হোম নির্বাচিত বাংলার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার পাঠ্যপুস্তকে হিন্দু-মুসলিম প্রসঙ্গ এবং দেশভাগ

বাংলার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার পাঠ্যপুস্তকে হিন্দু-মুসলিম প্রসঙ্গ এবং দেশভাগ

বাংলার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার পাঠ্যপুস্তকে হিন্দু-মুসলিম প্রসঙ্গ এবং দেশভাগ
406
0
তৃতীয় কিস্তির লিংক

 চতুর্থ কিস্তি

শিক্ষিত হিন্দুরা বাঙালিত্বের অধিকার মুসলমানদের দিতে চান নি। ভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সীমানা থেকে হিন্দুধর্ম পুনরুজ্জাগরণের নামে তাঁদের দূরে সরিয়ে রাখলেন। পশ্চাৎপদ মুসলমানরা যদি তখন নিজেদের ধর্মকেই ঢাল বানিয়ে বেঁচে থাকতে চায়, সমাজে মর্যাদার আসন লাভের জন্য লড়াই চালিয়ে যেতে চায়—সেক্ষেত্রে তাঁদের মুর্খতা নিয়ে সমালোচনা করা যেতে পারে, কিন্তু দোষ দেওয়া যাবে কি? বিশ শতকের গোড়ায় পিছিয়ে থাকা সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলমানরা যখন ইংরেজ প্রবর্তিত শিক্ষা গ্রহণে আগ্রহী হলেন, তখন তাঁরা প্রচলিত শিক্ষাধারার সর্বস্তরে বর্ণহিন্দুদের একাধিপত্য মেনে নিলেও পাঠ্যবিষয়ে হিন্দুধর্মের একাধিপত্য মেনে নিতে পারলেন না। পাঠ্যপুস্তকে হিন্দু ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির প্রভাবকে তাঁরা অনতিক্রম্য বাধা হিসেবে বিবেচনা করলেন। শিক্ষাব্যবস্থার পাঠ্যসূচিতে হিন্দু-আধিপত্য থেকে মুক্তি পাবার নামে তাঁরাও নিজধর্মের জটিল আবর্তে হাবুডুবু খেতে থাকলেন। হিন্দুদের বিরুদ্ধে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণ করতে ইসলামের ইতিহাসের উজ্জ্বল দিকগুলিকে সামনে টেনে আনলেন। মুঘল শাসনকে মনে করলেন ইসলামি শাসন। হিন্দু-জাগরণের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে গিয়ে তাঁরা ভুল পথে হাঁটলেন। হিন্দুরা কিন্তু পশ্চাৎপদ হিন্দু ধর্মের জাগরণ ঘটিয়ে প্রগতিশীল বলে পরিচিত হয়েছিলেন, কারণ সবকিছুর পরেও সত্যিই তাঁরা সামনের দিকে এগিয়ে যেতে পেরেছিলেন। কিন্তু মুসলমানরা তা পারেন নি। মাদ্রাসা আর মক্তবের শিক্ষা তাঁদেরকে খুব বেশি দূর আগাতে দেয় নি।

শিক্ষিত মুসলমানদের চিন্তার একটা বড় বিভ্রান্তি ছিল বর্ণহিন্দুদের তাঁরা হিন্দু হিসেবে দেখেছেন আর নিজেদের ভেবেছেন মুসলমান। প্রশ্নটা সত্যিকার অর্থে হিন্দু-মুসলমানের ছিল না। সেভাবে ব্যাখ্যা করাটাই ছিল ইতিহাস-বিরুদ্ধ। বর্ণহিন্দুদের মূল পরিচয় ছিল তাঁরা শাসকশ্রেণির অংশ। হিন্দু সংস্কৃতির সুবিধাগুলি তাঁরা ভোগ করতে চেয়েছিলেন, কারণ তা নিম্নবর্গকে শোষণ করতে সাহায্য করে। হিন্দুত্ব ছিল তাঁদের কাছে উচ্চবর্ণ হিসেবে নিজেদের প্রতিষ্ঠা করার আলখেল্লা। কিন্তু মূলত তাঁরা ছিলেন ইংরেজ শাসকদের দাসানুদাস। বিশ শতকে এসে শিক্ষিত মুসলমানরা নিজেদের ভাগ্য সুপ্রসন্ন করার লক্ষ্যে ইংরেজদের হাত ধরে সুযোগ-সুবিধা নিতে গিয়ে একই দৃষ্টান্ত সৃষ্টি করলেন। নিজেদের ইংরেজ শক্তির দাসানুদাসে পরিণত করলেন। বাংলার ভদ্রলোকদের হিন্দুজাগরণ যদি হিন্দুত্বের ব্যাপারই শুধু হতো তাহলে নিম্নবর্ণের বিশাল হিন্দুদের মধ্যেও তা সাড়া ফেলত। বঙ্কিমের রচনা শিক্ষিত হিন্দুদের মধ্যে প্রভাব বিস্তার করলে গ্রামের সাধারণ হিন্দুরা এসব থেকে অনেক দূরে ছিলেন। স্বদেশি আন্দোলন চলাকালেও দেখা গেছে হিন্দু আর মুসলিম কৃষকরা অনেকক্ষেত্রেই এক হয়ে লড়েছেন হিন্দু চরমপন্থিদের বিরুদ্ধে। গ্রামের নিম্নবর্গের মুসলমানরা নিজেদের বাঙালি বলে ভাবতেন এবং নিজেদেরকে হিন্দু কৃষকদের সমগোত্র বলেই মনে করতেন। সুবিধাভোগী শিক্ষিত বাঙালি ভদ্রলোকদের একগুঁয়ে স্বভাবের কারণেই সাধারণ কৃষকদের মধ্যে ধীরে ধীরে হিন্দু-মুসলিম প্রশ্নগুলি দানা বাধতে থাকে। মুসলমানরা হিন্দু পুনরুজ্জীবনের বিরুদ্ধে ইসলামকে না দাঁড় করিয়ে যদি বাঙালি নিম্নশ্রেণির সংস্কৃতিকে ধারণ করতেন, তাহলে সমস্যার চমৎকার সমাধান হতে পারত। কিন্তু ইতিহাস কখনো সহজ-সরল রাস্তা ধরে চলে না।

