হোম নির্বাচিত বাংলার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার পাঠ্যপুস্তকে হিন্দু-মুসলিম প্রসঙ্গ এবং দেশভাগ

বাংলার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার পাঠ্যপুস্তকে হিন্দু-মুসলিম প্রসঙ্গ এবং দেশভাগ

বাংলার প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার পাঠ্যপুস্তকে হিন্দু-মুসলিম প্রসঙ্গ এবং দেশভাগ
350
3
প্রথম কিস্তির লিংক

দ্বিতীয় কিস্তি

বিদ্যাসাগর, দেবেন্দ্রনাথরা শিশুকে দেখেছিলেন ক্ষুদ্রাকৃতির পূর্ণরবয়স্ক মানুষ হিসেবে। তার কাছ থেকে আশা করা হতো যেন সে প্রাপ্তবয়স্কদের মতো তার মগজটাকে জ্ঞানে ঠাসা করে রাখবে—পূর্ণবয়স্কর মতো কথা বলবে এবং কাজ করবে। শিশুর যেন কোনো শিশুকাল থাকবে না। রুশো বলেন, শিশুকে সেগুলিই শেখানোর চেষ্টা করা উচিত যেগুলি সে সহজে শিখতে পারবে। শিক্ষার লক্ষ্য হলো ব্যক্তির স্বাভাবিক বিকাশের দিকে পৌঁছানো। কিন্তু তার তো স্তরভেদ আছে। শিশু তো একদিনেই সব শিখে ফেলতে পারবে না। পাশ্চাত্যে পাঠের অর্থ না বুঝেই শিশুকে বহুকিছু শিখতে হতো—শব্দগুলির অর্থ না বুঝেই মুখস্থ করতে হতো। রুশো শিশুর প্রতি এই ধরনের শিক্ষা চাপিয়ে দেওয়ার বিরোধিতা করেছিলেন। রুশো যে চিন্তাভাবনা আঠারো শতকের শেষে করেছিলেন, বাংলার পাঠশালা সতেরো শতকের আগেই সেই প্রক্রিয়ায় গড়ে উঠেছিল। কিন্তু ইংরেজ শাসক এবং বাংলার অভিজাতরা সেই ধারণার বিরুদ্ধেই প্রাথমিক শিক্ষাকে পরিচালিত করেছিলেন। শাসকরা সনাতন পাঠশালার চরিত্র না বুঝে তার ইতিবাচক দিকগুলিকে না দেখেই সেগুলি মানসম্পন্ন নয় বলে প্রচার করেছিল। ইংরেজি শিক্ষিত ভদ্রলোক, নব্য জমিদার এবং শহুরে সম্ভ্রান্তরা এ ব্যাপারে ইংরেজ শাসকদের মন্তব্যকে সঠিক মনে করেছিলেন।

শহরের ধনিক সম্প্রদায়ের গতর-আয়েসি সন্তানদের জীবনের সাথে খাপ খায় এমন লেখাপড়াই হলো তখন আদর্শ। ইংরেজদের উদারতাবাদী শিক্ষার ধারায় মনের স্ফূর্তির জন্য ভাষা ও সাহিত্যচর্চা শুরু হলো। সারাদিন যাদের কোনো কায়িক পরিশ্রমে অংশ নিতে হয় না—দিনমান ধরে বিশ্বজ্ঞান ভাণ্ডার থেকে নানা কিছু আহরণ করা তো শুধুমাত্র তাদের পক্ষেই সম্ভব। সারা বিশ্বের কবিতা বা সাহিত্যের ভাণ্ডার মুখস্থ করতেই বা বাধা কোথায় তাদের! কিন্তু সারাদিন কায়িক পরিশ্রম করে যাদের বেঁচে থাকতে হয়, এই বিলাসী শিক্ষার সুযোগ কোথায় তাদের জীবনে? ভদ্রলোকের এই বিলাসী শিক্ষা বা সর্বজ্ঞান আহরণকে কোনো দোষই দেওয়া যেত না—যদি না তারা বাংলার নিম্নবর্গের সাক্ষরতা লাভের পাঠশালাকে ধ্বংস করতেন। গরিবের লেখাপড়া শেখার কথাটা এইসব দেশীয় সম্ভ্রান্ত এবং বিদ্যাসাগর কারো মনেই বড় একটা ঠাঁই পায় নি। বরং তাদের শিক্ষাদানের বিরুদ্ধেই তাঁরা সরব ছিলেন। শুধু তাই নয়, এমন এক শিক্ষার প্রস্তাব তাঁরা রাখলেন বা এমন ধারার শিক্ষা চালু করলেন যার জন্য বিদ্যালয়ের বাইরে গৃহশিক্ষক আবশ্যক হয়। তাঁদের দেওয়া পাঠ্যসূচি একজন গৃহশিক্ষক ছাড়া শুধুমাত্র বিদ্যালয়ের শ্রেণিতে বসে সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। স্বভাবতই ভদ্রলোকদের শিক্ষাব্যবস্থায় ‘গৃহশিক্ষক’ শব্দটি ঢুকে পড়ল। বিদ্যাসাগর দেবেন্দ্রনাথ প্রমুখের দেওয়া শিক্ষা প্রস্তাবের কারণেই বিদ্যালয়ের বাইরে বাড়তি খরচ হিসেবে একজন ‘গৃহশিক্ষক’-এর আবির্ভাব ঘটলো—যা দীর্ঘকালের জন্য বাংলার শিক্ষা ব্যবস্থার আপদ হয়ে রইল।

সনাতন পাঠশালার প্রধান উদ্দেশ্য ছিল বাস্তবজ্ঞান প্রদান করা। লেখাপড়া যাতে সুষ্ঠুভাবে এগিয়ে যেতে পারে শিক্ষক সেভাবেই সকল পরিকল্পনা করতেন। পাঠশালার গুরু শিক্ষার্থীর প্রতি যে সহমর্মিতা দেখাত, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পক্ষে তা সম্ভব ছিল না। কারণ ঊর্ধ্বতনদের নানা স্তর পার হয়ে যখন যে সিদ্ধান্ত আসত সেটাই ছিল প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকের জন্য পালনীয়, ছাত্রের কিংবা তার অভিভাবকদের সমস্যাগুলোকে গুরুত্ব দেয়া নয়। অতীতে প্রবল বর্ষণে পাঠশালা বন্ধ করে দেওয়ার ক্ষমতা ছিলো পণ্ডিত বা গুরু মশায়ের—সে ক্ষমতা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকের ছিল না। সনাতন পাঠশালার মুক্ত পরিবেশে পরীক্ষা নেওয়ার বাঁধাধরা কোনো নিয়ম ছিল না, সেখানে বার্ষিক কোনো পরীক্ষার ব্যবস্থাই ছিল না। গুরু যদি বুঝতেন যে, ছাত্র প্রয়োজনীয় মেধা অর্জন করেছে তাহলে বছরের যে-কোনো সময়েই তাকে উপরের শ্রেণিতে তুলে দিতেন। দিনপঞ্জির কোনো বালাই ছিল না বা পরীক্ষারও কোন নির্দিষ্ট তারিখ ছিল না। কিন্তু সহকারী বিদ্যালয় পরিদর্শক ভূদেব শর্ত দেন যে, উপ-পরিদর্শক তাঁর এলাকার পাঠশালার প্রতি শ্রেণির জন্য একটি দৈনিক পাঠক্রম তৈরি করে দিতে বাধ্য থাকবেন যা গুরুরা অনুসরণ করবেন। এটা কার্যকরভাবে বোঝানো হলো যে, গুরুগণ তাঁদের ইচ্ছানুযায়ী আর পড়াশুনার কাজ পরিচালনা করতে পারবেন না। এখন থেকে শিক্ষা বিভাগের নির্দেশনা বা হুকুম মেনে তাঁদের কাজ করতে হবে।

