। পরের বছর বাস্তিলে থাকার সময় রচিত লেখাগুলো তিনি পরিমার্জনা করেন আর তার একমাত্র প্রকাশিত নাটকটি রচনা করেন। ১৭৯২ সালের দিকে সাদের মধ্যে রাজনৈতিক সচেতনতা পরিলক্ষিত হয়। সংস্কারিত অভিজাত হিশেবে তিনি পরিচিতি পান। রোবেসপিয়ারের জেকোবিন ক্লাবের সচিব হিশেবে তিনি দায়িত্ব পান। আরও দু-একটি সংগঠনের সাথেও তার সম্পৃক্ততা ছিল। এরপর তিনি লেখেন শয়নঘরের দর্শন যা ১৭৯৫ সালের গ্রীষ্মকালে প্রকাশিত হয়। এই বইয়েই রয়েছে বিখ্যাত সেই রাজনৈতিক বক্তব্য : ‘‘নিজেদের রিপাকলিকান বলার আগে, ফরাসিরা, করো আরও একটি প্রচেষ্টা আর তোমাদের রিপাবলিক সকল মুক্ত মানুষের হৃদয়মনে চিরতরে বেঁচে থাকবে’’ যা ১৮৪৮ সালে বিপ্লবের সময় আলাদাভাবে ছাপিয়ে ব্যাপক বিলি করা হয়। এ সময় তিনি বাস্তিল দুর্গে থাকাকালীন লেখা কিছু অনন্বিত গল্পগুলোকে নিয়ে চার খণ্ডের একটি উপন্যাসও প্রকাশ করেন। ১৭৯৭ সালে প্রকাশিত হয় জুলিয়েত যা সাত খণ্ডে রচিত তার সবচেয়ে দীর্ঘ উপন্যাস। এ সময়ে তিনি এই উপন্যাসকে সম্প্রসারণের কাজও করেন, যাতে যুক্ত হয় কিছু অত্যাচারের দৃশ্য যা আগে ছিল না। কাহিনিটির নৈতিক সমাপ্তির বিষয়টিরও পরিবর্তন করেন, যেখানে অসতের ওপর সদ্‌গুণের বিজয়ী হওয়াকে বদলে বিপরীতটি করে দেন তিনি। বইগুলো সারা ইউরোপে হাজার হাজার কপি বিক্রি হয়ে যায়, যদিও এর থেকে যথাযথ সম্মানী লেখক পান নি। বয়স-হয়ে-যাওয়া প্রায় বন্ধুবান্ধবহীন সাবেক দাগি একজন আসামির পক্ষে প্রকাশকদের কাছ থেকে লেখক-সম্মানী আদায় করাও ছিল কঠিন, একই কারণে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়াও ছিল অসম্ভব। ফলে তার লোকসানই হলো। ১৭৯৮ সালে পারির অ্যাপার্টমেন্ট ছেড়ে দিতে তিনি বাধ্য হন, তিনি বুস-এ চলে গিয়ে তারই একজন কৃষকের কাছ থেকে একটি ছোট্ট ঘর ভাড়া করে বাস করতে থাকেন। ১৭৯৮-১৮০১ পর্যন্ত তিনি লেখালেখিতেই নিমজ্জিত থাকেন যদিও তা তার আগের লেখাগুলোর ভাববিস্তার ছাড়া বড় একটা কিছু ছিল না। এসবেরই একটি সংকলন ১৮০০ সালে বের হয় প্রেমের অপরাধ নামে। ওই সময়ে একটি নাটকে অভিনয়ও করেন তিনি। এ সময় জোলো ও তার তিনজন অনুচর নামের শ্লেষাত্মক পুস্তিকা লিখে তিনি অভিযুক্ত হন। ১৮০১ সালের ৫ মার্চ তিনি গ্রেফতার হয়ে যান এবং বিচার ছাড়াই সাজাপ্রাপ্ত হন যা নেপোলেয়োঁর রাজত্বে ছিল সাধারণ আচার। নেপোলেয়োঁ-ই তাকে শেষবার কারাগারে পাঠান, কারণ ছিল তাঁ স্বহস্তে লিখিত জুস্তিন উপন্যাসের পাণ্ডুলিপি, প্রমাণ হিশেবে যা প্রকাশকের কাছে পাওয়া গিয়েছিল, যদিও সাদ নিজে বলেছিলেন যে জুস্তিন বা ওই ধরনের কোনো লেখাই তিনি লিখেন নি। কারাগারে নানা ধরনের উপদ্রব করার জন্য ১৮০৩-এর ২৬ এপ্রিল তাকে অধিকতর নিরাপদ স্থান হিশেবে শারেঁতোঁর পাগলাগারদে রাখা হয়, তার রোগকে চিহ্নিত করা হয় ‘সেক্সুয়াল ডিমেনশিয়া’ বলে। কেউই তাকে প্রথাগত অর্থে পাগল বলেন নি, তবু সমাজের দোহাই দিয়ে তাকে পাগলাগারদে রাখা হয়, যেখানে ছিল কিছুটা আরাম, চারপাশে বই আর তার কন্যাবৎ মাদাম কোসিয়েঁর সান্নিধ্য। যেখানে পালমোনারি বন্ধ হয়ে যাওয়া ও প্রোস্টেট পচনজনিত জ্বরের ফলাফল হিশেবে ১৮১৪ সালের ২ ডিসেম্বর রাত ১০টায় তিনি মৃত্যুবরণ করেন। জিলবার্ত রেলি-র লেখা বিখ্যাত জীবনীতে সাদের জীবনের অনুপুঙ্খ বিবরণ রয়েছে।

সাদকে একদা বলা হয়েছিল ‘মন্দের সমর্থক’, ‘শয়তানের সাগরেদ’; তার কাজকে ‘দৈত্যসুলভ’, ‘কদর্য’, ‘ভয়ংকর’, ‘অধঃপতিত’, ‘গা-গোলানো’, ‘ঘিনঘিনে’ ইত্যাদি ভাষায় আখ্যায়িত করা হয়েছিল। ১৮০০ সালের ২২ অক্টোবর ‘জোনাল দি আ’-তে তার প্রেমের অপরাধ বইটির বিষয়ে গিয়ম ভিলতে লিখেছিলেন, ‘‘বিভীষিকার সমাহার… জঘন্য একটি বই যার লেখক তার চেয়েও জঘন্য একজন।’’ ১৮৩৪ সালে, সাদের কুড়িতম মৃত্যুবার্ষিকীতে, র‌্যুভো দা পারিতে জুল জোঁনা লেখেন: ‘‘রক্তাক্ত শব, মায়ের আলিঙ্গন থেকে নিয়ে এসে শিশুকে ধর্ষণ, কামানুষ্ঠানে যুবতীদের বারোটা বাজানো, রক্তে আর আরকে উপচে পড়া পেয়ালা, অকল্পনীয় ভোগান্তি, অসহ্যকর পীড়ন… কী এক নাছোড়-দৈত্য;…যখন তিনি তার অপরাধের শেষপ্রান্তে পৌঁছেন, যখন তিনি তার অজাচার আর বর্বরতার তলানিটুকুও শেষ করেন, সবশেষে যখন তিনি সেখানে, নিজ ছুরির আঘাতে শরীরগুলো বিদীর্ণ, বলাৎকৃত, যখন দূষিত করার মতো কোনো গির্জাও আর বাকি থাকে না, যখন তার ক্রোধে নিষ্ঠুরতার হাত থেকে কোনো শিশু রক্ষা পায় না, যখন একটিও ভালো চিন্তা পাওয়া যাবে না যাকে তিনি তার কদর্য-কুৎসিত মতবাদ এবং ভাষা দ্বারা কালিমালেপন না করেছেন, কেবল এসব করার পরই তিনি থেমেছেন… নিজের দিকে তাকিয়েছেন…আর হেসেছেন।’’ ১৯৪৯ সালে মধ্যরাত্রির সংস্করণ বা লে-জেদিশোঁ দ্য মিনুই-এ মরিস বাঁশো যা বলেছেন তা আরও গভীর ও যথার্থ :