WP_20150306_010-1024x575
সেমিনার ।। আলোচনা পর্ব

বঙ্গভঙ্গ রদের পর অবস্থার পরিবর্তন হলো। বঙ্গভঙ্গ রদ মুসলিম রক্ষণশীলদের মধ্যে হতাশার সৃষ্টি করলেও, তরুণ মুসলিমরা জাতীয় রাজনীতি ও আন্দোলনে হিন্দুদের থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন হয়ে থাকার নীতি ভ্রান্ত বলে মনে করতে লাগলেন। পূর্ববঙ্গে মুসলিমরা সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়ায় তাঁরা হিন্দুদের দ্বারা নিপীড়িত হবার ভয়ে আর ভীত ছিলেন না। বাংলার মুসলমানদের একটা বড় অংশই হলেন ধর্মান্তরিত। সমাজের তথাকথিত নিম্নবর্ণের মানুষদের মধ্য থেকে যাঁরা ধর্মান্তরিত হয়ে ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন, স্বভাবতই তাঁরা ছিলেন পশ্চাৎপদ। বিত্তে এবং শিক্ষায় বহুকাল তাঁরা পিছিয়ে ছিলেন। ইংরেজ শাসনে যখন তাঁদের কারো কারো শিক্ষালাভের সুযোগ হলো, শিক্ষার আঙিনায় তখন চলছে বর্ণহিন্দুদের আধিপত্য। মুসলমানরা সে অবস্থায় শিক্ষার প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে খানিকটা বিভ্রান্ত হয়ে পড়েছিলেন। সাধারণ মুসলমানদের একটি অংশ যখন পাটচাষের মধ্য দিয়ে নিজেদের আর্থিকভাবে লাভবান করে তুলেছিলেন, শিক্ষার ক্ষেত্রে যুক্তিসঙ্গত কারণেই তাঁরা কিছুটা প্রতিযোগিতার মনোভাব পোষণ করতেন। দীর্ঘদিন তাঁদের প্রতি বর্ণহিন্দুদের অবহেলা প্রদর্শনের একটা জবাব তাঁরা দিতে চাইছিলেন। ইংরেজ শাসনে উনিশ শতকের শেষার্ধে পাটচাষ লাভজনক ফসল হিসেবে খুব গুরুত্ব পেতে থাকে। আঠারশো সত্তরের দিকে পাটজাত পণ্যের চাহিদা আন্তর্জাতিক বাজারে বিশেষভাবে বৃদ্ধি পায়। ফসল হিসেবে পাটচাষের ব্যাপক প্রচলনের পর মুসলমান-প্রধান পূর্ববঙ্গের কৃষকদের অর্থনৈতিক উন্নতির ভিত্তি রচিত হয়। বলতে গেলে পাটচাষ ছিল পুর্ববঙ্গের মুসলমানদের একচেটিয়া।

মুসলিম ব্যবসায়ীদের মধ্য থেকে একদল পাটের ব্যবসার মাধ্যমে বিরাট সম্পদশালী হয়ে ওঠেন। ধনী মুসলামনারা এ সময় জমি ক্রয় করা শুরু করে। বিশ শতকের ত্রিশের দশকে পূর্ববাংলায় মুসলমান জোতদারদের সংখ্যা অনেক বেড়ে যায়। এঁরা শহর ও গ্রামাঞ্চলে ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করেছিল। এই অংশটাই কৃষক-প্রজা পার্টি ও মুসলিম লীগের প্রধান শক্তি হয়ে দাঁড়ায়। খুব শীঘ্রই তাঁরা হিন্দু জমিদারদের প্রতিপক্ষ একটি শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন। স্বভাবতই শিক্ষাদীক্ষায় এঁরা এগিয়ে যেতে চান। কিন্তু তাঁরা শুধু নিজেদের নয়, পূর্ব বাংলার অধিক সংখ্যক মুসলমানদের মধ্যে শিক্ষার বিস্তার ঘটাতে চান তাঁদের স্বার্থে। জমিদার না হওয়াতে নিম্নবর্গের কৃষকদের সাথে তাঁদের সরাসরি সংঘর্ষের কারণ ছিল না। দ্বিতীয়ত তাঁরা বুঝতে পারছিলেন ব্যাপকভাবে মুসলমানদের উত্থান না ঘটলে হিন্দু-অধ্যুষিত ভারতে তাঁদের আধিপত্য বিস্তার করা কঠিন হবে। নিজস্বার্থেই তাঁরা মুসলিম জনসাধারণকে কিছুটা এগিয়ে যেতে নানা পদক্ষেপ নেন। তারমধ্যে শিক্ষার প্রসার একটি।


