হোম নির্বাচিত বাংলার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার পাঠ্যপুস্তকে হিন্দু-মুসলিম প্রসঙ্গ এবং দেশভাগ

বাংলার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার পাঠ্যপুস্তকে হিন্দু-মুসলিম প্রসঙ্গ এবং দেশভাগ

বাংলার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার পাঠ্যপুস্তকে হিন্দু-মুসলিম প্রসঙ্গ এবং দেশভাগ
779
1
৬ মার্চ ২০১৫, শুক্রবার। ঢাকা থিয়েটারের সেমিনারে একটি দীর্ঘ প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন রাহমান চৌধুরী। অধ্যাপক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী এতে সভাপতিত্ব করেন। উপস্থিত ছিলেন অনেক গুণীজন। প্রবন্ধপাঠের পর বেশ প্রাণবন্ত আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। পরস্পর-এর অনুরোধে রাহমান চৌধুরী লেখাটি আমাদের ছাপতে অনুমতি দেন। কিন্তু সেই আলোচনা ও মত-মতান্তর অংশটি পাঠকের কাছে হাজির করতে পারছি না সঙ্গত কারণেই। যেহেতু কোনো ট্রান্সক্রিপ্ট তৈরি হয় নি এখনও। তবে আমরা আশা করি, পাঠকেরা এখানে যে কোনো প্রশ্ন বা তর্ক উত্থাপন করার মধ্য দিয়ে নিজেরাই সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করবেন। 

●   ●   ●

১ম কিস্তি

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলার শাসন ক্ষমতা লাভের পর স্থানীয়দের ধর্ম বা সংস্কৃতিতে প্রথম দিকে কোনোরকম হস্তক্ষেপ করতে চায় নি। কারণ তাদের ভয় ছিল স্থানীয়দের ধর্ম-সংস্কৃতিতে হাত দিলে নানা ধরনের বিদ্রোহ দেখা দিতে পারে। নিজেদের শাসন সুপ্রতিষ্ঠিত করার ব্যাপারে তারা তখন অধিক মনোযোগী ছিল। বাংলার জনগণের শিক্ষা নিয়েও তারা মাথা ঘামায় নি। কারণ জনসাধারণের শিক্ষার ব্যাপারে আগ্রহ দেখাতে গেলেই তাদের টাকা খরচ করতে হবে, যা মুনাফার অংশ থেকে চলে যাবে। ফলে ভারত তথা বাংলার শিক্ষা নিয়ে বহুকাল তারা উদাসীন ছিল। কিন্তু খ্রিস্টান মিশনারিদের চাপে ইংরেজ শাসকরা বাংলায় শিক্ষা বিস্তারের পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়। স্যার জন ম্যালকম আঠারশো আটাশ সালে লিখেছিলেন, একদল ইংরেজি-শিক্ষিত ভারতীয়দের আমাদের শাসনতন্ত্রের বিভিন্ন শাখায় নিযুক্ত করা দরকার। তিনি স্পষ্টই বলেন, সরকারের অধিক সমৃদ্ধি ও নিরাপত্তার জন্য ভারতীয়দের ইংরেজী শিক্ষিত করা একান্তই জরুরি। যখন নিজেদের স্বার্থে ইংরেজ শাসকরা শিক্ষাদানের ব্যাপারে কিছুটা আগ্রহী হয়, তখন বুঝতে পারছিল না কী ধরনের শিক্ষা দিতে হবে। সত্যিকার অর্থে আঠারশো পঁয়ত্রিশ সাল পর্যন্ত সরকার দ্বিধান্বিত ছিল যে, সনাতনী ভারতীয় শিক্ষা-ব্যবস্থাকে সমর্থন করা হবে, না পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রবর্তন করবে।


‘আমার দৃঢ় বিশ্বাস পরবর্তী ত্রিশ বছরের মধ্যে এদেশে একজনও মূর্তিপূজক থাকবে না।…’


টমাস বেবিংটন মেকলে আঠারশো চৌত্রিশ সালে বড়লাটের পরিষদের আইন সদস্যরূপে ভারতবর্ষে আসেন। আঠারশো পঁয়ত্রিশ সালে গভর্নর জেনারেল লর্ড বেন্টিঙ্ক ব্যবিংটন মেকলেকে জনশিক্ষা পরিষদের নতুন সভাপতি পদে নিয়োগ দেন। দ্বিধাহীন চিত্তে মেকলে পাশ্চাত্য শিক্ষার পক্ষ নেন। তিনি মনে করেন, এতে করে সাধারণ মানুষদের মধ্যেও ইংরেজদের সম্পর্কে নমনীয়তা প্রদর্শন এবং প্রশংসার মনোভাব তৈরি হবে। তিনি বললেন, ইংরেজি ভাষা ভারতে এক নতুন যুগের সূচনা করবে। দেশীয় লোকরা ইংরেজিই শিখতে চায়। ইংরেজি শিক্ষার ফলে এদেশে এমন এক শ্রেণির মানুষ সৃষ্টি হবে, যারা বর্ণে ও রক্তেই শুধু ভারতীয় থাকবে; কিন্তু রুচি, মতামত, নীতি ও বুদ্ধিতে হবে ইংরেজ। এদের মধ্যে থেকেই শিক্ষা নিচের দিকে নেমে সাধারণের মধ্যে ছড়িয়ে পড়বে।’ তিনি পিতার কাছে লিখছেন, ‘আমার দৃঢ় বিশ্বাস পরবর্তী ত্রিশ বছরের মধ্যে এদেশে একজনও মূর্তিপূজক থাকবে না। ইংরেজী শিক্ষা পেয়ে বাঙালিরা স্বাভাবিকভাবেই খ্রিস্টধর্মভাবাপন্ন হয়ে উঠবে, পাদ্রিদের আর ধর্ম প্রচার করার আবশ্যক হবে না।’ টমাস মেকলে আসলে মানুষকে শিক্ষাদানের চেয়ে ইংরেজদের স্বার্থ রক্ষার বিশেষ উদ্দেশ্য নিয়েই শিক্ষা-আলোচনায় অংশ নেন।