নানারকম নিয়ম-শৃঙ্খলা, বিধি-বিধানের রজ্জুতে ইংরেজ প্রবর্তিত পাঠশালাসমূহের শিক্ষকরা বাঁধা পড়লেন—এখন থেকে দৈনিক হাজিরা বহি, যা পূর্বে কোনোদিনই পাঠশালায় ব্যবহার করা হয় নি তা রক্ষা করতে হলো। শিক্ষক বা গুরুকে পড়াশুনার দিকে নজর দেওয়ার চেয়ে বহুগুণ প্রশাসনিক দায়িত্ব ঘাড়ে নিতে হলো। গুরু স্বাধীনভাবে পড়াবেন, না কি সরকারি আমলাতন্ত্রের নিত্য নতুন তৈরি করা হুকুম বা বিধিবিধান মেনে চলবেন সেটা গুরুতর সমস্যা হয়ে দেখা দিল। বিদ্যা শিক্ষাদানের চেয়ে নিয়ম মেনে চলাটাই যেন প্রধান বিবেচ্য হয়ে দাঁড়াল। নানারকম নিয়ম-কানুন তৈরি করার ভিতর দিয়ে সনাতন পাঠশালার সহজ স্বাভাবিক গতিকে রুদ্ধ করা হলো। সনাতন পাঠশালা বা নতুন বিদ্যালয়গুলোকে সরকারের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নিয়ে আসার চেষ্টা চলল। পাঠশালার সকল ছাত্রকেই, এমনকি তাদের অভিভাবকদের পর্যন্ত ব্যক্তিগতভাবে জানা থাকায় পূর্বে গুরু কোনো হাজিরা রাখার প্রয়োজন বোধ করেন নি। অথচ এখন তাঁকে যে শুধু সকল ছাত্রের উপস্থিতি ও অনুপস্থিতির হিসাব রাখতে হচ্ছে তাই নয়, পৃথকভাবে হিন্দু ও মুসলমান ছাত্রও দেখাতে হচ্ছে। অধিকন্তু গুরুকে বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকার জন্য অনুমোদন নিতে হচ্ছে।


বাঙলা বিদ্যালয়ের প্রচলিত পাঠ্যপুস্তকগুলি বিশেষরূপে হিন্দু ছাত্রদের পাঠোপযোগী করে লেখা হয়ে থাকে, অথচ বাঙলার অনেক প্রদেশেই হিন্দু অপেক্ষা মুসলমান প্রজার সংখ্যা অধিক


বাংলা ভাষার সংস্কার করে সংস্কৃতের মিশ্রণে এক মার্জিত সাধু বাংলা গড়ে উঠেছিল সেই সময়। সাধারণ মানুষের কথ্য ভাষায় ভদ্রলোকদের পছন্দ ছিল না, কাজেই এই সংস্কার। আঠারশো চল্লিশ সালে রামচন্দ্র বিদ্যাবাগীশ হিন্দু কলেজ সংযুক্ত পাঠশালার পাঠ শুরুর বক্তৃতায় এই মার্জিত বাংলার পক্ষেই মত দেন। ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের হাতে এই সাধু বাংলা প্রসারিত হতে থাকে। পাঠ্যপুস্তকে এই সাধু বাংলার সাথে হিন্দুধর্মের নানা গালগল্প স্থান পায়। প্রাথমিক শিক্ষার পাঠ্যপুস্তকে একদিকে সংস্কৃত ঘেঁষা বাংলার অনুপ্রবেশ আবার অন্যদিকে হিন্দুদের পৌরাণিক বিষয়কে স্থান দেয়ার কারণে বহু মুসলমান ভাষাটিকে ‘হিন্দুভাবাদর্শ প্রভাবিত’ বলেছিলেন। নওয়াব আলী চৌধুরী মুসলিম ছাত্রদের জন্য প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তকের কিছু সমস্যার কথা তুলে ধরেন। তিনি অভিযোগ করেন যে, শিক্ষা বিভাগের কর্মচারীদের মধ্যে হিন্দুর সংখ্যাই অধিক এবং তাঁদের নির্বাচিত পাঠ্যপুস্তকে হিন্দুদের দেবদেবী, হিন্দু-কৃষ্টি ও হিন্দুদের ইতিহাসই প্রাধান্য পায়। তিনি আরো অভিযোগ করেন যে, হিন্দুদের রচিত বাংলা পাঠ্যপুস্তকে মুসলিম ইতিহাস যা রয়েছে তার অধিকাংশ বিকৃত ও মনগড়া। নওয়াব চৌধুরীর বক্তব্যের প্রতি রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টি আকৃষ্ট হয়েছিল। তিনি নওয়াব আলীর বক্তব্যকে খুবই সহানুভূতির সাথে গ্রহণ করেছিলেন।

রবীন্দ্রনাথ ‘ভারতী’ পত্রিকায় মুসলিম শিক্ষার্থীদের পাঠ্যপুস্তকের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে নওয়াব আলীর সাথে একমত হয়ে বলেন যে, বাঙলা বিদ্যালয়ের প্রচলিত পাঠ্যপুস্তকগুলি বিশেষরূপে হিন্দু ছাত্রদের পাঠোপযোগী করে লেখা হয়ে থাকে, অথচ বাঙলার অনেক প্রদেশেই হিন্দু অপেক্ষা মুসলমান প্রজার সংখ্যা অধিক। তিনি নওয়াব আলীর আক্ষেপের প্রতি সম্মান জানিয়ে লেখেন যে, এরূপ হবার কারণ এই যে, এতদিন বিদ্যালয়ে হিন্দু ছাত্রসংখ্যাই অধিক ছিল এবং মুসলমান লেখকগণ বিশুদ্ধ বাংলা সাহিত্য রচনায় অগ্রসর হন নি। কিন্তু ক্রমান্বয়ে মুসলমান ছাত্রসংখ্যা বেড়ে চলেছে এবং ভালো বাংলা লিখতে পারেন এমন মুসলমান লেখকের অভাব নেই। অতএব মুসলমান ছাত্রদের প্রতি দৃষ্টি রেখে পাঠ্যপুস্তক রচনার সময় এসেছে।