মুসলমানদের পশ্চাৎপদতা থেকে এগিয়ে যাবার ব্যাপারটা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শিক্ষিত হিন্দুদের কাছে সাম্প্রদায়িকতা মনে হয়েছে


মুসলমানদের পশ্চাৎপদতা থেকে এগিয়ে যাবার ব্যাপারটা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শিক্ষিত হিন্দুদের কাছে সাম্প্রদায়িকতা মনে হয়েছে। সমাজের অগ্রগামী হিসেবে তাঁরা বিবেচনা করতে চান নি যে, এটা মুসলমানদের সমাজে প্রতিষ্ঠা লাভ এবং বেঁচে থাকার লড়াই। নিম্নবর্গের হিন্দুদের ব্যাপারে বর্ণহিন্দুদের দৃষ্টিভঙ্গি একইরকম রক্ষণশীল ছিল। কৃষিসমাজ কোনো এক শ্রেণির সমাজ নয়। বিভিন্ন পরস্পরবিরোধী শ্রেণির সম্পর্ক নিয়ে গড়ে উঠেছে কৃষিসমাজ। ফলে সমাজের কোনো সমস্যা এবং তার সমাধান সকলের নির্বিশেষ সমস্যার সমাধান নয়। সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষার সমস্যা সম্পর্কে কথাটা একইভাবে সত্যি। কৃষক আন্দোলনের নেতা অবনী লাহিড়ী দেখান যে, কৃষক আন্দোলনের সাথে যুক্ত এই সময়কালে বাংলার, বিশেষ করে উত্তর বাংলার কৃষকরা ছিলেন প্রায় নিরক্ষর। সাম্যবাদী দলের বা কৃষক সমিতির দিনাজপুরের সদস্যদের শতকরা আটানব্বই ভাগ নিরক্ষরই ছিলেন। অবনী লাহিড়ী স্বীকার করেন, নিরক্ষরতা কৃষক আন্দোলনের একটা সমস্যা ছিল কিন্তু নিরক্ষর মানেই অজ্ঞ নয়। কৃষক-আন্দোলনের সংস্পর্শে এসে সমাজের শত্রু-মিত্র সম্পর্কে এঁদের অনেক ধরনের অজ্ঞতা কেটে যায়। যদিও দেশের ও পৃথিবীর রাজনীতির সবগুলি দিক বোঝার ক্ষমতা তাঁদের ছিল না।

সর্বজনীন প্রাথমিক শিক্ষার সমস্যাটা মূলত মজুর বা কৃষিমজুরদের শিক্ষায় অংশ নেওয়ার সমস্যা। সকল মজুররা সমানভাবে শিক্ষায় অংশ নিক সেটা কি জমিদার বা মালিকরা খুব পছন্দ করবে? পছন্দ তো করবেই না বরং বিরোধিতা করবে। বিভিন্ন মতের বিরোধিতার সমন্বয় কিভাবে করা যায় সেটাই প্রাথমিক শিক্ষা বিস্তারের বড় বাধা বা সঙ্কট। জমিদার, পরগাছা জোতদার আর ধনী কৃষক নিজেদের ছেলেমেয়েদের লেখাপড়া শেখালেও দরিদ্রদের সন্তানরা লেখাপড়া শিখুক এটা চাইতেন না। তাহলে লেখাপড়া শিখে তাঁদের সন্তানদের ‘বাবু’ হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে, তখন তারা আর জলেকাদায় গায়গতরে খাটতে চাইবে না। বাপদাদার আমল থেকে চাষাবাদের যে নিয়ম চলে আসছে লেখাপড়া শিখলে ছোটলোকরা কি আর সে নিয়ম মানতে চাইবে! আর এদের লেখাপড়া শেখার দরকারটাই বা কী। ফলে নিচের দিক থেকে উঠে আসা হিন্দু-মুসলমানরা যখন প্রাথমিক শিক্ষাকে সর্বজনীন করতে চাইলেন, তখন সুবিধাভোগীরা সবার আগে তার মধ্যে সাম্প্রদায়িকতার ভূত দেখতে পেলেন।

সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী তখন দেশে সত্তর লক্ষ শিশু প্রাথমিক শিক্ষা লাভের উপযোগী ছিল। কিন্তু দেখা যায়, তার মাত্র এক তৃতীয়াংশ অর্থাৎ চব্বিশ লক্ষ বিদ্যালয়ে যাতায়াত করছে। চব্বিশ লক্ষ শিশুর মধ্যে আবার মাত্র দুলক্ষ পনেরো হাজার চতুর্থ ও পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ার সুযোগ পাচ্ছে। বাকিরা সকলে নিম্ন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়ছে। সরকার সেই বিবেচনা থেকে ‘গ্রাম্য প্রাথমিক শিক্ষা বিল’কে আইনে পরিণত করার প্রস্তুতি নেয়। এই প্রস্তাবের দুটি বিষয়ে বিশেষ বিতর্কের সৃষ্টি হয়। প্রাথমিক শিক্ষা পরিচালনার জন্য ‘জেলা বোর্ড’ বা ‘জেলা পর্ষদ’-এর সমান্তরাল প্রতি জেলায় একটি করে ‘জেলা স্কুল বোর্ড’ বা ‘জেলা বিদ্যালয় পর্ষদ’ স্থাপনের কথা বলা হয়েছিল। দীর্ঘদিন জেলার প্রাথমিক শিক্ষার তত্ত্বাবধানের ভার ছিল জেলা পর্ষদগুলির হাতে। নতুন প্রস্তাবে প্রাথমিক শিক্ষার যাবতীয় দায়িত্ব ‘জেলা বিদ্যালয় পর্ষদ’ গঠন করে তার হাতে দিতে বলা হলো। স্বাভাবিকভাবেই জেলা পর্ষদগুলি এই প্রস্তাবের বিরুদ্ধে গেল। পূর্বে জেলা পর্ষদগুলিতে সরকারি প্রতিনিধিদের প্রাধান্য ছিল। নতুন প্রস্তাব দেয়ার কিছুদিন আগেই মাত্র জেলা পর্ষদগুলি সম্পূর্ণভাবে ভোটে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের কর্তৃত্বে আসে। নির্বাচনে প্রধানত উচ্চবিত্ত হিন্দুরাই বেশিরভাগ ‘জেলা পর্ষদ’গুলি পরিচালনার ক্ষমতা লাভ করে। অন্যদিকে ‘জেলা বিদ্যালয় পর্ষদ’ সরকার মনোনীত সদস্যদের নিয়েই গঠন করার কথা বলা হয়। এতে করে শিক্ষিত হিন্দুরা সন্দেহ করে যে, পিছনের দরজা দিয়ে প্রাথমিক শিক্ষার দায়িত্ব মুসলমানদের হাতে তুলে দেওয়া হতে পারে।

দ্বিতীয় বিতর্কের বিষয়টি হলো, প্রাথমিক শিক্ষার ব্যয় নির্বাহের জন্য একটি শিক্ষা-কর প্রদানের প্রস্তাব। আসলে এই শিক্ষা-কর সংক্রান্ত বিতর্ক বহু পুরানো। বহুকাল ধরেই ইংরেজ সরকার এই কর আদায়ের চেষ্টা করছিল। অন্য অনেক প্রদেশে এই কর চালু হলেও বাংলায় সরকারকে বিশেষ বিরোধিতার সম্মুখীন হতে হয়। বাংলায় ‘শিক্ষা-কর’ না থাকায় প্রাথমিক শিক্ষায় সরকারি অনুদান অন্যান্য প্রদেশের তুলনায় কম ছিল। সন্দেহ নেই, প্রাথমিক শিক্ষা বিস্তারে শিক্ষাকর প্রদান অত্যাবশ্যক ছিল। চিরস্থায়ী বন্দেবস্তের কথা বলে জমিদাররা তা কিছুতেই করতে দিতে চাইছিলেন না। ফলে আইনসভায় উত্থাপিত নতুন প্রস্তাবকে ঘিরে বাংলার শিক্ষিত হিন্দু-মুসলমান সম্প্রদায়-ভিত্তিতে ভিন্ন ভিন্ন মঞ্চে বিভক্ত হয়ে যান। এই বিভাজনেরই পরিণতি আরো ব্যাপক ও মারাত্মক হয়ে দাঁড়ায় চল্লিশের দশকের মধ্যশিক্ষা প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে। প্রথম দিকে অবশ্য প্রাথমিক শিক্ষা বিষয়ক বিতর্ক ততটা সাম্প্রদায়িক ছিল না। শিক্ষিত হিন্দুদের মতো বহু মুসলমানও প্রস্তাবটির কিছু কিছু অংশের বিরোধিতা করেছিলেন। কিন্তু শেষপর্যন্ত ব্যাপারটা সাম্প্রদায়িক বিভেদের দিকেই মোড় নেয় এবং সে উত্তেজনা তীব্র আকার ধারণ করে। বিশেষ করে পাঠ্যবইয়ের সাম্প্রদায়িক প্রবণতা বা হিন্দু-মুসলিম শাসকদের বিতর্কিত প্রশ্নগুলো এই সাম্প্রদায়িক বিভাজনের পটভূমি আগেই তৈরি করে রেখেছিল। বঙ্গীয় আইনসভায় স্বরাজ্য দলের প্রতিনিধিরা নির্বচিত জেলা পর্ষদকে ডিঙ্গিয়ে মনোনীত সদসদের দ্বারা ‘জেলা বিদ্যালয় পর্ষদ’ গঠনের প্রস্তাবকে ঔপনিবেশিক সরকারের দুরভিসন্ধি বলে মনে করেন। প্রস্তাবটি স্বায়ত্তশাসন নীতির পরিপন্থি এবং নির্বাচিত জেলা পর্ষদের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন—এই যুক্তিতে তাঁরা প্রস্তাবটি নাকচ করে দেন।

