হোম নির্বাচিত বাংলার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার পাঠ্যপুস্তকে হিন্দু-মুসলিম প্রসঙ্গ এবং দেশভাগ

বাংলার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার পাঠ্যপুস্তকে হিন্দু-মুসলিম প্রসঙ্গ এবং দেশভাগ

বাংলার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার পাঠ্যপুস্তকে হিন্দু-মুসলিম প্রসঙ্গ এবং দেশভাগ
588
0
দ্বিতীয় কিস্তির লিংক


তৃতীয় কিস্তি


বাংলার ‘নবজাগরণ’-এর মতাদর্শগত ভিত্তি কখনোই ধর্মনিরপেক্ষ বা অসাম্প্রদায়িক ছিল না


যাঁরা সনাতন হিন্দু ঐতিহ্যের ধারক ছিলেন তাঁরাও পাশ্চাত্যের শিক্ষার প্রতি গুণমুগ্ধ ছিলেন। আবার যাঁরা মনে করতেন পাশ্চাত্য শিক্ষার প্রসার ছাড়া ভারতীয়রা সুসভ্য জাতি হিসেবে গড়ে উঠতে পারবে না, তাঁরাও জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রাচীন হিন্দু শাস্ত্রগুলিকে আঁকড়ে ধরেছিলেন। মুসলমানদের চিন্তা-ভাবনা ও সংস্কৃতির সেখানে কোনো স্থান ছিল না। বিরাট এক জনগোষ্ঠীকে তাঁরা সম্পূর্ণ ছুড়ে ফেলে দিলেন। বাংলার এইসব বুদ্ধিজীবী সম্পর্কে অমলেশ ত্রিপাঠী বলেছিলেন, ‘পশ্চিম তাঁদের বিভ্রান্ত করেছিল এবং প্রাচ্য তাঁদের সামনে ছলনাময় মরীচিকার সৃষ্টি করেছিল।’ ইংরেজ লেখকেরা প্রচার করতে শুরু করেছিলেন যে, বাংলাদেশে তাঁরা মধ্যযুগীয় মুসলমানের অত্যাচারের অবসান ঘটিয়ে একটি জ্ঞানদীপ্ত শাসন প্রতিষ্ঠা করেছেন। বাংলার বুদ্ধিজীবীরা বহুকাল ইংরেজ শাসকদের এই একই বক্তব্য ধার করে প্রচার করে গেছেন। তাঁরা বলতে চেয়েছেন, মুসলমানদের শাসন ছিল বাংলার জন্য অন্ধকার যুগ—ইংরেজ শাসকরা সমাজের সে অন্ধকার দূর করে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করেছে। সুতরাং বাংলার ‘নবজাগরণ’-এর মতাদর্শগত ভিত্তি কখনোই ধর্মনিরপেক্ষ বা অসাম্প্রদায়িক ছিল না।

বাংলার তথাকথিত নবজাগরণ বাংলার কোন কোন শ্রেণির মানুষকে লাভবান বা আলোকিত করেছিল সে সম্পর্কে জওহরলাল নেহরু বলেছিলেন, ‘ইংরেজ শাসনের ফলে কৃষকেরা দুর্ভিক্ষ ও লুণ্ঠনের শিকার হয়েছিল। কারিগর সম্প্রদায় প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছিল। ঐতিহ্যগত পুরাতন সমাজের সামন্ত-শ্রেণির পরিবর্তে নয়া ভূস্বামীশ্রেণির সৃষ্টি হয়েছিল। তাছাড়া পুরানো সমাজের কাঠামো ও ভিত্তি ভেঙে পড়ার পর নতুন নতুন শ্রেণি ও গোষ্ঠীর উত্থান ঘটেছিল। এঁদের মধ্যে কেউ ছিলেন ব্রিটিশ বাণিজ্যের সহায়ক দালাল, আবার কেউ ছিলেন ইংরেজি-শিক্ষিত সরকারি কর্মচারী ও পেশাজীবী মানুষ। এইসব শ্রেণির অনুপ্রেরণার উৎস ছিল ইংরেজ প্রতিষ্ঠানগুলি।’ তিনি স্পষ্টই বলেছিলেন যে, ইংরেজ শাসনের জ্ঞানদীপ্তি কেবলমাত্র বাঙালি হিন্দুদের উপরই প্রতিফলিত হয়েছিল। আপামর হিন্দু জনসাধারণের উপর এর কোনো প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ে নি এবং হিন্দু নেতারা এদের ব্যাপারে প্রায় কোনো চিন্তাই করেন নি। বাংলার নবজাগরণে যাঁরা শামিল হয়েছিলেন তাঁদের সঙ্গে গ্রামের ও শহরের হাজার হাজার দরিদ্র মেহনতি মানুষের কোনো সংশ্রব ছিল না। দরিদ্র মানুষের সন্তানদের শিক্ষাদীক্ষা নিয়ে কখনো তাঁদের মাথাব্যথা ছিল না।