বাংলা ভাষায় যেমন তখন সংস্কৃত শব্দের অনুপ্রবেশ ঘটেছিল, একইভাবে দীর্ঘদিন মুসলিম শাসনে থাকার ফলে প্রচলিত বাংলায় যে-সব আরবি-ফারসি শব্দ ছিল সেগুলিকে বিসর্জন দেওয়া হলো। প্রফুল্ল কুমার পাল পরবর্তীকালে বাংলা পরিচয়ের দুশো পঁচিশ বছর  গ্রন্থে লিখেছিলেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যেসব বর্ণপরিচয়মূলক গ্রন্থে নীতিপাঠ দেওয়া হতো, সেগুলির মাধ্যমে সাম্প্রদায়িকতার ও জাতিভেদের বীজ উপ্ত হয়। বর্ণপরিচয়মূলক গ্রন্থের গদ্যপাঠে সৃষ্ট চরিত্রগুলিকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে গ্রন্থকাররা অনেকেই নিজের নিজের ধর্মের প্রতি সম্মান দেখিয়েছেন, ভিন্ন ধর্ম এবং নিচু জাতকে খাটো করেছেন। হিন্দুদের রচিত বর্ণপরিচয়মূলক গ্রন্থে শব্দ-বানান, শিক্ষার পদ্ধতিতে এবং চরিত্র সৃষ্টিতে সাম্প্রদায়িক বিভেদকে অনিচ্ছাকৃতভাবেই উস্কে দেওয়া হয়েছিল। শিশু শিক্ষার্থীদের জন্য যখন শিশুসেবধি  গ্রন্থ রচিত হয় তখন পুরো জাতপাতের যুগ। বর্ণমালার গ্রন্থ উল্টালেই দেখা যাবে প্রায় ক্ষেত্রে জাতিগতভাবে ব্রাহ্মণ সম্প্রদায়কে বড় করা হয়েছে। রামচন্দ্র বিদ্যাবাগীশের শিশুসেবধি  গ্রন্থে ‘জাতিমালা’ নামক অধ্যায়ে ব্রাহ্মণ, বারেন্দ্রশ্রেণির ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয়, বৈশ্য, শূদ্র জাতির কিছু নাম এবং তাদের পদবি উল্লেখ করা হয়েছে। যেমন ব্রাহ্মণদের পদবি শর্মা, গঙ্গোপাধ্যায়, চট্টোপাধ্যায় ইতাদি; বারেন্দ্রশ্রেণির ব্রাহ্মণদের পদবি লাহিড়ি, ভাদুরি, মৈত্র ইত্যাদি; ক্ষত্রিয় জাতির পদবি আগুরি, বৈশ্য জাতির পদবি দাস, দত্ত এবং শূদ্র জাতির পদবি পালিত, গুহ, ঘোষ ইত্যাদি। গ্রন্থের বিরাট অংশ জুড়ে উল্লিখিত হয়েছে ব্রাহ্মণ-বৈদ্য ইত্যাদি জাতির বিদ্যাসংক্রান্ত উপাধিগুলি—যেমন ব্রাহ্মণদের বিদ্যাসম্বন্ধীয় উপাধি হচ্ছে বিদ্যালঙ্কার, বিদ্যাবাগীশ ইত্যাদি আর বৈদ্যদের বিদ্যাসংক্রান্ত উপাধি হচ্ছে বিশারদ, বৈদ্যরত্ন ইত্যাদি। এমনকি একাদশী, পূর্ণিমা, অমাবস্যা ইত্যাদির উল্লেখ এবং সেসব দিনের আচার-আচরণ সম্বন্ধীয় বক্তব্যগুলি হিন্দু সম্প্রদায়ের সাথেই সম্পর্কিত।


নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে বিদ্যাসাগর বলেছেন ‘অতি দুরাচার’ আর বেন্টিঙ্ককে অভিহিত করেছেন ‘চিরস্মরণীয় লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক মহোদয়’ বলে


সন্দেহ নেই, এগুলি খুব নির্দোষভাবেই হয়তো গ্রন্থে উল্লিখিত হয়েছে, কিন্তু মুসলমান শিশু শিক্ষার্থীদের কাছে এর গ্রহণযোগ্যতা নেই বললেই চলে। মদনমোহন তর্কলঙ্কারের ‘শিশুশিক্ষা’ গ্রন্থে ধর্মাধর্ম, জাতপাত, চতুর্বর্ণের কথা নেই। কিন্তু ঘোষাল পদবি, ব্রহ্মোপাসনা, জটবল্কধারণ ইত্যাদি শব্দ-বানান শিক্ষার জন্য ব্যবহৃত হলেও তা শিশুমনে হিন্দু সম্প্রদায়ের কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়। বিদ্যাসাগরের ‘বর্ণপরিচয়’ গ্রন্থে জাতপাতের কথা নেই। বিদ্যাসাগর নবীন, মাধব, গোপাল এইভাবে নাম উচ্চারণ করেছেন, কিন্তু কারো নামের সাথে পদবি যোগ করেন নি। নামগুলি দেখে বোঝার উপায় নেই কে ব্রাহ্মণ আর কে ক্ষত্রিয় বা শূদ্র। কিন্তু তারপরেও সন্ন্যাসী, পারলৌকিক, আহ্নিক এইরকম শব্দ-বানান শিক্ষার মধ্য দিয়ে হিন্দুধর্মাবলম্বী ক্রিয়াকাণ্ডের উল্লেখ পাওয়া যায়। বিশেষ করে বিদ্যাসাগর জাতপাত মানতেন না এবং সাম্প্রদায়িকও ছিলেন না। কিন্তু তিনি মার্শম্যানের লেখা বাংলার ইতিহাস  (দ্বিতীয় ভাগ) বইটি অনুবাদ করেছিলেন। বইটির ভূমিকায় বলা ছিল, বইটি সরাসরি অনুবাদ নয়, কিছু যোগ বিয়োগ করা হয়েছে। সে বইয়ে নবাব সিরাজউদ্দৌলাকে বিদ্যাসাগর বলেছেন ‘অতি দুরাচার’ আর বেন্টিঙ্ককে অভিহিত করেছেন ‘চিরস্মরণীয় লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক মহোদয়’ বলে। বইটিতে অন্ধকূপহত্যার বর্ণনা আছে, যা পরবর্তীকালে বহু ইতিহাসবিদ মিথ্যা বলে প্রমাণ করেছেন। সিরাজউদ্দৌলাকে দুরাচার বলাতে তেমন দোষের কিছু নেই, কিন্তু পাশাপাশি বেন্টিঙ্ককে মহিমান্বিত করায় বিদ্যাসাগরের দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে সংশয় তো জাগেই। ফলে প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ নিয়ে মুসলামানদের মনে নানা ধরনের প্রশ্ন দেখা দেয়।