বাংলা সরকারের পক্ষ থেকে উনিশশো উনত্রিশ সালের ডিসেম্বর মাসে খাজা নাজিমউদ্দিনকে শিক্ষামন্ত্রী নিযুক্ত করা হয়। খাজা নাজিমউদ্দিন বাংলার শিক্ষামন্ত্রী হবার পর খুব জোরের সাথেই তিনি ‘গ্রাম্য প্রাথমিক শিক্ষা বিল’কে আইনে পরিণত করতে উদ্যোগ নেন। সর্বস্তরে প্রাথমিক শিক্ষাদানের কথা বলা হয় ‘গ্রাম্য প্রাথমিক শিক্ষা বিল’-এ। শিক্ষালাভের জন্য জনগণকে শিক্ষা-কর প্রদান করতে হবে, এমন প্রস্তাবও তাতে ছিল। ব্রিটিশ সরকারের সহযোগিতায় এবং শিক্ষামন্ত্রী নাজিমউদ্দিনের উদ্যোগে শেষপর্যন্ত ‘গ্রাম্য প্রাথমিক শিক্ষা বিল’ আইনে পরিণত হয়। এই আইনে প্রাথমিক শিক্ষার ব্যয় নির্বাহের উদ্দেশ্যে জনগণের উপর এক কোটি টাকা কর আরোপ করা হয়। এই ‘গ্রাম্য প্রাথমিক শিক্ষা বিল’ নিয়ে পুনরায় সাম্প্রদায়িক বিভেদ বাড়তে থাকে। নাজিমউদ্দিন এই প্রস্তাবটি আইনে পরিণত করার জন্য মুসলিমদের উস্কে দেন। বিশেষ করে আইনসভার মুসলমান সদস্যরা যাতে প্রস্তাবটির বিরোধিতা না করেন তার জন্য সাম্প্রদায়িক চাপ সৃষ্টি করা হয়। নাজিমউদ্দিনের শিক্ষা প্রস্তাবটি নিয়ে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা এত প্রচণ্ড হয়ে ওঠে যে, ফজলুল হকের মক্কেলরা বিশেষভাবে তাঁকে বলেন যে, প্রস্তাবের বিরোধিতা করে তিনি যেন মুসলমানদের সর্বনাশ না করেন। সেরকম পরিস্থিতিতে যে-কয়জন মুসলমান সদস্য ‘শিক্ষা-কর’ আরোপের বিরুদ্ধে ছিলেন তাঁরাও আর এর বিরোধিতা করার সাহস পান নি। অন্যদিকে এ ঘটনা হিন্দু সদস্যদের মনে তীব্র বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে।

FazlulHuqMPOs29aug2014
বাংলার প্রধানমন্ত্রী হবার পর ফজলুল হক শিক্ষামন্ত্রণালয় তার অধীনেই রেখেছিলেন

উনিশশো সাইত্রিশ সালের বঙ্গীয় আইন সভার নির্বাচনে জয়লাভ করে ফজলুল হক প্রধানমন্ত্রী হন। তিনি শিক্ষামন্ত্রণালয় তাঁর দায়িত্বে রাখেন। তিনি মুসলিম প্রাথমিক শিক্ষার উন্নতির জন্য মক্তবগুলোকে সম্পূর্ণভাবে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে রূপান্তরের উদ্যোগ নেন। উনিশশো আটত্রিশ সালে প্রাথমিক শিক্ষার নতুন পাঠ্যসূচি প্রকাশিত হয়। এই পাঠ্যসূচি সম্পূর্ণ ভিন্ন ছিল পূর্বের পাঠ্যক্রম থেকে। ফজলুল হকের সময়কালে মাধ্যমিক শিক্ষাকে কেন্দ্র করে বাংলার হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক পুনরায় অবনতির দিকে গিয়েছিল। মুসলিম সমাজে প্রাথমিক শিক্ষার কিছুটা সাফল্যের পর মধ্যশিক্ষার ব্যাপারটা চলে আসে। মধ্যশিক্ষার দায়িত্ব ছিল কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের হাতে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছিল বর্ণহিন্দুদের একচেটিয়া আধিপত্য। বর্ণহিন্দুদের নিয়ন্ত্রণ থেকে মাধ্যমিক শিক্ষাকে মুক্ত করার জন্য একটি ‘মাধ্যমিক শিক্ষা পর্ষদ’ গঠনের ব্যাপারে প্রধানমন্ত্রী ফজলুল হক একটি পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছিলেন। মাধ্যমিক শিক্ষাকে কলকাতা বিশ্বদ্যিালয়ের হাত থেকে একটি শিক্ষা পর্ষদের হাতে অর্পণ করার জন্য ইতিপূর্বেও বহুবার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সরকারের পক্ষ থেকে মাধ্যমিক শিক্ষা পর্ষদ গঠনের জন্য বারবার খসড়া প্রস্তাব কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠানো হলে বিশ্ববিদ্যালয় এর বিরোধিতা করে। যার ফলে উনিশশো বিশ সাল থেকে উনিশশো চল্লিশ সাল পর্যন্ত বাংলা সরকার অন্তত ছয়বার শিক্ষা পর্ষদ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়ে ব্যর্থ হয়। ফজলুল হক যখন মাধ্যমিক শিক্ষাকে নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি পর্ষদ গঠনের প্রস্তাব দেন বিশ্ববিদ্যালয়ের বর্ণহিন্দুরা সেটাকে সাম্প্রদায়িক প্রচেষ্টা বলে নিন্দা করেন।