WP_20150306_007
ঢাকা থিয়েটারের সেমিনার

শিক্ষা বিষয়ক গবেষক পরমেশ আচার্য লিখেছেন, ‘শিক্ষার সঙ্গে সাম্প্রদায়িক রাজনীতির সম্পর্ক আপাতদৃষ্টিতে অসঙ্গত মনে হলেও বিশ শতকের অবিভক্ত বাংলায় শিক্ষা বিস্তারের সঙ্গে শিক্ষিত হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে বিবাদী সাম্প্রদায়িক মনোভাবের প্রসার বিশেষভাবে লক্ষণীয়।’ তিনি দেখিয়েছেন যে, শিক্ষার সঙ্গে সাহিত্য-সংস্কৃতি, রাজনীতি-অর্থনীতির যে সম্পর্ক তাই সাম্প্রদায়িক বিভেদের অন্যতম কারণ। তিনি চমৎকারভাবে বিষয়টি বিশ্লেষণ করেছেন। হিন্দু-মুসলিম লড়াইয়ে অন্যতম একটি কারণ ছিল শিক্ষায় আধিপত্য বিস্তার। হিন্দু সম্প্রদায়ের ভদ্রলোকরা যখন ইংরেজ শাসনে শিক্ষাদীক্ষায় এগিয়ে গেলেন এবং বিদ্যালয়ের জন্য তাঁদের অনেকে পাঠ্য বই লিখতে শুরু করলেন, দেখা গেল সেই পাঠ্য বইয়ে হিন্দুদের সংস্কৃতি বা হিন্দুধর্মের বহুকিছু স্থান পেল। হিন্দু এই ভদ্রলোকেরা গ্রন্থ লিখবার সময় এ কথা ভাবেন নি যে, বাংলার একটি বড় সম্প্রদায় হচ্ছে মুসলমান। হিন্দুদের দেবদেবী বা হিন্দুদের আচার-অনুষ্ঠানকে গ্রন্থে স্থান দিলে তা ধর্মনিরপেক্ষ রচনা হবে না। মুসলমানদের আত্মমর্যাদায় স্বভাবতই তা ঘা দেবে এবং মুসলমানরা এক ধরনের বিদ্বেষ পোষণ করবে। কিন্তু সমাজে ও রাষ্ট্রে হিন্দু ভদ্রলোকদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কারণেই সাধারণ হিন্দুকে তাঁরা যেমন অগ্রাহ্য করেছেন, একইভাবে বিরাট সংখ্যক মুসলমানদের ভালোমন্দ নিয়ে তাঁদের মাথা ব্যথা ছিল না।


ইংরেজ শাসনে যাঁরা পাশ্চাত্যের জ্ঞানবিজ্ঞানে আলোকিত হয়ে সমাজের কুসংস্কার দূর করতে চেয়েছিলেন, বাংলার দুর্ভাগ্য যে তাঁদের নানা ভুল চিন্তার কারণেই সাম্প্রদায়িক চিন্তার বিকাশ ঘটল


শিক্ষার প্রশ্নে যে সাম্প্রদায়িক রাজনীতি তার প্রকৃতি বুঝতে গেলে এটা বুঝতে হবে, শিক্ষা কখনো সংস্কৃতি-নিরপেক্ষ হয় না। শিক্ষার সঙ্গে বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সংস্কৃতির সম্পর্ক অত্যন্ত নিবিড় ও জটিল। শিক্ষার সাথে সম্পর্কিতরা সেখানে অসাম্প্রদায়িক মনোভাব দেখাতে না পারলে সম্প্রদায়ে-সম্প্রদায়ে বিরোধ বাড়বেই। যখন পাঠশালা শিক্ষা ছিল, পাঠশালার কমবয়সী শিশুদের জন্য ইতিহাস বা ধর্মশিক্ষার ব্যাপার ছিল না। দৈনন্দিন জীবনের প্রয়োজনে পাঠশালার শিক্ষাক্রম রচিত হয়েছিল। পাঠশালা শিক্ষায় ছাত্র এবং শিক্ষকদের একটা বড় অংশই ছিলেন হিন্দু। মুসলমান ছাত্র সে তুলনায় খুবই কম ছিল। অথচ পাঠশালার পাঠ্যক্রমে মুসলমানদের হেয় করা বা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করার মতো কারণ ঘটে নি। পাঠশালা শিক্ষার একটি বড় দিক ছিল, এখানে শাসকদের নিয়ন্ত্রণ বা প্রভাব ছিল না। শিক্ষকেরও শাসকবৃন্দকে খুশি করার জন্য গ্রন্থ লেখার প্রয়োজন পড়ে নি। শাসকদের মধ্যেও তখন সাম্প্রদায়িক মনোভাব ছিল না।