বিদ্যাসাগরের গ্রন্থের সব চরিত্রই ছিল হিন্দু, মুসলমান কোনো চরিত্র ছিল না। তিনি সাম্প্রদায়িক দৃষ্টি থেকে যে এটা করতেন তা নয়। বাংলার বিরাট সংখ্যক কৃষক দরিদ্র মুসলমানরা তাঁর দৃষ্টিসীমার মধ্যেই আসে নি। বাংলার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তকে শিক্ষিত হিন্দুদের একপেষে এবং মনগড়া রচনার অনেকেই সমালোচনা করেন। ভাষাবিদ ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ ‘আল ইসলাম’ পত্রিকায় লেখেন, ‘পরিতাপের বিষয়, আমাদের শিশুদেরকে প্রথমেই রাম শ্যাম গোপালের গল্প পড়তে হয়। সে পড়ে গোপাল বড় ভালো ছেলে। কাসেম বা আবদুল্লা কেমন ছেলে, সে তা পড়ার সুযোগ পায় না। এখান থেকেই তার সর্বনাশের বীজ বপিত হয়। তারপর সে পাঠ্যপুস্তকে রামলক্ষ্মণের কথা, কৃষ্ণাজ্জুর্নের কথা, সীতাসাবিত্রীর কথা, বিদ্যাসাগরের কথা, কৃষ্ণকান্তের কথা ইত্যাদি হিন্দু মহাজনদের আখ্যান পড়তে থাকে। স্বভাবতই তার ধারণা জন্মে যায়, আমরা মুসলমান ছোট জাতি, আমাদের মধ্যে বড় লোক নাই। হিন্দু বালকগণ ঐ সকল পুস্তক পড়ার পর মনে করে, আমাদের অপেক্ষা বড় কেহ নয়। মুসলমানরা নিতান্ত ছোট জাত। তাদের মধ্যে ভালো লোক জন্মে না। এই প্রকারে রাষ্ট্রীয় একতার মূলোচ্ছেদন করা হয়।’

WP_20150306_012
সেমিনার পেপার পড়ছেন রাহমান চৌধুরী

বাংলার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাঠ্য বইয়ে হিন্দু সংস্কৃতির প্রাধান্য বাঙালি মুসলমান ভদ্রসমাজ মেনে নিতে পারে নি। উনিশ শতকের শেষ দিকে দু-চারজন মুসলমান যে-কয়েকটি প্রাথমিক শিক্ষার বই লিখেছিলেন সেগুলি খুব একটা নজর কাড়তে পারে নি। শিক্ষায় হিন্দু আধিপত্য ও ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির প্রভাব বাঙালি মুসলমান ভদ্রলোকদের মনে কী ধরনের প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল তার সম্যক পরিচয় পাওয়া যায় কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য আজিজুল হকের লিখিত বিবৃতি থেকে। হিন্দুদের দ্বারা লিখিত সে-সব বই পাঠ করতে গিয়ে মুসলিম ছাত্রের কী সমস্যা হয় সেগুলিকে তিনি চিহ্নিত করেছিলেন। তিনি বলেন, বহু বইয়ের বাংলা কঠিন সংস্কৃত শব্দে ঠাসা। বাংলা সাহিত্য পড়তে গিয়ে মুসলিম ছাত্ররা দেব-দেবী, অবতার, নমস্কার, পূজা, জন্ম, পুনর্জন্ম সম্পর্কে অবহিত হয়। হিন্দুদের বেদবেদান্ত সম্পর্কেও অনেক কথা লেখা থাকে। কিন্তু ইসলাম ধর্ম সম্পর্কে সে কিছুই জানার অবকাশ পায় না। ইতিহাসে পাঠে সে প্রাচীন ভারতীয় সভ্যতার সমাজ, অর্থনীতি, সাহিত্য, স্থাপত্য, বিজ্ঞান, শাসননীতি, শিক্ষা ও সভ্যতার অনেক তথ্য জানতে পারে। কিন্তু যেই মধ্যযুগের ইতিহাস আসে তখন খালি যুদ্ধ, হত্যা, ধ্বংস, জয়, পরাজয়, ষড়যন্ত্রের বিবরণ পড়ে। তিনি এই সমস্যার সমাধান হিসেবে বলেন, বিদ্যালয়ে এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা বা পাঠ্যক্রম এমন হবে যেখানে হিন্দু-মুসলমান এবং অন্য সম্প্রদায়ের একটি মিলনক্ষেত্র হবে—সেখানে কোনো বিশেষ সম্প্রদায়ের প্রতি পক্ষপাতিত্ব বা বিশেষ সম্প্রদায়ের সংস্কৃতির প্রাধান্য থাকবে না। কিন্তু তা ঘটল না। বর্ণহিন্দুরা মুসলমানের আবেগের প্রতি সম্মান দেখাতে পারলেন না। শিক্ষাবিদ পরমেশ আচার্য তাই লিখেছেন, ‘দুঃখের হলেও এ কথা সত্যি তৎকালীন হিন্দু ভদ্রলোক সমাজ রাজনৈতিক মত নির্বিশেষে মুসলমানের শিক্ষাচিন্তা বা ক্ষোভের প্রতি যথোচিত মনোভাব দেখাতে পারেন নি।’