তিনি মন্তব্য করেন যে, বর্ণহিন্দুগণ মোট জনসংখ্যার ষোল ভাগ, যাঁরা শূদ্রদের ছাত্রাবাসে আসন দেন না, তাঁরাই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্তৃত্ব করছেন


ফজলুল হক এই নিন্দার জবাবে বলেন, আঠারো বছর আগে স্যার আশুতোষ মুখোপাধ্যায় মাধ্যমিক শিক্ষাকে সুষ্ঠুভাবে পরিচালনার জন্য একটি মাধ্যমিক শিক্ষা পরিষদ গঠনের জন্য জোর সুপারিশ করেছিলেন। ভারতের অনেক বিশ্ববিদ্যালয় সে পরামর্শ অনুযায়ী মাধ্যমিক শিক্ষা পর্ষদ গঠন করেছে। কিন্তু নানা উদ্যোগ সত্ত্বেও বাংলায় এখন পর্যন্ত একটি স্থায়ী ও পূর্ণাঙ্গ মাধ্যমিক শিক্ষা পর্ষদ গঠন করা সম্ভব হয় নি। তিনি বলেন, কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষানীতি প্রণয়ন ও সংরক্ষণ এবং বিদ্যালয় ও মহাবিদ্যালয়ের মান নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারে অহেতুক কর্তৃত্ব স্থাপন করছে। প্রকৃত পক্ষে এটি প্রদেশের শিক্ষার অগ্রগতির পক্ষে প্রধান অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে। তিনি মন্তব্য করেন যে, বর্ণহিন্দুগণ মোট জনসংখ্যার ষোল ভাগ, যাঁরা শূদ্রদের ছাত্রাবাসে আসন দেন না, তাঁরাই কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্তৃত্ব করছেন। তিনি বলেন, বাংলার জনসংখ্যার বায়ান্ন শতাংশ মুসলমান এবং ত্রিশ শতাংশ তফসিলির পক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতি নির্ধারণে কোনো হাত নেই। ফজলুল হক মিথ্যা বলেন নি। বর্ণহিন্দুরা নিজেদের দাবি করতেন জাতীয়তাবাদী বলে এবং পশ্চাৎপদ মুসলমানরা নিজেদের স্বার্থে কিছু সংস্কার সাধন করতে চাইলেই সেটাকে তাঁরা সাম্প্রদায়িক বলেই বিবেচনা করতেন। পশ্চাৎপদ মুসলিমদের এগিয়ে আসার জন্য যে প্রচলিত নিয়ম-কানুনের কিছু কিছু সংশোধন করা প্রয়োজন এটা তাঁরা মানতে রাজি ছিলেন না।