মুসলিমদের শাসনে দেখা গেছে হিন্দুরাই শাসনকার্যের সব বড় বড় পদে আসন রয়েছেন। ধর্মের কারণে নয়, সরকারের পদ মিলত যোগ্যতার মাপকাঠিতে। বলতে গেলে সে সময়টা ছিল ধর্মীয় নানা কু-সংস্কারে প্রভাবিত এবং সকলেই নিজ নিজ ধর্মের বিভিন্ন অনুষ্ঠানগুলি পালন করত। ধর্মের বাড়াবাড়ি থাকলেও সাম্প্রদায়িক দৃষ্টিভঙ্গির দেখা পাওয়া যায় নি। বাংলায় এই সাম্প্রদায়িক মনোভাবের সৃষ্টি হয় ইংরেজ শাসনে এবং হিন্দু জাতীয়তাবাদের পুনর্জাগরণের মধ্য দিয়ে। ইংরেজ শাসনের পূর্বে হিন্দু মুসলমানরা নিজ নিজ ধর্মের প্রতি অন্ধ বা অনুগত ছিলেন, কিন্তু একে অপরের প্রতি সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষ পোষণ করেন নি। ইংরেজ শাসনে যাঁরা পাশ্চাত্যের জ্ঞানবিজ্ঞানে আলোকিত হয়ে সমাজের কুসংস্কার দূর করতে চেয়েছিলেন, বাংলার দুর্ভাগ্য যে তাঁদের নানা ভুল চিন্তার কারণেই সাম্প্রদায়িক চিন্তার বিকাশ ঘটল। এর প্রথম সূত্রপাত হলো ইংরেজদের শিক্ষাব্যবস্থাকে কেন্দ্র করে এবং পাঠ্যক্রম রচনার মধ্য দিয়ে। বাংলার প্রাথমিক শিক্ষার পাঠ্যক্রমকে ঘিরে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে যে সাম্প্রদায়িক প্রশ্ন আলোড়িত হচ্ছিল, তা আরো বেগবান হলো লর্ড কার্জনের বঙ্গভঙ্গকে ঘিরে। ইংরেজরা তাদের রাজনৈতিক সুবিধা লাভ ও হিন্দু-মুসলিম বিদ্বেষ বাড়িয়ে তোলার জন্য বিশ শতকের শুরুতেই বঙ্গভঙ্গের প্রস্তাব রাখে।

Capture
জর্জ ন্যাথানিয়েল কার্জন (১৮৫৯-১৯২৫)

সন্দেহ নেই, বাংলা প্রদেশকে প্রশাসনিক স্বার্থে ছোট করা দরকার ছিল। কিন্তু লর্ড কার্জন সেই সাথে একটি রাজনৈতিক চাল চাললেন। তিনি বাংলাকে বিশেষ একটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে দ্বিখণ্ডিত করতে চাইলেন। এ সম্পর্কে তিনি লিখেছিলেন, ‘বাঙালিরা নিজেদের একটি মহান জাতি বলে মনে করে। তারা এমন একটি ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখে, যখন দেশ থেকে ইংরেজ বিতারিত হবে, কলকাতার কোনো এক বাবু তখন লাটসাহেবের প্রাসাদের ক্ষমতা অধিকার করবে। সুতরাং বঙ্গভঙ্গের পরিকল্পনা গ্রহণ না করলে ভারতবর্ষের এমন একটি শক্তিকে সংহত ও সুদৃঢ় করা হবে।’ যদি কার্জনের মনে রাজনৈতিক দুরভিসন্ধি না থাকত তাহলে প্রশাসনিক স্বার্থে বাংলা প্রদেশের আয়তন কমাবার জন্য জাতীয় কংগ্রেসের অন্যতম নেতা হেনরি কটনের প্রস্তাব তিনি গ্রহণ করতেন। কটনের প্রস্তাব ছিল, হিন্দিভাষী বিহার ও ওড়িয়াভাষী উড়িষ্যাকে বাংলা থেকে পৃথক করে শাসনতান্ত্রিক সমস্যা সমাধানে একটি পদক্ষেপ নেয়া হোক। কটন যুক্তি দেখিয়েছিলেন যে, তাঁর প্রস্তাব মেনে নিলে বাঙালিদের সংহতি রক্ষা করা সম্ভব হবে। কিন্তু লর্ড কার্জন তো বাঙালি জাতির মধ্যে সংহতি চান নি। বহুদিন ধরে বাঙালি হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে যে সাম্প্রদায়িক বিভাজন লক্ষ্ করা গিয়েছিল কার্জন তা বাড়িয়ে তুলতেই চাইলেন।