মুসলমানদের ইংরেজি শিক্ষার প্রতি তখন পর্যন্ত কোনো দুর্বলতা ছিল না এবং হিন্দু সুবিধাভোগী এবং ধনীরাই ইংরেজি শিখতে চাইছিলেন। যাঁরা ইংরেজি শিখতে চেয়েছিলেন সেই হিন্দুরা সকল সাধারণ হিন্দুর প্রতিনিধিত্ব করতেন না। সাধারণ হিন্দুরা ইংরেজি শিক্ষালাভের জন্য কখনোই হৈ চৈ করেন নি। বরং বাংলার লোক-কবিরা ইংরেজি জানা বাবুদের নিয়ে নানা ব্যঙ্গধর্মী কবিতা বা ছড়া রচনা করেছিলেন। বিশেষ করে ইংরেজি-শিক্ষিত বাবুদের নানা উদ্ভট আচার-আচরণকে কেন্দ্র করে প্রহসন লেখা শুরু হতে থাকে যা পরবর্তীকালে বটতলার সাহিত্য হিসেবে পরিচিত হয়। লর্ড বেন্টিঙ্কয়ের পর আঠারশো উনচল্লিশ সালে লর্ড অকল্যান্ড ভারতের বড়লাটের ক্ষমতাভার গ্রহণ করেন। তিনি ইংরেজি ভাষায় শিক্ষার পক্ষেই তাঁর দৃঢ়তা ব্যক্ত করেন। শুধু তাই নয়, লর্ড অকল্যান্ড সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন যে, শুধুমাত্র সমাজের উচ্চশ্রেণির মধ্যে উচ্চশিক্ষা বিস্তারের দ্বারা সরকারের শিক্ষা প্রচেষ্টাকে সীমাবদ্ধ রাখতে হবে। তিনি সাধারণ মানুষকে শিক্ষা দেয়ার বিরোধী ছিলেন। তিনি মনে করতেন, নিম্নশ্রেণির জন্য পড়াশোনা নয়, কারণ উচ্চশ্রেণির মধ্যেই পঠনপাঠনের জন্য পর্যাপ্ত অবসর রয়েছে। দরকার মতো উচ্চশ্রেণির সংস্কৃতিই সাধারণের মধ্যে ছড়িয়ে পড়বে। সাধারণের জন্য আলাদাভাবে শিক্ষাদানের প্রয়োজন নেই।

শিক্ষাকে শুধুমাত্র উচ্চবিত্তদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা বা ইংরেজি ভাষায় শিক্ষা প্রসারের ব্যাপারে শুধুমাত্র ইংরেজদের দায়ী করলে হবে না, বঙ্গের বা কলকাতার আলোকপ্রাপ্তরাই চাইছিলেন উচ্চস্তরের পাশ্চাত্য শিক্ষা—যা তাঁদের সন্তানদের চাকরি পেতে বা উচ্চপদ পেতে সাহায্য করবে। ‘বাঙালি ভদ্রলোকরা ইংরেজি শিক্ষানীতির উদ্দেশ্য বিষয়ে অবগত হয়েই এই নীতিকে সমর্থন করেছিলেন। এই শিক্ষানীতির প্রবক্তাদের ঘোষিত উদ্দেশ্য এঁদের খুব বিচলিত করে নি। কারণ উনিশ শতকের বাঙালি ভদ্রলোক সাধারভাবে সকলেই অনুগত প্রজাই হতে চেয়েছেন; ব্রিটিশ শাসনকে প্রায় আশীর্বাদ হিসাবেই গ্রহণ করেছিলেন।’ রামমোহন, বিদ্যাসাগর প্রভৃতি সমাজপতিরা এই ইংরেজ শাসকদের মতকেই সমর্থন করেছেন। সারাদেশের দীর্ঘ ঐতিহ্যবাহী প্রাথমিক শিক্ষা পাঠশালার বিরুদ্ধেও তাঁরা দাঁড়ালেন। পাঠশালা শিক্ষা তাঁদের বিচারে মান সম্পন্ন নয়, কারণ সেখানে ইতিহাস, ভূগোল, বিজ্ঞান ইত্যাদি পড়ানো হয় না—যা মিশনারিরা তাঁদের বিদ্যালয়ে পড়াচ্ছিলেন। কিন্তু বিকল্প হিসাবে গ্রামের সাধারণ মানুষের শিক্ষা লাভের সুযোগ নিয়ে তাঁরা মাথা ঘামালেন না। গরিবদের লেখাপড়া শেখার কথা এইসব দেশীয় সম্ভ্রান্তদের কারো মনেই বড় একটা ঠাঁই পায় নি। মেকলে বা অকল্যান্ডের শিক্ষানীতির তখন বিরোধিতা করেছিলেন এমন কোনো প্রভাবশালী বাঙালি ভদ্রলোকের কথা জানা যায় না।

সমাজের উচ্চ ও মধ্যবিত্তশ্রেণির শিক্ষার প্রতি আঠারশো পঁয়ত্রিশ সালের পর সরকার দৃষ্টি নিক্ষেপ করলেও নিম্নশ্রেণি সম্পূর্ণ উপেক্ষিত ছিল। বাঙালি ভদ্রলোকরাও সর্বসাধারণের শিক্ষার চাইতে সমাজের উঁচুস্তরকে শিক্ষিত করার প্রতি গুরুত্ব দিয়েছিলেন। শিক্ষানীতিতে উচ্চশিক্ষাকে প্রাধান্য দেওয়া হয়। ফলে নতুন শিক্ষা কার্যক্রমে সমাজের বিত্তবান লোকেরাই উপকৃত হন। যাঁরা শহরে বসবাস করেন তাঁরাই নিজেদের সন্তানদের সরকারি শিক্ষা ব্যবস্থায় পড়ানোর সুযোগ পান। বাংলার সাধারণ মুসলিম সমাজ এবং হিন্দু দরিদ্রদের ব্যাপক অংশ গ্রামে বসবাস করতেন। নতুন শিক্ষানীতির কারণে সাধারণ মানুষ মাধ্যমিক শিক্ষা তো দূরের কথা প্রাথমিক শিক্ষাটুকু লাভের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হলেন। দীর্ঘ সময়ে ধরে সরকারের শিক্ষাভাবনা কলকাতা কেন্দ্রিক হওয়ায় উত্তর ও পূর্ব বাংলার যেখানে মুসলমানরা ছিলেন সংখ্যাগরিষ্ঠ সেসব অঞ্চলে শিক্ষা বিস্তারে সরকারের কোনো দৃষ্টি ছিল না। বাংলার মানুষকে ইংরেজ শাসন ততদিনে প্রধানত দুশ্রেণিতে ভাগ করে ফেলেছে। গ্রামের সহায় সম্পদহীন নিম্নবর্গ ও শহরের উচ্চবিত্ত বাবুরা। নতুন গড়ে ওঠা এই বাবু শ্রেণির কাছে ছিন্নমূল মানুষ বা গ্রামের কৃষক-কারিগরদের জন্য সামান্য সম্মান বা অনুকম্পা ছিল না। তাদের সন্তানদের শিক্ষাদান তো বহুদূরের কথা। বাবুরা হয়ে উঠলো ইংরেজদের তোষামদকারী এবং অনুকরণপ্রিয় একটি সম্প্রদায়। সাধারণ মানুষের বাঁচামরা, শিক্ষাদীক্ষা নিয়ে তাদের মাথাব্যথা ছিল না।

