হোম গদ্য প্রবন্ধ রুদ্রের কবিতা : শব্দের হাতুড়ি—ভুল বোধে, ভুল চেতনায়

রুদ্রের কবিতা : শব্দের হাতুড়ি—ভুল বোধে, ভুল চেতনায়

রুদ্রের কবিতা : শব্দের হাতুড়ি—ভুল বোধে, ভুল চেতনায়
781
0

এ-যেন নষ্ট জন্মের লজ্জায় আড়ষ্ট কুমারী জননী,
স্বাধীনতা—এ কি তবে নষ্ট জন্ম?
                    এ কি তবে পিতাহীন জননীর লজ্জার ফসল?

জাতির পতাকা আজ খামচে ধরেছে সেই পুরনো শকুন।

                    (বাতাসে লাশের গন্ধ, উপদ্রুত উপকূল, পৃষ্ঠা  ১২)

রক্তিম উচ্চারণে কণ্ঠের সশরীর গন্ধ। শুধু কণ্ঠ আর বাক্যবিন্যাসে নয়—শুধু কবিতায়ও নয়; জীবন, জীবনের গতিবিধি, কর্ম ও যাপনে সর্বাবস্থায় এই বোধ কিংবা স্বপ্ন বাস্তবায়ন ও বিস্তারের সুষম তাড়নাজাত দ্রোহ ও প্রেমের ব্যতিক্রম এক কাব্যভাষা নির্মাণে পারঙ্গম স্বাধীনতা-যুদ্ধোত্তর বাঙালি কবিদের তিনি একজন এবং অন্যতম। কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ—অবশ্য তার ভাষায়, তিনি কবি নন তিনি একজন শব্দ-শ্রমিক।

আমি কবি নই—শব্দ শ্রমিক।
শব্দের লাল হাতুড়ি পেটাই ভুল বোধে ভুল চেতনায়,
                            হৃদয়ের কালো বেদনায়।
করি                            পাথরের মতো চূর্ন।
ছিড়ি                             পরান সে ভুলে পূর্ন।
রক্তের পথে রক্ত বিছিয়ে প্রতিরোধ করি পরাজয়,
হাতুড়ি পেটাই চেতনায়।

(শব্দ শ্রমিক, উপদ্রুত উপকূল)


রুদ্রের কবিতায় স্বাধীনতা ধরা দিয়েছে বহু মাত্রায় ও ভিন্ন ভিন্ন বিষয়-বৈচিত্র্যের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন স্বাদে, সাধে ও আমেজে।


 রুদ্র মুহাম্মদ শহিদুল্লাহ রচনাবলি গ্রন্থের ভূমিকায় কবি মুহম্মদ নুরুল হুদা’র ভাষ্য :

বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধে জন্ম নেয়া এই অকালপ্রয়াত শিল্পস্রষ্টা দেশ ও জাতি, মাটি ও মানুষ, মানবিকতা ও নান্দনিকতার কালকুশলী সংশ্লেষে তার সৃষ্টিজীবনকে তাৎপর্যময় করেছে যুগসত্যের সংগ্রামমুখর দ্বন্দ্বাবর্তে। শিল্পসম্মত জীবনায়নের সমান্তরালে রুদ্র আমৃৃত্যু এক সুষম সমাজ বিন্যাসেরও স্বপ্নদ্রষ্টা। নিরীক্ষাপ্রিয়, সেই সঙ্গে স্বঘোষিত এই ‘শব্দ-শ্রমিক’ নটরাজের অনুগ্রহপুষ্ট হয়েও সরস্বতী বরপুত্র। জাতির শেকড়সন্ধানী এই কবি নিজেকে শনাক্ত করেছেন অনার্য রূপেও। মুক্তিযুদ্ধের চেতনাবাহিত অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের অপ্রতিদ্বন্দ্বী চারণ এই কবি আপোসহীন শিল্প-যোদ্ধা।