বাংলা প্রদেশের উচ্চবর্ণের হিন্দুরা কিছুতেই এই বিভক্তি বা বাংলা ভাগ মেনে নিতে চান নি। বাংলা প্রদেশের সুবিধাভোগীদের অনেকেরই জমিদারি ছিল পূর্ববঙ্গে এবং তাঁদের কৃষকরা ছিলেন অধিকাংশ পূর্ববঙ্গের মুসলমান। জমিদাররা উপলব্ধি করলেন এই বিভক্তির ফলে মুসলিম প্রজাদের উপর তাঁদের প্রভাব প্রতিপত্তি কমে যাবে। দ্বিতীয়ত, শিক্ষিত বাঙালি হিন্দুদের উল্লেখযোগ্য একটি পেশা ছিল আইনব্যবসা আর তাঁদের মক্কেলদের একটি অংশ ছিল পূর্ববঙ্গের মুসলমান। বাংলাভাগের কারণে তাঁরা বুঝতে পারছিলেন যে, অচিরেই পূর্ববঙ্গের মক্কেলরা রাজধানী ঢাকা ছেড়ে তাঁদের কাছে আসা বন্ধ করবে। স্বভাবতই বাংলা বিভক্তি নিজ স্বার্থেই তাঁদের পক্ষে মেনে নেওয়া সম্ভব ছিল না। পূর্ববঙ্গের মুসলমানরা প্রথমে বঙ্গভঙ্গকে মেনে নিতে চান নি। কিন্তু যখন মুসলমানরা, বিশেষ করে মধ্যবিত্ত মুসলমানরা বঙ্গভঙ্গের মধ্যে তাঁদের অর্থনেতিক স্বার্থ দেখতে পেলেন তখন বঙ্গভঙ্গকে তাঁরা অনেকেই স্বাগত জানালেন। শিক্ষিত হিন্দুদের যেমন স্বার্থ ছিল বাংলাকে একত্রিত রাখার মধ্যে, মুসলিম মধ্যবিত্তদের স্বার্থ তেমনি দেখা গেল বাংলাকে দ্বিখণ্ডিত করার মধ্যে। সত্যিকারভাবেই এটা ছিল এক ঐতিহাসিক বাস্তবতা। ব্যাপারটার মধ্যে প্রথমে সাম্প্রদায়িক বিভেদ ছিল না, ছিল উচ্চবর্ণের হিন্দু এবং মধ্য ও নিম্নমধ্যবিত্ত মুসলমানের অর্থনৈতিক স্বার্থ।


যদি শিক্ষিত হিন্দুরা পূর্ব থেকেই মুসলমানদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলতেন, মুসলিমরা তাহলে বঙ্গভঙ্গ রদ করাটাকে তাঁদের কর্তব্য বলে মনে করতেন


মুসলিমদের হাত থেকে বাংলার ক্ষমতা ইংরেজদের কাছে চলে যাবার পর সুবিধাভোগী মুসলমানরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছিলেন। বিচার বিভাগ ও সামরিক বাহিনীতে তাঁদের প্রাধান্য কমে যায়। ব্রিটিশ সরকার নিজস্ব থানা, পুলিশ, বিচার-ব্যবস্থা, রাজস্ব-ব্যবস্থা এবং সেনাবাহিনীর প্রবর্তন করলে মুসলিম অভিজাতরা সেখান থেকেও বাদ পড়তে থাকেন। পূর্বের মর্যাদার আসন থেকে তাঁরা স্বাভাবিক নিয়মেই ছিটকে পড়েন। মুসলিম শাসনে বাংলার সমাজব্যবস্থায় মুসলিমদের শেকড় ছিল অনেকটা পরগাছার মতো। বিশেষ করে অভিজাত মুসলিমদের শেকড় শক্তভাবে ভূমিতে প্রথিত ছিল না, ছিলো মুসলিম শাসকদের দয়ার উপর নির্ভরশীল। বাংলার অভিজাত মুসলমানরা শাসকদের মুখাপেক্ষী হয়ে থাকার কারণেই, মুসলিমদের হাত থেকে ক্ষমতা চলে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁরা নতুন সমাজ-কাঠামোর মধ্যে দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন। নিজেদেরকে শক্তিশালী অবস্থায় টিকিয়ে রাখার সুযোগ তাঁদের ছিল না। যদি তাঁরা ব্যবসা-বাণিজ্য এবং প্রশাসনের সাথে হিন্দুদের মতো আগে থেকেই যুক্ত থাকতেন তাহলে ইংরেজ শাসনে তাঁদের অস্তিত্ব দ্রুত নড়বড়ে হয়ে যেত না। বাংলায় হিন্দুদের শেকড় ছিলো হাজার বছর ধরে বহুদূর পর্যন্ত বিস্তৃত। মুসলমানদের শেকড় সেভাবে বিস্তৃত হবার অাগেই ইংরেজরা ক্ষমতা দখল করে নিল। ইতিহাসের অনিবার্যতায় মুসলমানরা হিন্দুদের চেয়ে অনেক পিছিয়ে পড়েছিলেন।