পাঠাগারে যদি কোনো নরক থেকে থাকে, কোনো নরকের এক বিশেষ অংশ যা মনে হবে মানুষের উপভোগের জন্য অনুপযুক্ত, এটা এমনই এক পুস্তক (যেমনটা সাদের জুস্তিন বা সুনীতির দুর্ভাগ্য, শয়নঘরের দর্শন, জুলিয়েত বা পাপীর পোয়াবারো)। কোনো যুগের সাহিত্যই এমনতরো কলঙ্কময় কাজ দেখে নি যা এত গভীরভাবে মানুষের ভাবনা ও অনুভূতিকে আঘাত করেছে…হ্যাঁ দাবি করা যেতেই পারে যে, এর মাধ্যমে আমরা সর্বযুগের সবচেয়ে কলঙ্কময় লেখা পেয়েছি… এমন কাজ যা কোনো লেখকই কোনো সময়ে করার ঝুঁকি নিতে পারেন নি।

এই প্রশ্নটি ওঠা স্বাভাবিক ও উচিত যে সাদকে নিয়ে কেন এত বিতর্ক, তবে তার জীবনঘটনা থেকে তা অনুমিতও। কিন্তু যৌনতার ইতিহাস ঘেটে দেখলে বিষয়টা আরও স্পষ্ট হবে। সাদের বিষয় ছিল কামকেলি ও কামস্বৈরিতা এবং তিনি বিংশ শতাব্দের সবচেয়ে বেশি ভাবনাসঙ্কুল এই বিষয়টির ওপর অনেকের আগেই ভেবে বসেছিলেন। কিন্তু এ-ই একমাত্র নয়; চার্লস ডারউইনের জন্মের পঁচিশ বছর আগে বিবর্তনিক পরিভাষায় তিনি প্রকৃতিকে আলোচনা করেন, হ্যাবলক এলিস ও রিশার্ড ফন ক্রাফট-ইবিং-এর অর্ধ শতাব্দ আগে বর্ণনাত্মক যৌনবিকারতত্ত্বের ওপর কলম ধরেন, জিগমন্ড ফ্রয়েডের এক শতাব্দ আগে অবচেতন মনের অস্তিত্ব সম্পর্কে আলোকপাত করেন, মার্গারেট মিড ও মার্গারেট সেঙ্গারের দেড় শতাব্দ আগে অধিকতর নৃতাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে যৌনতার অনুসন্ধান চালান এবং জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ সম্পর্কে সাবধানবাণী উচ্চারণ করেন। এ ছাড়া তার কিছু রাজনৈতিক চিন্তাকে পরবর্তীকাল চর্চা করেছিলেন জোসেফ স্তালিন, আডোলফ হিটলার, ফ্রান্সিসকো ফ্রাঙ্কো, বেনিতো মুসোলিনি, মাও জে-দং, ফিদেল কাস্ত্রো এবং ইয়ান স্মিথ-এর মতো ভিন্ন ভিন্ন ধরনের ব্যক্তিত্বরা। অর্থনীতিতে তিনি প্রাথমিকভাবে আলোকপাত করেছিলেন ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ (লিসে-ফেয়ার) বা অবাধ বাণিজ্যনীতিবিষয়ক ‘অর্থনৈতিক উদারবাদ’ ধারণার; পরবর্তীকালে অ্যাডাম স্মিথ, উইলিয়াম এওয়ার্ট গ্যাডস্টোন, ফ্রিডরিশ আ. ফন হায়েক, ফ্রাঙ্ক নাইট এবং মিলটন ফ্রিডম্যান কর্তৃক যা চরমভাবে বিকশিত হয়েছিল। আর যদি সোরেন কিয়ের্কেগাদ এবং জাঁ-পল সার্ত্রকে ধরা হয় অস্তিত্ববাদের প্রথম পুরোধা ও দ্বিতীয় পুরোধা, তাহলে সাদকেও বলা যাবে এক্ষেত্রে দু-একটি বীজবপনকারী, বিশেষত প্রজনন পরীক্ষণের জায়গা থেকে। এতকিছু যার থলেতে, তিনি ছিলেন তার ভাষায়, চরম অহম্বাদী, প্রোসেসার দু ক্রিমা বা অপরাধের ওস্তাদ, পিজিয়ে আ তু প্রি বা যে-কোনো মূল্যে ইন্দ্রিয়ভোগের অন্বেষক, এ কনসার দে নোরোপাথি দে তুত বা সর্ববিকারব্যাধির সমঝদার। কিন্তু তার নিজের ভাষায় তার পরিচয় খণ্ডিত বা আংশিক, আর এ কারণেই তার লেখাগুলো পাঠ করা আবশ্যক। যে স্যাডিজম শব্দটির জন্ম তাঁর নাম থেকে, সেই স্যাডিজম বা ধর্ষকামিতার কিন্তু তিনি আবিষ্কর্তা নন। তিনি আসলে স্যাডিজমকে সাহিত্যে-দর্শনে-মনস্তত্ত্বে সুসংবদ্ধ করেছিলেন মাত্র। কিন্তু অনেক আগেই, সভ্যতার সূচনালগ্ন থেকেই, তা রয়েছে সমাজে; সাহিত্যেও ধর্ষকামী বর্ণনা পাওয়া যায়: পেত্রোনিয়স আরবিতের-এর একজন ইন্দ্রিয়পিপাসু রোমকের স্মৃতিকথা ও হিসতোরিয়ে জোৎসোমেন-এর লেখায় মেলে এমন বিবরণ। প্রাচীন ভারতে অষ্টমী চন্দ্রিকা, সুবসন্তিকা, কার্তিকমাসে অনুষ্ঠিত কৌমুদি, চৈত্রমাসের বসন্তউৎসব ইত্যাদি অনুষ্ঠানে কুমারী মেয়েদের ফুসলিয়ে অজ্ঞাত স্থানে নিয়ে গিয়ে মাদকদ্রব্য খাইয়ে তাদের সাথে জোরপূর্বক সম্ভোগ করা হতো, যার সাথে মিলে যায় সাদ কর্তৃক বর্ণিত ও প্রতিষ্ঠিত কামাচারকেন্দ্র বা অর্জি ধারণার। কিন্তু যা গুরুত্বপূর্ণ তা হলো, সাদই প্রথম যৌনপ্রয়াস হিশেবে ধর্ষকামিতাকে উপস্থাপন করেন, যা মনস্তত্ত্ব ও আচরণিক বিজ্ঞানের জায়গা থেকে হয়ে ওঠে গুরুত্বপূর্ণ। সাদই বস্তুকামবাদ, পাশবিকতা, পায়ুগামিতা, মুক্তধর্ষ, মূত্রগলাধঃকরণ বা ইওরোপেগি, মলভক্ষণ বা স্কোপোফিলিয়া, মৃতদেহসংসর্গ বা নেক্রোফিলিয়া, যৌনদর্শনগ্রাহ্যতা ইত্যাদির প্রথম প্রচারক। এছাড়াও অযৌন মানসিক ব্যাধি ক্লেপটোম্যানিয়া বা চৌর্যাভ্যাস এবং পাইরোম্যানিয়া বা অগ্নিসংযোগ বাতিকগ্রস্ততারও প্রচারক তিনি। সত্যিকার অর্থে উভলিঙ্গবাদ, অপ্রাপ্তবয়স্ক যৌনতা এবং বার্ধক্য-যৌনতারও অন্বেষক তিনি।