সাংবাদিক উইলিয়াম অ্যাডাম, যিনি বাংলার সনাতন পাঠশালা শিক্ষা সম্পর্কে উচ্চ ধারণা পোষণ করতেন, তিনি গ্রামের দরিদ্র জনসাধারণের সাক্ষরতার জন্য সরকারের হস্তক্ষেপ কামনা করেছিলেন। তিনি সাধারণ মানুষের শিক্ষাবিষয়ে সরকারের কাছে একটি দীর্ঘ প্রতিবেদন জমা দেন। সরকার অ্যাডামের প্রতিবেদনের বক্তব্যকে অনেকটা অবাস্তব বলে মনে করেছে, আবার বিরাট অঙ্কের অর্থ ব্যয়ের কথা ভেবেও সরকার তা বাস্তবায়নে বিরত থেকেছে। অ্যাডামের প্রতিবেদন পর্যবেক্ষণের পর নতুন গভর্নর জেনারেল অকল্যাণ্ড বলেন, জনাব অ্যাডামের প্রতিবেদন পাঠ করে আমি বলতে বাধ্য হচ্ছি, তিনি দেশীয় শিক্ষার ব্যাপারে যা লিখেছেন তার জন্য অভিভূত হওয়া ছাড়া আর কিছুই করার উপায় নেই। আমি এটা বলতে চাই না যে, ভারতবর্ষের জনগণের শিক্ষার কাজ উপেক্ষা করা হোক, কিন্তু বাস্তব অবস্থা অনুযায়ী আমি উচ্চশিক্ষার ব্যাপারেই নজর দেব। লর্ড অকল্যান্ডের পর গভর্নর জেনারেলের দ্বায়িত্বপ্রাপ্ত হন লর্ড এলেনবরা। তিনি ক্ষমতায় এসেই ঘোষণা করলেন, সরকারি চাকরি পেতে গেলে ইংরেজি জানতেই হবে। চারদিকে তখন ইংরেজি শিক্ষার জয়জয়কার পড়ে গেল। ইংরেজি শিক্ষা তখন আর্থিক উন্নতি ও সামাজিক মর্যাদা লাভের সোপান। মিশনারিদের মাধ্যমে ইংরেজি শিক্ষা ইতিমধ্যেই বেশ এগিয়ে চলছিল।


যখন মুসলমান পিশাচেরা এই ভারতবর্ষ আক্রমণ করে বিবিধ অত্যাচার দ্বারা খণ্ড-বিখণ্ড করল, সেই থেকে ক্রমে বিদ্যার বল হ্রাস পেল


বহু বঙ্গসন্তান তখন ইংরেজি শিক্ষা গ্রহণের ফলে একদিকে যেমন খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করছিল অপরদিকে তারা ভালো করে বাংলা বলতে পারছিল না। সমাজে প্রতিষ্ঠিত হিন্দুদের একাংশকে ব্যাপারটা ভাবিয়ে তুলল। উচ্চবর্গের বাঙালিরা ইংরেজদের চুঁইয়ে পড়া শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে ছিলেন না এবং ইংরেজি ভাষা শিখতেও তাঁদের কোনো আপত্তি ছিল না। কিন্তু যখন বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করে মিশনারিরা বাধাহীনভাবে খ্রিস্টধর্ম প্রচার আরম্ভ করল, তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে গিয়েই দেবেন্দ্রনাথ প্রমুখ হিন্দুধর্মের প্রাচীন জ্ঞানের দিকে মুখ ফেরালেন এবং বিদ্যালয়ে বেদ-বেদান্ত পড়াতে লাগলেন। সত্যিকার অর্থে তাঁরা সনাতন হিন্দু ধর্মরক্ষা ও ধর্ম সংস্কারে মনোযোগী হলেন। দেবেন্দ্রনাথ প্রাচীন ভারতের শিক্ষার পক্ষে ‘তত্ত্ববোধিনী’ পত্রিকায় লিখেছিলেন, ‘তৎকালে বিদ্যার কী পরিপাটি রূপ ছিল। ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য তিন বর্ণ বিদ্যাভ্যাসে তৎপর ছিল, শূদ্রদের বিদ্যার অনুশীলন ছিল না। কিন্তু তারা সমুদয় লোকের মধ্যে চার ভাগের এক ভাগ মাত্র, কোন দেশ আছে যেখানে এক চতুর্থাংশ মূর্খ লোক পাওয়া যাবে না। পরে যখন মুসলমান পিশাচেরা এই ভারতবর্ষ আক্রমণ করে বিবিধ অত্যাচার দ্বারা খণ্ড-বিখণ্ড করল, সেই থেকে ক্রমে বিদ্যার বল হ্রাস পেল।’ তিনি আরো লিখেছেন, ‘ব্রাহ্মণরা যখন জীবন রক্ষার্থে শূদ্রদের দৃষ্টান্তে মুসলমানদের দাসত্ব স্বীকার করতে বাধ্য হলেন এবং পারস্য ভাষা শিখতে লাগলেন; যে ভাষাতে কেবল কতগুলি উন্মাদ প্রলাপের ন্যায় গদ্যপদ্য রচনা ভিন্ন যাকে বিদ্যা বলা যায় এমন কোনো বিদ্যার বাষ্পও নাই, যার অভ্যাসে মনের বিকার ব্যতীত সংস্কার কখনো সম্ভব নয়। মুসলমানের বিদ্যা অর্থকরী বিদ্যা, সুতরাং ধনের উদ্দেশ্যে ধর্মনাশের শিক্ষা তাদের শাসনে শিখতেই হলো, সেই থেকে সকলের মনে এক কুসংস্কার জন্মাল যে কেবল ধনের জন্যই বিদ্যাশিক্ষার প্রয়োজন। সুতরাং হিন্দুদের সনাতন ধর্মেও নানা বিকৃতি ঘটল।’