ইংরেজ শাসনের দেড়শো বছরে শাসকশ্রেণির অংশ হিসেবে পিছিয়ে পড়া মুসলমান সম্প্রদায়ের প্রতি বর্ণহিন্দুরা এবং নব্যশিক্ষিত বাবুরা সামান্যতম সম্মান বা সহানুভূতি দেখাবার প্রয়োজন বোধ করেন নি। অথচ বঙ্গভঙ্গের সময় নিজেদের স্বার্থে বঙ্গভঙ্গ রদ করতে মুসলামানদের সমর্থন আশা করে বসলেন। মুসলমানদের প্রতি তাঁদের দীর্ঘকালের অবহেলা ও অসঙ্গত ব্যবহার তাঁরা স্মরণেই আনলেন না। দরিদ্র মুসলমানদের কাছ থেকে তাঁরা শুধু আনুগত্যই আশা করতেন। মুসলমানদের প্রতি তাঁদের দায় পালনের কথা ভাবনায় আসত না। বঙ্গভঙ্গের মধ্যে পিছিয়ে পড়া মুসলমানরা তাঁদের স্বার্থ দেখতে পেলেন। সেটা কোনো হিন্দুবিদ্বেষ নয়, নিজেদের আর্থিক উন্নতির দিকটাই শুধু তাঁরা বিবেচনায় রাখলেন। যদি শিক্ষিত হিন্দুরা পূর্ব থেকেই মুসলমানদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলতেন, মুসলিমরা তাহলে বঙ্গভঙ্গ রদ করাটাকে তাঁদের কর্তব্য বলে মনে করতেন। বর্ণহিন্দুরা প্রথম যা করেছিলেন—নিজেদের উন্নতির জন্য শাসকদের পদলেহন বা আপোস, বাংলার শিক্ষিত মুসলমানরা এবার সেই পথই ধরলেন। নিজেদের উন্নতির জন্য শাসকদের সাথে আপোস করলেন। নিজেদের উন্নতির এরকম সুযোগ তাঁরা হেলায় হারাতে চাইলেন না।

পূর্ব বাংলা গঠন বা বাংলাকে ভাগ করা ইংরেজদের চাল হলেও সুবিধাবঞ্চিত মুসলমানরা এটাকে সমর্থন করলেন। পূর্ব বাংলার সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থেই বাংলা বিভাগের পক্ষে ছিলেন। বঙ্গভঙ্গ বা নতুন প্রদেশের সৃষ্টি কিন্তু মুসলমানদের আন্দোলনের ফলে হয় নি। মুসলিমরা কখনো এরকম কোনো দাবিও তোলেন নি। কিন্তু বঙ্গভঙ্গ যখন ঘটেই গেল, মুসলমানরা এর সুবিধাগুলি বুঝতে পারলেন। পূর্ব বাংলার নতুন প্রদেশ মুসলিম মধ্যবিত্তের মনে নতুন আশার সঞ্চার করেছিল। তাঁদের কাছে হিন্দুদের সাথে প্রতিযোগিতায় না গিয়েও সরকারি চাকরি, আইন-ব্যবসা ও রাজনৈতিক কর্মজীবনে সফল হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিল। ইতিমধ্যেই পাটচাষকে কেন্দ্র করে মুসলমানদের মধ্যে মধ্যবিত্তশ্রেণির বিকাশ আরম্ভ হয়েছিল। লর্ড কার্জনের সময় প্রাথমিক শিক্ষার কিছুটা প্রসার ঘটে। সারাদেশ জুড়ে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনও এসময়ে আরম্ভ হয়। বিশেষ করে বাংলায় বঙ্গভঙ্গকে ঘিরে স্বদেশি আন্দোলন দানা বাধতে থাকে। বিপিনচন্দ্রপাল, অরবিন্দ ঘোষ ও ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায়ের নেতৃত্বে দ্রুত এরপর চরমপন্থি আন্দোলন বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ে।


স্বদেশি আন্দোলনের গোটা চরিত্রটাই ছিল সাম্প্রদায়িক


বাংলার স্বদেশি আন্দোলন ভারতের জাতীয় আন্দোলনকে এক নতুন স্তরে উন্নীত করেছিল। কিন্তু স্বদেশি আন্দোলনের গোটা চরিত্রটাই ছিল সাম্প্রদায়িক। স্বদেশি যুগে চরমপন্থিরা ‘মাতৃ মতবাদ’, ‘কৃষ্ণ মতবাদ’ ইত্যাদি প্রচার করে ধর্মভিত্তিক রাষ্ট্রদর্শন সৃষ্টি করেছিলেন। হিন্দুধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক আবেদনে হিন্দুসমাজ সাড়া দিয়েছিল। মুসলমানদের সাড়া দেয়ার কোনো উপায়ই ছিল না। ঢাকা অনুশীলন সমিতির প্রখ্যাত নেতা পুলিন দাস লিখেছেন যে, নিয়ম করলাম সমিতিতে মুসলমানদের নেওয়া হবে না। বঙ্গদেশে চরমপন্থি রাজনীতি ও কর্মপদ্ধতি প্রচার করেছিলেন যে তিনজন—বিপিনচন্দ্র পাল, অরবিন্দ ঘোষ ও ব্রহ্মবান্ধব উপাধ্যায়—এঁরা প্রত্যেকেই বৈদিক যুগ, প্রাচীন ভারতের দর্শন, নীতিশাস্ত্র ও বর্ণাশ্রয়ী সমাজবিন্যাস দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। চরমপন্থি দলের সদস্য জীবনতারা হালদার লিখেছেন যে, সমিতির প্রত্যেক সদস্যের গীতা পাঠ ছিল বাধ্যতামূলক। সদস্যদের নৈতিক উন্নয়নের জন্য প্রতি রবিবার বিকেলে রামায়ণ, মহাভারত, চণ্ডী, গীতা প্রভৃতি ব্যাখ্যা করা হতো। চরমপন্থি প্রতুলচন্দ্র গাঙ্গুলী লিখেছেন, বাংলার বিপ্লবীদের বিপ্লব-সাধনার ভিত্তিই ছিল স্বামী বিবেকানন্দের বাণী, ভগবদগীতা ও বঙ্কিমের রচনা।

বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং স্বামী বিবেকানন্দের প্রভাব বঙ্গের চরমপন্থি চিন্তাধারায় গভীরভাবে পরিলক্ষিত হয়। বিশেষ করে বঙ্কিমের ‘আনন্দমঠ’ উপন্যাস চরমপন্থী আন্দোলনকে নানাভাবে দিক-নির্দেশনা দেয়। চরমপন্থিদের ধর্মাশ্রয়ী রাজনীতি ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির বুনিয়াদকে যথেষ্ট দুর্বল করেছিল। বাংলায় মুসলিমদের অস্তিত্ব, মুসলমানদের অবদান এবং মুসলমান কৃষকদের সম্পর্কে ভালোমন্দ চিন্তা তাঁদের কারো মাথার মধ্যে রইল না। সাধারণ মুসলমানদের যদি তাঁরা মানুষ হিসেবে গণ্য করতেন তাহলে কখনো জেনে শুনে স্বদেশি আন্দোলনে গীতাকে প্রাধান্য দিতেন না। সাধারণ মুসলমানরা উচ্চবর্ণের দ্বারা দুভাবে নিগৃহীত হলেন। প্রথমবার নিম্নবর্গের বলে তাঁরা সাধারণ হিন্দুদের সাথে মিলিতভাবে নিগৃহীত হলেন, দ্বিতীয়বার নিগৃহীত হলেন মুসলমান বলে। ভারতীয় হিসেবে তাঁদের সামান্য সম্মান দেখানো বা তাঁদের অস্তিত্বকে মূল্যায়ন করাই হলো না। মুসলমানদের বাদ দিয়ে জাতীয় মুক্তি আন্দোলন করার সহজ অর্থ দাঁড়ায়, মুসলমানদেরকে জাতীয় আন্দোলন থেকে দূরে সরিয়ে দেয়া।

বঙ্গভঙ্গকে বিরোধিতা করে যে বয়কট ও স্বদেশি আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, সেই আন্দোলনে মুসলিম সম্প্রদায়ের ভূমিকা কী ছিল? সুকান্ত পাল লিখেছেন, মুসলিম লীগ-পন্থিরা বঙ্গভঙ্গকে সমর্থন করেছিল এ কথা ধরেই নেয়া যায়। কিন্তু ভারতের বা বাংলার সব মুসলমানই তো আর মুসলিম লীগ-পন্থি ছিলেন না। মুসলমান মাত্রই বঙ্গভঙ্গ চেয়েছিলেন, ব্যাপারটা তা ছিল না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত দেখা গেল মুসলিম সমাজের এক বিশাল অংশ স্বদেশি আন্দোলনের বিপক্ষে চলে গেলেন। কেন এরকম হলো? সব মুসলমান মুসলিম লীগ-পন্থি ছিলেন না বা সাম্প্রদায়িকতার পথে হাটেন নি, তবে কেন এরকম ঘটনা ঘটল? সুকান্ত পাল দেখাচ্ছেন যে, ‘স্বদেশী আন্দোলনের ফলে বিদেশী দ্রব্য বর্জন করা হয় এবং সে স্থলে স্বদেশী দ্রব্য ব্যবহার করার ব্যবস্থা করা হয়। কিন্তু এতে অর্থনৈতিকভাবে কি হিন্দু কি মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের নিম্নশ্রেণীর মানুষ অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাদের পক্ষে সম্ভব হয় নি কম দামের বিদেশী দ্রব্য বর্জন করে বেশী দামী স্বদেশী দ্রব্য গ্রহণ করা। পূর্ব বাংলার নতুন প্রদেশে মুসলিম সংখ্যাধিক্য প্রাধান্য পাবে এই আশঙ্কায় নিম্নশ্রেণীর হিন্দুরা অর্থনৈতিক পীড়নকে সহ্য করেও স্বদেশী আন্দোলনের বিরোধিতা করেন নি। কিন্তু অন্যদিকে মুসলিম সমাজের কিছু হারানোর ভয় ছিল না। তাই তারা প্রবলভাবে স্বদেশী আন্দোলনের বিরোধিতা করে। বাঙালী হিন্দুরা স্বদেশী আন্দোলনের নামে দরিদ্র ও সরল মুসলমানদের নিপীড়ন করেন, তারা বিলাতি যন্ত্র, চিনি ও লবণ নষ্ট করে ফেলায় মুসলমানদের অনেক বেশি দামে এইসব জিনিস কিনতে হয়। বাধ্য হয়েই এই কষ্ট স্বীকার তাদের করতে হয়। কিন্তু আর কতকাল মুসলমানেরা এই দুর্ভোগ ভুগবেন।’