পাপই জয়ী, পুণ্য পরাজিত—যেন ফুটে উঠেছে বিংশ শতাব্দের এক ভয়ংকর বিশ্বদর্শনের ব্যাপার।


কিন্তু যেটা অবশেষে তার নামকে পাঠকমানসে গড়পড়তা স্থায়িত্ব দিয়েছে তা হলো বিকৃতি। কিন্তু ধর্ষকামিতা কাকে বলে, কোথা থেকে তার উদ্ভব বা কী মনস্তাত্ত্বিক শক্তি এই ইচ্ছাকে বাস্তবে নিয়ে যায়, সাদ-বিষয়ক আলোচনায় তা জানা দরকার। মনোচিকিৎসাগত অভিধানের ভাষায় ধর্ষকামিতা বা স্যাডিজম হলো এমন এক ধরনের বিকৃতি যাতে কৃত রাগমোচন বা অর্গাজম অন্যের অত্যাচার বা ব্যথার যন্ত্রণাভোগ, খারাপ ব্যবহার বা মনঃপীড়নের ওপর নির্ভরশীল। এই সংজ্ঞার্থের প্রধান উপাদানটি হলো রাগমোচনের নির্ভরতা, যা অন্য ক্রিয়াকলাপের সাথে সম্পর্কিত। অতএব একজন ধর্ষকামী কেবল নিষ্ঠুরতাকেই উপভোগ করে না, বরং তার কামসন্তুষ্টি এই নিষ্ঠুরতার ওপর নির্ভরশীল। সুতরাং সচেতন, অবচেতন ও নির্জ্ঞান যৌন উৎসগুলোর ওপর যার শারীরিক বা মানসিক নিষ্ঠুরতা কোনো ছাপ ফেলে না, তাকে সঠিক অর্থে বলা যাবে না ধর্ষকামী। নিষ্ঠুরতার ধর্ষকাম এবং যৌনতৃপ্তির এই অনিবারণীয় বিজড়নই সাদের লেখায় প্রতিভাত।

কিন্তু ধর্ষমর্ষকামিতার উদ্ভব কোথা থেকে তা না জানলে এর পরাবর্তকে পুরোপুরি বোঝা যাবে না। মনঃসমীক্ষণে বলা হয়, দুটো বাহ্যিক উপাদান মানুষের মনস্তাত্ত্বিক জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে: প্রেম ও ঘৃণা, বা অন্যভাবে বললে: জীবনপ্রবৃত্তি ও মৃত্যুপ্রবৃত্তি। জীবনপ্রবৃত্তি সদর্থকমুখী, অহমকে তা সংরক্ষণ করে; মৃত্যুপ্রবৃত্তি ঋণাত্মকমুখী, অহমকে ধ্বংস করে বিপদে ফেলতে চায় তা। অন্যভাবে বলা যায়, যখন একজনের প্রতি কারও প্রেমের উপলব্ধি হয়, তার অর্থ হলো সে ওই একজনকে বলছে, ‘‘আমি তোমাকে ভালোবাসি, কারণ তুমি আমার অহমকে রক্ষা করছ,’’ আর যখন একজন কারও বিষয়ে ঘৃণাসংক্রান্ত ঋণাত্মক ধারণা পোষণ করে, তার মানে হলো সেই ব্যক্তি তাকে যেন বলছে, ‘‘আমি তোমাকে ঘৃণা করি, কারণ তুমি আমার অহমকে চোখ রাঙাচ্ছ।’’ নিষ্ঠুরতা হলো মৃত্যুপ্রবৃত্তির প্রকাশ, এটা ঘৃণানুভূতির শারীরিক অনুবাদ। যৌনতার প্রকৃতি বিষয়ে ব্যক্তির যে ভুল একাত্মতা, তার ফল থেকে তা কোনো যৌন-উপাদান পেয়ে যায়। এইজন্য বলা হয় যে, যৌন-বালসুলভ চপলতায় বা যৌন-বৃদ্ধিহীনতায় ভোগে ধর্ষকামী; অবচেতনিকভাবে সে ভয় পায় যে স্বাভাবিক কামসম্পর্কে প্রশ্রয় থেকে হীনবীর্যের জন্ম হয়, ফলে সে পলায়নী মানসিকতা থেকে অস্বাভাবিক তথা ধর্ষকামী সম্পর্কে আশ্রয় নেয়, কারণ তাতে থাকে না হীনবীর্যের অপমানের কোনো সম্ভাবনা। ধর্ষকামিতা, ধরা যাক ঈক্ষণকামী অপেক্ষা, সুনির্দিষ্ট অস্বাভাবিক আচরণগত ভাবের বিবেচনায় নির্বাচিত, কারণ এটা ভয়কে বাতিল করতে ব্যক্তিকে প্রণোদনা জোগায়। এটা হচ্ছে আগ্রাসকের সাথে এক ধরনের সমাসক্তি। ধর্ষকামী বাধ্য করতে চায় তার শিকারকে ভালোবাসতে, এই প্রেমকে ধরা হয় এক ধরনের মার্জনা হিশেবে যা তার কামসম্পর্কিত অপরাধী মানসিকতাকে দূর করতে চায়। ফ্রয়েডীয়রা অবশ্য এই ব্যাখ্যাকে চার স্তরের যৌন-প্রগতির সাথে মিলিয়ে স্বীকার করবেন যেখানে ধর্ষকাম পায়ুস্তরের অত্যানুরক্তি বা প্রত্যাবৃত্তি। কিছু লেখক ধর্ষকামিতার জৈবিক ব্যাখ্যা দেওয়ার পক্ষপাতি, তারা একে বলে ‘আলগোলাগনিয়া’, যা বোঝায় বেদনানন্দ। তারা প্রপঞ্চটিকে শারীরিক সংবেদ-লিপ্ততার জায়গা থেকে দেখতে চান। যা-ই হোক, বর্তমানে অনেকে যৌনবিচ্যুতিকে লিবিডোর অভিঘাতজনিত অসুস্থতা বা ‘ট্রমাটাইজেশন অফ দ্য লিবিডো’ তত্ত্ব দিয়েও ব্যাখ্যা করছেন। লিবিডো হলো শক্তি, মানুষের যৌনশক্তি, যৌনাকর্ষণের শক্তি, যৌনজীবনের গতিশক্তি। এর ভ্রূণবিদ্যা বা শারীরবিদ্যা জানা নেই। এর উপাদান হয়তো তড়িৎ বা রাসায়নিক, বা দুটোই। লিবিডোর চারটি রূপ রয়েছে: ইতরকামিতা, সমকামিতা, আত্মরতি এবং বিকৃতি। সবার মধ্যেই এগুলোর উপস্থিতি রয়েছে, পার্থক্য শুধু অনুপাতের।