সমাজ-সংস্কারক দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর উপরের বক্তব্যের ঠিক পরেই লিখছেন, ‘এখন ইংল্যান্ডীয়দের প্রাদুর্ভাবে এদেশ উজ্জ্বল হবার সম্ভবনা দেখা দিয়েছে, প্রায় আটশো বছর পর্যন্ত যে দুঃখ এদেশে সঞ্চিত রয়েছে তা ক্রমে দূর হচ্ছে। পরোপকারী সদাচারী ইংল্যান্ডীয়দের উৎসাহে এবং যত্নে দেশে নানারকম বিদ্যালয় স্থাপিত হয়েছে, তাতে মানুষের স্বভাব উজ্জ্বলকারক প্রচুর বিদ্যার অভ্যাস হচ্ছে।’ তিনি এর কিছু পরে লিখছেন, ‘ইংরেজী বিদ্যার দ্বারা চতুর্দিকে জ্ঞানের স্ফূর্তি হচ্ছে, অতএব আমাদের চিরকালের যে বেদান্ত শাস্ত্র, যা গুপ্ত থাকার জন্য প্রায় লুপ্ত অবস্থায় রয়েছে তা এখন প্রকাশ করা অতি আবশ্যক হয়েছে।’ দেবেন্দ্রনাথ একদিকে ব্রাহ্মণ্যধর্মের মহিমা প্রকাশ করেছেন এবং অন্যদিকে ইংরেজ শাসকদের জয়গান গেয়েছেন। তিনি শূদ্রদের বা নিম্নবর্গের মানুষকে শিক্ষা না দেওয়ার পক্ষেও কলম ধরেছেন। তিনি মনে করেছেন শূদ্রদের মতো এক তৃতীয়াংশ মানুষের শিক্ষা গ্রহণ না করায় সমাজের খুব ক্ষতিবৃদ্ধি নেই। কিন্তু শূদ্ররা সমাজের এক তৃতীয়াংশ মাত্র ছিলেন না, বরং তাঁরা ছিলেন সমাজের তিন চতুর্থাংশ অর্থাৎ বৃহত্তর জনগোষ্ঠী। শিক্ষা এবং বিভিন্ন প্রশ্নেই দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ইংরেজ শাসকদের সুরেই সুর মিলিয়ে ছিলেন। বলা বাহুল্য, মুসলমানদের শাসন ও শিক্ষা সম্পর্কে তাঁর মন্তব্যগুলি ছিল ইতিহাসবিরুদ্ধ।

WP_20150306_007
ঢাকা থিয়েটারের সেমিনার

মুসলিম শাসনে বাংলার সমাজ, শিল্প-সংস্কৃতিতে আর অর্থনীতিতে হিন্দু এবং মুসলমান সমাজের ভূমিকা কী ছিলো তার পর্যালোচনা করা যাক। তখন বাংলার বেশির ভাগ জমিদারই ছিলেন হিন্দু। মুর্শিদকুলি খান বেছে বেছে হিন্দুদের মধ্য থেকেই ইজারাদার বা জমিদার নির্বাচন করেছিলেন। এমনকি তিনি উচ্চপদস্থ রাজকর্মচারী হিসেবে হিন্দুদেরকেই বেশি নিয়োগ দিয়েছিলেন। দেখা যায়, পরবর্তী নবাবদের সময়ও এই অবস্থা অপরিবর্তিত ছিল। শুধু আলীবর্দির সময় সাতটি উচ্চপদের মধ্যে একটি পদ পেয়েছিলেন একজন মুসলমান। মীরজাফরকে প্রধান সেনাপতি বা মীর বকশীর পদটি দেওয়া হয়েছিল। নবাব সিরাজদৌলার আমলে তার কোনো পরিবর্তন হয় নি। সুতরাং নিঃসন্দেহে বলা যায়, মুসলিম রাজত্বে হিন্দুরা মুসলমানদের চেয়ে অনেক বেশি সুবিধাজনক অবস্থায় ছিলেন। তাছাড়া খাজনা আদায়কারী, ভূমি জরিপ প্রভৃতি কাজ হিন্দুদের অংশগ্রহণ প্রায় একচেটিয়া ছিল। সিরাজদৌলার সময় এই হিন্দুপ্রাধান্য সর্বক্ষেত্রে বেড়ে যায়। ইতিহাসবিদ নরেন্দ্র কৃষ্ণ সিংহ লিখেছেন যে, দশভাগের নভাগ জমিদারী ছিল হিন্দুদের হাতে। আর নিম্নতম রায়তের অধিকাংশ ছিলেন মুসলমান। সতেরশো আটাশের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, বাংলার পনেরোটি বৃহত্তর জমিদারির মধ্যে মাত্র দুটি ছিল মুসলমানদের হাতে। ঠিক একইভাবে ছোট একুশটি জমিদারির মধ্যে মুসলমানদের অধিকারে ছিল দুটি। প্রধান প্রধান ব্যবসা-বাণিজ্য এবং মহাজনি কারবারও ছিল হিন্দুদের একচেটিয়া। মুসলমানরা প্রধানত ছিলেন কৃষক ও কারিগর। তাহলে দেখা যাচ্ছে, দেবেন্দ্রনাথ মুসলমান শাসকদের সম্পর্কে যে বিষোদগার করেছেন তা ঠিক নয়।