তার কবিতা, তার জীবন, চিন্তা-চেতনা, শরীরী ভাষা, চলাফেরা, সবকিছুতেই যেন চরম বৈচিত্র্য এবং সেই সাথে আপসহীন শিল্পসূত্রের সুচারু গাঁথুনি। বিষয় বিবেচনায় তার কবিতায় মুক্তিযুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের সমকালীন চড়াই-উতরাই ব্যাপক জায়গা দখল করে আছে। কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ ব্যক্তি-মানুষ হিশেবে যেমন মুক্তমনের অধিকারী ছিলেন তেমনি তার কবিতায়ও সব রকমের বন্ধন থেকে মুুক্তির একটা প্রয়াস চির-লক্ষণীয়। হতে পারে সে মুক্তি একান্তই নিজের অথবা অপরাপর ব্যক্তির, সমাজের, জাতির কিংবা রাষ্ট্রের। আমরা আরো লক্ষ করি, তিনি শুধুু যেকোনো ধরনের মুক্তি অর্জনের স্বপ্নেই বিভোর থাকেন নি। কোথাও মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ভূলুন্ঠিত হতে দেখলে কিংবা কোনো অশুভ চক্রান্তের গন্ধ টের পেলে এমনকি শুধুমাত্র চোখের সামনে দেখলে বা অবলীলায় টের পেলেই নয়; বরং তিনি খুঁজে খুঁজে বের করে এসবের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছেন বরাবরই। তার কবিতায় স্বাধীনতা ধরা দিয়েছে বহু মাত্রায় ও ভিন্ন ভিন্ন বিষয়-বৈচিত্র্যের মধ্য দিয়ে বিভিন্ন স্বাদে, সাধে ও আমেজে। ‘মুক্তিযুদ্ধ’—শতাব্দীর সবচেয়ে ঘৃণ্যতম কর্মকাণ্ডের স্মারক বহন করলেও—এ আমাদের চেতনার বেদিতে সবচেয়ে উজ্জ্বল ও সম্মানের আসন দখল করে আছে। এর সংজ্ঞার্থ কবির ভাষায় এ রকম—

স্বাধীনতা—সে আমার স্বজন হারিয়ে পাওয়া একমাত্র স্বজন,
স্বাধীনতা—সে আমার প্রিয়মানুষের রক্তে কেনা অমূল্য ফসল
ধর্ষিতা বোনের শাড়ি ওই আমার জাতির পতাকা।

                                (বাতাসে লাশের গন্ধ)

মুক্তিযুদ্ধোত্তর পরিস্থিতির বর্ণনায় তার একটি নাট্যকাব্য বিষবিরিক্ষের বীজ। যেখানে আমরা দেখি কাব্যের শুরুতেই রাখাল বালকের সংলাপে উচ্চারিত হয়—

ভায়েরা আমার, হানাদার শত্রুর কবলমুক্ত
আজ প্রিয়তম দেশ, মুক্ত আজ বাংলার আকাশ
স্বাধীন আজ বাংলার মাটি, জল, বনানী, মানুষ।

কবির মৃত্যুর পরে প্রকাশিত গণ আদালত পর্ব, বীরাঙ্গনা পর্ব, শুঁড়িখানা পর্ব, আত্মসমর্পণ পর্ব, ক্যাম্প পর্ব, গর্ভপাত পর্ব এবং ক্ষমা পর্ব—এই সাত খণ্ডে বিভক্ত বিষবিরিক্ষের বীজ নাট্যকাব্য সম্পর্কে ‘চন্দ্রাহত অভিমান’ গ্রন্থে কবি তপন বাগচীর বক্তব্য এ রকম—‘বিষবিরিক্ষের বীজ নাট্যকাব্যে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস এবং মুক্তিযুদ্ধ-পরবর্তী ঘটনা-প্রবাহ উন্মোচিত হয়েছে রুদ্রের সহজাত কবিপ্রতিভার দক্ষ আয়োজনে’।