কামাবেগকে নিজের মধ্যে স্বৈরাচারীর মতো প্রকাশ এবং সাহিত্যে ও চিন্তায় তাকে সম্পূর্ণ নতুনভাবে উপস্থাপনের দিক থেকে সাদ ছিলেন ব্যতিক্রমী। সাদ তার ব্যতিক্রমী লেখায় এমন কিছু মনস্তাত্ত্বিক, সামাজিক ও দার্শনিক উপকরণ ব্যবহার করেছেন যা আগেও ছিল অতুলনীয়, এখনও তা-ই। সমালোচকেরা বলেছেন, সাদের অন্তর্দৃষ্টি ছিল গভীর। তার লেখায় শুধু যৌনবিভ্রমই বর্ণিত নয় যা আধুনিক বিজ্ঞানের বিষয়বস্তু, বরং তাতে যৌনতার ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ-শ্রেণিবিন্যাসও রয়েছে দারুণভাবে। এই কারণেই দেড়শ বছর অশ্লীলতার দায়ে নিষিদ্ধ থাকার পরও তার লেখা জেগে উঠেছে। যৌনবিজ্ঞান এখন যা করছে, সাদের লেখা, তার সাইকোপেথিয়া সেক্সুয়ালিস, তাকে ভিত্তি জুগিয়েছে। এজন্যই তিনি বলেছিলেন, যা কিছুই বর্ণিত ও ব্যাখ্যা করা হোক না কেন এসব বিচ্যুতি থেকেই সম্ভাব্য মানবাচরণের চমৎকার কাজ হতে থাকবে যা হবে অতি আকর্ষণীয়ও। দীর্ঘদিন তার লেখা নিষিদ্ধ ছিল বটে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে গুপ্তগ্রন্থের মতোই চলত এগুলোর পাঠ। বিখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক লুইস বুনুয়েল তার আত্মজীবনীগ্রন্থ মাই লাস্ট ব্রিদ-এ লিখেছেন: ‘‘মার্কি দ্য সাদের লেখাও আমার অতি পছন্দের। আমার পঁচিশ বছর বয়সে তার সদোমে ১২০ দিন বইটি পড়ে আমি ডারউইনের রচনার চেয়েও অতিমাত্রায় আশ্চর্যান্বিত হই। …এক অজানা জগতের দেখা যেন পেলাম। তখনও আমি সাদ সম্পর্কে জানতাম না কিছুই। আমাদের মাদ্রিদের বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকেরা অনেকটা গর্ব করেই বলতেন, ছাত্রদের নিকট তারা কোনো কিছুই গোপন করেন না। তখন দান্তে, হোমার আর সার্ভেন্তিসের লেখাই আমরা পড়তাম সচরাচর। সুতরাং কেন যে সমাজের এই দৃঢ় ও প্রামাণ্য উন্মোচনের ব্যাপারে জানতে পারলাম না? সংস্কৃতির এমন মূলোৎপাটন করার উপস্থাপনা কেন যে আমার অগোচরে থেকে গেল? সাদের লেখার কাছে বহু সাহিত্যকর্মই ম্লান হয়ে যায়।… এখনও সাদের সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পদ্ধতির প্রতি রয়েছে আমার গভীর অভিনিবেশ। তার ভাবনা আমাকে যারপরনাই প্রভাবিত করেছিল নানাভাবে। বিশেষত দ্য গোল্ডেন এজ ছবিটি বানানোর ক্ষেত্রে সেই প্রভাব ছিল অপরিসীম।’’ বুনুয়েল আরও বলেছেন, কিভাবে সাদের বইয়ের দুষ্প্রাপ্য সংস্করণ নানা লেখকের কাছে রক্ষিত থাকত, বিশেষত মার্সেল প্রুস্ত, ব্রেতঁ এবং এলুয়ারের কাছে।

বিংশ শতাব্দে সাদের পুনর্জাগরণের পেছনে একটি সুনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক কারণ আছে। রয়েছে বিশ্বযুদ্ধের অভিঘাতজনিত নতুন দৃষ্টিভঙ্গি। ১৯৪৪ সালে দুজন জার্মান চিন্তক, যাদের ছিল ইহুদি উত্তরাধিকার, একটি বই লেখেন যা নির্দেশ করেছিল সাদীয় ভাবনার কারণকে। টেয়োডোর আডেরনো এবং মাক্স হোর্কহাইমার লেখেন সেই বইটি যার নাম দ্য ডায়েলিকটিক অব এনলাইটেনমেন্ট, যা প্রকাশিত হয়েছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র থেকে। এ বইয়ে তারা বললেন নতুন কথা; বললেন, অষ্টাদশ শতকের ইউরোপীয় আলোকপ্রাপ্তি ও কাল্পনিক খোয়াব হাস্যকর বিষয়ে পরিণত হয়েছে আর তা হয়েছে দু-দুটো বিশ্বযুদ্ধের ঘটনা ও অভিজ্ঞতায়, যা ছিল যেমনি অবিশ্বাস্য তেমনি ভয়ংকর। তারা আরও বললেন, যথাযথ তথ্যপ্রবাহ এবং নিত্যনতুন বিনোদন একদিকে মানুষকে যেমন করেছে কেতাদুরস্ত, অন্যদিকে বানিয়েছে বোকা। ইউরোপীয় সভ্যতার আড়ালে ঘাপটি মেরে বসে আছে এক বাঘ, যা সুযোগ পেলেই বের হয়ে এসে ঘাড় মটকে দেয়। তারা আরও বললেন, এই বিষয়টা প্রথম ধরতে পেরেছিলেন মার্কি দ্য সাদ, যা রয়েছে তার উপন্যাসগুলোতে। বইটিতে তাঁরা বললেন, আলোকপ্রাপ্তি ও তার সীমাবদ্ধতা বিষয়ে; সাদের জুলিয়েত উপন্যাস বিষয়ে লিখলেন একটি অধ্যায় যার নাম ‘জুলিয়েত বা আলোকপ্রাপ্তি এবং নৈতিকতা’। এভাবেই খোলামেলাভাবে শুরু হলো সাদ-চর্চা। পিয়ের ক্লভৌক্সি, ওক্তাবিয়ো পাস, জর্জ বাতাই, মরিস বাঁশো, সিমন দ্য বোভোয়া, জাক লাঁকা, রোলাঁ বার্থ, ফিলিপ সলের্শ, ফ্রেডরিক জেমিসন প্রমুখ লিখলেন সাদের ওপর, নতুনভাবে আবির্ভূত হলেন একদা বিস্মরিত সাদ।