ঠিক একইভাবে ইংরেজ লেখক হান্টার এবং অন্য যাঁরা দেখাবার চেষ্টা করেছেন যে, ইংরেজদের রাজত্বে মুসলমানদের সব গেল আর তাঁদের স্থানে হিন্দুরা জাঁকিয়ে বসল, কথাটি সত্যি নয়। হান্টার লিখেছেন, এ পর্যন্ত যে-সব হিন্দু গোমস্তারা অত্যন্ত ছোটখাটো স্তরের কাজে লিপ্ত ছিলেন, চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে তাঁরা সবাই জমিদার হয়ে গেলেন, জমির মালিকানা স্বত্ব লাভ করলেন। হান্টারের এইটুকু বক্তব্য সঠিক। কিন্তু তিনি যে লিখেছেন, ইংরেজ রাজত্বের সূত্রপাতে মুসলমান জমিদারদের হাত থেকে জমিদারি ও বড় বড় কর্মচারীর পদ চলে গেল আর হিন্দুরা তাঁদের স্থানে জমিদার হলেন—এ কথা ঠিক নয়। কারণ পূর্বে বাংলার প্রায় সব জমিদারই হিন্দু ছিলেন এবং সরকারি বড় বড় পদগুলি হিন্দুদের দখলেই ছিল। চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে একটা অঘটন ঘটেছিল ঠিকই, সেটা হলো খান্দানি হিন্দু জমিদারদের পতন। সেখানে দেখা গেল নতুন এক জমিদার গোষ্ঠীর উত্থান। ইংরেজদের গোমস্তা আর বানিয়ানের কাজ করে বিপুল অর্থ যাঁরা সঞ্চয় করেছিলেন সূর্যাস্ত আইনের নিলামের সুযোগে পুরানো জমিদারদের হটিয়ে তাঁরা সেইসব জমিদারি কিনে নিলেন। নতুন এই জমিদাররাও ছিলেন হিন্দু সম্প্রদায় থেকেই আগত। মুসলমানদের কাছ থেকে জোর-জবরদস্তি করে তাঁরা কিছুই নেন নি।

ইংরেজ শাসনে মুসলিমরা সরকারি চাকরি, শিক্ষার সুযোগ হারিয়ে আকস্মিকভাবে দরিদ্র হয়ে গেলেন এবং হিন্দুরা তাঁদের সব কিছু দখল করে বসলেন—একথা বলার আসলে সুযোগই নেই। মুসলিম শাসনের সাতশো বছর ধরেই শিক্ষায়, প্রশাসনে, গ্রাম্য পঞ্চায়েতে বর্ণহিন্দু এবং কায়স্থ ও বৈদ্যদের প্রাধান্য ছিল। বর্ণহিন্দু বা উচ্চবর্গের হিন্দুরা মুসলমানদের কারো ক্ষমতা কেড়ে নেন নি, কিন্তু সমস্যা তৈরি করেছিলেন অন্যত্র। ইংরেজ শাসনে বাংলার মুসলমান কৃষকসহ সকল কৃষক চরম দারিদ্র্যের মধ্যে নিপতিত হয়। বিশেষ করে কুটিরশিল্প ধ্বংসের ফলে মুসলিম কারিগররা ভয়াবহ ক্ষতির স্বীকার হয়েছিলেন। বাংলার কারিগরি শিল্পকে সম্পূর্ণরূপে তছনছ করে লক্ষ লক্ষ মানুষকে কৃষির ওপর নিক্ষেপ করা ছিল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের চক্রান্ত। হেনরি কটন লিখেছিলেন, ‘সরকারের কর্মকর্তারা পর্যন্ত সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, সারাদেশের কারিগররা নিঃস্ব হয়ে যাচ্ছে।’ কিন্তু বাংলার বাবুরা কৃষক ও কারিগরদের এই আর্তনাদ কানে তোলেন নি। বরং নিজদেশের সাধারণ মানুষের দুঃককষ্টের পাশে না দাঁড়িয়ে তাঁরা ইংরেজ শাসন দীর্ঘতর করার আবেদন জানিয়েছিলেন। বাবুরা কেন ইংরেজ শাসন দীর্ঘতর করতে চাইছেন সে সম্পর্কে কটন লিখেছেন, ‘এঁরা জানেন আমরা যদি আজ স্বেচ্ছায় ভারত ছেড়ে চলে যাই, যদি ভদ্রলোকদের জন্য শান্তি ও শৃঙ্খলার পাকা ব্যবস্থা না করেই চলে যাই, তবে সেই মুহূর্তে তাঁরা হিংস্র ও অশিক্ষিত সব যোদ্ধাদের পদানত হবেন।’


দ্বারকানাথ এসব অনাচার করতেন জানার পর তাঁর নিরক্ষর স্ত্রী ধর্মের বিশুদ্ধতা রক্ষার জন্য আর কখনো তাঁর সাথে এক শয্যায় যান নি


কটন এইসব শিক্ষিত বাঙালিদের সম্পর্কে আরো লিখেছেন, ‘এঁরা কিন্তু জনগণের মুখপাত্র নন। তাঁদের কথাবার্তায় সাধারণের মতামত বা আবেগ-অনুভূতির প্রতিধ্বনি মিলবে না।’ শিক্ষিত হিন্দুদের বিরুদ্ধে তাই অভিযোগ এটা নয় যে, তাঁরা মুসলমানদের জমিদারি বা পদগুলি দখল করেছিলেন। বরং অভিযোগ হচ্ছে নিম্নবর্গের মানুষদের প্রতি তাদের আচরণ সহানুভূতিশীল তো ছিলই না, বরং ইংরেজ শাসকদের মতো নিজেরাও তাঁরা জমিদারি লাভ করে, মহাজনি ব্যবসা করে কৃষক ও কারিগরদের উপর লুণ্ঠন ও নির্যাতন চালিয়েছেন। হিন্দুদের দ্বারা মুসলমানদের প্রতি কোনো অবিচারই হয় নি তাহলে, সেকথা বলা যাবে না। হিন্দুরা মুসলমানদের উপর অবিচার করেছে একথা সত্যি, তবে সেটা হিন্দু হিসেবে নয়, অবিচার তাঁরা করেছিলেন উচ্চবর্গের লোক হিসেবে, শাসকদের দোসর হিসেবে। কটন খুব সত্যিই কথাই বলেছিলেন, বাংলার শিক্ষিতরা জনগণের মুখপাত্র ছিলেন না। ঈশ্বরচন্দ্র শর্মার মতো ব্যক্তিরা নিজেদের আত্মপ্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে তাই ইংরেজ শাসনের কুফলগুলি দেখতে পান নি। সেজন্য চাষীদের দুভার্গ্যের সমব্যথী না হয়ে তিনি ইংরেজ শাসনের পূজারী হয়েছিলেন। বাংলার শিক্ষিত এই হিন্দুদের আচরণ ছিলো দ্বিমুখী। বেদ-বেদান্ত নিয়ে তাঁদের যে বাড়াবাড়ি সেটা তাঁদের উচ্চবর্ণের সম্ভ্রম রক্ষার জন্য। কারণ চারটি বেদের মাধ্যমেই বর্ণপ্রথাকে সুরক্ষা দেওয়া বা উচ্চ-নিম্নের ভেদাভেদ তৈরি করা হয়েছিল। এই শিক্ষিত হিন্দুরা একদিকে হিন্দুত্বের বড়াই করেছেন, ধর্ম রক্ষার কথা বলেছেন, আবার ইংরেজ শাসকদের নিজেদের বাড়িতে আমন্ত্রণ জানিয়ে বিভিন্ন পূজাপার্বণে গোমাংস খাইয়েছেন। বাবুরা প্রায় সবাই এসব করতেন। দ্বারকানাথ এসব অনাচার করতেন জানার পর তাঁর নিরক্ষর স্ত্রী ধর্মের বিশুদ্ধতা রক্ষার জন্য আর কখনো তাঁর সাথে এক শয্যায় যান নি।