মুসলমানরা যেমন, নিম্নবর্ণের হিন্দুরা তেমনি উচ্চবর্ণের স্বদেশি আন্দোলনকে মোটেও সমর্থন করেন নি, বরং উল্টো এই আন্দোলনের বিরোধিতা করেছিলেন


স্বদেশি আন্দোলনে জোর করে হিন্দু লাইন মুসলমান কৃষকদের অনুসরণ করতে বাধ্য করার ফলেই কুমিল্লা, ত্রিপুরার মগরা ও ছাতিয়ারা, ময়মনসিংহের জামালপুরে, দেওয়ানগঞ্জ ও বখশিগঞ্জে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা বাঁধে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর ‘ঘরে বাইরে’ উপন্যাসে এই সত্যকেই উদ্ঘাটন করেছেন ইতিহাসের চোখ দিয়ে। হিন্দু লাইন অনুসরণ করতে গিয়ে শুধুমাত্র কি মুসলমানদেরই অর্থনৈতিক অসুবিধায় পড়তে হয়েছিল? না, মুসলমানরা এককভাবে এই অসহায়তার শিকার হন নি। হিন্দু কৃষক বা দরিদ্র জনগণও এই স্বদেশি আন্দোলনে সমানভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হন। স্বদেশিরা মুসলমানদের ক্ষতি করবার কথা ভেবে এই আন্দোলন শুরু করেন নি। সাধারণ দরিদ্র মানুষের যে ক্ষতি সাধিত হয়েছিল স্বদেশি আন্দোলনের ফলে, সেটা তাদের রাজনীতির ভুলের কারণে, সাম্প্রদায়িক মনোভাবের কারণে নয়। স্বদেশি আন্দোলনের উপর তাই দরিদ্র হিন্দুরাও চড়াও হয়েছিলেন। মুসলমানদের মতো হিন্দু সমাজের নিম্নশ্রেণি বিশেষ করে পূর্ব বাংলার এক বৃহৎ অঞ্চলের নমঃশূদ্রগোষ্ঠী উচ্চবর্ণের হিন্দুদের প্রতি ছিল বিরূপ। মুসলমানরা যেমন, নিম্নবর্ণের হিন্দুরা তেমনি উচ্চবর্ণের স্বদেশি আন্দোলনকে মোটেও সমর্থন করেন নি, বরং উল্টো এই আন্দোলনের বিরোধিতা করেছিলেন।

রবীন্দ্রনাথ সে প্রসঙ্গে লিখেছেন, ‘বাংলাদেশের অনেক স্থানে এক ফরাসে হিন্দু-মুসলমান বসে না—ঘরে মুসলমান আসিলে জাজিমের এক অংশ তুলিয়া দেওয়া হয়, হুঁকার জল ফেলিয়া দেওয়া হয়। তর্ক করিবার বেলায় বলিয়া থাকি, কী করা যায়, শাস্ত্র তো মানিতে হইবে। অথচ শাস্ত্রে হিন্দু-মুসলমান সম্বন্ধে পরস্পরকে এমন করিয়া ঘৃণা করিবার তো কোনো বিধান দেখি না। যদি-বা শাস্ত্রের বিধানই হয় তবে শাস্ত্র লইয়া স্বদেশ-স্বজাতি-স্বরাজের প্রতিষ্ঠা কোনোদিন হইবে না।’ তিনি আরো লিখেছেন, ইংরেজি-শিক্ষিত শহরের লোক হঠাৎ গ্রামে গিয়ে নিরক্ষর লোককে ‘ভাই’ বললে তারা কথাটার মানে বুঝতে পারে না। যাদেরকে ‘চাষার বেটা’ বলে এতকাল অবহেলা করা হয়েছে, যাদের সুখদুঃখের মূল্য এতকাল শিক্ষিত লোকদের কাছে ছিল না, যাদের সুদিনে দুর্দিনে শহরের লোকরা ছায়া মাড়ায় নাই—হঠাৎ আজ ইংরেজদের প্রতি স্পর্ধা প্রকাশ করার স্বার্থে তাদের সাথে ভাই সম্পর্ক পাতাতে গেলে সন্দেহ জাগবেই। বিখ্যাত স্বদেশীর বক্তৃতা শুনে পূর্ববঙ্গের মুসলমান শ্রোতারা পরস্পর বলাবলি করছিল ‘বাবুরা বোধহয় বিপদে পড়েছে’। বাবুদের স্নেহভাষণের সুরের মধ্যে চালাকি বুঝতে সাধারণ মানুষের বিলম্ব হয় নি। উদ্দেশ্য সাধনে ‘ভাই’ পাতাতে গেলে ক্ষুদ্র ব্যক্তির কাছেও তা বিস্বাদ লাগে।—রবীন্দ্রনাথ চমৎকার একটি চিত্র তুলে ধরেছেন সাধারণ কৃষকদের সাথে বাবুদের সম্পর্কের।

sriaurobindo (1)
অরবিন্দ ঘোষ (১৮৭২-১৯৫০)