আজীবন সাদ অনুশীলন করে গেছেন তার নারী-বিদ্বেষ লাম্পট্য ও কাম-বিকৃতির মাধ্যমে। ১৭৯০ সালে তার সর্বংসহা স্ত্রী তাকে পরিত্যাগ করার পর তিনি স্বামী-পরিত্যক্তা এক তরুণী অভিনেত্রী কোঁস্তাসঁ কিরনি-র সাথে পরিচিত হন এবং আজীবন তার সাথে নিজ উদ্দেশ্য চরিতার্থ করতে থাকেন। তিনি তাকে ডাকনাম দেন ‘সুবেদিতা’, আর জুস্তিন উপন্যাসটি তাকে উৎসর্গ করেন। উৎসর্গপত্রে লেখেন:

কোঁস্তাসঁকে: হ্যাঁ, প্রিয় সখি আমার, যাকে এই বই উৎসর্গ করা যায় সে তো তুমিই; কারণ যা তোমারই অংশ; তোমার সেই সম্মান ও সদ্‌গুণকে, ভালোভাবে জেনেই, পাপ ও কুকর্ম, এক্ষণে হিশেবকৃত কুতার্কিকতা এবং উন্নাসিকতা তোমাকে কোনো বিপদে ফেলবে এ ভয় আমার নেই। নিশ্চয়ই কেউ না কেউ এই বইকে ঘৃণার চোখে দেখবে, তা তারা করতেই পারে; পাপ পাপকেই স্বীকার করে, আর এই স্বীকৃতি সবসময়ই বেদনাদায়ক। যা-ই হোক, এ ধরনের মানুষ আমার বিবেচ্য নয়; তুমি, এবং তোমার মতো অন্যদের প্রতি আমার উদ্দেশ্য পরিষ্কার। এ কাজটি ভিন্ন ধরনের। অন্য উপন্যাসে পাপের ওপর পুণ্য জয়ী হয়; ঈশ্বর হন জয়ী, শয়তানের হয় শাস্তি। কিন্তু এখানে দেখবে পাপই জয়ী, পুণ্য পরাজিত।

এই শেষ পঙ্‌ক্তিটিতে—পাপই জয়ী, পুণ্য পরাজিত—যেন ফুটে উঠেছে বিংশ শতাব্দের এক ভয়ংকর বিশ্বদর্শনের ব্যাপার।

আমরা যাকে বলি পর্নোগ্রাফি, তা হলো নারীশরীরের এক ধরনের স্থিরচিত্রের মেকি গতিশীলতা, যার প্রযোজক হলো পুরুষ। পুরুষ এখানে একচ্ছত্র, নারী নিমিত্ত মাত্র। এঞ্জেলা কার্টার বলেছেন, পর্নোগ্রাফারেরা হলো নারীর শত্রু, কারণ পর্নোচিন্তা পরিবর্তনের সম্ভাবনাকে বিবেচনা করে না, যেন মনে হয় নারীরা দাস মাত্র ইতিহাসের, তার রচয়িতা নয়; যেন যৌনসম্পর্ক প্রয়োজনীয়ভাবে সামাজিক সম্পর্ক নয়, যেন যৌনতা এক বাহ্যিক বিষয়, আবহাওয়ার মতো নির্বাক বিষয়, যা মানুষের বিমানবিক অনুশীলনকে সৃষ্টি করে, তাতে মানুষের অংশগ্রহণ হয় না। পর্নোগ্রাফি হলো মানুষের শারীরিক সঙ্গমের বিমূর্তীকরণ, যাতে ব্যক্তিপ্রতিস্ব হ্রাস পেয়ে বাহ্যিক উপাদানে পরিণত হয়। এক্ষেত্রে পুরুষটিই শুধু সক্রিয়, নারীটি পুরুষ-সক্রিয়তার জোগানদাতা। নারী কিছু শূন্যস্থান নিয়ে ঘুরে বেড়ায়, যা তার নিরঙ্কুশ স্বেচ্ছাচারিতায় পূরণ করে পুরুষ। এক্ষেত্রে যৌন-সংসর্গ হলো আচরণগতভাবে স্বৈরাচারী। নারীর দু-ঊরুর মাঝে একটি আস্ত শূন্য ছাড়া কিছু নেই, এই চিহ্ন হলো অর্থহীন যতক্ষণ না পুরুষ তাকে অর্থময় করে তোলে। ফ্রয়েড বলেছেন, শারীরসংস্থানবিদ্যাই হলো নিয়তি, কথাটি নারীর জন্য যেন আরও যুৎসই হয়ে যায় পর্নোগ্রাফিতে। পর্নোগ্রাফি হলো কল্পনা; অন্তহীন রতিসংযোগ, মনে হয় এভাবেই তা চলতে থাকবে যেভাবে চলে কারখানার যন্ত্র ঠিকঠিকভাবে। সাদ এমন এক যৌনতার জগৎ সৃষ্টি করেছেন যেখানে তা উপহার দেয় এক নরক-ব্যথার, বেদনার। নারীর শরীরকে টুকরা টুকরা করে তিনি জন্ম দেন তার নিজস্ব বিভ্রম। যৌন-উগ্রতার মাধ্যমে তিনি এমন এক অবস্থার জন্ম দেন যেখানে তার তত্ত্ব কার্টেসীয় ঢঙে যেন বলে ওঠে, ‘‘আমি আছি কেননা আমি চুদি।’’ শয়নঘরের দর্শন উপন্যাসে সাঁতমোজে যখন তার শিশ্নটি দেখিয়ে ইউজেনেকে বলে, ‘‘…দ্যাখো, জীবনের ধন; চমৎকারভাবে বাড়ন্ত; এটা শিং যা দিয়ে পুরুষ গুঁতো মারে। একে বলা হয় বাড়া, ধোন বা দণ্ড। এটা দিয়েই যৌনানন্দ উপভোগ করা হয়। এটার এমন সমীহ জাগানো স্বাচ্ছন্দ্য রয়েছে যে, নারীদেহের যে-কোনো অঙ্গে প্রবেশ করতে পারে এটা।’’—তখন কি মনে হয় না যে পুরুষাঙ্গটি শিকার করছে নারীর সমস্ত শরীরকে, এবং তার কাজই হচ্ছে সর্বগ্রাসী ধর্ষকাম করা? তিনি বলেওছেন যে, মানবীয় সম্পর্কের মূলই হলো রতিক্রিয়া আর এই রতিক্রিয়ার অজগরটি হলো পুরুষের শিশ্ন, যার গহ্বরে অনায়াসে এবং কোনোরকম প্রতিরোধ ছাড়াই ঢুকে যায় যে-কোনো বয়সের নারী। শয়নঘরের দর্শন-এ দোলমাঁস এজন্যই বলতে পারে: ‘‘এটা শিশ্ন নয় এক প্রতিষ্ঠান!’’ সদোমের ১২০ দিন-এও শিশ্নের প্রদর্শনী: যা মোটাতাজা, ঠিক যেন আলাদিনের চেরাগের এক দৈত্য। সাদ শুরুতেই প্রথম লম্পট ডিউক অব বুঁজি-র কথা বলছেন, যার বয়স পঞ্চাশ, যে মদ্যপায়ী, মিথ্যাবাদী, চোর, সমকামী, পেটুক, এবং মাতৃধর্ষক, যে ষোল বছর বয়সে পিতার অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া থেকে ফেরার পথে মাকে ধর্ষণ করে। তার রয়েছে আকর্ষণীয় শক্তসমর্থ শরীর, কিন্তু সবকিছুকে ছাপিয়ে তার দীর্ঘ শিশ্নটি হলো সেরা আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু যা এক মনুমেন্টের মতো, যার বেড় আট ইঞ্চি আর দৈর্ঘ্য ষোল ইঞ্চি, এবং দণ্ডায়মান অবস্থায় তা কোনো দিকে হেলে না, বরং একদম সোজা হয়ে থাকে যেন একটি পতাকাস্তম্ভ। সাদ শিশ্নের বাহ্যিক বর্ণনা দেওয়ার পর দেন তার কর্মক্ষমতার বর্ণনা, এভাবে যে, এই শিশ্ন একদিনে আঠার বার বীর্যপাত করতে পারে। সুতরাং, সাদের পুরুষ মানে শিশ্নপুরুষ। শুধু তা-ই নয়, তারা নারীবিদ্বেষী ও বিকৃতকামীও। যখন তারা নারীর পায়ুদেশ দিয়ে সঙ্গম করে তখন নিমিষেই ভুলে যায় যে তার সন্নিকটেই রয়েছে নারীর স্বাভাবিক যৌনাঙ্গটি। সে স্মরণ করতেও চায় না তা, কারণ তা মনে এলেই তার স্বাভাবিক আনন্দের ব্যাঘাত ঘটবে। কিন্তু এই উপলব্ধিও শেষ কথা নয় সাদের কাছে। যৌন-রূপক দ্ব্যর্থাত্মকও তার লেখায়। নারীর রন্ধ্রকে তিনি বলেছেন এক মন্দির; এক পূজার স্থান। জুস্তিন উপন্যাসের শল্যচিকিৎসক রোলাঁ যোনিকে সম্বোধন করে বলে : ‘‘আমার দীর্ঘকামনার মন্দির।’’ বীর্যপাতকে বলা হয় ‘জ্বলন্ত ধূপকাঠি’, চরম পুলককে ‘সম্মান জানানো’। শিশ্ন হলো সাদের কাছে ‘যৌনানন্দের প্রথম মাধ্যম’। কখনও তা ‘যুদ্ধক্ষেত্রের যন্ত্র’। আর প্রায় সময়ই শিশ্ন এক সাপ, যে বিষ উগড়ে দেয়। যখন জুস্তিন দেখে যে কামুক সাধু জেরোম সেন্ট ম্যারি মঠের এক বন্দিনী যুবতী বালিকার মুখে শিশ্ন ঢুকিয়ে দিচ্ছে, তখন তার মনে হলো: ‘‘নোংরা সরীসৃপ গোলাপটিকে ধ্বংস করে ফেলছে।’’