শীঘ্রই ইংরেজ সরকার বুঝতে পারল উচ্চশিক্ষার মতো জনসাধারণের শিক্ষাকেও ইংরেজ শাসকদের স্বার্থের অনুকূলে নিয়ন্ত্রণ করা দরকার। ফলে আঠারশো চুয়ান্ন সালে চালর্স উড সাধারণের মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষা বিস্তারের লক্ষ্যে একটি বার্তা পাঠালেন, যা উডের শিক্ষাদলিল নামে পরিচিত। বিখ্যাত উডের বার্তায় স্পষ্টভাবেই বলা হলো, ‘এই শিক্ষা শুধুমাত্র বুদ্ধি ও চরিত্রের বিকাশ হবে না, শিক্ষার মধ্য দিয়ে যোগ্য নৈতিক বুদ্ধিসম্পন্ন বিশ্বাসী কর্মচারী সৃষ্টি হবে।’ শিক্ষার কাজ হবে, ‘ইউরোপীয় ব্যবসা-বাণিজ্য সম্পর্কে ভারতীয়দের সচেতন করে তুলে ইংল্যান্ডের কারখানাসমূহের জন্য প্রয়োজনীয় ভারতীয় কাঁচামালের সরবরাহ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া ও ব্রিটেনে উৎপন্ন পণ্যের যাতে ভারতের বাজারে অফুরন্ত চাহিদার সৃষ্টি হয়, সেই ব্যবস্থা করা।’ ইংরেজদের শিক্ষা বিস্তারের সার কথা হলো, ইংরেজদের শাসনের স্বার্থে কিছু করণিক তৈরি করা এবং ইংরেজদের ব্যবসা-বাণিজ্য যাতে ঠিক থাকে তার জন্য এই দেশীয় শিক্ষিত শ্রেণির সমর্থন লাভ করা। বাংলার জনগণের মধ্যে উচ্চশিক্ষার প্রসারে চার্লস উডের ভীতি ছিল। সে কারণেই তিনি তাঁর দৃষ্টিকে প্রাথমিক শিক্ষার দিকে নিয়ে যান। তিনি লিখেছিলেন, উচ্চশিক্ষা পেলে ওরা বিপজ্জনক হতে পারে। তিনি বাংলার ছোটলাট ফ্রেডারিক হ্যালিডেকে লিখেছিলেন, ‘যারা ভবিষ্যতে আমাদের অপবাদ দেবে, বিরোধিতা করবে এবং আমাদের প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করবে তাদের জন্য উচ্চশিক্ষার ব্যবস্থা করার আমি বিপক্ষে।’ যাই হোক আঠারশো চুয়ান্ন সালে বাংলার শিক্ষানীতিতে ভিন্ন মাত্রা যুক্ত হয়। জনসাধারণের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারের উদ্দেশ্যে প্রচলিত পাঠশালা শিক্ষাকেই সহায়ক হিসেবে বেছে নেওয়া হলো।

বাংলার ‘পাঠশালা’ ছিলো একটি বিশেষ ধরনের শিক্ষাব্যবস্থা, যেখানে গ্রামের জনগোষ্ঠীর জন্য পার্থিব বিষয়াদিতে শিক্ষাদান করা হতো। শিক্ষাক্রমের ভিতর অন্তর্ভুক্ত ছিলো গণিত, পত্রলিখন, সংস্কৃত, ব্যাকরণ, জমিদারি ও মহাজনি হিসাবরক্ষণ। জমিদারি বা কৃষি-সংক্রান্ত হিসাব-রক্ষণে শেখানো হতো জমির মাপজোক ও রাজস্বের হিসাব। মহাজনি বা বাণিজ্যিক হিসাব-রক্ষণে পড়ানো হতো সুদকষা এবং কী করে বিভিন্ন পণ্যের মূল্য নির্ধারণ করা যায়। সতেরো শতকের পাঠশালায় মুদ্রিত গ্রন্থ ব্যবহারের সুযোগ ছিল না। এমনকি হস্তলিখিত গ্রন্থও খুব কম ব্যবহার করা হতো। শিক্ষক মুখেমুখেই ছাত্রদের পাঠদান করতেন এবং ছাত্ররা গুরুপ্রদত্ত তথ্যাদি মুখস্থ করত। পাঠশালার শিক্ষা কার্যক্রমে অঙ্কশাস্ত্রে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হতো। শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন স্তরে কড়ির হিসাব, একশো পর্যন্ত গণনা, ভূমির পরিমাপ কাঠার হিসাব, ওজন মাপার সের হিসাব, দেশীয় পদ্ধতির হিসাবের জন্য শুভঙ্কর-এর গণনা, যোগ ও বিয়োগ পদ্ধতি এবং বিশ পর্যন্ত গুণনের নামতা শেখানো হতো গুণ ও ভাগের জন্য। এসব বিষয়ে শিক্ষালাভের পর জমিদারি ও মহাজনি হিসাব শেখানো হতো। বাংলা ভাষাতেই এই শিক্ষাদান করা হতো।