প্রাথমিক শিক্ষায় নিরক্ষরতা দূর করাই তো প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত, বৃহৎ দার্শনিক প্রশ্নগুলোকে সামনে আনা নয়। নীতিশিক্ষা দেয়াও নয়। শিশুকে নীতিশিক্ষা দেওয়ার চেয়ে ভয়াবহ কিছু নেই। কারণ নীতিগুলো গড়ে ওঠে ধর্মশিক্ষার ভিত্তিতে—নীতিশিক্ষার ফলে শিশুর মন একপেশে হয়ে দাঁড়ায়। প্রশ্ন দাঁড়ায়, শিশুকে যদি নীতিশক্ষা দেওয়াই কাজ হয়—তাহলে সেটা কোন নীতি, কোন আদর্শের পক্ষে সে দাঁড়াবে। সকল নীতি বা আদর্শের বিপরীত আদর্শও রয়েছে। হিন্দুধর্মের আর বৌদ্ধধর্মের নীতিশিক্ষা এক ছিল না—ঠিক তেমনি হিন্দু আর মুসলিমের নীতিশিক্ষা এক হতে পারে না। ফলে এইসব শিক্ষা শিশুর মনকে বিভ্রান্ত করে, সাম্প্রদায়িক করে তোলে। মুহম্মদ শহীদুল্লাহ দেখান যে, শিশু বয়সেই কীভাবে হিন্দু-মুসলমানের মধ্যে পাঠ্যপুস্তক দ্বারা মনের ভিতর পরস্পরের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ও অহম গড়ে তোলা হয়। শিশুবয়সে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যদি এমন ঘটে তা হলে বড় হবার পর মনের ভিতর সে ঘৃণা সুপ্তই থেকে যাবে। বাংলায় ব্যাপারটা শেষপর্যন্ত তেমনি ঘটেছিল। মীর মশাররফ হোসেন ১৯০৩ সালে যে বইটি শিশুশিক্ষার জন্য লেখেন তার নাম ছিল ‘মুসলমানের বাঙ্গলা শিক্ষা প্রথম ভাগ’। বইটির আরম্ভ হয়েছে, ‘আল্লা এক। আল্লা সকলের বড়। আল্লার কোনো দোষ নাই। কোনো বদনাম নাই’। বইটির অন্যত্র আছে, ‘তুমি মুসলমান? টুপি নাই কেন?’ বইটিতে গুরু-শিষ্যের সংলাপ রয়েছে এইরকম— গুরু : বেহেস্ত কি? শিষ্য : বেহেস্ত অতি সুশ্রী আরামের বাসস্থান।


মশাররফ হোসেন যে বই লিখেছেন, সেটা সমস্যার সমাধান নয় বরং মুসলমান ছেলেকে কট্টর মোল্লা বানাবার উদাহরণ


খুব পরিষ্কারভাবে বইটির লেখক বালকদের ভাষা শিক্ষা বা লেখাপড়া শিক্ষা দেয়ার চেয়ে ধর্মীয় উপদেশ দেয়ার চেষ্টা করেছেন। খুব নগ্নভাবে মুসলমানদের মুসলমানিত্বকে ফুটিয়ে তুলতে চেয়েছেন। মদনমোহন তর্কারঙ্কারের শিশুশিক্ষা, বিদ্যাসাগরের বর্ণপরিচয় খুবই মান সম্পন্ন এবং জনপ্রিয় গ্রন্থ ছিল। মশাররফ হোসেনের গ্রন্থে তেমন কোনো মান রক্ষিত হয় নি। হিন্দুরা তাঁদের বর্ণশিক্ষা গ্রন্থে শব্দ বাক্য যতিচিহ্ন ইত্যাদি শিখাবার জন্য যে-সব কথা লিখেছেন সন্দেহ নেই তার মধ্যে হিন্দুদের আচার-আচরণ প্রস্ফুটিত হয়েছে। হিন্দু পরিবারের মধ্যে তাঁরা বড় হবার জন্য তেমনটি ঘটেছে। বেদ-বেদান্তের বহু কথা এসেছে, পৌরাণিক গল্প এসেছে। মশাররফ হোসেন একেবারে উগ্রভাবে মুসলিম বিষয়গুলিকে তার গ্রন্থে স্থান দিয়েছেন। মনে হয়েছে তিনি যেন বর্ণশিক্ষার গ্রন্থ না লিখে সরাসরি ধর্মগ্রন্থ লিখেছেন শিশুদের খাঁটি মুসলমান বানাবার জন্য। হিন্দুদের রচিত গ্রন্থ মুসলমানদের জন্য কী ধরণের সমস্যা সৃষ্টি করেছিল সেটাকে মূল্যায়ন না করে মশাররফ হোসেন ভুল পথে হেঁটেছিলেন। হিন্দুরা বর্ণশিক্ষা রচনার ক্ষেত্রে মুসলমানদের সংস্কৃতিকে একেবারেই গ্রন্থে স্থান দিতে পারেন নি। কিন্তু মশাররফ হোসেন যে বই লিখেছেন, সেটা সমস্যার সমাধান নয় বরং মুসলমান ছেলেকে কট্টর মোল্লা বানাবার উদাহরণ। পরমেশ আচার্য লিখছেন, ‘সন্দেহ নেই যে, উনিশ শতকের পুরোধারাই মূলত বাংলা গদ্যসাহিত্য ও বাংলার আধুনিক শিক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে প্রধান ভূমিকা নিয়েছিলেন। স্বাভাবিকভাবেই শিক্ষার বিষয় ও বাংলা সাহিত্যে হিন্দু ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির গভীর অনুপ্রবেশ ঘটেছিল।’

ইংরেজ শাসক এবং শিক্ষিত বাঙালিরা শিক্ষাকে শুধুমাত্র সমাজের উচ্চবর্গের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখতে চেয়েছিলেন বলেই ব্যাপারটা এইরকম হয়েছিল। বাংলার উচ্চবর্গ মানেই বর্ণহিন্দু। সমাজের নিম্নবর্গ মানেই হিন্দুদের একটি বড় অংশ, যারা কায়িকশ্রমের সাথে যুক্ত। সেক্ষেত্রে বাংলার মুসলমানদের প্রায় পুরো অংশটাই ছিল নিম্নবর্গের অন্তর্গত, কারণ প্রধানত তাঁরা ছিলেন কৃষক ও কারিগর। বাঙালি ভদ্রলোকরা শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে এই পুরো নিম্নবর্গকেই অবহেলা করেছেন। অথচ পাঠশালা শিক্ষায় হিন্দু-মুসলিম নির্বিশেষে নিম্নবর্গের পড়াশোনার সুযোগ ছিল। সেখানকার পাঠ্যপুস্তকে এইধরনের সাম্প্রদায়িক বিভেদের প্রশ্নগুলো স্থানই পায় নি। নিম্নবর্গের মধ্যে শিক্ষা প্রসারে ইংরেজ শাসকদের চেয়ে অনেক বেশি অনীহা ছিলো বাঙালি ভদ্রলোকদের। সরকারি বরাদ্দ টাকার বেশিরভাগই তখন ভদ্রলোকদের উচ্চশিক্ষার ব্যয় হতো। আঠারশো উনসত্তর সালে ভারতের গর্ভনর জেনারেলের দায়িত্ব নেন লর্ড মেয়ো। তিনি উচ্চশিক্ষার জন্য সরকারি ব্যয়ের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। বরঞ্চ সরকারি অর্থ প্রাথমিক শিক্ষাখাতে ব্যয় হওয়া উচিত বলে তিনি মন্তব্য করেন। তিনি মেকলে ও অকল্যান্ডের চুইয়ে পড়া শিক্ষানীতির বিরোধিতা করেন এবং বলেন, সরকার সর্বসাধারণের শিক্ষার জন্য কিছুই করে নি। তাঁর মতে উচ্চশ্রেণির লোকেরা নিজেরাই তাঁদের সন্তানের শিক্ষার ব্যয়ভার বহনে সক্ষম। কাজেই এই শ্রেণির শিক্ষার জন্য সরকারি অর্থব্যয় অর্থহীন বলে তিনি বিবেচনা করেন। তিনি স্পষ্টতই জানান যে, বাবুরা যত খুশি ইংরেজি শিক্ষা লাভ করুন। সরকার না হয় গরিবদের শিক্ষার জন্য কিছু চেষ্টা করুক। লর্ড মেয়োর এই মতের সমর্থনে বাংলার ছোটলাট ক্যাম্পবেল সর্বসাধারণের শিক্ষার জন্য বিশেষ পরিকল্পনা করেছিলেন।