একটি পরাধীন সমাজে একজন স্বাধীন নারী হয়ে ওঠে দানব।


তার উপন্যাসের সব-সেরা চরিত্ররা কেউ রাষ্ট্রনেতা, রাজকুমার, ডিউক, কেউবা পোপ, কিন্তু সবাই নিষ্ঠুর, এবং তাদের যৌন রাক্ষুসেপনা এক ধরনের বিশুদ্ধ ধ্বংসাত্মকতা। তারা চায় পৃথিবীকে শুধু ‘ফাক’ করতে এবং এটাই তাদের জন্য চিরবিলুপ্তির শক্তিপ্রয়োগের একমাত্র পথ। এমনকি তার মহিয়সী নারী জুলিয়েত, ক্লাভিল, রাশিয়ার কাথারিন দ্য গ্রেট, নেপলসের শারলোতরাও কম নিষ্ঠুর নয়, বিশেষত যখন তারা পায় ক্ষমতার স্বাদ। একবার তারা যদি তাদের আগ্রাসনের হাতিয়ার হিশেবে যৌনতাকে ব্যবহার করতে জানতে পারে, তাহলে তারা আর পিছপা হয় না। অ্যাঞ্জেলা কারটার বলেছেন, একটি পরাধীন সমাজে একজন স্বাধীন নারী হয়ে ওঠে দানব। সাদের নর-নারী উভয়েই বিদ্ধ করে বা বিদ্ধ হয়, এবং দুটোই তাদের উদযাপন: সমকামী দ্য ব্রিসাক জুস্তিনকে বলে, কিভাবে সে নিজে নারী সেজে যৌনতাকে উপভোগ করে; শয়নঘরের দর্শন-এর কামশিক্ষক দোলমাজেঁ নিজের পায়ুকে যোনি ভেবে ও ব্যবহার করে আনন্দ উপভোগের কথা বলে।

অষ্টাদশ শতাব্দ থেকেই সাদকে বিবেচনা করা হতো ভয়ংকর পর্নোলেখক হিশেবে, শুধু তা-ই নয়, বিশেষভাবে মনে করা হতো সমাজের জন্য ধ্বংসাত্মক এবং ক্ষতিকর। সাধারণত প্রতিটি সমাজেই কিছু চটি পর্নোগ্রাফি থাকে, এসব চটি আবার ভেতরে ভেতরে রসনা মিটায় এক শ্রেণির পাঠকের। নীতিবাদীরাও গোপনে তার আস্বাদ নেয়। এসব লেখা বাজেয়াপ্ত হয় না কখনও, কারণ এগুলো নিছকই কাম-বিনোদনের ভূমিকা রাখে, এগুলোর লেখকও আড়ালের মানুষ, কখনও কখনও ছদ্মনামের লেখক, কখনও পয়সা রোজগারের জন্য প্রতিষ্ঠিত লেখকেরাও ছদ্মনামে এ জাতীয় কিছু লিখে থাকে। কিন্তু সাদের লেখা বাজেয়াপ্ত হয়েছিল, কারণ সাদের কামকল্পনা সামাজিক প্রথাকে আঘাত করতে চেয়েছিল। তাই সাদকে পর্নোগ্রাফি-লেখকের তকমা দেওয়া অতি সরলীকরণ ছাড়া আর কিছু নয়। এজন্যই বিংশ শতাব্দীতে সাদের ব্যাখ্যার নতুনত্বের আবির্ভাব হয়। ফুকো তার মেডনেস অ্যান্ড সিভিলাইজেশান গ্রন্থে বলেন, স্যাডিজমকে চূড়ান্ত অর্থে প্রাচীন এরোস-এর মতো কোনো চর্চার বিষয় বলা যায় না, বরং তা এক ব্যাপক সাংস্কৃতিক ঘটনা যার আবির্ভাব হয়েছিল যথাযথভাবে অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে, যাতে ছিল পশ্চিমা কল্পনার অন্যতম সেরা দ্বিরালাপ: হৃদয়ের উন্মাদানন্দে, অভীপ্সার মাতলামিতে, সীমাহীন আকাঙ্ক্ষার অনুমানে প্রেম এবং মৃত্যুর বাতুলতায় অযুক্তির রূপান্তর। ফুকো আরও বলেছেন : ‘‘আমি মনে করি ধর্ষমর্ষকাম হলো… ইন্দ্রিয়সুখ লাভের নতুন সম্ভাবনার সত্যিকারের এক আবির্ভাব, যা কেউ আগে কখনও কল্পনা করতে পারে নি… শারীরিক আনন্দ সব সময়ই এক যৌনসুখের বিষয় আর যৌনসুখই সব সম্ভাব্য আনন্দের বিষয়—এই ধারণা এমন একটা কিছু যাকে আমি সত্যিসত্যিই এক মিথ্যা ভাবি। ধর্ষমর্ষকামের অনুশীলন আমাদের দেখায় যে, আমরা ইন্দ্রিয়সুখ গ্রহণ করতে পারি অনেক আশ্চর্য বস্তু থেকে, আর আমাদের শরীরের কিছু নিশ্চিত অস্বাভাবিক অংশকে ব্যবহার করতে পারি এক-একটি অস্বাভাবিক অবস্থায়।’’ ধর্ষমর্ষকামীদের ক্রিয়াকর্মকে অদ্ভুত ও আশ্চর্যজনক আনন্দের উৎসসন্ধান মনে করে ফুকো বলেন: ‘‘এসব লোকজন যা করছে তা নয় আগ্রাসী; তারা তাদের শরীরের আশ্চর্যময় অংশগুলোর দ্বারা আনন্দের নতুন সম্ভাবনাকে আবিষ্কার করছে শরীরের কামাগ্নির মাধ্যমে। আমি মনে করি, এটা…এক সৃষ্টিশীল কাজ, যা রয়েছে তার প্রধান একটা বৈশিষ্ট্যে, যাকে বলা যায় ইন্দ্রিয়সুখের বিযৌনতাকরণ।’’