মধ্যযুগের পাঠশালা শিক্ষা সম্পর্কে কিছু ধারণা পাওয়া যায় ইংরেজদের মাধ্যমে। আঠারো শতকে এডওয়ার্ড ইভস্ লন্ডন থেকে ভারতে আসেন। ইভসের বিবরণে জানা যায় সতেরশো সাতান্ন-আটান্ন খ্রিস্টাব্দে বাংলায় লেখাপড়া শেখার অনেক বিদ্যালয় ছিল। ইভস্ লিখেছেন, ‘যদিও শিশুদের লেখাপড়া শেখার অনেক বিদ্যালয় ছিল, তবে তাতে মাতৃভাষার বেশি আর কিছু শেখানো হতো না।’ সতেরশো একানব্বই সালে ক্রফোর্ড জানাচ্ছেন, ‘সব শহরে এবং প্রধান প্রধান গ্রামগুলিতে লেখাপড়া শেখার বিদ্যালয় ছিল।’ তিনি জানাচ্ছেন যে, খুঁটির উপর তালপাতার ছাউনি দিয়ে বিদ্যালয়-ঘর তৈরি হতো। বালকেরা মাটিতে চাটাইয়ের আসনে বসতো। তালপাতার পুঁথি ব্যবহার হতো। বাঁ হাতে পুঁথি ধরে ডান হাতে লোহার শলা দিয়ে চেপে লেখা হতো। কিন্তু প্রায়ই তারা বালিতে আঙুল দিয়ে লিখতো ও অঙ্ক কষতো। ইংরেজদের শাসনক্ষমতা লাভের আগেই সতেরো শতকে যে বাংলায় বর্ণশিক্ষা বা সাক্ষরতার হার বাড়ছিল, এইসব তথ্য থেকে তা যথেষ্ট অনুমান করা যায়। সহজ অঙ্ক এবং বর্ণশিক্ষা লাভের এই ধারা অকারণে হয় নি। গ্রামের নিম্নবর্গের মানুষ নিজেদের অর্থনীতির তাগিদেই লেখাপড়ার দিকে ঝুঁকেছিলেন। ইংরেজ শাসক এবং বাংলার ভদ্রলোকরা প্রাথমিক শিক্ষা হিসেবে এই পাঠশালা পাঠ্যসূচিকে যথেষ্ট মনে করলেন না।

বাংলায় উনিশ শতকের দ্বিতীয়ার্ধে সরকারি শিক্ষাব্যবস্থাকে যে ব্যক্তি সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করেছেন তিনি ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর। বাংলার পাঠশালাগুলি কোনো কাজের নয়, এই বিশ্বাস থেকে তিনি যে ধরনের প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সুপারিশ করেছিলেন তা মূলত মাধ্যমিক শিক্ষার নামান্তর। শুধু তাই নয়, বিদ্যাসাগর শিক্ষাখাতে সরকারি বরাদ্দকে শুধুমাত্র উচ্চশ্রেণির শিক্ষার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার পরামর্শ দেন। ইংরেজ শাসকরা এবং ঈশ্বরচন্দ্র মনে করতেন, বাংলার পাঠশালাসমূহে যে শিক্ষা দেওয়া হতো তা ছিল অতি নিম্নমানের। কিন্তু কোন মাপকাঠিতে সেটা ঠিক করা হলো সে ব্যাপারে সরকারের সুস্পষ্ট বক্তব্য নেই। ঈশ্বরচন্দ্র মনে করেন যে, মুদ্রিত পুস্তকের প্রচলন করা গেলে পাঠশালাগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবেই উন্নত হবে। সেই পরিকল্পনা মতো প্রাথমিক শিক্ষার ক্ষেত্রে পূর্বের সরল পাঠক্রমের পরিবর্তে নতুন পাঠক্রম বিস্তৃত হলো। পাঠশালা শিক্ষার সহজ সরল পাঠক্রম বাদ দিয়ে ইংরেজরা প্রাথমিক শিক্ষাব্যবস্থাকে ক্রমেই বইয়ের বোঝায় পরিণত করলো। তবে তার জন্য শুধু ইংরেজদেরকে দায়ী করলে চলবে না। বাংলার শিক্ষিত ও সুবিধাভোগীরা ছিলেন এই সমস্যা সৃষ্টির জন্য অনেকটা দায়ী। বঙ্গদেশে তখন যাঁরা শিক্ষায় অগ্রণী ছিলেন সকলেই প্রাথমিক বিদ্যালয়েই শিশুকে পণ্ডিত বানিয়ে তুলতে চেয়েছিলেন। শিশুদের উপর নানারকম পাঠক্রম বা বইয়ের বোঝা চাপিয়ে দেয়ার কথা বলেছিলেন তাঁদের অনেকেই।

বাংলা শিক্ষার পরিকল্পনায় ইশ্বরচন্দ্র শর্মা বা বিদ্যাসাগর বলেছিলেন, কেবল লিখন, পঠন ও সরল অঙ্ক কষার মধ্যে বাংলা শিক্ষা সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। যতদূর সম্ভব বাংলা ভাষাতেই সম্পূর্ণ শিক্ষা দিতে হবে এবং তার জন্য ভূগোল, ইতিহাস, জীবনচরিত, পাটিগণিত, জ্যামিতি, পদার্থবিদ্যা, নীতিবিজ্ঞান, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, শরীরতত্ত্ব বাংলায় শিক্ষা দেওয়া প্রয়োজন। জীবনী হিসাবে তিনি কোপার্নিকাস, গ্যালিলিও, নিউটন, হার্শেল, লিনিয়াস, ডুবাল, উইলিয়াম জোনস, টমাস জেঙ্কিস প্রমুখ বিজ্ঞানীর নাম উল্লেখ করেন। তিনি শুরুতে ভারতবর্ষ, গ্রিস, রোম ও ইংল্যান্ডের ইতিহাস পড়াবার প্রস্তাব দেন। প্রাথমিক শিক্ষার জন্য ঈশ্বরচন্দ্রের পাঠক্রম ছিল বিশাল ও ব্যাপক। মার্শম্যানের লেখা বাংলার ইতিহাসের ভাবানুবাদ পাঠদানের কথা বলেন তিনি। সাধারণ জনসাধারণের সন্তানদের প্রাথমিক শিক্ষাদানের জন্য ইশ্বরচন্দ্র শর্মা যে বিরাট পাঠক্রম দিয়েছিলেন তার সাথে সনাতন পাঠশালার মিল ছিল না। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাধারণ ছাত্রদের পক্ষে তা গ্রহণ করা অসম্ভব ছিল। তাঁর পরিকল্পনার মধ্যে উচ্চাকাঙ্ক্ষা ছিল, তবে তা বাস্তবসম্মত ছিল না। মাধ্যমিক বা উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষার জন্যই তাঁর পাঠক্রম সঠিক ছিল। তিনি যে-সব বিষয়ের কথা বলেছিলেন তা শিক্ষাদানের যোগ্য শিক্ষকই তখন ছিল না।