তার একটি দীর্ঘ কবিতা ‘হাড়েরও ঘরখানি’। এ কবিতায় আমাদের চারপাশের চেনা-জানা আপাত-দীপ্ত মানুষদের সাথে আমাদের স্নায়ুবিক যে বিকর্ষণ, প্রতিনিয়ত যে অন্তর্দ্বন্দ্ব, বিশ্বাস-অবিশ্বাসের দোলাচল—তারই একটি পরিষ্কার বিশ্লেষণ আমরা দেখি। প্রতি মুহূর্ত আমরা এরই মাঝে বেঁচে আছি, বেড়ে উঠছি; অস্পষ্ট এক বোধ-বুঝতেও পারছি এবং সবকিছু ঠিক দেখছিও হয়তো এমনই। কিন্তু এমন করে আমরা হয়তো বলতে পারছি না। কবি যেমন সুচারুরূপে, অতি সহজভাবে বলে ফেললেন আমাদেরই কথাগুলো—

বেশ্যাকে তবু বিশ্বাস করা চলে
রাজনীতিকের ধমনী শিরায় সুবিধাবাদের পাপ
বেশ্যাকে তবু বিশ্বাস করা চলে
বুদ্ধিজীবীর রক্তে স্নায়ুতে সচেতন অপরাধ
বেশ্যাকে তবু বিশ্বাস করা চলে
জাতির তরুন রক্ত পুষেছে নির্বীর্যের সাপ—

                                (হাড়েরও ঘরখানি)

শ্রেণি সংগ্রামের পথিকৃত এ কবি নিপীড়িত, নির্যাতিত, শ্রমজীবী, সৌন্দর্যমুখী মানুষদের সশস্ত্র করার কথা বলেছেন। যুদ্ধের ময়দানে নিজে যেমন মিশে থেকেছেন শরীরী সামর্থ্যে, আন্দোলনে, সংগ্রামে, মিছিলে, শ্লোগানে আর রক্তে—পাশাপাশি তার কবিতার অবয়বেও বুনে দিয়েছেন গাঢ় এক ধরনের প্রেরণা, উজ্জীবনী এবং এক আপসহীন সংগামের মন্ত্র।

তুমি—মানে সামাজিক নারী,
মানে সংসার, সন্তান, বাড়িভাড়া, মরিচ, পেঁয়াজ,
মানে দশটা-পাঁচটা, বিকেলে ক্রিসেন্ট লেক
নয়তো বেইলি রোডে নাগরিক নটনটী,
                                                    শুধু অভিনয়,

শুধু কথার মুখোশ, চমৎকার, বনেদি মসৃন।

(ময়নাতদন্ত)


অন্ধকারে অবসিত সমাজ ও জাতীয় মানবিক টানাপড়েনে কবি সৌন্দর্যকেই পরম আশ্রয় বলে জেনেছেন।


প্রতিদিনের জীবনাচরণে যে প্রতারণা বা সাজানো যে ফরম্যাট তার মুখোশ উন্মোচন (যথার্থ ময়নাতদন্ত) করা বীভৎস চিত্রটিই যেন এ কবিতা। যখন কবি দেখেন—মানে চার ইঞ্চি ফোমে গা ডুবিয়ে/ নগ্ন স্তনে হাত, চোখে স্বপ্ন—/ ব্যালকনিসহ বাড়ি/ ব্যক্তিগত দ্রুতযানে স্মৃতিসৌধ দেখে আসা—

এ যেন জীবনের সাথেই প্রতারণা। নিজের সাথেই চরম গাদ্দারি। প্রতিদিনের জীবন-যাপনে আমরা কি এতেই অভ্যস্ত হয়ে পড়ছি না? যেন এ-ই সত্য। এ-ই আমাদের কালচার। এ-ই বেঁচে থাকার একমাত্র কৌশল। যার রেশে রেশে আমরা কিনা জীবনের আরো অন্ধকারতম কানাগলিতে প্রবেশ করছি প্রতিনিয়ত এবং খুব দ্রুত।

ঘুষ, কালো টাকা,
                                মানে ককটেল পার্টি,
মানে বন্ধুর পত্নীর কাঁধে হাত, আবডালে ছোঁয়াছুঁয়ি,
মানে কন্যার স্বামীর সাথে মা উধাও
                            ব্লু—ব্লু—
                                    (ময়নাতদন্ত)