বর্ণহিন্দুরা শুধু কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের নীতি নির্ধারণই করতেন না, পাঠ্যপুস্তক রচনায় সাম্প্রদায়িক বিভেদ সৃষ্টি করেছিলেন। মাধ্যমিক শিক্ষার পাঠ্য সম্পর্কে ‘আল এছলাম’ পত্রিকায় জনৈক ইদ্রিছ লেখেন যে, শ্রেণিকক্ষে যা পাঠদান করা হয় তার অধিকাংশই রামায়ণ মহাভারতের আজগুবি গল্পের ছায়াবলম্বনে রচিত এবং কতকটা বঙ্কিম প্রভৃতি মুসলিম-বিদ্বেষী সাহিত্যরথীগণের প্রবন্ধ থেকে উদ্ধৃত। তিনি আরো উল্লেখ করেন, হিন্দু ছাত্র ও শিক্ষকগণ কথায় কথায় মুসলিম ছাত্রদের ‘ম্লেচ্ছ’, ‘যবন’, ‘নেড়েমাথা’ প্রভৃতি অশালীন ভাষায় সম্বোধন করে থাকেন, যা খুবই অপমানজনক। মুসলমানরা কিন্তু প্রায়ই এ ধরনের অভিযোগ করতেন প্রচলিত বাংলা ভাষা, সাহিত্য ও কলিকাতা বিশ্বদ্যিালয়ের অনুমোদিত পাঠ্যপুস্তক সম্পর্কে। তাঁরা হিন্দুসংস্কৃতির প্রভাব ও অনুপ্রবেশের বিরুদ্ধে বারবার ক্ষোভ প্রকাশ করেছিলেন। সমসাময়িক ‘কোহিনূর’ পত্রিকায় লেখা হয়েছিল যে, বিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তকগুলি হিন্দুদের লিখিত বলে তার সবকিছুই হিন্দুভাবাপন্ন। বর্তমান বাঙলা সাহিত্য পাঠে মুসলমান ছাত্ররা স্বধর্ম বিষয়ে কিছু জ্ঞান তো লাভ করতেই পারে না, অধিকন্তু মুসলমানদের অযথা নিন্দাবাদ দেখে তারা মর্মাহত হয়।

বঙ্গীয় আইন সভার সদস্য আবুল হাসিম মুসলমানদের সম্পর্কে শিক্ষিত হিন্দুর মনোভাব বোঝাতে যে উদাহরণ দিয়েছিলেন তা খুবই গুরুত্ব বহন করে। তিনি অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘রাজকাহিনী’ থেকে একটি উদ্ধৃতি দেন, যা বিদ্যালয়ের পাঠ্য ছিল। রাজকাহিনীর উদ্ধৃতিটি হলো, ‘সেই অবসরে সুলতানের যত আমীর ওমরা লুঙ্গি ছেড়ে, দাড়ি ফেলে বিবি আর মুরগির খাঁচা নিয়ে রাতারাতি শহর ছেড়ে আজমিরের দিকে চম্পট দিল। সকালে পৃথ্বিরাজ টোডা দখল করে নিলেন।’ বীরের মতো পৃথ্বিরাজের দখল ও মুসলিমদের ভীতুর মতো পলায়নের এই সরল প্রকাশভঙ্গিটি হিন্দু শিক্ষার্থীর কাছে মজার মনে হতে পারে, কিন্তু মুসলমান শিক্ষার্থী এতে মজা না পেয়ে সঙ্গত কারণেই বিষণ্ন বোধ করবে। মুসলিম ছাত্রদের কাছে ব্যাপারটি লজ্জারও ছিল। সাম্প্রদায়িক মনোভাবের এরকম বহু উদাহরণ ছিল তখনকার পাঠ্যক্রমে। বাংলা তেরশো সাত সালে ‘নূর আল ইমান’ পত্রিকায় লেখা হয়, ‘সেই সকল পাঠশালায় যে সকল পুস্তক পড়ানো হয়, তাতে হিন্দুদের পৌরাণিক কাহিনী রাম-রাবণের যুদ্ধ, কুরু-পাণ্ডবের লীলা পড়তে হয়। সেই সাথে হিন্দুদের রীতিনীতি, আচার-ব্যবহার মুখস্থ করতে হয়। সেটুকুতেও নিস্তার নেই। কোমলমতি পাঠ্যপুস্তকে মুসলমানের নিন্দা, ইসলামি আচার-ব্যবহারের কুৎসা এবং মুসলিমদেরকে ম্লেচ্ছ, যবন ইত্যাদি সম্বোধনে ঘৃণা প্রদর্শন করা হয়ে থাকে।’ সে পত্রিকায় আরো লেখা হয়, ‘মুসলিমদের মধ্যে বাঙালী গ্রন্থকর্তা খুব বেশি নেই। যে দু-চারজন আছেন তাদের লিখিত গ্রন্থগুলি হিন্দু নির্বাচকদের বিচারে পাঠ্যপুস্তকের তালিকায় স্থান পায় না।’


ভারতবর্ষের ইতিহাস পাঠ করার পর ছাত্রেরা বুঝে নেয়, মুসলমান নিতান্ত অপদার্থ, অবিশ্বাসী, অত্যাচারী এবং নিষ্ঠুর জাতি। পৃথিবী থেকে তাদের লোপ হওয়াই মঙ্গল