ক্যাম্পবেল আঠারশো বাহাত্তর সালের ত্রিশে সেপ্টেম্বর একটি প্রস্তাব প্রণয়ন করেন যা পাঠশালাগুলোকে সরকারি নিয়ন্ত্রণাধীনে আনার ক্ষেত্রে নতুন ধারার সূচনা করেছিল। প্রস্তাবে বলা হয় যে, সরকারের একটি মূল উদ্দেশ্য হবে সাধারণ জনগণের মধ্যে প্রাথমিক শিক্ষা বিস্তারে সহায়তা প্রদান। এ লক্ষ্যে গ্রামাঞ্চলের শিক্ষা উন্নয়নে চার লক্ষ রুপির বিশেষ বরাদ্দ দেয়া হয়। এ বরাদ্দ ছিল পূর্বের এক লক্ষ ত্রিশ হাজারের অতিরিক্ত। হাজী মহম্মদ মহসীন হুগলী কলেজের জন্য বিরাট অঙ্কের টাকা অনুদান দিয়েছিলেন। ক্যাম্পবেল মহম্মদ মহসীনের বিপুল দান হুগলী কলেজের জন্য ব্যয় না করে দেশের মুসলমান সন্তানদের প্রাথমিক শিক্ষার জন্য ব্যয় করার সিদ্ধান্ত নেন। তিনি উচ্চশিক্ষার আয়োজনকে সঙ্কুচিত করে প্রাথমিক শিক্ষার প্রসার ঘটাতে চান। ক্যাম্পবেল উচ্চ শিক্ষাখাতে ভর্তুকি কমিয়ে সেই টাকা প্রাথমিক শিক্ষার জন্য ব্যয় করার উদ্যোগ নিলে বাঙালি ভদ্রলোক সমাজ গেল গেল রব তুলে এই নীতির বিরোধিতায় আন্দোলন শুরু করে। ক্যাম্পবেল পুরানো গুরু ও সনাতন পাঠশালা ব্যবস্থা বজায় রাখার কথা বললেও পাশাপাশি শিক্ষক-প্রশিক্ষণের উপর জোর দেন। কারণ তাঁর পরিকল্পনায় নতুন বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার কথাও ছিল। ক্যাম্পবেলের চিন্তা কেবল প্রতিষ্ঠিত পাঠশালা নিয়েই ছিল না, যেখানে কোনো পাঠশালা নেই সেখানেও দেশীয় রীতিতে নতুন পাঠশালা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়। ক্যাম্পবেলের পূর্বের প্রাথমিক শিক্ষার উদ্যোগগুলো শুধুমাত্র কয়েকটি জেলায় সীমাবদ্ধ ছিল। ক্যাম্পবেল সেরকম না করে সারা বাংলার জন্য তাঁর পরিকল্পনা প্রণয়ন করেন। পাঠশালাসমূহের গণচরিত্র বজায় রাখার কারণে তিনি শিক্ষা কার্যক্রমের মান উন্নয়নে তাড়াহুড়ো না করা এবং পুরাতন পাঠশালার শিক্ষাসূচি অনুসরণ করার নির্দেশ দেন। তিনি মনে করতেন, পাঠশালাসমূহের উন্নতি প্রধানত মুদ্রিত পুস্তকের ব্যবহার প্রবর্তনের মাধ্যমেই আসতে হবে, তবে তা ধীরে ধীরে। পশ্চাৎপদ মুসলমানদের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারে তাঁর পরিকল্পনার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল।

স্যার জর্জ ক্যাম্পবেল আঠারশো একাত্তর থেকে চুয়াত্তর সালের মধ্যে সাঁইত্রিশ মাসের জন্য বাংলার সরকার পরিচালনা করেন। গরিব শিক্ষার্থীর প্রতি তিনি নজর দিয়েছিলেন। ক্যাম্পবেলের কম খরচে বেশি ছাত্রের সাক্ষরতা লাভের শিক্ষানীতি কার্যকরী হলেও শেষপর্যন্ত তাঁকে বিদায় নিতে হয় বাঙালি ভদ্রলোকদের প্রতিবাদের চাপে। ভদ্রলোকরা ক্যাম্পবেলের শিক্ষানীতি মেনে নিতে পারেন নি। অতিরিক্ত চার লাখ টাকা প্রাথমিক শিক্ষায় ব্যয় না করে উচ্চশিক্ষার জন্য ব্যয় করলেই তাঁরা আর আপত্তি করতেন না। এই সময় বাংলার সব পত্র-পত্রিকায় ক্যাম্পবেলের শিক্ষানীতির বিরোধিতা করা হয়। শুধু কলকাতায় নয়, জেলায় জেলায় প্রতিবাদ সভার আয়োজন করা হয়। ক্যাম্পেবেলের শিক্ষনীতিকে উচ্চশিক্ষার বিরুদ্ধে জেহাদ হিসাবে বর্ণিত হয়। বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় ক্যাম্পেবেলের শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে ভদ্রলোকদের বিরোধিতার তীব্র সমালোচনা করেন। তিনি ক্যাম্পবেলের পক্ষে লেখেন, ‘রাজকোষ হইতে ধনীদের শিক্ষার জন্য অধিক অর্থ ব্যয় হউক, নির্ধনদিগের শিক্ষায় অল্প ব্যয় হউক ইহা ন্যায়বিহর্গিত কথা। বরং নির্ধনদিগের শিক্ষার্থ অধিক ব্যয়, এবং ধনীদিগের শিক্ষার্থ অল্প ব্যয়ই ন্যায়সঙ্গত; কেননা ধনীগণ আপন ব্যয়ে শিক্ষাপ্রাপ্ত হইতে পারে, কিন্তু নির্ধনগণ, সংখ্যায় অধিক, এবং রাজকোষ ভিন্ন অনন্যগতি।’ বঙ্কিমচন্দ্র জর্জ ক্যাম্পবেলের শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে ভদ্রলোকদের প্রতিবাদের সমালোচনা করে আরো বলেন, ‘তিনি সাম্যবাদী, তিনি প্রজার কোনো মঙ্গলসিদ্ধ করে থাকুন বা নাই থাকুন, তিনি প্রজাহিতৈষী’। বঙ্কিমচন্দ্রের পাশাপাশি ক্যাম্পেবেলের শিক্ষানীতির সমর্থনে যে-কয়েকজন কলম ধরেন তাঁদের মধ্যে ছিলেন পাদ্রি লালবিহারী দে, ব্রাহ্মনেতা কেশবচন্দ্র সেন। কিন্তু বাংলার হিন্দু ভদ্রলোকদের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ বিক্ষোভে ফেটে পড়ে। বাংলার জেলায় জেলায় সরকারি নীতির প্রতিবাদে সভার আয়োজন করা হয়। সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মতো বক্তারা এইসব সভায় সরকারি নীতির প্রতিবাদে জনমত সংগঠনের লড়াই চালিয়ে যান। শেষপর্যন্ত ক্যাম্পবেলকে বিদায় নিতে হলো এবং সুরেন্দ্রনাথ দাবি করলেন, তাঁদের আন্দোলনের ফলেই ক্যাম্পবেলকে বিদায় নিতে হয়েছিল। বাঙালি শিক্ষিত হিন্দুরা কিভাবে সাধারণের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারের বিরোধী ছিলেন এটাই তার বড় প্রমাণ।