জীবনের এইসব আড়ালসত্য খুঁজতে খুঁজতে ক্লান্ত, তিক্ত, আহত, অভিমানী কবি তবু জীবন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেন নি। চলার পথেই নীল অভিমান পুড়িয়ে কবি পেয়ে গেলেন জীবনের অন্য রকম ঘ্রাণ। জীবন তৃষ্ণায় কাতর কবি বলে উঠলেন—

বেদনার পায়ে চুমো খেয়ে বলি এই তো জীবন, এই তো মাধুরী, এই তো অধর ছুঁয়েছে সুখের সুতনু সুনীল রাত!

(অভিমানের খেয়া)

অন্ধকারে অবসিত সমাজ ও জাতীয় মানবিক টানাপড়েনে কবি সৌন্দর্যকেই পরম আশ্রয় বলে জেনেছেন। এবং সৌন্দর্যের ভাঙা-চোরা কাচেই তিনি জীবনকে আরো স্পষ্ট ও প্রত্যক্ষ করতে চেয়েছেন। তার কবিতায় প্রেমময় সৌন্দর্য ধরা দিয়েছে নানা রূপে, নানা আঙ্গিকে। দ্রোহী ও প্রেমিক কবি হিশেবে পাঠকের হৃদয়ের খুব নিকটবাসী এই কবির কবিতায় তারুণ্য, উচ্ছ্বাস, উন্মাদনা, প্রেম, ভালোবাসার অঢেল খনিজ পাওয়া যায়। তার এই প্রেম কখনও প্রকৃতির প্রতি, কখনও নারীর প্রতি, কখনও দেশের প্রতি। এমনকি রাজনীতি, সন্ত্রাস, হানাহানি, শত্রুর উত্থান, মৌলবাদ, স্বৈরাচার—এসবের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া ও সংগ্রামের মতো বিষয়গুলোও তিনি অত্যন্ত পরিশীলিতভাবে নিপুণ কারিশমায় ফুটিয়ে তুলেছেন প্রেমময় সৌন্দর্যের ভেতর দিয়ে। প্রেম তার কবিতায় কখনোই এক-পাক্ষিক বিষয় ছিল না। দুটি মনের সমান্তরাল বিশ্বাস ও সশ্রদ্ধ স্বতঃস্ফূর্ত ইচ্ছার ফলই প্রেম।

প্রস্তুত ছিল প্রেম, তুমি শুধু হাত তুলে ডেকেছো তারে—
যজ্ঞের যোগার শেষে তুমি শুভ্র এলে পুরোহিত
চুম্বন সাজানো ছিলো, তুমি এসে ছোঁয়ালে অধর
অধরের পরে।

                        (অকর্ষিত হিয়া)

প্রেমে আনন্দ আছে—আছে বেদনাও। প্রেমে আনন্দ যেমন সুন্দর, হারানোর বেদনাও তেমনি এক ধরনের সৌন্দর্য। পাত্র-পাত্রী যখন জীবনের প্রয়োজনে সাময়িক বিচ্ছেদেও অপার কোনো সম্ভাবনায় সমূহ দোলে ওঠে তখন তাদের আলাপচারিতায় বেদনার যে নৈসর্গিক সৌন্দর্যের চিত্রটি ফুটে ওঠে তা-ই যেন এ কবিতাটি—

ভাসান যে দিতে চাও, কোন দেশে যাবা, সে কোন বন্দরে
আমারে একলা থুয়ে? এই ঘর, যৌবনের কে দেবে পাহারা?
এমন কদম ফুল—ফোটা ফুল থুয়ে কেউ পরবাসে যায়!
তুমি কেন যেতে চাও বুঝি সব, তবু এই পরান মানে না।

                        (মানুষের মানচিত্র ৪)

কবিতায় পুরাণের ব্যবহার, ছন্দ, অলঙ্কার, উপমা এবং চিত্রকল্প ব্যবহারেও কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ ছিলেন সিদ্ধহস্ত। স্বরবৃত্ত, অক্ষরবৃত্ত, মাত্রাবৃত্ত, গদ্য, মিশ্র এবং প্রচলিত সকল ছন্দেই এই কবি লিখেছেন।