বাংলার প্রাথমিক শিক্ষায় কিন্তু ছোট ছোট শিশুদের মগজে ইতিহাস ও ধর্ম সম্পর্কে নানা মনগড়া চিন্তাভাবনা ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছিল, যা পরবর্তীকালে বাংলায় সাম্প্রদায়িক মানসিকতার সূত্রপাত ঘটায়


প্রাথমিক শিক্ষার পাঠক্রম তৈরির ব্যাপারে আরো অনেকের মতো দেবেন্দ্রনাথও ছিলেন অনেক বেশি উচ্চাকাঙ্ক্ষী। তিনি বলছেন, পাঠশালার পাঠক্রমে নিম্নলিখিত বিষয়গুলি অন্তর্ভুক্ত হওয়া প্রয়োজন : পড়ালেখা ও বানান শেখা, সরল পাটিগণিত এবং ক্ষেত্র পরিমাপ বিদ্যা, পত্রলিখন, কৃষি ও ব্যবসা সম্পর্কিত হিসাবরক্ষা পদ্ধতি, প্রাথমিক কৃষিবিজ্ঞান, সম্পত্তি সম্পর্কিত আইনের প্রাথমিক জ্ঞান, প্রাথমিক ভূগোল, ইতিহাস এবং ব্যবহারিক নীতিজ্ঞান। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর প্রাথমিক শিক্ষার জন্য যে-পাঠ্যক্রম দিয়েছিলেন তা উচ্চবর্গের সন্তানদের মস্তিস্কে ধারণ করার জন্য হয়তো কঠিন কিছু নয়, কারণ তাদের হাতে ছিল অফুরন্ত সময়। গৃহশিক্ষক রাখার সামর্থ্যও ছিল তাঁদের। কিন্তু গ্রামের দরিদ্র মানুষের সন্তানদের জন্য তা বাস্তবসম্মত ছিল না। কারণ পড়াশোনার পাশাপাশি তাদের নানা ধরনের সংসারিক কাজে ব্যস্ত থাকতে হতো। এসব বিদ্বান বা সমাজ-সংস্কারকরা নিজেদের সন্তানদের দিকে তাকিয়ে প্রাথমিক শিক্ষার পাঠক্রম নির্বাচন করতেন। প্রাথমিক শিক্ষার সাথে সেটা সঙ্গতিপূর্ণ কিনা, সনাতন গুরুরা তা পড়াতে পারবেন কিনা সেটা তাঁরা বিবেচনায় নেন নি।

রুশো বলেছিলেন, শিশুকে পরিণত বয়স্ক মানুষ হিসেবে দেখার আগে তাকে ‘শিশু’ হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। শিশুকে তার নিজস্ব ক্ষমতা পূরণ করার সুযোগ দেওয়া দরকার। তিনি মনে করতেন, শিশুর মনকে অকালে উপযুক্ত সময়ের আগেই বয়স্কজনোচিত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। তিনি এই ধরনের কৃত্রিম শিক্ষাপ্রণালির বিরোধিতা করেছিলেন। কৃত্রিম শিক্ষা ব্যবস্থায় শিশুর সামনে পরিণত মানুষের ধ্যানধারণাগুলি উপস্থিত করা হয় এবং জোর করে শিশুমনে পরিণত বয়স্ক মানুষের ধ্যানধারণা এবং চিন্তাধারা বা ভাবনা ঢুকিয়ে দেওয়া হয়। শিশুকে বাধ্য করা হয় সেগুলি গ্রহণ করতে। এই ধরনের সদর্থক কৃত্রিম শিক্ষাকে রুশো অগ্রাহ্য করেছিলেন। রুশোর মতে, শিক্ষা বলতে বোঝায় শিশুমনকে বিমূর্ত এবং আগে থেকেই তৈরি করা ‘সত্য’ দিয়ে পূর্ণ করা নয়। যদি জোর করে শিশুর উপর কিছু ধারণা চাপিয়ে দেওয়া হয়, সেটা হবে শিশুর সহজাত স্বাভাবিক প্রকৃতিকে অগ্রাহ্য করে কৃত্রিমভাবে তার মস্তিষ্ককে ঠেসে দেওয়া বা পুননির্র্মাণ করা। শিশুকে কৃত্রিম ছাঁচে ঢালাই করার প্রচেষ্টার ফল খারাপই হবে। শিশু স্বভাবিকভাবে বেড়ে উঠতে পারবে না। বাংলার প্রাথমিক শিক্ষায় কিন্তু ছোট ছোট শিশুদের মগজে ইতিহাস ও ধর্ম সম্পর্কে নানা মনগড়া চিন্তাভাবনা ঢুকিয়ে দেওয়া হচ্ছিল, যা পরবর্তীকালে বাংলায় সাম্প্রদায়িক মানসিকতার সূত্রপাত ঘটায়। শিশুদের স্বাভাবিকভাবে বেড়ে উঠতে দেওয়া হয় নি। বয়স্ক মানুষরা শিশুদের শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে তাঁদের বিশ্বাসগুলিকেই গলাধঃকরণ করিয়েছিলেন।


দ্বিতীয় কিস্তির লিংক