বিভিন্ন পত্রিকায় মুসলমানরা এসব নিয়ে অভিযোগ তুললেন এবং লেখালেখি করলেন। উনিশশো তেত্রিশ সালে আকরম খাঁ তাঁর রচিত এক প্রবন্ধে পাঠ্যপুস্তকে মুসলিম ইতিহাসকে বিকৃত করার ব্যাপারে সমালোচনা করেন এবং পাঠ্যপুস্তক থেকে তা বাদ দিতে বলেন। বর্ণহিন্দুরা এসব ব্যাপারে গা করেন নি। বিদ্যালয়ের পাঠ্য ইতিহাস গ্রন্থ সম্পর্কে মুহম্মদ শহীদুল্লাহ লিখেছিলেন যে, পাঠ্য ইতিহাসে হিন্দু রাজাদের সম্বন্ধে অগৌরবজনক কথা প্রায় ঢেকে ফেলা হয়, আর মুসলমানদের বেলা ঢাকঢোল বাজিয়ে প্রকাশ করা হয়। মুসলমানদের গুণের কথা বড় একটা উল্লেখিত হয় না। ফল দাঁড়ায় এই, ভারতবর্ষের ইতিহাস পাঠ করার পর ছাত্রেরা বুঝে নেয়, মুসলমান নিতান্ত অপদার্থ, অবিশ্বাসী, অত্যাচারী এবং নিষ্ঠুর জাতি। পৃথিবী থেকে তাদের লোপ হওয়াই মঙ্গল।’ সিরাজী নামে আর এক ব্যক্তি বাংলা তেরশো তেইশ সালে ‘আল-এসলাম’ পত্রিকায় ‘ইতিহাস চর্চার আবশ্যকতা’ নামক প্রবন্ধে লেখেন, ‘আমাদের সন্তানেরা প্রায়শই মুসলমানবিদ্বেষী বিজাতীয় লেখকদের রচিত ইতিহাস মুসলমানদ্বেষী শিক্ষকদের নিকট পাঠ করে থাকে। এই সমস্ত ইতিহাসের যে কোনো একটি সামান্য পাঠ করলেই দেখা যাবে যে অত্যন্ত সাবধানতার সাথে মুসলিম আমলদারীর অংশ হতে গৌরবের কথাগুলি একেবারে চেঁচেমুছে ধুয়ে ফেলা হয়েছে। ফলতঃ বিদ্যালয়পাঠ্য ইতিহাস পাঠে মুসলমানের হিতের পরিবর্তে নিদারুণ বিপরীত ফল হচ্ছে।’

মুসলমান-সম্প্রদায়ের অভিযোগের যথেষ্ট ভিত্তি ছিল। মুসলমানদের এসব অভিযোগে বা প্রতিক্রিয়ায় শিক্ষিত হিন্দুসম্প্রদায় যথেষ্ট সহানুভূতিশীল মনোভাবের পরিচয় দিতে পারেন নি। মাধ্যমিক শিক্ষার পাঠ্যপুস্তকে হিন্দুধর্মের বিবিধ বিষয় অন্তর্ভুক্ত হওয়ায় মুসলিম পিতা-মাতা তাঁদের সন্তানদের শিক্ষালাভের জন্য মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পাঠাতে চাইতেন না। বড়জোর তাঁরা মাদ্রাসায় পাঠাবার কথা ভাবতেন। মুসলমানদের কাছে যেমন এসব গ্রন্থ গ্রহণীয় ছিল না, খুব গভীরভাবে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে গ্রন্থের বিষয়বস্তুগুলি সাধারণ হিন্দুদের পক্ষেও যায় না। কারণ পৌরাণিক কাহিনির মূল চরিত্ররা ছিলেন ব্রাহ্মণ। হিন্দুদের প্রাচীন ধারাগুলি প্রাথমিক শিক্ষার অন্তর্ভুক্ত করে বর্ণহিন্দুরা জাতপাতের প্রসারে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছিলেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের বা সমাজের বর্ণহিন্দুরা এ ধরনের গ্রন্থ রচনাকে সাম্প্রদায়িক মনে করতেন না। বরং বহু সময় এসবের পক্ষ নিয়েই কথা বলতেন। যেমন ‘অমৃতবাজার’ পত্রিকার এক সম্পাদকীয়তে লেখা হয়েছিল, ‘মনে রাখতে হবে বাংলা ভাষা অন্য অনেক ভাষার মতো সংস্কৃত ভাষা থেকে উৎপন্ন। অতএব স্বাভাবিকভাবেই বাংলা ভাষা এই জননী ভাষার দ্বারা প্রভুত পরিমাণে প্রভাবিত—শুধু শব্দে নয়, সাধারণ চরিত্র ও ভঙ্গিতে। আমাদের মুসলমান বন্ধুরা যারা প্রধানত হিন্দু থেকে ইসলামে ধর্মান্তরিত তাঁদের এতে ক্ষুব্ধ হওয়ার বা তাদের ধর্ম ও সংস্কৃতিকে অবজ্ঞা করা হচ্ছে এটা মনে করার কারণ নেই।’ মুসলমানদের ক্ষুব্ধ হতে না বলেই তাঁরা তাঁদের দায়িত্ব পালন করলেন। কিন্তু ক্ষুব্ধ হবার কারণগুলি বা সমস্যার সমাধানের কথা ভাবলেন না। ফজলুল হক সে কারণেই মাধ্যমিক শিক্ষা পর্ষদ গঠনে উদ্যোগী হয়ে ছিলেন। তিনি বুঝতে পারছিলেন, তা না করা গেলে পাঠ্যপুস্তকের সমস্যা সমাধান করা সম্ভব নয়।


শেষ কিস্তির লিংক