বিবেকানন্দ যদিও সবার জন্য শিক্ষার কথা বলেছেন, অথচ সেখানে সাধারণ মুসলমানদের বা মুসলমান কৃষকদের ব্যাপারটা নেই


বিবেকানন্দ শিক্ষাবিদ ছিলেন না, শিক্ষা আন্দোলনের সৃষ্টি করেন নি, এমনকি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও স্থাপন করেন নি। কিন্তু শিক্ষা বলতে তিনি অগ্রাধিকার দিয়েছিলেন গণশিক্ষাকে। তিনি বলেছেন, দেশ বলতে বোঝায় সাধারণ মানুষ। খেটে খাওয়া সেইসব মানুষের শিক্ষার জন্য তিনি এক অভিনব কথা বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, খেটে খাওয়া মানুষদেরকে শিক্ষা দিতে হবে এবং এঁরা শিক্ষার জন্য এগিয়ে আসবে না, শিক্ষাকে এদের কাছে নিয়ে যেতে হবে। দরিদ্র বালকগণ যদি শিক্ষার লাভের জন্য না আসে শিক্ষাকে তাদের দ্বারে যেতে হবে। জীবনযুদ্ধে ব্যতিব্যস্ত থেকে তাদের জ্ঞান লাভের সুযোগ হয় নি। এতকাল তারা যন্ত্রের মতো কাজ করেছে এবং চতুর শিক্ষিত সম্প্রদায় তাদের শ্রমের সারাংশ অধিকার করেছে। সেইসব বঞ্চিতদের শিক্ষার আলো পৌঁছে দেবার কথা বলেন বিবেকানন্দ। তিনি বলেন, একজন ব্রাহ্মণ পণ্ডিতের ছেলের জন্য যদি একজন শিক্ষক যথেষ্ট গণ্য হয়, তাহলে পিছিয়ে পড়া সাধারণ ছেলেমেয়েদের প্রত্যেকের জন্য চারজন শিক্ষক থাকা দরকার। ব্রাহ্মণ যদি বুদ্ধিমান হয়েই জন্মগ্রহণ করে থাকে তাহলে সে অপরের সাহায্য ব্যতিরেকেই শিক্ষালাভ করবে। যারা বুদ্ধিমান হয়ে জন্মগ্রহণ করে না, শিক্ষকগণ তাদের জন্যই নিয়োজিত হোক। তিনি উচ্চকণ্ঠে বলেন, ‘সুযোগ দাও, শিক্ষা দাও, সকলেই মহৎ হতে পারে, সকলেই সাধু হতে পারে; কোনো কিছুই তথাকথিত উচ্চবর্ণের একচেটিয়া অধিকার নহে।’ বিবেকানন্দের বক্তব্য থেকে স্পষ্টই তৎকালীন সমাজের চেহারাটা ধরা পড়ে—শিক্ষাকে যে উচ্চবর্ণের লোকরা একচেটিয়া করে রেখেছে তা তিনি জোরালোভাবেই বুঝিয়ে দেন।

বিবেকানন্দ যদিও সবার জন্য শিক্ষার কথা বলেছেন, অথচ সেখানে সাধারণ মুসলমানদের বা মুসলমান কৃষকদের ব্যাপারটা নেই। কারণ তিনি যে শিক্ষার কথা বলেছেন, তা ছিল অধ্যাত্মবাদী। মুসলমানরা কেন হিন্দুদের আধ্যাত্মবাদী শিক্ষা গ্রহণ করতে যাবে সে ব্যাপারটা তাদের বিবেচনায় স্থান পায় নি। হিন্দুজাগরণের প্রবক্তা বিবেকানন্দের কাছে মুসলমানদের চেয়ে সাধারণ হিন্দুরাই অগ্রাধিকার পেয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ, অরবিন্দ ও বিবেকানন্দ—এই তিন বাঙালির শিক্ষাদর্শেই আধ্যাত্মিকতা বিশেষ স্থান নিয়েছে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর একবার ‘বেদ’ অনুসারী হয়ে বর্ণপ্রথার পক্ষে প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। ইংরেজ প্রবর্তিত ‘করণিক’ তৈরির শিক্ষাব্যবস্থার প্রতিবাদে তিনি শান্তিনিকেতনে প্রাচীন ভারতের ব্রাহ্মণ্য আদর্শে একটি ব্রহ্ম বিদ্যালয় স্থাপন করেন। সে বিদ্যালয়ে তিনি ভারতের প্রাচীন শিক্ষাধারার নিয়ম অনুসারে বর্ণপ্রথা চালু করেন। শান্তিনিকেতনের সেই বিদ্যালয়ে বর্ণাশ্রম প্রথা অক্ষরে অক্ষরে পালিত হতো, এমনকি ব্রাহ্মণ কায়স্থ বৈশ্য ছাত্রদের পোশাকের রঙ পর্যন্ত আলাদা আলাদা রাখা হয়েছিল। ব্রাহ্মণ ছাত্ররা খাওয়ার সময় পৃথক সারিতে বসতো ছোঁয়াছুয়ি বাঁচিয়ে। ব্রাহ্মণ ছাত্ররা কায়স্থ শিক্ষকের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করবে না, রবীন্দ্রনাথ এই ধরনের বিধানকেও প্রশ্রয় দিয়েছিলেন।

মনোরঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়কে ১৯০২ সালে লেখা এক চিঠিতে তিনি উল্লেখ করেন, ‘যা হিন্দুসমাজ বিরোধী তাকে এ বিদ্যালয়ে স্থান দেওয়া চলবে না। সংহিতায় যে রূপ উপদেশ আছে ছাত্ররা তদানুসারে ব্রাহ্মণ অধ্যাপকদের পা স্পর্শপূর্বক প্রণাম ও অন্যান্য অধ্যাপকদের নমস্কার করবে।’ স্বভাবতই রবীন্দ্রনাথের এই বিদ্যালয়ে নিম্নবর্ণের হিন্দু ও মুসলমানের স্থান ছিল না। রবীন্দ্রনাথ পরবর্তীকালে অবশ্য এ ধরনের সংস্কার থেকে মুক্ত হয়েছিলেন এবং তাঁর এই পশ্চাদমুখিনতা শুধরে নিয়েছিলেন। ব্রহ্ম বিদ্যালয়টিই পরে বিশ্বভারতী বিদ্যালয় হিসেবে রূপান্তরিত হয়। প্রশ্ন হলো, রবীন্দ্রনাথের মতো বৃহৎ মাপের মানুষ যদি পাশ্চাত্য শিক্ষার বাড়াবাড়ির বিরুদ্ধে ক্ষেপে গিয়ে নিজধর্মের কুসংস্কারের কাছে আশ্রয় নিতে পারেন, তাহলে বর্ণহিন্দুরা যখন হিন্দুধর্মের ঐতিহ্য নিয়ে শিক্ষায় বাড়াবাড়ি শুরু করলেন, তখন মুসলমানরা যদি নিজধর্মের আশ্রয়-প্রশ্রয় পেতে দূরদেশীয় প্রথা ও আচার-আচরণ রপ্ত করার চেষ্টা করেন সেটাকে কোন চোখে বিচার করা হবে? ভুল করবার অধিকার কি রবীন্দ্রনাথ একাই পাবেন? নাকি রবীন্দ্রনাথের মতো মানুষদের ভুলের খেসারত দিলেন পিছিয়ে পড়া মুসলমানরা।


‘রাজ্য চাহি না, কেবল মুসলমানেরা ভগবানের বিদ্বেষী বলে তাঁদের সবংশে নিপাত করতে চাই।’


মুসলমানরা কিছু কিছু ব্যাপারে খুব গোড়া ও কট্টর ছিলেন এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু ইংরেজ সরকার তাদের প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থাকে পাঠশালার মতো একটি ধর্মনিরপেক্ষ শিক্ষা হিসেবে চালু করার ব্যাপারে যোগ্যতার প্রমাণ রাখতে পারল না। হিন্দু সম্প্রদায়ের মহরথীরাও ধর্মনিরপেক্ষ হওয়ার ব্যাপারে নমনীয়তা দেখাতে পারলেন না। ধর্মীয় শিক্ষার উপর জোর দেওয়ায় বাঙালি মুসলমানের শিক্ষা বিস্তারের পথে তা এক বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কারণ শিক্ষিত হিন্দু ভদ্রলোক যাঁরা নিজেদের প্রগতিশীল বলে দাবি করতেন যখন তাঁরা হিন্দু ঐতিহ্যকে চাপিয়ে দিতে চাইলেন, স্বভাবতই সাধারণ মুসলমানরা তখন নিজ ধর্মের ঐতিহ্যকেও রক্ষা করতে চাইবেন। সমাজের সুবিধাভোগী অংশ হিসেবে উচ্চবর্গের শিক্ষিত হিন্দুরা তখন নানাভাবে মুসলমানদের আক্রমণ করেছেন এবং অসম্মানও করেছেন। বঙ্কিমের মতো চিন্তাবিদ লিখেছেন যে, ভারতে ব্রিটিশ শাসন পূর্বনির্ধারিত। কেনন সে শাসনের মধ্য দিয়েই হিন্দুত্বের আদি শক্তি পুনরুজ্জীবিত হবে। তিনি অন্যত্র বলেছেন, ‘আমি হিন্দু, তুমি হিন্দু। রাম হিন্দু, যদু হিন্দু, আরো লক্ষ লক্ষ হিন্দু আছে। এই লক্ষ লক্ষ হিন্দু মাত্রেরই যাতে মঙ্গল হয়, তাতেই আমার মঙ্গল।’ তিনি মুসলমানদের কোনো বিবেচনার মধ্যেই রাখেন নি।

শিক্ষিত হিন্দুরা সমাজে তখন এগিয়ে থাকা শক্তি। বঙ্কিম তাঁদের মঙ্গল নিয়ে ভাবছেন কিন্তু পশ্চাৎপদ মুসলমানদের প্রতি তাঁর সামান্যতম সহানুভূতি নেই। তিনি তাঁদেরকে মনে করছেন শত্রুপক্ষ। ইংরেজ রাজত্বে তিনি ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়াই না করে মুসলমানদের সবংশে নিপাত করতে চেয়েছেন। তাঁর রচিত আনন্দমঠ  উপন্যাসের ইতিবাচক চরিত্র সত্যানন্দ স্পষ্ট বলছেন, ‘রাজ্য চাহি না, কেবল মুসলমানেরা ভগবানের বিদ্বেষী বলে তাঁদের সবংশে নিপাত করতে চাই।’ মুসলমানদের একাংশ কেন প্রাথমিক বিদ্যালয় বাদ দিয়ে রক্ষণশীলদের মতো মাদ্রাসা আর মক্তবের শিক্ষা নিয়ে পড়ে থাকতে চেয়েছেন তাঁর ব্যাখ্যা এখানেই পাওয়া যাবে। প্রায় সমস্ত শিক্ষিত হিন্দুরা যখন ইংরেজদের প্রশংসায় পঞ্চমুখ আর মুসলিমদের নিন্দা করে চলেছে, সেই হিন্দুদের মুসলমানরা কিভাবে আপন করে নেবে? মুসলমানরাও তখন হিন্দুদের মতো নিজ-ধর্মীয় পরিচয়ের মধ্যে ঢুকে পড়তে চাইলেন। শিক্ষিত হিন্দুদের নানা কুসংস্কারাচ্ছন্ন কর্মকাণ্ডই বাঙালি মুসলমানদের বাঙালি থেকে মুসলমান বানিয়ে ছেড়েছিল।

 

তৃতীয় কিস্তির লিংক