সাদের কাছে যৌনসুখ একটি পুরোপুরি অন্তর্বৃত্ত বিষয়, যেখানে নারী-পুরুষের ভূমিকার অবস্থান্তর ঘটে। পুরুষটি কখনও নারী হয় আবার নারীটি হয় পুরুষ; আঘাতকারী ও নির্যাতকও এভাবে স্থানবদল করে। এটাও একটি পদ্ধতি যার মাধ্যমে তিনি হিংসা, ঘৃণা এবং আগ্রাসী মনস্তত্ত্বকে সবার মধ্যে সঞ্চারিত করেন। তার কাছে যৌনসুখ হলো যৌনবিপর্যাসের মাধ্যমে ইন্দ্রিয়াঘাত সৃষ্টি। তার সৃষ্ট চরিত্র জুস্তিন উপন্যাসের জুস্তিনের বোনের প্রেমিক নোয়ার্সাই বলে : ‘‘কাকে বলে সুখ? শুধু এইটুকু: যখন কামোদ্দীপক পরমাণু বা কামোদ্দীপক বস্তু থেকে পরমাণু উদ্‌গত হয়ে আমাদের ফাঁপা  স্নায়ুমণ্ডলের তন্তুতে প্রবাহিত তড়িৎবস্তুর সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয় এবং আগুন সৃষ্টি করে। এই সুখকে সমাপ্ত করার জন্য সংঘর্ষকে যতটা সম্ভব সহিংস হতে হবে।’’ অ্যাঞ্জেলা কার্টার এ ধরনের যৌনতাকে বলেছেন যন্ত্রণাদায়ক ‘‘অটো-ইরোটিসিজম’’-এর এক ধরন। কামসুখ এখানে অভিজ্ঞতার আলোকে উদ্‌যাপিত নয়; এটা বিষয়কেও পরিবর্তন করতে পারে না। এটা পুরোপুরি বাহ্যিকভাবে অনারোপিত এক প্রপঞ্চ, যার সংবেদন একান্তভাবেই ব্যক্তিক, যেন ছুরি দিয়ে কাটার সময়ও তা কোনো ব্যথা দিচ্ছে না। সাদ নিজেই যেন কসাইখানার ভেড়া এবং কসাই, যার হাতে রয়েছে নিরুত্তাপহীন ছুরিটি। সাদের জগতে যৌনতা ও তার কার্যকলাপ প্রজননহীন বা প্রজননবিরুদ্ধ এক সাম্প্রদায়িক তৎপরতা, যার বলীর শিকার নারীরা, যারা নিজেদের মুক্ত করতে এসে প্রকারান্তরে নিজেদের যৌনদাসীতে পরিণত করেছে। বিংশ শতাব্দের পর্নোগ্রাফির নতুন যে বিকাশ, সাদ যেন তার গুরু। ‘আর্কিটেকটনিক কনফিগারেশন’ বা সুসজ্জিত রূপরেখা, ভয়ংকর সঙ্গম, সমবেত স্খলন ও পতন, কামযান্ত্রিকতার শক্তিক্ষেপ, মুখবীর্যপাত, অণ্ডচোষণ, পায়ুগমন, ভগাঙ্কুর মর্দন ইত্যাদি কার্যাদি যেন বিংশ শতাব্দের নতুন পর্নোর অভাবিত গুরুবিদ্যা। যেন এক সাধ্বী স্ত্রী তার কাপবোর্ড ঠিকঠাক করছেন, সাদ যেন সবকিছুর জন্য এক জায়গা চাইছেন আর সবকিছু রয়েছে তার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত কামনার তাড়নার জায়গায়, বলেছেন অ্যাঞ্জেলা কার্টার।

মার্কি দ্য সাদের একাকিত্ব আসলে ছিল একজন বন্দির প্রতিদিনকার আতঙ্কের প্রতীক, যার আসল আশ্রয়স্থল তার আত্মবোধ। ঠিক এই জায়গা থেকেই বেশ কিছু লেখক প্রভাবিত হয়েছিলেন সাদের চিন্তায়। বোদল্যের প্রভাবিত হয়েছিলেন। তিনি যখন বলেন, সর্বজনীন বিরক্তি আর আতঙ্ককে উৎসাহিত করার মাধ্যমেই তিনি জয় করবেন একাকিত্বকে, তখন বুঝি যে তা হলো সাদীয় অনুচিন্তন, কারণ সাদই এই নারকীয় একাকিত্বকে পরম অহংবাদে পরিণত করেন। বোদল্যের বারে বারে পড়তেন সাদের লেখা এবং হয়েছিলেন সরাসরি তার দ্বারা প্রভাবিত। এছাড়া জাঁ জেনেরও আধ্যাত্মিক পূর্বসূরি ছিলেন সাদ। বিষাদের জায়গা থেকে তার সমসাময়িক অষ্টাদশ শতকের ইস্পানিওল চিত্রকর ফ্রানসিসকো গোয়া-র সাথে মিল রয়েছে তার এবং বিশ শতকের আমেরিকান লেখক উইলিয়াম বারোজের সাথেও রয়েছে তার মিল, বিশেষত তার চরিত্রগুলোর বহুরূপী বিকৃতি ও তীব্র বিচ্ছিন্নতার জায়গা থেকে। অ্যাঞ্জেলা কার্টার আরও বলেছেন, যদি সাদই হয় আলোকপ্রাপ্তির সর্বশেষ, বিষাদময়, বিভ্রান্ত স্বর, তাহলে বিংশ শতাব্দের নৈরাজ্যবাদের তিনিই অবতার। সত্যিই কলির অবতার তিনি। সাদ এমন এক সমাজের স্বপ্ন দেখতেন যেখানে থাকবে দুর্বল আইন-কানুন আর সবল আবেগ-উদ্দীপন, যেখানে একমাত্র থাকবে আনন্দ করবার অধিকার, তা যত নিষ্ঠুর ও মারাত্মকই হোক না কেন। অদ্ভুতই ছিল তার সংকল্পাভাস, কিন্তু এর মধ্যে অন্তর্নিহিত ছিল মানুষের আদিম প্রবৃত্তির বাতুলতা। কেউ কল্পনাও করতে পারে নি যে কামুক-দর্শনকে উৎখাত করবে বাণিজ্যিক কাজকারবার আর আনন্দ পরিণত হবে কারখানার যন্ত্রে, যেমনটা বলেছেন ওক্তাবিয়ো পাস।