ক) মিছিলেই তুমি/ সবচেয়ে লোভ/ নীয়/
মিছিলেই তুমি/ সবচেয়ে বেশি/ নারী। (মিছিল ও নারীর গল্প)
খ) বহুদিন পরে/ দ্যাখা হলো জন/ পদে
লাবন্য ঝরা/ দুপুরের ফুল/ যেন
যেন বালুচর/ জেগেছে স্রোতের/ নদে
চোখের শিয়রে/ কালিমা জমেছে/ কেন

দেখা যাচ্ছে, কবিতা দুটিতেই পূর্ণ পর্ব ৬ মাত্রার এবং অপূর্ণ পর্ব ২ মাত্রার। এই কবির কবিতার ছন্দবিন্যাসে অক্ষরবৃত্ত ও মাত্রাবৃত্তে ৬/২ পর্ব বিন্যাসই বেশি চোখে পড়ে। তাছাড়া তিনি অন্যান্য ছন্দসহ মুক্তক মাত্রাবৃত্ত ছন্দেও অনেক কবিতা লিখেছেন। কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ ছন্দের মতো উপমা ব্যবহারেও দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন।

ক) পাখির নাহান ডাকো। মাঝরাতে ডাক দাও পাখির গলায়।
আমি কি বুঝি না ভাবো? কাতলা মাছের মতো ঘাই মারে বুকে,
ওই ডাক ঘাই মারে রক্তে—মাংশে। (মানুষের মানচিত্র ২)
খ) তুমি নিজেই এসেছো নেমে উন্মাতাল রাজপথে আজ।
কী দৃপ্ত সাহসী ভঙ্গি, চিবুকের সজীব উদ্ধত্য!
চাবুকের টান টান তীক্ষ্মতার মতো তোমার তারুণ্য, (মিছিলে নোতুন মুখ)
গ) দু’জনের হাতে কড়া সিগারেট পোড়ে জীবনের মতো (পাখিদের কথা ভেবে ডানা মেলে দেই)


তিনি চেয়েছিলেন যে এই দেশ, এই প্রকৃতি এবং মানুষ তাকে চিনুক, আপন করে নিক কিংবা অন্তত ভালোবেসে মনে রাখুক।


কবিতার ইমেজ বুঝে এমনি করে আঙ্গিক ও বিষয়বস্তুর সাথে সঙ্গতিপূর্ণ উপমা, ছন্দ এবং অন্যান্য মেকানিজমের যে সুষম সমন্বয় তিনি ঘটিয়েছেন তা স্বাধীনতা যুদ্ধোত্তর বাংলা কবিতায় খুব কম কবিই পেরেছেন। তেমনি করে এই কবির কবিতায় আমরা দেখি—শামুক কিংবা কেন্নোর মতো গুটিয়ে যাওয়া, এস এম সুলতানের ছবির পৌরুষ, শরীরে বাড়তি মেদের মতো বিশ্বাসের দ্বিধা-জড়তা, তখন যেন আমাদের চোখে এক একটা স্বতন্ত্র ছবি কিংবা চিত্রকল্প জীবন্ত হয়ে ওঠে।

রাত নামে। অন্ধকার ঘিরে আসে বাইদ্যার দলের নাহান
বিষের খঞ্জর হাতে—এ জীবনে ফুরোয় না মহুয়ার পালা

                        (মানুষের মানচিত্র ৯)