স্বদেশি আন্দোলনের প্রধান দুর্বলতা ছিল যে, এই আন্দোলন মুসলমান ধর্মাবলম্বী মানুষের সমর্থন আদায় করতে পারে নি। সূচনায় বেশ কিছু জাতীয়তাবাদী মুসলমান নেতা স্বদেশি আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। স্বদেশিদের বয়কট পরিকল্পনার অন্যতম পথিকৃৎ ছিলেন একজন মুসলমান—লিয়াকত হোসেন। কিছুদিনের মধ্যেই মুসলমান সম্প্রদায়ের মানুষ স্বদেশি আন্দোলনের মূল স্রোত থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়লেন। এর পেছনে কতকগুলি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল। স্বদেশি নেতারা তাঁদের বক্তৃতায় প্রকাশ্যে হিন্দুত্বের শ্রেষ্ঠত্বের কথা বলতেন। হিন্দু শিক্ষিত সম্প্রদায়ের দ্বারা হিন্দুত্বের প্রকাশ ও প্রচার বাংলার হিন্দু-মুসলমানকে বিভক্ত করে ফেলেছিল। স্বদেশি আন্দোলনের নেতা অরবিন্দ ঘোষ বললেন যে, জাতীয়তা শুধু রাজনৈতিক কর্মসূচি নয়। জাতীয়তা এক ধর্ম, যার উৎস ঈশ্বর। জাতীয়তাবাদী হতে হলে, জাতীয়তাবাদের স্বরূপ হিসেবে ধর্মে বিশ্বাস করতে হবে। ভারতবর্ষের নিজেকে চারদিকে ব্যাপ্ত করা মানেই তার সনাতন ধর্মকে সম্পসারিত করা। বাংলার চরমপন্থি রাজনীতি এবং স্বদেশি আন্দোলন হিন্দুধর্মকে ঘিরে এমনভাবে শুরু হলো যে, মুসলমানদের অনেকে নিজেদের আর ভারতবাসী বলে ভাবতে কুণ্ঠা বোধ করলেন। পাশাপাশি জাতীয় শিক্ষার সাথে হিন্দু ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি মিলেমিশে থাকায় তা বাঙালি মুসলমানের আত্মপরিচয়ের জন্য বিরাট সঙ্কট হিসেবে দেখা দেয়।

স্বদেশি আন্দোলনে হিন্দু ভদ্রলোকদের এ হেন হিন্দুত্বের পুনরুজ্জীবন বা জাগরণে মুসলমানরা সঠিক পথে আগাতে পারলেন না। সুবিধাবঞ্চিত কিন্তু উপরের দিকে উঠে আসা শিক্ষিত মুসলমানদের একটি বড় অংশই হিন্দুত্বের বিপরীতে নিরপেক্ষ ভূমিকা নিতে ব্যর্থ হলেন। বাঙালিত্বের জায়গায় মুসলমান হিসেবে তাঁরা ইসলামের আশ্রয়ে নিজেদের মুক্তি খুঁজলেন। নিজেদের বাঙালি পরিচয় ভুলে তাঁরা ইসলামের ঐতিহ্যকে ধারণ করে হিন্দুদের থেকে আলাদা হয়ে মুসলিম বিশ্বের দিকে হাত বাড়াতে চাইলেন। কিছু কিছু মুসলমান নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রাখার জন্য ইসলামের আশ্রয়ে না গিয়ে বরং হিন্দুত্বের জাগরণ সম্পর্কে সমালোচনামূলক ভূমিকা নিলেও শিক্ষিত হিন্দুরা তা গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করলেন না। কাজী আবদুল ওদুদ, এস ওয়াজেদ আলী প্রমুখ চাইছিলেন হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝির অবসান হোক। কলম ধরে তাঁরা দুপক্ষকেই সমঝোতার মধ্যে আনতে চেয়েছিলেন। কিন্তু হিন্দু শিক্ষিতরা এসবকে ধর্তব্যের মধ্যেই আনলেন না। রবীন্দ্রনাথই এক্ষেত্রে কিছুটা উদারতার পরিচয় দেন। অথচ সমাজের শিক্ষিত-অগ্রণী অংশ হিসেবে উচ্চবর্ণের হিন্দুদের বিরাট দায়িত্ব ছিল সাম্প্রদায়িক বিভেদ বেড়ে উঠবার আগেই তাকে রুখে দেয়া। কিন্তু তাঁরা ঠিক উল্টোটাই করলেন।


চতুর্থ কিস্তির লিংক