সাদ-এর লেখার মতোই তার শেষ ইচ্ছাটিও ছিল আশ্চর্যজনক। তিনি বলেছিলেন, তার দেহভস্ম যেন ছড়িয়ে দেওয়া হয় পৃথিবীর চার কোণে, যাতে সবাই ভুলে যেতে পারে তাকে, চিরতরে। নিজেকে বিস্মৃত করতে চেয়েছিলেন তিনি, কিন্তু হয় নি তা। আরও বলেছিলেন তিনি, নাস্তিক্যের জন্য প্রয়োজনে শহিদ হতে তিনি আগ্রহী, কিন্তু পর্নোগ্রাফির জন্য শহিদ হওয়া মানে এক অগৌরবের দুর্ভাগ্যকে বরণ করা। কথাটা একাধারে সত্য ও মিথ্যা: সত্য, কারণ তা ছিল বাস্তব, মিথ্যা, কারণ তা এখন মিথ্যা।


প্রধান সহায়ক গ্রন্থসমূহ :
দ্য কমপ্লিট মার্কি দ্য সাদ, অনুবাদ : ড. পল জে. জিলেট, (হলোওয়ে হাউস পাবলিশিং কো., ক্যালিফোর্নিয়া, ২০০৮)।
আ লাভারস ডিসকোর্স, রোলাঁ বার্থ, অনুবাদ: রিচার্ড হাওয়ার্ড, (ভিনটেজ বুকস, লন্ডন, ২০০২)।
দ্য ডায়ালেকটিকস অব এনলাইটমেন্ট, টেয়োডোর আডোরনো অ্যান্ড মাক্স হোরকহাইমের, অনুবাদ: এমান্ড জেফকোট, (স্ট্যান্ডার্ড ইউনিভার্সিটি প্রেস, স্ট্যানফোর্ড, ক্যালিফোর্নিয়া, ২০০২)।
ভারতে বিবাহের ইতিহাস, অতুল সুর, (আনন্দ পাবলিশার্স, কলকাতা, কার্তিক ১৪২৩)।
দ্য স্যাডিয়ান উইমেন: এন এক্সারসাইজ অব কালচারাল হিস্ট্রি, অ্যাঞ্জেলা কার্টার, ( ভিরাগো, লন্ডন, ১৯৭৯)।
দ্য ইরোটিক পোয়েমস, ওভিদ, অনুবাদ: পিটার গ্রিন, ( পেঙ্গুইন বুকস,১৯৮২)।
ম্যান অন হিজ ন্যাচার, স্যার চার্লস স্কট শেরিংটন, (ক্যামব্রিজ ইউনিভারসিটি প্রেস, ২০০৯)।
কনজাঙ্কশন অ্যান্ড ডিসজাঙ্কশন, ওক্তাবিয়ো পাস, ( আরকেড পাবলিশিং, নিউ ইয়র্ক, ১৯৯০)।
দ্য রাউটলেজ হিস্ট্রি অভ সেক্স অ্যান্ড দ্য বর্ডি, এডিটেড বাই সারাহ টউলালান অ্যান্ড ক্যাট ফিশার, (রাউটলেজ, লন্ডন অ্যান্ড নিউ ইয়র্ক, ২০১৩)।
ইরোটিসিজম, জর্জ বাতাইয়ে, ইংরেজি অনুবাদ: ম্যারি ড্যালউড, ( পেঙ্গুইন বুকস, লন্ডন, ২০১২)।
ম্যাড লাভ, আঁদ্রে ব্রেতঁ, ইংরেজি অনুবাদ: ম্যারি অ্যান কাউস,(ইউনিভার্সিটি অব নেব্রাস্কা প্রেস, ইউ.এস. এ. ১৯৮৭)।
দ্য লিটারেরি কমপেনিয়োন টু সেক্স: অ্যান অ্যানথোলজি অব প্রোজ অ্যান্ড পোয়েট্রি, সংগ্রাহক: ফিয়োনা পিট-কেটলি, (র‌্যান্ডম হাউস, নিউ ইয়র্ক, ১৯৯২)।
কুমার চক্রবর্তী

কুমার চক্রবর্তী

কবি, প্রাবন্ধিক, অনুবাদক। জন্ম ২ চৈত্র ১৩৭১ বঙ্গাব্দ, কুমিল্লা, বাংলাদেশ।

প্রকাশিত গ্রন্থ:
কবিতা: লগপুস্তকের পাতা (১৯৯৮), আয়না ও প্রতিবিম্ব ( ২০০৩), সমুদ্র, বিষণ্নতা ও অলীক বাতিঘর (২০০৭), পাখিদের নির্মিত সাঁকো (২০১০), হারানো ফোনোগ্রাফের গান (২০১২), তবে এসো, হে হাওয়া হে হর্ষনাদ (২০১৪);

প্রবন্ধ: ভাবনাবিন্দু (২০০২), ভাবনা ও নির্মিতি (২০০৪), মাত্রামানব ও ইচ্ছামৃত্যুর কথকতা (২০০৫/২০০৬), অস্তিত্ব ও আত্মহত্যা (২০১২), শূন্যপ্রতীক্ষার ওতপ্রোতে আছি আমি, আছে ইউলিসিস (২০০৯),মৃতদের সমান অভিজ্ঞ (২০০৯), কবিতার অন্ধনন্দন (২০১০), নির্বাচিত প্রবন্ধ (২০১৫);

অনুবাদ: আমি শূন্য নই, আমি উন্মুক্ত: টোমাস ট্রান্সট্যোমারের কবিতা (১৯৯৬/২০০২/২০১২), নির্বাচিত কবিতা: ইহুদা আমিচাই (২০০৫/২০১৩), মেঘ বৃক্ষ আর নৈঃশব্দ্যের কবিতা: চেসোয়াভ মিউশ (২০১৪)।

ই-মেইল : kumar.4585@yahoo.com
কুমার চক্রবর্তী