কী পরিষ্কার অথচ ঘোরলাগা আবহের এক ধরনের সুরেলা চিত্র ফুটে আছে এই লাইন দু’টিতে। সমকালীন সাহিত্য সম্পর্কে, কবিতা সম্পর্কে বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের টেপা পুতুলের মতো দেরাজে সাজানো-গোছানো ভাষা সম্পর্কে এবং জীবনবোধের তাড়নাজাত নয় কিংবা বলা চলে বেফাঁস কোনো স্রোতে ভাসমান অস্থির কবিতা সম্পর্কে কবি রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ ছিলেন অনেকটাই বিরূপ। তার কবিতার ভাষা যেমন দেশের মানুষের জীবনাচরণের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ তেমনি উঁচু-নিচু, ত্যাড়া-বাঁকা, ধ্যাবড়া, উত্তেজিত, ক্রন্দনরত, দরদী, মায়াময়, প্রেমময়, জিজ্ঞাসু প্রভৃতি বাঙ্ময় নানা ব্যঞ্জনা আমরা তার কবিতায় দেখি—যেখানে ভাষাকে জোর করে বসিয়ে দেবার মতো কোনো ব্যাপার ঘটে নি। বিষয়টি পরিষ্কার করতে তসলিমা নাসরিন সম্পাদিত ‘সেঁজুতি’ পড়ে তসলিমা নাসরিনকে লেখা কবির একটি চিঠি থেকে উদ্ধৃত করছি—

আপনার ‘হলুদ সেঁজুতি’ পেলাম তখন। হলুদ বলছি এ জন্যে যে, পত্রিকার সমস্ত লেখাগুলো আমার হলুদ মনে হলো। একজন শব্দ-শ্রমিকের হৃদয় যে-বেদনায়, যে-বিশ্বাসে, যে-ভালোবাসায়, ব্যর্থতায়, ক্রোধে, ক্ষমায়, ঘৃণায় রক্তাক্ত হয়ে ওঠে, প্লাবিত হয়ে ওঠে সেঁজুতি-তে তা নেই কেন? পূর্ব বাংলার মাটির গন্ধ আলাদা, এ-মাটির মানুষের হাড়ে লবণের ঘ্রাণ, তামাটে চামড়ার এই মানুষ প্রকৃতির সাথে পাঞ্জা লড়ে বেঁচে থাকে। বাংলা কবিতা কি সেই বিশাল জনগোষ্ঠীর সাথে কোনোই সম্পর্ক রাখবে না?

অভিমানী কবিকে তাই বলতে দেখি—

কাফনের পবিত্র ফুল যাকে ঢেকেছিলো ভালোবেসে
অনুভূতিহীন যাকে সকলে শব বলেছিলো
আমি তার পরবর্তী গন্তব্যের ঠিকানার সন্ধানে
শূন্যে তাকালাম, অনেক আর্তনাদে আমার
প্রশ্নসূচক চোখ কাঁচের মতো প্রতিবিম্বিত হলো;
আমি প্রচুর হাওয়ায় আমার হলুদ শার্ট খুলে দিলাম।

সকলের অজ্ঞাতে মৃত্যুর শিয়রে
            আমি অন্য কিছু ভাবছিলাম
            গন্তব্যের ঠিকানা খুঁজছিলাম
            গন্তব্য—

এত অভিমান, এত হতাশা আর এত এত সব বিরূপের ভিড়ের ভেতর থেকেও কবি নিজেকে ঠিকই চিনে নিতে পেরেছিলেন এবং তিনি চেয়েছিলেন যে এই দেশ, এই প্রকৃতি এবং মানুষ তাকে চিনুক, আপন করে নিক কিংবা অন্তত ভালোবেসে মনে রাখুক। তাই তার দৃপ্ত উচ্চারণ—

ভালো আছি ভালো থেকো
আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখো—

 

আজিম হিয়া

আজিম হিয়া

জন্ম ১ জানুয়ারি ১৯৮৪; নেত্রকোণা। শিক্ষা : বিএ/বিএসএস, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়। পেশায় বেতারকর্মী। বাংলাদেশ বেতার, সদর দপ্তর, ঢাকায় কর্মরত।

প্রকাশিত বই :
অন্ধ আতরের ঘ্রাণ [কবিতা; চৈতন্য, ২০১৬]

সম্পাদিত ছোটকাগজ : ‘পলিমাটি’ ও
সহকারী সম্পাদক : শিল্পসংস্কৃতির কাগজ ‘দেশ প্রসঙ্গ’।

ই-মেইল : azimhiya@gmail.com
আজিম হিয়া